📄 দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর রূহকে কিভাবে চেনা যায়
দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর রূহকে কি চেনা যায়? রূহের কি পরস্পর পরিচয় ও সাক্ষাৎ হয়? দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর রূহ কি কোনো বিশেষ আকৃতি ধারণ করে? এসব বিষয় সম্পর্কে সম্ভবত আগে কেউ কোনো আলোকপাত করেননি। এ সম্পর্কে কোনো গ্রন্থে কোনো কিছু উল্লেখ নেই। তবে কোনো কোনো চিন্তাশীল ব্যক্তির ধারণা অনুযায়ী রূহ কোনো বস্তু বা পদার্থ নয়। এছাড়া, রূহের অবস্থান দুনিয়ার মধ্যে অথবা দুনিয়ার বাইরে নেই। রূহের কোনো আকৃতি বা আকারও নেই। যাঁরা রূহকে বিবর্তনশীল বলে মনে করেন, তাঁদেরও এ সম্পর্কে কোনো বক্তব্য নেই। কেউ কেউ মনে করেন, রূহের মধ্যে দৈহিক পার্থক্য বা বৈষম্য বিদ্যমান নেই। তাই মৃত্যুর পর রূহের মধ্যে কোনো তারতম্য থাকে না, বরং অপরাপর পরমূর্তের ন্যায় রূহের অস্তিত্ব লোপ পেয়ে যায়। অবশ্য আহলে সুন্নাতের বিশ্বাস ও ধারণা অনুযায়ী রূহ একটি স্বতন্ত্র সত্তা। রূহ আসা-যাওয়া ও ওঠানামা করে, একত্রিত হয় এবং পৃথকও হয়, ভেতরে ও বাইরে আসা-যাওয়া করে। এভাবেই রূহের স্থিরতা ও অস্থিরতা পরিলক্ষিত হয়। এটাই আহলে সুন্নাতের অভিমত। এই বিষয় সম্পর্কে কুরআন-হাদীস, কিয়াস ও ইজতিহাদের দলীল-প্রমাণ বিদ্যমান আছে। এই গ্রন্থকারের বৃহৎ গ্রন্থ 'মাআরেফাতুর রূহ ওয়ান্নাফস'-এর মধ্যে এই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে। আর বিরুদ্ধবাদীদের মতবাদের ভুল-ভ্রান্তি অনেক দলীল-প্রমাণ দ্বারা খণ্ডন করা হয়েছে।
পবিত্র কুরআনের দ্বারা একথায় প্রমাণিত যে, রূহ ইহজগত ও পরজগতের সর্বত্র বিচরণ করে, রূহকে কবয করে উঠিয়ে নেয়া হয়। রূহ নিজের আবাসের দিকেও প্রত্যাবর্তন করে। এর জন্য আসমানের দরজা খুলে দেয়া হয় ও বন্ধ করে দেয়া হয়। রূহ সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন, "যদি আপনি দেখতেন, যালিমরা যখন মৃত্যু যন্ত্রণায় থাকবে আর ফেরেশতারা তাদের দিকে তাঁদের হাত প্রসারিত করে বলবে, হে রূহেরা বেরিয়ে এসো। কারণ, তোমরা আল্লাহ সম্বন্ধে অসত্য বলতে ও তাঁর আয়াত সম্পর্কে অহঙ্কার করতে। অদ্য তোমাদেরকে অবমাননাকর শাস্তি দেয়া হবে।" (সূরা আল-আন'আম : আয়াত-৯৩)
আল্লাহ তা'আলা পবিত্র কুরআনে সে সম্পর্কে আরও ইরশাদ করেছেন, “হে প্রশান্ত চিত্ত! তুমি তোমার রবের দিকে প্রত্যাবর্তন করো সন্তুষ্ট ও সন্তোষজনক হয়ে। (তুমি তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট, আর তিনিও তোমার প্রতি সন্তুষ্ট)। কাজেই আমার বান্দাদের মধ্যে দাখিল হও এবং আমার বেহেশতে প্রবেশ করো।" (সূরা আল ফাজর: আয়াত-২৭-৩০)
রূহকে যখন দেহ থেকে পৃথক করা হয়, তখনই উপরোক্ত কথাগুলো বলা হয়ে থাকে। পবিত্র কুরআনে অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে, “রূহের ও রূহের সুবিন্যস্তকারীর শপথ, যিনি তাকে তার ভালো-মন্দ জ্ঞান দান করেছেন। যে নিজেকে পরিশুদ্ধ করে, সেই সফলকাম হয় এবং যে নিজেকে কলুষিত করে, সে ব্যর্থ মনোরথ হয়।” (সূরা আশ-শামস: আয়াত-৭-১০)
পবিত্র কুরআনে উল্লেখ আছে, তিনি দেহের ন্যায় রূহকেও সামঞ্জস্যপূর্ণ করেছেন। “হে মানুষ, কিসে তোমাকে তোমার মহামহিম পালনকর্তা সম্পর্কে বিভ্রান্ত করলো? তিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর তোমাকে সুবিন্যস্ত করেছেন।” অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা মানুষের রূহকে সুবিন্যস্ত করেছেন যেরূপ সামঞ্জস্যপূর্ণ করেছেন দেহকে। দেহকে এজন্য সুঠাম ও সুন্দর করেছেন, যাতে তা রূহের ছাঁচে গঠিত হয়। দেহকে সুঠাম করা আসল উদ্দেশ্য নয়, বরং আসল উদ্দেশ্য হলো, দেহকে একটি সুন্দর আধারে পরিণত করা। কেননা, দেহ হচ্ছে রূহের আবাসস্থল।
অতএব জানা গেল, রূহের আকার ও আকৃতি আছে এবং তা দেহের সাথে মিশে এমন এক রূপ ধারণ করে, যাতে মানুষ একে অপর থেকে এক একটি পৃথক বৈশিষ্ট্যের অধিকারী হয়। কেননা, দেহের ন্যায় রূহও প্রভাবিত হয়। দেহের পবিত্রতা বা অপবিত্রতার কারণে রূহও পবিত্র বা অপবিত্র হয়ে যায়। কাজেই দেহ ও রূহের মধ্যে ঐরূপ যোগসূত্র ও সমন্বয় বজায় থাকে, যেরূপ সম্পর্ক অন্য কোনো দুটি পার্থিব বস্তুর মধ্যে বিদ্যমান থাকে না। এজন্যই দেহ থেকে রূহের বিচ্ছিন্ন হওয়ার সময় বলা হয়, "হে পবিত্র রূহ! যে পবিত্র দেহে রয়েছো আর হে অপবিত্র রূহ যে অপবিত্র দেহে রয়েছো, সেখান থেকে বেরিয়ে এসো।" পবিত্র কুরআনে আরও ইরশাদ হয়েছে, "আল্লাহ মানুষের রূহগুলোকে মৃত্যু দান করেন তাদের মৃত্যুর সময়, আর যারা মৃত্যুবরণ করে না তাদের নিদ্রার সময়, আর যার মৃত্যুর নির্দেশ দিয়েছেন সেটাকে আটকে রাখেন এবং অন্যগুলোকে এক নির্দিষ্ট মেয়াদকাল পর্যন্ত ছেড়ে দেন। নিশ্চয় এতে চিন্তাশীলদের জন্য নিদর্শনাবলী রয়েছে।” (সূরা আয-যুমার : আয়াত-৪২)
রূহ সম্পর্কে উপরে বলা হয়েছে, তাদেরকে উপরে উঠানো হয়, আটক রাখা হয় এবং ছেড়ে দেয়া হয়। রূহ বিভিন্ন স্থানে আসা-যাওয়া করতে পারে এবং তাদেরকে সমন্বিতও করা হয়। এই প্রসঙ্গে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, “রূহকে কবয করার পর রূহ যখন উপরের দিকে উঠতে থাকে, তখন মৃত ব্যক্তি তা দেখতে থাকে।” তিনি আরও বলেছেন, মালাকুল মউত রূহ কবয করেন, অতঃপর অন্যান্য ফেরেশতারা তাঁর হাত থেকে সেটাকে নিয়ে যান। সে রূহ নেককার বান্দাদের হলে, মেশকের চেয়েও বেশি সুগন্ধ বেরিয়ে আসে আর বদকার বান্দার রূহ হলে, পচা গলা লাশের চেয়েও বিশ্রী দুর্গন্ধ বেরিয়ে আসে। উল্লেখ্য যে, পরমূর্ত বা ছায়াতুল্য বস্তু থেকে কোনো গন্ধ বের হয় না, একে আটকেও রাখা যায় না। আর তাকে হস্তান্তরও করা যায় না। তাই রূহকে কোনো পরমূর্ত বস্তু হিসেবে গণ্য করা যায় না।
পবিত্র হাদীসে আরও বর্ণিত আছে যে, নেক রূহ যখন আসমানের দিকে উঠতে থাকে, তখন আসমান ও যমীনের সকল ফেরেশতা তার জন্য দু'আ করেন, তাঁর জন্য আসমানের দরজাগুলো খুলে দেয়া হয়। অতঃপর সে রূহ এক আসমান থেকে অন্য আসমানে উঠতে থাকে এবং শেষ পর্যন্ত ঐ আসমানে গিয়ে পৌঁছে যেখানে আল্লাহ তা'আলার আরশ রয়েছে। এরপর ঐ রূহকে আল্লাহর মহান দরবারে হাজির করা হয়। তখন আল্লাহ তা'আলা নির্দেশ দেন, এর নাম ইল্লিয়্যীন অথবা সিজ্জীনবাসীদের তালিকায় লিপিবদ্ধ করা হোক। অতঃপর মুমিনের রূহ সসম্মানে কবরে ফিরিয়ে দেয়া হয়, আর কাফিরের রূহ তাচ্ছিল্যের সাথে নিচের দিকে ছুঁড়ে দেয়া হয়। অতঃপর সেসব রূহকে মুনকার-নাকীরের প্রশ্নের উত্তর দেয়ার জন্যে তাদের দেহে প্রবেশ করানো হয়। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, "মুমিনের রূহ পাখির ন্যায় বেহেশতের গাছপালা থেকে ফল-ফলাদি খেতে থাকে, যতোক্ষণ না আল্লাহ তা'আলা সেই রূহকে তার দেহের মধ্যে ফিরিয়ে নেন।" হাদীসে আরও বলা হয়েছে যে, শহীদগণের রূহ সবুজ রঙের পাখিদের গলায় ঝুলন্ত থলেতে অবস্থান করে, এরা বেহেশতের নহরসমূহের ওপর দিয়ে উড়াউড়ি করে এবং বেহেশতের ফলফলাদি ভক্ষণ করে। আর বরযখী জীবনে রূহকে কিয়ামত পর্যন্ত শাস্তি অথবা শান্তি প্রদান করা হয়।
আল্লাহ তা'আলা ফিরাউনের কাওমের সম্পর্কে আমাদেরকে খবর দিয়েছেন, “তাদেরকে সকাল-সন্ধ্যায় আগুনের সামনে পেশ করা হয় এবং যেদিন কিয়ামত সংঘটিত হবে, সেদিন আদেশ করা হবে, ফিরাউনের কাওমকে কঠিনতর আযাবে দাখিল করো।” (সূরা আল মুমিন: আয়াত-৪৫-৪৬)
অপরপক্ষে, আল্লাহ তা'আলা আমাদেরকে শহীদদের সম্পর্কে সুসংবাদ দিয়েছেন যে, “যারা আল্লাহর পথে নিহত হয়েছে তাদেরকে কখনো মৃত মনে করো না, বরং তারা জীবিত এবং তাদের রবের নিকট থেকে তারা জীবিকা প্রাপ্ত। আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদেরকে যা দিয়েছেন তাতে তারা আনন্দিত এবং তাদের পিছনে যারা এখনও তাদের সাথে মিলিত হয়নি তাদের জন্য তারা আনন্দ প্রকাশ করে এজন্য যে, তাদের কোনো ভয় নেই, তারা দুঃখিত হবে না। আল্লাহর অবদান ও অনুগ্রহের জন্য তারা আনন্দ প্রকাশ করে এবং এটা এ কারণে যে, আল্লাহ মুমিনদের শ্রমফল নষ্ট করেন না।” (সূরা আলে ইমরান: আয়াত-১৬৯-১৭১)
উপরে বর্ণিত জীবনকাল বলতে রূহানী জীবনকেই বুঝায়, আর তাঁরা সেখানে সবসময় জীবিকা পাচ্ছেন। কারণ, তাঁদের দেহ তো কবেই বিনষ্ট হয়ে গেছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁদের জীবনের এক ব্যাখ্যা দিয়েছেন যে, তাঁদের রূহ সবুজ রঙের পাখির পক্ষপুটের মধ্যে থাকে। আর তাঁদের জন্য আরশের নিচে ঝাড়বাতি ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। তাঁরা বেহেশতের মধ্যে ঘোরাফেরা করেন, আর ঐসব প্রদীপে অবস্থান করেন। তখন তাঁদের রব তাঁদের দিকে লক্ষ্য করে জিজ্ঞেস করেন, তোমাদের আর কোনো কিছুর আকাঙ্ক্ষা আছে কি? তাঁরা উত্তরে বলেন, আমরা তো বেহেশতে যথা ইচ্ছা বিচরণ করছি, এরপর আমাদের আর কি চাওয়ার আছে? আল্লাহ তা'আলা এভাবে তাদেরকে তিনবার জিজ্ঞেস করবেন। শহীদগণের এসব রূহ যখন বুঝবে উত্তর না দিয়ে রক্ষা নেই, তখন তাঁরা বলবে, আমাদের দেহে আমাদের রূহকে ফিরিয়ে দিন, যাতে আমরা পুনরায় আপনার রাস্তায় যুদ্ধ করে শাহাদাত বরণ করতে পারি, এটাই আমাদের বাসনা।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে আরও বর্ণিত আছে যে, শহীদদের রূহ সবুজ পাখিদের মধ্যে অবস্থান করে এবং বেহেশতের ফলফলাদি ভক্ষণ করে। হযরত ইবনে আব্বাস (রা) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, উহুদের যুদ্ধে তোমাদের ভাইগণ শহীদ হলে আল্লাহ তা'আলা তাঁদের রূহ ঐ সমস্ত পাখিদের পক্ষপুটে রেখে দিলেন, যারা বেহেশতের নহরসমূহের ওপর দিয়ে উড়ে বেড়ায়, বেহেশতের ফলফলাদি ভক্ষণ করে আর আরশের ছায়ায় সোনার ঝাড়বাতিসমূহের মধ্যে অবস্থান করে। এরপর তাঁরা যখন নিজেদের উত্তম সুস্বাদু খাবার ও পানীয় এবং আরাম আয়েশের মনোরম মহলসমূহ দেখবেন তখন তাঁরা বলে উঠবেন, হায়! যদি আমাদের ভাইয়েরা জানতে পারতো এসব নি'আমতের কথা, যেগুলো আল্লাহ তা'আলা আমাদের জন্য তৈরি করে রেখেছেন তাহলে তারা জিহাদের প্রতি আরও বেশি উৎসাহিত হতো আর যুদ্ধ থেকে পিছপা হতো না। অবশ্য আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে বলে দিয়েছেন, "আমি তোমাদের খবর তোমাদের ভাইদের কাছে পৌঁছিয়ে দিচ্ছি।"
সুতরাং, আল্লাহ তা'আলা তাঁর রাসূলের প্রতি আয়াত নাযিল করলেন, "যারা আল্লাহর পথে নিহত হয়েছে তাদেরকে কখনো মৃত মনে করো না, বরং তারা জীবিত এবং তাদের রবের নিকট থেকে তারা জীবিকা প্রাপ্ত। আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদেরকে যা দিয়েছেন তাতে তারা আনন্দিত এবং তাদের পিছনে যারা এখনও তাদের সাথে মিলিত হয়নি তাদের জন্য তারা আনন্দ প্রকাশ করে এজন্য যে, তাদের কোনো ভয় নেই, তারা দুঃখিত হবে না। আল্লাহর অবদান ও অনুগ্রহের জন্য তারা আনন্দ প্রকাশ করে এবং এটা এ কারণে যে, আল্লাহ মুমিনদের শ্রমফল নষ্ট করেন না।” (সূরা আলে ইমরান: আয়াত-১৬৯-১৭১) ইমাম আহমদ (র)- এর বর্ণনা অনুযায়ী রূহের পানাহার, চলাফেরা ও পরস্পর কথাবার্তা বলা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হলো। যখন রূহের মধ্যে ঐসব বৈশিষ্ট্য নিহিত আছে, তখন দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর তা দেহের চেয়ে অধিকতর বৈশিষ্ট্যপূর্ণ হবে। দেহের মধ্যে অনেক সময় সাদৃশ্য পরিলক্ষিত হয়, কিন্তু রূহের মধ্যে কোনোই সাদৃশ্য বিদ্যমান নেই।
মহান আম্বিয়া, সাহাবায়ে কিরাম ও সম্মানিত ইমামগণের দেহ মুবারক স্বচক্ষে দেখার আমাদের সৌভাগ্য হয়নি, অথচ তাঁরা আমাদের চেতনার মধ্যে অনন্য বৈশিষ্ট্যে সমুজ্জ্বল। এই অনুপম বৈশিষ্ট্য শুধুমাত্র দেহের ফলশ্রুতিতে নয়, এটা হচ্ছে তাঁদের রূহানী গুণাবলীর সুফল। গুণের দিক দিয়ে দেহের চেয়ে রূহের বৈশিষ্ট্য অধিক। একজন মুমিন ও একজন কাফিরের দেহ অনেক ব্যাপারেই সামঞ্জস্যপূর্ণ, কিন্তু তাদের রূহের মধ্যে বিরাট পার্থক্য ও স্বাতন্ত্র্য বিদ্যমান। দু'সহোদর ভাইয়ের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের মধ্যে যথেষ্ট সাদৃশ্য দেখা গেলেও তাদের রূহের মধ্যে অধিক পার্থক্য পরিদৃষ্ট হয়। যখন এই দুটি রূহ তাদের দেহ থেকে পৃথক হয়ে যায়, তখন এদের উভয়ের পারস্পরিক পার্থক্য ও স্বাতন্ত্র্য প্রকাশ পায়। দেহ ও রূহের অবস্থার ওপর লক্ষ্য করলে তা স্বাভাবিকভাবে প্রত্যক্ষ করা যায়। কুৎসিত আকৃতির দেহ তারই সামঞ্জস্যপূর্ণ আকৃতির রূহের বাহক হয়ে থাকে। যদি দেহের মধ্যে কোনো বিপদাপদ দেখা দেয়, তাহলে তারই অনুকূল বিপদাপদ রূহের মধ্যেও দেখা দেয়। এই কারণেই দূরদৃষ্টিসম্পন্ন ব্যক্তিরা দেহের আকৃতি ও অবস্থাদৃষ্টে রূহের অবস্থা জেনে নেন। এ সম্পর্কীয় অনেক বিস্ময়কর ঘটনাবলী ইমাম শাফেয়ী (র) থেকে বর্ণিত আছে। উল্লেখ্য যে, সাধারণত মোহনীয় ও সুন্দর আকৃতির দেহের সাথে যে রূহ সংশ্লিষ্ট আছে, সেই রূহও সুন্দর, সুশ্রী ও পূতপবিত্র হয়ে থাকে। শর্ত এই যে, সেই দেহ ও রূহের মধ্যে যেন কোনো গরমিল না থাকে। যখন কোনো উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন রূহ ও নিম্নপর্যায়ের রূহ দেহ ছাড়াই পৃথক বৈশিষ্ট্যের অধিকারী হয় তখন দেহধারী রূহ পৃথক বৈশিষ্ট্যের অধিক দাবীদার বটে।
এই প্রসঙ্গে উল্লেখ্য যে, ফেরেশতারা দেহধারী না হওয়া সত্ত্বেও একে অপর থেকে পৃথক বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। জিনেরাও একে অপর থেকে ভিন্ন বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন। তাহলে মানুষের রূহ পৃথক বৈশিষ্ট্যের অধিকারী হবে না কেন? বরং পৃথক বৈশিষ্ট্যের অধিকারী হওয়াটা খুবই স্বাভাবিক।