📄 রূহের মৃত্যু হয়, না কেবল দেহের মৃত্যু হয়
এ বিষয়ে মত পার্থক্য রয়েছে। কারো কারো মতে রূহ মৃত্যুবরণ করে। কেননা, রূহও একটি প্রাণী এবং প্রাণী মাত্রই মরণশীল। যাঁরা রূহকে মরণশীল মনে করেন—তাঁদের কাছে এই সম্পর্কে অনেক প্রমাণ বিদ্যমান আছে। তাঁরা বলেন, আল্লাহর সত্তা ছাড়া আর কোনো কিছুই চিরঞ্জীব নয়। আল্লাহ তা'আলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন, "ভূপৃষ্ঠে যা কিছু আছে সবই নশ্বর, স্থায়ী হচ্ছে কেবল আপনার রবের সত্তা, যিনি মহিমাময়, মহানুভব।" (সূরা আর রাহমান: আয়াত ২৬-২৭)
পবিত্র কুরআনে আরো উল্লেখ আছে, "তিনি ব্যতীত অন্য কোনো মা'বুদ নেই। আল্লাহর সত্তা ব্যতীত সব কিছুই ধ্বংসশীল।" (সূরা কাসাস: আয়াত ৮৮)
তাঁরা বলেন, যখন ফেরেশতাগণও মরণশীল, তখন মানবাত্মার মৃত্যু হওয়া খুবই স্বাভাবিক। তাঁরা আরো বলেন, আল্লাহ তা'আলা পবিত্র কুরআনে জাহান্নামীদের যে উক্তি উল্লেখ করেছেন তা হলো, "হে আমাদের রব! তুমি আমাদেরকে দু'বার মৃত্যুদান করেছো, আর দু'বার জীবন দান করেছো। আমরা আমাদের অপরাধ স্বীকার করছি, এখন মুক্তির কোনো পথ আছে কি?" (সূরা আল মুমিন: আয়াত- ১১)
উক্ত দু'রকমের মৃত্যুর মধ্যে প্রথমবার মৃত্যু হলো দেহের, আর দ্বিতীয়বার মৃত্যু হলো রূহের।
আবার কারো মতে রূহের কোনো মৃত্যু নেই। কেননা, রূহকে জীবিত থাকার জন্যই সৃষ্টি করা হয়েছে। সুতরাং দেহেরই কেবল মৃত্যু হয়। পবিত্র হাদীস দ্বারা প্রমাণিত আছে যে, রূহ দেহ থেকে পৃথক হওয়ার পর পুনরায় দেহে ফিরে না আসা পর্যন্ত শান্তি বা শাস্তি ভোগ করতে থাকে। কাজেই রূহ যদি মরেই যায় তাহলে শান্তি বা শাস্তি ভোগ করার অবকাশ কোথায়?
আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন, "যারা আল্লাহর পথে নিহত হয়েছে তাদেরকে কখনো মৃত মনে করো না, বরং তারা জীবিত এবং তাদের রবের নিকট থেকে তারা জীবিকাপ্রাপ্ত। আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদেরকে যা দিয়েছেন তাতে তারা আনন্দিত এবং তাদের পেছনে যারা এখনও তাদের সাথে মিলিত হয়নি তাদের জন্য তারা আনন্দ প্রকাশ করে এজন্য যে, তাদের কোনো ভয় নেই, তারা দুঃখিত হবে না। আল্লাহর অবদান ও অনুগ্রহের জন্য তারা আনন্দ প্রকাশ করে এবং এটা এ কারণে যে, আল্লাহ মুমিনদের শ্রমফল নষ্ট করেন না।" (সূরা আলে ইমরান: আয়াত-১৬৯-১৭১)
উপরোক্ত মত পার্থক্য প্রসঙ্গে উল্লেখ্য যে, যদি রূহের মৃত্যু বলতে দেহ থেকে তাদের পৃথক হওয়াকে বুঝায় তাহলে অবশ্যই রূহ মৃত্যুবরণ করে। আর যদি এর অর্থ এই হয় যে, এরাও দেহের মতো সব সময়ের জন্য হারিয়ে যায়, তাহলে নিঃসন্দেহে রূহ মৃত্যুবরণ করে না। বরং জন্মের পর থেকে চিরকাল বিদ্যমান থাকে, শান্তির মধ্যে থাকুক বা অশান্তির মধ্যে থাকুক। স্পষ্ট দলীল দ্বারা জানা যায় যে, রূহ আলমে বরযখে শান্তি বা শাস্তি ভোগ করতে থাকে, যতোক্ষণ পর্যন্ত না আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে হাশরের দিন পুনরায় দেহের মধ্যে ফিরিয়ে দেবেন।
আহমদ ইবনে কুনদী (র) এই মত পার্থক্যকে একটি কবিতার মাধ্যমে অতি সুন্দরভাবে ব্যক্ত করেছেন। এর মর্মার্থ হলো, "মানুষের মধ্যে এতো বেশি মত পার্থক্য রয়েছে যে, মৃত্যু ছাড়া আর কিছুতেই তাদের কোনো মতৈক্য হয় না, এমনকি মৃত্যুর মধ্যেও তাদের মতবিরোধ থেকে যায়। কেউ কেউ বলেন, মানুষের রূহ অক্ষয় হয়ে থাকবে, আবার কেউ কেউ বলেন, রূহেরও মৃত্যু হবে।"
আল্লাহ তা'আলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন, "এবং শিঙ্গায় ফুঁ দেয়া হবে, ফলে আকাশ ও যমীনের বাসিন্দারা সব বেহুঁশ হয়ে যাবে, তারা ব্যতীত যাদেরকে আল্লাহ হিফাযত করার ইচ্ছা করবেন। অতঃপর আবার শিঙ্গায় ফুঁ দেয়া হবে, তৎক্ষণাৎ তারা দাঁড়িয়ে তাকিয়ে থাকবে।" (সূরা আয যুমার: আয়াত-৬৮)
কারো কারো মতে যাঁদের মৃত্যু নেই তাঁরা হচ্ছেন মহান শহীদগণ। হযরত আবু হুরাইরা (রা), হযরত ইবনে আব্বাস (রা) ও হযরত সায়ীদ ইবনে যুবায়ের (রা) প্রমুখ এই অভিমত পোষণ করতেন। কারো কারো মতে তাঁরা হচ্ছেন বেহেশতের আয়ত-নয়না হুর, সিজ্জীনে শাস্তি ভোগকারী লোক সকল এবং জাহান্নামের প্রহরীগণ। হযরত আবূ ইসহাক (র) প্রমুখ শেষোক্ত অভিমতটি পোষণ করতেন।
ইমাম আহমদ (র) থেকে বর্ণিত আছে যে, যখন শিঙ্গায় ফুঁ দেয়া হবে তখন হুর ও গেলমান মরবে না। কেননা আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেছেন, "প্রথম মৃত্যুর পর তারা আর মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে না। আপনার প্রতিপালক তাদেরকে জাহান্নামের শাস্তি থেকে রক্ষা করবেন।" (সূরা দুখান: আয়াত-৫৬)
এর দ্বারা স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে যে, হুর গেলমান মাত্র একবারই মৃত্যুবরণ করবে। তারা যদি আবার মৃত্যুবরণ করে, তাহলে তাদের দু'বার মৃত্যু অনিবার্য হয়ে পড়ে।
এখন আসছে জাহান্নামীদের কথা। তারা বলবে, "হে রব তুমি আমাদেরকে দু'বার মৃত্যু দান করেছো আর দু'বার জীবন দান করেছো। আমরা আমাদের অপরাধ স্বীকার করছি, এখন মুক্তির কোনো পথ আছে কি? (সূরা আল মুমিন: আয়াত-১১)
এর ব্যাখ্যা সূরা বাকারায় উল্লেখ রয়েছে, "তোমরা আল্লাহকে কিভাবে অস্বীকার করো? অথচ তোমরা ছিলে প্রাণহীন, তারপর তোমাদেরকে আল্লাহ জীবন দান করেছেন, আবার তিনি তোমাদেরকে মৃত্যু দান করবেন এবং পুনরায় জীবন দান করবেন, পরিণামে তোমরা তাঁর দিকেই ফিরে যাবে।" (সূরা আল-বাকারা: আয়াত-২৮)
অর্থাৎ তারা তাদের পিতার পৃষ্ঠদেশে ও মায়ের গর্ভে শুক্রের আকারে অস্তিত্বহীন ছিলো। এরপর আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে জীবন দান করলেন। তারপর মৃত্যু দান করে পুনরায় কিয়ামতের দিন নবজীবন দান করবেন। এই আয়াতের দ্বারা কিয়ামতের পূর্বে শিঙ্গার ফুঁ এর দ্বারা রূহকে মৃত্যু দান করা বুঝায় না। অন্যথায় তিনবার মৃত্যুর সমস্যা দেখা দেবে। শিঙ্গায় ফুঁ এর কালে রূহের চৈতন্য হারিয়ে ফেলার অর্থ মৃত্যু নয়, বরং বেহুঁশ হওয়া।
একটি সহীহ হাদীসে আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, "কিয়ামতের দিন সব মানুষ বেহুঁশ হয়ে যাবে। অতঃপর সর্বপ্রথম আমার হুঁশ আসবে, তখন আমি হযরত মূসা (আ)-কে আরশের পায়া ধরা অবস্থায় দেখতে পাবো। জানি না, তিনি আমার আগে চৈতন্য ফিরে পাবেন, না তুর পাহাড়ে বেহুঁশীর বিনিময়ে তিনি এখানে বেহুঁশই হবেন না।"
হাশরের ময়দানে এভাবে মানুষ চেতনা ফিরে পাবার পর যখন আল্লাহ তা'আলা বিচারের জন্য আবির্ভূত হবেন এবং তাঁর নূরের তাজাল্লিতে হাশরের ময়দান ঝলমল করে উঠবে, তখন আবার সবাই চৈতন্য হারিয়ে ফেলবে। তাই আল্লাহ তা'আলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন, "তাদেরকে উপেক্ষা করে চলো সেই দিন পর্যন্ত যেদিন তাদের উপর বজ্রাঘাত পড়বে" (সূরা আতূর: আয়াত-৪৫)। কাজেই এই বেহুঁশী বলতে যদি মৃত্যুকে বুঝায়, তাহলে পুনরায় মৃত্যুবরণ জরুরী হয়ে পড়ে আর এর দ্বারা দু'বার মৃত্যু হওয়া বুঝায়।
উক্ত বিষয়টির প্রতি কোনো কোনো বিজ্ঞ আলিমের দৃষ্টি আকৃষ্ট হয়েছে। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন, হযরত আবূ আবদুল্লাহ কুরতুবী (র)। তাঁর মতে, এই হাদীসে চৈতন্য হারানোর বাহ্যিক অর্থ হলো বেহুঁশ বা অজ্ঞান হয়ে যাওয়া, মৃত্যু নয়। শাইখ আহমদ ইবনে আমর (র) বলেন, দ্বিতীয়বার শিঙ্গায় ফুঁ এর পর লোকেরা বেহুঁশ হয়ে যাবে এটাই এর বাহ্যিক অর্থ। এ সম্পর্কে কোনো কোনো আলিম বলেছেন, নবীদের মধ্যে সম্ভবত হযরত মূসা (আ)-এর মৃত্যুই হয়নি, কিন্তু এটা ভুল ধারণা। কাযী আয়ায (র)-এর মতে, এই চৈতন্য হারানোর অর্থ কবর থেকে উঠার পর কিয়ামতের মাঠে দাঁড়ানোর ভয়-ভীতিজনিত চেতনাহীনতা, যেহেতু তখন আসমান ও যমীন বিদীর্ণ হতে থাকবে। কিন্তু হযরত কুরতুবী (র) বলেন, কাযী আয়ায (র)-এর এই উক্তি ভ্রান্ত। কেননা হাদীসের দ্বারা একথা প্রমাণিত হয়েছে যে, যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পবিত্র রওযা থেকে বের হবেন, তখন তিনি হযরত মূসা (আ)-কে আরশের পায়া ধরা অবস্থায় দেখতে পাবেন। আর শিঙ্গায় ভয়ঙ্কর আওয়াযে এই ভীষণ অবস্থার সৃষ্টি হবে। হযরত আবূ আবদুল্লাহ (র) কর্তৃক বর্ণিত আছে, শাইখ আহমদ ইবনে আমর (র) বলেছেন, মৃত্যুই মানুষের শেষ অবস্থা নয়, বরং স্থান পরিবর্তন মাত্র।
উপরোক্ত বক্তব্য মেনে নিলে ইনশাআল্লাহ এরূপ জটিলতার অবসান ঘটবে। প্রমাণ হিসেবে উল্লেখ করা যায় যে, হত্যাজনিত মৃত্যুর পরও শহীদগণ জীবিত থাকেন, পানাহার করেন, আল্লাহর নি'আমতসমূহ উপভোগ করেন, দুনিয়াবাসী আত্মীয়-স্বজনের জন্যও সন্তোষ প্রকাশ করেন। সুতরাং বরযখে অবস্থানকারী শহীদগণের অবস্থাই যখন এমন, তাহলে নবীগণের তো কোনো প্রশ্নই উঠে না। এছাড়া, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত আছে, তিনি ইরশাদ করেছেন, "নবীদের দেহ মুবারক বিনষ্ট করা মাটির জন্য হারাম করে দেয়া হয়েছে।" রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে এটা প্রমাণিত আছে যে, তিনি শবে মি'রাজের সময় বাইতুল মুকাদ্দাসে আম্বিয়ায়ে কিরামের এক সমাবেশে যোগদান করেছিলেন এবং আসমানেও নবীদের সাথে বিশেষ করে হযরত মূসা (আ)-এর সাথে মিলিত হয়েছিলেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে আরো বর্ণিত আছে যে, কোনো মুসলমান যখন আমাকে আমার ওফাত শরীফের পর সালাম করে তখন তার সালামের উত্তর দেয়ার জন্য আল্লাহ তা'আলা আমার রূহকে আমার মধ্যে ফিরিয়ে দেন। এই সব বর্ণনা মতে এটা অকাট্যভাবে প্রমাণিত হয় যে, আম্বিয়ায়ে কিরাম বরযখী জীবনে জীবিত আছেন। এই অবস্থায় যখন হযরত ইসরাফীল (আ) কর্তৃক শিঙ্গায় ফুঁ দেয়া হবে তখন আসমান যমীনের সবাই বেহুঁশ হয়ে যাবে, কেবল তারা ছাড়া যাদেরকে আল্লাহ পূর্বের অবস্থায় স্থির রাখবেন। কাজেই নবীগণ ছাড়া অন্যদের বেহুঁশীর অর্থ হবে মৃত্যু, আর নবীগণ হবেন শুধু বেহুঁশ। তারপর যখন মৃত্যুর পরবর্তী জীবনের জন্য শিঙ্গায় ফুঁ দেয়া হবে, তখন মৃতেরা জীবিত হয়ে উঠবে, আর আম্বিয়াদের হুঁশ ফিরে আসবে। এ কারণেই নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি সহীহ হাদীসে উল্লেখ করেছেন, "সবার আগে আমার চৈতন্য ফিরে আসবে, কাজেই হযরত মূসা (আ) ছাড়া অন্য সবার আগে মহানবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজ কবর থেকে বের হয়ে আসবেন।" হযরত মূসা (আ) সম্পর্কে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দ্বিধা-দ্বন্দ্ব থাকবে এই কারণে যে, এটা মূসা (আ)-এর এক বিরাট ফযীলত। কিন্তু এরূপ কোনো একটি ফযীলতের ঘটনার দ্বারা আমাদের মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চেয়ে তাঁর ফযীলত যে অধিক এটা প্রমাণিত হয় না। কেননা কারো আংশিক ফযীলতের কোনো একটি ঘটনা দ্বারা তাঁর সামগ্রিক মর্যাদা ও ফযীলতের কোনো বিষয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় না।
আল্লামা কুরতুবী (র)-এর অভিমত এই যে, যদি এই হাদীসটির দ্বারা ময়দানে হাশরে মৃত্যুকে বেহুঁশী অর্থে ধরা হয়, তাহলে এ সম্পর্কে জটিলতার সৃষ্টি হয় না। তবে এর দ্বারা যদি শিঙ্গার ফুঁজনিত মৃত্যু বুঝায়, তাহলে কিয়ামতের অর্থ এখানে কিয়ামতের আলামত হিসেবে গণ্য করা হবে। তবে হযরত ইসরাফীল (আ)-এর শিঙ্গায় ফুঁ-এর মাধ্যমেই কিয়ামতের সূচনা হবে। তাহলে এই হাদীসটির অর্থ হবে এই যে, মৃত্যুর পরে আবার জীবিত হওয়ার জন্য যখন শিঙ্গায় ফুঁ দেয়া হবে, তখন সবার আগে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর পবিত্র শির উঠাবেন। অর্থাৎ রওযা শরীফ থেকে তিনি বের হবেন। আর সে সময় তিনি মূসা (আ)-কে আরশের পায়া ধরা অবস্থায় দেখতে পাবেন। তিনি আরো ইরশাদ করেন, "আমি জানি না, তিনি আমার পূর্বে চেতনা ফিরে পাবেন, না কূহে তুরে চেতনা হারানোর ফলে তাঁকে এখানে এ মর্যাদা দেয়া হবে।" আল্লামা কুরতুবী (র) আরো বলেন, হযরত মূসা (আ) বেহুঁশ হবেন কি হবেন না, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এ ব্যাপারে দ্বিধা-দ্বন্দ্ব রয়েছে। তিনি এও বলেছেন, "সবার আগে আমার হুঁশ ফিরে আসবে।" এখানে যদি হাদীসের দ্বারা মৃত্যুর বেহুঁশী বুঝাতো, তাহলে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের স্বীয় মৃত্যু সম্পর্কে বিশ্বাস এবং হযরত মূসা (আ)-এর মৃত্যু সম্পর্কে দ্বিধা-দ্বন্দ্ব হতো। কিন্তু এরূপ ধারণা বহু দলীলের মাধ্যমে ভ্রান্ত বলে প্রমাণিত হয়েছে। তাই জানা গেলো যে, এখানে বেহুঁশী অর্থ মৃত্যু নয়, বরং নিছক সম্বিত হারানো মাত্র। উক্ত বর্ণনা থেকে জানা যায় যে, মৃত্যুজনিত শিঙ্গায় ফুঁয়ে রূহ মরে যাবে। তবে এটা অবশ্য বুঝা যায় যে, সমস্ত জীবিত মাখলুকই মরে যাবে। কিন্তু যাঁরা ইতিমধ্যে মারা গিয়েছেন কিংবা যাঁদের মৃত্যু নেই, হাদীসের দ্বারা এটা প্রমাণিত হয় না যে, তারা পুনর্বার মৃত্যুবরণ করবে না।
এটা যদি বলা হয়, হাদীসের এসব শব্দের কি অর্থ হবে যেখানে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, "কিয়ামতের দিন মানুষ বেহুঁশ হয়ে যাবে, তারপর সর্বপ্রথম মাটি ফেটে যাবে। এরপর আমি মূসা (আ)-কে আরশের পায়া জড়িয়ে থাকা অবস্থায় দেখতে পাবো, জানি না, মূসা (আ) আমার পূর্বে চেতনা ফিরে পাবেন, না তিনি ঐ সমস্ত ব্যক্তিদের অন্যতম যাদেরকে আল্লাহ তা'আলা এ থেকে অব্যাহতি দিয়েছেন।" এটা সুস্পষ্ট যে, যাঁরা অব্যাহতি পাবেন, তাঁরা তা পাবে মৃত্যুজনিত বেহুঁশী থেকে, কিয়ামতের দিনের বেহুঁশী থেকে নয়। এখানে মৃত্যুজনিত বেহুঁশীই উক্ত বর্ণনা দ্বারা প্রমাণিত হলো। এই প্রসঙ্গে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেছেন, "আর সেদিন শিঙ্গায় ফুঁ দেয়া হবে যার ফলে আসমান ও যমীনের সবাই বেহুঁশ হয়ে যাবে, তাঁরা ব্যতীত, যাঁদেরকে আল্লাহ তা'আলা হিফাযত করতে ইচ্ছা করবেন। অতঃপর আবার শিঙ্গায় ফুঁ দেয়া হবে। তৎক্ষণাৎ তাঁরা দণ্ডায়মান হয়ে তাকাতে থাকবেন। রাব্বুল আলামীনের নূরে হাশরের ময়দান আলোকিত হবে, আমলনামা পেশ করা হবে এবং নবীগণকে ও সাক্ষীগণকে হাযির করা হবে এবং সবার মধ্যে সুবিচার প্রতিষ্ঠা করা হবে এবং কারো প্রতি যুলুম করা হবে না। প্রত্যেককে তার কৃতকর্মের পূর্ণ প্রতিদান দেয়া হবে। তারা যা কিছু করে সে সম্পর্কে আল্লাহ বিশেষভাবে অবহিত।" (সূরা আয-যুমার: আয়াত-৬৮-৭০)
কোনো কোনো হাদীসের দ্বারা হাশরের ময়দানে কে আগে চৈতন্য ফিরে পাবেন, এ সম্পর্কে কিছু জটিলতার সৃষ্টি হয়েছে। তবে প্রকৃত ব্যাপার হলো, হাদীস বর্ণনাকারী তাঁর বিস্মৃতিজনিত কারণে দু'টি হাদীসের বাক্য একত্রিত করে ফেলেছেন। হাদীসগুলো নিম্নে বর্ণিত হলো:
এক- রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, "কিয়ামতের দিন সকল মানুষ বেহুঁশ হয়ে যাবে, সবার আগে আমার হুঁশ আসবে।"
দুই- আমি প্রথম ব্যক্তি যাঁর জন্য কিয়ামতের দিন মাটি ফেটে যাবে। এছাড়া হযরত আবূ সাঈদ খুদরী (রা) কর্তৃক বর্ণিত আরেকটি হাদীস তিরমিযী শরীফে বর্ণিত আছে—নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, "আমি কিয়ামতের দিন সমস্ত মানুষের সর্দার হবো, এজন্য আমার গর্ব নেই। আর আমার হাতে 'হামদ' নামক ঝাণ্ডা শোভা পাবে, এজন্যও আমার কোনো গর্ব নেই। আর ঐ দিন সকল নবী আমার ঝাণ্ডার নিচে অবস্থান করবেন। আমি হবো প্রথম ব্যক্তি যাঁর উপর থেকে মাটি ফেটে যাবে, সেজন্যও আমার কোনো গর্ব নেই।" সুতরাং হাদীস বর্ণনাকারী যে উভয় হাদীসকে একত্রিত করে বর্ণনা করেছেন, এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।
উপরোক্ত হাদীসের অর্থ আমরা কিভাবে গ্রহণ করবো? হযরত মূসা (আ), নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আগে হুঁশে আসবেন, নাকি তিনি ওদের মধ্যে হবেন যাঁদেরকে আল্লাহ বেহুঁশী থেকে ব্যতিক্রম রেখেছেন, ইসরাফীল (আ)-এর ফুঁজনিত বেহুঁশী থেকে তিনি ব্যতিক্রম হবেন, ময়দানে হাশরের বেহুঁশী থেকে নয়। যেমন, আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেছেন, "আর শিঙ্গায় ফুঁ দেয়া হবে, এতে আসমান ও যমীনের অধিবাসীরা বেহুঁশ হয়ে যাবে, কিন্তু তারাই রক্ষা পাবে যাদেরকে আল্লাহ রক্ষা করতে চান।" এর উত্তর হলো, হাদীসের শব্দগুলো সঠিকভাবে সংরক্ষিত নয়, তা কোনো বর্ণনাকারীর কল্পনাপ্রসূত মাত্র। যে শব্দগুলো সহীহ রেওয়ায়েতের উপর প্রতিষ্ঠিত ঐগুলোই সংরক্ষিত। আর তা হলো, "এটা জানা নেই, হযরত মূসা (আ) আমার আগে হুঁশে আসবেন, নাকি তূর পর্বতের বেহুঁশীর পরিবর্তে তিনি আর বেহুঁশই হবেন না।" কিন্তু কোনো কোনো বর্ণনাকারী মনে করেন যে, এখানে ইসরাফীল (আ)-এর ফুঁজনিত বেহুঁশীকেই বুঝানো হয়েছে। আর হযরত মূসা (আ)-এর মধ্যে শামিল আছেন যদিও তিনি বেহুঁশ হননি। তবে এ রকম অর্থ হাদীসের ধারাবাহিকতার সরাসরি বিরোধী। কারণ, হুঁশ বলতে মৃত্যুর পরবর্তী জীবনের হুঁশে আসাকেই বুঝায়। সেক্ষেত্রে রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এ বাণী—"জানা যায় না তাঁর আগে মূসা (আ) হুঁশে আসবেন, নাকি কূহে তূরের বেহুঁশীর পরিবর্তে তিনি এ সময় আর বেহুঁশই হবেন না" ভ্রান্ত হয়ে যায়। এটা একটি বিশেষ চিন্তা-ভাবনার বিষয় বটে। তাই চিন্তা-ভাবনা করেই কোনো সিদ্ধান্তে আসা উচিত। এছাড়া, এখানে আলোচিত বিষয়টি সুষ্ঠু ও সঠিকভাবে উপলব্ধি করাও প্রয়োজন।