📘 রূহের খোরাক > 📄 একটি শাব্দিক বিশ্লেষণ

📄 একটি শাব্দিক বিশ্লেষণ


'দ্বীন' শব্দের মধ্যে আনুগত্য ও নমনীয়তা আছে, তেমনি আছে প্রভাব বিস্তারের মধ্য দিয়ে অধীন করার তাৎপর্যও। এজন্য 'দ্বীন' শব্দ দিয়ে ঊর্ধ্ব থেকে নিম্ন এবং নিম্ন থেকে ঊর্ধ্ব-উভয় অর্থ প্রকাশের সুযোগ আছে। যেমন বলা হয়-دنته فدان-এর অর্থ হচ্ছে-قهرته فذل অর্থাৎ- 'আমি তাকে ধমক দিলাম ফলে সে নমনীয় হয়ে গেল।'
অন্যদিকে دنت الله শব্দ ব্যবহার করে বোঝানো হয় যে, 'আমি আল্লাহর অনুগত হলাম।'
দ্বীনের আভ্যন্তরীণ দিকে প্রেম ও নমনীয়তার বিমূর্ত প্রকাশ ঘটে থাকে সাধারণত। কিন্তু দ্বীনের বাহ্যিক দিকে আনুগত্য বিদ্যমান থাকলেও, প্রেম ও ভালোবাসা স্বল্প পরিসরে প্রকাশিত হয়। আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিনকে يوم الدين বলে ব্যক্ত করেছেন। কারণ, এ দিনে মানুষকে তার ভালো-মন্দের প্রতিদান দেওয়া হবে। অন্য শব্দে এই দিনকে 'প্রতিদানের দিবস' বলা হয়।
দ্বীন বলতে দুটি জিনিসকে বোঝানো হয়। একটি হচ্ছে শরীয়ত। অপরটি হিসাব ও প্রতিদান।
তবে আল্লাহর দ্বীনের যে অংশকেই বিবেচনায় আনা হোক, এর সারকথা হলো প্রেম ও মুহাব্বাত। কারণ, আল্লাহ তাআলা মানুষের জন্য যা কিছুই নির্দেশ ও শরীয়ত-সিদ্ধ করেছেন, তা তিনি ভালোবাসা ও সন্তুষ্টি থেকে করেছেন। বান্দার ধার্মিকতা তখনই গৃহীত হবে, যখন তা ভালোবাসা-সহকারে প্রকাশিত হবে। নবীজি বলেছেন-
ذَاقَ طَعْمَ الْإِيمَانِ مَنْ رَضِيَ بِاللَّهِ رَبًّا، وَبِالْإِسْلَامِ دِينًا، وَبِمُحَمَّدٍ - صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ - رَسُولًا
'ঐ ব্যক্তি ঈমানের স্বাদ পাবে, যে আল্লাহকে প্রভু হিসেবে, ইসলামকে দ্বীন হিসেবে এবং মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহিই ওয়া সাল্লামকে নবী হিসেবে পেয়ে সন্তুষ্ট।[১]
অনুরূপ সম্পর্ক দ্বীনের প্রতিদান ও প্রতিফলের ক্ষেত্রেও। কারণ, আল্লাহ তাআলা এর মধ্যে উৎকৃষ্টকে যেমন প্রতিদান দেবেন, নিকৃষ্টকেও তার প্রতিফল দেবেন। এর মধ্যে যেমন আল্লাহর ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা পায়, তেমনি প্রকাশ পায় তাঁর অপার অনুগ্রহের দিকটাও। আর অনুগ্রহ ও ন্যায়বিচার—দুটিই আল্লাহর নিকট প্রিয় ও পছন্দনীয়।

টিকাঃ
[১] মুসলিম, হাদীস-ক্রম: ২৪

📘 রূহের খোরাক > 📄 মূর্তিও প্রতিকৃতির প্রতি ভালোবাসা

📄 মূর্তিও প্রতিকৃতির প্রতি ভালোবাসা


প্রতিকৃতির প্রতি মানুষের ভালোবাসা অন্তরকে বিনষ্ট করার মাধ্যমে তার কর্ম, ইচ্ছা ও ভাষ্যকে কলুষিত করে দেয়। তাওহীদের শক্তিমত্তার শিকড় উৎপাটন করে। আল্লাহ তাআলা এ রোগের আলোচনায় দুটি শ্রেণিকে চিহ্নিত করেছেন—নারীকেন্দ্রিক প্রেমিক ও সমকামী প্রেমিক। সূরা ইউসুফে আল্লাহ তাআলা নবী ইউসুফ আলাইহিস সালামের প্রতি মিশরের রানির প্রেম ও আকাঙ্ক্ষার বিষয়ে আলোচনা এনেছেন। পাশাপাশি, ইউসুফ আলাইহিস সালামের ধৈর্য, নির্মলতা ও খোদাভীরুতার কথা গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করেছেন। এসব স্থানে আল্লাহর সাহায্য ছাড়া মানুষ নিরুপায় হয়ে যায়।
এই ঘটনায় ইউসুফ আলাহিস সালামের অগ্রসর হওয়া ছিল খুবই যৌক্তিক। কয়েক দিক থেকে এর কারণ পর্যালোচনা করা যায়।
১. আল্লাহ তাআলা মানুষের অন্তরে নারীর প্রতি এক আকর্ষণ রেখে দিয়েছেন; যেভাবে খাবারের প্রতি ক্ষুধার্ত মানুষের আকর্ষণ ক্রিয়াশীল থাকে। তবে খাবারের আকর্ষণ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা মানুষের আছে, কিন্তু নারীর আকর্ষণ থেকে মানুষ সহজে বেরিয়ে আসতে পারে না। অবশ্য নারীর প্রতি আকর্ষণ যদি বৈধ উপায়ে হয়, তাহলে তা প্রশংসনীয়; হাদীসের ভাষ্য এরকমই।
আনাস সূত্রে বর্ণিত হাদীসে রাসূল বলেন—
حُبِّبَ إِلَيَّ مِنْ دُنْيَاكُمُ النِّسَاءُ وَالطِيبُ، وَجُعِلَتْ قُرَّةُ عَيْنِي فِي الصَّلاةِ
'দুনিয়াতে নারী ও সুগন্ধিকে আমার পছন্দের বস্তু হিসেবে প্রদান করা হয়েছে। আর সালাতের মধ্যে রয়েছে আমার চোখের শীতলতা।[১]
অন্য বর্ণনায় এই অংশটুকুও আছে, নবীজি বলেন—
أَصْبِرُ عَنِ الطَّعَامِ وَالشَّرَابِ وَلَا أَصْبِرُ عَنْهُنَّ
'আমি খাদ্য ও পানীয়ের ক্ষেত্রে ধৈর্য ধরতে পারি, কিন্তু স্ত্রীদের ব্যাপারে না।'[২]
২. ইউসুফ আলাইহিস সালাম ছিলেন যুবক। সে হিসেবে রানির প্রতি তাঁর অধিক আকর্ষণ থাকা স্বাভাবিক।
৩. সেসময়ে তিনি ছিলেন কুমার, তাঁর কোনো স্ত্রী ছিল না—যার মাধ্যমে চাহিদা মেটানো সম্ভব হবে।
৪. আলোচিত নারী ছিলেন উচ্চ-বংশীয়া ও সম্ভ্রান্ত। সাধারণত এসবের প্রতি মানুষের আকর্ষণ বেশি থাকে।
৫. এই আহ্বানে সম্পূর্ণভাবে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে নারী; সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা করেছে, উদ্বুদ্ধ করেছে। তাই ইউসুফ আলাইহিস সালামের পক্ষে এতে প্ররোচিত হওয়া খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার ছিল।
৬. ইউসুফ আলাইহিস সালাম যেহেতু নারীর আবাসগৃহেই লালিত- পালিত হচ্ছেন, তাই তাঁর উপর নারীর প্রভাব প্রবলভাবে বিদ্যমান ছিল। এ ক্ষেত্রে যুগপৎ দুটি বিষয় ক্রিয়াশীল ছিল—প্রেরণা ও ভীতি প্রদর্শন।
৭. অন্যদিকে মহিলার আহ্বানে সাড়া না দেওয়ার মধ্যে একটি সংকট ছিল এই যে, সম্ভবত সে ও তার পরিবারের সদস্যদের থেকে সহযোগিতার সকল পথ বন্ধ হয়ে যাবে।
৮. অন্য একটি ব্যাপার হলো, মহিলা ইউসুফ আলাইহিস সালামের মনিবা বা অধিকারিণী হওয়ার কারণে পূর্ব থেকেই একটা আসা-যাওয়া চলছিল। এ কারণে পারস্পরিক সম্পর্কের প্রশ্নে সখ্যতার বিষয়টি পূর্ণরূপে হাজির আছে। এবং সেই সখ্যতা-কেন্দ্রিক সম্মিলন অসম্ভব কিছু ছিল না। যেমন—একটি প্রবাদ আছে প্রসিদ্ধ। এক নারীকে প্রশ্ন করা হলো, 'তুমি আরব নারী, তোমার আছে আত্মগরিমা। কীভাবে তুমি অপকর্মে লিপ্ত হলে?' নারী বলল, 'আমাদের অত্যধিক গমনাগমন বিষয়টিকে হালকা করে দিয়েছিল।'
৯. তাছাড়া মহিলাটি একই সাথে কারাগারের ভয় দেখিয়ে সম্মত করতে চেয়েছিল। এ বিবেচনায় এতে মুক্তি ও প্রবৃত্তির চাহিদা যুগপৎ ক্রিয়াশীল ছিল।
তথাপি, ইউসুফ আলাইহিস সালাম অপকর্মে লিপ্ত হননি। তিনি নিজের জীবনকে ঠেলে দিয়েছেন অনাকাঙ্ক্ষিত ও অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে; শুধুমাত্র আল্লাহর প্রেম ও ভালোবাসার প্রতি দৃষ্টি দিয়ে। ফলে তিনি কারাগারকে বিনা-বাক্যে গ্রহণ করেছেন; যিনার মতো হারামকে উপেক্ষা করেছেন। তিনি বলেছেন—
رَبِّ السِّجْنُ أَحَبُّ إِلَيَّ مِمَّا يَدْعُونَنِي إِلَيْهِ
'হে প্রভু! তারা যে দিকে আমাকে আহ্বান করছে, তার চেয়ে আমার নিকট কারাগার অনেক প্রিয়।[১]
এ ঘটনায় যে শিক্ষা রয়েছে, তা নিয়ে স্বতন্ত্র গ্রন্থ রচনা করা যাবে। সহস্রাধিক হিকমত, উপকারিতা ও শিক্ষার একটি সুশান্ত পরিবেশন হয়েছে এই সূরার ঘটনায়।

টিকাঃ
[১] মুসনাদু আহমাদ, হাদীস-ক্রম: ১৩০৭৯
[২] হাদীসের কোনো কিতাবে এই অংশটি পাওয়া যায় না। ইবনুল কাইয়্যিম কিতাবুয যুহদের উদ্ধৃতি দিলেও কিতাবুয যুহদের বেশ কিছু পাণ্ডুলিপিতে এই অংশটি নেই। ইমাম সুয়ূতী বলেন, কিতাবুয যুহদের মূল পাণ্ডুলিপিটি বেশ কয়েকবার ঘেঁটেও হাদীসটি আমি পাইনি। শুধু কিতাবুয যুহদের সংযোজিত অংশে হাদীসটি পাওয়া যায়। -ফায়যুল কাদীর-৩/৩৭০-সম্পাদক
[১] সূরা ইউসুফ, আয়াত-ক্রম: ৩৩

📘 রূহের খোরাক > 📄 সমকামিতা-সুনত প্রেম

📄 সমকামিতা-সুনত প্রেম


(সমকামিতা সুলভ প্রেম হচ্ছে, যে প্রেম মানুষকে সমকামিতার দিকে ধাবিত করে।) সমকামিতা সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা সূরা হিজরে আলোচনা করেছেন। লুত আলাইহিস সালামের গোত্রের বিবরণে তিনি ইরশাদ করেন—
وَجَاءَ أَهْلُ الْمَدِينَةِ يَسْتَبْشِرُونَ - قَالَ إِنَّ هَؤُلَاءِ ضَيْفِي فَلَا تَفْضَحُونِ - وَاتَّقُوا اللَّهَ وَلَا تُخْزُونِ - قَالُوا أَوَلَمْ نَنْهَكَ عَنِ الْعَالَمِينَ - قَالَ هَؤُلَاءِ بَنَاتِي إِنْ كُنْتُمْ فَاعِلِينَ - لَعَمْرُكَ إِنَّهُمْ لَفِي سَكْرَتِهِمْ يَعْمَهُونَ
'শহরবাসীরা সংবাদ পেয়ে চলে এল। নবী বললেন, "এরা আমার মেহমান, তোমরা অপকর্ম করো না, আল্লাহকে ভয় করো, আমাকে লাঞ্ছিত করো না।" তারা বলল, "আমরা কি আপনাকে বিশ্ববাসীর সমর্থন করতে নিষেধ করিনি? নবী তখন তাদেরকে বললেন, "যদি তোমরা কিছু করতেই চাও, তবে আমার সম্প্রদায়ের মেয়েরা রয়েছে।" আপনার জীবনের কসম, তারা ছিল আপন নেশায় প্রমত্ত।'[১]
এই সম্প্রদায়ের লোকেরা সমকামিতায় লিপ্ত ছিল, এক্ষেত্রে তারা আল্লাহকে ভয় করত না। এসবের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে তারা ছিল উদাসীন।
সমকামিতার জন্য কেউ যদি কাউকে ভালোবাসে, এবং সে-ভালোবাসাটা আল্লাহর ভালোবাসার উপর প্রবল হয়, অবস্থা যদি এমন হয় যে, তার অন্তরের সমগ্রটা জুড়ে আছে সমকামিতা-সুলভ প্রেম, তাহলে সে ব্যক্তি মুশরিক বা অংশীবাদী হিসেবে বিবেচিত হবে। আর শিরকের পাপ আল্লাহ তাআলা কখনো ক্ষমা করবেন না।

টিকাঃ
[১] সূরা হিজর, আয়াত-ক্রম: ৬৭-৭২

📘 রূহের খোরাক > 📄 শিরকযুক্ত প্রেমের আলামত

📄 শিরকযুক্ত প্রেমের আলামত


যখন কোনো ব্যক্তি অন্যের প্রেম বা সন্তুষ্টিকে আল্লাহর প্রেম ও সন্তুষ্টির উপর প্রাধান্য দেবে, উভয় সন্তুষ্টির বিষয় সামনে উপস্থিত হলে আল্লাহকে উপেক্ষা করবে, এবং নিজের পছন্দের বস্তুকে ব্যয় করবে প্রেমাষ্পদের জন্য, আল্লাহর জন্য বিশিষ্ট করবে মন্দ জিনিসকে, তখন বুঝতে হবে, ওই ব্যক্তি ভালোবাসার ক্ষেত্রে শিরকে লিপ্ত। এই দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে প্রত্যেক প্রেমিকের অবস্থা বিবেচনা করলে দেখা যায়, তাদের প্রেমময় অবস্থার পাল্লা ঈমান ও তাওহীদের পাল্লা থেকেও বেশি ভারি। তাদের কেউ তো স্পষ্টই বলে, 'হে প্রেমাষ্পদ! তোমার প্রতি আমার ভালোবাসা ঈমানের চেয়ে অনেক বেশি।' কেউ বলে, 'আমার সমগ্র অন্তর জুড়ে তোমার উপস্থিতি, এখানে অন্যের কোনো ঠাঁই নেই।' এসব প্রেম যে শিরক, তাতে বিন্দুমাত্র সন্দেহের অবকাশ নেই। এ জন্যই অনেক বুযুর্গ বলেন, 'এ ধরনের প্রেম আর বস্তুর পূজা করা সমান ব্যাপার।'

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00