📄 শিরকযুক্ত প্রেমের প্রতিষেধক
যে ব্যক্তি এ রোগে আক্রান্ত, তাকে ভাবতে হবে যে, সে তার অজ্ঞতা ও উদাসীনতার কারণে আল্লাহবিমুখ হয়ে গেছে। পরবর্তীতে তার জন্য জরুরি হচ্ছে, সে তাওহীদের মর্ম উপলব্ধি করবে, আল্লাহর নিদর্শনের প্রতি গভীর দৃষ্টি দেবে। বাহ্যিক ও আভ্যন্তরীণ ইবাদাতে মশগুল হবে। অনুনয়ের সাথে পূর্ণ আনুগত্যের পরাকাষ্ঠা প্রদর্শনের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য অর্জনে মনোনিবেশ করবে। আল্লাহ তাআলা বলেন-
كَذَلِكَ لِنَصْرِفَ عَنْهُ السُّوءَ وَالْفَحْشَاءَ إِنَّهُ مِنْ عِبَادِنَا الْمُخْلَصِينَ
'এভাবেই আমি বান্দা থেকে মন্দ ও অশ্লীলতাকে ফিরিয়ে দিই, নিশ্চয় সে আমার একনিষ্ঠ বান্দাদের একজন।[১]
বান্দা যখন একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর প্রতি মনোনিবেশ করে, আল্লাহ তার থেকে অশ্লীলতাকে সরিয়ে দেন। ফলে বাহ্যিক প্রেমের মত্ততা থেকে সে মুক্তি পায়।
এসবের আবশ্যিক ফলাফল হলো, একজন জ্ঞানী যাতে বুঝতে পারে, জ্ঞান ও শরীয়তের দাবি হচ্ছে কল্যাণকামিতা। ব্যক্তির সামনে যখন ভালো ও মন্দ দুটি জিনিস উপস্থিত হবে, তাকে জ্ঞানের আলোয় ভাবতে হবে কোনটা উপকারী, এরপর কর্মের দ্বারা উপকারী বিষয়কে বেছে নিতে হবে।
টিকাঃ
[১] সূরা ইউসুফ, আয়াত-ক্রম: ২৪
📄 হারাম প্রেমের ক্ষতিকর দিক
এ বিষয়টি খুবই স্পষ্ট যে, বস্তু-সর্বস্ব প্রেম দুনিয়া-আখিরাত—উভয় জাহানেই ক্ষতিকর। কারণ-
১. মানুষের অন্তরে দুটি জিনিস একত্রে সমান্তরালে ক্রিয়াশীল থাকে না; একটি দিক অবশ্যই প্রাধান্য বিস্তার করে। তাই ব্যক্তির মাঝে আল্লাহ ও বস্তুর প্রেম সমানভাবে বিদ্যমান থাকবে না—এটাই স্বাভাবিক।
২. কোনো বস্তুর প্রতি মানুষের প্রেম তাকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তোলে। এটি বস্তুতান্ত্রিক প্রেমের অনিবার্য ফল।
৩. প্রেমিক ব্যক্তির অন্তর অন্যের হাতে ক্রীড়নক হিসেবে অবস্থান করে। কিন্তু প্রেমের মাদকতা তাকে এতটাই আচ্ছন্ন করে রাখে যে, নিজেকে সে অবলীলায় ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়।
৪. ব্যক্তি প্রেমের ঘোরে দুনিয়া-আখিরাত—উভয় স্থানে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরকালীন ক্ষতি হলো, সে আল্লাহর আনুগত্য থেকে দূরে সরে যায়। আর ইহকালীন ক্ষতির বিষয়টা তো স্পষ্টই।
৫. আগুন যেমন কাঠ পুড়িয়ে ভস্মীভূত করে, মানুষের অন্তরকে তারচেয়ে অনেক বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করে প্রেম। মানুষ প্রেমে যত মত্ত হবে, আল্লাহর সাথে তার দূরত্ব তত বাড়বে। একসময় শয়তান তার পরিচালক হিসেবে অধিষ্ঠিত হবে, ফলে সে আল্লাহ থেকে তাকে বিমুখ করে রাখবে।
৬. হারাম প্রেম মানুষের অনুভূতি-শক্তি বিনাশ করে, হয়তো পরোক্ষভাবে নতুবা প্রত্যক্ষভাবে। পরোক্ষভাবে মানে হলো—মানুষের অন্তর যখন নষ্ট হয়, সে তখন ভালোকে মন্দ আর মন্দকে ভালো মনে করতে থাকে। এজন্যেই হাদীসে এসেছে—
حُبُّكَ الشَّيْءَ يُعْمِي وَيُصِمُّ
'কোনো বস্তুর প্রতি তোমার প্রেম তোমাকে অন্ধ ও বধির করে দেবে।'[১]
আর প্রত্যক্ষ ক্ষতি হলো, দৈহিক ক্ষতি। প্রেম ব্যক্তিকে শারীরিকভাবে দুর্বল করে ফেলে। এমনকি ধ্বংসের সম্মুখীন করে দেয়। এ ধরনের অনেক গল্প প্রচলিত আছে। ইবনু আব্বাস আরাফার ময়দানে কঙ্কালসার দেহের এক যুবককে দেখে জিজ্ঞেস করলেন, 'এর কী হয়েছে?' লোকেরা বলল, 'সে প্রেমের বিরহে জ্বলছে।' ইবনু আব্বাস এ কথা শুনে এমন নিষিদ্ধ প্রেম থেকে আল্লাহর নিকট পানাহ চাইলেন।
টিকাঃ
[১] মুসনাদু আহমাদ, হাদীস-ক্রম: ২১৬৯৪
📄 ইশ্ক বা ভালোবাসার স্তর
প্রেমিক তার প্রেমের জগতের সফরে তিনটি স্তর অতিক্রম করে-১. সূচনা স্তর, ২. মধ্যবর্তী স্তর, ৩. সমাপ্তি স্তর।
সূচনা স্তরের ক্ষেত্রে আলিমগণ বলেন, যদি প্রেমিকের প্রেমাষ্পদের সাথে মিলন সামাজিক ও ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে অসম্ভব হয়, তাহলে তার উচিত নিজেকে দমন করা। প্রেমাষ্পদের কাছে যাওয়া ছাড়া তার মন যদি আর কিছু না মানে, তাহলে বুঝতে হবে সে মধ্যবর্তী ও সমাপ্তি-স্তরে পৌঁছে গেছে।। তখন তার উচিত হবে মনের কথা মানুষের কাছে প্রকাশ না করা। কেননা এটা যেমন শিরক, তেমনি নিজের উপর অবিচারও। এক্ষেত্রে তার প্রেমাষ্পদের যেমন জান-মাল-মর্যাদার ক্ষতি হবে, তেমনি মানুষ এগুলো নিয়ে বলাবলি করবে। সমাজে লোকমুখেও বিভিন্ন ধরনের উড়োকথা ছড়াবে ব্যক্তির প্রেমকে ঘিরে।
সমাজে সাধারণত যদি কারো সম্পর্কে বলা হয়, অমুক অমুকের সাথে সম্পর্ক রাখে, তাহলে কথা অসত্য হলেও, শতকরা ৯৯ জন সেটা বিশ্বাস করে নেয়।
প্রেম সম্পর্কিত সংবাদ মিথ্যা হলেও মানুষ সাধারণত বিশ্বাস করে নেয়। এই দুর্বলতারই সুযোগ নেয় সতীসাধ্বী নারীর ওপর অপবাদ আরোপকারীরা। আম্মাজান আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহার ক্ষেত্রে যেমনটা হয়েছিল। সাফওয়ান ইবনু মুআত্তালের সাথে দেরিতে আসার ঠুনকো যুক্তিতে তাঁর উপর অপবাদ আরোপ করা হয়। কিন্তু আল্লাহ তাঁকে নির্দোষ সাব্যস্ত করেছেন।
কারো প্রতি ভালোবাসা জন্ম নিলে সেকথা মানুষের কাছে বলে বেড়ানো অন্যায়, গুনাহ। এর চেয়েও বড় অন্যায় হলো সেই ভালোবাসার মানুষের কাছে যাওয়ার জন্য কাউকে মাধ্যম বানানো। এতে সেই প্রেমাষ্পদের উপর অবিচারের মাত্রা আরো বেড়ে যায়। এই অন্যায় কাজের গুনাহ সেই প্রেমিক ও মধ্যস্থ ব্যক্তি— উভয়েরই হয়। নবীজি , ঘুষ প্রদানকারী ও ঘুষ গ্রহণকারী—উভয়কে লানত দেয়ার পাশাপাশি মধ্যস্থ ব্যক্তিকেও অভিসম্পাত করেছেন।
প্রেমিক যদি প্রেমাষ্পদের সাথে যুক্ত হবার চেষ্টা করে, তাহলে বৈষয়িক ক্ষতির আশঙ্কাও কম নয়। হতে পারে কোনো মেয়ের সাথে সে যুক্ত হতে চায়, এতে করে সেই মেয়ের সাথে তার মা-বাবা, আত্মীয়-স্বজনের সম্পর্কের অবনতি ঘটে। বিয়ের প্রস্তাব ফিরে যায়। প্রেমিক এ ক্ষেত্রে কখনো মেয়ের পরিবারের কাউকে হত্যা করার দিকেও এগিয়ে যায়; যা 'আকবারুল কাবায়ির' বা সবচে বড় কবীরা গুনাহ। নবীজি মুসলিম ভাইয়ের বিয়ের প্রস্তাবের উপর প্রস্তাব দিতে নিষেধ করেছেন, অন্যের দামাদামির উপর দাম বাড়াতে নিষেধ করেছেন। তাহলে যে লোক স্বামী ও স্ত্রীর মাঝে অথবা পিতা ও মেয়ের মাঝে বিচ্ছেদ ঘটায়, তার উপর হুঁশিয়ারির কঠোরতার মাত্রা কি এখান থেকেই অনুমান করা যাচ্ছে না?
প্রেমিক অথবা মধ্যস্থতাকারী হয়তো এর মাঝে কোনো গুনাহ দেখতে পায় না। অথচ এই কাজে শুধু যে আল্লাহর হক নষ্ট হচ্ছে, তা নয়; বরং বান্দারও হক নষ্ট হয়। আর বান্দার হক নষ্ট করলে শুধু তাওবা করলে মাফ পাওয়া যায় না। দুনিয়াতে মাফ চাইতে হয়। না হলে কষ্টদাতার সব সওয়াব তার আমলনামায় চলে যাবে। আর যদি সেই প্রেমাষ্পদ তার প্রতিবেশী বা আত্মীয় হয়, তাহলে হাদীসের ভাষ্য অনুযায়ী এই অবৈধ প্রেমিক তো জান্নাতেই প্রবেশ করতে পারবে না।
আর যদি প্রেমিক তার প্রেমাষ্পদের নিকট পৌঁছাতে জীন বা শয়তানের সাহায্য নেয়, তাহলে কবীরা গুনাহের পাশাপাশি এটা হবে কুফর ও শিরক, যা জাহান্নামের পথে নিয়ে যাবে।
এই পথে সাহায্য-সহযোগিতা করা মানেই পাপের ক্ষেত্রে সহায়তা। প্রেমিকের প্রেমাষ্পদ যদি মিলেও যায়, তাহলে পাপ ও অন্যের উপর জুলুম কমে না, বরং বাড়ে। তারা পরস্পরকে সহায়তা করে পরস্পরের মা-বাবা, আত্মীয়-স্বজনকে ধোঁকা ও কষ্ট দেয়ার ক্ষেত্রে। এতে মানুষ তাদের প্রতি বিতৃষ্ণ হয়ে ওঠে।
সুন্দর চেহারার প্রতি আকর্ষণের দরুণই এসব সংকট ও পাপ জন্ম নেয়। এই প্রেম কাউকে আবার সুস্পষ্ট কুফরীর দিকেও নিয়ে যায়। আবদুল হক রচিত আল-আকিবাহ (পরিণতি) গ্রন্থে মসজিদের এক মুয়াযযিনের ঘটনা এসেছে, সে আযান ও নামাযের সময় সর্বদা মসজিদে উপস্থিত থাকত। তার চালচলনে আল্লাহ তাআলার পূর্ণ আনুগত্য ও একনিষ্ঠ ইবাদাতের ছাপ ছিল। একদিন সে মিনারের চূড়ায় উঠল আযান দেওয়ার জন্য। মসজিদের পাশের এক খ্রিষ্টান বাড়ির মেয়ের প্রতি তার দৃষ্টি পড়ে যায়। সে খ্রিষ্টান মেয়ের সৌন্দর্যে বিমোহিত হয়ে আযান দেওয়া বাদ দিয়ে মন্ত্রমুগ্ধের মতো মিনার থেকে নেমে সোজা মেয়ের বাড়িতে গিয়ে উপস্থিত হয় এবং তাকে বিয়ের প্রস্তাব দেয়। তখন মেয়েটি তাকে জানিয়ে দেয়, 'আমার বাবা আমাকে কোনো মুসলমানের কাছে বিয়ে দেবেন না। তুমি খ্রিষ্টান হলেই আমাকে বিয়ে করতে পারবে।' মেয়ের সৌন্দর্যের ঘোরে লোকটি তখন ইসলাম ধর্ম ত্যাগ করে খ্রিষ্টান হয়ে যায়। যেদিন সে ধর্মান্তরিত হয়ে খ্রিষ্টান হলো, সেদিনই ঘরের ছাদ থেকে পড়ে মারা যায়। এভাবে সে সারাজীবন আল্লাহ তাআলার আনুগত্যময় জীবন যাপন করেও খ্রিষ্টান অবস্থায় ইন্তেকাল করে তার সারাজীবনের সকল পুণ্য থেকে বঞ্চিত হয়ে গেল।
কথিত আছে, খ্রিষ্টানরা মুসলমান কয়েদিদের ঈমান নষ্ট করতে চাইলে সুন্দর নারীর প্রলোভন দিয়ে ধর্মান্তরিত করে।
প্রেমের ক্ষতিকর আরো দিক আছে। হয়তো প্রেমিক পুরুষ অন্য কোনো নারীর প্রেমে মত্ত হয়ে যায় অথবা কোনো নারী পরপুরুষের প্রেমে হাবুডুব খায়। তাহলে, কখনো খুনের মাধ্যমে অনেকে নিজের পূর্ব প্রেমাষ্পদকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেয়। সুতরাং বুদ্ধিমান কোনো মানুষের উচিত না, এরকম হারাম প্রেমের সম্পর্কে জড়ানো।
অবশ্যি প্রেমের পথে উপকারী কিছু দিকও আছে। মনে প্রশান্তি আসে, মেজায ফুরফুরে থাকে। সাহসিকতা, বদান্যতা, মানবিকতার মতো ভালো গুণাবলি অর্জন করা যায়।
ইয়াহইয়া ইবনু মুয়াযকে বলা হলো, 'আপনার ছেলে তো অমুক মেয়ের প্রেমে পড়েছে।' এটা শুনে তিনি বললেন, 'আল্লাহর প্রশংসা, যিনি আমার ছেলেকে পুরুষের স্বভাব দান করেছেন।'
এক জ্ঞানী বলেছেন, 'প্রেম ভালো লোকদের হৃদয়ের ওষুধ।'
আরেকজন বলেছেন, 'প্রেম ভীরুকে সাহসী করে, বোকাকে মেধাবী বানায়, কৃপণকে করে বদান্য। শান্তকে দুষ্ট স্বভাবের বানিয়ে দেয়। আবার ধুলোয় মিশিয়ে দিতে পারে বাদশাহর সম্মান। যার কোনো সঙ্গী নেই, প্রেম তার সঙ্গী।'
এক দার্শনিক বলেছেন, 'প্রেম আত্মাকে শোধিত করে, চরিত্র সুন্দর করে। তা প্রকাশ করা প্রাকৃতিক, কিন্তু চেপে রাখা অস্বাভাবিক।'
একজন পবিত্র প্রেম-সাধক বলেছেন, 'তুমি পবিত্র থাকো, সম্মান পাবে। এরপর প্রেম করো, মহৎ কিছু অর্জন করতে পারবে।'
এক প্রকৃত প্রেমিককে বলা হলো, 'যদি প্রেমাষ্পদকে পাও তাহলে কী করবে?' সে বলল, 'তার মুখশ্রী দেখে চোখ জুড়াব। তার স্মরণ ও বচনে মন-দিল শীতল করব। বিনিময়ে জীবন দিয়ে হলেও তার সতীত্ব রক্ষা করব।'
ইসহাক ইবনু ইবরাহীম বলেছেন, 'যদি প্রেম-ভালোবাসা না থাকত, তাহলে দুনিয়ার আনন্দ-উচ্ছ্বাস সব রঙহীন ধূসর হয়ে যেত।'
আরেকজন বলেছেন, 'হৃদয়ের সুস্থতার জন্য প্রেম তেমন জরুরি, দেহের জন্য যেমন জরুরি খাদ্য।'
আবু বকর সিদ্দীক এক তরুণীর পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। শুনলেন, তরুণীটি কবিতা আবৃত্তি করছে, 'আমি তাকে বহু আগেই ভালোবেসে ফেলেছি। আমার হৃদয় তার দিকে ঝুঁকে আছে কচি লতার মতো।' তখন আবু বকর তাকে বললেন, 'তুমি কি দাসী নাকি স্বাধীন?' সে বলল, 'দাসী।'
'তোমার প্রেমাষ্পদ কে?'
এ প্রশ্নের জবাবে সে আমতা আমতা করছিল। আবু বকর কসম করে বললেন যে, নামটি তিনি কাউকে বলবেন না। তখন মেয়েটি বলল, 'আমি যার ভালোবাসায় মরে যাচ্ছি, সে হলো মুহাম্মদ ইবনু কাসিম।' তখন তাকে আবু বকর কিনে আযাদ করে দিলেন এবং তাকে পাঠিয়ে দিলেন মুহাম্মদ ইবনু কাসিম ইবনি জাফর ইবনি আবি তালেবের কাছে। এবং বললেন, 'এরাই পুরুষদের ঘোরে ফেলে দেয়।'
যে প্রেম প্রেমাষ্পদের সাথে অন্যায় কাজের দিকে ধাবিত করে, তা যে মন্দ, এ কথা অনস্বীকার্য। কিন্তু জীবন আলোকিত হয়ে যায় পবিত্র প্রেমের ফোয়ারায়।
প্রকৃত বুদ্ধিমান জানে, তার প্রেম তার মাঝে ও আল্লাহ তাআলার মাঝে সম্পর্কের অবনতি ঘটাবে। এটাই ছিল আসলাফদের প্রেমের দর্শন। উবাইদুল্লাহ ইবনু আবদিল্লাহ ইবনি উতবাহ ইবনি মাসউদের প্রেম তো বেশ প্রসিদ্ধি লাভ করেছিল। তার প্রেম নিয়ে কেউ আপত্তি করেনি। উমর ইবনু আবদিল আযিয ফাতেমা বিনতু আবদিল মালিকের এক সুশ্রী দাসীকে যে ভালোবেসে ফেলেছিলেন, তাও লেখা আছে ইতিহাসের পাতায়। আবু বকর মুহাম্মদ ইবনু দাউদ যাহেরীর মতো বড় ইমামও প্রেমে পড়েছিলেন। তার প্রেম অনেক প্রসিদ্ধ। আল্লাহর নবী দাউদ আলাইহিস সালামের অধীনে ৯৯ জন স্ত্রী ছিলেন। এরপর তিনি একজনকে ভালোবেসে ফেললেন, অতপর তার দ্বারাই পূর্ণ হলো ১০০ স্ত্রীর সংখ্যা। [১]
ইমাম যুহরী বলেন, ইসলামের প্রথম প্রেম ছিল আয়েশা সিদ্দিকা রাদিয়াল্লাহু আনহা'র সাথে নবীজির প্রেম। মাসরুক আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা'র উপাধি দিয়েছেন, আল্লাহর রাসূলের প্রেমিকা।
বর্ণিত আছে, ইবরাহীম আলাইহিস সালাম প্রতিদিন বোরাকে চড়ে হাজেরা আলাইহাস সালামকে দেখতে আসতেন শাম থেকে, প্রচণ্ড ভালোবাসা আর অস্থিরতার কারণে।
আবু মুহাম্মদ ইবনু হাযম বলেছেন, আয়িম্মা ও খুলাফাদের অনেকেই প্রেমে পড়েছেন। এক লোক উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু'র কাছে এসে বললেন, 'এক মেয়েকে দেখে তার প্রেমে পড়ে গিয়েছি।' তখন তিনি বললেন, 'তোমার মন তো তোমার হাতে নেই।'
প্রেম বিষয়ে কথা বলতে গেলে উপকারী অপকারী, বৈধ অবৈধ সম্পর্কের মাঝে পার্থক্যরেখা টানা জরুরি। একচেটিয়াভাবে কোনো প্রণয় বা প্রেমের সম্পর্ককে হালাল বা হারাম বলে দেয়া এক্ষেত্রে মুশকিল।
টিকাঃ
[১] দাউদ আলাইহিস সালাম বিয়ে-বহির্ভূতভাবে কোনো নারীর সাথে প্রেম করেছিলেন, এমন কথা একটি ভিত্তিহীন বর্ণনা থেকে এসেছে। কোনো কোনো মুফাসসির নিজ নিজ তাফসীরগ্রন্থে নির্ভরযোগ্য কোনো সূত্র ছাড়াই এ সংক্রান্ত একটি ঘটনা উল্লেখ করেছেন। ঘটনাটিতে দেখা যায়, আল্লাহর রাসূল দাউদ এক নারীর প্রতি মোহগ্রস্ত হয়ে তার বর্তমান স্বামীকে হত্যা করে তাকে বিবাহ করেন। নাউযুবিল্লাহ! এ সমস্ত ঘটনার নির্ভরযোগ্য কোনো সূত্র যেমন নেই, তেমনি একজন মুমিনের জন্য তা বিশ্বাস করাও মারাত্মক ধৃষ্টতা। হাফিয ইবনু কাসীর বলেন, এ সংক্রান্ত যত ঘটনা মুফাসসিরগণ উল্লেখ করেছেন তার অধিকাংশই ইসরাঈলী বর্ণনা থেকে গৃহীত। নবীজি সূত্রে সরাসরি এ বিষয়ে কোনো হাদীস বর্ণিত হয়নি। -তাফসীরু ইবনি কাসীর-৪/৭৬। এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে পড়ুন আল্লামা রাযী রচিত আত-তাফসীরুল কাবীর, সূরা সোয়াদ, আয়াত-ক্রম: ২১-২৫-এর আলোচনায়। -সম্পাদক
📄 উন্নত প্রেম
শর্তহীনভাবে মৌলিক উপকারী প্রেম হলো, হৃদয়ের ফিতরাত বা স্বভাবগত যে প্রেম, তা। আর সেটা হলো আল্লাহর প্রতি মুহাব্বাত, আল্লাহপ্রেম। 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ'-এর প্রেম। এটা একটা মহান ইবাদাত। এ ক্ষেত্রে অন্যকে আল্লাহর শরীক বানানো জায়েয নেই। এই প্রেমই আসল। অন্য সকল প্রেম আপেক্ষিক ও আপতিত। এই কালিমাহর প্রতি বান্দার স্বভাবজাত প্রেম থাকা আবশ্যক। এই কালিমাহর উৎস থেকেই বান্দার জগত-সংসার যাবতীয় নিয়ামত আর ইহসানে আচ্ছাদিত হয়। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-
وَمَا بِكُمْ مِنْ نِعْمَةٍ فَمِنَ اللَّهِ ثُمَّ إِذَا مَسَّكُمُ الضُّرُّ فَإِلَيْهِ تَجْأَرُونَ
'তোমাদের নিকট যত নিয়ামত রয়েছে, তার সবই আল্লাহ তাআলা থেকে আগত। এরপর তোমরা যখন-তখন তাঁরই নিকট অনুনয়-বিনয় করো।' [১]
দুইটি উপলক্ষ সব প্রেমেই বিদ্যমান থাকে। সৌন্দর্য ও মাহাত্ম্য। আর এই দুই গুণের ক্ষেত্রে একমাত্র আল্লাহ তাআলারই রয়েছে সর্বোচ্চ পরিপূর্ণতা। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-
قُلْ إِنْ كُنْتُمْ تُحِبُّونَ اللَّهَ فَاتَّبِعُونِي يُحْبِبْكُمُ اللَّهُ
'আপনি বলুন, যদি তোমরা আল্লাহকে ভালোবেসে থাক, তাহলে আমার অনুসরণ করো। তাহলে আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন।' [২]
অন্য আয়াতে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-
وَمِنَ النَّاسِ مَنْ يَتَّخِذُ مِنْ دُونِ اللَّهِ أَنْدَادًا يُحِبُّونَهُمْ كَحُبِّ اللَّهِ وَالَّذِينَ آمَنُوا أَشَدُّ حُبًّا لِلَّهِ
'মানুষের মধ্যে কেউ কেউ আল্লাহ ছাড়া তার সমকক্ষ নির্ধারণ করে থাকে। যাদেরকে তারা আল্লাহর মত ভালোবেসে থাকে। আর মুমিনরা আল্লাহকেই অধিক ভালোবেসে থাকে।[১]
নবীজি কসম করে বলেছেন, 'কোনো বান্দা পরিপূর্ণ মুমিন হতে পারে না, যতক্ষণ না সে আমাকে তার পুত্র, পিতা নির্বিশেষে সকল মানুষের চেয়ে বেশি ভালোবাসবে।'
যেখানে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে ভালোবাসার ক্ষেত্রেই এভাবে বলা হয়েছে, সেখানে আল্লাহর ভালোবাসা ও প্রেম তো বান্দার কাছে আরো অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত। বান্দার প্রতি আল্লাহর সার্বক্ষণিক ইহসান ও অনুগ্রহের দাবি হলো, বান্দা মন উজাড় করে আল্লাহ তাআলাকে ভালোবাসবে। মানুষ মানুষকে ভালোবাসে বিশেষ কোনো উদ্দেশ্যে প্রণোদিত হয়ে। কিন্তু আল্লাহ যে মানুষকে ভালোবাসেন সে ভালোবাসা খাদহীন। মানুষের কল্যাণেই আল্লাহ তাকে ভালোবাসেন। এমন মহান সত্তার প্রেমকে কেবল দুর্ভাগারাই উপেক্ষা করতে পারে। দুনিয়ার সকল কিছু আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন মানুষের জন্য। আর মানুষকে সৃষ্টি করেছেন আল্লাহর ভালোবাসা অর্জন করার জন্য। বান্দার প্রার্থনার পূর্বেই আল্লাহ তাকে দিয়ে দিতে প্রস্তুত থাকেন। সুতরাং মানব-অন্তর তো এমন সত্তাকেই ভালোবাসবে, জগতের সকল কল্যাণ, অকল্যাণ, সুখ-শান্তি ও নিরাপত্তা যাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়।
হাদীসে কুদসীতে আছে, রাতের শেষ-অংশে আল্লাহ প্রথম আসমানে এসে বলেন-
مَنْ يَسْأَلُنِي فَأُعْطِيَهُ، مَنْ يَسْتَغْفِرُنِي فَأَغْفِرَ لَهُ؟
'কে আছে আমার কাছে চাইবে, আমি তাকে দান করব। কে আছে আমার কাছে ইস্তিগফার করবে, আমি তাকে ক্ষমা করব।' [২]
তিনিই একমাত্র মালিক। তাঁর কোনো শরীক নেই। সব একসময় ধ্বংস হয়ে যাবে। থাকবেন শুধু চিরন্তন আল্লাহ। তিনি অক্ষয়, অনাদি, অনন্ত। তাঁকে যে ভালোবাসবে, সে তাঁর নৈকট্যপ্রাপ্ত হবে। তাঁর সাথে যার গড়ে উঠবে প্রেম, সে তাঁর নূরের রৌশনিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠবে।
টিকাঃ
[১] সূরা নাহল, আয়াত-ক্রম: ৫৩
[২] সূরা আলে ইমরান, আয়াত-ক্রম: ৩১
[১] সূরা বাকারা, আয়াত-ক্রম: ১৬৫
[২] বুখারী, হাদীস-ক্রম: ১১৫৪; মুসলিম, হাদীস-ক্রম: ৭৫৮; তিরমিযী, হাদীস-ক্রম: ৪৪৬