📄 ইশ্ক বা ভালোবাসার স্তর
প্রেমিক তার প্রেমের জগতের সফরে তিনটি স্তর অতিক্রম করে-১. সূচনা স্তর, ২. মধ্যবর্তী স্তর, ৩. সমাপ্তি স্তর।
সূচনা স্তরের ক্ষেত্রে আলিমগণ বলেন, যদি প্রেমিকের প্রেমাষ্পদের সাথে মিলন সামাজিক ও ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে অসম্ভব হয়, তাহলে তার উচিত নিজেকে দমন করা। প্রেমাষ্পদের কাছে যাওয়া ছাড়া তার মন যদি আর কিছু না মানে, তাহলে বুঝতে হবে সে মধ্যবর্তী ও সমাপ্তি-স্তরে পৌঁছে গেছে।। তখন তার উচিত হবে মনের কথা মানুষের কাছে প্রকাশ না করা। কেননা এটা যেমন শিরক, তেমনি নিজের উপর অবিচারও। এক্ষেত্রে তার প্রেমাষ্পদের যেমন জান-মাল-মর্যাদার ক্ষতি হবে, তেমনি মানুষ এগুলো নিয়ে বলাবলি করবে। সমাজে লোকমুখেও বিভিন্ন ধরনের উড়োকথা ছড়াবে ব্যক্তির প্রেমকে ঘিরে।
সমাজে সাধারণত যদি কারো সম্পর্কে বলা হয়, অমুক অমুকের সাথে সম্পর্ক রাখে, তাহলে কথা অসত্য হলেও, শতকরা ৯৯ জন সেটা বিশ্বাস করে নেয়।
প্রেম সম্পর্কিত সংবাদ মিথ্যা হলেও মানুষ সাধারণত বিশ্বাস করে নেয়। এই দুর্বলতারই সুযোগ নেয় সতীসাধ্বী নারীর ওপর অপবাদ আরোপকারীরা। আম্মাজান আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহার ক্ষেত্রে যেমনটা হয়েছিল। সাফওয়ান ইবনু মুআত্তালের সাথে দেরিতে আসার ঠুনকো যুক্তিতে তাঁর উপর অপবাদ আরোপ করা হয়। কিন্তু আল্লাহ তাঁকে নির্দোষ সাব্যস্ত করেছেন।
কারো প্রতি ভালোবাসা জন্ম নিলে সেকথা মানুষের কাছে বলে বেড়ানো অন্যায়, গুনাহ। এর চেয়েও বড় অন্যায় হলো সেই ভালোবাসার মানুষের কাছে যাওয়ার জন্য কাউকে মাধ্যম বানানো। এতে সেই প্রেমাষ্পদের উপর অবিচারের মাত্রা আরো বেড়ে যায়। এই অন্যায় কাজের গুনাহ সেই প্রেমিক ও মধ্যস্থ ব্যক্তি— উভয়েরই হয়। নবীজি , ঘুষ প্রদানকারী ও ঘুষ গ্রহণকারী—উভয়কে লানত দেয়ার পাশাপাশি মধ্যস্থ ব্যক্তিকেও অভিসম্পাত করেছেন।
প্রেমিক যদি প্রেমাষ্পদের সাথে যুক্ত হবার চেষ্টা করে, তাহলে বৈষয়িক ক্ষতির আশঙ্কাও কম নয়। হতে পারে কোনো মেয়ের সাথে সে যুক্ত হতে চায়, এতে করে সেই মেয়ের সাথে তার মা-বাবা, আত্মীয়-স্বজনের সম্পর্কের অবনতি ঘটে। বিয়ের প্রস্তাব ফিরে যায়। প্রেমিক এ ক্ষেত্রে কখনো মেয়ের পরিবারের কাউকে হত্যা করার দিকেও এগিয়ে যায়; যা 'আকবারুল কাবায়ির' বা সবচে বড় কবীরা গুনাহ। নবীজি মুসলিম ভাইয়ের বিয়ের প্রস্তাবের উপর প্রস্তাব দিতে নিষেধ করেছেন, অন্যের দামাদামির উপর দাম বাড়াতে নিষেধ করেছেন। তাহলে যে লোক স্বামী ও স্ত্রীর মাঝে অথবা পিতা ও মেয়ের মাঝে বিচ্ছেদ ঘটায়, তার উপর হুঁশিয়ারির কঠোরতার মাত্রা কি এখান থেকেই অনুমান করা যাচ্ছে না?
প্রেমিক অথবা মধ্যস্থতাকারী হয়তো এর মাঝে কোনো গুনাহ দেখতে পায় না। অথচ এই কাজে শুধু যে আল্লাহর হক নষ্ট হচ্ছে, তা নয়; বরং বান্দারও হক নষ্ট হয়। আর বান্দার হক নষ্ট করলে শুধু তাওবা করলে মাফ পাওয়া যায় না। দুনিয়াতে মাফ চাইতে হয়। না হলে কষ্টদাতার সব সওয়াব তার আমলনামায় চলে যাবে। আর যদি সেই প্রেমাষ্পদ তার প্রতিবেশী বা আত্মীয় হয়, তাহলে হাদীসের ভাষ্য অনুযায়ী এই অবৈধ প্রেমিক তো জান্নাতেই প্রবেশ করতে পারবে না।
আর যদি প্রেমিক তার প্রেমাষ্পদের নিকট পৌঁছাতে জীন বা শয়তানের সাহায্য নেয়, তাহলে কবীরা গুনাহের পাশাপাশি এটা হবে কুফর ও শিরক, যা জাহান্নামের পথে নিয়ে যাবে।
এই পথে সাহায্য-সহযোগিতা করা মানেই পাপের ক্ষেত্রে সহায়তা। প্রেমিকের প্রেমাষ্পদ যদি মিলেও যায়, তাহলে পাপ ও অন্যের উপর জুলুম কমে না, বরং বাড়ে। তারা পরস্পরকে সহায়তা করে পরস্পরের মা-বাবা, আত্মীয়-স্বজনকে ধোঁকা ও কষ্ট দেয়ার ক্ষেত্রে। এতে মানুষ তাদের প্রতি বিতৃষ্ণ হয়ে ওঠে।
সুন্দর চেহারার প্রতি আকর্ষণের দরুণই এসব সংকট ও পাপ জন্ম নেয়। এই প্রেম কাউকে আবার সুস্পষ্ট কুফরীর দিকেও নিয়ে যায়। আবদুল হক রচিত আল-আকিবাহ (পরিণতি) গ্রন্থে মসজিদের এক মুয়াযযিনের ঘটনা এসেছে, সে আযান ও নামাযের সময় সর্বদা মসজিদে উপস্থিত থাকত। তার চালচলনে আল্লাহ তাআলার পূর্ণ আনুগত্য ও একনিষ্ঠ ইবাদাতের ছাপ ছিল। একদিন সে মিনারের চূড়ায় উঠল আযান দেওয়ার জন্য। মসজিদের পাশের এক খ্রিষ্টান বাড়ির মেয়ের প্রতি তার দৃষ্টি পড়ে যায়। সে খ্রিষ্টান মেয়ের সৌন্দর্যে বিমোহিত হয়ে আযান দেওয়া বাদ দিয়ে মন্ত্রমুগ্ধের মতো মিনার থেকে নেমে সোজা মেয়ের বাড়িতে গিয়ে উপস্থিত হয় এবং তাকে বিয়ের প্রস্তাব দেয়। তখন মেয়েটি তাকে জানিয়ে দেয়, 'আমার বাবা আমাকে কোনো মুসলমানের কাছে বিয়ে দেবেন না। তুমি খ্রিষ্টান হলেই আমাকে বিয়ে করতে পারবে।' মেয়ের সৌন্দর্যের ঘোরে লোকটি তখন ইসলাম ধর্ম ত্যাগ করে খ্রিষ্টান হয়ে যায়। যেদিন সে ধর্মান্তরিত হয়ে খ্রিষ্টান হলো, সেদিনই ঘরের ছাদ থেকে পড়ে মারা যায়। এভাবে সে সারাজীবন আল্লাহ তাআলার আনুগত্যময় জীবন যাপন করেও খ্রিষ্টান অবস্থায় ইন্তেকাল করে তার সারাজীবনের সকল পুণ্য থেকে বঞ্চিত হয়ে গেল।
কথিত আছে, খ্রিষ্টানরা মুসলমান কয়েদিদের ঈমান নষ্ট করতে চাইলে সুন্দর নারীর প্রলোভন দিয়ে ধর্মান্তরিত করে।
প্রেমের ক্ষতিকর আরো দিক আছে। হয়তো প্রেমিক পুরুষ অন্য কোনো নারীর প্রেমে মত্ত হয়ে যায় অথবা কোনো নারী পরপুরুষের প্রেমে হাবুডুব খায়। তাহলে, কখনো খুনের মাধ্যমে অনেকে নিজের পূর্ব প্রেমাষ্পদকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেয়। সুতরাং বুদ্ধিমান কোনো মানুষের উচিত না, এরকম হারাম প্রেমের সম্পর্কে জড়ানো।
অবশ্যি প্রেমের পথে উপকারী কিছু দিকও আছে। মনে প্রশান্তি আসে, মেজায ফুরফুরে থাকে। সাহসিকতা, বদান্যতা, মানবিকতার মতো ভালো গুণাবলি অর্জন করা যায়।
ইয়াহইয়া ইবনু মুয়াযকে বলা হলো, 'আপনার ছেলে তো অমুক মেয়ের প্রেমে পড়েছে।' এটা শুনে তিনি বললেন, 'আল্লাহর প্রশংসা, যিনি আমার ছেলেকে পুরুষের স্বভাব দান করেছেন।'
এক জ্ঞানী বলেছেন, 'প্রেম ভালো লোকদের হৃদয়ের ওষুধ।'
আরেকজন বলেছেন, 'প্রেম ভীরুকে সাহসী করে, বোকাকে মেধাবী বানায়, কৃপণকে করে বদান্য। শান্তকে দুষ্ট স্বভাবের বানিয়ে দেয়। আবার ধুলোয় মিশিয়ে দিতে পারে বাদশাহর সম্মান। যার কোনো সঙ্গী নেই, প্রেম তার সঙ্গী।'
এক দার্শনিক বলেছেন, 'প্রেম আত্মাকে শোধিত করে, চরিত্র সুন্দর করে। তা প্রকাশ করা প্রাকৃতিক, কিন্তু চেপে রাখা অস্বাভাবিক।'
একজন পবিত্র প্রেম-সাধক বলেছেন, 'তুমি পবিত্র থাকো, সম্মান পাবে। এরপর প্রেম করো, মহৎ কিছু অর্জন করতে পারবে।'
এক প্রকৃত প্রেমিককে বলা হলো, 'যদি প্রেমাষ্পদকে পাও তাহলে কী করবে?' সে বলল, 'তার মুখশ্রী দেখে চোখ জুড়াব। তার স্মরণ ও বচনে মন-দিল শীতল করব। বিনিময়ে জীবন দিয়ে হলেও তার সতীত্ব রক্ষা করব।'
ইসহাক ইবনু ইবরাহীম বলেছেন, 'যদি প্রেম-ভালোবাসা না থাকত, তাহলে দুনিয়ার আনন্দ-উচ্ছ্বাস সব রঙহীন ধূসর হয়ে যেত।'
আরেকজন বলেছেন, 'হৃদয়ের সুস্থতার জন্য প্রেম তেমন জরুরি, দেহের জন্য যেমন জরুরি খাদ্য।'
আবু বকর সিদ্দীক এক তরুণীর পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। শুনলেন, তরুণীটি কবিতা আবৃত্তি করছে, 'আমি তাকে বহু আগেই ভালোবেসে ফেলেছি। আমার হৃদয় তার দিকে ঝুঁকে আছে কচি লতার মতো।' তখন আবু বকর তাকে বললেন, 'তুমি কি দাসী নাকি স্বাধীন?' সে বলল, 'দাসী।'
'তোমার প্রেমাষ্পদ কে?'
এ প্রশ্নের জবাবে সে আমতা আমতা করছিল। আবু বকর কসম করে বললেন যে, নামটি তিনি কাউকে বলবেন না। তখন মেয়েটি বলল, 'আমি যার ভালোবাসায় মরে যাচ্ছি, সে হলো মুহাম্মদ ইবনু কাসিম।' তখন তাকে আবু বকর কিনে আযাদ করে দিলেন এবং তাকে পাঠিয়ে দিলেন মুহাম্মদ ইবনু কাসিম ইবনি জাফর ইবনি আবি তালেবের কাছে। এবং বললেন, 'এরাই পুরুষদের ঘোরে ফেলে দেয়।'
যে প্রেম প্রেমাষ্পদের সাথে অন্যায় কাজের দিকে ধাবিত করে, তা যে মন্দ, এ কথা অনস্বীকার্য। কিন্তু জীবন আলোকিত হয়ে যায় পবিত্র প্রেমের ফোয়ারায়।
প্রকৃত বুদ্ধিমান জানে, তার প্রেম তার মাঝে ও আল্লাহ তাআলার মাঝে সম্পর্কের অবনতি ঘটাবে। এটাই ছিল আসলাফদের প্রেমের দর্শন। উবাইদুল্লাহ ইবনু আবদিল্লাহ ইবনি উতবাহ ইবনি মাসউদের প্রেম তো বেশ প্রসিদ্ধি লাভ করেছিল। তার প্রেম নিয়ে কেউ আপত্তি করেনি। উমর ইবনু আবদিল আযিয ফাতেমা বিনতু আবদিল মালিকের এক সুশ্রী দাসীকে যে ভালোবেসে ফেলেছিলেন, তাও লেখা আছে ইতিহাসের পাতায়। আবু বকর মুহাম্মদ ইবনু দাউদ যাহেরীর মতো বড় ইমামও প্রেমে পড়েছিলেন। তার প্রেম অনেক প্রসিদ্ধ। আল্লাহর নবী দাউদ আলাইহিস সালামের অধীনে ৯৯ জন স্ত্রী ছিলেন। এরপর তিনি একজনকে ভালোবেসে ফেললেন, অতপর তার দ্বারাই পূর্ণ হলো ১০০ স্ত্রীর সংখ্যা। [১]
ইমাম যুহরী বলেন, ইসলামের প্রথম প্রেম ছিল আয়েশা সিদ্দিকা রাদিয়াল্লাহু আনহা'র সাথে নবীজির প্রেম। মাসরুক আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা'র উপাধি দিয়েছেন, আল্লাহর রাসূলের প্রেমিকা।
বর্ণিত আছে, ইবরাহীম আলাইহিস সালাম প্রতিদিন বোরাকে চড়ে হাজেরা আলাইহাস সালামকে দেখতে আসতেন শাম থেকে, প্রচণ্ড ভালোবাসা আর অস্থিরতার কারণে।
আবু মুহাম্মদ ইবনু হাযম বলেছেন, আয়িম্মা ও খুলাফাদের অনেকেই প্রেমে পড়েছেন। এক লোক উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু'র কাছে এসে বললেন, 'এক মেয়েকে দেখে তার প্রেমে পড়ে গিয়েছি।' তখন তিনি বললেন, 'তোমার মন তো তোমার হাতে নেই।'
প্রেম বিষয়ে কথা বলতে গেলে উপকারী অপকারী, বৈধ অবৈধ সম্পর্কের মাঝে পার্থক্যরেখা টানা জরুরি। একচেটিয়াভাবে কোনো প্রণয় বা প্রেমের সম্পর্ককে হালাল বা হারাম বলে দেয়া এক্ষেত্রে মুশকিল।
টিকাঃ
[১] দাউদ আলাইহিস সালাম বিয়ে-বহির্ভূতভাবে কোনো নারীর সাথে প্রেম করেছিলেন, এমন কথা একটি ভিত্তিহীন বর্ণনা থেকে এসেছে। কোনো কোনো মুফাসসির নিজ নিজ তাফসীরগ্রন্থে নির্ভরযোগ্য কোনো সূত্র ছাড়াই এ সংক্রান্ত একটি ঘটনা উল্লেখ করেছেন। ঘটনাটিতে দেখা যায়, আল্লাহর রাসূল দাউদ এক নারীর প্রতি মোহগ্রস্ত হয়ে তার বর্তমান স্বামীকে হত্যা করে তাকে বিবাহ করেন। নাউযুবিল্লাহ! এ সমস্ত ঘটনার নির্ভরযোগ্য কোনো সূত্র যেমন নেই, তেমনি একজন মুমিনের জন্য তা বিশ্বাস করাও মারাত্মক ধৃষ্টতা। হাফিয ইবনু কাসীর বলেন, এ সংক্রান্ত যত ঘটনা মুফাসসিরগণ উল্লেখ করেছেন তার অধিকাংশই ইসরাঈলী বর্ণনা থেকে গৃহীত। নবীজি সূত্রে সরাসরি এ বিষয়ে কোনো হাদীস বর্ণিত হয়নি। -তাফসীরু ইবনি কাসীর-৪/৭৬। এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে পড়ুন আল্লামা রাযী রচিত আত-তাফসীরুল কাবীর, সূরা সোয়াদ, আয়াত-ক্রম: ২১-২৫-এর আলোচনায়। -সম্পাদক
📄 উন্নত প্রেম
শর্তহীনভাবে মৌলিক উপকারী প্রেম হলো, হৃদয়ের ফিতরাত বা স্বভাবগত যে প্রেম, তা। আর সেটা হলো আল্লাহর প্রতি মুহাব্বাত, আল্লাহপ্রেম। 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ'-এর প্রেম। এটা একটা মহান ইবাদাত। এ ক্ষেত্রে অন্যকে আল্লাহর শরীক বানানো জায়েয নেই। এই প্রেমই আসল। অন্য সকল প্রেম আপেক্ষিক ও আপতিত। এই কালিমাহর প্রতি বান্দার স্বভাবজাত প্রেম থাকা আবশ্যক। এই কালিমাহর উৎস থেকেই বান্দার জগত-সংসার যাবতীয় নিয়ামত আর ইহসানে আচ্ছাদিত হয়। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-
وَمَا بِكُمْ مِنْ نِعْمَةٍ فَمِنَ اللَّهِ ثُمَّ إِذَا مَسَّكُمُ الضُّرُّ فَإِلَيْهِ تَجْأَرُونَ
'তোমাদের নিকট যত নিয়ামত রয়েছে, তার সবই আল্লাহ তাআলা থেকে আগত। এরপর তোমরা যখন-তখন তাঁরই নিকট অনুনয়-বিনয় করো।' [১]
দুইটি উপলক্ষ সব প্রেমেই বিদ্যমান থাকে। সৌন্দর্য ও মাহাত্ম্য। আর এই দুই গুণের ক্ষেত্রে একমাত্র আল্লাহ তাআলারই রয়েছে সর্বোচ্চ পরিপূর্ণতা। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-
قُلْ إِنْ كُنْتُمْ تُحِبُّونَ اللَّهَ فَاتَّبِعُونِي يُحْبِبْكُمُ اللَّهُ
'আপনি বলুন, যদি তোমরা আল্লাহকে ভালোবেসে থাক, তাহলে আমার অনুসরণ করো। তাহলে আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন।' [২]
অন্য আয়াতে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-
وَمِنَ النَّاسِ مَنْ يَتَّخِذُ مِنْ دُونِ اللَّهِ أَنْدَادًا يُحِبُّونَهُمْ كَحُبِّ اللَّهِ وَالَّذِينَ آمَنُوا أَشَدُّ حُبًّا لِلَّهِ
'মানুষের মধ্যে কেউ কেউ আল্লাহ ছাড়া তার সমকক্ষ নির্ধারণ করে থাকে। যাদেরকে তারা আল্লাহর মত ভালোবেসে থাকে। আর মুমিনরা আল্লাহকেই অধিক ভালোবেসে থাকে।[১]
নবীজি কসম করে বলেছেন, 'কোনো বান্দা পরিপূর্ণ মুমিন হতে পারে না, যতক্ষণ না সে আমাকে তার পুত্র, পিতা নির্বিশেষে সকল মানুষের চেয়ে বেশি ভালোবাসবে।'
যেখানে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে ভালোবাসার ক্ষেত্রেই এভাবে বলা হয়েছে, সেখানে আল্লাহর ভালোবাসা ও প্রেম তো বান্দার কাছে আরো অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত। বান্দার প্রতি আল্লাহর সার্বক্ষণিক ইহসান ও অনুগ্রহের দাবি হলো, বান্দা মন উজাড় করে আল্লাহ তাআলাকে ভালোবাসবে। মানুষ মানুষকে ভালোবাসে বিশেষ কোনো উদ্দেশ্যে প্রণোদিত হয়ে। কিন্তু আল্লাহ যে মানুষকে ভালোবাসেন সে ভালোবাসা খাদহীন। মানুষের কল্যাণেই আল্লাহ তাকে ভালোবাসেন। এমন মহান সত্তার প্রেমকে কেবল দুর্ভাগারাই উপেক্ষা করতে পারে। দুনিয়ার সকল কিছু আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন মানুষের জন্য। আর মানুষকে সৃষ্টি করেছেন আল্লাহর ভালোবাসা অর্জন করার জন্য। বান্দার প্রার্থনার পূর্বেই আল্লাহ তাকে দিয়ে দিতে প্রস্তুত থাকেন। সুতরাং মানব-অন্তর তো এমন সত্তাকেই ভালোবাসবে, জগতের সকল কল্যাণ, অকল্যাণ, সুখ-শান্তি ও নিরাপত্তা যাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়।
হাদীসে কুদসীতে আছে, রাতের শেষ-অংশে আল্লাহ প্রথম আসমানে এসে বলেন-
مَنْ يَسْأَلُنِي فَأُعْطِيَهُ، مَنْ يَسْتَغْفِرُنِي فَأَغْفِرَ لَهُ؟
'কে আছে আমার কাছে চাইবে, আমি তাকে দান করব। কে আছে আমার কাছে ইস্তিগফার করবে, আমি তাকে ক্ষমা করব।' [২]
তিনিই একমাত্র মালিক। তাঁর কোনো শরীক নেই। সব একসময় ধ্বংস হয়ে যাবে। থাকবেন শুধু চিরন্তন আল্লাহ। তিনি অক্ষয়, অনাদি, অনন্ত। তাঁকে যে ভালোবাসবে, সে তাঁর নৈকট্যপ্রাপ্ত হবে। তাঁর সাথে যার গড়ে উঠবে প্রেম, সে তাঁর নূরের রৌশনিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠবে।
টিকাঃ
[১] সূরা নাহল, আয়াত-ক্রম: ৫৩
[২] সূরা আলে ইমরান, আয়াত-ক্রম: ৩১
[১] সূরা বাকারা, আয়াত-ক্রম: ১৬৫
[২] বুখারী, হাদীস-ক্রম: ১১৫৪; মুসলিম, হাদীস-ক্রম: ৭৫৮; তিরমিযী, হাদীস-ক্রম: ৪৪৬
📄 প্রেম ও প্রেমাষ্পদের পূর্ণতায় প্রেমে আসে পূর্ণ স্বাদ
এখানে একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বুঝে নেয়া অত্যন্ত জরুরি। মানুষের হৃদয় আনন্দের পূর্ণতায় পৌঁছায় দুটি বিষয়ের মাধ্যমে।
১. প্রেমাষ্পদ-সত্তার সৌন্দর্যের পূর্ণতা অনুভব করলে।
২. এরপর সবকিছু উজাড় করে প্রেমাষ্পদকে ভালোবাসতে পারলে।
সুতরাং মানুষের জন্য উচিত ভালোবাসার সর্বোচ্চ পরিতৃপ্তি লাভের চেষ্টা করা। আল্লাহ তাআলার প্রতি তার প্রেম ও ভালোবাসার সর্বোত্তম প্রকাশ ঘটানোর জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করা। আর এ ভালোবাসা এমন নয় যে, এটা হারালে শুধু পার্থিব পুলক থেকে বঞ্চিত থাকবে; বরং আখিরাতের সম্মান-মর্যাদাও তাকে খোয়াতে হবে। সর্বশ্রেষ্ঠ প্রেম থেকে বঞ্চিত হওয়ার কারণে একসময় এর জন্য অনেক বেশি আফসোস ও হতাশা নেমে আসবে বান্দার জীবনে, যার কোনো সীমা-পরিসীমা থাকবে না। যার কোনো ক্ষতিপূরণ থাকবে না। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-
بَلْ تُؤْثِرُونَ الْحَيَاةَ الدُّنْيَا - وَالْآخِرَةُ خَيْرٌ وَأَبْقَى
'বরং তোমরা পার্থিব জীবনকেই অগ্রাধিকার দিয়ে থাক। অথচ আখিরাতই উত্তম ও চিরন্তন।[১]
মহান আল্লাহর প্রতি প্রেম, ভালোবাসা আর আনুগত্যের প্রকৃত সুখ লাভ করেই ফিরআউনের যাদুকররা ঈমান এনে দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ফিরআউনের হুমকি ও শাস্তির হুঁশিয়ারিকে বৃদ্ধাঙুল প্রদর্শন করে বলে উঠেছে-
فَاقْضِ مَا أَنْتَ قَاضٍ إِنَّمَا تَقْضِي هَذِهِ الْحَيَاةَ الدُّنْيَا - إِنَّا آمَنَّا بِرَبِّنَا لِيَغْفِرَ لَنَا خَطَايَانَا وَمَا أَكْرَهْتَنَا عَلَيْهِ مِنَ السِّحْرِ وَاللَّهُ خَيْرٌ وَأَبْقَى
'সুতরাং তোমার যা ফায়সালা করার, করে ফেলো। তুমি তো কেবল এই পার্থিব জগতেই ফায়সালা করতে পারবে। আমরা তো ঈমান এনেছি আমাদের মহান প্রতিপালকের প্রতি। তিনি আমাদের গুনাহসমূহ মার্জনা করে দেবেন এবং ক্ষমা করে দেবেন যেই যাদুর চর্চা করতে তুমি আমাদেরকে বাধ্য করেছ সেই গর্হিত অপরাধকে। আর আল্লাহ তাআলাই হলেন সর্বোত্তম ও চিরস্থায়ী।[১]
আল্লাহ মানুষকে সৃষ্টি করেছেন, যেন আখিরাতের অনন্ত নিয়ামত আস্বাদন করাতে পারেন। যেন দান করতে পারেন জান্নাতের অভাবনীয় আনন্দ। এ মর্মেই পবিত্র কুরআনে বর্ণিত হয়েছে-
يَا قَوْمِ اتَّبِعُونِ أَهْدِكُمْ سَبِيلَ الرَّشَادِ - يَا قَوْمِ إِنَّمَا هَذِهِ الْحَيَاةُ الدُّنْيَا مَتَاعٌ وَإِنَّ الْآخِرَةُ هِيَ دَارُ الْقَرَارِ
'হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা আমাকে অনুসরণ করো, আমি তোমাদের হিদায়াতের পথ দেখাব। হে আমার সম্প্রদায়! এই পার্থিব জীবন তো শুধু ভোগের উপকরণ। আর আখিরাতই অনন্ত বসবাসের স্থল।'[২]
টিকাঃ
[১] সূরা আলা, আয়াত-ক্রম: ১৬, ১৭
[১] সূরা তহা, আয়াত-ক্রম: ৭২, ৭৩
[২] সূরা গাফির, আয়াত-ক্রম: ৩৮, ৩৯
📄 পরকালে আল্লাহকে দেখা প্রসঙ্গে
প্রেমিক যদি আসল প্রেমকে এভাবে বুঝতে পারে যে, প্রকৃত প্রেম আল্লাহ তাআলাকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়, তাহলে তার মনে প্রবল আকাঙ্ক্ষা জাগবে আল্লাহ তাআলার পবিত্র চেহারা দর্শনের, তার কণ্ঠস্বর শোনার, তার কাছে যাবার। এটাই স্বাভাবিক। সহীহ মুসলিমে আছে-
فَوَاللَّهِ مَا أَعْطَاهُمْ شَيْئًا أَحَبَّ إِلَيْهِمْ مِنَ النَّظَرِ إِلَيْهِ
'আল্লাহর কসম! কিয়ামতের দিন তাদের জন্য সবচেয়ে বড় ও কাঙ্ক্ষিত পুরস্কার হবে, আল্লাহকে দিব্যচোখে দর্শন করা।'[১]
অন্য বর্ণনায় এসেছে-
إِنَّهُ إِذَا تَجَلَّى لَهُمْ وَرَأَوْهُ؛ نَسُوا مَا هُمْ فِيهِ مِنَ النَّعِيمِ
'যখন আল্লাহ তাআলার পবিত্র চেহারা তাদের সামনে উদ্ভাসিত হবে আর তারা সেই কাঙ্ক্ষিত মুহূর্ত অবলোকন করবে, তখন তারা খুশিতে আত্মহারা হয়ে আখিরাতের যাবতীয় নিয়ামতের কথা বেমালুম ভুলে যাবে।'
আম্মার ইবনু ইয়াসির নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দুআর একটি অংশ বর্ণনা করেন। সেই দুআতে নবীজি প্রার্থনা করেছেন-
وَأَسْأَلُكَ اللَّهُمَّ لَذَّةَ النَّظَرِ إِلَى وَجْهِكَ الْكَرِيمِ، وَالشوْقَ إِلَى لِقَائِكَ
'আল্লাহ! আমি আপনার সম্মানিত চেহারা দর্শনের স্বাদ আস্বাদন করতে চাই, আপনার সাক্ষাৎস্পৃহার মোহ প্রার্থনা করি।'[৩]
দুনিয়ার সবচেয়ে আনন্দের বিষয় হলো, আল্লাহর পরিচয় লাভ ও তাঁকে ভালোবাসা। আর আখিরাতে সবচেয়ে সুখের বিষয় হবে, আল্লাহকে দিব্যচোখে প্রত্যক্ষ করা। এক আল্লাহ-প্রেমিক একবার বলেছিলেন, যদি রাজা-বাদশাহ ও সুলতানেরা জানত, আমরা কী সুখের মধ্যে আছি, তাহলে তরবারি দিয়ে লড়াই করে আমাদের সুখ ছিনিয়ে নিতে চাইত।'
আল্লাহ তাআলার দর্শন লাভের মুহূর্ত হবে মুমিন বান্দাদের জন্য সর্বোচ্চ আনন্দঘন মুহূর্ত। মহান রবের যে কুরআন তারা জীবনভর তিলাওয়াত করেছে, কিয়ামত-দিবসের পবিত্রতম আনন্দঘন মিলনমেলায় মহান রবের কন্ঠে সে কুরআনের আয়াত তিলাওয়াত হবে। মানুষ রবের তিলাওয়াত শুনে মোহগ্রস্ত হয়ে যাবে। কুরআন তিলাওয়াত শ্রবণের ঘোরের মাঝে তারা অবর্ণনীয় সুখ আর আনন্দ অনুভব করবে। তারা দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে ভাববে—এই কুরআন কি আমরা জীবনে কোনোদিন শুনেছি! হাদীসে বর্ণিত হয়েছে—
كَأَنَّ النَّاسَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ لَمْ يَسْمَعُوا الْقُرْآنَ، إِذَا سَمِعُوهُ مِنَ الرَّحْمَنِ فَكَأَنَّهُمْ لَمْ يَسْمَعُوا قَبْلَ ذَلِكَ
'কিয়ামত-দিবসে মানুষের অবস্থা এমন হবে যে, তারা যেন কখনোই কুরআনের তিলাওয়াত শোনেনি। যখন তারা মহান রহমানের পবিত্র কন্ঠে কুরআনের তিলাওয়াত শুনবে, তখন তাদের মনে হবে, এই মোহনীয় সুর, এই তিলওয়াত তারা কোনোদিন শোনেইনি।' [১]
প্রেম হলো রূহের খোরাক, হৃদয়ের প্রাণ, আত্মার অমৃতজল। এই প্রেম হারালে কত না দুঃখ! সেই দুঃখের তীব্রতা বুঝতে পারবে না যে হারিয়েছে দেখার চোখ, শ্রবণের কান অথবা মুখের বাক। এর চেয়েও বড় কষ্ট আল্লাহর প্রেম হারানো। দুনিয়ার এই সর্বোচ্চ পুলক ও আনন্দ আখিরাতের সর্বোচ্চ আনন্দ পর্যন্ত পৌঁছে দেয়।
দুনিয়ার সুখ তিন প্রকার।
১. ওই সুখ, যা মানুষকে আখিরাতের সুখ পর্যন্ত পৌঁছে দেয়। এই সুখ কোনো বৃথা আনন্দ নয়। এর প্রতিদান মানুষকে পরকালে দেওয়া হয়। এটা হলো আল্লাহর সাথে একজন মুমিন বান্দার প্রেম।
২. যে সুখ মানুষকে আখিরাতের সুখ থেকে বঞ্চিত করে। তারা সুখ পায় আল্লাহ ছাড়া কোনো মূর্তি বা অন্যকিছুতে। তাদের জন্য আখিরাতে আছে জ্বলন্ত আগুনের শাস্তি।
৩. স্বাভাবিক বৈধ সুখ। এর জন্য পরকালে তার জন্য কোনো শাস্তিও নেই, পুরস্কারও নেই। এই সুখের জীবন খুবই স্বল্প।
টিকাঃ
[১] মুসলিম, হাদীস-ক্রম: ১৮১
[২] সুনানু ইবনি মাজাহ, হাদীস-ক্রম: ১৮৪; শুআইব আরনাউতের মতে, হাদীসটির সনদ দুর্বল।-আল আওয়াসিম ওয়াল কাওয়াসিম ৫/১৬৮
[৩] নাসায়ী, হাদীস-ক্রম: ১৩০৫
[১] হাদীসটির সনদ যঈফ।