📄 নন্দিত প্রেম ও নিন্দিত প্রেম
প্রকার ও গুণাবলির বিভিন্নতা বিচারে প্রেম- ভালোবাসার পরিধিও বিস্তৃত। তবে মানবজীবনে সবচেয়ে আলোচিত, উপকারী এবং অতি গুরুত্বপূর্ণ হলো 'উত্তম প্রেমের গল্প'; যা আল্লাহ ও তাঁর অধিকারের সাথে সংশ্লিষ্ট। যেমন- আল্লাহর আনুগত্য, আল্লাহমুখিতা ও ইবাদাত ইত্যাদি। কারণ, এসব বিষয়ের যোগ্য কেবল আল্লাহ পাক। তিনি বলেন-
وَمِنَ النَّاسِ مَنْ يَتَّخِذُ مِنْ دُونِ اللَّهِ أَنْدَادًا يُحِبُّونَهُمْ كَحُبِّ اللَّهِ وَالَّذِينَ آمَنُوا أَشَدُّ حُبًّا لِلَّهِ
'কিছু মানুষ আছে, যারা আল্লাহ ছাড়া অন্য কিছুকে তার শরীক হিসেবে গ্রহণ করে, তাদেরকে ভালোবাসে আল্লাহকে ভালোবাসার মতো। তবে যারা মুমিন তারা আল্লাহকে আরো বেশি ভালোবাসে।[১]
সবচেয়ে নিকৃষ্ট প্রেম হিসেবে চিহ্নিত করা যায় সেই প্রেমকে, যা আল্লাহ-প্রেমের মাত্রায় আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো জন্য প্রকাশিত হয়। বিপরীতে সর্বোত্তম ভালোবাসা হচ্ছে, আল্লাহকে ভালোবাসা এবং আল্লাহ যাকিছু পছন্দ করেন, সেসবকে ভালোবাসা। এই স্তরের ভালোবাসা মানুষের সৌভাগ্যের ভাবাবেগকে উদ্বেলিত করে, চিত্তকে করে প্রফুল্ল। এ ছাড়াও চিরস্থায়ী জান্নাতের বন্দোবস্ত করে। অন্যদিকে যেই প্রেম অংশীবাদী, তার পরিণতি ভয়াবহ।
পবিত্র কুরআনে উভয় প্রকারের প্রেম নিয়ে ব্যাপক আলোচনা করা হয়েছে। উৎকৃষ্ট প্রেমের প্রশংসা নানাদিক থেকে বর্ণনা করা হয়েছে। কখনো গল্পাকারে, ঘটনা শুনিয়ে এবং পরিণতির দিকে স্বচ্ছ ইঙ্গিত দিয়ে। অন্যদিকে সমান্তরালে নিন্দা জানানো হয়েছে নিকৃষ্ট প্রেমকে। এবং উভয় প্রকার প্রেমের পরিণতি নির্দেশ করে তিনটি কালের আলোচনা এসেছে-দুনিয়া, কবরের জীবন ও পরকাল।
পৃথিবীর সূচনা থেকে শেষ অবধি যত নবী এসেছেন, তাঁরা মানুষকে আল্লাহর ইবাদাতের প্রতি আহ্বান করেছেন এবং প্রচেষ্টা করেছেন-যেন মানবজাতি বিনয় ও শ্রদ্ধাভরে আল্লাহর ইবাদাতে নিমগ্ন হয়। আর স্বভাবতই, আনুগত্য ও খোদাভীরুতা এসবের অনিবার্য শর্ত। বুখারী ও মুসলিমে আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু সূত্রে বর্ণিত হাদীসে নবীজি বলেছেন-
وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ لَا يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ حَتَّى أَكُونَ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِنْ وَالِدِهِ وَوَلَدِهِ وَالنَّاسِ أَجْمَعِينَ
'ঐ আল্লাহর শপথ, যার হাতে আমার প্রাণ! তোমাদের কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত মুমিন হবে না, যতক্ষণ না আমাকে তার সত্তা, সন্তান-সন্তুতি ও পিতামাতা থেকে বেশি ভালোবাসে। [১]
একজন নবীর প্রসঙ্গ যদি এমন হয়, তবে তাঁকে যিনি প্রেরণ করেছেন, সেই সত্তার সাথে মানুষের প্রেমের সম্পর্ক কত গভীর হওয়া দরকার, তা সহজেই অনুমেয়। প্রেমের প্রশ্নে তিনি থাকবেন সর্বোচ্চে।
টিকাঃ
[১] সূরা বাকারা, আয়াত-ক্রম: ১৬৫
[১] বুখারী, হাদীস-ক্রম: ১৫
📄 পৃথিবী আবর্তিত হয় ভালোবাসাকে কেন্দ্র করে
আসমান ও জমিনে যত ধরনের চাঞ্চল্য রয়েছে, সবকিছুর মূলে আছে ভালোবাসা। এই ভালোবাসাই চরম ও চূড়ান্ত কারণ।
কারণ, মানুষের চঞ্চলতা সাধারণত তিন ধরনের হয়ে থাকে-
. ঐচ্ছিক।
. স্বাভাবিক।
. বাধ্যগত।
স্বাভাবিক চঞ্চলতার মৌলিক ক্ষেত্র হচ্ছে-স্থিরতা। পুনর্বাসিত হওয়ার লক্ষ্যে দেহ যখন তার প্রাকৃতিক অবস্থান থেকে সরে আসে, তা স্বাভাবিক হিসেবে বিবেচিত হবে। এটি একজন পরিচালকের হাতে সংঘটিত হয়। আরো একটি চঞ্চলতা রয়েছে, যা চঞ্চল ব্যক্তির অনুগামী হয়। সুতরাং, এই দুই প্রকারের মধ্যেই অদৃশ্যের পরিবর্তনকারী প্রধান ভূমিকা পালন করে। আর ঐচ্ছিক চঞ্চলতা এই দুটির মৌল। ঐচ্ছিক চঞ্চলতা আবার ইচ্ছা ও ভালোবাসার অধীন। মোটকথা, ভালোবাসা সবকিছুর কেন্দ্র। চঞ্চলতার এ তিনটি প্রকারেই সীমাবদ্ধ গোটা জগত।
পৃথিবীর সবকিছুই এসবের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। আল্লাহ তাআলা ফিরিশতাদের বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলেন-
وَمَا نَتَنَزَّلُ إِلَّا بِأَمْرِ رَبِّكَ لَهُ مَا بَيْنَ أَيْدِينَا وَمَا خَلْفَنَا وَمَا بَيْنَ ذَلِكَ وَمَا كَانَ رَبُّكَ نَسِيًّا
'পৃথিবীতে আমরা আল্লাহর নির্দেশেই অবতীর্ণ হই, আমাদের সামনে-পেছনে এবং এ দুয়ের মাঝে যা কিছু আছে-সবই আল্লাহর সৃষ্টি। তিনি বিস্মৃত হন না।[১]
এ ছাড়াও অন্যান্য আয়াতে ফিরিশতাদের কর্মতৎপরতার বিশেষ দিকগুলো আলোচিত হয়েছে। আল্লাহ তাআলার এই বিশালতম সৃষ্টির ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর পদার্থও জগতের সকল চঞ্চলতার মধ্য দিয়ে অবিনশ্বর জগতের দিকে ছুটে চলছে অবিরত।
ইরশাদ হচ্ছে-
تُسَبِّحُ لَهُ السَّمَاوَاتُ السَّبْعُ وَالْأَرْضُ وَمَنْ فِيهِنَّ وَإِنْ مِنْ شَيْءٍ إِلَّا يُسَبِّحُ بِحَمْدِهِ وَلَكِنْ لَا تَفْقَهُونَ تَسْبِيحَهُمْ إِنَّهُ كَانَ حَلِيمًا غَفُورًا
'সাত আসমান, জমিন এবং এসবের মাঝে যা কিছু রয়েছে-সবই আল্লাহ তাআলার গুণগান গাইতে থাকে, তাঁর পবিত্রতা ঘোষণা করে। জগতের প্রতিটি সৃষ্টিই তার গুণকীর্তন করতে থাকে। অবশ্য তোমরা তাদের গুণগান অনুধাবন করতে পার না। নিশ্চয় তিনি অতি সহনশীল, ক্ষমাপরায়ণ।[১]
সুতরাং, পৃথিবীর এ চঞ্চলতা যেন আল্লাহ তাআলার ইবাদাত। যদি আল্লাহ তাআলার জন্য আনুগত্য, প্রেম, প্রীতি, ইবাদাত-স্পৃহা না থাকত, তবে এই বিশ্বজগত নিশ্চল ও নিথর হয়ে পড়ত।
টিকাঃ
[১] সূরা মারইয়াম, আয়াত-ক্রম: ৬৪
[১] সূরা ইসরা, আয়াত-ক্রম: ৪৪
📄 ভালোবাসা শুধু আল্লাহর জন্য
উপরোক্ত আলোচনা থেকে বোঝা যাচ্ছে, ব্যক্তিভেদে সকলেরই ইচ্ছা, কর্ম ও ভালোবাসা রয়েছে। আর এসকল বিষয়ের চঞ্চলতার মূলে রয়েছে ইচ্ছা ও প্রেম। আর স্বভাবতই এসব চঞ্চলতা মূলত সৃষ্টিকর্তার জন্যে। কারণ, জগত তো তিনিই সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন-
لَوْ كَانَ فِيهِمَا آلِهَةٌ إِلَّا اللَّهُ لَفَسَدَتَا
'আসমান ও জমিনে যদি আল্লাহ ছাড়া আরও প্রভু থাকত, তবে তা ধ্বংস হয়ে যেত।'[২]
কারণ, পৃথিবীতে যখন প্রভু দুইজন হবেন, প্রত্যেকে আপন ইচ্ছা বাস্তবায়ন করতে চেষ্টা করবেন। অন্যজনকে প্রতিহত করে নিজস্ব মতামত প্রতিষ্ঠা করতে চাইবেন। এ সময়ে একজন নতি স্বীকার করলে তাঁর অপূর্ণতা প্রকাশিত হবে। আর কেউ চায় না নিজ অপূর্ণতা প্রকাশ করতে। স্বাভাবিক বিষয় এমনই-এক রাষ্ট্রে দুইজন শাসক হলে শৃঙ্খলা ব্যহত হবে। আল্লাহ তাআলা বলেন-
قُلْ لَوْ كَانَ مَعَهُ آلِهَةٌ كَمَا يَقُولُونَ إِذًا لَابْتَغَوْا إِلَى ذِي الْعَرْشِ سَبِيلًا
'আপনি বলুন, যদি তাঁর সাথে কোনো প্রভু বিদ্যমান থাকত, লোকে যেমন বলে থাকে, তবে তারা অবশ্যই আরশে যাবার পথ অনুসন্ধান করত।'[৩]
অর্থাৎ পৃথিবীর রাজা-বাদশাহ যেমন অপরের ক্ষমতা দখল করতে চায়।
ইমাম ইবনু তাইমিয়্যাহ ؒ এ আয়াতের ব্যাখ্যা এভাবে করেছেন-আল্লাহ তাআলার কথার মর্ম হলো-'যদি অন্য প্রভু থাকত, তারাও আমার আনুগত্য ও নৈকট্য অর্জনে মনোনিবেশ করত। সুতরাং, তোমরা তাদের উপাসনা কীভাবে করছ!'
টিকাঃ
[২] সূরা আম্বিয়া, আয়াত-ক্রম: ২২
[৩] সূরা বনী ইসরাঈল, আয়াত-ক্রম: ৪২
📄 ভালোবাসার চিহ্ন-সমূহ
ভালোবাসা ভালো-মন্দ বা উপকারী-অপকারী যেমনই হোক, তার কিছু চিহ্ন, অনুষঙ্গ ও আবশ্যকীয় উপাদান আছে। যেমন-স্বাদ, উপলব্ধি, আগ্রহ-উদ্দীপনা, প্রেমাস্পদের নৈকট্য কিবা বিচ্ছেদ-ইত্যাদি বিষয়।
উপকারী প্রেম: যার মাধ্যমে ব্যক্তি ইহ ও পরজাগতিক জীবনে উপকৃত হয়। এ প্রেম মানুষের সৌভাগ্যের সোপান।
মন্দ প্রেম: যা মানুষকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, এবং মানুষের জীবনে দুর্ভোগ ডেকে আনে। কোনো জ্ঞানী লোক ক্ষতিকর বিষয়কে বেছে নেয় না, যারা নেয় তারা নিজের উপর অন্যায় করে। অন্তর কখনও প্রবৃত্তির কুহকে আচ্ছন্ন থাকে, বেছে নেয় ক্ষতিকর বিষয়কে; যা নিজ সত্তার উপর অন্যায় হিসেবে বিবেচিত হবে। কিন্তু, জ্ঞাতসারে কেউ এ পথে হাঁটতে পারে না। তবে কারো উপর প্রবৃত্তি প্রাধান্য বিস্তার করে, ফলে মন্দ থেকে ভালোকে সে পৃথক করতে ব্যর্থ হয়। তথাপি, এর সুনির্দিষ্ট কিছু কারণ আছে; যেমন-
১. ভ্রান্ত বিশ্বাস। যা অত্যন্ত নিন্দিত বিষয়। মূলত প্রবৃত্তির অনুগামিতাও ভ্রান্তধারণা থেকে সৃষ্ট। আর অন্যায় প্রেম মূর্খতা ও ভ্রান্ত বিশ্বাস থেকে বিকশিত হতে থাকে।
২. প্রবৃত্তির অধীনতা। মানুষ যখন প্রবৃত্তির অনুগামী হয়, প্রবৃত্তির দ্বারা শাসিত হতে থাকে, তখন সত্য ও মিথ্যার বিভাজন সংশয়পূর্ণ হয়ে যায়। একসময়ে প্রবৃত্তির শক্তি প্রবলভাবে বিজয়ী হয়ে যায়।
সেই সাথে এসবের সংশ্লিষ্ট বিষয়ের অবস্থান স্পষ্ট হয়। সুতরাং, উপকারী প্রেমে আসক্তদের হাসি-কান্নার মুহূর্তগুলোও উপকারী হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে। ফলে তার প্রেমময় জীবনের শক্তি ও উন্মেষ ক্রমশ বৃদ্ধি পেতে থাকে।
আর নিন্দিত ও ক্ষতিকর প্রেম মানুষকে আল্লাহ থেকে বিমুখ করে রাখে। ব্যক্তি যত বেশি মন্দ-প্রেমে মত্ত থাকে, ততই ক্ষতির সম্মুখীন হয়। ব্যক্তির কাজের ফলাফল এভাবেই প্রতিফলিত হয়, যেসব কর্ম প্রকাশিত হয় গুনাহ থেকে, তার ফলাফল হয় নিন্দিত। আর যা আনুগত্যের প্রকাশ হিসেবে দৃশ্যমান হয়, তা সবসময়ই কল্যাণকর।