📄 ভালোবাসা শুধু আল্লাহর জন্য
উপরোক্ত আলোচনা থেকে বোঝা যাচ্ছে, ব্যক্তিভেদে সকলেরই ইচ্ছা, কর্ম ও ভালোবাসা রয়েছে। আর এসকল বিষয়ের চঞ্চলতার মূলে রয়েছে ইচ্ছা ও প্রেম। আর স্বভাবতই এসব চঞ্চলতা মূলত সৃষ্টিকর্তার জন্যে। কারণ, জগত তো তিনিই সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন-
لَوْ كَانَ فِيهِمَا آلِهَةٌ إِلَّا اللَّهُ لَفَسَدَتَا
'আসমান ও জমিনে যদি আল্লাহ ছাড়া আরও প্রভু থাকত, তবে তা ধ্বংস হয়ে যেত।'[২]
কারণ, পৃথিবীতে যখন প্রভু দুইজন হবেন, প্রত্যেকে আপন ইচ্ছা বাস্তবায়ন করতে চেষ্টা করবেন। অন্যজনকে প্রতিহত করে নিজস্ব মতামত প্রতিষ্ঠা করতে চাইবেন। এ সময়ে একজন নতি স্বীকার করলে তাঁর অপূর্ণতা প্রকাশিত হবে। আর কেউ চায় না নিজ অপূর্ণতা প্রকাশ করতে। স্বাভাবিক বিষয় এমনই-এক রাষ্ট্রে দুইজন শাসক হলে শৃঙ্খলা ব্যহত হবে। আল্লাহ তাআলা বলেন-
قُلْ لَوْ كَانَ مَعَهُ آلِهَةٌ كَمَا يَقُولُونَ إِذًا لَابْتَغَوْا إِلَى ذِي الْعَرْشِ سَبِيلًا
'আপনি বলুন, যদি তাঁর সাথে কোনো প্রভু বিদ্যমান থাকত, লোকে যেমন বলে থাকে, তবে তারা অবশ্যই আরশে যাবার পথ অনুসন্ধান করত।'[৩]
অর্থাৎ পৃথিবীর রাজা-বাদশাহ যেমন অপরের ক্ষমতা দখল করতে চায়।
ইমাম ইবনু তাইমিয়্যাহ ؒ এ আয়াতের ব্যাখ্যা এভাবে করেছেন-আল্লাহ তাআলার কথার মর্ম হলো-'যদি অন্য প্রভু থাকত, তারাও আমার আনুগত্য ও নৈকট্য অর্জনে মনোনিবেশ করত। সুতরাং, তোমরা তাদের উপাসনা কীভাবে করছ!'
টিকাঃ
[২] সূরা আম্বিয়া, আয়াত-ক্রম: ২২
[৩] সূরা বনী ইসরাঈল, আয়াত-ক্রম: ৪২
📄 ভালোবাসার চিহ্ন-সমূহ
ভালোবাসা ভালো-মন্দ বা উপকারী-অপকারী যেমনই হোক, তার কিছু চিহ্ন, অনুষঙ্গ ও আবশ্যকীয় উপাদান আছে। যেমন-স্বাদ, উপলব্ধি, আগ্রহ-উদ্দীপনা, প্রেমাস্পদের নৈকট্য কিবা বিচ্ছেদ-ইত্যাদি বিষয়।
উপকারী প্রেম: যার মাধ্যমে ব্যক্তি ইহ ও পরজাগতিক জীবনে উপকৃত হয়। এ প্রেম মানুষের সৌভাগ্যের সোপান।
মন্দ প্রেম: যা মানুষকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, এবং মানুষের জীবনে দুর্ভোগ ডেকে আনে। কোনো জ্ঞানী লোক ক্ষতিকর বিষয়কে বেছে নেয় না, যারা নেয় তারা নিজের উপর অন্যায় করে। অন্তর কখনও প্রবৃত্তির কুহকে আচ্ছন্ন থাকে, বেছে নেয় ক্ষতিকর বিষয়কে; যা নিজ সত্তার উপর অন্যায় হিসেবে বিবেচিত হবে। কিন্তু, জ্ঞাতসারে কেউ এ পথে হাঁটতে পারে না। তবে কারো উপর প্রবৃত্তি প্রাধান্য বিস্তার করে, ফলে মন্দ থেকে ভালোকে সে পৃথক করতে ব্যর্থ হয়। তথাপি, এর সুনির্দিষ্ট কিছু কারণ আছে; যেমন-
১. ভ্রান্ত বিশ্বাস। যা অত্যন্ত নিন্দিত বিষয়। মূলত প্রবৃত্তির অনুগামিতাও ভ্রান্তধারণা থেকে সৃষ্ট। আর অন্যায় প্রেম মূর্খতা ও ভ্রান্ত বিশ্বাস থেকে বিকশিত হতে থাকে।
২. প্রবৃত্তির অধীনতা। মানুষ যখন প্রবৃত্তির অনুগামী হয়, প্রবৃত্তির দ্বারা শাসিত হতে থাকে, তখন সত্য ও মিথ্যার বিভাজন সংশয়পূর্ণ হয়ে যায়। একসময়ে প্রবৃত্তির শক্তি প্রবলভাবে বিজয়ী হয়ে যায়।
সেই সাথে এসবের সংশ্লিষ্ট বিষয়ের অবস্থান স্পষ্ট হয়। সুতরাং, উপকারী প্রেমে আসক্তদের হাসি-কান্নার মুহূর্তগুলোও উপকারী হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে। ফলে তার প্রেমময় জীবনের শক্তি ও উন্মেষ ক্রমশ বৃদ্ধি পেতে থাকে।
আর নিন্দিত ও ক্ষতিকর প্রেম মানুষকে আল্লাহ থেকে বিমুখ করে রাখে। ব্যক্তি যত বেশি মন্দ-প্রেমে মত্ত থাকে, ততই ক্ষতির সম্মুখীন হয়। ব্যক্তির কাজের ফলাফল এভাবেই প্রতিফলিত হয়, যেসব কর্ম প্রকাশিত হয় গুনাহ থেকে, তার ফলাফল হয় নিন্দিত। আর যা আনুগত্যের প্রকাশ হিসেবে দৃশ্যমান হয়, তা সবসময়ই কল্যাণকর।
📄 ভালোবাসাই সকল ধর্মের ভিত্তি
পৃথিবীর সকল ধর্ম—বাতিল হোক বা বিশুদ্ধ—সবই ভালোবাসার উপর প্রতিষ্ঠিত। পৃথিবীর সকল কর্ম যেমন ইচ্ছা ও ভালোবাসার অধীন, তেমনি পৃথিবীর সকল ধর্মও ভালোবাসার অধীন। দ্বীন ও ধর্ম মানবজাতিকে ইবাদাত, আনুগত্য ও উত্তম আদর্শের নির্দেশ করে থাকে। এ কারণে কুরআনে দ্বীনকে খুলক (আদর্শ) দ্বারা ব্যক্ত করা হয়েছে। আল্লাহ বলেন—
وَإِنَّكَ لَعَلَى خُلُقٍ عَظِيمٍ
'আর (হে নবী!) আপনি অবশ্যই সন্দেহাতীতভাবে উত্তম আদর্শের উপর প্রতিষ্ঠিত।' [১]
এ আয়াতের ব্যাখ্যায় ইবনু আব্বাস বলেন, 'এর অর্থ হলো, আপনি মহান ধর্মের উপর প্রতিষ্ঠিত।'
আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে রাসূলের আদর্শ সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, 'তাঁর আদর্শ হচ্ছে কুরআন।' [২]
টিকাঃ
[১] সূরা কলম, আয়াত-ক্রম: ৪
[২] মুসনাদু আহমাদ, হাদিস-ক্রম: ২৫৮১৩
📄 একটি শাব্দিক বিশ্লেষণ
'দ্বীন' শব্দের মধ্যে আনুগত্য ও নমনীয়তা আছে, তেমনি আছে প্রভাব বিস্তারের মধ্য দিয়ে অধীন করার তাৎপর্যও। এজন্য 'দ্বীন' শব্দ দিয়ে ঊর্ধ্ব থেকে নিম্ন এবং নিম্ন থেকে ঊর্ধ্ব-উভয় অর্থ প্রকাশের সুযোগ আছে। যেমন বলা হয়-دنته فدان-এর অর্থ হচ্ছে-قهرته فذل অর্থাৎ- 'আমি তাকে ধমক দিলাম ফলে সে নমনীয় হয়ে গেল।'
অন্যদিকে دنت الله শব্দ ব্যবহার করে বোঝানো হয় যে, 'আমি আল্লাহর অনুগত হলাম।'
দ্বীনের আভ্যন্তরীণ দিকে প্রেম ও নমনীয়তার বিমূর্ত প্রকাশ ঘটে থাকে সাধারণত। কিন্তু দ্বীনের বাহ্যিক দিকে আনুগত্য বিদ্যমান থাকলেও, প্রেম ও ভালোবাসা স্বল্প পরিসরে প্রকাশিত হয়। আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিনকে يوم الدين বলে ব্যক্ত করেছেন। কারণ, এ দিনে মানুষকে তার ভালো-মন্দের প্রতিদান দেওয়া হবে। অন্য শব্দে এই দিনকে 'প্রতিদানের দিবস' বলা হয়।
দ্বীন বলতে দুটি জিনিসকে বোঝানো হয়। একটি হচ্ছে শরীয়ত। অপরটি হিসাব ও প্রতিদান।
তবে আল্লাহর দ্বীনের যে অংশকেই বিবেচনায় আনা হোক, এর সারকথা হলো প্রেম ও মুহাব্বাত। কারণ, আল্লাহ তাআলা মানুষের জন্য যা কিছুই নির্দেশ ও শরীয়ত-সিদ্ধ করেছেন, তা তিনি ভালোবাসা ও সন্তুষ্টি থেকে করেছেন। বান্দার ধার্মিকতা তখনই গৃহীত হবে, যখন তা ভালোবাসা-সহকারে প্রকাশিত হবে। নবীজি বলেছেন-
ذَاقَ طَعْمَ الْإِيمَانِ مَنْ رَضِيَ بِاللَّهِ رَبًّا، وَبِالْإِسْلَامِ دِينًا، وَبِمُحَمَّدٍ - صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ - رَسُولًا
'ঐ ব্যক্তি ঈমানের স্বাদ পাবে, যে আল্লাহকে প্রভু হিসেবে, ইসলামকে দ্বীন হিসেবে এবং মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহিই ওয়া সাল্লামকে নবী হিসেবে পেয়ে সন্তুষ্ট।[১]
অনুরূপ সম্পর্ক দ্বীনের প্রতিদান ও প্রতিফলের ক্ষেত্রেও। কারণ, আল্লাহ তাআলা এর মধ্যে উৎকৃষ্টকে যেমন প্রতিদান দেবেন, নিকৃষ্টকেও তার প্রতিফল দেবেন। এর মধ্যে যেমন আল্লাহর ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা পায়, তেমনি প্রকাশ পায় তাঁর অপার অনুগ্রহের দিকটাও। আর অনুগ্রহ ও ন্যায়বিচার—দুটিই আল্লাহর নিকট প্রিয় ও পছন্দনীয়।
টিকাঃ
[১] মুসলিম, হাদীস-ক্রম: ২৪