📘 রূহের খোরাক > 📄 প্রশংসিত প্রেম

📄 প্রশংসিত প্রেম


আল্লাহ ও রাসূলের প্রেমের কথা তো পূর্বেই গত হয়েছে। এই প্রেমের ঘোর ব্যতীত একজন মানুষ পরিপূর্ণ মুমিনই হতে পারে না। এরপরে আছে পবিত্র কুআনের প্রেম। কুরআন তিলাওয়াত করা, শ্রবণ করা, এর উপর আমল করা পবিত্র কুরআনের প্রতি প্রেমের প্রকাশক্ষেত্র। এই প্রেম মুখের ঔজ্জ্বল্য বাড়ায়। বক্ষ প্রশস্ত করে। হৃদয় জাগ্রত করে।
এ ছাড়াও এ প্রকারের প্রেমের মধ্যে আছে দুই বন্ধুর মাঝে ভালোবাসা। এই ভালোবাসা মনকে হালকা করে, কৃপণকে দানশীল বানায়, ভীরুকে সাহসী করে, নির্বোধকে করে তোলে মেধাবী।
এই সুখের কথাই নবীজি বলেছেন হাদীসে-
كُلٌّ لَهُو يَلْهُو بِهِ الرَّجُلُ فَهُوَ بَاطِلُ إِلَّا رَمْيَهُ بِقَوْسِهِ، وَتَأْدِيبَهُ فَرَسَهُ، وَمُلَاعَبَتَهُ امْرَأَتَهُ، فَإِنَّهُنَّ مِنَ الْحَقِّ
'মানুষের সকল আনন্দই মিছে, তবে তির নিক্ষেপ, ঘোড়া-প্রতিযোগিতা ও স্ত্রীর সাথে খুনসুটি ছাড়া। এগুলো কর্তব্যের মধ্যে পড়ে।[১]

টিকাঃ
[১] তিরমিযী, হাদীস-ক্রম: ১৬৩৭

📘 রূহের খোরাক > 📄 দাম্পত্য-জীবনের প্রেম

📄 দাম্পত্য-জীবনের প্রেম


দাম্পত্য-জীবনে স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক প্রেমে তিরস্কারের তো কিছু নেইই, বরং এই প্রেম না থাকলে দাম্পত্য-জীবন অপূর্ণ থেকে যায়। এটি বান্দার প্রতি মহান আল্লাহর অনুগ্রহ। এ মর্মে তিনি পবিত্র কুরআনে বলেছেন-
وَمِنْ آيَاتِهِ أَنْ خَلَقَ لَكُمْ مِنْ أَنْفُسِكُمْ أَزْوَاجًا لِتَسْكُنُوا إِلَيْهَا وَجَعَلَ بَيْنَكُمْ مَوَدَّةً وَرَحْمَةً إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآيَاتٍ لِقَوْمٍ يَتَفَكَّرُونَ
'তাঁর (আল্লাহর) একটি নিদর্শন হলো, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদেরই মধ্য থেকে সৃষ্টি করেছেন তোমাদের স্ত্রী-পরিজন। যেন তোমরা তার কাছে গিয়ে প্রশান্তি লাভ করতে পার। এবং তিনি তোমাদের পরস্পরের মধ্যে ভালোবাসা ও দয়া সৃষ্টি করে দিয়েছেন। নিশ্চয় তাতে নিদর্শন রয়েছে এমন সম্প্রদায়ের জন্য, যারা চিন্তা করে। [১]
জাবির সূত্রে বর্ণিত, নবীজি একবার এক নারীকে দেখলেন। তৎক্ষণাৎ যাইনাব রাদিয়াল্লাহু আনহার কাছে গিয়ে আপন প্রয়োজন পূরণ করলেন এবং বললেন-
إِنَّ الْمَرْأَةَ تُقْبِلُ فِي صُورَةٍ شَيْطَانٍ، وَتُدْبِرُ فِي صُورَةٍ شَيْطَانٍ، فَإِذَا رَأَى أَحَدُكُمُ امْرَأَةً فَأَعْجَبَتْهُ فَلْيَأْتِ أَهْلَهُ، فَإِنَّ ذَلِكَ يَرُدُّ مَا فِي نَفْسِهِ
'কখনো শয়তানের অবয়বে নারী সামনে আসে। শয়তানের অবয়বে ফিরে যায়। কোনো নারীকে দেখে যদি ভালো লেগে যায়, তাহলে স্ত্রীর কাছে যাও। এটা মনের ধোঁকা দূর করে দেবে।' [২]
উল্লিখিত হাদীস থেকে মানব জাতির জন্য অনেক কিছু শেখার আছে।
প্রথমত, নবীজি এ হাদীসে মানুষকে হারামভাবে-কাঙ্ক্ষিত বিষয়ের বিকল্পে সমপর্যায়ের হালাল জিনিস গ্রহণের মাধ্যমে সান্ত্বনা লাভ করার পথ দেখিয়েছেন। এক খাবারের স্থলে অন্য খাবার, বা এক পোষাকের বিকল্পে অন্য পোষাক গ্রহণ করে বান্দা যেমন তার সাধ্যের মাঝে চাহিদাকে পূরণ করে, তেমনি অন্য নারীর প্রতি মুগ্ধতার চাহিদা নিজ স্ত্রীর দ্বারাও পূরণ করা যায়।
দ্বিতীয়ত, কোনো হারাম নারীর কারণে যদি পুরুষের মাঝে কামভাব জাগ্রত হয়, তাহলে সেই কামভাব পূরণের চিকিৎসার জন্য ওষুধ বাতলে দেয়া হয়েছে উক্ত হাদীসে। নিজ স্ত্রীর একান্ত সান্নিধ্য ও সহবাসের দ্বারা মানুষ তার কামভাব পূরণ করে নিজেকে গুনাহ থেকে ফিরিয়ে রাখতে পারে। এজন্যই পরস্পরের প্রতি আসক্ত প্রেমিক-প্রেমিকাকে শরীয়ত বিয়ের প্রতি আগ্রহী করেছে-
لَمْ يُرَ لِلْمُتَحَاتِينَ مِثْلُ النِّكَاحِ
'পরস্পরের প্রতি আসক্ত দুই প্রেমিক-প্রেমিকার জন্য বিয়ের চেয়ে উত্তম কোনো পথ নেই।' [১]
কেউ যদি কাউকে ভালোবেসে ফেলে, তাহলে তার শরীয়তসম্মত সর্বোত্তম ওষুধ হলো তাকে বিয়ে করে ফেলা। দাউদ আলাইহিস সালাম এই ওষুধই গ্রহণ করেছিলেন। [২]
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-
حُبِّبَ إِلَيَّ مِنْ دُنْيَاكُمُ النِّسَاءُ وَالطِيبُ، وَجُعِلَتْ قُرَّةُ عَيْنِي فِي الصَّلَاةِ
'দুনিয়ার দুইটি জিনিস আমি ভালোবাসি। নারী ও সুগন্ধি। আর নামাযে আমার চোখের শীতলতা রাখা হয়েছে।[৩]
ইমাম আহমাদ তাঁর বিখ্যাত কিতাব আয-যুহদে উপরোক্ত হাদীসের আরেকটু অংশ উল্লেখ করেছেন। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-
أَصْبِرُ عَنِ الطَّعَامِ وَالشَّرَابِ وَلَا أَصْبِرُ عَنْهُنَّ
'আমি খাদ্য ও পানীয়ের ক্ষেত্রে ধৈর্য ধরতে পারি, কিন্তু স্ত্রীদের ব্যাপারে না।'[১]
উম্মাহাতুল মুমিনীন নবীপত্নীদের প্রতি নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রীতি ও ভালোবাসা দেখে মদীনার ইহুদীরা হিংসার অনলে জ্বলতে থাকত। আল্লাহ তাআলা তাদের ব্যাপারে আয়াত নাযিল করেন-
أَمْ يَحْسُدُونَ النَّاسَ عَلَى مَا آتَاهُمُ اللَّهُ مِنْ فَضْلِهِ فَقَدْ آتَيْنَا آل إِبْرَاهِيمَ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ وَآتَيْنَاهُمْ مُلْكًا عَظِيمًا
'নাকি আল্লাহ তাআলা লোকদেরকে যে শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন, সে ব্যাপারে তারা তাদেরকে হিংসা করে? আর অবশ্যই আমি ইবরাহীমের বংশধরে দান করেছি আমার কিতাব ও প্রজ্ঞাজ্ঞান। এবং দান করেছি এক বিশাল রাজত্ব।'[২]
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞেস করা হলো, 'দুনিয়াতে কে আপনার সবচেয়ে প্রিয়?' নবীজি বললেন, 'আয়েশা।'[৩]
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে খাদীজা রাদিয়াল্লাহু আনহা'র ব্যাপারে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি উত্তর দিলেন, 'খাদীজার ভালোবাসা আমার অন্তরে ঢেলে দেয়া হয়েছে।'[৪]
আব্বাস বলেন, 'অধিক স্ত্রীর অধিকারী ব্যক্তি হলো এই উম্মতের শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি।'

টিকাঃ
[১] সূরা রুম, আয়াত-ক্রম: ২১
[২] তিরমিযী, হাদীস-ক্রম: ১১৫৮
[১] ইবনু মাজাহ, হাদীস-ক্রম: ১৫০৯
[২] দাউদ আলাইহিস সালাম বিয়ে-বহির্ভূতভাবে কোনো নারীর সাথে প্রেম করেছিলেন, এমন কথা একটি ভিত্তিহীন বর্ণনা থেকে এসেছে। কোনো কোনো মুফাসসির নিজ নিজ তাফসীরগ্রন্থে নির্ভরযোগ্য কোনো সূত্র ছাড়াই এ সংক্রান্ত একটি ঘটনা উল্লেখ করেছেন। ঘটনাটিতে দেখা যায়, আল্লাহর রাসূল দাউদ এক নারীর প্রতি মোহগ্রস্ত হয়ে তার বর্তমান স্বামীকে হত্যা করে তাকে বিবাহ করেন। নাউযুবিল্লাহ! এ সমস্ত ঘটনার নির্ভরযোগ্য কোনো সূত্র যেমন নেই, তেমনি একজন মুমিনের জন্য তা বিশ্বাস করাও মারাত্মক ধৃষ্টতা। হাফিয ইবনু কাসীর বলেন, এ সংক্রান্ত যত ঘটনা মুফাসসিরগণ উল্লেখ করেছেন তার অধিকাংশই ইসরাঈলী বর্ণনা থেকে গৃহীত। নবীজি সূত্রে সরাসরি এ বিষয়ে কোনো হাদীস বর্ণিত হয়নি। -তাফসীরু ইবনি কাসীর-৪/৭৬। এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে পড়ুন আল্লামা রাযী রচিত আত-তাফসীরুল কাবীর, সূরা সোয়াদ, আয়াত-ক্রম: ২১-২৫-এর আলোচনায়। -সম্পাদক
[৩] নাসায়ী, হাদীস-ক্রম: ৩৯৩৯
[১] হাদীসের কোনো কিতাবে এই অংশটি পাওয়া যায় না। ইবনুল কাইয়্যিম কিতাবুয যুহদের উদ্ধৃতি দিলেও কিতাবুয যুহদের বেশ কিছু পাণ্ডুলিপিতে এই অংশটি নেই। ইমাম সুয়ূতী বলেন, কিতাবুয যুহদের মূল পাণ্ডুলিপি বেশ কয়েকবার ঘেঁটেও হাদীসটি আমি পাইনি। শুধু কিতাবুয যুহদের সংযোজিত অংশে হাদীসটি পাওয়া যায়। -ফায়যুল কাদীর-৩/৩৭০
[২] সূরা নিসা, আয়াত-ক্রম: ৫৪
[৩] তিরমিযী, হাদীস-ক্রম: ৩৮৯০
[৪] মুসলিম, হাদীস-ক্রম: ২৪৩৫

📘 রূহের খোরাক > 📄 নারী-প্রেমের প্রকার

📄 নারী-প্রেমের প্রকার


১. আপন স্ত্রী ও দাসীর প্রেম। এটি প্রসংশিত। এর মাধ্যমে গুনাহ থেকে বাঁচা যায়। শরীয়ত মানবজীবনের জন্য যে মহৎ উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে বৈবাহিক জীবনের ব্যবস্থা রেখেছে, তা পূরণ হয়। চোখ ও মনের সর্বোত্তম ব্যবহার হয় এই প্রেমের কারণে। হারাম জায়গা থেকে মন ও চোখকে ফিরিয়ে রাখা যায়।
২. বৈধ প্রেম। তা হলো, অনিচ্ছাকৃতভাবে, কোনো সুন্দরী নারীকে হঠাৎ দেখে অথবা তার বর্ণনা শুনে মনে প্রেমভাব জাগ্রত হওয়া। এ প্রেম থেকে মনকে শীঘ্রই দূরে সরিয়ে নিতে হবে। এ প্রেমকে প্রকাশ না করে দ্রুততম সময়ে তা থেকে পবিত্র হতে হবে।
৩. জঘন্য প্রেম। আদতে এটা নারী-প্রেম নয়। সুশ্রী বালক-প্রেম। সমকামের আসক্তি। এই নিকৃষ্ট স্বভাব আল্লাহর গযব ডেকে আনে। এই প্রেম লূত আলাইহিস সালামের জাতিকে আল্লাহর আযাবের লক্ষ্যবস্তু করেছে। দুআ, যিকির এবং অন্যান্য নেক আমলের মাধ্যমে এই প্রেমকে ভুলে থাকতে হবে। এর করুণ পরিণতির বিষয়ে চিন্তা করতে হবে।

📘 রূহের খোরাক > 📄 প্রেমকে কেন্দ্র করে মানুষের প্রকারভেদ

📄 প্রেমকে কেন্দ্র করে মানুষের প্রকারভেদ


এক্ষেত্রে মানুষ তিন ভাগে বিভক্ত।
১. কেউ কেউ আছে, নিছক সৌন্দর্যকে ভালোবাসে। পৃথিবীর পথে ঘাটে উপত্যকায় ঘুরে বেড়ায় তাদের হৃদয়। প্রত্যেক সৌন্দর্যই তাদের লক্ষ্যবস্তু। এটা কচু-পাতার উপর টলটল পানির মতো সাময়িক প্রেম।
২. কেউ কেউ আছে, নির্দিষ্ট নারীকে ভালোবাসে। কিন্তু মিলনের আশা করে না।
৩. কেউ আছে, মিলনের আশা ছাড়া কাউকে ভালোবাসে না। প্রেমের চূড়ান্ত পরিণতিতে সে পৌঁছাতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ থাকে। সারাজীবন সে তার প্রেমাষ্পদের সাথে সুখে-দুঃখে কাটিয়ে দিতে চায়। এই প্রেমাসক্তি সবচেয়ে শক্তিশালী। বান্দার এই প্রেম যদি হারাম থেকে মুক্ত হয়, হালাল পথে সামনের দিকে এগিয়ে যায়, তবে এর সুফল সে দুনিয়া ও আখিরাতে ভোগ করে। এই প্রেমের সৌভাগ্য তাকে দুনিয়াতেই স্বর্গীয় সুখানুভূতি দান করে।
বারীরাহ দাসী ছিলেন। দাসত্ব থেকে মুক্তি পেয়ে তিনি এক গোলামের বিবাহ- বন্ধনে থাকতে অস্বীকৃতি জানালে গোলামটি বারীরাহর বিচ্ছেদ সইতে না পেরে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট এসে বারীরাহকে তার ব্যাপারে সুপারিশ করতে দরখাস্ত করলেন। নবীজি স্ত্রীর প্রেমাসক্তির এই আধিক্য দেখে আশ্চর্য প্রকাশ করেন এবং বারীরাহর নিকট তাঁর জন্য সুপারিশ করেন।[১] স্ত্রীর প্রতি স্বামীর এই প্রেম ও ভালোবাসা-নিবেদন পূর্ণ মনুষ্যত্বেরই বহিঃপ্রকাশ।
পরিশেষে মহান রাব্বুল আলামীনের কাছে তাওফীক কামনা করি-আমরা যেন সে সকল মুমিনের মতো হতে পারি, যাঁরা নিজেদের ভালোবাসাকে অর্পণ করতে অন্য সব কিছুর উপর প্রাধান্য দিয়েছেন আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে। আর মহান রবের পক্ষ থেকে অর্জন করেছেন চিরায়ত সম্মান ও সন্তুষ্টি। আমীন।

টিকাঃ
[১] বুখারী, হাদীস-ক্রম: ৫২৮৩

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00