📄 জীবিত ও মৃত ব্যক্তিদের রূহ পরস্পর সাক্ষাৎ করে কিনা
একজন জীবিত ব্যক্তি ও একজন মৃত ব্যক্তির রূহ যে পরস্পর সাক্ষাৎ করে এর বহু প্রমাণ রয়েছে। অনুভূতি ও সত্য ঘটনাবলীর মাধ্যমে তা জানা যায়। জীবিত ব্যক্তি ও মৃত ব্যক্তির রূহ এমনিভাবে মিলিত হয় যেমনি জীবিত ব্যক্তিরা পরস্পর মিলিত হন। আল্লাহ তা'আলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন, "মৃত্যুর সময় আল্লাহ রূহ কবয করেন এবং যারা জীবিত তাদের রূহও কবয করেন যখন তারা নিদ্রিত থাকে। অতঃপর যার জন্য মৃত্যু অবধারিত তিনি তার রূহ আটকে রাখেন এবং অন্যদের রূহ এক নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ফিরিয়ে দেন। এতে নিদর্শন রয়েছে চিন্তাশীল সম্প্রদায়ের জন্য।" (সূরা আয-যুমার: আয়াত ৪২)
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা)-এর অভিমত অনুযায়ী, একজন জীবিত ব্যক্তি নিদ্রিত অবস্থায়ও মৃত ব্যক্তিদের রূহের সাথে সময় সময় মিলিত হয়ে থাকে এবং কথাবার্তাও বলে। আর একজন জীবিত ব্যক্তির যদি নিদ্রিত অবস্থায় মৃত্যু না হয়, তাহলে তার রূহ দেহে ফিরে আসে। নিদ্রার মধ্যে যাঁরা মৃত্যুবরণ করেন তাঁদের রূহ আর দেহের মধ্যে ফিরে আসে না।
হযরত আসবাত (র), হযরত সুদ্দী (র) থেকে উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে বর্ণনা করেছেন, "আল্লাহ তা'আলা যারা মরেনি তাদের রূহও কবয করেন।” তিনি বলেন, আল্লাহ তা'আলা নিদ্রার মধ্যেও রূহকে কবয করেন। জীবিত ও মৃতদের রূহ একে অপরের সাথে সাক্ষাৎ করে, তারা পরস্পর আলাপ-আলোচনা করে ও একে অন্যকে চিনতে পারে। তারপর জীবিতদের রূহকে তাদের দেহে ফিরিয়ে দেয়া হয়। তবে কোনো কোনো মৃত ব্যক্তির রূহ যখন তাদের দেহের দিকে ফিরে যেতে চায়, তখন তাদেরকে আটকে রাখা হয়।
উপরোক্ত আয়াতের প্রথম ব্যাখ্যা হলো, যিনি মারা গেছেন তাঁর রূহকে আটকে রাখা হয়। আর যিনি জীবিত এবং যাঁর রূহ নিদ্রার সময় দেহ থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল, সে রূহ দেহে ফিরে আসে।
এই আয়াতের দ্বিতীয় ব্যাখ্যা হলো, আটককৃত রূহ ও মুক্ত রূহ, উভয় রূহই জীবিতদের। এসব রূহকে নিদ্রাবস্থায় কবয করা হয়। অতঃপর এদের মধ্যে যার জীবনকাল পূর্ণ হয়ে গেছে, সেই রূহকে আটকে রাখা হয় এবং কিয়ামতের আগে সেই রূহকে তার দেহের মধ্যে ফিরে যেতে দেয়া হবে না। আর যার জীবনকাল শেষ হয়নি, তার রূহকে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য তার দেহে ফিরিয়ে দেওয়া হয়।
শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়াহ্ (র) এই ব্যাখ্যা গ্রহণ করেছেন। তবে তিনি আরো দাবি করেছেন যে, তাঁর এই অভিমত কুরআন ও হাদীস দ্বারা সমর্থিত। যে রূহকে আল্লাহ তা'আলা নিদ্রাজনিত কারণে মৃত্যু দান করেছেন, তাদের মধ্য থেকে যেসব জীবিত ব্যক্তির রূহকে মৃত্যুর সময় কবয করা হয়, তাদেরকে ছেড়ে দেয়া হয় না এবং যাদেরকে আটকিয়ে রাখা হয় না, সেসব রূহ তাদের নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছে যায়।
কিন্তু এখানে রূহ সম্পর্কে প্রথম ব্যাখ্যাই সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য। কেননা আল্লাহ তা'আলা এখানে দু'টি মৃত্যুর কথা বলেছেন—একটি বড় ধরনের মৃত্যু এবং অপরটি ছোট ধরনের মৃত্যু অর্থাৎ নিদ্রা। আর রূহ দু'প্রকারের বলে উল্লেখ করেছেন। এক প্রকার রূহ হলো ঐ রূহ যাদের ওপর মৃত্যুর হুকুম বর্তিয়েছে। এসব রূহকে তো আল্লাহ তা'আলা নিজের নিকট রেখে মৃত্যুদান করেছেন। আর দ্বিতীয় প্রকার রূহ হলো, ঐ সমস্ত রূহ যাদের নির্ধারিত মৃত্যুর মেয়াদ এখনো পূর্ণ হয়নি। এসব রূহকে আল্লাহ তা'আলা তাদের বয়স পূর্তির জন্য এদের দেহে ফিরিয়ে দেন। আর উপরোক্ত দু'টি মৃত্যুর জন্য দু'টি হুকুম উল্লেখ করেছেন অর্থাৎ আটকে রাখা ও ছেড়ে দেয়া রূহ।
আরো বলা হয়েছে, জীবিত রূহ হলো ঐসব রূহ যেসব রূহকে নিদ্রাজনিত মৃত্যু দান করা হয়েছে। এখন নিদ্রাজনিত মৃত্যু যদি দু'প্রকারের হয়, যথা—মৃত্যু ও নিদ্রা, তাহলে আল্লাহ তা'আলার বাণী, "যে নিদ্রার মধ্যে মরেনি” বলার প্রয়োজন হতো না। কেননা তার রূহ কবযের সময়েই মৃত্যুবরণ করে, অথচ আল্লাহ পাক বলেছেন, সে মরেনি। তাহলে যার জন্য মৃত্যু অবধারিত করেছেন, তিনি তার রূহকে আটক রেখে দেন, বলাটা কী করে ঠিক হতো? উত্তরে বলা যায়, নিদ্রাজনিত মৃত্যুর পর আল্লাহ আসল মৃত্যুর ফয়সালা করেছেন। মোটকথা হলো, ওফাতের আয়াতে উভয় প্রকার মৃত্যুই যুক্ত রয়েছে। এর মধ্যে দু'ধরনের মৃত্যুর বর্ণনা রয়েছে—একটি হলো মৃত্যুজনিত মৃত্যু ও অপরটি হলো নিদ্রাজনিত মৃত্যু। এছাড়া মৃত্যুজনিত রূহকে আটক রাখার ও দ্বিতীয় প্রকার রূহকে ছেড়ে দেয়ার উল্লেখ আছে। এ কথা সুস্পষ্ট যে, প্রত্যেক মৃত্যুবরণকারী ব্যক্তির রূহকে আটক করা হয়, সে নিদ্রাবস্থায় মারা যাক বা জাগ্রত অবস্থায় মারা যাক।
জীবিত ও মৃতদের রূহের মিলিত হওয়ার এটিও একটি প্রমাণ যে, জীবিত বুযুর্গ ব্যক্তিরা স্বপ্নে মৃতদের দর্শন লাভ করেন এবং এদের কাছ থেকে তাদের পরিস্থিতি জেনে নেন। আর মৃতরা এমন অজ্ঞাত তথ্যের সংবাদ দেন যেগুলো অতীতে সংঘটিত ঘটনাবলীও হয়ে থাকে। কোনো কোনো সময় মৃত ব্যক্তি মাটিতে পুঁতে রাখা সঞ্চিত ধন-সম্পদের সংবাদও দিয়ে থাকেন, যে সম্পর্কে তিনি ছাড়া অন্য আর কেউ জানত না। কোনো কোনো সময়ে তাঁরা একজনের কাছে অন্যজনের ঋণের কথাও বলে দেন। এমনকি ঐ ঋণের সাক্ষ্য প্রমাণও উল্লেখ করেন। এছাড়া কখনো কখনো দুনিয়ার কর্মকাণ্ড সম্পর্কেও খবর দিয়ে থাকেন, যা তিনি ছাড়া দুনিয়াতে আর অন্য কেউ অবগত নয়। সেই মৃত ব্যক্তি কখনো কখনো বলে থাকেন, তুমি অমুক সময়ে আমার নিকট আসবে, এই সংবাদটাও সত্যে পরিণত হয়ে যায়। কোনো কোনো সময়ে তিনি এমন সব তথ্যও বলে দেন, যেগুলো সম্পর্কে জীবিতদের দৃঢ় বিশ্বাস—এগুলো তিনি ছাড়া অন্য আর কেউ জানত না। এসব ঘটনার সাথে জড়িত হযরত সাআব, হযরত আউফ, হযরত সাবিত ইবনে কায়স, হযরত সাদাকা ইবনে সুলাইমান জাফরি, হযরত শুবায়েব ইবনে শায়বাহ এবং ফযল ইবনে মুয়াফফিক (রা)-এর ঘটনাবলী ইতিপূর্বে আলোচনা করা হয়েছে।
হযরত সায়ীদ ইবনে মুসাইয়িব থেকে বর্ণিত: একদা হযরত আবদুল্লাহ ইবনে সালাম (রা) এবং হযরত সালমান ফারসী (রা) পরস্পর মিলিত হন এবং উভয়ের মধ্যে এই ওয়াদা হয় যে, তাঁদের মধ্যে যিনি আগে মারা যাবেন, তিনি অপরজনকে স্বপ্নে দেখা দেবেন আর আল্লাহর কাছ থেকে যে ব্যবহার পাবেন তাও জানাবেন। সে সময় তারা একে অপরের সাথে একথা বলেছিলেন, আচ্ছা ভাই, জীবিত ও মৃতদের মধ্যে কি দেখা সাক্ষাৎ হয়? উত্তরে অপরজন বলেছিলেন, হ্যাঁ। তবে নেককারদের রূহ জান্নাতে থাকে এবং যেখানে ইচ্ছে সেখানে বিচরণ করতে পারে। অতঃপর তাদের মধ্যে একজন মারা গেলেন এবং অপরজনের সাথে স্বপ্নযোগে দেখা করলেন এবং বললেন, "আল্লাহর ওপর দৃঢ়ভাবে তাওয়াক্কুল করুন, এতে খুশি হতে পারবেন। আমি তাওয়াক্কুলের চেয়ে উত্তম আর কোনো আমল পাইনি।"
হযরত আব্বাস ইবনে আব্দুল মুত্তালিব (রা) বলেছেন, আমি হযরত উমর (রা)-কে স্বপ্নে দেখার ইচ্ছা পোষণ করছিলাম। অবশেষে তাঁর শাহাদাত প্রাপ্তির প্রায় এক বছর পর তাঁকে স্বপ্নে দেখলাম। তিনি কপালের ঘাম মুছছেন আর বলছেন, এখনই আমি ব্যস্ততা থেকে অবসর পেলাম। আমার মনে হচ্ছিল যেন আমার (ঘরের) ছাদ এক বিকট শব্দে ধ্বসে পড়বে, যদি না পরম দয়ালু আল্লাহ তা'আলা আমাকে রক্ষা করতেন তাহলে আমি নির্ঘাত ধ্বংস হয়ে যেতাম। আল্লাহ তা'আলার অশেষ কৃপায় আমি রক্ষা পেয়ে গেছি।
হযরত শারীহ ইবনে আবিদ (র)-এর যখন অন্তিম অবস্থা, তখন হযরত গাযীফ ইবনে হারিস (র) তাঁর নিকট গেলেন এবং আরয করলেন, আপনি আপনার ওফাতের পর যদি আমার কাছে আসতে পারেন এবং নিজের অবস্থা সম্পর্কে জানাতে পারেন তাহলে অবশ্যই তা করবেন। এই ধরনের কথা তৎকালীন বুযুর্গ ব্যক্তিদের মধ্যে প্রচলিত ছিল। হযরত শারীহ (রা)-এর ওফাতের দীর্ঘদিন পর গাযীফ (র) তাঁকে স্বপ্নে দেখলেন এবং তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কি মৃত্যুবরণ করেননি? তিনি উত্তরে বললেন, হ্যাঁ অবশ্যই। তিনি আবার জিজ্ঞেস করলেন, এখন কি অবস্থায় আছেন? তিনি বললেন, "আমাদের মধ্যে কেবল 'আহরায' ছাড়া আর অন্য সকলেই মুক্তি পেয়েছে।" তিনি আবার তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, 'আহরায' কারা? তিনি উত্তর দিলেন, "কোনো কথা প্রসঙ্গে যাদের প্রতি অঙ্গুলীর ইশারা করা হয়।"
হযরত আবদুল্লাহ (র) বলেন, আমি একবার আমার পিতা হযরত উমর ইবনে আবদুল আযীয (র)-কে স্বপ্নে দেখলাম, তিনি যেন এক বাগানের মধ্যে আছেন। তিনি আমাকে কয়েকটি নাশপাতি খেতে দিলেন। আমি এ স্বপ্নের ব্যাখ্যা করলাম—আমার এক পুত্র সন্তান হবে। আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম, আপনি আপনার কোন্ আমলটি উত্তম পেয়েছেন? তিনি বললেন, হে বৎস! 'ইসতিগফার'। (অর্থাৎ আল্লাহর কাছে গুনাহ মাফ চাওয়া)।
হযরত মাসলামাহ ইবনে আবদুল মালিক (র) হযরত উমর ইবনে আবদুল আযীয (র)-কে স্বপ্নে দেখে জিজ্ঞেস করেছিলেন, হে আমীরুল মুমিনীন! আমি যদি জানতে পারতাম, আপনার ওফাতের পর আপনি কি পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছিলেন? তিনি বললেন, হে মাসলামাহ! এখন আমি একটু জিরোতে পারছি। আল্লাহর কসম, এখন আমি একটু শান্তির মধ্যে আছি। আমি আবার তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম, আপনি এখন কোথায় আছেন? তিনি বললেন, "আমি এখন হিদায়াতপ্রাপ্ত ইমামদের সাথে জান্নাতে আদনে আছি।"
হযরত সালিহ বারাদ (র) বলেন, আমি যুরারাহ ইবনে আওফা (র)-কে তাঁর ওফাতের পর স্বপ্নে দেখলাম এবং জিজ্ঞেস করলাম, আল্লাহ আপনার প্রতি রহম করুন, আপনাকে কি জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, আর আপনি কি উত্তর দিয়েছিলেন? তিনি আমার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলেন। আমি আবার তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম, আল্লাহ আপনার সাথে কেমন ব্যবহার করেছেন? তিনি বললেন, আল্লাহ আমার প্রতি দয়া ও অনুগ্রহ করেছেন। আমি আবার তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম, আল্লাহ তা'আলা হযরত আবুল আলা ইবনে ইয়াযীদ মুতরাফের ভাইয়ের সাথে কেমন ব্যবহার করেছেন? তিনি উত্তরে বললেন, তিনি তো উচ্চ মর্যাদা লাভ করেছেন। আমি আবার তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম, আপনার দৃষ্টিতে কোন আমলটি উত্তম? তিনি উত্তর দিলেন, 'তাওয়াক্কুল অর্থাৎ আল্লাহর ওপর ভরসা করা ও কামনা-বাসনা হ্রাস করা'।
হযরত মালিক ইবনে দীনার (র) থেকে বর্ণিত: তিনি একবার হযরত মুসলিম ইবনে ইয়াসার (র)-কে তাঁর মৃত্যুর পর স্বপ্নে দেখে তাঁকে সালাম পেশ করলেন। কিন্তু তিনি তাঁর সালামের কোনো উত্তর দিলেন না। তিনি তখন তাঁকে বললেন, আমি তো মৃত। তোমার সালামের জবাব কীভাবে দেব? তিনি আবার তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, মৃত্যুর পর আপনি কী পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছিলেন? তিনি বললেন, আল্লাহর কসম, আমি অনেক ভয়াবহ ভূমিকম্পের অবস্থা প্রত্যক্ষ করেছি। তিনি আবার তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, এরপর কী হলো? তিনি বললেন, তোমার কোনো পরম দাতা থেকে যেমন আশা করো তেমনই হলো। আল্লাহ তা'আলা আমার পুণ্যসমূহ গ্রহণ করে আমার যাবতীয় গুনাহ মাফ করে দিয়েছেন। আর তিনি দয়া পরবশ হয়ে এই অধমের যিম্মাদার হয়ে গেছেন। তা শ্রবণে হযরত মালিক (রা) প্রচণ্ড চিৎকার করে অজ্ঞান হয়ে গেলেন। এই ঘটনার পর তিনি দীর্ঘদিন অসুস্থ থেকে ইনতেকাল করেন।
হযরত হাযাম (র)-এর ভাই হযরত সুহায়েল (রা) বলেন, আমি মালিক ইবনে দীনার (রা)-কে স্বপ্নে দেখে জিজ্ঞেস করলাম, হে আবু ইয়াহইয়া (রা), আমি যদি জানতে পারতাম, আপনি আল্লাহর কাছে কী নিয়ে গিয়েছেন? তিনি বললেন, অনেক গুনাহ নিয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু আল্লাহর ওপর আমার দৃঢ় বিশ্বাস ও ভরসা ছিল আর তার কারণেই আমাকে তিনি ক্ষমা করে দিয়েছেন।
হযরত রাজা ইবনে হাইওয়াহ (র)-এর ওফাতের পর জনৈক পুণ্যবতী মহিলা তাঁকে স্বপ্নে দেখে জিজ্ঞেস করলেন, হে আবুল মিকদাম, আপনি কোন দিকে প্রত্যাবর্তন করেছেন, কল্যাণের দিকে না অকল্যাণের দিকে? তিনি উত্তর দিলেন, কল্যাণের দিকে। কিন্তু তোমাদেরকে ছেড়ে আসার পর আমি এক ভয়ঙ্কর অবস্থায় পড়েছিলাম এবং ভেবেছিলাম কিয়ামত এসে গেছে। মহিলাটি তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, কেন? তিনি উত্তর দিলেন, হযরত জাররাহ (রা) এবং তাঁর সঙ্গী সাথীগণ তাঁদের অর্জিত এতো পুণ্যসম্ভার নিয়ে জান্নাতে প্রবেশ করেছিলেন যে, তাতে জান্নাতের দরজায় ভিড় জমে গিয়েছিল।
হযরত জামীল ইবনে মুরাহ (র) বলেন: হযরত মুয়াররিক আজলী (র) একাধারে আমার একজন প্রিয় ভাই ও বন্ধু ছিলেন। আমরা পরস্পর ওয়াদা করেছিলাম যে, আমাদের মধ্যে যে আগে মারা যাবে, সে তার বন্ধুর কাছে স্বপ্নের মাধ্যমে তার অবস্থা জ্ঞাত করবে। ঘটনাক্রমে মুয়াররিক আগে মারা গেলেন। জামীলের স্ত্রী তাঁকে স্বপ্নে দেখলেন, তিনি পূর্বের ন্যায় তাদের দরজায় টোকা দিচ্ছেন। জামীলের স্ত্রী যথারীতি দরজা খুলে দিলেন এবং আরয করলেন, আপনি ভেতরে আসুন, আপনার বন্ধুর ঘরে এসে বসুন। তিনি বললেন, আমি কীভাবে আসব, আমি তো মৃত্যুবরণ করেছি। আমি আমার বন্ধুকে আল্লাহর দয়ার শুভ সংবাদ দিতে এসেছি। তাঁকে বলবেন, আল্লাহ তা'আলা আমাকে তাঁর খাস বান্দাদের মধ্যে শামিল করে নিয়েছেন।
হযরত ইবনে সীরীন (র)-এর ওফাতের পর তাঁর জনৈক বন্ধু খুবই মর্মাহত হয়েছিলেন। তিনি একবার তাঁকে স্বপ্নে খুব ভালো অবস্থায় দেখতে পেলেন এবং বললেন, ভাই, আপনার এই ভালো অবস্থা দেখে আমি খুবই আনন্দিত হয়েছি। এবার বলুন, হযরত হাসান বসরী (র)-এর অবস্থা কেমন? তিনি উত্তরে বললেন, হযরত হাসান (র) আমার চেয়ে সত্তর গুণ অধিক উচ্চ মর্যাদা লাভ করেছেন।
হযরত ইবনে উয়াইনাহ (র) বলেন, আমি হযরত সুফইয়ান সওরী (র)-কে স্বপ্নে দেখে বললাম, আমাকে কিছু উপদেশ দিন। তিনি বললেন, লোকজনের সাথে কম মেলামেশা করবে।
হযরত আম্মার ইবনে সাঈফ (র) বলেন, আমি হযরত হাসান ইবনে সালিহ (র)-কে স্বপ্নে দেখে বললাম, আমি তো আপনার একজন সাক্ষাৎপ্রার্থী। আপনার অবস্থা এখন কেমন? তিনি বললেন, "তুমি জেনে খুশি হবে যে, আল্লাহ তা'আলা সম্পর্কে সুউচ্চ ধারণা পোষণ করার চেয়ে উৎকৃষ্টতর আর কোনো আমল আমার জানা নেই।"
জনৈক ব্যক্তি হযরত যাইগাম আবিদ (র)-কে একবার স্বপ্নে দেখলেন। হযরত যাইগাম তাঁকে বললেন, তুমি আমার জন্য দু'আ করোনি কেন? সে লোকটি ঐ ত্রুটির জন্য কৈফিয়ৎ দিয়ে মাফ চাইলে তিনি বললেন, "তুমি আমার জন্য দু'আ করলে ভালো হতো।"
হযরত রাবিআ বসরী (র) ইনতেকাল করার পর তাঁর সঙ্গী সাথীদের মধ্য থেকে জনৈকা মহিলা তাঁকে স্বপ্নে দেখলেন, তিনি মিহিন রেশমের পরিচ্ছদ এবং সেই সাথে মোটা রেশমের দোপাট্টা পরে আছেন। আসলে কম্বলের একটি জুব্বা ও একটি পশমের দোপাট্টা পরিয়ে তাঁকে দাফন করা হয়েছিল। উক্ত মহিলাটি তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, আপনার ঐ জুব্বা ও পশমের দোপাট্টা কোথায়? তিনি বললেন, ঐগুলো খুলে নিয়ে আমাকে এই পোশাক পরানো হয়েছে। আর সেগুলো ভাঁজ করে পুটুলীতে ভরে তার উপর সীলমোহর মেরে ইল্লিয়্যীনে রেখে দেয়া হয়েছে যাতে কিয়ামতের দিন আমি এর সওয়াব পেয়ে যাই। মহিলাটি তাঁকে আবার জিজ্ঞেস করলেন; আপনি কি এই উদ্দেশ্যে দুনিয়ার নেক আমল করতেন? উত্তরে তিনি বললেন, আমার মনে হয়, আল্লাহর ওলীদের প্রতি তাঁর যে সম্মানজনক আচরণ দেখেছি সে তুলনায় আমার আমল কোনো স্তরেই পড়ে না। তিনি আরো জিজ্ঞেস করলেন, হযরত আবিদাহ বিনতে কিলাব (র)-এর অবস্থা কেমন? আল্লাহর কসম, তিনিতো আমার চেয়ে অনেক উচ্চ মর্যাদা লাভ করেছেন। মহিলাটি জিজ্ঞেস করলেন, কেন? মানুষ তো আপনাকে অধিক ইবাদতগুযার মনে করত। হযরত রাবিআ বসরী (র) বললেন, তিনি দুনিয়ায় যখন যে অবস্থায় থাকতেন সেদিকে কোনো ভ্রূক্ষেপ করতেন না। তিনি আরো জানতে চাইলেন, হযরত আবু মালিক যাইগাম (র)-এর অবস্থা কেমন? তিনি বললেন, তাঁর যখন ইচ্ছা তখনই তিনি আল্লাহর দীদার লাভ করে থাকেন। তিনি আবার তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম, হযরত ইবনে মনসুর (র) কেমন আছেন? তিনি বললেন, আল্লাহর শোকর! আল্লাহ তা'আলা তাঁকে তো আশাতিরিক্ত নিআমত দান করেছেন। অতঃপর তিনি আরয করলেন, আল্লাহ তা'আলার নৈকট্য লাভের জন্য আমাকে কোনো আমল বলে দিন। তিনি বললেন, তুমি অধিক পরিমাণে আল্লাহর যিকির করতে থাকো, তাহলে কবরে তুমি দীর্ঘদিন ঈর্ষণীয় অবস্থায় থাকবে।
হযরত আবদুল আযীয ইবনে সুলাইমান (র)-কে তাঁর মৃত্যুর পর জনৈক ব্যক্তি স্বপ্নে দেখলেন। তিনি সবুজ রঙের পোশাক ও মণি মুক্তা খচিত মুকুট পরিহিত অবস্থায় আছেন। তিনি তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কেমন আছেন, আপনার মৃত্যুকালীন অবস্থা কেমন ছিল, আর সেখানে কি দেখলেন? তিনি বললেন, মৃত্যুর কষ্ট ও যন্ত্রণার কথা আর জিজ্ঞেস করো না। কিন্তু আল্লাহ তা'আলা আমার প্রত্যেকটি অন্যায় কাজকে ঢেকে দিয়েছেন এবং তিনি নিজ অনুগ্রহেই আমার প্রতি সদয় হয়েছেন।
হযরত সালিহ ইবনে বাশার (র) বলেন, আমি আতা সালমী (র)-এর ওফাতের পর তাঁকে স্বপ্নে দেখে জিজ্ঞেস করলাম, আপনি কি মৃত্যুবরণ করেননি? তিনি বললেন, কেন নয়? আমি জিজ্ঞেস করলাম, মুত্যুর পর আপনি কি অবস্থার সম্মুখীন হয়েছিলেন? তিনি বললেন, আল্লাহর শপথ আমি অত্যন্ত মঙ্গলজনক অবস্থায় শ্রেষ্ঠ উপকারী ও ক্ষমাপ্রদর্শনকারী সত্তার নিকট পৌঁছে গিয়েছি। আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম, আপনি কি দুনিয়াতে সব সময় চিন্তিত থাকতেন না? তিনি মৃদু হেসে বললেন, আল্লাহর শপথ, হ্যাঁ, আমি সব সময় চিন্তিত থাকতাম। এরই বিনিময়ে আমি চিরশান্তি ও আনন্দ লাভ করতে পেরেছি। আমি আবার তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম, এখন আপনি কোথায় আছেন? তিনি বললেন, আম্বিয়া, সিদ্দীক, শহীদ ও নেককারদের সাহচর্যে আছি।
হযরত আসিম জাহদারী (র)-এর ইনতেকালের পর তাঁর কোনো প্রিয়জন তাঁকে স্বপ্নে দেখলেন এবং জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কি মৃত্যুবরণ করেননি? তিনি বললেন, কেন নয়? আসিম জাহদারী (র)-কে তিনি আবার জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কোথায় আছেন? তিনি বললেন, আল্লাহর শপথ, আমি বেহেশতের বাগানে আছি। আমি এবং আমার সঙ্গীরা জুমুআর দিনে, জুমুআর রাতে ও পরের দিন সকালে হযরত বকর ইবনে আবদুল্লাহ মুযানী (র)-এর নিকট সমবেত হই আর তোমাদের খবরাখবর নিয়ে থাকি। হযরত আসিম জাহদারীর নিকট তিনি আবার জানতে চাইলেন, আপনাদের এই উপস্থিতি শারীরিক না আধ্যাত্মিক? তিনি বললেন শরীর তো বিনষ্ট হয়ে গেছে, আমরা শুধু রূহানীভাবে একত্রিত হয়ে থাকি।
হযরত ফুযায়েল ইবনে আয়ায (র)-কে জনৈক ব্যক্তি একবার স্বপ্নে দেখলেন। হযরত ফুযায়েল ইবনে আয়ায (র) তাঁকে বললেন, "বান্দার কল্যাণের ক্ষেত্রে আমি রাব্বুল আলামীনের চেয়ে উত্তম আর কাউকে পাইনি।"
হযরত মুরা হামাদানী (র) এতো দীর্ঘক্ষণ সিজদায় থাকতেন যে, তাঁর কপালে মাটির দাগ পড়ে গিয়েছিল। তাঁর পরিবারের কোনো একজন লোক তাঁর ইনতেকালের পর তাঁকে স্বপ্নে দেখলেন যে, তাঁর সিজদার জায়গা অতি উজ্জ্বল তারার মতো ঝলমল করছে। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, আপনার চেহারা কি জন্য ঝলমল করছে? তিনি বললেন, মাটির এ চিহ্নের দরুন আমার কপালকে উজ্জ্বলতা দান করা হয়েছে। আবার তাঁকে জিজ্ঞেস করা হলো, আখিরাতে আপনার মর্যাদা কিরূপ হবে? তিনি বললেন, "আমি উচ্চ মর্যাদা ও উত্তম বালাখানা পেয়েছি, যার বাসিন্দাদের সেখান থেকে সরানো হবে না এবং তাঁদের আর মৃত্যুও হবে না।”
হযরত আবু ইয়াকুব কারী (র) বলেন, পিঙ্গল রঙের দীর্ঘ আকৃতির জনৈক ব্যক্তিকে তিনি একবার স্বপ্নে দেখলেন। তাঁর পেছনে অনেক লোকজন সারিবদ্ধভাবে ছিল। আমি জানতে চাইলাম, ইনি কে? লোকেরা বললো, ইনি হযরত ওয়ায়িস কারণী (র)। অবশেষে আমিও তাঁর পেছনের সারিতে শামিল হলাম এবং তাঁর কাছে আরয করলাম, আল্লাহ আপনাকে রহম করুন, আপনি আমাকে কিছু উপদেশ দিন। তিনি আমাকে মনোযোগের সাথে দেখলেন, কিন্তু কিছু বললেন না। তাই আমি আবার আরয করলাম, আমি হিদায়াত প্রার্থী, আমাকে পথ প্রদর্শন করুন। আল্লাহ আপনাকে রহম করুন। অবশেষে তিনি আমার প্রতি লক্ষ্য করলেন এবং বললেন, "আল্লাহর রহমত তাঁর আনুগত্যের মধ্যে তালাশ করো। আর গুনাহের আযাব থেকে নিজেকে রক্ষা করো। কেননা, এতেই আল্লাহর শান্তি নিহিত রয়েছে। সেই লক্ষ্য অর্জনে আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না।” অতঃপর তিনি আমাকে ছেড়ে অন্যদিকে চলে গেলেন।
হযরত ইবনে সাম্মাক (র) বলেন, আমি মিসআর (র)-কে স্বপ্নে দেখে জিজ্ঞেস করলাম, আপনার বিবেচনায় কোন্ আমলটি উত্তম? তিনি বললেন, "যিকরের মজলিস"।
হযরত আজলাহ (র) বলেন, আমি সালমাহ্ ইবনে কাহীল (র)-কে স্বপ্নে দেখে জিজ্ঞেস করলাম, আপনি কোন আমলটি শ্রেষ্ঠ পেয়েছেন? তিনি বললেন, 'তাহাজ্জুদের নামায'।
হযরত আবু বকর ইবনে আবী মারইয়াম (র) বলেন, আমি ওফা ইবনে বাশার (র)-কে স্বপ্নে দেখে তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম, আপনার অবস্থা কেমন? তিনি বললেন, অতি কষ্টে মুক্তি পেয়ে গেছি। আমি আবার তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম, কোন আমলটি আপনি উত্তম পেয়েছেন? তিনি বললেন, "আল্লাহর ভয়ে ক্রন্দন করা।"
হযরত মূসা ইবনে ওয়ারদান (র) বলেন, আমি আবদুল্লাহ ইবনে আবী হাবীবাহ (র)-কে তাঁর ইনতেকালের পর একবার স্বপ্নে দেখলাম। তিনি আমাকে বললেন, আমাকে আমার সমূহ পাপ ও পুণ্যকে দেখানো হলো, আমার সৎকাজের মধ্যে আমি যে আনারের দানাগুলো মাটি থেকে তুলে খেয়েছিলাম, তাও দেখতে পেলাম। আর পাপের মধ্যে আমার টুপিতে যে রেশমের দুটি সূতা ব্যবহৃত হয়েছিল, তাও দেখতে পেলাম।
জুয়াইরিয়াহ ইবনে আসমা (র) বলেন, আমরা তখন আবাদানে ছিলাম। আমাদের নিকটেই জনৈক কৃষ্ণাবাসী যুবক এসে বসবাস করতে লাগলেন। তিনি অত্যন্ত ইবাদতকারী ছিলেন। ঘটনাক্রমে তিনি মারা গেলেন। তখন খুব গরম পড়েছিল। আমরা সকলে সিদ্ধান্ত নিলাম, আবহাওয়া একটু ঠাণ্ডা হলে তাঁর দাফন-কাফনের ব্যবস্থা করা হবে। এরপরে আমি একটু ঘুমিয়ে পড়লাম। তখন আমি স্বপ্নে দেখলাম—আমি যেন কবরস্থানে আছি। সেখানে মণি মুক্তা খচিত এমন একটি বন্ধ গম্বুজ দেখতে পেলাম যার সৌন্দর্যের প্রতি দৃষ্টি রাখা ছিল এক কষ্টকর ব্যাপার। হঠাৎ গম্বুজটি ফেটে গেল এবং সেখান থেকে এক সুন্দরী যুবতী বেরিয়ে আসলেন। তিনি আমাকে বললেন, তোমাকে আল্লাহর শপথ, যুহরের নামাযের সময়ের মৃত যুবকটিকে আমার নিকট আসতে যেন বিলম্ব না হয়। তখন আমার ঘুম ভেঙ্গে গেল। তারপর আমি তৎক্ষণাৎ যুবকটির দাফন-কাফনের কাজে লেগে গেলাম। আর আমি ঐস্থানে কবর খনন করলাম, যেখানে গম্বুজটি স্বপ্নে দেখেছিলাম। আর তাঁকে ঐ কবরে দাফন করলাম।
আবদুল মালিক ইবনে আত্তাব লাইসী (র) একবার আমির ইবনে আবদে কায়স (র)-কে স্বপ্নে দেখে জিজ্ঞেস করলেন, তিনি তাঁর কোন্ আমলটি উত্তম পেয়েছেন? তিনি বললেন, "আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য যে আমল করা হয়"।
ইয়াযীদ ইবনে হারুন আবুল আলা আইয়ুব ইবনে মিসকীন (র)-কে একবার স্বপ্নে দেখে জিজ্ঞেস করলেন, "আল্লাহ আপনার সাথে কেমন ব্যবহার করেছেন?" তিনি বললেন, "আমাকে মাফ করা হয়েছে।" আবার জিজ্ঞেস করলেন, কোন্ আমলের বদৌলতে? তিনি বললেন, নামায-রোযার কারণে। আবার তিনি জানতে চাইলেন, হযরত মনসুর ইবনে যাযান (র) সম্পর্কে সংবাদ দিন। তিনি বললেন, তাঁকে উচ্চ মর্যাদা দান করা হয়েছে। তাঁর বালাখানা আমরা কেবল দূর থেকে দেখতে পাই।
হযরত ইয়াযীদ ইবনে নায়ামা (র) বলেন, একটি মেয়ে প্লেগে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। তার পিতা তাকে স্বপ্নে দেখে জিজ্ঞেস করলেন, আখিরাত সম্পর্কে কিছু বলো। সে বললো, আব্বাজান আমি এমন এক গুরুত্বপূর্ণ স্থানে পৌঁছে গেছি, যেখানে আমাদের ইলম বা জ্ঞান আছে কিন্তু কোনো আমল করতে সক্ষম নই। আর আপনারা আমল করতে পারেন তবে সে জ্ঞান থেকে বঞ্চিত। আল্লাহর শপথ, কিছু তাসবীহ পাঠ কিংবা দু'এক রাকআত নামায আদায় করার সওয়াব আমার আমলনামায় লিপিবদ্ধ থাকা দুনিয়া ও দুনিয়ার মধ্যে যা কিছু আছে, আমার নিকট তার চেয়েও অধিক প্রিয় ও মূল্যবান।
হযরত কাসীর ইবনে মুরা (র) একবার স্বপ্নে দেখলেন তিনি বেহেশতের এক উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন প্রাসাদে প্রবেশ করেছেন এবং ঘুরে ফিরে তা দেখছেন ও আনন্দিত হচ্ছেন। হঠাৎ ঐ স্থানের এক কোণে মসজিদের মধ্যে কিছু সংখ্যক মহিলাকে দেখতে পেলেন। তিনি সেখানে গিয়ে তাঁদেরকে সালাম পেশ করলেন এবং জিজ্ঞেস করলেন, আপনারা কোন আমলের বদৌলতে এই উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন স্থানে পৌঁছতে পেরেছেন? তাঁরা বললেন, “সিজদাহ ও তাকবীরের বদৌলতে আমরা এই সম্মান লাভ করেছি”।
হযরত ফাতেমা বিনতে আবদুল মালিক (র) হযরত উমর ইবনে আবদুল আযীয (র)-এর পত্নী থেকে বর্ণনা করেছেন: এক রাতে হযরত উমর ইবনে আবদুল আযীয ঘুম থেকে জেগে বললেন, আমি একটি চমৎকার স্বপ্ন দেখেছি। আমি তখন তাঁকে বললাম, আপনার জন্য আমার জান কুরবান, বলুন আপনি কি স্বপ্নে দেখেছেন? তিনি বললেন, সকাল না হওয়া পর্যন্ত আমি তা বলবো না। সুবহে সাদিকের পর তিনি মসজিদে গিয়ে নামায আদায় করে বাসায় ফিরে আসলেন। আমি এ সময়টিকে অত্যন্ত উপযুক্ত মনে করে স্বপ্নটি শুনবার জন্য তাঁর কাছে আরয করলাম। তখন তিনি বললেন, কে একজন যেন আমাকে প্রশস্ত, সবুজ-শ্যামল এক প্রান্তরে নিয়ে গেল, যেখানে যমরুদের বিছানা পাতা রয়েছে। আমি সেখানে রৌপ্যের মতো সাদা রঙের একটি প্রাসাদ দেখতে পেলাম। সেখানে আরো দেখতে পেলাম, জনৈক ব্যক্তি ঐ মহল থেকে বের হয়ে এসে উচ্চস্বরে হাঁক দিচ্ছে—মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে আবদুল মুত্তালিব কোথায়? আল্লাহর রাসূল কোথায়? এমন সময় দেখলাম, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাশরীফ এনে ঐ মহলে প্রবেশ করলেন। তারপর উক্ত মহল থেকে আরো এক ব্যক্তি বের হয়ে উচ্চস্বরে হাঁক দিল, আবু বকর সিদ্দীক কোথায়? ইবনে আবু কুহাফা কোথায়? তখন হযরত আবু বকর (রা) তাশরীফ আনলেন এবং উক্ত মহলেই প্রবেশ করলেন। অতঃপর অপর এক ব্যক্তি ঐ প্রাসাদ থেকে বের হয়ে হাঁক দিল—কোথায় উমর ইবনে খাত্তাব? হযরত উমর (রা) এসে ঐ মহলে প্রবেশ করলেন। অতঃপর অন্য এক ব্যক্তি ঐ প্রাসাদ থেকে হাঁক দিল—উসমান ইবনে আফফান কোথায়? তখন হযরত উসমান (রা) এসে ঐ মহলেই প্রবেশ করলেন। এরপর আরো এক ব্যক্তি ঐ প্রাসাদ থেকে বের হয়ে হাঁক দিল—আলী ইবনে আবী তালিব কোথায়? তখন হযরত আলী (রা) এসে ঐ প্রাসাদে প্রবেশ করলেন। অতঃপর অপর এক ব্যক্তি ঐ প্রাসাদ থেকে বের হয়ে এসে হাঁক দিল, কোথায় উমর ইবনে আবদুল আযীয? তখন আমি অগ্রসর হয়ে এ প্রাসাদে প্রবেশ করলাম। আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খিদমতে হাযির হলাম। সাহাবীরা তখন তাঁর চার পাশ থেকে তাঁকে ঘিরে রেখেছেন। আমি মনে মনে ভাবছিলাম, কোথায় বসব? শেষ পর্যন্ত আমার নানা হযরত উমর (রা)-এর পাশে বসে পড়লাম। সেখানে দেখতে পেলাম রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ডান পাশে হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা) ও বাম পাশে হযরত উমর (রা) বসে আছেন। তারপর আরো লক্ষ্য করে দেখতে পেলাম, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও আবু বকর সিদ্দীক (রা)-এর মধ্যে অপর এক মহৎ ব্যক্তি বসে আছেন। আমি জিজ্ঞেস করলাম, ইনি কে? আমাকে বলা হলো, ইনি হচ্ছেন হযরত ঈসা (আ)। তারপর নূরানী পর্দার আড়াল থেকে একটি আওয়ায এলো, “হে উমর ইবনে আবদুল আযীয, তুমি যে পথে আছো সেই পথকে আঁকড়ে ধরে থাকো এবং এর ওপর স্থির থাকো।” অতঃপর আমাকে বাইরে আসার অনুমতি দেয়া হলো, আমি ঐ প্রাসাদ থেকে বের হলাম এবং পেছনে ফিরে দেখি আমার পেছনে পেছনে হযরত উসমান (রা) এই বলতে বলতে আসছেন, 'আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহ আমাকে ক্ষমা করে দিয়েছেন।' আরো দেখলাম, তাঁর পেছনে হযরত আলী (রা) এই বলে বলে আসছেন, 'আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহ আমাকে মাফ করে দিয়েছেন'।
হযরত উমর ইবনে আবদুল আযীয (র) থেকে আরো বর্ণিত: তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে স্বপ্নে দেখলেন, হযরত আবু বকর (রা) ও হযরত উমর (রা) তাঁর পাশে বসে আছেন। তিনি তাঁকে সালাম করে সেখানে বসে পড়লেন। এর মধ্যে হযরত আলী (রা) ও হযরত মুআবিয়া (রা)-কে সেখানে নিয়ে আসা হলো, তাঁদেরকে ঘরের মধ্যে ঢুকিয়ে দরজা বন্ধ করে দেয়া হলো। তিনি সেদিকে তাকিয়ে রইলেন। হযরত আলী (রা) তাড়াতাড়ি সেখান থেকে এই বলে বের হয়ে আসলেন, "কাবার রবের কসম, আমার বিবাদের মীমাংসা হয়ে গেছে।" এরপর হযরত মুআবিয়া (রা) এই বলে বেরিয়ে আসলেন, "কাবার রবের কসম, আল্লাহ আমাকে ক্ষমা করে দিয়েছেন।"
একবার জনৈক ব্যক্তি হযরত উমর ইবনে আবদুল আযীয (র)-এর নিকট এসে বললেন, "আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে স্বপ্নে দেখলাম, তাঁর ডান পাশে হযরত আবু বকর (রা) ও বাম পাশে হযরত উমর (রা) রয়েছেন। সে সময় দু'জন লোক ঝগড়ারত অবস্থায় সেখানে উপস্থিত হলেন। আর আপনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনে বসা ছিলেন। তারপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আপনাকে সম্বোধন করে বললেন, “হে উমর ইবনে আবদুল আযীয! যখন তুমি ইবাদত-বন্দেগী করবে, তখন এই দুই ব্যক্তি অর্থাৎ আবূ বকর ও উমরের মতো আমল করবে।" হযরত উমর ইবনে আবদুল আযীয (র) তখন ঐ ব্যক্তিকে কসম দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কি সত্যি সত্যি এরূপ স্বপ্ন দেখেছো? সেই ব্যক্তি কসম করে তার সত্যতা স্বীকার করল। তখন হযরত উমর ইবনে আবদুল আযীয (র) কেঁদে ফেললেন।
হযরত আবদুর রহমান ইবনে গানাম (রা) বলেন: তিনি হযরত মুআয ইবনে জাবাল (রা)-কে তাঁর ওফাতের তিন বছর পর স্বপ্নে দেখলেন তিনি একটি ধূসর বর্ণের ঘোড়ার ওপর সওয়ার রয়েছেন। আর তাঁর পেছনে গৌর বর্ণের কিছু লোক সবুজ পোশাক পরিহিত অবস্থায় ধূসর বর্ণের ঘোড়ার ওপর আরোহণ করে আছেন। এই অবস্থায় হযরত মুআয (রা) কুরআন পাকের এই আয়াত দু'টি পাঠ করলেন, “হায় আমার কাওম যদি জানতে পারত, আমার রব কোন্ জিনিসের বদৌলতে আমাকে ক্ষমা করেছেন এবং আমাকে সম্মানিতদের অন্তর্ভুক্ত করেছেন।” (সূরা ইয়াসীন: আয়াত ২৬-২৭)
তারা বলবে, "সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর, যিনি আমাদের প্রতি তাঁর প্রতিশ্রুতি পূরণ করেছেন এবং আমাদেরকে এই ভূমির (বেহেশতের) অধিকারী করেছেন। আমরা জান্নাতে যেথায় ইচ্ছা বসবাস করব। নেক আমলকারীদের জন্য কতোই না উত্তম প্রতিদান রয়েছে।” (সূরা আয-যুমার: আয়াত ৭৪)
তারপর তিনি আবদুর রহমান ইবনে গানাম (রা)-এর সাথে মুসাফাহা করলেন ও সালাম জানালেন। হযরত কুবায়সা ইবনে উকবাহ (র) বলেন, আমি একদিন সুফইয়ান সওরী (র)-কে তাঁর ইনতেকালের পর স্বপ্নে দেখলাম এবং জিজ্ঞেস করলাম, আল্লাহ তা'আলা আপনার সাথে কেমন ব্যবহার করেছেন? উত্তরে তিনি একটি কবিতা পাঠ করলেন, যার মমার্থ হলো: আমি আমার রবকে আমার সামনে দেখেছি। তিনি আমাকে বললেন, হে ইবনে সায়ীদ, আমার সন্তুষ্টি তোমার জন্য কল্যাণকর হোক। কেননা রাতের বেলায় তুমি যখন তাহাজ্জুদ নামায আদায় করতে, তখন তোমার চোখ থেকে ব্যথার অশ্রু ঝরত আর অন্তর থাকত ব্যথাতুর। এখন তুমি যেই মহল ইচ্ছা তা বেছে নাও, আর আমি তোমার অতি নিকটে আছি। তুমি যতো ইচ্ছা আমাকে দর্শন করতে থাকো।
হযরত ইবনে উয়াইনা (র) বলেন, "আমি একবার হযরত সুফইয়ান সওরী (র)-কে তাঁর ইনতেকালের পর স্বপ্নে দেখলাম, তিনি বেহেশতের মধ্যে এক খেজুর গাছ থেকে উড়ে গিয়ে অন্য এক খেজুর গাছে বসছেন আর বলছেন, "এরূপ নিআমত লাভের জন্য সাধনাকারীদের সাধনা করা উচিত।" তাঁকে জিজ্ঞেস করা হলো, কোন্ আমলের বদৌলতে আপনি বেহেশত লাভ করেছেন? তিনি বললেন, তাকওয়া ও পরহেযগারীর জন্য। তাঁকে আবার জিজ্ঞেস করা হলো, হযরত আলী ইবনে আসিম (র) কেমন আছেন? তিনি বললেন, "তাঁকে আমরা আকাশের তারকারাজির মতো দেখতে পাই।"
হযরত শোয়বা ইবনে হাজ্জাজ (র) ও হযরত মিসআর ইবনে কুদাম (র) উভয়ে কুরআনে হাফিয ছিলেন। তাঁরা সম্মানিত ব্যক্তিও ছিলেন। হযরত আবু আহমদ বারীদী (র) বলেন, 'আমি তাঁদের দু'জনকে স্বপ্নে দেখে জিজ্ঞেস করলাম, হে আবু বিসতাম; আল্লাহ আপনার সাথে কেমন ব্যবহার করেছেন? তিনি একটি কবিতা পাঠ করলেন এবং বললেন, আল্লাহ তোমাকে আমার এই কবিতাটি হৃদয়ঙ্গম করার তাওফীক দান করুন। কবিতাটির মর্মার্থ হলো, আমাকে আমার প্রভু বেহেশতে এমন এক মহল দান করেছেন, যার এক হাজার দরজা রয়েছে, যা চান্দি ও মণি মুক্তার তৈরি। দয়ালু আল্লাহ পাক আমাকে বললেন, হে শোয়বা! তুমি অধিক পরিমাণে জ্ঞান আহরণে পটু ছিলে, এখন তুমি আমার নিকট আনন্দ উপভোগ করো। আমি তোমার প্রতি সন্তুষ্ট। আর আমার বান্দা মিসআর-এর প্রতিও আমি সন্তুষ্ট। কেননা সে তাহাজ্জুদগুযার ছিল। মিসআর-এর জন্য এই মর্যাদাই যথেষ্ট যে তার জন্য আমার দীদার লাভ হয়েছে। আমি তার জন্য আমার পবিত্র চেহারা উন্মুক্ত করে দেই। ইবাদতকারীদের সাথে আমার ব্যবহার এই রকমই যে, যারা অতীতে কোনো পাপে লিপ্ত ছিল না।
হযরত আহমদ ইবনে মুহাম্মদ লাবাদী (র) বলেন, 'আমি একবার ইমাম আহমদ (র)-কে স্বপ্নে দেখে জিজ্ঞেস করলাম, আল্লাহ তা'আলা আপনার সাথে কেমন ব্যবহার করেছেন? উত্তরে তিনি বললেন, আল্লাহ তা'আলা আমাকে মাফ করে দিয়েছেন এবং আমাকে বলছেন, হে আহমদ, তোমার হয়তো মনে আছে, তুমি আমার জন্য ষাটটি চাবুকের ঘা খেয়েছিলে। তিনি বললেন, হ্যাঁ, আমার মনে আছে। আল্লাহ তা'আলা বললেন, আমি আমার চেহারা তোমার জন্য উন্মুক্ত করে দিলাম। তুমি এখন এর দীদারের আনন্দ উপভোগ করতে থাকো।
একবার জনৈক তুরতুসী আল্লাহর কাছে দু'আ করলেন, হে আল্লাহ! তুমি আমাকে কবরবাসীদেরকে দেখাও, তাহলে আমি তাঁদের কাছে ইমাম আহমদ (র) সম্পর্কে জিজ্ঞেস করব, আপনি তাঁর সাথে কেমন ব্যবহার করেছেন। এরপর দশ বছর চলে গেল। আমি স্বপ্নে দেখলাম, কবরবাসীরা কবর থেকে বের হয়ে এসেছেন। প্রত্যেকেই আমার সাথে আগে কথা বলতে চান। তাঁরা আমাকে বললেন, আপনি দশ বছর যাবত দু'আ করছিলেন যেন আল্লাহ আমাদেরকে আপনার সাথে দেখা করান। আর আপনি এমন এক ব্যক্তি সম্পর্কে আমাদেরকে জিজ্ঞেস করবেন যিনি আপনার নিকট থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর ফেরেশতারা তৃবা বৃক্ষের নিচে তাঁকে অলঙ্কারাদি দিয়ে সুসজ্জিত করে রেখেছেন। এই সম্পর্কে আবু মুহাম্মদ আবদুল হক (র) বলেন, মৃত ব্যক্তিদের পরিবেশিত এইরূপ তথ্য ইমাম আহমদের উচ্চ মর্যাদা ও উচ্চ মাকাম লাভের সুস্পষ্ট প্রমাণ। তাঁর উচ্চ সম্মান লাভের বর্ণনার ক্ষেত্রে এর চেয়ে অধিক সুন্দর ও বাস্তবধর্মী আর কোনো ভাষা মৃত ব্যক্তিরা খুঁজে পাননি।
হযরত বাশার ইবনে হারিসের বন্ধু হযরত আবু জাফর সাক্কা (র) থেকে বর্ণিত: আমি একবার হযরত বাশার হাফী (র) ও হযরত মারূফ কারখী (র)-কে স্বপ্নে দেখলাম, তাঁরা যেন কোথা থেকে আসছেন। আমি তাঁদেরকে জিজ্ঞেস করলাম, আপনারা কোত্থেকে তাশরীফ আনছেন? তাঁরা বললেন, জান্নাতে ফিরদাউসে হযরত মূসা কালীমুল্লাহ (আ)-এর সাথে সাক্ষাৎ করে ফিরছি।
হযরত আসিম জাযারী (র) বলেন, স্বপ্নে বাশার ইবনে হারিস (র)-এর সাথে আমার দেখা হয়। আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম, হে আবু নসর, আপনি কোথা থেকে আসছেন? তিনি বললেন ইল্লিয়্যীন থেকে আসছি। আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম, হযরত আহমদ ইবনে হাম্বল (র)-এর অবস্থা কেমন? তিনি উত্তরে বললেন, আমি এখনই তাঁকে আবদুল ওহাব ওয়ারাক (র) সহ আল্লাহর সামনে রেখে এসেছি। তাঁরা উভয়েই সেখানে পানাহার করছেন। আমি বললাম, আর আপনি? তিনি বললেন, আল্লাহ জানেন, পানাহারের প্রতি আমার ততো আগ্রহ নেই। তাই তিনি তাঁর দীদার লাভের পথ আমার জন্য উন্মুক্ত করে দিয়েছেন।
এই প্রসঙ্গে হযরত আবু জাফর সাক্কা (র) আরো বলেন, আমি হযরত বাশার (র)-কে তাঁর ইনতেকালের পর স্বপ্নে দেখে জিজ্ঞেস করলাম, আল্লাহ আপনার সাথে কিরূপ ব্যবহার করেছেন? তিনি উত্তর দিলেন, আল্লাহ আমার প্রতি দয়া, অনুগ্রহ বর্ষণ করেছেন এবং বলেছেন, হে বাশার, আমি মানুষের অন্তরে তোমার জন্য যে ভালোবাসা সৃষ্টি করেছি, তুমি যদি জ্বলন্ত আগুনের কয়লার ওপরও সিজদাহ করতে তবুও তার শুকরিয়া আদায় হতো না। আল্লাহ আমার জন্য অর্ধেক বেহেশত উন্মুক্ত করে দিয়েছেন। আমি সেখানে যথা ইচ্ছা যেতে পারি ও যা খুশি খেতে পারি। আল্লাহ তা'আলা আমার জানাযায় যারা শরীক হয়েছিলেন, তাদের সবাইকে ক্ষমা করারও ওয়াদা করেছেন। আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম, আবু নসর তাম্মারের অবস্থা কেমন? উত্তরে তিনি বললেন, দারুণ অভাবগ্রস্ত অবস্থায় থাকা সত্ত্বেও সবর করার দরুন তিনি সবার উপরে মর্যাদা লাভ করেছেন। হযরত আবদুল হক (র) বলেন, সম্ভবত এখানে অর্ধেক বেহেশত বলতে বেহেশতের অর্ধেক নিআমতের কথা বুঝানো হয়েছে। কেননা বেহেশতের নিআমতসমূহ দু'ভাগে বিভক্ত। এক ভাগ আধ্যাত্মিক ও অপর ভাগ শারীরিক। বেহেশতীরা আলমে বরযখে রূহানী নিআমত উপভোগ করবেন। আর কিয়ামতের দিন রূহ যখন নিজ নিজ দেহে ফিরে আসবে তখন রূহানী নিআমতের সাথে শারীরিক নিআমতও যোগ হবে। কারো কারো মতে, বেহেশতের নিআমতসমূহ ইলম ও আমলের ওপর নির্ভর করে, কাজেই বাশার (র)-এর ইলমী নিআমতের অনুপাতে আমলী নিআমতসমূহ অধিক। আল্লাহ সর্বজ্ঞাত।
এক সময় জনৈক নেককার ব্যক্তি হযরত শিবলী (র)-কে স্বপ্নে দেখলেন তিনি বাগদাদের রুসাফাহ নামক একটি স্থানে সুন্দর পোশাক পরিচ্ছদ পরিধান করে জীবিতকালে যে জায়গায় বসতেন ঠিক সেখানে বসে আছেন। আমি তাঁর দিকে অগ্রসর হয়ে তাঁকে সালাম করলাম এবং তাঁর সামনে বসে জিজ্ঞেস করলাম, আপনার একান্ত বন্ধু কে? তিনি উত্তর দিলেন, যিনি সবচেয়ে বেশি আল্লাহর যিকর করেন এবং যিনি সবচেয়ে বেশি আল্লাহর হকের প্রতি লক্ষ্য রাখেন, আর যিনি আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য বেশি তৎপর ও সতর্ক, তিনিই আমার বন্ধু।
হযরত আবূ আবদুর রহমান সাহিলী বলেন, আমি মায়সারাহ ইবনে সালীম (রা)-কে তাঁর ইনতেকালের পর স্বপ্নে দেখলাম এবং তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম, আপনি তো দীর্ঘ দিন ধরে অজ্ঞাত রয়েছেন। তিনি বললেন, এটি আমার খুবই দীর্ঘ সফর। আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম, আপনি কী কী পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছিলেন? তিনি উত্তর দিলেন, আমাকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। কেন না আমি রুখসত বা সহজ গ্রহণীয় ফতওয়া দিতাম। আমি বললাম আমাকে কিছু উপদেশ দিন। তিনি বললেন, "সুন্নাতের অনুসরণ এবং আল্লাহ প্রেমিকদের সাহচর্য দোযখের আগুন থেকে মুক্তি দেয় আর আল্লাহর নৈকট্য প্রদান করে।"
হযরত আবূ জাফর যারীর (র) বলেন, আমি ঈসা ইবনে যাযান (র)-কে তাঁর ইনতেকালের পর স্বপ্নে দেখলাম এবং জিজ্ঞেস করলাম, আল্লাহ আপনার সাথে কেমন ব্যবহার করেছেন? তখন তিনি যে কবিতাটি পাঠ করেছিলেন সেটির মর্মার্থ হলো—"কতোই না ভালো হতো যদি তুমি আমার চতুর্পাশে পানীয় ভরা পেয়ালা হাতে সুন্দরীদেরকে দেখতে যারা সুমিষ্ট সুরে কুরআন পাঠে রত এবং তারা তাদের পরিধেয় পোশাক টেনে টেনে এগিয়ে আসছে।"
হযরত ইবনে জুরায়েজ (র)-এর জনৈক বন্ধু বলেন, আমি স্বপ্নে দেখলাম মক্কা শরীফের কবরস্থানের মধ্যে রয়েছি। সেখানে দেখলাম প্রত্যেক কবরের ওপর শামিয়ানা টানানো রয়েছে। কিন্তু একটি কবরের ওপর শামিয়ানার সাথে তাবুও খাটানো রয়েছে এবং সেখানে একটি কুল বৃক্ষও রয়েছে। আমি তাঁবুর দরজায় গিয়ে সালাম পেশ করে ভেতরে প্রবেশ করলাম। সেখানে হযরত মুসলিম ইবনে খালিদ যানজী (র)-কে দেখলাম। আমি তাঁকে সালাম করে জিজ্ঞেস করলাম, হে আবূ খালিদ! ব্যাপার কী? প্রত্যেক কবরের ওপর শামিয়ানা রয়েছে কিন্তু আপনার কবরের ওপর শামিয়ানার সাথে তাঁবুও রয়েছে এবং একটি কুল বৃক্ষও আছে। তিনি বললেন, আমি যে অধিক পরিমাণে রোযা রাখতাম এটা তারই প্রতিদান। আমি জিজ্ঞেস করলাম, ইবনে জুরায়েজের কবর কোন দিকে এবং তাঁর মর্যাদা কী রকম? আমি দুনিয়ার জীবনে তাঁর সাথে উঠাবসা করতাম, এখন তাঁকে আমি সালাম করতে চাই। এই কথা শুনে তিনি হাতের ইশারায় বললেন, ঐখানে। তারপর তিনি তর্জনী ঘুরিয়ে বললেন, ইবনে জুরায়েজের ঠিকানা আবার কোথায়, তাঁর আমলনামা তো ইল্লিয়্যীনে উঠিয়ে নেয়া হয়েছে।
হযরত হাম্মাদ ইবনে সালমাহ (র) তাঁর কোনো এক বন্ধুকে তাঁর ইনতেকালের পর স্বপ্নে দেখলেন এবং তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, আল্লাহ তা'আলা আপনার সাথে কেমন ব্যবহার করেছেন? তিনি বললেন, আল্লাহ তা'আলা আমাকে বলেছেন, তুমি তো দুনিয়াতে অনেক দুঃখ-কষ্ট সহ্য করেছিলে, এখন আমি তোমাকে এবং তোমার মতো অন্য সকল দুঃখ-কষ্ট সহ্যকারীদেরকে চিরশান্তি দান করেছি।
স্বপ্নে দেখা ঘটনাবলী অতি ব্যাপক ও অর্থবহ। যদি কেউ এর সত্যতা স্বীকার না করে আর মনে করে যে, এগুলো স্বপ্ন বৈ আর কিছু নয়; স্বপ্ন সত্য হতে পারে আর মিথ্যাও হতে পারে, তাই এই বিষয়টিকে সে এড়িয়ে যেতে চায়। সেই ক্ষেত্রে তার উচিত, ঐ ব্যক্তির স্বপ্নের কথা চিন্তা করা যে তার কোনো বন্ধু বা প্রিয়জনকে কিংবা অন্য কাউকে স্বপ্নে দেখল এবং সে তাকে এমন সব বিষয়ের সংবাদ দিল, যেসব বিষয়ের কথা সে ছাড়া আর অন্য কেউ জানত না। যেমন পুঁতে রাখা ধন-সম্পদের তথ্য অবগত করানো অথবা ভবিষ্যৎ বিপদাপদের সংবাদ দেয়া, সামনে যেসব ঘটনা ঘটবে সেসবের সংবাদ দেয়া এবং তা সত্যে পরিণত হওয়া। এছাড়া অমুক ব্যক্তি বা অমুক পরিবারের অমুক ব্যক্তি এতো দিনের মধ্যে মৃত্যুবরণ করবে, আর বাস্তবে তাই ঘটল অথবা তাকে বাজারের জিনিসপত্রের দামের সঠিক সংবাদ বা দুর্ভিক্ষের খবর দেয়া, কোনো দুশমনের হামলা কিংবা আসন্ন কোনো বিপদের বা কোনো রোগ ব্যাধিতে আক্রান্ত হওয়া, কারো দায়দায়িত্বের খবর দেয়া, আর সেসব খবর অনুযায়ী সমস্ত কিছু সত্যে পরিণত হওয়া। এ ধরনের অসংখ্য ঘটনা সব সময় ঘটছে আর এতে সর্বশ্রেণীর লোক জড়িত রয়েছেন। আর সকলেই এ ধরনের আশ্চর্যজনক ঘটনাবলী অবলোকন করছেন।
অনেকে মনে করে থাকেন, স্বপ্ন একটি নিছক কল্পনাপ্রসূত বিষয় মাত্র, এটাকে বিশ্বাস করার কিছুই নেই। যেসব স্বপ্ন, দর্শনকারীর সামনে ছবির মতো ধরা দেয়, সেসব স্বপ্ন কোনো ব্যক্তির রূহ নিদ্রার সময় দৈহিক বন্ধন থেকে মুক্ত হলে দেখে থাকে। কিন্তু এটা একটি সম্পূর্ণ ভ্রান্ত ও অবাস্তব ধারণা। কোনো নাফসের পক্ষে ঐসব বিষয় জানার কোনো ক্ষমতা বা জ্ঞান নেই, যা স্বপ্নের মাধ্যমে জ্ঞাত হওয়া যায়, বরং ঐ বিষয়গুলো নাফসের ধারণারও অতীত। এছাড়া নাফসের সঙ্গে এ সবের কোনো যোগসূত্র বা সম্পর্ক নেই। তবে কোনো কোনো সময় ধ্যান-ধারণা বা বিশ্বাসের মাধ্যমে অনেক বিষয় অবগত হওয়া যায়। অবশ্য মানুষের অনেক স্বপ্ন শুধু তাদের ধ্যান-ধারণা ও চিন্তারই প্রতিফলন মাত্র, সেটা কোনো বাস্তব ঘটনার ভিত্তিতেই হোক বা অন্য কোনো কারণে দৃষ্ট হোক।
স্বপ্ন তিন প্রকার। এক—কোনো কোনো স্বপ্ন আল্লাহর পক্ষ থেকে সংঘটিত হয়। দুই—কোনো কোনো স্বপ্ন শয়তানের পক্ষ থেকে ঘটে থাকে। তিন—কোনো কোনো স্বপ্ন নিজের ধ্যান-ধারণা থেকে দেখা যায়। আবার সত্য স্বপ্নও কয়েক প্রকারের হয়ে থাকে। যথা: প্রথম—ইলহামী স্বপ্ন: যার মাধ্যমে আল্লাহ পাক কোনো বান্দার দিলের মধ্যে নিদ্রাবস্থায় কোনো বিষয় অবহিত করে দেন। অর্থাৎ আল্লাহ পাক যেন স্বপ্নের মাধ্যমে সেই বান্দার সাথে কথা বলেন। যেমন, হযরত উবায়দা ইবনে সামিত (রা) প্রমুখের ঘটনাবলী। দ্বিতীয়—তামসীলী স্বপ্ন: যেই স্বপ্নের মাধ্যমে ফেরেশতারা বান্দাকে রূপকের সাহায্যে কোনো কথা বলে দেন বা ইঙ্গিত করেন। তৃতীয়—রূহানী স্বপ্ন: এই স্বপ্নের দ্বারা নিদ্রিত ব্যক্তির রূহ তার কোনো মৃত আত্মীয় বা প্রিয়জনের রূহের সাথে মিলিত হয়। আর ঐ মৃত ব্যক্তির রূহ তার জানা বিষয়সমূহের সংবাদ নিদ্রিত ব্যক্তিকে দিয়ে থাকে। চতুর্থ—উরূজী স্বপ্ন: কোনো নিদ্রিত ব্যক্তির রূহ যখন আল্লাহর দিকে উড়ে যায়, তখন সে এই স্বপ্ন দেখে। পঞ্চম—জান্নাতী স্বপ্ন: এই স্বপ্নের মাধ্যমে নিদ্রিত ব্যক্তির রূহ বেহেশতে গিয়ে পৌঁছে এবং সেখানে অনেক কিছু দেখে ফিরে আসে।
প্রকৃতপক্ষে, জীবিত ও মৃতদের রূহ একত্রিত হওয়ার বিষয়টিও সত্য স্বপ্নেরই রকম বিশেষ যেটা মানুষের কাছে অনুভূত বিষয়সমূহের সমশ্রেণীর। তবে এ বিষয়ে মত পার্থক্য রয়েছে। কারো কারো মতে রূহের মধ্যে সর্বপ্রকার ইলম বিদ্যমান। কিন্তু জ্ঞানী ব্যক্তিদের পার্থিব কর্মচাঞ্চল্য ও ব্যস্ততা ঐ জ্ঞান অর্জনের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। তবে নিদ্রাবস্থায় যখন কোনো রূহ সাময়িকভাবে দেহ থেকে বের হয়ে যায়, তখন সেই রূহ আপন যোগ্যতা ও মর্যাদা অনুযায়ী অনেক বিষয় অবলোকন করে থাকে। আর যেহেতু মৃত্যুজনিত কারণে দেহ থেকে রূহ পুরোপুরিভাবে মুক্তি লাভ করে, সেই হেতু রূহ জ্ঞান ও চরম উৎকর্ষ লাভ করে। কিন্তু এর মধ্যেও কিছু সত্য ও কিছু ভ্রান্তির অবকাশ রয়েছে। কেননা, মুক্তিপ্রাপ্ত রূহ ছাড়া ঐসব জ্ঞান লাভ করা কারো পক্ষে সম্ভব নয়।
কোনো রূহ পুরোপুরি মুক্তি লাভ করা সত্ত্বেও, আল্লাহর ঐসব জ্ঞান সম্পর্কে অবহিত হতে পারে না, যেসব জ্ঞান তিনি তার রাসূলগণকে প্রদান করে দুনিয়াতে প্রেরণ করেছেন। আর রূহ, পূর্ববর্তী নবী ও তাঁদের কাওমের বিস্তারিত কোনো তথ্য, যেমন—পরকাল, কিয়ামতের আলামত, কোনো কাজের ভালোমন্দ ফলাফল, আল্লাহর আদেশ-নিষেধের বিবরণ, আল্লাহ পাকের আসমাউল-হুসনা, আল্লাহর গুণাবলী, কার্যাবলী ও শরীআতের বিস্তারিত বিষয়টিও জানতে পারে না। কেননা এই সমস্ত বিষয় শুধু ওহী বা প্রত্যাদেশের মাধ্যমে জানা যায়। মুক্তি প্রাপ্ত রূহের পক্ষে এসব বিষয় জানা সহজ হয়ে উঠে। তবে ওহীর মাধ্যমে যে জ্ঞান লাভ করা যায়, সেটাই শ্রেষ্ঠ ও সঠিক।
কারো কারো দৃষ্টিতে স্বপ্ন হলো ঐ জ্ঞান, যা আল্লাহ পাক বিনা কারণেই সৃষ্টির শুরু থেকে মানুষের অন্তরে গচ্ছিত রেখেছেন। এই অভিমত ঐসব লোকের, যাঁরা পার্থিব কার্যকরণ ও হিকমতকে অস্বীকার করেন। তাঁদের এই ধারণা সঠিক নয়, বরং এটা শরীআত ও সাধারণ বিবেক-বুদ্ধিরও পরিপন্থী। আল্লাহ তা'আলা বান্দার যোগ্যতা অনুযায়ী কোনো কোনো কথা উপমার আকারে বর্ণনা করে থাকেন। তাই কখনো কখনো উপমা বা রূপকের মাধ্যমেও স্বপ্ন দেখা যায়। আবার কখনো কখনো যা কিছু দৃষ্ট হয়, হুবহু তাই ঘটে থাকে। সত্য স্বপ্ন বাস্তব ঘটনা অনুযায়ী দৃষ্ট হয়ে থাকে।
হযরত ইবনে উমর (রা) বলেন, একবার হযরত উমর (রা) হযরত আলী (রা)-কে জিজ্ঞেস করলেন, হে আবুল হাসান, আপনি অনেক সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর খিদমতে থাকেন, আমরা যখন থাকি না। আর কোনো কোনো সময় আমরা থাকি কিন্তু আপনি থাকেন না। আমি আপনার নিকট তিনটি বিষয়ে প্রশ্ন রাখছি। এ প্রশ্নগুলোর উত্তর আপনার জানা থাকলে তা অবশ্যই বলবেন। হযরত আলী (রা) বললেন, প্রশ্নগুলো কী? হযরত উমর (রা) বললেন, একজন লোক অন্য একজন লোককে ভালোবাসেন, অথচ বিনিময়ে তিনি কোনো ভালো ব্যবহার পান না। আবার একজন লোকের সাথে অন্য একজন লোকের দুশমনী আছে, অথচ তজ্জন্য তার নিকট থেকে সে কোনো খারাপ ব্যবহার পায় না।
হযরত আলী (রা) বললেন, হ্যাঁ, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি, রূহ হচ্ছে এক সম্মিলিত সৈন্য বাহিনীর ন্যায়, এরা মহাশূন্যে একে অপরের সাথে মেলামেশা করে। তখন যেসব রূহের মধ্যে আলাপ-পরিচয় হয়, তাদের মধ্যে ভালোবাসা জন্মে এবং যাদের মধ্যে পরস্পর আলাপ-পরিচয় হয় না, তাদের মধ্যে দুনিয়ায়ও কোনো সম্পর্ক বা ভালোবাসা জন্মে না। এদের সাথে দুনিয়াতেও তারা অজানা ও অচেনা থেকে যায়। হযরত উমর (রা) বললেন, হাঁ, একটি প্রশ্নের উত্তর তো পেয়ে গেলাম। তারপর বলুন, মানুষ কেন কথা বলতে বলতে হঠাৎ সে কথা ভুলে যায়, তারপর ভুলে যাওয়া কথা আবার মনে পড়ে, এর কারণ কী? হযরত আলী (রা) বললেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, প্রত্যেক মানুষের অন্তরে এক প্রকার মেঘমালা রয়েছে, যেমন মেঘমালা চাঁদের জন্য রয়েছে। যখন চাঁদকে মেঘমালা ঢেকে দেয়, তখন চাঁদের আলো ঢাকা পড়ে যায়। তারপর যখন মেঘমালা সরে যায়, তখন চাঁদ আবার আলোকিত হয়ে উঠে। ঠিক এমনিভাবে, কথাবার্তার মাঝে মানুষের স্মৃতিশক্তির ওপরও মেঘমালা ছেয়ে যায়, ফলে সে ব্যক্তি ঐকথা ভুলে যায়। আবার যখন মেঘমালা সরে যায় তখন ভুলে যাওয়া কথা তার মনে পড়ে। হযরত উমর (রা) বললেন, হ্যাঁ, দু'টি প্রশ্নের উত্তর পেয়ে গেলাম। তিন—তারপর হযরত উমর (রা) বললেন, মানুষ স্বপ্ন দেখে, কিন্তু কোনো কোনো স্বপ্ন সত্য হয়, আবার কোনো কোনো স্বপ্ন মিথ্যে হয়, এর কারণ কী? হযরত আলী (রা) বললেন, হাঁ, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, আল্লাহর একজন প্রিয় বান্দা যখন গভীর নিদ্রায় মগ্ন থাকেন, তখন তাঁর রূহ আরশ পর্যন্ত পৌঁছে যায়, সে সময় তিনি যে স্বপ্ন দেখেন, তা সত্য হয়। অন্যথায়, সে স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে যায়, তা সত্য পরিণত হয় না। তখন হযরত উমর (রা) বললেন, আলহামদুলিল্লাহ, আমি মৃত্যুর পূর্বে আমার তিনটি প্রশ্নের উত্তর পেয়ে গেলাম।
হযরত উমর ইবনে খাত্তাব (রা) আরো বলেন, আশ্চর্যের বিষয় এই যে, কোনো সময় মানুষ এমন সব স্বপ্ন দেখে যা কখনো তার অন্তরে উদিত হয়নি, অথচ সে স্বপ্ন সত্যে পরিণত হয়। আবার কোনো কোনো সময় এমন সব স্বপ্নও দেখে যা কখনো সত্যে পরিণত হয় না। একথা শুনে হযরত আলী (রা) বললেন, আল্লাহ তা'আলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন, "আল্লাহ মৃত্যুর সময় রূহকে কবয করেন। আর যারা জীবিত, তাদের রূহকে নিদ্রার মধ্যে কবয করে নেন। এরপর ঐ রূহকে যেগুলোর ব্যাপারে মৃত্যু অবধারিত সেগুলো আটক করে রাখেন। আর অন্যান্য রূহকে একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত ছেড়ে দেয়া হয়। এতে অবশ্যই চিন্তাশীল লোকদের জন্য বহু নিদর্শন রয়েছে।” (সূরা আয-যুমার: আয়াত ৪২)
এছাড়া, যে সব রূহকে নিদ্রার সময় আকাশে উঠিয়ে নেয়া হয়, তারা আসমানে যা কিছু দেখে আসে ঐগুলো সঠিক প্রমাণিত হয়। আর যখন ঐসব রূহকে নিজ নিজ দেহের দিকে ফিরিয়ে আনা হয়, তখন মহাশূন্যে তাদের সাথে শয়তানের দেখা হয়। এই সুযোগে এদেরকে শয়তান মিথ্যে কথা শিখিয়ে দেয়। শয়তানের এই ধরনের শিখিয়ে দেয়া স্বপ্নই মিথ্যে হয়ে থাকে। (কিতাবুন নুফুস ওয়াররূহ)
একবার হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা) হযরত উমর ইবনে খাত্তাব (রা)-কে বললেন, হে আমীরুল মুমিনীন! আমি আপনার নিকট থেকে কয়েকটি বিষয় জানতে চাই। মানুষ কথা বলতে বলতে হঠাৎ কোনো কথা ভুলে যায়, আবার ভুলে যাওয়া কথা মনে পড়ে এবং মানুষের স্বপ্ন কখনো সত্য হয়, আবার কখনো মিথ্যে হয়, এর কারণ কী? হযরত উমর (রা) বললেন, মানুষের অন্তরে এক প্রকার মেঘমালা রয়েছে যেমন চাঁদেরও মেঘমালা রয়েছে। যখন মেঘমালা মানুষের অন্তরকে ঢেকে দেয় তখন সে তার কথা ভুলে যায়। আর যখন মেঘমালা সরে যায় তখন ভুলে যাওয়া কথা তার মনে পড়ে। আর মানুষের স্বপ্ন কখনো সত্য আবার কখনো মিথ্যে হওয়ার কারণ হলো—আল্লাহ পাক ইরশাদ করেন, "আল্লাহ মৃত্যুর সময় রূহ কবয করে নেন, এরপর যেগুলোর ব্যাপারে মৃত্যু অবধারিত সেগুলো রেখে দেয়া হয়। আর অন্যান্য রূহগুলোকে একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত ছেড়ে দেয়া হয়। এতে অবশ্যই চিন্তাশীল লোকদের জন্য নিদর্শন রয়েছে।” (সূরা আয-যুমার: আয়াত ৪২)
উপরোক্ত আলোচনার প্রেক্ষাপটে এটাই প্রমাণিত হয় যে, যে সব রূহ ঊর্ধ্বলোকে প্রবেশ করে তাদের স্বপ্ন সত্য হয়, আর যে সব রূহ ঊর্ধ্বলোকের বাইরে থাকে তাদের স্বপ্ন মিথ্যে হয়। এ প্রসঙ্গে তাবারানী গ্রন্থে হযরত ইবনে আব্বাস (রা)-এর রেওয়ায়েতটিও নিম্নে বর্ণিত ঘটনাবলীকে সমর্থন করে। হযরত আবূ দারদা (রা) কর্তৃক একটি রেওয়ায়েত বর্ণিত আছে যে, যখন কোনো নেককার বান্দা ঘুমিয়ে পড়েন, তখন তাঁর রূহ ওপরের দিকে ছুটে যায়, এমনকি আরশের নিকট গিয়ে পৌঁছে। যদি ঘুমন্ত ব্যক্তি পাক অবস্থায় থাকেন, তাহলে তাঁর রূহ আল্লাহকে সিজদাহ করার অনুমতি লাভ করে। আর যদি সে ব্যক্তি নাপাক অবস্থায় থাকে তাহলে সিজদাহ করার অনুমতি সে পায় না।
এই প্রসঙ্গে হযরত ইবনে মাসউদ (রা) থেকে বর্ণিত, রূহ হলো এক সম্মিলিত সৈন্য বাহিনীর ন্যায়, এরা পরস্পর মেলামেশা করে। এদের মধ্যে কোনো কোনো রূহ এক জাতীয় ঘোড়ার মতো অশুভ ও অপয়াও হয়ে থাকে। সুতরাং যেই রূহের মধ্যে পরস্পর পরিচয় হয়, তাদের মধ্যে ভালোবাসাও জন্মে। আর যাদের মধ্যে কোনো পরিচয় হয় না, তাদের মধ্যে দুনিয়ায়ও কোনো সম্পর্ক স্থাপিত হয় না। এরূপ ধারণা বহু পূর্ব হতে মানুষের মধ্যে প্রচলিত আছে। জামীল ইবনে মুআম্মার তাঁর এক কবিতায় বলেন, "আমি সারাদিন হতবুদ্ধি হয়ে থাকি, কিন্তু রাত্রে স্বপ্নে আমার রূহ আমার প্রেয়সীর রূহের সাথে দেখা-সাক্ষাৎ করে আসে।"
জীবিত মানুষও সময় সময় অন্য জীবিত মানুষকে স্বপ্নে দেখে থাকে এবং তাকে সম্বোধন করে কথাবার্তাও বলে থাকে। অনেক সময় উভয়ের মধ্যে বিরাট দূরত্ব থাকা সত্ত্বেও একে অন্যকে সম্বোধন করে কথাবার্তা বলে। এই অবস্থায় তাদের রূহ কীভাবে মিলিত হতে পারে? এর উত্তর হলো, এটা হচ্ছে একটি সাদৃশ্য বা উপমার ব্যাপার, যাকে স্বপ্নের ফেরেশতারা সাদৃশ্যের অনুকরণে পেশ করে থাকেন। আসলে একজন স্বপ্ন দর্শনকারীর ধ্যান-ধারণা ও কল্পনা তার স্বপ্নের মধ্যে কোনো আকৃতি ধারণ করে সামনে আসে। যেমন: হাবীব ইবনে আউস তাঁর এক কবিতায় বলেন, “হে আমার প্রেয়সী! আল্লাহ তোমার চিন্তাধারাকে সজীব রাখুন। তার বদৌলতে তোমার সাথে আমার যিয়ারত সম্পন্ন হয়েছে। হে আমার কল্পনা, তোমার জন্য আমার প্রাণ উৎসর্গ হোক। তোমারই বদৌলতে আমি আমার প্রেয়সীর সামনা-সামনি হয়ে থাকি।"
কোনো কোনো সময় দু'টি রূহের মধ্যে বিশেষ সম্পর্ক স্থাপিত হয় এবং তাদের মধ্যে নিবিড় ও গোপন যোগাযোগ গড়ে উঠে। এরই ফলশ্রুতিতে এক ব্যক্তির রূহ অন্য কোনো ব্যক্তির রূহের কোনো না কোনো ঘটনা অবহিত হয়ে থাকে। অনেক লোক এ বিষয়ে বহু আশ্চর্যজনক ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছেন। মোট কথা, জীবিতদের রূহ অপর জীবিতদের রূহের সাথেও একত্রিত হয়ে থাকে। অনুরূপভাবে, মৃত ব্যক্তিদের রূহ জীবিত মানুষের রূহের সাথেও মিলিত হয়।
প্রথম যুগের কোনো কোনো আলিমের অভিমত হলো, মহাশূন্যে রূহের পরস্পর সাক্ষাৎকার ও পরিচয় ঘটে থাকে। এদের মধ্যে কথোপকথনও হয়। তারপর স্বপ্নের ফেরেশতা ভালো-মন্দ বিষয় নিয়ে এদের কাছে হাযির হন যা তাদের সঙ্গে সংঘটিত হবে। আল্লাহ তা'আলা সত্য স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য একজন ফেরেশতাকে নির্দিষ্ট করে রেখেছেন। তিনি পৃথক পৃথকভাবে প্রত্যেক ব্যক্তিকে জানেন ও চিনেন। আল্লাহ তা'আলা ঐ ফেরেশতাকে প্রত্যেক ব্যক্তির অবস্থা সম্পর্কে জ্ঞান দিয়ে রেখেছেন। সেই ফেরেশতা সকল অনাগত, ইহলৌকিক, পারলৌকিক ও ধর্মীয় ঘটনাবলী অবগত আছেন এবং মানুষের সব রকমের অবস্থা উত্তমরূপে জ্ঞাত আছেন, তাঁর কোনো কিছুই অজানা নেই। আর সেই ফেরেশতা তাঁর জানা বিষয়ে কোনো ভুল করেন না। ঐ ফেরেশতা উম্মুল কিতাব অর্থাৎ আল্লাহর অদৃশ্যের ভাণ্ডার থেকে সে সব ঘটনাবলীর পাণ্ডুলিপি যা মানুষের জীবনে ঘটবে, তা অবহিত হন। তারপর ঐ ফেরেশতা তা রূপক ও উপমার সাহায্যে সহজভাবে মানুষের সামনে উপস্থাপন করেন। তাই কখনো কখনো সেই ফেরেশতা মানুষের অতীত বা ভবিষ্যৎ কল্যাণ সম্পর্কে শুভ সংবাদ দিয়ে থাকেন। আবার কখনো কখনো ঐ সব গুনাহ সম্পর্কে যা সে করার ইচ্ছা পোষণ করেছিল বা যে গুনাহে সে জড়িয়ে পড়েছিল, সে সব ব্যাপারেও তাকে ভয়-ভীতি দেখানো হয়। আর কোনো কোনো সময় ঐ ফেরেশতা মানুষের মন্দকাজ সম্পর্কে ঘৃণা প্রদর্শন করেন যা পূর্বে সম্পন্ন হয়ে গিয়েছে। অন্যান্য যেসব কারণে মানুষের মধ্যে সংঘর্ষ বাঁধে, সেগুলোকে তিনি মিটিয়ে দেন। এছাড়া আল্লাহ তা'আলা স্বপ্নযোগ-সুবিধা রেখে দিয়েছেন। আর আল্লাহ তা'আলা রূহের পরস্পর সাক্ষাৎকার ও পরিচিতি নির্ধারণ করে দিয়েছেন। তাই স্বপ্নের মাধ্যমেও অনেক লোকের সংশোধন হয়ে যায়। আর তাঁরা গুনাহ থেকে খাঁটি অন্তঃকরণে তাওবাহ করে আল্লাহর প্রিয়ভাজন হয়ে যান এবং আখিরাতের সঠিক পথের সন্ধানও পেয়ে যান। এমনকি অনেকে স্বপ্নের মাধ্যমে লুক্কায়িত ধন-সম্পদও লাভ করে থাকেন।
জনৈক বুযুর্গব্যক্তি বর্ণনা করেছেন, একবার আমরা তিন জন লোক সফরে রওয়ানা হলাম। এই সফরের মধ্যে আমাদের একজন ঘুমিয়ে পড়লেন। আমরা দেখলাম, তাঁর নাক থেকে একটি রৌশনী বের হয়ে নিকটবর্তী একটি গর্তে চলে গেল, তারপর ফিরে এসে আবার তাঁর নাকে প্রবেশ করল। লোকটি চোখ মেলে উঠে বসলেন আর বললেন, আমি একটি আশ্চর্যজনক স্বপ্ন দেখেছি, আমি দেখলাম ঐ গর্তে প্রচুর ধন-সম্পদ রয়েছে। অতঃপর আমরা ঐ গর্তে প্রবেশ করলাম এবং সেখানে ধনভাণ্ডারের কিছু অংশ যা তিনি স্বপ্নে দেখেছিলেন, তা পেয়ে গেলাম। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দাদা আবদুল মুত্তালিবকে স্বপ্নের মাধ্যমে যমযম কূপের অবস্থান বলে দেয়া হয়েছিল। সেখান থেকে তিনি ধনভাণ্ডারও লাভ করেছিলেন।
এক সময় হযরত উমায়ের ইবনে ওহাব (রা)-কে স্বপ্নে বলা হয়েছিল, আপনি আপনার ঘরের অমুক অমুক জায়গা খনন করুন, সেখানে আপনার পিতার পুঁতে রাখা ধন-সম্পদ পাবেন। ইনতেকালের পূর্বে তাঁর পিতা যে ধন-সম্পদ পুঁতে রেখেছিলেন, সে সম্পর্কে তিনি অসিয়ত করে যাবার সুযোগ পাননি। হযরত উমায়ের (রা) এই স্বপ্ন দেখার পর ঐ জায়গা খুঁড়েন এবং সেখান থেকে দশ হাজার দিরহাম ও বিপুল পরিমাণ সোনাদানা পেয়েছিলেন। তা দিয়ে তিনি ঋণ পরিশোধ করেন ও তাঁর জীবনযাত্রার মানও উন্নত করেন। এটা ছিল তাঁর ইসলাম গ্রহণের পরের ঘটনা। যখন এই ধন-সম্পদ পাওয়া গেল, তখন তাঁর ছোট মেয়েটি তাঁকে বলেছিল, "আব্বা, যে মা'বূদ আমাদেরকে দীনের বদৌলতে নবজীবন দান করেছেন, তিনি নিশ্চয় 'হুবল' ও 'উয্যা' দেবদেবীর থেকে উত্তম। কেননা মাত্র কিছু দিন থেকে আমরা তাঁর ইবাদত শুরু করেছি। আর তিনি আপনাকে এই বিপুল ধন-সম্পদের মালিক করে দিয়েছেন।"
হযরত আলী ইবনে আবূ তালিব কায়রাওয়ানী (র) যিনি একজন স্বপ্নের ব্যাখ্যাকারী ছিলেন, তিনি বলেন, হযরত উমায়ের (রা)-এর স্বপ্নের উক্ত ঘটনাটি এতো আশ্চর্যজনক নয়, এর চেয়েও বিস্ময়কর যে ঘটনা আমি নিজের জীবনে, নিজের শহরে, নিজের চোখে হযরত আবূ আবদুল্লাহ (র)-এর মাধ্যমে প্রত্যক্ষ করেছি। হযরত আবূ আবদুল্লাহ (র) একজন নেককার বান্দা ছিলেন। তিনি মৃতদেরকে স্বপ্নে দেখে তাঁদের কাছ থেকে গোপনীয় অনেক তথ্য জেনে নিতেন এবং এসব বিষয় তাঁদের পরিবার-পরিজন আত্মীয় স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবদেরকে বলে দিতেন। এ ব্যাপারে তিনি একজন পারদর্শী ব্যক্তি ছিলেন। তাই দেশবিদেশে এ জন্যে তাঁর সুনাম ও পরিচিতি ছড়িয়ে পড়েছিল। অনেক দূর থেকে কেউ এসে তাঁকে বলত, আমার অমুক বন্ধু ইনতেকাল করেছেন, তাঁর কাছে ধন-সম্পদ ছিল কিন্তু তা কোথায় আছে তা তিনি মৃত্যুর পূর্বে কাউকে বলে যাবার সুযোগ পাননি। কোথায় সে সব ধন-সম্পদ তিনি পুঁতে রেখেছিলেন তা আমরা জানি না। তিনি এরূপ কথা শুনে বলতেন, আল্লাহ যদি চান তা অবশ্যই পাওয়া যাবে। তুমি আগামীকাল এসো। তিনি আল্লাহর কাছে দু'আ করে ঘুমিয়ে পড়তেন এবং রাতে উল্লেখিত মৃত ব্যক্তিকে স্বপ্নে দেখে তার কাছ থেকে সেই পুঁতে রাখা ধন-সম্পদের কথা জেনে নিতেন।
একবার একজন নেককার বৃদ্ধা মহিলা ইনতেকাল করলেন। তাঁর কাছে জনৈকা মহিলা সাতটি দীনার আমানত রেখেছিলেন। ঐ মহিলা কাঁদতে কাঁদতে হযরত আবূ আবদুল্লাহ (র)-এর কাছে এসে সমস্ত বৃত্তান্তসহ তাঁর নাম ঠিকানা বলে বিদায় নিলেন। দ্বিতীয় দিন সেই মহিলা আবার তাঁর কাছে আসলেন। হযরত আবূ আবদুল্লাহ (র) তাঁকে বললেন, "ঐ বৃদ্ধা স্বপ্নের মধ্যে আমাকে বলেছেন, তাঁর ঘরের ছাদে সাতটি বর্গা আছে, আর আপনার দীনারগুলো সপ্তম বর্গার মধ্যে রেশমী কাপড়ে বাঁধা অবস্থায় আছে। সেখান থেকে দীনারগুলো আপনাকে নিয়ে যেতে বলেছেন। সেই নির্দেশ অনুযায়ী তিনি তাঁর দীনারগুলো সেখানে পেয়ে গেলেন।
হযরত আবূ আবদুল্লাহ (র) আরো বলেন, আমার কাছে একজন বিশ্বস্ত লোক একটি ঘটনা বর্ণনা করেছিলেন। একজন মহিলা কোনো এক ব্যক্তিকে শ্রমিক হিসেবে নিয়োগ করেছিলেন যেন সে তাঁর পুরাতন ঘরটি ভেঙে সেখানে একটি নতুন ঘর তৈরি করে দেয়। শ্রমিকটি যখন ঘরটি ভাঙতে লাগল, তখন ঐ মহিলা এবং তার পরিবারের অন্য কেউই ঘর থেকে বের হলো না। কাজের লোকটি জিজ্ঞেস করল, ব্যাপার কী? ঐ মহিলা বললেন, এই ঘর ভেঙে ফেলার কোনো প্রয়োজন আমার ছিল না। কিন্তু আমার আব্বা ইন্তেকাল করেছেন, তিনি ছিলেন একজন ধনী ব্যক্তি। অথচ তাঁর ইনতিকালের পর আমরা বিশেষ কোনো ধন-সম্পদ পাইনি। তাই ভাবলাম, তাঁর ধন-সম্পদ হয়তো মাটির নিচে পুঁতে রাখা হয়েছে। তাই ঘরটি ভেঙে ফেলার সিদ্ধান্ত নিলাম, যাতে এর মধ্যে কিছু ধন-সম্পদ পাওয়া যায়। তখন উপস্থিত জনৈক ব্যক্তি বললেন, এর চেয়ে সহজ অন্য একটি পন্থা আছে, যা তোমাকে বলতে আমি ভুলেই গিয়েছিলাম। ঘরের মালিক বললেন, সেটা কী? সে ব্যক্তি তখন বললেন, অমুক ব্যক্তির কাছে গিয়ে ঘটনাটি ব্যক্ত করুন হয়তো তিনি আপনার পিতাকে স্বপ্নে দেখে তাঁর কাছ থেকে সব কিছু জেনে নিতে পারবেন। অযথা পরিশ্রম ও অর্থ ব্যয় ছাড়াই আপনি আপনার পিতার ধন-সম্পদ পেয়ে যাবেন। তখন মহিলাটি সেই ব্যক্তির কাছে গেলেন এবং তাঁর ও তাঁর পিতার নাম তাঁর কাছে বলে আসলেন। পরের দিন প্রত্যুষে তিনি ঐ ব্যক্তির কাছে গেলে তিনি বললেন, আমি আপনার পিতাকে স্বপ্নে দেখেছি এবং তাঁর কাছে মালামাল সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছি। তিনি বলেছেন, ঐ ধন-সম্পদ মিহরাবের মধ্যে পুঁতে রাখা আছে। পরে সেই মহিলা মিহরাবের মাটি খনন করে সেই মাল উদ্ধার করলেন। কিন্তু লোকেরা মালের পরিমাণ কম দেখে আশ্চর্য হলো। এজন্য মহিলাটি আবার সেই ব্যক্তির নিকট গেলেন এবং বললেন, আপনার নির্দেশিত স্থান থেকে মাল বের হয়েছে কিন্তু তা পরিমাণে খুবই সামান্য। তিনি বললেন, আপনি আবার আগামীকাল আমার কাছে আসুন। তার পরের দিন মহিলাটি তাঁর কাছে আবার গেলেন। তিনি তখন বললেন, আপনার পিতা যাইতুন তেলের গুদাম ঘরে যে চতুষ্কোণ একটি হাউজ রয়েছে, সেটার নিম্ন অংশ খনন করতে বলেছেন। মহিলাটি ঐ নির্দেশিত কামরাটি খুললেন এবং সেখানে একটি চতুষ্কোণ হাউজ দেখতে পেলেন। সেই জায়গাটি খুঁড়লে সেখানে একটি বড় পানপাত্র পাওয়া গেল, কিন্তু এতেও মহিলাটির ধনের লিপ্সা মিটল না। তাই তিনি আবার ঐ ব্যক্তির নিকট গিয়ে সব কথা খুলে বললেন। তিনি বললেন, ঠিক আছে, আগামীকাল আবার আসুন। মহিলাটি পরের দিন খুব ভোরে সেখানে গিয়ে উপস্থিত হলেন। সেই ব্যক্তি তখন তাঁকে বললেন, আপনার পিতা বলেছেন, আপনার ভাগ্যে যা ছিল তা আপনি পেয়ে গেছেন। আপনার পিতার অবশিষ্ট ধন-সম্পদের ওপর জিনের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে, সেই সম্পদ যার ভাগ্যে আছে সেই পাবে।
এই প্রসঙ্গে আরো অনেক ঘটনা বর্ণিত আছে। স্বপ্নের মাধ্যমেও অনেক রোগের ঔষধ বলে দেয়া হয়েছে। সেই ঔষধ ব্যবহার করে আল্লাহর মেহেরবানীতে রোগীরাও আরোগ্য লাভ করেছেন। শাইখুল ইসলাম ইবনু ইমাম তাইমিয়া (র)-এর ভক্ত ছিলেন না এমন কিছু সংখ্যক লোক তাঁকে স্বপ্নে দেখে ফারায়েয সংক্রান্ত কিছু জটিল মাসয়ালা জিজ্ঞেস করেছিলেন। শাইখ সেসব প্রশ্নের যথাযথ উত্তর দিয়েছিলেন। আসলে এসব ঘটনা ঐসব লোকেরাই অস্বীকার ও অবিশ্বাস করে, যাদের রূহ সম্পর্কে কোনো সুস্পষ্ট জ্ঞান নেই। আল্লাহই আমাদের একমাত্র সহায়।<sup>*</sup>
টিকাঃ
* মানুষ মরণশীল। মৃত্যুর পর মানুষ পার্থিব দেহে আর ফিরে আসে না। তবে হাশরের দিন সকল মানুষ সশরীরে উত্থিত হবে। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে, "এরপর তোমরা মৃত্যুবরণ করবে। অতঃপর কিয়ামতের দিন তোমরা পুনরুত্থিত হবে।" (সূরা মুমিনূন: আয়াত ১৫, ১৬)
কিন্তু মৃত ব্যক্তির রূহ তার জীবিতকালের দেহের আকৃতি ধারণ করে জীবিতদের সঙ্গে দেখা করতে পারে। ওপরে বর্ণিত ঘটনাবলী ছাড়াও রূহের এরূপ আরো অনেক ঘটনা আমাদের ধর্মীয় গ্রন্থসমূহে উল্লেখ রয়েছে। এই সম্পর্কে শাহ ওয়ালী উল্লাহ দেহলভী (র)-এর সম্মানিত পিতা মাওলানা আবদুর রহীম (র)-এর ছাত্রজীবনের একটি ঘটনা এখানে উল্লেখ করা হলো:
মাওলানা আবদুর রহীম (র) থেকে বর্ণিত আছে যে, তিনি একবার আকবরবাদে তাঁর উস্তাদ মির্যা মুহাম্মদ যাহিদের কাছ থেকে ঐদিনের পড়া শেষ করে বাড়ি ফেরার পথে একটি নির্জন রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলেন। তখন তিনি মনে মনে শেখ সাদী (র)-এর এই চরণগুলো খুব আনন্দের সাথে আবৃত্তি করছিলেন—
জুয ইয়াদে দোস্ত হারছে কুনী উমর যায়ে আস্ত,
জুয সিরে ইশক হারছে বখানী বতালাত আস্ত।
সাদী বশো লাওহে দেল আয নকশে গায়বে হক,
অর্থ: বন্ধুর (আল্লাহর) স্মরণ ছাড়া অন্য যা কিছু করো, তাতে তোমার জীবন বিফল। প্রেমের রহস্য ভিন্ন যা পাঠ করো তা ধ্বংসশীল। হে সাদী! তোমার দেলের ওপরে আল্লাহ ছাড়া অন্যের যে নকশার চাপ পড়েছে, তা ধুয়ে ফেলো। কিন্তু কবিতাটির শেষ অর্থাৎ চতুর্থ পঙ্ক্তিটি তাঁর স্মরণ হচ্ছিল না। এতে তিনি খুব অস্বস্তি বোধ করছিলেন। হঠাৎ তাঁর সামনে এক সৌম্য দর্শন বৃদ্ধ লোক উপস্থিত হলেন এবং ঐ কবিতার চতুর্থ পংক্তিটি তাঁকে বলে দিলেন। পঙ্ক্তিটি হলো—"ইলমে কে রাহ বহক্ক নানুমায়েদ জেহালাত আস্ত।” অর্থাৎ যে বিদ্যা সত্যের সন্ধান দেয় না, তা অধিক মূর্খতাই বৃদ্ধি করে। এই চতুর্থ পঙ্ক্তিটি জানতে পারায় তিনি খুব উৎফুল্ল বোধ করলেন এবং ঐ লোকটিকে বললেন, "আল্লাহ আপনার মঙ্গল করুন, আপনি আমার মনের অস্বস্তি দূর করে দিয়েছেন।"... এরপর আগন্তুক তাঁকে বললেন, "আমাকে তাড়াতাড়ি যেতে হবে।” তিনি বললেন, "চলুন।” এরপর তাঁরা উভয়ে চলতে লাগলেন। মাওলানা আবদুর রহীম (র) তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, "জনাব! আপনার পরিচয়?” তিনি বললেন, "আমি শেখ সাদী"। এই বলে তিনি অদৃশ্য হয়ে গেলেন। (তথ্যসূত্র: আনফাসুল আরেফীন, শাহ ওয়ালী উল্লাহ দেহলভী র.।) -অনুবাদক