📄 সমকামিতা-সুনত প্রেম
(সমকামিতা সুলভ প্রেম হচ্ছে, যে প্রেম মানুষকে সমকামিতার দিকে ধাবিত করে।) সমকামিতা সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা সূরা হিজরে আলোচনা করেছেন। লুত আলাইহিস সালামের গোত্রের বিবরণে তিনি ইরশাদ করেন—
وَجَاءَ أَهْلُ الْمَدِينَةِ يَسْتَبْشِرُونَ - قَالَ إِنَّ هَؤُلَاءِ ضَيْفِي فَلَا تَفْضَحُونِ - وَاتَّقُوا اللَّهَ وَلَا تُخْزُونِ - قَالُوا أَوَلَمْ نَنْهَكَ عَنِ الْعَالَمِينَ - قَالَ هَؤُلَاءِ بَنَاتِي إِنْ كُنْتُمْ فَاعِلِينَ - لَعَمْرُكَ إِنَّهُمْ لَفِي سَكْرَتِهِمْ يَعْمَهُونَ
'শহরবাসীরা সংবাদ পেয়ে চলে এল। নবী বললেন, "এরা আমার মেহমান, তোমরা অপকর্ম করো না, আল্লাহকে ভয় করো, আমাকে লাঞ্ছিত করো না।" তারা বলল, "আমরা কি আপনাকে বিশ্ববাসীর সমর্থন করতে নিষেধ করিনি? নবী তখন তাদেরকে বললেন, "যদি তোমরা কিছু করতেই চাও, তবে আমার সম্প্রদায়ের মেয়েরা রয়েছে।" আপনার জীবনের কসম, তারা ছিল আপন নেশায় প্রমত্ত।'[১]
এই সম্প্রদায়ের লোকেরা সমকামিতায় লিপ্ত ছিল, এক্ষেত্রে তারা আল্লাহকে ভয় করত না। এসবের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে তারা ছিল উদাসীন।
সমকামিতার জন্য কেউ যদি কাউকে ভালোবাসে, এবং সে-ভালোবাসাটা আল্লাহর ভালোবাসার উপর প্রবল হয়, অবস্থা যদি এমন হয় যে, তার অন্তরের সমগ্রটা জুড়ে আছে সমকামিতা-সুলভ প্রেম, তাহলে সে ব্যক্তি মুশরিক বা অংশীবাদী হিসেবে বিবেচিত হবে। আর শিরকের পাপ আল্লাহ তাআলা কখনো ক্ষমা করবেন না।
টিকাঃ
[১] সূরা হিজর, আয়াত-ক্রম: ৬৭-৭২
📄 শিরকযুক্ত প্রেমের আলামত
যখন কোনো ব্যক্তি অন্যের প্রেম বা সন্তুষ্টিকে আল্লাহর প্রেম ও সন্তুষ্টির উপর প্রাধান্য দেবে, উভয় সন্তুষ্টির বিষয় সামনে উপস্থিত হলে আল্লাহকে উপেক্ষা করবে, এবং নিজের পছন্দের বস্তুকে ব্যয় করবে প্রেমাষ্পদের জন্য, আল্লাহর জন্য বিশিষ্ট করবে মন্দ জিনিসকে, তখন বুঝতে হবে, ওই ব্যক্তি ভালোবাসার ক্ষেত্রে শিরকে লিপ্ত। এই দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে প্রত্যেক প্রেমিকের অবস্থা বিবেচনা করলে দেখা যায়, তাদের প্রেমময় অবস্থার পাল্লা ঈমান ও তাওহীদের পাল্লা থেকেও বেশি ভারি। তাদের কেউ তো স্পষ্টই বলে, 'হে প্রেমাষ্পদ! তোমার প্রতি আমার ভালোবাসা ঈমানের চেয়ে অনেক বেশি।' কেউ বলে, 'আমার সমগ্র অন্তর জুড়ে তোমার উপস্থিতি, এখানে অন্যের কোনো ঠাঁই নেই।' এসব প্রেম যে শিরক, তাতে বিন্দুমাত্র সন্দেহের অবকাশ নেই। এ জন্যই অনেক বুযুর্গ বলেন, 'এ ধরনের প্রেম আর বস্তুর পূজা করা সমান ব্যাপার।'
📄 শিরকযুক্ত প্রেমের প্রতিষেধক
যে ব্যক্তি এ রোগে আক্রান্ত, তাকে ভাবতে হবে যে, সে তার অজ্ঞতা ও উদাসীনতার কারণে আল্লাহবিমুখ হয়ে গেছে। পরবর্তীতে তার জন্য জরুরি হচ্ছে, সে তাওহীদের মর্ম উপলব্ধি করবে, আল্লাহর নিদর্শনের প্রতি গভীর দৃষ্টি দেবে। বাহ্যিক ও আভ্যন্তরীণ ইবাদাতে মশগুল হবে। অনুনয়ের সাথে পূর্ণ আনুগত্যের পরাকাষ্ঠা প্রদর্শনের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য অর্জনে মনোনিবেশ করবে। আল্লাহ তাআলা বলেন-
كَذَلِكَ لِنَصْرِفَ عَنْهُ السُّوءَ وَالْفَحْشَاءَ إِنَّهُ مِنْ عِبَادِنَا الْمُخْلَصِينَ
'এভাবেই আমি বান্দা থেকে মন্দ ও অশ্লীলতাকে ফিরিয়ে দিই, নিশ্চয় সে আমার একনিষ্ঠ বান্দাদের একজন।[১]
বান্দা যখন একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর প্রতি মনোনিবেশ করে, আল্লাহ তার থেকে অশ্লীলতাকে সরিয়ে দেন। ফলে বাহ্যিক প্রেমের মত্ততা থেকে সে মুক্তি পায়।
এসবের আবশ্যিক ফলাফল হলো, একজন জ্ঞানী যাতে বুঝতে পারে, জ্ঞান ও শরীয়তের দাবি হচ্ছে কল্যাণকামিতা। ব্যক্তির সামনে যখন ভালো ও মন্দ দুটি জিনিস উপস্থিত হবে, তাকে জ্ঞানের আলোয় ভাবতে হবে কোনটা উপকারী, এরপর কর্মের দ্বারা উপকারী বিষয়কে বেছে নিতে হবে।
টিকাঃ
[১] সূরা ইউসুফ, আয়াত-ক্রম: ২৪
📄 হারাম প্রেমের ক্ষতিকর দিক
এ বিষয়টি খুবই স্পষ্ট যে, বস্তু-সর্বস্ব প্রেম দুনিয়া-আখিরাত—উভয় জাহানেই ক্ষতিকর। কারণ-
১. মানুষের অন্তরে দুটি জিনিস একত্রে সমান্তরালে ক্রিয়াশীল থাকে না; একটি দিক অবশ্যই প্রাধান্য বিস্তার করে। তাই ব্যক্তির মাঝে আল্লাহ ও বস্তুর প্রেম সমানভাবে বিদ্যমান থাকবে না—এটাই স্বাভাবিক।
২. কোনো বস্তুর প্রতি মানুষের প্রেম তাকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তোলে। এটি বস্তুতান্ত্রিক প্রেমের অনিবার্য ফল।
৩. প্রেমিক ব্যক্তির অন্তর অন্যের হাতে ক্রীড়নক হিসেবে অবস্থান করে। কিন্তু প্রেমের মাদকতা তাকে এতটাই আচ্ছন্ন করে রাখে যে, নিজেকে সে অবলীলায় ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়।
৪. ব্যক্তি প্রেমের ঘোরে দুনিয়া-আখিরাত—উভয় স্থানে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরকালীন ক্ষতি হলো, সে আল্লাহর আনুগত্য থেকে দূরে সরে যায়। আর ইহকালীন ক্ষতির বিষয়টা তো স্পষ্টই।
৫. আগুন যেমন কাঠ পুড়িয়ে ভস্মীভূত করে, মানুষের অন্তরকে তারচেয়ে অনেক বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করে প্রেম। মানুষ প্রেমে যত মত্ত হবে, আল্লাহর সাথে তার দূরত্ব তত বাড়বে। একসময় শয়তান তার পরিচালক হিসেবে অধিষ্ঠিত হবে, ফলে সে আল্লাহ থেকে তাকে বিমুখ করে রাখবে।
৬. হারাম প্রেম মানুষের অনুভূতি-শক্তি বিনাশ করে, হয়তো পরোক্ষভাবে নতুবা প্রত্যক্ষভাবে। পরোক্ষভাবে মানে হলো—মানুষের অন্তর যখন নষ্ট হয়, সে তখন ভালোকে মন্দ আর মন্দকে ভালো মনে করতে থাকে। এজন্যেই হাদীসে এসেছে—
حُبُّكَ الشَّيْءَ يُعْمِي وَيُصِمُّ
'কোনো বস্তুর প্রতি তোমার প্রেম তোমাকে অন্ধ ও বধির করে দেবে।'[১]
আর প্রত্যক্ষ ক্ষতি হলো, দৈহিক ক্ষতি। প্রেম ব্যক্তিকে শারীরিকভাবে দুর্বল করে ফেলে। এমনকি ধ্বংসের সম্মুখীন করে দেয়। এ ধরনের অনেক গল্প প্রচলিত আছে। ইবনু আব্বাস আরাফার ময়দানে কঙ্কালসার দেহের এক যুবককে দেখে জিজ্ঞেস করলেন, 'এর কী হয়েছে?' লোকেরা বলল, 'সে প্রেমের বিরহে জ্বলছে।' ইবনু আব্বাস এ কথা শুনে এমন নিষিদ্ধ প্রেম থেকে আল্লাহর নিকট পানাহ চাইলেন।
টিকাঃ
[১] মুসনাদু আহমাদ, হাদীস-ক্রম: ২১৬৯৪