📘 রূহের রহস্য > 📄 কবরে মুনকার-নাকীরের সওয়াল-জওয়াবের সময় মৃত ব্যক্তির রুহকে কিভাবে দেহে ফিরিয়ে আনা হয়

📄 কবরে মুনকার-নাকীরের সওয়াল-জওয়াবের সময় মৃত ব্যক্তির রুহকে কিভাবে দেহে ফিরিয়ে আনা হয়


নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই প্রসঙ্গে বিস্তারিত আলোকপাত করেছেন। আর রূহ দেহে ফিরে আসার বিষয়টি তিনি ব্যাখ্যা করে দিয়েছেন। এখানে এই প্রসঙ্গে একটি ঘটনা উল্লেখ করা হলো। হযরত বারা ইবনে আযিব (রা) থেকে বর্ণিত: তিনি বলেন, আমি 'বাকী গারকাদ' নামক গোরস্থানে এক ব্যক্তির জানাযায় শরীক ছিলাম। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও সেখানে তাশরীফ আনলেন এবং বসে পড়লেন। আমি তাঁর পাশে চুপচাপ বসে রইলাম। মৃত ব্যক্তির জন্য লাহাদ ধরনের কবর খনন করা হচ্ছিলো। তিনি তিনবার কবরের আযাব থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাইলেন। তারপর তিনি বললেন, নেককার বান্দা যখন দুনিয়ার সম্পর্ক ছিন্ন করে আখিরাতে প্রবেশ করতে থাকে, আর দুনিয়ায় তার শেষ নিঃশ্বাসের সময় উপস্থিত হয়, তখন তার নিকট সূর্যের মতো চেহারা বিশিষ্ট ফেরেশতারা আগমন করেন। তার দৃষ্টিসীমা পর্যন্ত ফেরেশতার সমাগম ঘটে। মালাকুল মউত এসে তার শিয়রের দিকে বসে বলেন, হে পবিত্র রূহ, আল্লাহর অনুগ্রহ ও সন্তুষ্টির দিকে বের হয়ে এসো। তখন সেই রূহ এরূপ সহজভাবে দেহ থেকে বের হয়ে আসে যেরূপ মশকের মুখ দিয়ে পানি বের হয়ে আসে। তারপর মউতের ফেরেশতা সেই রূহকে নিয়ে যান। তারপর ফেরেশতারা সেই রূহকে গ্রহণ করেন। এরপর অন্যান্য ফেরেশতারা এক মুহূর্ত বিলম্ব না করে তাঁর হাত থেকে সেই রূহকে নিয়ে যান। তারপর ফেরেশতারা সেই রূহকে খুশবুযুক্ত জান্নাতী কাফনে জড়িয়ে নেন। তখন ঐ রূহ থেকে মেশকের চেয়েও অধিক খুশবু ছড়িয়ে পড়ে। এইভাবে ফেরেশতারা ঐ রূহকে নিয়ে উপরে উঠতে থাকেন। আর এঁরা ফেরেশতাদের যেসব জামাআতের নিকট দিয়ে যেতে থাকেন, তাঁরাই জিজ্ঞেস করেন, এই পবিত্র রূহটি কার? সেই রূহের বহনকারী ফেরেশতারা যার রূহ তার ভালো নামটি উল্লেখ করে বলেন, এই রূহটি অমুকের পুত্র অমুকের। এভাবে ঐ রূহকে দুনিয়ার নিকটবর্তী আকাশে নিয়ে যান এবং ঐ রূহের জন্য দরজা খুলে দিতে বলা হয়। দরজা খুলে দেয়া হলে ঐ আকাশের সকল আল্লাহর নৈকট্য লাভকারী ফেরেশতা ঐ রূহকে দ্বিতীয় আকাশ পর্যন্ত পৌছিয়ে দেন। এমনিভাবে ঐ আকাশ পর্যন্ত নিয়ে যান যেই আকাশটি আল্লাহর সবচেয়ে নিকটবর্তী। তখন আল্লাহ তা'আলা বলেন, "আমার বান্দার কিতাব অর্থাৎ আমলনামা ইল্লিয়‍্যীনে রেখে দাও। আর তার রূহকে যমীনের দিকে পাঠিয়ে দাও। কেননা, আমি মাটি দ্বারাই একে পয়দা করেছি, আর মাটির মধ্যেই ওকে ফিরিয়ে আনবো, দ্বিতীয়বার মাটি থেকে একে পয়দা করবো।” তারপর মৃত ব্যক্তির রূহকে তার দেহে ফিরিয়ে দেয়া হয়।

উক্ত মৃত ব্যক্তির কবরে দু'জন ফেরেশতা এসে তাঁকে বসান এবং প্রশ্ন করেন, আপনার রব কে? তিনি জবাব দেন, আমার রব আল্লাহ। এরপর প্রশ্ন করা হয়, আপনার দ্বীন কি? তিনি উত্তর দেন, আমার দ্বীন ইসলাম। আবার তাঁকে প্রশ্ন করা হয়, আপনাদের হিদায়াতের জন্য যাঁকে প্রেরণ করা হয়েছিলো, তিনি কে? তিনি জবাব দেন, তিনি আল্লাহর রাসূল। পুনরায় প্রশ্ন করা হয়। তিনি যে আল্লাহর রাসূল, তা কিভাবে জানলেন? তিনি জবাব দেন, আমি আল্লাহর কিতাব পড়েছি এবং এর প্রতি ঈমান এনেছি আর এটার সত্যতার স্বীকৃতিও দিয়েছি। এভাবে রাসূলের রিসালাতের কথা আমি জানতে পেরেছি। অতঃপর আসমান থেকে আওয়ায আসে, আমার বান্দা সত্যি কথা বলেছে। তার নিচে জান্নাতের শয্যা বিছিয়ে দাও এবং বেহেশতের দরজা তার জন্য খুলে দাও। তখন তার কবরের মধ্যে বেহেশতের সুঘ্রাণ আসতে থাকে। এরপর তার কবরকে দৃষ্টিসীমা পর্যন্ত প্রশস্ত করে দেয়া হয়। তখন তার নিকট অত্যন্ত সুন্দর, মনোরম ও সুগন্ধিযুক্ত পোশাক পরিহিত একজন লোক এসে বলেন, একটি আনন্দদায়ক সংবাদ শুনুন, আজকের এই দিনটি সম্পর্কে আপনার সাথে দুনিয়ায় ওয়াদা করা হয়েছিলো। মৃত ব্যক্তি জিজ্ঞেস করেন, আপনি কে? আপনার চেহারায় শুভ সংবাদের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। আগন্তুক ব্যক্তি উত্তর দেন যে, আমি আপনার নেক আমল। এই কথা শুনে মৃত ব্যক্তি দু'আ করেন, হে আমার রব, তুমি কিয়ামত কায়িম করো। তাহলে আমি আত্মীয়-স্বজনের কাছে ফিরে যেতে পারবো।

এমনিভাবে কোন কাফির যখন দুনিয়া থেকে বিদায় নেয় ও আখিরাতে প্রবেশ করে, তখন ভয়ানক কালো চেহারা বিশিষ্ট ফেরেশতারা আকাশ থেকে অবতরণ করে তার নিকট আসেন। ফেরেশতাদের হাতে একটি নেকড়া থাকে তাঁরা ঐ কাফিরের দৃষ্টির সীমা পর্যন্ত ছড়িয়ে থাকেন। তারপর মালাকুল মউত এসে ওর শিয়রে বসে বলেন, হে অপবিত্র রূহ, আল্লাহর ক্রোধ ও গজবের দিকে বেরিয়ে এসো। কিন্তু তার রূহ বের না হয়ে শরীরের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়বে। এই অবস্থায় মালাকুল মউত ঐ রূহকে এমনিভাবে টান দেন, যেভাবে ভিজা তুলা বা পশমের ভেতর থেকে কোন কাঁটাযুক্ত লৌহ শলাকা টান দিলে যে নাযুক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, সেভাবে তার রূহকে বের করে ধরে আনেন। কিন্তু ফেরেশতারা এক মুহূর্তের জন্য ঐ রূহকে মালাকুল মউতের হাতে থাকতে দেন না, তাঁর থেকে ঐ রূহকে নিয়ে নেকড়ার মধ্যে জড়িয়ে ফেলেন। ঐ রূহ থেকে খুব বেশি পচা গলা লাশের ন্যায় দুর্গন্ধ বের হতে থাকে। তারপর ফেরেশতারা ঐ রূহকে নিয়ে উপরে উঠতে থাকেন। ফেরেশতাদের যে কোন জামায়াতের নিকট দিয়ে অতিক্রম করার সময় তারা জিজ্ঞেস করেন, এই অপবিত্র রূহ কার? ফেরেশতারা তখন তার দুনিয়ার সবচেয়ে নিকৃষ্ট নামটি উল্লেখ করে বলেন, এই রূহ অমুকের পুত্র অমুকের। তাঁরা এই রূহকে নিয়ে প্রথম আকাশে গিয়ে পৌছেন এবং দরজা খোলতে বলেন, কিন্তু দরজা খোলা হয় না। তারপর নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পবিত্র কুরআনের এই আয়াত পড়ে শুনালেন। “যাঁরা আমার নিদর্শনকে প্রত্যাখ্যান করে এবং অহঙ্কারবশতঃ তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তাদের জন্য আসমানের ফটকগুলো খোলা হবেনা এবং তারা বেহেশতেও প্রবেশ করতে পারবে না, যেই পর্যন্ত না উট সুচের ছিদ্রপথে প্রবেশ করবে। (এটা একটি সম্পূর্ণ অসম্ভব ব্যাপার, কাজেই কাফিরদের বেহেশতে যাওয়াও অসম্ভব।) এভাবে আমি অপরাধীদেরকে প্রতিফল দিয়ে থাকি। তাদের জন্য জাহান্নামের বিছানা এবং জাহান্নামের আগুনই হবে উপরের আচ্ছাদন। আমি এমনিভাবে যালিমদেরকে শাস্তি প্রদান করে থাকি।” (সূরা আল-আ'রাফ: আয়াত ৪০-৪১)

আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন, "এর আমলনামা সিজ্জীনের সবচেয়ে নিচু যমীনে নিয়ে যাও। তারপর তার রূহকে ওর উপরেই ছুঁড়ে মারা হয়। তারপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরআন মাজিদের এই আয়াত পাঠ করলেন, “যে কেউ আল্লাহর সাথে শিরক করলো, সে যেন আকাশ থেকে ছিটকে পড়লো, অতঃপর একে পাখি ছোঁ মেরে নিয়ে গেলো কিংবা বাতাস ওকে দূরে উড়িয়ে নিয়ে নিক্ষেপ করলো।” (সূরা হজ্জ: আয়াত-৩১)

এই অবস্থায় ঐ রূহকে তার দেহে ফিরিয়ে দেয়া হয়। এরপর দু'জন ফেরেশতা তার কাছে এসে জিজ্ঞেস করেন, তোমার রব কে? সে জবাব দেয়, হায় হায়! আমার জানা নেই। এরপর জিজ্ঞেস করা হয়, ইনি কে? যাঁকে তোমাদের কাছে প্রেরণ করা হয়েছিলো, সে জবাব দেয়, হায় হায় আমি তাঁকে চিনি না। তারপর আকাশ থেকে আওয়ায আসে, আমার এ বান্দা মিথ্যাবাদী। ওর নিচে আগুনের বিছানা বিছিয়ে দাও। আর জাহান্নামের জানালা খুলে দাও। এরপর তার কবরে জাহান্নামের প্রচণ্ড গরম ও দুর্গন্ধ আসতে আরম্ভ করে। তাকে তারা এমনভাবে চাপ দেয় যে, এদিকের হাড়-গোড় ওদিকে, ওদিকের হাড়-গোড় এদিকে বের হয়ে যায়। তারপর তার নিকট কুৎসিত আকৃতির ও দুর্গন্ধযুক্ত বিশ্রী পোশাক পরা একজন লোক এসে বলে, তুমি একটি দুঃসংবাদ শোন! আজকের দিনটি ঐদিন, তোমার সাথে যেই দিনটি সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছিলো। সে জিজ্ঞেস করে তুমি কে? তোমার চেহারা থেকে অশুভ লক্ষণ পরিলক্ষিত হচ্ছে। সে জবাব দেয়, আমি হলাম তোমার বদ আমল। তারপর সেই ব্যক্তি দুআ করে, আল্লাহ কিয়ামত কায়িম করো না। (আহমদ, আবূ দাউদ, নাসাঈ, ইবনে মাজা, আবূ উআনা)

এখানে ইমাম ইবনে হাযম (র)-এর অভিমত বিশেষ প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেন, কিয়ামতের পূর্বে যে মৃত ব্যক্তি কবরে জীবিত হন, এটা একটি ভ্রান্ত ধারণা। কারণ, আল্লাহ তা'আলা কুরআন পাকে ইরশাদ করেছেন, "তারা বলবে, হে আমাদের রব, আপনি আমাদেরকে দু'বার মৃত্যু দিয়েছেন আবার দু'বার জীবন দিয়েছেন। আমরা এখন আমাদের অপরাধ স্বীকার করেছি। এখন আমাদের মুক্তির কোন উপায় আছে কী?” (সূরা মুমিন: আয়াত-১১)

কুরআন পাকে আরো উল্লেখ রয়েছে, "কেমন করে তোমরা আল্লাহর ব্যাপারে কুফরি অবলম্বন করছো? অথচ তোমরা ছিলে নিষ্প্রাণ। অতঃপর তিনিই তোমাদেরকে প্রাণ দান করেছেন। আবার মৃত্যু দান করবেন। পুনরায় তোমাদেরকে জীবন দান করবেন। অতঃপর তারই দিকে তোমরা ফিরে যাবে।" (সূরা আল-বাকারা: আয়াত-২৮) কুরআন পাকের এই আয়াতসমূহ উক্ত ধারণাকে সমর্থন করে। কেননা, যদি মৃতব্যক্তির কবরে জীবিত হওয়ার কথা মেনে নেয়া হয়, তাহলে দু'টি মৃত্যুর পরিবর্তে তিনটি মৃত্যু ও তিনটি জীবন অনিবার্য হয়ে পড়ে। এরূপ কোন ধারণা ভ্রান্ত ও পবিত্র কুরআনের পরিপন্থি। হ্যাঁ, যদি আল্লাহ কাউকে কোন নবীর মু'জিযার বদৌলতে জীবিত করে দেন, তাহলে সেটা হবে একটি ব্যতিক্রমধর্মী ঘটনা। পবিত্র কুরআনে এ ধরনের কিছু ঘটনার উল্লেখ রয়েছে। যেমন, হাজার হাজার মানুষকে জীবিত করা প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, "আপনি কি তাদেরকে দেখেননি, যারা মৃত্যুর ভয়ে নিজেদের ঘর বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে গিয়েছিলো? অথচ তারা ছিলো সংখ্যায় হাজার হাজার। তারপর আল্লাহ তাদেকে বললেন, মরে যাও। তারপর তাদেরকে জীবিত করে দিলেন। নিশ্চয় আল্লাহ মানুষের উপর অনুগ্রহকারী। কিন্তু অধিকাংশ লোক এর শোকর আদায় করে না।" (সূরা আল-বাকারা: আয়াত-২৪৩)

এমনিভাবে হযরত উযায়ের (আ) একবার বায়তুল মুকাদ্দাস হয়ে যাবার সময় দেখলেন, শহরটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়ে আছে। ঐ সময় আল্লাহ তাকে মৃত্যু দান করলেন এবং এক শতাব্দী পর তাঁকে জীবিত করলেন। এই ঘটনাটি আল্লাহ তা'আলা কুরআন পাকে উল্লেখ করেছেন, "আপনি কি সেই লোকটিকে দেখেননি যে এমন একটি জনপদের নিকট দিয়ে যাচ্ছিলো, তার ঘর-বাড়ী সব ভেঙ্গে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিলো। সে বললো, কেমন করে আল্লাহ মরণের পর একে জীবিত করবেন? অতঃপর আল্লাহ ঐ লোকটিকে মৃত অবস্থায় একশ বছর রাখলেন। তারপর তাকে উঠালেন অর্থাৎ জীবিত করলেন। আল্লাহ তাকে বললেন তুমি কতকাল এভাবে ছিলে? সে বললো, একদিন কিংবা একদিনের কিছু কম সময়। আল্লাহ বললেন, তা নয়, বরং তুমিতো ছিলে একশ বছর। এবার চেয়ে দেখ তোমার খাবার ও পানীয়-এর দিকে। সেগুলো পচে যায়নি। তোমার গাধাটির দিকেও চেয়ে দেখো। আর আমি তোমাকে মানুষের জন্য একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে চেয়েছি। আর হাড়গুলোর দিকেও চেয়ে দেখো আমি এগুলোকে কেমন করে জোড়া দেই এবং সেগুলোর উপর মাংসের আবরণ পরিয়ে দেই। অতঃপর যখন তার উপর এ অবস্থা প্রকাশিত হলো, তখন সে বলে উঠলো, আমি জানি, নিঃসন্দেহে আল্লাহ সর্ব বিষয়ে ক্ষমতাবান।" (সূরা আল-বাকারা: আয়াত-২৫৯)

কুরআন পাকের এই আয়াত দ্বারাও প্রমাণিত হয় যে, কিয়ামতের পূর্বে রূহ তার দেহের মধ্যে ফিরে আসে না। "আল্লাহ মানুষের রূহ কবয করেন তার মৃত্যুর সময় আর যারা মরে না, তাদের নিদ্রার কালে। অতঃপর যার মৃত্যু অবধারিত তার রূহ আটকে রাখেন এবং অন্যান্যদের রূহ এক নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ছেড়ে দেন। নিশ্চয় এতে চিন্তাশীল লোকদের জন্য নিদর্শনাবলী রয়েছে।” (সূরা আয-যুমার: আয়াত-৪২)

সুতরাং কুরআন শরীফের তিনটি আয়াতের দ্বারা জানা গেলো যে, রূহ কিয়ামতের আগে দেহে ফিরে আসবে না। এই প্রসঙ্গে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তিনি পবিত্র মি'রাজের সময় প্রথম আকাশে হযরত আদম (আ)-এর ডান দিকে সৌভাগ্যবানদের আর বাম দিকে দুর্ভাগাদের রূহ প্রত্যক্ষ করেছিলেন। এছাড়া বদরের যুদ্ধের দিন তিনি নিহত কাফিরদের লাশগুলোকে যখন সম্বোধন করেছিলেন, তখন তারা তাঁর কথা শুনতে পেরেছিলো। সে সময় সাহাবায়ে কিরাম (রা) যখন বললেন, ওদের লাশতো পচে গলে গেছে, তখন নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের কথা অস্বীকার করেননি, বরং তিনি বলেছিলেন, তবুও তারা আমার কথা শুনেছে। এর দ্বারা জানা গেলো তার সম্বোধন ছিলো রূহের প্রতি এবং তাদের রূহ তার কথা শুনেছিলো। অবশ্য ওদের দেহে কোন অনুভূতি ছিলো না। আল্লাহ তা'আলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন, "আর সমান নয় জীবিত ও মৃত। আল্লাহ যাকে ইচ্ছা শ্রবণ করান, আপনি কবরবাসীদেরকে শুনাতে পারবেন না।" (সূরা ফাতির : আয়াত-২২)

যেহেতু দেহই কবরে বাস করে, রূহ নয়, তাই এখানে শুনতে না পারার বিষয়টি দেহের জন্যই প্রযোজ্য। কোন মুসলমান এ ব্যাপারে সন্দেহ পোষণ করতে পারে না যে, আল্লাহ যাকে শুনার অযোগ্য বলেছেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে শুনার যোগ্য বলবেন। অর্থাৎ দেহ শুনতে পায় না, রূহ শুনতে পায়। কোন সহীহ হাদীসের দ্বারা এটা প্রমাণিত নয় যে, কবরে মুনকার-নাকীরের সওয়ালের সময় মৃতদের রূহ দেহে ফিরিয়ে দেয়া হয়। তাহলে সেটা গ্রহণ করা যেতো। কবরে দেহের মধ্যে রূহ ফিরিয়ে দেয়ার ব্যাপারে একমাত্র মিনহাল ইবনে আমর (র) অত্যধিক বাড়াবাড়ি করেছেন, যদিও তাঁর এই অভিমত ততো জোরদার নয়। হযরত শুবা (র) প্রমুখের নিকটও এ ধারণা গ্রহণযোগ্য ছিলো না। তাঁর সম্পর্কে ইমাম মুগিরা ইবনে মুকসিম মানাবী (র)-এর অভিমত হলো, ইসলামের কোন বিষয় সম্পর্কে মিনহালের সাক্ষ্য নির্ভরযোগ্য নয়। সব সহীহ হাদীস এরূপ বাড়াবাড়ির বিপক্ষে। এ ছাড়া মহান সাহাবীগণও এই অভিমত সমর্থন করেছেন।

হযরত সুফিয়া বিনতে শায়বা (রা)-বর্ণনা করেছেন যে, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা) একদিন মসজিদে হারামে প্রবেশ করে দেখলেন, সেখানে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়ের (রা)-এর লাশ পড়ে আছে। তাঁকে বলা হলো যে, হযরত আসমা বিনতে আবু বকর (রা) ও এখানে আছেন। হযরত ইবনে উমর (রা) হযরত আসমা (রা)-কে সান্ত্বনা ও প্রবোধ দিতে গিয়ে বললেন, এসব লাশ কিছুই নয়। নিশ্চয় তাঁর রূহ আল্লাহর কাছে রয়েছে। তখন হযরত আসমা (রা) জবাব দিলেন, আল্লাহর নবী হযরত ইয়াহইয়া (আ)-এর শির মুবারক বনী ইসরাইলের একজন পতিতাকে উপহার দেয়া হয়েছিলো। তাহলে আমাদের অবস্থা আর কি হতে পারে।

উল্লেখ্য যে, আবু মুহাম্মদ ইবনে হাযম (র)-এর বক্তব্যের মধ্যে কিছু সত্য আছে, আবার কিছু বিভ্রান্তিও আছে। কবরের মধ্যে জীবিত হওয়া সম্পর্কে ইবনে হাযম (র)-এর অভিমতটি ভ্রান্ত প্রমাণিত হতো, যদি তাঁর কথার অর্থ দুনিয়ার জীবনের ন্যায় জীবন হতো। অর্থাৎ দেহের মধ্যে রূহ অবস্থান করে, দেহের সকল কর্মকাণ্ডে হস্তক্ষেপ করে এবং রূহ বিদ্যামান থাকা অবস্থায়ই দেহের পানাহার, পোশাক পরিচ্ছদ ইত্যাদির প্রয়োজন দেখা দেয়, তাহলে মৃত ব্যক্তির জন্য এরূপ জীবন লাভের অভিমত অবশ্যই ভ্রান্ত। এই অভিমতকে শুধু কুরআন-হাদীসই অস্বীকার করে না বরং বিবেক বুদ্ধিও এটাকে অস্বীকার করে। আর এর অর্থ যদি বরযখী জীবন হয়, যা দুনিয়ার জীবনের মতো নয়, তাহলে কবরে দেহের মধ্যে রূহ অবশ্যই ফিরে আসে, যাতে তার পরীক্ষা গ্রহণ করা যায়। অর্থাৎ সে মুনকার-নাকীরের সওয়ালের জওয়াব দিতে পারে। কিন্তু রূহের এরূপ প্রত্যাবর্তন দুনিয়ার প্রত্যাবর্তনের মত নয়। যদি তা হয় তবে উক্ত অভিমতটি সঠিক। আর যাঁরা উপরোক্ত অভিমত পোষণ করেন তাঁরা নিঃসন্দেহে ভ্রান্ত।

ইমাম ইবনে হাযম (র) প্রমাণ হিসেবে কুরআন শরীফের যে আয়াতটি উল্লেখ করেছেন, তার অর্থ হলো, "তারা বলবে, হে আমাদের রব! তুমি আমাদেরকে দু'বার প্রাণহীন অবস্থায় রেখেছো আবার দু'বার প্রাণ ফিরিয়ে দিয়েছো। আমরা আমাদের অপরাধ স্বীকার করছি, এখন মুক্তির কোন উপায় আছে কি?” (সূরা আল মুমিন : আয়াত-১১)

কুরআন পাকের এ আয়াতের দ্বারা সাময়িকভাবে দেহের মধ্যে রূহ ফিরে আসাকে অস্বীকার করা হয়নি। যেমন বনী ইসরাঈলের জনৈক নিহত ব্যক্তিকে মৃত্যুর পর সাময়িকভাবে জীবিত করা হয়েছিলো। কিছুক্ষণ পর সে আবার মৃত্যুবরণ করেছিলো, একটি মাত্র প্রশ্ন জিজ্ঞেস করার উদ্দেশ্যে তাকে কিছুক্ষণের জন্য জীবনদান করাকে স্বাভাবিক জীবন হিসেবে গণ্য করা যায় না। কেননা, লোকটিকে সামান্য সময়ের জন্য জীবিত করা হয়েছিলো। জীবিত হয়েই সে বলে দিয়েছিলো, আমাকে অমুক ব্যক্তি হত্যা করেছে। এরপর সে আবার মৃত্যুবরণ করে। তদুপরি রূহকে দেহে ফিরিয়ে দিলেই তাতে স্বাভাবিক জীবন অপরিহার্য হয়ে পড়ে না। বরং দেহের সাথে এক ধরনের সম্পর্ক সৃষ্টি হয় মাত্র। আর রূহের সম্পর্ক তার অশরীরী দেহের সাথে সব সময়ই বজায় থাকে যদিও দেহ পচে গলে ছিন্ন ভিন্ন হয়ে মাটির সাথে মিশে বিলীন হয়ে যায়।

রূহের সাথে দেহের পাঁচ রকমের সম্পর্ক থাকে এবং প্রত্যেকটি সম্পর্কই স্বতন্ত্র বটে। প্রথম সম্পর্ক মায়ের গর্ভে অবস্থানকালে। দ্বিতীয় সম্পর্ক দুনিয়াতে আসার পর। তৃতীয় সম্পর্ক স্থাপিত হয় নিদ্রার মধ্যে। সাধারণত দেহের রূহের সম্পর্ক নিদ্রিত অবস্থায় অটুট থাকে। তবে সময় সময় রূহ নিদ্রিত ব্যক্তির দেহ থেকে সময়িক বিচ্ছিন্নও হয়ে যায়। রূহের চতুর্থ সম্পর্ক বরযখী জীবনে হয়ে থাকে, যদিও মৃত্যুর পর রূহ দেহ থেকে পৃথক হয়ে মুক্ত হয়ে যায়। তবে এমনভাবে রূহ পৃথক হয় না যে, দেহের সাথে তার কোনই সম্পর্ক বিদ্যমান থাকে না। ইতিপূর্বে কবরে রূহের প্রত্যাবর্তন সম্পর্কীয় হাদীসগুলো উল্লেখ করা হয়েছে। যেমন, মৃত ব্যক্তিকে কেউ সালাম করলে সেই সালামের উত্তর দেয়ার জন্য তার রূহকে দেহে ফিরিয়ে দেয়া হয়। রূহকে দেহে ফিরিয়ে দেয়ার এটা একটা বিশেষ ধরনের প্রক্রিয়া যে জন্য কিয়ামতের পূর্বে দেহের নব জীবন লাভ করা কোন অত্যাবশ্যক নয়। দেহের সাথে রূহের পঞ্চম সম্পর্ক মৃত্যুর পরে অর্থাৎ আখিরাতে স্থাপিত হবে। আর সেটা হবে দেহের সাথে রূহের সবচেয়ে পরিপূর্ণ ও নিবিড় সম্পর্ক। এই প্রেক্ষাপটে দেহের সাথে রূহের উপরোক্ত চার ধরনের সম্পর্ক নগণ্য বলে বিবেচিত হবে।

ইমাম ইবনে হাযম (র) তাঁর অভিমতের স্বপক্ষে পবিত্র কুরআনের যে আয়াতটি প্রমাণস্বরূপ উদ্ধৃত করেছেন তা হলো, "আল্লাহ মানুষের রূহকে কবয করেন তার মৃত্যুর সময়, আর যে মরে না, তার নিদ্রাকালে। অতঃপর যার মৃত্যু অবধারিত করেন, তার রূহকে আর ছেড়ে দেয়া হয় না। অন্যান্য (নিদ্রিত ব্যক্তিদর) রূহকে ছেড়ে দেন এক নির্দিষ্ট সময়ের জন্য। নিশ্চয় এতে রয়েছে চিন্তাশীল লোকদের জন্য নিদর্শনাবলী”। (সূরা আয-যুমার: আয়াত-৪২)

নিদ্রিত ব্যক্তির রূহকে সাময়িকভাবে তার দেহের মধ্যে আটকিয়ে রাখার অর্থ এই নয় যে, সেই রূহ তার দেহের মধ্যে কোন সময়ই ফিরে আসতে পারবে না। কবরের মধ্যে রূহকে যখন মৃত ব্যক্তির দেহে ফিরিয়ে দেয়া হয়, তখন দুনিয়ার স্বাভাবিক জীবন আর ফিরে পাওয়া যায় না। একজন নিদ্রিত ব্যক্তির দিকে লক্ষ্য করলে বুঝা যায় সে জীবিত নয়, আবার মৃতও নয়, বরং সে এক মধ্যবর্তী অবস্থায় আছে। অথচ দেহে রূহ আছেই বলে আমরা তাকে জীবিত বলি। কিন্তু সে জীবন জাগ্রত অবস্থার জীবন থেকে ভিন্ন ধরনের, যেহেতু নিদ্রা হলো মৃত্যুর সহোদর ভাই। ঠিক তেমনিভাবে মৃতব্যক্তির রূহকে যখন তার দেহে ফিরিয়ে দেয়া হয়, তখন রূহের অবস্থা হয় মধ্যবর্তী ধরনের। না মৃত না জীবিত। তবে সাধারণত এই অবস্থাকে মৃতই বলা হয়। উপরোক্ত বিষয় সম্পর্কে একটু গভীরভাবে চিন্তা করলে অনেক জটিলতা দূর হয়ে যায়।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বর্ণনা করেছেন, তিনি মি'রাজ শরীফের রাত্রে আম্বিয়া কিরামের দর্শন লাভ করেছিলেন। এ সম্পর্কে কতিপয় হাদীস বিশারদের অভিমত হলো, তিনি তাঁদেরকে সশরীরের দেখেছিলেন। কেননা, আম্বিয়ায়ে কিরাম তাঁদের রবের নিকট জীবিত। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত ইবরাহীম খলীলুল্লাহ (আ)-কে বায়তুল মামুরে হেলান দিয়ে বসা অবস্থায় দেখেছিলেন। তিনি হযরত মূসা কলীমুল্লাহ (আ)-কে তাঁর কবরে নামায পড়তে দেখেছিলেন এবং তাঁর শারীরিক আকৃতি কিরূপ ছিলো তাও বর্ণনা করেছিলেন। তাঁর সম্পর্কে আরো বর্ণনা করেছেন, তিনি উজ্জ্বল, গৌরবর্ণ ও শানুয়া গোত্রের লোকের মতো দীর্ঘদেহী ছিলেন। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত ঈসা (আ) সম্পর্কে বলেছেন, তাঁর মাথা থেকে ফোঁটা ফোঁটা পানি ঝরছিলো, যেন তিনি এই মাত্র গোসলখানা থেকে বেরিয়ে এসেছেন। তিনি আরো বলেছেন, যেই ব্যক্তি হযরত ইবরাহীম খলীলুল্লাহ (আ)-কে কোন সময় দেখেনি সে যেন আমাকে দেখে নেয়। কিন্তু অনেক আলিমের অভিমত হলো, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নবীদের রূহ দর্শন করেছিলেন। কেননা নবীদের পবিত্র দেহ তো তাদের কবরেই আছে। যা কিয়ামতের আগে উঠানো হবে না। অন্যথায় সকল নবী রাসূলগণকে কিয়ামতের পূর্বেই কবর থেকে উঠানো প্রয়োজন হয়ে পড়ে। এ ছাড়া ইসরাফীল (আ)-এর শিঙ্গায় ফুঁ-এর সময় তাঁদের আবার মৃত্যুবরণ করতে হবে। যেই জন্য তাঁদের তিনবার মৃত্যুবরণ করার প্রশ্ন দেখা দেয়। এরূপ ধারণা একান্তই ভ্রান্ত।

যদি নবী-রাসূলগণের পবিত্র দেহ কবর থেকে উঠিয়ে নেয়া হতো, তাহলে আল্লাহ তাঁদের সাথে বেহেশতের ওয়াদা করতেন না। তাঁরা জান্নাতেই অবস্থান করতেন। অথচ নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ তা'আলা তাঁর আগে আম্বিয়া কিরামের জান্নাতে প্রবেশ করা নিষিদ্ধ করে দিয়েছেন। সবার আগে তিনিই জান্নাতে প্রবেশ করবেন এবং সবার আগে তিনিই কবর থেকে উঠবেন। নিঃসন্দেহে তাঁর দেহ মুবারক কবরের মধ্যে স্বাভাবিক ও সুন্দর অবস্থায় আছে।

একদা সাহাবায়ে কিরাম তাঁর কাছে আরয করেছিলেন, আপনি কবরবাসী হওয়ার পর আমাদের প্রেরিত দরূদ শরীফ আপনার খেদমতে কিভাবে পেশ করা হবে। তখন তিনি ইরশাদ করেছিলেন, "আল্লাহ তা'আলা আম্বিয়া কিরামের পবিত্র দেহকে নষ্ট করা মাটির জন্য হারাম করে দিয়েছেন।" যদি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দেহ মুবারক কবরে বিদ্যমান আছে বলে স্বীকার করা না হয়, তাহলে উপরোক্ত হাদীসটি গ্রহণযোগ্য হবে না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেছেন যে, আল্লাহ তা'আলা তাঁর পবিত্র কবরে ফেরেশতাদের নিয়োজিত রাখবেন, যাঁরা তার খিদমতে অহরহ উম্মতদের সালাম পৌঁছাতে থাকবেন। এছাড়া নির্ভরযোগ্য হাদীসে বর্ণিত আছে যে, একদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বাইরে বের হয়েছিলেন, হযরত আবু বকরও তাঁর সাথে ছিলেন। সে সময় তিনি ইরশাদ করেছিলেন, আমাদেরকে ঠিক এমনিভাবে (হাশরের দিন) জীবিত করা হবে। তবে এটাও দৃঢ় সত্য যে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পবিত্র রূহ আলা ইল্লিয়‍্যীনে আম্বিয়া কিরামের পবিত্র রূহের সাথে আছে।

এ প্রসঙ্গে আরো বর্ণিত আছে, পবিত্র মিরাজের সময়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত মূসা (আ)-কে কবরের মধ্যে নামায পড়া অবস্থায় দেখেছিলেন। তিনি তাঁকে আবার ষষ্ঠ অথবা সপ্তম আকাশেও দেখেছিলেন। অতএব জানা গেলো যে, হযরত মূসা (আঃ)-এর পবিত্র দেহ কবরে আর তাঁর পবিত্র রূহ আসমানে ছিলো। আর তাঁর রূহের সাথে দেহেরও এক বিশেষ ধরনের সম্পর্ক বা যোগাযোগ বিদ্যমান ছিলো, যেমন, তিনি কবরে নামাযরত ছিলেন এবং সালামকারীদের সালামের উত্তরও দিচ্ছিলেন। অথচ সে সময় তাঁর পবিত্র রূহ রফীকে আলার মধ্যে ছিলো। অতএব, এই দুটি বিষয়ের মধ্যে বিরোধের কোন অবকাশ নেই।

রূহের অবস্থা ও দেহের অবস্থা এক নয়। যদিও উভয়ের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। এ ছাড়া রূহের ও দেহের মধ্যে অনেক সম্পর্ক বিদ্যমান। অপর দিকে, পরস্পর বিদ্বেষ পোষণকারী দু'টি রূহের মধ্যেও অনেক পার্থক্য রয়েছে। তবে দেহের দিক দিয়ে তাদের মধ্যে কোন বিরোধ নেই। রূহ আসমান যমীনে সর্বত্র চলাফেরা করতে পারে। আর দেহের পক্ষে তা সম্ভব নয়। যেমন, রূহ কবয হওয়ার পরই সপ্তম আকাশে পৌঁছে যায় আবার নেমেও আসে। ঠিক তেমনিভাবে একজন জীবিত মানুষের রূহ নিদ্রিত অবস্থায় যথা ইচ্ছা উঠানামা করে থাকে।

কেউ কেউ রূহকে সূর্য ও সূর্যের কিরণের সাথে তুলনা করেছেন। কেননা, সূর্য আকাশে অবস্থান করে অথচ তার কিরণ পৃথিবী পর্যন্ত পৌঁছে। কিন্তু শাইখ ইবনে তাইমিয়া (র) বলেন, এরূপ উদাহরণের কোন অর্থ নেই। সূর্য আকাশ থেকে পৃথিবীতে নেমে আসে না। কেবল তার কিরণ পৃথিবীর সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। তাই সূর্যের কিরণ সূর্য নয়। এটা সূর্যের কোন গুণও নয়। সূর্য পৃথিবীর মুখোমুখি হওয়ার কারণে এইরূপ অবস্থার সৃষ্টি হয়। পক্ষান্তরে, রূহ নিজেই উঠানামা করে।

এখানে উল্লেখ্য যে, বদর যুদ্ধে নিহত কাফিরদের সম্পর্কে সাহাবায়ে কিরাম রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর খিদমতে আরয করেছিলেন, আপনি কি ঐ সমস্ত লোকদের সাথে কথা বলছেন, যাদের লাশ পচে গলে বিকৃত হয়ে গেছে? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উত্তরে বলেছিলেন, হ্যাঁ, তারা আমার কথা শুনছে। এ মন্তব্য একথার পরিপন্থি নয় যে, ঐ সময় তাদের রূহ তাদের দেহে ফিরে এসেছিলো। যে জন্য তারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কথা শুনতে পেরেছিলো, যদিও তাদের দেহ পচে গলে গিয়েছিলো। আসলে সম্বোধন করা হয়েছিলো তাদের রূহকে, আর রূহ যে দেহের সাথে সম্পৃক্ত, সেই দেহই পরে পচে গলে গিয়েছিলো, রূহ নয়।

イমাম ইবনে হাযম (র) কুরআন শরীফের অন্য দু'টি আয়াতের দ্বারা প্রমাণ করতে চেয়েছেন যে, কবরের মধ্যে মৃত ব্যক্তির দেহে রূহ ফিরে আসে না। এ আয়াত দু'টির অর্থ হলো, "আর জীবিত ও মৃত সমান নয় আল্লাহ যাকে ইচ্ছা শ্রবণ করান। যারা কবরবাসী তাদেরকে আপনি শুনাতে পারবেন না। আপনি তো কেবল একজন সতর্ককারী মাত্র।” (সূরা ফাতির: আয়াত-২২-২৩)

এই আয়াত দু'টির পূর্বাপর অর্থ থেকে জানা যায় যে, কাফিরদের অন্তর হলো মৃত, আপনি আপনার সম্বোধনের মাধ্যমে তাদের কোন উপকার করতে পারবেন না। তবে আল্লাহ তা'আলার উপরোক্ত কালামের অর্থ এই নয় যে, কবরবাসীরা কোন সময়ই শুনতে পায় না। উল্লেখ্য যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, মৃত ব্যক্তি তার জানাযায় অংশগ্রহণকারীদের জুতোর শব্দ পর্যন্ত শুনতে পান। তিনি আরো বলেন, বদর যুদ্ধে নিহত ব্যক্তিরা তাঁর কথা শুনতে পেয়েছিলো। তাই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুসলমান মৃত ব্যক্তিদের প্রতি সালাম পেশ করার এমন নিয়ম প্রবর্তন করেছেন, যাতে করে তারা সালামকারীর ঐ সালাম শুনতে পায়।

নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেন, কোন মুমিন ব্যক্তি মৃত ব্যক্তিদেরকে সালাম করলে তাঁরা সালামের উত্তর দিয়ে থাকেন। উপরে বর্ণিত আয়াতের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ আরো দু'টি আয়াতের অর্থ এখানে উল্লেখ করা হলো, "আপনি আহ্বান শুনাতে পারবেন না মৃতদেরকে এবং বধিরদেরকেও, যখন তাঁরা পৃষ্ঠপ্রদর্শন করে চলে যায়। আপনি অন্ধদেরকে তাদের পথভ্রষ্টতা থেকে ফিরিয়ে আনতে পারবেন না। আপনি কেবল তাদেরকে শুনাতে পারবেন, যারা আমার আয়াত সমূহে বিশ্বাস করে। অতএব, তারাই আত্মসমর্পণকারী।” (সূরা আন্ নামল: আয়াত ৮০-৮১)

এখানে বধিরদেকে শুনাতে পারবেন না এবং মৃতদেরকে শুনাতে পারবেন না, এ দু'টো কথা পাশাপাশি উল্লেখ করায় বুঝা যায় যে, এদের কারোরই শুনবার কোন ক্ষমতা নেই। এদের অন্তর যেহেতু মৃত ও বধির, তাই এদেরকে শুনানো সম্ভব নয়। আর এদেরকে সম্বোধন করা, মৃত ও বধিরদেরকে সম্বোধন করারই শামিল। এই অর্থ যদি সঠিকও হয়, তাহলে মৃত্যুর পরে রূহকে তিরস্কার করা, ধমক দেয়া বা রূহকে কোন কথা শুনানো যাবে না। সেটা ঠিক বুঝা যায় না। প্রকৃতপক্ষে এই আয়াতের অর্থ হলো, আল্লাহ যাকে শুনাতে চান না, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে শুনাতে পারবেন না। তিনি শুধু ভয় প্রদর্শনকারী। অর্থাৎ আল্লাহ রাসূলকে ভয় প্রদর্শনের জন্য ক্ষমতা প্রদান করেছেন, যার জন্য তিনি দায়িত্বপ্রাপ্ত। কিন্তু যাদেরকে আল্লাহ শুনাতে চান না তাদেরকে শুনাবার ক্ষমতা তাঁকে দেয়া হয়নি।

ইমাম ইবনে হাযম (র)-এর পূর্বে উল্লেখিত মন্তব্য: "এই হাদীসটি সহীহ নয়। কেননা, এই হাদীসটির বর্ণনাকারী হচ্ছেন একমাত্র মিনহাল ইবনে আমর, যিনি নির্ভরযোগ্য রাবী নন" তবে এই হাদীসটি নিঃসন্দেহে সহীহ। কারণ এই হাদীসটি হযরত বারা ইবনে আযিব (রা) থেকে হযরত যাযান (রা) বর্ণনা করেছেন। এ ছাড়া হযরত আদী ইবনে সাবিত (রা), হযরত মুহাম্মদ ইবনে উকবা (রা), হযরত মুজাহিদ (রা)ও এই হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। হযরত আদী ইবনে সাবিত (রা) কর্তৃক বর্ণিত হাদীসটিতে কিছুটা শব্দগত পার্থক্য রয়েছে। এই হাদীসটি হযরত মুজাহিদ (রা)ও বর্ণনা করেছেন। মোটকথা, এই হাদীসটি স্বীকৃত, সুপরিচিত ও সহীহ বলে প্রতিষ্ঠিত।

হাফিয আবূ আবদুল্লাহ (র) তাঁর "কিতাবুর রূহ ওয়ান নাফস” নামক গ্রন্থে লিখেছেন, হযরত আদী ইবনে সাবিত (রা) থেকে হযরত বারা ইবনে আযিব (রা) বর্ণনা করেছেন, আমরা একদিন জনৈক আনসারের জানাযায় শরীক হওয়ার জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে বের হলাম। আমরা যখন কবরস্থানে গিয়ে পৌঁছলাম, তখন আনসারের কবর খোঁড়া হচ্ছিলো। রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেখানে বসে পড়লেন। আমরাও চুপচাপ বসে পড়লাম, আমাদের মাথার উপর যেন পাখি বসে আছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর শির মুবারক তুলে বললেন, "যখন কোন মুমিন ব্যক্তি দুনিয়ার সম্পর্ক ছিন্ন করে আখিরাতের দিকে রওয়ানা হন এবং হযরত আযরাঈল (আ) মুমিন ব্যক্তির শিয়রের কাছে বসেন এবং বলেন, হে পবিত্র রূহ! আল্লাহর রহমত ও সন্তুষ্টির দিকে বেরিয়ে এসো। তখন ঐ রূহ দেহ থেকে ঠিক তেমন সহজে বেরিয়ে আসে যেমন সহজে মশক থেকে পানি বেরিয়ে আসে। যখন কোন মুমিন ব্যক্তির রূহ এভাবে বেরিয়ে পড়ে, তখন মানুষ ও জিন ছাড়া আসমান-যমীনের অন্য সবাই তাঁকে সালাম জানায়। এইভাবে মুমিন ব্যক্তির রূহ আসমানের দিকে উঠিয়ে নেয়া হয়। তখন সেই রূহের জন্য আসমানের দরজা খুলে দেওয়া হয় এবং প্রত্যেক আসমানের আল্লাহর নৈকট্য প্রাপ্ত ফেরেশতারা অন্য আসমান পর্যন্ত সেই রূহকে বিদায় সম্ভাষণ জানান। এভাবে দ্বিতীয়, তৃতীয়, চতুর্থ, পঞ্চম, ষষ্ঠ ও সপ্তম আসমান অতিক্রম করে সে রূহ আল্লাহর 'আরশ পর্যন্ত গিয়ে পৌঁছে। রূহ 'আরশের নিকট পৌঁছার পর আল্লাহ তা'আলার নির্দেশ হয়, আমার এই নেক বান্দার আমলনামা ইল্লিয়‍্যীনে রেখে তাকে কবরে পাঠিয়ে দাও। নিশ্চয়ই, আমি তাকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম, মিনহা খালাকনাকুম ওয়া ফীহা নুয়ীদুকুম ওয়া মিনহা নুখরিজুকুম তারাতান উখরা। "আমি মাটি থেকে তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছি, এতেই তোমাদের ফিরিয়ে নেব, সেখান থেকেই তোমাদের আবার বের করবো।" (সূরা তাহা: আয়াত-৫৫)

তখন বান্দার সেই রূহকে কবরের দিকে ফিরিয়ে নেয়া হয়। এরপর তার কবরে মুনকার-নাকীর এসে তাঁকে বসান আর তাঁকে সম্বোধন করে জিজ্ঞেস করেন, হে অমুক ব্যক্তি, আপনার প্রভু কে? তিনি বলেন, আমার প্রভু আল্লাহ। তখন ফেরেশতারা বলেন, আপনি ঠিক বলেছেন? আবার তাঁকে জিজ্ঞেস করা হয়, আপনার দীন কি? তিনি বলেন, আমার দীন হলো ইসলাম। তখন ফেরেশতারা বলেন, আপনার নবী কে? তিনি বলেন, আমার নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। তখন ফেরেশতারা তাঁকে বলেন, আপনি ঠিক বলেছেন। অতঃপর দৃষ্টির সীমা পর্যন্ত সেই মুমিন ব্যক্তির কবর প্রশস্ত করে দেয়া হয়। সে সময় তাঁর কাছে অত্যন্ত সুন্দর চেহারা বিশিষ্ট ও সুঘ্রাণযুক্ত পোশাক পরিহিত এক ব্যক্তি এসে বলেন, আল্লাহ আপনাকে এর শ্রেষ্ঠ প্রতিদান দিন। আল্লাহর কসম, নিশ্চয় আপনি আল্লাহর ইবাদতে তৎপর ছিলেন এবং নাফরমানীতে ছিলেন পশ্চাৎপদ। তখন মুমিন ব্যক্তি বলেন, আল্লাহ আপনাকে এর শ্রেষ্ঠ প্রতিদান দিন। বলুন আপনি কে? তখন তিনি বলেন, আমি আপনার নেক আমল। এরপর তাঁর জন্য বেহেশতের একটি দরজা খুলে দেয়া হয় এবং বেহেশতে তাঁর জন্য যে আসন ও স্থান নির্ধারিত আছে, তা তিনি দেখতে পান। কিয়ামত পর্যন্ত তিনি এই অবস্থায় থাকবেন।

পক্ষান্তরে, যখন কোন কাফির ব্যক্তির মৃত্যুর সময় উপস্থিত হয় তখন দোযখের আগুনের কাফন ও শবাধার নিয়ে ফেরেশতারা তার কাছে আসেন এবং দৃষ্টির সীমা পর্যন্ত জায়গা জুড়ে তারা বসে পড়েন। অতঃপর হযরত আযরাঈল (আ) এসে ঐ ব্যক্তির শিয়রে বসে বলেন, হে অপবিত্র রূহ, তুই আল্লাহর ক্রোধ ও গযবের দিকে বেরিয়ে আয়। তখন ঐ ব্যক্তির রূহ এই ভয়াবহ অবস্থা দেখে বের হতে চায় না, বরং দেহের বিভিন্ন অংশে লুকাবার চেষ্টা করে। তখন হযরত আযরাঈল (আ) তার রূহকে দেহ থেকে এমনভাবে টেনে বের করেন, যেমন ভিজা পশম থেকে কাঁটাযুক্ত শলাকা টেনে বের করা হয়। যখন তার রূহ বের হয়ে পড়ে, তখন মানুষ ও জিন ছাড়া দুনিয়া ও আসমানের আর সবাই তার উপর অভিশাপ বর্ষণ করে। এরপর তাকে আসমানের দিকে উঠিয়ে নেয়া হয়। কিন্তু আসমানের দরজা তার জন্য খুলে দেয়া হয় না। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন, আমার বান্দাকে তার কবরে ফিরিয়ে নিয়ে যাও। তখন ভয়ানক আকৃতি ধারণ করে মুনকার-নাকীর ফেরেশতাদ্বয় তার কাছে আসেন। তাঁদের স্বর বিদ্যুতের কড়কড়ে শব্দের মতো। তাঁরা এই ব্যক্তিকে বসিয়ে জিজ্ঞেস করেন, হে অমুক, তোমার প্রভু কে? সে বলে, আমি জানিনা। তখন ফেরেশতারা গুর্জ দিয়ে তার উপর আঘাত করেন এবং তার কবরকে এভাবে সঙ্কুচিত করে দেন যার ফলে তার এপাশের পাঁজর ওপাশে চলে যায় এবং ওপাশের পাঁজর এপাশে চলে আসে। তারপর তার কাছে বিশ্রী চেহারার বিশ্রী পোশাক পরা দুর্গন্ধযুক্ত এক ব্যক্তি এসে বলে, আল্লাহ তোকে খারাপ প্রতিদান দিন। আল্লাহর কসম, তুই আল্লাহর ইবাদতে ছিলি পশ্চাৎপদ এবং আল্লাহর নাফরমানীতে ছিলে তৎপর। তখন সে মৃতব্যক্তি বলে তুমি কে? সে উত্তর দেয়, আমি তোমার বদ আমল। এরপর তার জন্য জাহান্নামের দরজা খুলে দেয়া হয়। সে কিয়ামত পর্যন্ত সেখানে তার যে নির্ধারিত স্থান রয়েছে তা দেখতে পায়। আবূ নযর (র) থেকে ইমাম আহমদ (র), মাহমূদ ইবনে গায়লান প্রমুখ এই হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। উপরোক্ত হাদীসের দ্বারা প্রমাণিত হলো যে, রূহকে কবরে ফিরিয়ে দেয়া হয় এবং মুনকার-নাকীর এসে মৃত ব্যক্তিকে বসান এবং তাঁর সাথে সওয়াল-জওয়াব করেন। ইবনে মানদাহ (র) থেকে বর্ণিত: আমাকে মুহাম্মদ ইবনে সালামাহ, তাঁকে বলেছেন খাসীফ জাবরী, তাঁকে বলেছেন মুজাহিদ, আর মুজাহিদকে বলেছেন বারা ইবনে আযিব (রা)। আমরা জনৈক আনসারের জানাযায় শরীক হয়েছিলাম এবং সেই জানাযায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও তাশরীফ এনেছিলেন। আমরা কবরস্থানে গেলাম, কিন্তু তখনও কবর খোঁড়া হয়নি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বসে পড়লেন এবং বললেন, মুমিন ব্যক্তির মৃত্যুর সময় উপস্থিত হলে, মৃত্যুর ফেরেশতারা সুগন্ধি ছড়িয়ে অত্যন্ত সুন্দর আকৃতি ধারণ করে তাঁর নিকট উপস্থিত হন। সেই ফেরেশতা মুমিন ব্যক্তির জান কবয করার জন্য তাঁর পাশে বসেন। তখন ঐ ব্যক্তির নিকট আরো দু'জন ফেরেশতা বেহেশতী কাফন ও সুগন্ধি নিয়ে উপস্থিত হন। তাঁরা মুমিন ব্যক্তির নিকট থেকে কিছু দূরে অবস্থান করেন। মালাকুল মউত ঐ ব্যক্তির দেহ থেকে তাঁর রূহকে লুফে নেন এবং জান্নাতী কাফন পরিয়ে রূহটিতে সুগন্ধি মাখেন। তারপর রূহকে নিয়ে তাঁরা বেহেশতের দিকে রওয়ানা হন। তাঁদের জন্য আসমানের দরজা খুলে দেওয়া হয় এবং আসমানের ফেরেশতারা এই রূহকে নিয়ে আনন্দ প্রকাশ করতে থাকেন। তাঁরা জিজ্ঞেস করেন, যে রূহের জন্য আকাশের দরজাসমূহ খুলে দেয় হলো, এই পবিত্র রূহটি কার? তখন ফেরেশতারা তাঁর দুনিয়ার সবচেয়ে সুন্দর নামটি উল্লেখ করে বলেন, এ রূহটি অমুকের। তখন ফেরেশতারা রূহকে নিয়ে আকাশের দিকে উঠতে থাকেন, তখন প্রত্যেক আসমানের আল্লাহর নৈকট্যপ্রাপ্ত ফেরেশতারা তাঁকে অপর আসমান পর্যন্ত বিদায় সম্ভাষণ জানান। শেষ পর্যন্ত সেই রূহটিকে আরশের নিকট আল্লাহর সমীপে পেশ করা হয় তখন ইল্লিয়্যীন থেকে তাঁর আমলনামা বের করা হয়। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা তাঁর নৈকট্যপ্রাপ্ত ফেরেশতাদের বলেন, তোমরা সাক্ষী থাক, আমি এই নেককার বান্দাকে ক্ষমা করে দিলাম। ফেরেশতারা তখন তাঁর আমলনামায় সীল মোহর লাগিয়ে পুনরায় তা ইল্লিয়্যীনে রেখে দেন। এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেন, আমার এই বান্দার রূহকে যমীনের দিকে নিয়ে যাও। আমি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম, আমি তাদেরকে সেখানেই ফিরিয়ে নিয়ে যাবো। এরপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরআন পাকের এই পবিত্র আয়াতটি পাঠ করলেন, "এ মাটি থেকে আমি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছি, সেই মাটিতেই তোমাদেরকে ফিরিয়ে নেবো এবং তা থেকেই তোমাদেরকে পুনরায় বের করবো। (সূরা ত্বাহা: আয়াত-৫৫)

যখন কোন মুমিন ব্যক্তিকে কবরে রাখা হয় তখন তাঁর পায়ের কাছে একটি দরজা বেহেশতের দিকে খুলে দেয়া হয় এবং তাঁকে বলা হয়, আল্লাহ তা'আলা আপনার জন্য এসব প্রতিদান রেখে দিয়েছেন। অতঃপর তাঁর শিয়রের কাছে একটি দরজা জাহান্নামের দিকে খুলে দেয়া হয় এবং তাঁকে বলা হয়, দেখুন, আল্লাহ তা'আলা আপনার থেকে কি ভয়াবহ শাস্তি সরিয়ে দিয়েছেন। এরপর তাঁকে বলা হয়, এবার শান্তির সাথে নির্বিঘ্নে ঘুমিয়ে পড়ুন। তখন ঐ মুমিন ব্যক্তির কাছে কিয়ামত আগমনের চাইতে প্রিয়তর আর কোন কিছু থাকবে না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যখন মুমিন ব্যক্তিকে তাঁর কবরে রাখা হয় তখন যমীন বলে, আপনি যখন আমার পিঠের উপর ছিলেন, তখন আমার প্রতি আপনি বন্ধুভাবাপন্ন ছিলেন, এখন আপনি আমার পেটে এসেছেন, আমি চেষ্টা করবো, আপনার সাথে কতো ভালো ব্যবহার করতে পারি। অতঃপর তাঁর দৃষ্টির সীমা পর্যন্ত তাঁর কবরকে প্রশস্ত করে দেয়া হয়।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কাফিরদের সম্পর্কে বলেছেন, যখন কাফির ব্যক্তিকে তাঁর কবরে রাখা হয়, তখন মুনকার-নাকীর এসে তাকে বসান এবং জিজ্ঞেস করেন, তোমার রব কে? সে বলে আমি জানি না। তখন তাঁরা উভয়ে তাঁকে মারতে থাকেন, ফলে তার দেহ ছিন্ন ভিন্ন হয়ে যায়। তারপর তাকে পুনরায় জীবিত করা হয় এবং সে উঠে বসে। তখন তাকে বলা হয় এই ব্যক্তি সম্পর্কে তুমি কি বলো? তখন সে বলে, কোন ব্যক্তি? তাঁরা উভয়ে বলেন, তিনি হলেন হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। তখন সে বলে, হ্যাঁ লোকে বলতো, তিনি আল্লাহর রাসূল। তখন তাঁরা আবার তাকে মারতে থাকেন। তখন সে ছাই ভস্মে পরিণত হয়ে যায়। হাদীসের হাফিযগণ কেউ কেউ এই হাদীসটিকে সহীহ হিসেবে সাব্যস্ত করেছেন। আমরা হাদীসের এমন কোন ইমাম পাইনি, যিনি এই হাদীস সম্পর্কে দ্বিমত পোষণ করেছেন। আর কবরের আযাব ও আরাম মুনকার নাকীরের সওয়াল ও জওয়াব এগুলো দীন ইসলামের মূলনীতির মধ্যে অন্যতম মূলনীতি হিসেবে গ্রহণ করেছেন। "যাযান ব্যতীত, অন্য আর কেউ এই হাদীসটি বর্ণনা করেননি", ইমাম ইবনে হাযম (র)-এর উপরোক্ত বক্তব্যটি তাঁর মনগড়া উক্তি ছাড়া আর কিছুই নয়। উল্লেখ্য, এই হাদীসটি আলিমদের একটি বিশেষ শ্রেণী কর্তৃক বর্ণিত। এছাড়া হাদীসটির সবগুলো সনদ ইমাম দারু কুতনী একটি পুস্তিকায় একত্রিত করেছেন। হযরত যাযান (র) ছিলেন একজন বিশ্বস্ত হাদীস বর্ণনাকারী। যিনি হযরত উমর (রা) প্রমুখ উচ্চ শ্রেণীর সাহাবাগণ থেকে হাদীস রেওয়ায়েত করেছেন। তাঁর রেওয়ায়েত করা হাদীস মুসলিম শরীফেও বর্ণিত আছে। ইবনে মুয়ীন (র) ও যাযানকে একজন বিশ্বস্ত রাবী হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাঁর সম্পর্কে হামীদ ইবনে হেলাল (র)-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিলো তাঁর অভিমত এই যে, তিনি ছিলেন একজন বিশ্বস্ত রাবী। এরূপ একজন সম্মানিত রাবীর বিশ্বাসযোগ্যতা সম্পর্কে কোন প্রশ্নই উঠে না। ইবনে আদী (র) বলেন, হযরত যাযান (র) যখন কোন বিশ্বস্ত ব্যক্তি থেকে রেওয়ায়েত করেন, তখন তাঁর রেওয়ায়েতে কোন ত্রুটি-বিচ্যুতি থাকতে পারেনা।

এখানে উল্লেখ্য যে, হযরত মিনহাল (র) ছিলেন একজন নির্ভরশীল ও বিশ্বস্ত রাবী। তিনি হাদীসের বর্ণনায় কোন অত্যুক্তি করেননি। ইবনে মুয়ীন (র) ও আজলী (র) তাঁকে বিশ্বস্ত বলে আখ্যায়িত করেছেন। তবে তাঁর বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় একটি অভিযোগ হলো, তাঁর ঘর থেকে সঙ্গীতের শব্দ শোনা যেতো। শুধু এই কারণেই তাঁর রেওয়ায়েতকে ত্রুটিযুক্ত মনে করা উচিত নয়। ইমাম ইবনে হাযম (র), যাযান (র)-কে দুর্বল রাবী হিসেবে অভিহিত করেছেন, তবে এটা কোন বিবেচ্য বিষয় নয়। যাযান (র) ছিলেন হাদীসটির একক বর্ণনাকারী। এছাড়া তাঁর অন্য কোন দুর্বলতা ছিলো না। ইমাম ইবনে হাযম (র) এ সম্পর্কে আর অন্য কোন দলীল উপস্থাপন করতে পারেননি। আসলে মিনহাল (র) এই হাদীসের বর্ণনাকারী হিসেবে একা নন। তাই যাযান (র)-কে একক বর্ণনাকারী বলাটা ইবনে হাযম (র)-এর বাড়াবাড়ি ছাড়া আর কিছুই নয়। অন্যান্য রাবীগণ এই হাদীসটিকে এইভাবে বর্ণনা করেছেন, মৃত ব্যক্তির নিকট তার রূহ ফিরিয়ে দেয়া হয়। আর রূহ তাঁর কবরে ফিরে আসে, তারপর মৃত ব্যক্তি উঠে বসে, মুনকার-নাকীর তাকে কবরে বসান, এই হাদীসগুলো সবই সহীহ, এ বিষয়ে কোন দ্বিমত বা সন্দেহ নেই। তবে কেউ কেউ এর মধ্যেও কিছু ত্রুটি বের করার চেষ্টা করেছেন। যেমন বলা হয়েছে, “হযরত বারা (রা) থেকে হযরত যাযান (র)-এর সরাসরি শোনার কোন প্রমাণ নেই।” তবে এরূপ উক্তি সম্পূর্ণ অযৌক্তিক ও অচল।

হযরত বারা (রা) থেকে যাযান (র)-এর হাদীস শোনার প্রমাণ প্রসঙ্গে, হযরত আবূ উয়ানা ইসফারাহনী (র) তাঁর গ্রন্থে যেই রেওয়ায়েত উল্লেখ করেছেন, তার মধ্যে হযরত বারা (রা) থেকে যাযান (র)-এর হাদীস শোনার কথা ব্যাখ্যাসহকারে উল্লেখ রয়েছে। যাযান (র) নিজেই বলেছেন, তিনি বারা (রা) থেকে হাদীস শুনেছেন। হাফিয ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে মানদাহ (র) বলেন, হাদীসটির সনদ মুত্তাসিল ও মশহুর অর্থাৎ সংশ্লিষ্ট ও সুপ্রসিদ্ধ। এছাড়া এই হাদীসটি বারা (রা) থেকে একদল বিশ্বস্ত রাবী বর্ণনা করেছেন। যদি জটিলতার কারণে বারা (রা)-এর হাদীসটিকে আমরা এড়িয়ে যেতে চাই, তাহলেও অন্যান্য হাদীসমূহে এর ব্যাখ্যা রয়েছে। যেমন, হযরত আবূ হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত হাদীসে আছে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, মৃত ব্যক্তির নিকট ফেরেশতারা হাযির হন। আর যদি সেই ব্যক্তি সৎ হন, তাহলে মউতের ফেরেশতা বলেন, হে পবিত্র রূহ! পবিত্র দেহ থেকে বের হও, আরামদায়ক জীবন যাপনের এবং তোমার রবের সন্তুষ্টি লাভের জন্য। অবশেষে উক্ত রূহ বের হয়ে আসে এবং সেই রূহকে আসমানের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়। যখন ফেরেশতারা তাঁর জন্য আসমানের দরজা খুলতে বলেন, তখন তাদেরকে বলা হয়, এই রূহ কার? ফেরেশতারা এই পবিত্র রূহকে খোশ আমদেদ জানান। আরামদায়ক ও উত্তম জীবন উপভোগ করার জন্য এবং আপনার প্রভুর সন্তুষ্টি লাভের জন্য আপনি বেহেশতে প্রবেশ করুন, সেই পবিত্র রূহকে এভাবে বারবার সাদর অভ্যর্থনা জানানো হয়। অবশেষে সেই রূহকে আল্লাহর সান্নিধ্যে উপস্থিত করা হয়।

অপরপক্ষে, যদি রূহ বদকার হয়, তাহলে আযরাঈল (আ) রূহকে সম্বোধন করে বলেন, অপবিত্র দেহে অবস্থানকারী হে রূহ! লাঞ্ছিত অবস্থায় বের হও, আর ফুটন্ত পানি ও পুঁজ খেয়ে সন্তুষ্ট থাকো। শেষ পর্যন্ত তার রূহ বেরিয়ে আসে এবং সেই রূহকে আসমানের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়। ফেরেশতারা যখন তার জন্য আসমানের দরজা খুলতে বলেন, তাঁদেরকে তখন বলা হয়, এই রূহ কার? ফেরেশতারা বলেন, এই রূহ অমুকের বা অমুকের সন্তান অমুকের। তখন আসমানের ফেরেশতারা বলেন, অপবিত্র দেহে অবস্থানকারী এই অপবিত্র রূহের জন্য কোন প্রকার অভ্যর্থনা নেই। হে অপবিত্র রূহ, তুমি লাঞ্ছিত অবস্থায় ফিরে যাও। তোমার জন্য আসমানের দরজা খোলা হবে না। তখন সে রূহ তার কবরে ফিরে আসে।

একজন নেককার বান্দা তাঁর কবরের মধ্যে শান্তিতে অবস্থান করেন। তাঁকে জিজ্ঞেস করা হয়, ইসলাম সম্পর্কে আপনার ধারণা কী? আর ইনি কে? তখন তিনি বলেন, ইনি হলেন আল্লাহর রাসূল হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, তিনি আমাদের কাছে আল্লাহর সুস্পষ্ট দলীল নিয়ে এসেছিলেন। আমরা তাঁর উপর ঈমান এনেছি এবং তাঁকে রাসূল হিসেবে বিশ্বাস করেছি। অবশ্যই তিনি আল্লাহর রাসূল। .....এভাবে হযরত আবূ হুরায়রা (রা) পুরো হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। হাফিয আবূ নায়ীম (র) থেকে বর্ণিত, এই হাদীসের বর্ণনাকারীগণ যে বিশ্বস্ত ব্যক্তি এ বিষয়ে ইমাম বুখারী (র) এবং ইমাম মুসলিম (র)-ও একমত। আর আগেকার নেতৃস্থানীয় মুহাদ্দিসীন যেমন, ইবনে আবী ফুদায়েক, আবদুর রহীম ইবরাহীম (র) প্রমুখ ইবনে আযীব (রা) থেকে হাদীসটি রেওয়ায়াতে করেছেন। আবার অনেকেই তাঁর থেকে হাদীসটি সংকলনও করেছেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রা) কর্তৃক বর্ণিত: দেহে রূহ ফিরিয়ে আনা সম্পর্কীয় হাদীস দ্বারা ইবনে মানদাহ (র) ও প্রমাণ পেশ করেছেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রা) বর্ণনা করেন, একদিন নবী করীম (সা) বসা ছিলেন। সেই অবস্থায় তিনি নিম্নোক্ত আয়াতটি তিলাওয়াত করলেন, "আপনি যদি যালিমদের ঐ সময়ে দেখতে পেতেন, যখন তারা মৃত্যু যন্ত্রণায় থাকবে, এবং ফেরেশতারা তাদের হাত বাড়িয়ে বলবেন, তোমরা নিজেরাই তোমাদের প্রাণ বের করে আনো। তোমাদের আমলের বিনিময়ে আজ তোমাদেরকে অবমাননাকর আযাব দেয়া হবে, কারণ আল্লাহর প্রতি মিথ্যা দোষারোপ করে যা তোমরা অকারণ প্রলাপ বকছিলে এবং তাঁর আয়াতের বিরুদ্ধে অহঙ্কার ও অবাধ্যতা দেখাচ্ছিলে।" (সূরা আল-আনয়াম: আয়াত-৯৩)

এরপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করলেন, তাঁর কসম, যাঁর হাতে আমার প্রাণ, প্রত্যেক ব্যক্তি দুনিয়া থেকে বিদায় নেয়ার আগে তার স্থান জান্নাতে না জাহান্নামে তা সে দেখতে পায়। তিনি আরো বলেন, দুনিয়া থেকে বিদায় নেয়ার সময় মৃত ব্যক্তির সামনে আসমান ও যমীনের মধ্যবর্তী স্থানে ফেরেশতাদের দু'টি সারি সুশৃঙ্খলভাবে মোতায়েন থাকে। তাঁদের চেহারা সূর্যের মতো উজ্জ্বল। মৃত্যু পথযাত্রী যখন তাঁদের দিকে তাকায়, তখন তার আশে পাশের লোকেরা মনে করেন, সে যেন তাঁদেরকেই দেখছে। ঐসব ফেরেশতাদের কাছে কাফন ও সুগন্ধি থাকে। যদি মৃত্যু পথযাত্রী মুমিন হন, তাহলে ফেরেশতারা তাঁকে জান্নাতের সুসংবাদ দেন। আর বলেন, হে পবিত্র রূহ! আল্লাহর জান্নাত ও তাঁর সন্তুষ্টির দিকে বেরিয়ে এসো। আল্লাহ তোমার জন্য সম্মানিত স্থান ও শ্রেষ্ঠ নিআমত নির্দিষ্ট করে রেখেছেন, দুনিয়ার মধ্যে যা কিছু আছে সে সবের চেয়েও তা উত্তম। এভাবে ফেরেশতারা তাঁকে অনবরত সুসংবাদ দিতে থাকেন ও ঘিরে রাখেন। তাঁরা রূহকে প্রত্যেক নখ ও প্রত্যেক গ্রন্থি থেকে টেনে বের করতে থাকেন। দেহের যে সমস্ত অংশ থেকে রূহকে ক্রমান্বয়ে টেনে বের করা হয়, সে সব স্থান নির্জীব হয়ে যায়। এতে তাঁর রূহ আরাম বোধ করে, যদিও মনে হয় তিনি কষ্ট পাচ্ছেন। অবশেষে, তার রূহ কণ্ঠস্থলে গিয়ে পৌঁছে। নবজাত শিশু সন্তান তার মায়ের গর্ভ থেকে বের হতে যে কষ্ট পায়, তার চেয়েও কম কষ্টে সে পবিত্র রূহ দেহ থেকে বের হয়ে আসে। এরপর প্রত্যেক ফেরেশতাই সেই রূহকে নিয়ে যাবার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়েন। কিন্তু আজরাঈল (আ) সেই রূহকে তাঁর হাতে তুলে নেন। অতঃপর হযরত নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিম্নোক্ত আয়াত শরীফ তিলাওয়াত করলেন, “বলুন, তোমাদের রূহ হরণের দায়িত্বে নিয়োজিত ফেরেশতা তোমাদের রূহ হরণ করবে। অতঃপর তোমরা তোমাদের পালনকর্তার নিকট প্রত্যাবর্তিত হবে।” (সূরা সাজদা: আয়াত-১১)

এছাড়া ফেরেশতাগণ শুভ্র কাফন নিয়ে ঐ শ্রেণীর রূহকে সাদর অভ্যর্থনা জানান এবং বুকের সঙ্গে তাদেরকে এমনভাবে জড়িয়ে ধরেন, যেভাবে একটি শিশু ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর তার মা তাকে জড়িয়ে ধরেন। না, তাঁরা মায়ের চেয়েও ঐ রূহকে অধিক স্নেহ-মমতা প্রদর্শন করেন। শুধু তাই নয়, ঐ রূহ থেকে মেশকের চেয়েও বেশি খুশবু ছড়িয়ে পড়ে। ফেরেশতারা রূহের খুশবুর ঘ্রাণ নেন এবং রূহকে জড়িয়ে ধরে রাখেন। তাঁরা রূহকে বলতে থাকেন, হে পবিত্র রূহ! খোশ আমদেদ, আর তাঁরা এই বলে দু'আ করতে থাকেন, হে আল্লাহ! এই রূহের প্রতি আপনি করুণা বর্ষণ করুন। আর ঐ দেহের প্রতিও রহম করুন, যে দেহ থেকে এই রূহ বের হয়ে এসেছে। অতঃপর তাঁরা রূহটিকে নিয়ে উপরের দিকে উঠতে থাকেন।

মহাশূন্যে আল্লাহর এক ধরনের সৃষ্টি আছে, যাদের সংখ্যা কতো তা একমাত্র আল্লাহই জানেন। ঐ আগত সুগন্ধযুক্ত রূহের খুশবু তাঁরাও পান, যা মেশকের চেয়েও উত্তম। তাঁরাও এই রূহের জন্য দু'আ করেন এবং একে বুকের সাথে জড়িয়ে ধরেন। তারপর রূহের জন্য আকাশের দরজা খুলে দেয়া হয়। ঐ রূহ যে আসমানই অতিক্রম করে সেখানকার ফেরেশতারা তার জন্য দু'আ করেন। অবশেষে ঐ রূহ আল্লাহ তা'আলার মহান দরবারে পৌঁছে যায়। আল্লাহ তা'আলা এই পবিত্র রূহকে স্বাগত জানান আর সেই রূহের দেহকেও স্বাগত জানান যেখান থেকে সে বের হয়ে এসেছে। আল্লাহ যখন কাউকে স্বাগত জানান, তখন প্রত্যেক জিনিসই তাকে স্বাগত জানায়। আর সেই রূহের যাবতীয় অসুবিধা দূর হয়ে যায়। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা ফেরেশতাদের হুকুম দেন, "একে বেহেশতে নিয়ে তার নির্দিষ্ট স্থানটি দেখিয়ে দাও। আর আমি এ রূহের জন্য যে সম্মান ও আরামদায়ক নিআমত তৈরি করে রেখেছি, সেগুলোও তাকে দেখিয়ে দাও। তারপর তাকে যমীনের দিকে নিয়ে যাও। কেননা, আমার সিদ্ধান্ত হলো, "আমি মানুষকে মাটি দিয়েই সৃষ্টি করেছি, আর মাটির মধ্যেই তাকে ফিরিয়ে নিয়ে যাবো এবং মাটি থেকেই তাকে পুনরায় সৃষ্টি করবো।” কসম সেই মহান সত্তার যাঁর হাতে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবন, রূহকে দেহ থেকে বের করে আনা ততো কঠিন কাজ নয়, তাকে বেহেশত থেকে বের করে আনা যতোটা কঠিন। রূহ তখন বলে, আমাকে তোমরা কোথায় নিয়ে যাচ্ছো সেই দেহের দিকে নিয়ে যাচ্ছো কি যেখানে আমি আগে ছিলাম? ফেরেশতারা তখন বলে হ্যাঁ, আমাদের প্রতি তাই নির্দেশ এবং তোমারও ঐ নির্দেশ মানা ছাড়া আর কোন উপায় নেই। শেষ পর্যন্ত ফেরেশতারা তাকে বেহেশত থেকে নামিয়ে নিয়ে আসেন। ইতিমধ্যে মৃত ব্যক্তির গোসল ও কাফনের কাজ সম্পন্ন হয়ে যায়, ফেরেশতারা তখন তাঁর রূহকে সেই কাফন পরিহিত দেহে প্রবেশ করিয়ে দেন।

উক্ত হাদীস দ্বারা জানা গেলো, রূহকে দেহ ও কাফনের মধ্যে ফিরিয়ে দেয়া হয়। তবে এই অবস্থার সাথে দুনিয়ার যিন্দেগীর কোন সাদৃশ্য বা সম্পর্ক নেই। এটা একটি পৃথক ব্যাপার। মৃত্যুর পূর্বে রূহের সাথে দেহের যে সম্পর্ক থাকে, মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে সে সম্পর্ক শেষ হয়ে যায়। এছাড়া নিদ্রার সময় দেহের সাথে রূহের যে সম্পর্ক থাকে, সেই সম্পর্কের সাথেও এর কোন মিল নেই। মুনকার-নাকীর সওয়াল-জওয়াবের জন্য এটা হচ্ছে মৃত ব্যক্তির দেহে রূহের এক বিশেষ ধরনের প্রত্যাবর্তন। উপরোক্ত প্রেক্ষাপটে শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়াহ (র) বলেন, সকল সহীহ ও মুতাওয়াতর হাদীস দ্বারা জানা যায়, মুনকার-নাকীর সওয়ালের সময় রূহকে দেহে ফিরিয়ে দেয়া হয়। অনেকের ধারণা, রূহকে নয়, কেবল দেহকে সওয়াল করা হয়। কিন্তু অধিকাংশ অভিজ্ঞ আলেম এই অভিমতকে স্বীকার করেন না। আবার অনেকে মনে করেন, শুধু রূহকে সওয়াল করা হয় দেহকে নয়। ইমাম ইবনে হাযম (র)ও এই অভিমত সমর্থন করেন। কিন্তু উভয় মতই ভ্রান্ত এবং সহীহ হাদীস দ্বারা বাতিল বলে প্রমাণিত। সওয়াল যদি শুধু রূহকেই করা হয়, তাহলে কবরের সাথে রূহের তো কোন সংশ্লিষ্টতা বা সম্পর্ক থাকতো না। এ বিষয়ে শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়াহ (র)-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিলো, কবরের আযাব ও আরাম রূহ ও দেহের উপর হয়, না, শুধু রূহের উপর হয়, না, শুধু দেহের উপর হয়? উত্তরে তিনি বলেছিলেন, আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের ঐকমত্য এই যে, কবরের আযাব ও আরাম রূহ ও দেহ উভয়ের উপর হয়ে থাকে।

উপরে বর্ণিত রূহের অবস্থা সম্পর্কে আহলে হাদীস, আহলে সুন্নাত ও মুসলিম দার্শনিকদের মধ্যে দু'টি উল্লেখযোগ্য অভিমত রয়েছে। এছাড়া এ বিষয়ে ছোটখাটো আরো অনেক অভিমতও রয়েছে। তবে এসব আহলে হাদীস বা আহলে সুন্নাতের মতবাদ নয়। দার্শনিকরা বলেন, আযাব বা আরাম শুধু রূহের সাথে সম্পর্কিত, দেহের সাথে নয়। তারা মৃত্যুর পরবর্তী জীবন অস্বীকার করে। তাই তারা সর্বসম্মতিক্রমে কাফির। ন্যায় শাস্ত্রবিদেরা এবং মুতাযিলা সম্প্রদায় মৃত্যুর পরবর্তী জীবনকে স্বীকার করেন। কিন্তু তাঁরা বলেন, মৃত্যুর পরবর্তী জীবন বরযখে নয়, হাশরের দিন তা প্রকাশ পাবে। এই দলটি বরযখে দেহের আযাব আরামের সমর্থক। তাঁরা বলে থাকেন, বরযখে শুধু রূহের উপর আযাব বা আরাম হয়ে থাকে। কিন্তু তাদের অন্য একটি মত এই যে, কিয়ামতের দিন রূহ এবং দেহ উভয়ের উপরই আযাব আরাম হবে। মুসলমানদের মধ্যে আহলে হাদীস ও ন্যায় শাস্ত্রবিদদের এক শ্রেণীর লোকের অভিমতও তাই। ইবনে হাযম (র) এবং ইবনে মুরা (র) এই অভিমতটি সমর্থন করেছেন। এছাড়া পূর্ববর্তী উলামা ও ইমামদের অভিমত অনুযায়ী কবরের শাস্তি বা শান্তি উভয়ই বাস্তব ও সত্য। আর এই শান্তি বা শাস্তি রূহ ও দেহের উভয়ের উপরই হয়ে থাকে। এছাড়া রূহ দেহ থেকে পৃথক হওয়ার পর এর অস্তিত্ব টিকে থাকে এবং আযাব বা আরাম ভোগ করে। কখনো কখনো রূহ দেহের সাথে সম্পৃক্ত হয়ে পড়ে এবং দেহ ও রূহের সাথে আযাব বা আরাম ভোগ করে। কিয়ামতের দিন রূহকে নিজ নিজ দেহের মধ্যে ফিরিয়ে দেয়া হবে। হাশরের দিন কবর থেকে উঠে মানুষ রাব্বুল আলামীনের দরবারে হাযির হবে। দৈহিক পুনরুত্থান সম্পর্কে মুসলমান, ইয়াহুদী ও খ্রিস্টান সবাই অভিন্ন মত ও ধারণা পোষণ করে থাকেন।

কবরের আযাব ও মুনকার-নাকীর সওয়াল প্রসঙ্গে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে অনেক মুতাওয়াতর বা ধারাবাহিক হাদীস বর্ণিত আছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রা) বর্ণনা করেছেন, একবার নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দু'টি কবরের নিকট দিয়ে যাবার সময় বললেন, এই দুটি কবরবাসীর উপর আযাব হচ্ছে, এটা কোন বড় ধরনের অপরাধের কারণে নয়, বরং এদের একজন পেশাব থেকে সতর্ক থাকতো না, অপরজন ছিলো পরদোষ চর্চাকারী। অতঃপর তিনি খেজুর গাছের একটি তাজা ডাল আনিয়ে দু'টুকরো করে ঐ দু'কবরে পুঁতে দিলেন। লোকেরা জিজ্ঞেস করলো, হে আল্লাহর রাসূল! কি উদ্দেশ্যে আপনি এরূপ করলেন? জবাবে তিনি ইরশাদ করলেন, হয়তো আল্লাহ তা'আলা এ দু'টি ডাল না শুকানো পর্যন্ত, তাদের আযাব লঘু করে দেবেন। (বুখারী ও মুসলিম)

সহীহ মুসলিমে হযরত যায়েদ ইবনে সাবিত (রা) থেকে বর্ণিত আছে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদা একটি খচ্চরের উপর সওয়ার হয়ে বনী নাজ্জারের বাগিচায় ভ্রমণ করছিলেন। আমরা সবাই তাঁর সাথে ছিলাম। হঠাৎ তাঁর খচ্চরটি ভীত-চকিত হয়ে এমনভাবে ছটফট করে উঠলো যে, হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার পিঠ থেকে পড়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল। এমন সময় চার, পাঁচ অথবা ছয়টি কবর আমাদের দৃষ্টিগোচর হলো। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, তোমরা কি কেউ এই কবরবাসীদের পরিচয় জানো? একজন আরয করলেন, তাদের অবস্থা আমার জানা আছে। হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবার জিজ্ঞেস করলেন, এদের মৃত্যু কি অবস্থায় হয়েছিল? উত্তরে ঐ ব্যক্তি বললেন, এরা মুশরিক হিসেবে মৃত্যুবরণ করেছিলো। তখন ইরশাদ হলো, তাই নাকি? তিনি আরো বলেন, আমার উম্মতেরাও অনেকে কবরে আযাবের সম্মুখীন হবে। তোমরা যদি মৃতদের লাশ দাফন করা ছেড়ে দেবার ভয় আমার না হতো, তাহলে আমি আল্লাহ তা'আলার কাছে দু'আ করতাম, যেন তিনি আমার মতো তোমাদেরকেও কবরের আযাব শুনিয়ে দেন। তারপর তিনি আমাদের দিকে ফিরে বললেন, "তোমরা দোযখের আগুন থেকে আল্লাহর আশ্রয় চাও, সাহাবায়ে কেরাম বললেন, আমরা দোযখের আগুন থেকে আল্লাহর আশ্রয় চাই। সাহাবায়ে কেরাম বললেন, আমরা কবরের আযাব থেকে আল্লাহর আশ্রয় চাই। তিনি বললেন, তোমরা কবরের আযাব থেকে আল্লাহর আশ্রয় চাও। সাহাবায়ে কেরাম বললেন, আমরা কবরের আযাব থেকে আল্লাহর আশ্রয় চাই। তিনি বললেন, প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য ফিতনা থেকে আল্লাহর আশ্রয় চাও। সাহাবায়ে কেরাম বললেন, আমরা প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য ফিতনা থেকে আল্লাহর আশ্রয় চাই। তিনি আরো বললেন, দাজ্জালের ফিতনা থেকে আশ্রয় চাও। সাহাবায়ে কেরাম বললেন, আমরা দাজ্জালের ফিতনা থেকে আল্লাহর আশ্রয় চাই।"

হযরত আবু হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যখন তোমাদের মধ্যে কেউ নামাযের শেষ বৈঠকে তাশাহুদ ও দুরূদ পড়া শেষ করে, তখন সে যেন চারটি জিনিস থেকে আল্লাহর আশ্রয় চায়। এক. জাহান্নামের আযাব, দুই. কবরের আযাব, তিন. জীবন ও মৃত্যুর ফিতনা, চার. মসীহে দাজ্জালের ফিতনা থেকে। (মুসলিম)

উপরোক্ত বিষয় সম্পর্কে হযরত ইবনে আব্বাস (রা) বর্ণনা করেন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁদেরকে (সাহাবায়ে কেরামকে) কুরআন শরীফ যেভাবে শিক্ষা দেয়া হয়, সেইভাবে নিম্নোক্ত দু'আটি শিক্ষা দিতেন, "আল্লাহুম্মা ইন্নী আউযুবিকা মিন আযাবি জাহান্নাম, ওয়া আউযুবিকা মিন আযাবিল কাবরে, ওয়া আউযুবিকা মিন ফিতনাতিল মাহইয়া ওয়াল মামাতি, ওয়া আউযুবিকা মি ফিতনাতিল মাসীহিদ্দাজ্জাল।” অর্থাৎ “হে আল্লাহ! আমি আপনার আশ্রয় চাই জাহান্নামের আযাব থেকে ও কবরের আযাব থেকে। হে আল্লাহ, আমি আপনার আশ্রয় চাই জীবন ও মৃত্যুর ফিতনা থেকে এবং মসীহে দাজ্জালের ফিতানা থেকে।” (মুসলিম)

কবরের আযাব সম্পর্কে হযরত আবূ আইয়ূব (রা) থেকে বর্ণিত আছে, একদিন সূর্য অস্ত যাওয়ার পর নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাইরে এসে একটি আওয়াজ শুনে বললেন, "ইয়াহুদীদেরকে তাদের কবরে আযাব দেয়া হচ্ছে।” (বুখারী ও মুসলিম)

হযরত আয়িশা সিদ্দীকা (রা) থেকে বর্ণিত, একদিন জনৈকা ইয়াহুদী বৃদ্ধা মহিলা তাঁর নিকট এসে বললেন, "কবরবাসীদেরকে কবরের মধ্যে শাস্তি দেয়া হয়।” আমি তার কথা মিথ্যা বলে গণ্য করলাম। একথা আমার বিশ্বাস হলো না। এরপর বৃদ্ধা মহিলাটি চলে গেলো। কিছুক্ষণ পর নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেখানে তাশরীফ আনলেন। আমি ঐ ইয়াহুদী বৃদ্ধা মহিলার কথাটি তাঁকে জানালাম। তিনি বললেন, "সে সত্য কথা বলেছে কবরে আযাব হয় এবং তা সমস্ত জীবজন্তু শুনে থাকে।” এরপর থেকে প্রত্যেক নামাযের পর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে কবরের আযাব থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাইতে দেখেছি। (বুখারী ও মুসলিম)

উম্মে মুবাশ্বির (রা) বলেন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদিন আমার কাছে তাশরীফ আনলেন, আর বললেন, তোমরা কবরের আযাব থেকে আল্লাহর কাছে পানাহ চাও। তখন আমি বললাম, ইয়া রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! কবরে কি আযাব হয়? তিনি বললেন, হ্যাঁ, আর সে আযাব সমস্ত জীবজন্তু শুনতে পায়। (ইবনে হাব্বান)

কোন কোন আলিম বলে থাকেন, যখন কোন পশুর পেটে ব্যথা দেখা দেয়, তখন লোকজন পশুদেরকে ইয়াহুদী, নাসারা ও মুনাফিকদের, যেমন- ইসমাঈলী, নাসীরিয়াহ, কারমিতাহ প্রমুখ, যারা মিসর ও সিরিয়ার অধিবাসী তাদের কবরের নিকট নিয়ে যায়। তখন কোন জানোয়ার বিশেষ করে ঘোড়া কবরের আযাব শুনতে পেয়ে চমকে উঠে আর ভীত হয়ে লাফাতে থাকে, তখন তার পেটের ব্যথা সেরে যায়।

আবুল হিকাম ইবনে বারখান বলেন, লোকেরা ইশবীলীয়ারের উঁচু কবরস্থানে এক ব্যক্তির লাশ দাফন করে সেই কবরের নিকট বসে কথাবার্তা বলতে লাগলেন। একটি পশু নিকটেই চরছিলো। এরমধ্যে পশুটি অনেক দূরে চলে গিয়ে আবার কবরের দিকে ফিরে এলো এবং এমনভাবে কান খাড়া করলো যেন সে কোন কিছু শুনতে পাচ্ছে, পশুটি কয়েকবার এরূপ করলো। আবুল হিকাম বলেন, তখন নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সেই কথাটি আমার মনে পড়ে গেলো যে, কবরে আযাব হয় যা পশুরাও শুনতে পায়। আশবীলী বলেন, সহীহ মুসলিমের পাঠদান সময় আবুল হিকাম এই ঘটনাটি আমাদের কাছে বর্ণনা করেছিলেন যে, পশুরা আযাবে লিপ্ত কবরবাসীর চিৎকার শুনতে পায়। হযরত আয়িশা (রা) কর্তৃক বর্ণিত এ সম্পর্কীয় হাদীসটি দ্বারাও প্রমাণিত হয় যে, পশুরাও কবরের আযাব শুনতে পায়। হযরত আয়িশা (রা) বলেন, জনৈকা ইয়াহুদী মহিলা আমার কাছে এলো এবং কবরের আযাবের কথা বললো। কিন্তু আমি তার কথা বিশ্বাস করলাম না। অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার কাছে তাশরীফ আনলেন। আমি তাঁকে ঐ কথা জানালাম। তিনি ইরশাদ করলেন, কসম ঐ পবিত্র সত্তার যাঁর হাতে আমার প্রাণ, নিশ্চয় (গুনাহগার) কবরবাসীরা শাস্তি ভোগ করে, এমনকি জীবজন্তুরাও তাদের আর্তচিৎকার শুনতে পায়।

কবরে সওয়াল জওয়াব সম্পর্কিত হাদীসের সংখ্যা অনেক। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, কবরে মৃতদেরকে যখন প্রশ্ন করা হয় তখন তাঁরা তাওহীদ ও রিসালাতের সাক্ষ্য দেন। পবিত্র কুরআনে বর্ণিত আছে, "আল্লাহ তা'আলা ঈমানদারদেরকে দুনিয়া ও আখিরাতে এক প্রতিষ্ঠিত প্রমাণিত কথার ভিত্তিতে কায়িম রাখবেন এবং যারা সীমালঙ্ঘনকারী তাদেরকে আল্লাহ বিভ্রান্তিতে রাখবেন। আল্লাহ যা ইচ্ছা তাই করেন।” (সূরা ইবরাহীম: আয়াত-২৭)

উক্ত হাদীসটি সুনানে এবং মুসনাদসমূহে বিস্তারিতভাবে বর্ণিত আছে, যা পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে। উপরে বর্ণিত হাদীসটি দ্বারা এটা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় যে, রূহকে মৃত ব্যক্তির দেহের মধ্যে ফিরিয়ে দেয়া হয়। আর কবরের চাপের কারণে মৃত ব্যক্তির এ দিকের পাঁজর ওদিকে এবং ওদিকের পাঁজর এদিকে এসে যায়। এর দ্বারা জানা গেলো, দেহ ও রূহ উভয়ের উপরই আযাব হয়ে থাকে। অন্য একটি হাদীসে আছে, যখন কোন মৃত ব্যক্তিকে দাফন করে লোকজন ফিরে আসতে থাকে, তখন মৃত ব্যক্তি তাদের চলে যাওয়ার জুতোর শব্দ পর্যন্ত শুনতে পায়। এই অবস্থায় একজন মুমিন বান্দার শিয়রের দিকে তার নামায, ডান পাশে তার রোযা, বাম পাশে তার যাকাত এবং পায়ের দিকে তার সাদকা, খয়রাত ইত্যাদি আমল তাকে ঘিরে রাখে। ফেরেশতারা তার শিয়রের দিকে আসতে চাইলে নামায বলে, আমার এদিকে কোন প্রবেশ পথ নেই। তাঁরা ডান দিকে আসতে চাইলে রোযা, বাম দিকে আসতে চাইলে যাকাত এবং পায়ের দিকে আসতে চাইলে অন্যান্য আমল ফেরেশতাদেরকে বাধা দেয় এবং বলে, আমাদের এ দিকেও কোন প্রবেশ পথ নেই। তখন মৃত ব্যক্তিকে উঠে বসতে বলা হয়। সে উঠে বসে এবং তার কাছে মনে হয় যেন সূর্য অস্ত যাচ্ছে। তাকে জিজ্ঞেস করা হয়, রাসূল হিসেবে যিনি এসেছিলেন, তাঁর সম্পর্কে তোমার ধারণা কী? তুমি তাঁকে কি মনে করো? তখন মৃত ব্যক্তি বলে, আমাকে আগে নামায আদায় করতে দাও। উত্তরে তাঁরা বলেন, নামায তো পড়বেই। প্রথমে আমাদের প্রশ্নের উত্তর দাও। তখন মৃত ব্যক্তি উত্তর দেয়, তাঁর পবিত্র নাম মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, তিনি আল্লাহর রাসূল এবং আল্লাহর নিকট থেকে তিনি সত্য দীনসহ তাশরীফ এনেছিলেন। তারপর তাকে বলা হয়, এই বিশ্বাসের উপর তুমি জীবিত ছিলে, আর এ বিশ্বাসের উপরই তুমি মৃত্যুবরণ করেছো। ইনশাআল্লাহ, এই বিশ্বাসের উপরই তোমাকে পুনরায় জীবিত করা হবে। তখন তার জন্য বেহেশতের একটি দরজা খুলে দেয়া হয় এবং তাকে বলা হয়, এই বেহেশত এবং আল্লাহ তা'আলা তোমার জন্য অন্য যে সব নিয়ামত রেখেছেন, এ সবই তোমার। এই সব কিছু দেখে মৃত ব্যক্তির আনন্দের সীমা-পরিসীমা থাকে না। এছাড়া তার কবর সত্তর হাত প্রশস্ত এবং আলোকিত করে দেয়া হয়। আর তার দেহ সেই মাটির সাথে মিশে যায়, যেই মাটি থেকে তাকে প্রথম সৃষ্টি করা হয়েছিলো। আর তার রূহকে অন্যান্য পবিত্র রূহের সাথে রেখে দেয়া হয়, যাদের সাথে তার রূহ পাখির আকার ধারণ করে জান্নাতের ফল ফলাদি ভক্ষণ করতে থাকে। পবিত্র কুরআনে উল্লেখ আছে- "আল্লাহ তা'আলা এক প্রতিষ্ঠিত প্রমাণিত কথার ভিত্তিতে মুমিনদের পার্থিব জীবনে এবং পরকালে প্রতিষ্ঠা দান করেন। আর আল্লাহ যালিমদেরকে পথভ্রষ্ট করেন। আল্লাহ যা ইচ্ছা তা করেন। (সূরা ইবরাহীম : আয়াত-২৭)

ফেরেশতারা কাফিরদের সম্পর্কে এর ঠিক বিপরীত অবস্থার বিবরণ দেন। কাফিরদের কবর এতোই সংকীর্ণ হয় যে, মৃত ব্যক্তির এক পাঁজরের মধ্যে অন্য পাঁজর ঢুকে পড়ে। এটাই হলো এমন একটি ভয়াবহ জীবন যে সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে উল্লেখ আছে। “এবং যে ব্যক্তি আমার স্মরণ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে, তার জীবন-যাপন হবে সংকুচিত এবং আমি তাকে কিয়ামতের দিন অন্ধ অবস্থায় উত্থিত করবো। সে বলবে, হে আমার পালনকর্তা, আমাকে কেন অন্ধ অবস্থায় উত্থিত করলেন? আমি তো চক্ষুষ্মান ছিলাম। আল্লাহ বলবেন, এভাবে তোমার কাছে আমার আয়াতসমূহ এসেছিলো, অতঃপর তুমি সেগুলো ভুলে গিয়েছিলে। সেভাবে আজ আমিও তোমাকে ভুলে যাবো। এভাবে আমি তাকে প্রতিফল দেবো, যে সীমালঙ্ঘন করে এবং পালনকর্তার নিদর্শনে বিশ্বাস স্থাপন করে না আর পরকালে শাস্তি কঠোরতর এবং দীর্ঘস্থায়ী।” (সূরা ত্বাহা: আয়াত ১২৪-১২৭)

সহীহ বুখারী ও মুসলিম শরীফে হযরত আনাস (রা) থেকে বর্ণিত: হযরত কাতাদাহ (রা) কর্তৃক বর্ণিত একটি হাদীস আছে। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, মৃত ব্যক্তিকে যখন কবরের মধ্যে রাখা হয় এবং তার সঙ্গীরা ফিরে আসতে থাকে তখন তাদের জুতোর আওয়ায পর্যন্ত সে শুনতে পায়। এমতাবস্থায় তার কাছে দু'জন ফেরেশতা এসে তাকে বসান এবং হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দেখিয়ে তাকে জিজ্ঞেস করেন ইনি কে? যদি সে মৃত ব্যক্তি মুমিন হন তাহলে তিনি বলেন, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, নিশ্চয় তিনি আল্লাহর বান্দা ও রাসূল। তখন ফেরেশতারা তাকে বলেন, তাকিয়ে দেখো তোমার জাহান্নামের স্থানকে, যেটাকে আল্লাহ তোমার জান্নাতের আবাসস্থানে পরিবর্তন করে দিয়েছেন। এই প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, সে তখন এক সাথে দু'টি জায়গাই দেখতে পাবে। হযরত কাতাদাহ (রা) বলেন, উক্ত রেওয়ায়েতে আরো বর্ণিত আছে, সেই মৃত ব্যক্তির কবরটি সত্তর হাত প্রশস্ত করে দেয়া হয়।

অপরপক্ষে, মৃত ব্যক্তি যদি কাফির বা মুনাফিক হয়, তাহলে সে ফেরেশতাদের প্রশ্নের উত্তরে বলে, আমি ঐ ব্যক্তি সম্বন্ধে কিছু জানিনা, লোকেরা যা বলতো আমিও তাই বলতাম। তখন ফেরেশতারা লোহার একটি হাতুড়ি দিয়ে তার দু'কানের মধ্যবর্তী স্থানে অর্থাৎ কপালে আঘাত করতে থাকেন। সে তখন চিৎকার করতে থাকে, তার ঐ চিৎকারের শব্দ জিন ও ইনসান ছাড়া অন্য সবাই শুনতে পায়।

সহীহ আবু হাতিমে হযরত আবূ হুরাইরা (রা) থেকে কবরে কাফিরের আযাব সম্পর্কে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যখন কোন মৃত মানুষকে দাফন করা হয়, তখন তার কাছে কালো চেহারার ও নীল রংয়ের চোখ বিশিষ্ট দু'জন ফেরেশতা আসেন। তাঁদের একজনকে বলা হয় নাকীর এবং অপরজনকে বলা হয় মুনকার। উভয় ফেরেশতা মৃত ব্যক্তিকে জিজ্ঞেস করেন, তুমি এই ব্যক্তি অর্থাৎ মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে কি বলতে? তখন সে তাই বলে, যা দুনিয়াতে বলতো। যদি মৃত ব্যক্তি মুমিন হন, তাহলে তিনি বলেন, হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর বান্দা ও রাসূল। তখন ফেরেশতারা বলেন, আমরা জানতাম আপনি একথাই বলবেন। অতঃপর তাঁর কবরটি সত্তর হাত লম্বা ও সত্তর হাত চওড়া ও আলোকিত করে দেয়া হয় এবং তাকে বলা হয়, "আরামে ঘুমিয়ে থাকুন।" তখন তিনি বলেন, আমি আমার পরিবার পরিজন ও সহায় সম্পত্তির দিকে ফিরে যেতে চাই এবং তাঁদেরকে এ সুসংবাদ দিতে চাই। তখন ফেরেশতারা তাঁকে বলেন, আপনি কিয়ামত পর্যন্ত নববধূর মতো ঘুমিয়ে থাকুন, যতোক্ষণ পর্যন্ত না আল্লাহ আপনাকে আবার জাগান, যেমন একজন স্বামী তার নববধূকে ঘুম থেকে জাগিয়ে তোলেন।

আর যদি মৃত ব্যক্তি মুনাফিক হয়, তাহলে সে বলে, আমি জানিনা ইনি কে? আমি শুনতাম, মানুষ তাঁকে কিছু একটা বলতো, আর আমিও তাই বলতাম। তখন ফেরেশতারা তাকে বলেন, আমরা জানতাম, তুমি এটাই বলবে। অতঃপর যমীনকে বলা হবে, তুমি তাকে চেপে ধরো। তখন যমীন ঐ মুনাফিক ব্যক্তিকে এমনভাবে চেপে ধরবে যে, তার এক দিকের পাঁজর অন্যদিকে চলে যাবে। আল্লাহ তা'আলা তাকে পুনরায় কবর থেকে না উঠানো পর্যন্ত সে এভাবে শাস্তি ভোগ করতে থাকবে। এর দ্বারা জানা গেল যে, দেহের উপরই আযাব হয়ে থাকে। কবরে যে মুমিনদের জন্য রয়েছে শান্তি ও কাফিরদের জন্য রয়েছে শাস্তি সে বিষয়ে আবু হাতিম (র) তাঁর এক সহীহ গ্রন্থে এই হাদীসটি উদ্ধৃত করেছেন। কোন মুমিন ব্যক্তির মৃত্যুর সময় উপস্থিত হলে রহমতের ফেরেশতারা তাঁর কাছে আসেন। যখন তাঁর রূহ কবয করা হয় তখন ফেরেশতারা তাঁকে সাদা রেশমের কাপড়ে জড়িয়ে অত্যন্ত সম্মানের সাথে নিয়ে গিয়ে আসমানের দরজায় পৌঁছেন। আর তাঁরা বলতে থাকেন, এর চেয়ে অধিক মন মাতানো সুগন্ধি আমরা আর কখনো পাইনি। অতঃপর বলা হয়, অমুক পুরুষ বা অমুক মহিলা কি মর্যাদা সম্পন্ন কাজ করেছেন? তখন তাঁদেরকে বলা হয়, তাঁকে আর কিছু জিজ্ঞেস করো না, তাঁকে বিশ্রাম নিতে দাও। কেননা, সে দুনিয়াতে দুশ্চিন্তার মধ্যে ছিলো। আর কাফিরদের রূহ যখন কবয করা হয় তখন তাকে পাতালের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়। তখন পাতালের প্রহরীরা বলেন, এর চেয়ে বিকট দুর্গন্ধ তো আমরা আর কখনো পাইনি। অতঃপর তাকে পাতালের একেবারে নিচে নিয়ে যাওয়া হয়।

হযরত সাআদ ইবনে মুআয (রা) সম্পর্কে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, হযরত ইবনে মুআয (রা) ঐ ব্যক্তি যাঁর মৃত্যুর সময় আল্লাহ তা'আলার আরশ কেঁপে উঠেছিলো। আকাশের দরজা খুলে দেয়া হয়েছিলো। আর সত্তর হাজার ফেরেশতা তাঁর জন্য সাক্ষ্য প্রদান করেছিলেন। তবুও কবর তাঁকে চাপ দিয়েছিলো, আবার চাপ থেকে তাঁকে অব্যাহতিও দেয়া হয়েছিলো। (নাসাঈ শরীফ) হযরত আবী মালিকা (রা) থেকে বর্ণিত: কবরের চাপ থেকে কেউ রক্ষা পায়নি, এমনকি সাআদ ইবনে মুআয (রা) পর্যন্ত রক্ষা পাননি, যাঁর রুমালটির মর্যাদা ছিলো দুনিয়ায় ও দুনিয়ার সবকিছুর চেয়ে অধিক। হযরত নাফি (রা) বলেন, আমি জানতে পেরেছি যে, হযরত সাআদ ইবনে মুআয (রা)-এর জানাযায় এমন সত্তর হাজার ফেরেশতা অংশ গ্রহণ করেছিলেন, যাঁরা এর আগে কখনো পৃথিবীতে অবতরণ করেননি। আমি আরো জানতে পেরেছি যে, হযরত সাআদ (রা)-কেও কবর চাপ দিয়েছিলো। হযরত নাফি (রা) আরো বলেন, হযরত ইবনে উমর (রা)-এর স্ত্রী সুফিয়া বিনতে আবী উবায়েদ (রা)-এর নিকট আমি এক সময় গেলাম, সে সময় তিনি অত্যন্ত ভীত-সন্ত্রস্ত অবস্থায় ছিলেন। আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম, ব্যাপার কি? তখন তিনি বললেন, আমি জনৈকা উম্মুল মুমিনীনের নিকট থেকে এসেছি। তিনি বললেন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যদি কারো কবরের আযাব মাফ হতো, তাহলে সাআদ (রা)- এরই মাফ হতো, কিন্তু তাকেও কবর চাপ দিয়েছিলো।

মারওয়ান ইবনে মুআবিয়া (রা) থেকে বর্ণিত: নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর এক মেয়েকে দাফন করে তার কবরের পাশে বসে পড়লেন। তখন তাঁর চেহারা মুবারকে দুঃখের চিহ্ন প্রকাশ পেলো। একটু পরে তাঁর চিন্তাযুক্তভাব দূরীভূত হলো। সাহাবায়ে কেরাম এর কারণ জানতে চাইলে তিনি বললেন, আমার নিজের মেয়ের কথা, তার অসহায় অবস্থা ও কবরের আযাবের কথা আমার মনে পড়লো, তাই আমি আল্লাহ পাকের দরবারে দু'আ করলাম। তখন আল্লাহ তা'আলা তার আযাব দূর করে দিলেন। আল্লাহর কসম, কবর তাকে এমনভাবে চাপ দিলো, যার শব্দ সমস্ত আকাশ-যমীনের মধ্যস্থিত সবাই শুনতে পেয়েছিলো। শুয়াইব ইবনে দীনার ইবরাহীম আলগানাবী (র) জনৈক ব্যক্তি থেকে বর্ণনা করেছেন, কবরের চাপ দেয়া সম্পর্কে তিনি বলেছেন, "আমি হযরত আয়িশা সিদ্দীকা (রা)-এর কাছে ছিলাম, এমন সময় একটি শিশুর জানাযা সেদিক দিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। এ দৃশ্য দেখে হযরত আয়িশা সিদ্দীক (রা) কেঁদে ফেললেন। আমি বললাম, হে উম্মুল মুমিনীন! আপনি কাঁদছেন কেনো? তিনি বললেন, আমি শিশুটির প্রতি দয়া পরবশ হয়ে তার জন্য কাঁদলাম এ জন্য যে, এ শিশুটিকে তার কবর চাপ দেবে।” এ ঘটনা থেকে জানা গেলো, রূহের মাধ্যমেই দেহের উপর কবরের আযাব হয়।

কবরের আযাব যে বাস্তব ও সত্য সহীহ হাদীসের মাধ্যমে তা জানা গেল। আহলে সুন্নাতের আলিমগণ এ বিষয়ে একমত। ইমাম মারুযী (র) থেকে বর্ণিত, হযরত আবূ আবদুল্লাহ (র) বলেছেন, কবরের আযাব সত্য, পথভ্রষ্ট ব্যক্তি ও পথ ভ্রষ্টকারী ছাড়া আর কেউ এটা অস্বীকার করেন না। ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (র) থেকে বর্ণিত, তিনি হযরত আবূ আবদুল্লাহকে কবরের আযাব সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, এ সম্পর্কে অনেক সহীহ হাদীস রয়েছে। এই হাদীসগুলো বিশ্বস্ত সনদের দ্বারা প্রমাণিত। তাই এগুলো অবশ্যই মেনে নিতে হবে। এসব হাদীস প্রত্যাখ্যান করা আল্লাহর হুকুমকে প্রত্যাখ্যান করারই শামিল। আল্লাহ তা'আলা পবিত্র কুরআনে নির্দেশ করেছেন, "রাসূল তোমাদেরকে যা প্রদান করেন, তা তোমরা গ্রহণ করো এবং যা নিষেধ করেন, তা থেকে বিরত থাকো এবং আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চয় আল্লাহ কঠোর শাস্তিদাতা।” (সূরা আল হাশর: আয়াত-৭)

ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (র) হযরত আবূ আব্দুল্লাহকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, কবরের আযাব কি সত্য? তিনি বললেন, হ্যাঁ, কবরের আযাব সত্য। তিনি আরো বললেন, আবূ আবদুল্লাহ (র)-কে তিনি বলতে শুনেছেন, "কবরের আযাব, নাকীর-মুনকার, বান্দাকে কবরের সওয়াল জবাবের কথা এ সবই আমরা বিশ্বাস করি।” আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন, "আল্লাহ তা'আলা এক প্রতিষ্ঠিত প্রমাণিত বাক্য দ্বারা মুমিনদেরকে প্রতিষ্ঠা দান করেন পার্থিব জীবনে ও পরকালে এবং আল্লাহ যালিমদেরকে পথভ্রষ্ট করেন। আল্লাহ যা ইচ্ছা তা করেন।” (সূরা ইবরাহীম: আয়াত-২৭)

আহমদ ইবনে কাসিম (র) বলেন, আমি আবূ আবদুল্লাহ (র)-কে জিজ্ঞেস করলাম, আপনি কি নাকীর-মুনকার এবং কবরের আযাব সম্পর্কে যা হাদীসে বর্ণিত আছে, তা স্বীকার করেন? তিনি উত্তর দিলেন, সুবহানাল্লাহ! নিশ্চয়ই আমি তা স্বীকার করি। আমি আবার তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম, কবরে সওয়ালকারীদেরকে আপনি নাকীর-মুনকার বলেন, না শুধু ফেরেশতা বলেন? তিনি উত্তর দিলেন নাকীর-মুনকার বলি। আমি বললাম, কেউ কেউ বলে থাকেন, হাদীস শরীফে মুনকার-নাকীরের শব্দ দু'টি নেই। তিনি বললেন, না, আছে। তবে অধিকাংশ মুতাযিলীর মতে, নাকীর-মুনকার শব্দ দ্বারা আল্লাহর ফেরেশতাদের নামকরণ বৈধ নয়। আবূ হুযায়েল ও মারীসী থেকে বর্ণিত, মুমিনদেরকে কবরে কোন আযাব দেয়া হয়না। তবে বেঈমানদের মৃত্যুর পর কিয়ামতের শিঙ্গায় ফুঁ ও পুনরুত্থানের মধ্যকার সময় শাস্তি হবে, আর সেই সময় তাদেরকে সওয়ালও করা হবে। জুব্বাই ও তদীয়পুত্র বালাজীর অভিমত হলো, কবরের আযাব সত্য, তবে তা মুমিনদের জন্য নয়, তা শুধু কাফির ও ফাসিকদের জন্য, কবরের আযাব সম্পর্কে এটাই তাদের মূল ধারণা। হযরত সালিহ (র) বলেন, মুমিনদেরও কবরের আযাব হয় তবে তাদের দেহে রূহ ফিরিয়ে আনা হয় না। মৃত ব্যক্তির পক্ষে রূহ ছাড়াই ব্যথা অনুভব করা সম্ভব। এছাড়া হুঁশ-জ্ঞান থাকাও সম্ভব, কারামিয়া নামক একটি সম্প্রদায় এই অভিমত পোষণ করে। এক শ্রেণীর মুতাযিলীর মতে, আল্লাহ তা'আলা কবরের মধ্যে মৃতদেরকে শাস্তি দেন, তবে কিয়ামতের দিন যখন এদেরকে কবর থেকে উঠানো হবে তখন তারা সেই শাস্তির দুঃখ-যন্ত্রণা অনুভব করবে। তাদের মতে আযাবে লিপ্ত মৃতদের দৃষ্টান্ত হলো, নেশাগ্রস্ত ও বেহুঁশ মানুষের মতো। এ অবস্থায় যদি তাদেরকে কেউ প্রহার করে, তাহলে তারা তা অনুভব করে না। কিন্তু যখন নেশার ভাব কেটে যায় এবং চেতনা ফিরে আসে তখন তারা ঐ আঘাতের ব্যথা অনুভব করে। কোন কোন মুতাযিলী কবরের আযাবকে মোটেই স্বীকার করে না। তন্মধ্যে রয়েছে, যারার ইবনে আমর, ইয়াহইয়া ইনে কামিল প্রমুখ। মারিসীও এই অভিমত পোষণ করতেন। তবে এটা হলো ভ্রান্ত ও বিপথগামীদের অভিমত।

উল্লেখ্য যে, কবরের আযাব বলতে বরযখের আযাবকেই বুঝায়। যে ব্যক্তি শাস্তির যোগ্য তাকে বরযখে শাস্তি ভোগ করতে হবে, তাকে দাফন করা হোক বা না হোক। যেমন কোন ব্যক্তির দেহ হিংস্র জন্তু খেয়ে ফেলেছে বা আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে এবং সেই ছাই বাতাসে উড়ে গিয়েছে, কিম্বা তার দেহ ফাঁসি কাষ্ঠে ঝুলে আছে, কিম্বা সেই দেহ সমুদ্রে ডুবে গেছে, সেই অবস্থায় তার রূহ ও দেহের উপরই বরযখে আযাব বা আরাম হয়ে থাকে। হযরত সামুরাহ ইবনে জুনদুব (রা) থেকে বর্ণিত: নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখনই ফজরের নামায আদায় করতেন, নামায শেষে তিনি আমাদের দিকে ঘুরে বসতেন এবং বলতেন, আজ রাতে তোমাদের মধ্যে কেউ কোন স্বপ্ন দেখেছো কী? সামুরাহ ইবনে জুনদুব (রা) বলেন, এই অবস্থায় কেউ কোন স্বপ্ন দেখে থাকলে তা বর্ণনা করতেন এবং আল্লাহ যেমন তাঁকে জানাতেন তিনি স্বপ্নের তাবীর সেভাবে বলে দিতেন। একদিন তিনি আমাদেরকে স্বপ্ন সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন, তোমাদের মধ্যে কেউ কি কোন স্বপ্ন দেখেছো। আমরা জবাব দিলাম না, আমরা কেউ কোন স্বপ্ন দেখিনি। তখন তিনি বললেন, আমি কিন্তু আজ রাতে স্বপ্নে দু'জন লোককে দেখেছি, তারা আমার কাছে এসে আমার হাত ধরে এক পবিত্র স্থানে নিয়ে গেলো। সেখানে দেখতে পেলাম এক ব্যক্তি বসে আছে আর তার পাশেই অন্য এক ব্যক্তি দাঁড়িয়ে আছে। তার হাতে আছে একটি লোহার কাঁটা। সেটি সে বসা মানুষটির চোয়ালে ঢুকিয়ে তা চিরে ফেলছে, অনুরূপভাবে অপর চোয়ালেও ঐ কাঁটাটি ঢুকিয়ে তা চিরে ফেলেছে। এর মধ্যে তার প্রথম চোয়ালটি জোড়া লেগে ভালো হয়ে যাচ্ছে। সুতরাং সে এ চোয়ালটিতে আবার কাঁটা ঢুকিয়ে আগের মতো করছে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আমি বললাম, এ কি ব্যাপার? এই অবস্থায় তারা দু'জন আমাকে বললো, চলুন। সুতরাং আমরা চলতে থাকলাম এবং এমন এক ব্যক্তির নিকট পৌঁছলাম, যে চিত হয়ে শুয়ে আছে আর অপর এক ব্যক্তি তার মাথার কাছে এক খণ্ড পাথর হাতে দাঁড়িয়ে আছে এবং পাথরটি তার মাথার উপর নিক্ষেপ করছে। যখন সে তাকে আঘাত করছে প্রস্তর খণ্ডটি তখন ছিটকে মস্তক থেকে দূরে গিয়ে পড়ছে। লোকটি তা কুড়িয়ে আনছে। কিন্তু ফিরে আসার আগেই এ ব্যক্তির মাথা জোড়া লেগে পূর্বের মতোই হয়ে যাচ্ছে। তারপর লোকটি ফিরে এসে পাথর দ্বারা আবার তাকে আঘাত করছে। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আমি জিজ্ঞেস করলাম, এ লোকটি কে? তারা দু'জন বললো আরো আগে চলুন। আমরা অগ্রসর হলাম এবং তন্দুরের মতো একটি গর্তের পাশে গিয়ে পৌঁছলাম। এটির উপরিভাগ ছিলো সংকীর্ণ, কিন্তু নিম্নভাগ ছিলো প্রশস্ত, আর এর নিচে ছিলো জ্বলন্ত আগুন। আগুনের শিখা যখন উপরে উঠছে তখন ভেতরের লোকগুলো যেন বের হয়ে পড়বে বলে মনে হচ্ছে এবং আগুন যখন থেমে নিস্তেজ হয়ে যাচ্ছে তখন তারাও নিচে চলে যাচ্ছে। ঐ গর্তের সংকীর্ণ মুখের মধ্যে উলঙ্গ নারী ও পুরুষদের রাখা হয়েছে। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আমি সংগী দু'জনকে জিজ্ঞেস করলাম এ কি কাণ্ড? তারা বললো, এগিয়ে চলুন। আমরা আবার অগ্রসর হলাম এবং একটি রক্তের নদীর কিনারে উপনীত হলাম যার মধ্যে একজন লোক দাঁড়িয়ে আছে। উপরোক্ত হাদীস সম্পর্কে অন্য এক বর্ণনায় ইয়াযীদ ইবনে হারূন এবং ওয়াহাব ইবনে জাবীর ইবনে হাযেম উল্লেখ করেছেন, নদীর মাঝখানে একজন লোক এবং নদীর তীরে অন্য একজন লোক দাঁড়িয়ে আছে। আরো দেখলেন নদীর তীরে দাঁড়ানো লোকটির সামনে কিছু পাথর রাখা আছে। ইতিমধ্যে নদীর মাঝখানে দাঁড়ানো লোকটি তীরের দিকে অগ্রসর হলো। সে যখন তীরে উঠার চেষ্টা করলো তখন অপর লোকটি তার মুখের উপর পাথর নিক্ষেপ করে তাকে পূর্বের জায়গায় ফিরিয়ে দিলো। এভাবে যখনই সে তীরে উঠতে চেষ্টা করছে, তখনই লোকটি তাকে পাথর ছুঁড়ে মারছে। আর সে যেখানে ছিলো সেখানে ফিরে যেতে বাধ্য হচ্ছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, একি ব্যাপার দেখছি? তারা দু'জন আবার বললো, এগিয়ে চলুন। আমরা এগিয়ে চললাম এবং এমন একটি শ্যামল তরুতাজা বাগিচায় প্রবেশ করলাম যেখানে একটি বিরাট গাছ ছিলো। গাছটির নিচে এক বৃদ্ধ ও কিছু সংখ্যক শিশু বসা ছিলো। গাছটির অদূরেই একজন লোক তার সামনে আগুন জ্বালাচ্ছিলো। আমার সাথী দু'জন আমাকে নিয়ে গাছে আরোহণ করে আমাকে এমন একটি ঘরে প্রবেশ করিয়ে দিলো যে ঘরের চেয়ে উত্তম ও সুন্দর কোন ঘর আমি আর কখনো দেখিনি। সেখানে যুবক, বৃদ্ধ, নারী ও শিশুরা অবস্থান করছিলো। অতঃপর তারা দু'জন সেখান থেকে আমাকে বের করে আনলো এবং পুনরায় আমাকে নিয়ে অন্য একটি গাছে আরোহণ করে এমন একটি ঘরে প্রবেশ করিয়ে দিলো যেটি ছিলো সবচেয়ে বেশি সুন্দর আর সেখানে ছিলো শুধু বৃদ্ধ ও যুবকেরা। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, এই অবস্থায় আমি আমার সাথী দু'জনকে বললাম, তোমরা তো আজ রাতে আমাকে ভ্রমণ করালে। এতোক্ষণ যেসব বিষয় আমি দেখতে পেলাম সে সম্পর্কে আমাকে কিছু অবহিত করো। তারা বললো, হ্যাঁ, তা করছি। যাকে আপনি দেখলেন যে, তার চোয়াল চিরে ফেলা হচ্ছে, সে হলো মিথ্যাবাদী সে মিথ্যা কথা বলে বেড়াতো। লোকেরা তার থেকে কথা শুনে অন্যদের তা বলতো এভাবে তা সর্বত্র ছড়িয়ে পড়তো। এখন কিয়ামত পর্যন্ত তার সাথে এ আচরণ করা হবে। যে ব্যক্তিকে দেখলেন যে, তার মাথা পাথরের আঘাতে চূর্ণবিচূর্ণ করা হচ্ছে। এ হলো সেই ব্যক্তি যাকে আল্লাহ কুরআনের জ্ঞান দান করেছিলেন কিন্তু তা থেকে সে গাফিল হয়ে রাতে ঘুমিয়েছে আর দিনেও সেই অনুযায়ী কাজ করেনি। তার সাথে কিয়ামত পর্যন্ত এ আচরণ করা হবে। যাদেরকে আপনি তন্দুর সদৃশ গর্তের মধ্যে দেখতে পেলেন তারা সবাই হলো ব্যভিচারী ও ব্যভিচারিণীর দল। রক্তের নদীতে যাকে দেখলেন সে হলো সুদখোর। গাছের নিচে যে বৃদ্ধকে দেখেছেন, তিনি হলেন হযরত ইবরাহীম (আ), আর তাঁর চারদিকে শিশুরা হলো মৃত নাবালিগ সন্তানগণ। যাকে আগুণ জ্বালাতে দেখলেন, সে হলো দোযখের ফেরেশতা মালেক। প্রথম যে ঘরে আপনি প্রবেশ করেছিলেন তা হলো সাধারণ ঈমানদারদের ঘর আর অপরটি হলো শহীদদের ঘর। আমি হলাম, জিবরাঈল এবং ইনি হলেন মীকাঈল। এরপর তিনি বললেন, আপনি মাথা উঠান। আমি মাথা তুলে উপরে মেঘ মালার ন্যায় কিছু দেখতে পেলাম। তাঁরা দু'জন বললেন, ওটি আপনার জায়গা। আমি বললাম, আপনারা আমাকে আমার জায়গায় যেতে দিন। তাঁরা দু'জন বললেন, আপনার আয়ু এখনো বাকী আছে, এখনো তা পূর্ণ হয়নি। আপনার আয়ু পূর্ণ হলে আপনার ঘরে যেতে পারবেন। (বুখারী) এ হাদীসের দ্বারা আলমে বরযখের আযাব ও আরাম যে সত্য, তার সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়। কেননা আম্বিয়ায়ে কেরামের স্বপ্ন ওহীর সমতুল্য।

একবার নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আল্লাহর কোন এক বান্দাকে তার কবরে একশত চাবুক মারার হুকুম দেয়া হলো। কিন্তু ঐ বান্দা আল্লাহর কাছে দু'আ করতে থাকলো। শেষ পর্যন্ত মাত্র এক চাবুক মারা বাকী রইলো, সেই অবস্থায় তার কবরটি আগুনের চুলায় পরিণত হয়ে গেলো। অবশেষে তার আযাব যখন দূর হলো এবং সে চেতনা ফিরে পেলো, তখন সে জানতে চাইলো, কী কারণে তাকে এই শাস্তি দেয়া হলো? ফেরেশতাগণ তখন জবাব দিলেন, "তুমি এক ওয়াক্ত নামায বিনা ওযূতে আদায় করেছিলে। আর একবার তুমি জনৈক মযলূম ব্যক্তির নিকট দিয়ে যাচ্ছিলে কিন্তু তুমি তাকে কোন সাহায্য করোনি।” (তাহাবী) শবে মি'রাজ সম্পর্কে হযরত আবূ হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত আছে, একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পবিত্র কুরআনের এই আয়াতটি তিলাওয়াত করলেন, "পবিত্র ও মহিমময় তিনি, যিনি এক রাত্রে তাঁর বান্দাকে মসজিদে হারাম থেকে মসজিদে আকসায় ভ্রমণ করিয়েছিলেন, যার চার দিকে আমি বরকত দান করেছিলাম, যেন তাঁকে নিজের কিছু নিদর্শনাদি পর্যবেক্ষণ করাতে পারি। নিশ্চয়ই তিনি সর্বশ্রোতা ও সর্বদ্রষ্টা।” (সূরা বনী ইসরাঈল: আয়াত-১) তিনি এ প্রসঙ্গে ইরশাদ করেন, অতঃপর আমার নিকট বুরাক নিয়ে আসা হয়। আমি তার উপর সওয়ার হলাম। ঐ বুরাকের প্রতিটি পদক্ষেপ তার দৃষ্টির শেষ সীমা পর্যন্ত পৌঁছতো। এভাবে যাচ্ছিলাম এবং জিবরাঈল আমাদের সাথে ছিলেন। অতঃপর আমরা এমন কিছু লোকের নিকট দিয়ে যাচ্ছিলাম যারা একদিন ফসল রোপন করে আর পরের দিন ফসল কেটে নেয়। আর কাটার পরই মাঠ আবার আগের মতো ফসলে ভরে যায়। আমি জিজ্ঞেস করলাম, জিবরাঈল, এরা কারা? তিনি বললেন, এরা হলো আল্লাহর পথে জিহাদকারী। এদের পুণ্যের সংখ্যা সাতশত পর্যন্ত বাড়িয়ে দেয়া হয়। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তা'আলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেরেছন, "তোমরা যা কিছু ব্যয় করবে তিনি তার প্রতিদান দেবেন। তিনিই শ্রেষ্ঠ জীবিকাদাতা।" (সূরা সাবা: আয়াত-৩৯)

অতঃপর আমরা এমন কিছু লোকের নিকট দিয়ে গেলাম যাদের মাথা পাথর মেরে চূর্ণবিচূর্ণ করে দেয়া হচ্ছে। আর তাদের মাথা চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যাওয়ার পরই আবার তা ঠিক হয়ে যাচ্ছিলো। এই আযাব এক মুহূর্তের জন্যও মুলতবী করা হচ্ছেলো না। আমি জিজ্ঞেস করলাম, জিবরাঈল এরা কারা? তিনি বললেন, এরা নামাযে আলসেমী করতো। এভাবে আমরা এমন একদল লোকের কাছ দিয়ে গেলাম, যাদের দেহের সম্মুখ ও পশ্চাদ ভাগে কিছু কাপড়ের টুকরো বা পট্টি রাখা আছে আর বাঁধন ছাড়া পশুর ন্যায় কাঁটাতার ও বিষাক্ত গাছগাছালি এবং জাহান্নামের পাথর ইত্যাদির উপর দিয়ে তারা ছুটে চলেছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, হে জিবরাঈল, এরা কারা? তিনি বললেন, এরা সেসব লোক, যারা যাকাত দিতো না, আবার আমরা এমন কিছু লোকের নিকট দিয়ে গেলাম যাদের সামনে পাক-পবিত্র ও টাটকা এবং রান্না করা গোশত রাখা আছে এবং পচা গোশতও রাখা আছে। কিন্তু এরা উত্তম ও টাটকা গোশত ছেড়ে দিয়ে পচা, অপবিত্র গোশত খাচ্ছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, জিবরাঈল, এরা কারা? তিনি বললেন, এরা হলো ঐসব লোক যারা নিজেদের স্ত্রীদেরকে ছেড়ে পতিতাদের নিয়ে রাত কাটাতো। তারপর আমি দেখলাম রাস্তায় একটি কাঠের টুকরো পড়ে আছে, কাঠের টুকরোটি যা কিছু সামনে পায় সব কিছুই ভেঙ্গে চুরমার করে দিচ্ছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, জিবরাঈল এটা কি? তিনি বললেন, এটা হলো আপনার উম্মতের মধ্যে যারা ডাকাত তাদের উপমা, যারা রাস্তায় বসে থাকে এবং পথিকদের ধন-সম্পদ লুটপাট করে। আল্লাহ তা'আলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন, "তোমরা লোকদেরকে ভয় দেখাবার জন্য পথে-ঘাটে বসে থেকো না।" (সূরা আরাফ: আয়াত-৮৬) এরপর অন্য এমন একজন লোকের নিকট দিয়ে গেলাম যে ব্যক্তি লাকড়ির এমন ভারী বোঝা জমা করে রেখেছে যা সে উঠাতে পারছেনা অথচ আরো বেশি লাকড়ি একত্রিত করার চেষ্টা করছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, এটা কি? জিবরাঈল (আ) বললেন, এই ব্যক্তি আপনার উম্মতের সেই লোক যার কাছে লোকের আমানত গচ্ছিত আছে। আর সে ঐগুলো দিচ্ছে না, অথচ সে আরো আমানত জমা করার ইচ্ছা পোষণ করছে। তারপর আমরা এমন কিছু লোকের নিকট দিয়ে গেলাম যাদের ঠোঁট লোহার কাঁচি দ্বারা কাটা হচ্ছিল। কাটার পরক্ষণে ঠোঁট আবার ঠিক হয়ে যাচ্ছিলো এ আযাব এক মুহূর্তের জন্যও বন্ধ হচ্ছিলো না। আমি বললাম, এরা কারা? জিবরাঈল (আ) বললেন, এরা হলো সব ফিতনার যামানার বক্তা। এরপর আমরা এমন একটি সংকীর্ণ সুড়ঙ্গের নিকট দিয়ে গেলাম যার ভেতর থেকে উজ্জ্বল আলো বের হচ্ছিলো, পরক্ষণে এ আলো ফিরে যেতে চায় কিন্তু ফিরে যেতে পারে না। আমি জিজ্ঞেস করলাম, এটা কি? জিবরাঈল (আ) বললেন, এ হলো সে ব্যক্তি যে কোন খারাপ কথা বলে তার জন্য লজ্জাবোধ করে এবং তা প্রত্যাহার করতে চায় যদিও তা সম্ভব হয় না।

উপরে বর্ণিত ঘটনাবলী শেষ করে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবার জিবরাঈল (আ)-এর সঙ্গে যাত্রা শুরু করলেন। অতঃপর জিবরাঈল (আ) আসমানের দরজা খুললেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, আল্লাহ তা'আলা আদম (আ)-কে যে আকৃতিতে পয়দা করেছেন আমি সেই আকৃতিতে তাঁকে দেখলাম। এছাড়া সে সময় তাঁকে তাঁর মুমিন সন্তানদের রূহসমূহ দেখানো হলো, তা দেখে তিনি বলছিলেন, এগুলো হলো পাক পবিত্র রূহ আর পাক নাফস, এদেরকে ইল্লিয়্যীন রাখো। আদম (আ)-এর বেঈমান সন্তানদের রূহ তাঁকে দেখানো হলো, তিনি সেগুলো দেখে বললেন, এগুলো হলো অপবিত্র রূহ ও অপবিত্র নাফস, এগুলোকে সিজ্জীনে রাখো। তারপর আমরা আরেকটু অগ্রসর হলাম এবং দেখলাম, একটি দস্তরখানে পাক পবিত্র ও টাটকা গোশত রাখা আছে কিন্তু এর ধারে কাছে কেউ নেই। আরেকটি দস্তরখান দেখলাম যার মধ্যে পঁচা গলা ও দুর্গন্ধযুক্ত গোশত রাখা আছে, আর লোকেরা তা খাচ্ছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, জিবরাঈল এরা কারা? তিনি বললেন, এরা হলো ঐ সমস্ত লোক যারা হালাল পরিত্যাগ করে হারাম খায়। এরপর আমরা আরো একটু অগ্রসর হলাম, তখন আমরা ঐ সব লোক দেখতে পেলাম যাদের পেট কলসের মতো বড় আকারের। এদের মধ্যে কেউ দাঁড়াতে চাইলে পড়ে যায় আর দুআ করে হে আল্লাহ! কিয়ামত কায়িম করো না। এরা হলো ঐসব লোক যাদেরকে ফিরআউনের কাফিলা পদদলিত করে চলে যায় আর তারা চিৎকার করতে থাকে। আমি জিজ্ঞেস করলাম এরা কারা? জিবরাঈল (আ) বললেন, এরা সুদখোর এবং জিনে আক্রান্ত লোকদের মতো এরা দাঁড়াতে চায়। এভাবে আমরা আরো অগ্রসর হলাম, তখন এমন কিছু লোকদেরকে দেখতে পেলাম যাদের ঠোঁট উটের ঠোঁটের মতো, জোর করে ওদের মুখে পাথর ঢুকিয়ে দেয়া হচ্ছে যা তাদের মলদ্বার দিয়ে বেরিয়ে আসছে আর এরা এই অবস্থায় চিৎকার করছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, এরা কারা? জিবরাঈল (আ) বললেন, এরা অন্যায়ভাবে ইয়াতীমের মাল ভক্ষণ করতো। আমরা আরেকটু অগ্রসর হয়ে দেখলাম, কিছু সংখ্যক মহিলা যাদের বক্ষদেশ বেঁধে রাখা হয়েছে আর তারা ঝুলছে। আর তারা করুণভাবে চিৎকার করছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, এরা কারা? জিবরাঈল (আ) বললেন, এরা ব্যভিচারিণী স্ত্রীলোক। আমরা আরো কিছু দূর এগিয়ে গেলাম, সেখানে এমন কিছু লোক দেখতে পেলাম যাদের পার্শ্বদেশ থেকে মাংস কাটা হচ্ছে এবং তাদের মুখের ভেতর ঢুকিয়ে দেয়া হচ্ছে আর বলা হচ্ছে, এটা খাও, যেমনিভাবে তোমরা নিজের ভাইয়ের মাংস খেতে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, এরা কারা? জিবরাঈল (আ) বললেন, এরা হলো আপনার উম্মতের ঐসব লোক যারা পরের দোষ চর্চা করতো। এভাবে তিনি সম্পূর্ণ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। (বায়হাকী) নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই প্রসঙ্গে আরো ইরশাদ করেছেন, মি'রাজ শরীফে আমরা এমনি ধরনের কিছু লোকের নিকট গেলাম, যাদের নখ ছিলো তামার। আর সেগুলো দিয়ে তারা তাদের মুখমণ্ডলে ও বুকে আঁচড় কাটছিলো। আমি জিজ্ঞেস করলাম, এরা কারা? জিবরাঈল (আ) বললেন, এরা হলো ঐসব লোক যারা মানুষের গোশত ভক্ষণ করতো অর্থাৎ পরনিন্দা করতো এবং তাদের সম্মান হনন করতো। (আবূ দাউদ)

আবূ দাউদ তায়ালিসীর গ্রন্থের মধ্যে খেজুর গাছের তাজা ডাল সম্পর্কীয় হাদীসের উল্লেখ আছে, যা দু'টুকরো করে দু'কবরে পুঁতে দেয়া হয়েছিলো। হাদীসটি উপরে বর্ণিত হয়েছে। উক্ত কবরবাসীদের সম্পর্কে মতভেদ আছে, এরা কাফির ছিলো না মুমিন ছিলো। তবে সঠিক সিদ্ধান্ত এই যে, এরা ছিলো কাফির। এই হাদীসে আরো উল্লেখ আছে, তাদের কোন বড় গুনাহের কারণে আযাব হচ্ছিলো না, অর্থাৎ শিরক ও কুফরীর তুলনায় এটা ছিলো সাধারণ গুনাহ। এই হাদীসের দ্বারা জানা গেলো যে, এরা আযাব থেকে মুক্ত হয়নি। তাদের আযাব সাময়িকভাবে লাঘব করা হয়েছিলো মাত্র। তারা যদি মুমিন হতো তাহলে তিনি তাদের জন্য দু'আ করতেন এবং তারা আযাব থেকেও মুক্তি পেতো। উক্ত হাদীসের এক সনদেও এরা যে কাফির ছিলো এটা উল্লেখ আছে। লোকগুলোর এই আযাব অন্য গুনাহর কারণে ছিল, শিরক বা কুফরীর জন্য নয়। এতে জানা গেলো যে, কাফিরদের কুফরী ও শিরকের যেমন আযাব হয় তেমনি অন্যান্য গুনাহের জন্যও আযাব হয়। এই অভিমত আবুল হিকাম ইবনে বারখানও সমর্থন করেছেন। ইমাম কুরতুবীর অভিমত অনুযায়ী ঐ দুই কবরবাসী মুসলমান ছিলেন। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসালাম স্পষ্টভাবে বলেছেন, কুফরী ও শিরকের কারণে এদের আযাব হচ্ছিলো না। কারণ কুফরী ও শিরক হচ্ছে সবচেয়ে বড় গুনাহ। এছাড়া এটা এমন কোন বিষয় নয় যে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সকল গুনাহগার মুসলমান যারা কবরের আযাবে লিপ্ত, তাদের জন্য সুপারিশ করতে হবে। এখানে উল্লেখ্য যে, একবার জনৈক মুসলমান জিহাদে নিহত হয়েছিলেন। কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রে শহীদ হওয়ার পূর্বে তিনি একটি চাদর আত্মসাৎ করেছিলেন। সেই মুজাহিদ সম্পর্কে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসালাম থেকে বর্ণিত আছে যে, এই মুজাহিদের কবরে আগুনের চাদর প্রজ্জ্বলিত রয়েছে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00