📄 ভালোবাসার চিহ্ন-সমূহ
ভালোবাসা ভালো-মন্দ বা উপকারী-অপকারী যেমনই হোক, তার কিছু চিহ্ন, অনুষঙ্গ ও আবশ্যকীয় উপাদান আছে। যেমন-স্বাদ, উপলব্ধি, আগ্রহ-উদ্দীপনা, প্রেমাস্পদের নৈকট্য কিবা বিচ্ছেদ-ইত্যাদি বিষয়।
উপকারী প্রেম: যার মাধ্যমে ব্যক্তি ইহ ও পরজাগতিক জীবনে উপকৃত হয়। এ প্রেম মানুষের সৌভাগ্যের সোপান।
মন্দ প্রেম: যা মানুষকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, এবং মানুষের জীবনে দুর্ভোগ ডেকে আনে। কোনো জ্ঞানী লোক ক্ষতিকর বিষয়কে বেছে নেয় না, যারা নেয় তারা নিজের উপর অন্যায় করে। অন্তর কখনও প্রবৃত্তির কুহকে আচ্ছন্ন থাকে, বেছে নেয় ক্ষতিকর বিষয়কে; যা নিজ সত্তার উপর অন্যায় হিসেবে বিবেচিত হবে। কিন্তু, জ্ঞাতসারে কেউ এ পথে হাঁটতে পারে না। তবে কারো উপর প্রবৃত্তি প্রাধান্য বিস্তার করে, ফলে মন্দ থেকে ভালোকে সে পৃথক করতে ব্যর্থ হয়। তথাপি, এর সুনির্দিষ্ট কিছু কারণ আছে; যেমন-
১. ভ্রান্ত বিশ্বাস। যা অত্যন্ত নিন্দিত বিষয়। মূলত প্রবৃত্তির অনুগামিতাও ভ্রান্তধারণা থেকে সৃষ্ট। আর অন্যায় প্রেম মূর্খতা ও ভ্রান্ত বিশ্বাস থেকে বিকশিত হতে থাকে।
২. প্রবৃত্তির অধীনতা। মানুষ যখন প্রবৃত্তির অনুগামী হয়, প্রবৃত্তির দ্বারা শাসিত হতে থাকে, তখন সত্য ও মিথ্যার বিভাজন সংশয়পূর্ণ হয়ে যায়। একসময়ে প্রবৃত্তির শক্তি প্রবলভাবে বিজয়ী হয়ে যায়।
সেই সাথে এসবের সংশ্লিষ্ট বিষয়ের অবস্থান স্পষ্ট হয়। সুতরাং, উপকারী প্রেমে আসক্তদের হাসি-কান্নার মুহূর্তগুলোও উপকারী হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে। ফলে তার প্রেমময় জীবনের শক্তি ও উন্মেষ ক্রমশ বৃদ্ধি পেতে থাকে।
আর নিন্দিত ও ক্ষতিকর প্রেম মানুষকে আল্লাহ থেকে বিমুখ করে রাখে। ব্যক্তি যত বেশি মন্দ-প্রেমে মত্ত থাকে, ততই ক্ষতির সম্মুখীন হয়। ব্যক্তির কাজের ফলাফল এভাবেই প্রতিফলিত হয়, যেসব কর্ম প্রকাশিত হয় গুনাহ থেকে, তার ফলাফল হয় নিন্দিত। আর যা আনুগত্যের প্রকাশ হিসেবে দৃশ্যমান হয়, তা সবসময়ই কল্যাণকর।
📄 ভালোবাসাই সকল ধর্মের ভিত্তি
পৃথিবীর সকল ধর্ম—বাতিল হোক বা বিশুদ্ধ—সবই ভালোবাসার উপর প্রতিষ্ঠিত। পৃথিবীর সকল কর্ম যেমন ইচ্ছা ও ভালোবাসার অধীন, তেমনি পৃথিবীর সকল ধর্মও ভালোবাসার অধীন। দ্বীন ও ধর্ম মানবজাতিকে ইবাদাত, আনুগত্য ও উত্তম আদর্শের নির্দেশ করে থাকে। এ কারণে কুরআনে দ্বীনকে খুলক (আদর্শ) দ্বারা ব্যক্ত করা হয়েছে। আল্লাহ বলেন—
وَإِنَّكَ لَعَلَى خُلُقٍ عَظِيمٍ
'আর (হে নবী!) আপনি অবশ্যই সন্দেহাতীতভাবে উত্তম আদর্শের উপর প্রতিষ্ঠিত।' [১]
এ আয়াতের ব্যাখ্যায় ইবনু আব্বাস বলেন, 'এর অর্থ হলো, আপনি মহান ধর্মের উপর প্রতিষ্ঠিত।'
আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে রাসূলের আদর্শ সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, 'তাঁর আদর্শ হচ্ছে কুরআন।' [২]
টিকাঃ
[১] সূরা কলম, আয়াত-ক্রম: ৪
[২] মুসনাদু আহমাদ, হাদিস-ক্রম: ২৫৮১৩
📄 একটি শাব্দিক বিশ্লেষণ
'দ্বীন' শব্দের মধ্যে আনুগত্য ও নমনীয়তা আছে, তেমনি আছে প্রভাব বিস্তারের মধ্য দিয়ে অধীন করার তাৎপর্যও। এজন্য 'দ্বীন' শব্দ দিয়ে ঊর্ধ্ব থেকে নিম্ন এবং নিম্ন থেকে ঊর্ধ্ব-উভয় অর্থ প্রকাশের সুযোগ আছে। যেমন বলা হয়-دنته فدان-এর অর্থ হচ্ছে-قهرته فذل অর্থাৎ- 'আমি তাকে ধমক দিলাম ফলে সে নমনীয় হয়ে গেল।'
অন্যদিকে دنت الله শব্দ ব্যবহার করে বোঝানো হয় যে, 'আমি আল্লাহর অনুগত হলাম।'
দ্বীনের আভ্যন্তরীণ দিকে প্রেম ও নমনীয়তার বিমূর্ত প্রকাশ ঘটে থাকে সাধারণত। কিন্তু দ্বীনের বাহ্যিক দিকে আনুগত্য বিদ্যমান থাকলেও, প্রেম ও ভালোবাসা স্বল্প পরিসরে প্রকাশিত হয়। আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিনকে يوم الدين বলে ব্যক্ত করেছেন। কারণ, এ দিনে মানুষকে তার ভালো-মন্দের প্রতিদান দেওয়া হবে। অন্য শব্দে এই দিনকে 'প্রতিদানের দিবস' বলা হয়।
দ্বীন বলতে দুটি জিনিসকে বোঝানো হয়। একটি হচ্ছে শরীয়ত। অপরটি হিসাব ও প্রতিদান।
তবে আল্লাহর দ্বীনের যে অংশকেই বিবেচনায় আনা হোক, এর সারকথা হলো প্রেম ও মুহাব্বাত। কারণ, আল্লাহ তাআলা মানুষের জন্য যা কিছুই নির্দেশ ও শরীয়ত-সিদ্ধ করেছেন, তা তিনি ভালোবাসা ও সন্তুষ্টি থেকে করেছেন। বান্দার ধার্মিকতা তখনই গৃহীত হবে, যখন তা ভালোবাসা-সহকারে প্রকাশিত হবে। নবীজি বলেছেন-
ذَاقَ طَعْمَ الْإِيمَانِ مَنْ رَضِيَ بِاللَّهِ رَبًّا، وَبِالْإِسْلَامِ دِينًا، وَبِمُحَمَّدٍ - صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ - رَسُولًا
'ঐ ব্যক্তি ঈমানের স্বাদ পাবে, যে আল্লাহকে প্রভু হিসেবে, ইসলামকে দ্বীন হিসেবে এবং মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহিই ওয়া সাল্লামকে নবী হিসেবে পেয়ে সন্তুষ্ট।[১]
অনুরূপ সম্পর্ক দ্বীনের প্রতিদান ও প্রতিফলের ক্ষেত্রেও। কারণ, আল্লাহ তাআলা এর মধ্যে উৎকৃষ্টকে যেমন প্রতিদান দেবেন, নিকৃষ্টকেও তার প্রতিফল দেবেন। এর মধ্যে যেমন আল্লাহর ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা পায়, তেমনি প্রকাশ পায় তাঁর অপার অনুগ্রহের দিকটাও। আর অনুগ্রহ ও ন্যায়বিচার—দুটিই আল্লাহর নিকট প্রিয় ও পছন্দনীয়।
টিকাঃ
[১] মুসলিম, হাদীস-ক্রম: ২৪
📄 মূর্তিও প্রতিকৃতির প্রতি ভালোবাসা
প্রতিকৃতির প্রতি মানুষের ভালোবাসা অন্তরকে বিনষ্ট করার মাধ্যমে তার কর্ম, ইচ্ছা ও ভাষ্যকে কলুষিত করে দেয়। তাওহীদের শক্তিমত্তার শিকড় উৎপাটন করে। আল্লাহ তাআলা এ রোগের আলোচনায় দুটি শ্রেণিকে চিহ্নিত করেছেন—নারীকেন্দ্রিক প্রেমিক ও সমকামী প্রেমিক। সূরা ইউসুফে আল্লাহ তাআলা নবী ইউসুফ আলাইহিস সালামের প্রতি মিশরের রানির প্রেম ও আকাঙ্ক্ষার বিষয়ে আলোচনা এনেছেন। পাশাপাশি, ইউসুফ আলাইহিস সালামের ধৈর্য, নির্মলতা ও খোদাভীরুতার কথা গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করেছেন। এসব স্থানে আল্লাহর সাহায্য ছাড়া মানুষ নিরুপায় হয়ে যায়।
এই ঘটনায় ইউসুফ আলাহিস সালামের অগ্রসর হওয়া ছিল খুবই যৌক্তিক। কয়েক দিক থেকে এর কারণ পর্যালোচনা করা যায়।
১. আল্লাহ তাআলা মানুষের অন্তরে নারীর প্রতি এক আকর্ষণ রেখে দিয়েছেন; যেভাবে খাবারের প্রতি ক্ষুধার্ত মানুষের আকর্ষণ ক্রিয়াশীল থাকে। তবে খাবারের আকর্ষণ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা মানুষের আছে, কিন্তু নারীর আকর্ষণ থেকে মানুষ সহজে বেরিয়ে আসতে পারে না। অবশ্য নারীর প্রতি আকর্ষণ যদি বৈধ উপায়ে হয়, তাহলে তা প্রশংসনীয়; হাদীসের ভাষ্য এরকমই।
আনাস সূত্রে বর্ণিত হাদীসে রাসূল বলেন—
حُبِّبَ إِلَيَّ مِنْ دُنْيَاكُمُ النِّسَاءُ وَالطِيبُ، وَجُعِلَتْ قُرَّةُ عَيْنِي فِي الصَّلاةِ
'দুনিয়াতে নারী ও সুগন্ধিকে আমার পছন্দের বস্তু হিসেবে প্রদান করা হয়েছে। আর সালাতের মধ্যে রয়েছে আমার চোখের শীতলতা।[১]
অন্য বর্ণনায় এই অংশটুকুও আছে, নবীজি বলেন—
أَصْبِرُ عَنِ الطَّعَامِ وَالشَّرَابِ وَلَا أَصْبِرُ عَنْهُنَّ
'আমি খাদ্য ও পানীয়ের ক্ষেত্রে ধৈর্য ধরতে পারি, কিন্তু স্ত্রীদের ব্যাপারে না।'[২]
২. ইউসুফ আলাইহিস সালাম ছিলেন যুবক। সে হিসেবে রানির প্রতি তাঁর অধিক আকর্ষণ থাকা স্বাভাবিক।
৩. সেসময়ে তিনি ছিলেন কুমার, তাঁর কোনো স্ত্রী ছিল না—যার মাধ্যমে চাহিদা মেটানো সম্ভব হবে।
৪. আলোচিত নারী ছিলেন উচ্চ-বংশীয়া ও সম্ভ্রান্ত। সাধারণত এসবের প্রতি মানুষের আকর্ষণ বেশি থাকে।
৫. এই আহ্বানে সম্পূর্ণভাবে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে নারী; সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা করেছে, উদ্বুদ্ধ করেছে। তাই ইউসুফ আলাইহিস সালামের পক্ষে এতে প্ররোচিত হওয়া খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার ছিল।
৬. ইউসুফ আলাইহিস সালাম যেহেতু নারীর আবাসগৃহেই লালিত- পালিত হচ্ছেন, তাই তাঁর উপর নারীর প্রভাব প্রবলভাবে বিদ্যমান ছিল। এ ক্ষেত্রে যুগপৎ দুটি বিষয় ক্রিয়াশীল ছিল—প্রেরণা ও ভীতি প্রদর্শন।
৭. অন্যদিকে মহিলার আহ্বানে সাড়া না দেওয়ার মধ্যে একটি সংকট ছিল এই যে, সম্ভবত সে ও তার পরিবারের সদস্যদের থেকে সহযোগিতার সকল পথ বন্ধ হয়ে যাবে।
৮. অন্য একটি ব্যাপার হলো, মহিলা ইউসুফ আলাইহিস সালামের মনিবা বা অধিকারিণী হওয়ার কারণে পূর্ব থেকেই একটা আসা-যাওয়া চলছিল। এ কারণে পারস্পরিক সম্পর্কের প্রশ্নে সখ্যতার বিষয়টি পূর্ণরূপে হাজির আছে। এবং সেই সখ্যতা-কেন্দ্রিক সম্মিলন অসম্ভব কিছু ছিল না। যেমন—একটি প্রবাদ আছে প্রসিদ্ধ। এক নারীকে প্রশ্ন করা হলো, 'তুমি আরব নারী, তোমার আছে আত্মগরিমা। কীভাবে তুমি অপকর্মে লিপ্ত হলে?' নারী বলল, 'আমাদের অত্যধিক গমনাগমন বিষয়টিকে হালকা করে দিয়েছিল।'
৯. তাছাড়া মহিলাটি একই সাথে কারাগারের ভয় দেখিয়ে সম্মত করতে চেয়েছিল। এ বিবেচনায় এতে মুক্তি ও প্রবৃত্তির চাহিদা যুগপৎ ক্রিয়াশীল ছিল।
তথাপি, ইউসুফ আলাইহিস সালাম অপকর্মে লিপ্ত হননি। তিনি নিজের জীবনকে ঠেলে দিয়েছেন অনাকাঙ্ক্ষিত ও অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে; শুধুমাত্র আল্লাহর প্রেম ও ভালোবাসার প্রতি দৃষ্টি দিয়ে। ফলে তিনি কারাগারকে বিনা-বাক্যে গ্রহণ করেছেন; যিনার মতো হারামকে উপেক্ষা করেছেন। তিনি বলেছেন—
رَبِّ السِّجْنُ أَحَبُّ إِلَيَّ مِمَّا يَدْعُونَنِي إِلَيْهِ
'হে প্রভু! তারা যে দিকে আমাকে আহ্বান করছে, তার চেয়ে আমার নিকট কারাগার অনেক প্রিয়।[১]
এ ঘটনায় যে শিক্ষা রয়েছে, তা নিয়ে স্বতন্ত্র গ্রন্থ রচনা করা যাবে। সহস্রাধিক হিকমত, উপকারিতা ও শিক্ষার একটি সুশান্ত পরিবেশন হয়েছে এই সূরার ঘটনায়।
টিকাঃ
[১] মুসনাদু আহমাদ, হাদীস-ক্রম: ১৩০৭৯
[২] হাদীসের কোনো কিতাবে এই অংশটি পাওয়া যায় না। ইবনুল কাইয়্যিম কিতাবুয যুহদের উদ্ধৃতি দিলেও কিতাবুয যুহদের বেশ কিছু পাণ্ডুলিপিতে এই অংশটি নেই। ইমাম সুয়ূতী বলেন, কিতাবুয যুহদের মূল পাণ্ডুলিপিটি বেশ কয়েকবার ঘেঁটেও হাদীসটি আমি পাইনি। শুধু কিতাবুয যুহদের সংযোজিত অংশে হাদীসটি পাওয়া যায়। -ফায়যুল কাদীর-৩/৩৭০-সম্পাদক
[১] সূরা ইউসুফ, আয়াত-ক্রম: ৩৩