📄 তাওহীদীদের কালিমা
لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ – লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, তাওহীদের কালিমা।
গোটা পৃথিবী তাওহীদ বা একত্ববাদের স্বীকারোক্তির উপর প্রতিষ্ঠিত, তাকে লক্ষ্য বানিয়ে তৈরি করা হয়েছে সকল সৃষ্টি। এবং একত্ববাদের বাক্য বা বাণীই মুসলিম মিল্লাতের বীজ। এই কালিমা দুনিয়ার জীবনে মানুষের রক্ত, সম্পত্তি ও বংশের নিরাপত্তা এবং পরকালে বারযাখ-জগত ও জাহান্নামের শান্তি থেকে নিরাপত্তার ব্যবস্থা নিশ্চিত করে। এ কালিমা ছাড়া মানুষ জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না। শান্তির চাবিকাঠি এই কালিমার দ্বারা ভাগ্যবান ও দুর্ভাগা নির্ণিত হয়। এ ছাড়াও অনৈসলামী রাষ্ট্র থেকে ইসলামী রাষ্ট্রের বিভাজন ঘটে কালিমাকে ভিত্তি করে। যার জাগতিক জীবনের শেষ বাক্য হয় এই কালিমা, সে জান্নাতবাসী হবে।
📄 কালিমার মূলমন্ত্র
এ বাক্যের মূলমন্ত্র হচ্ছে, সম্মান ও শ্রদ্ধা মিশ্রিত ভয় ও আশাবাদী মনোভাব-সহ এ সংশ্লিষ্ট আল্লাহমুখিতা ও দুনিয়াবিমুখতার যাবতীয় দিকগুলো কেবল আল্লাহর জন্য পরিচালিত হওয়া। জাগতিক জীবনে আল্লাহ ব্যতীত অন্যের নিকট প্রত্যাশা, ক্ষমা প্রার্থনা, বিপদে আশ্রয় কামনা-সহ আনুগত্যের কোনো দিকই যেন প্রকাশিত না হয়।
অর্থাৎ ইবাদাতের কোনো দিকই যেন আল্লাহর সত্তা ব্যতীত অন্যের জন্য প্রকাশিত না হয়। কারণ, এর মধ্য দিয়েই শাহাদাত বা সাক্ষ্যের যথার্থ রূপায়ন সম্ভব হয়। এজন্যেই এ কালিমা পাঠককে জান্নাতে প্রবেশের নিশ্চয়তা দেয়। আল্লাহ তাআলা বলেন-
وَالَّذِينَ هُمْ بِشَهَادَاتِهِمْ قَائِمُونَ
'যারা তাদের শাহাদাত নিয়ে দৃঢ়তার সাথে প্রতিষ্ঠিত।[১]
অনেকেই আছেন, যারা নিজেদের শাহাদাত নিয়ে দৃঢ়তার সাথে প্রতিষ্ঠিত; প্রকাশ্যে, অপ্রকাশ্যে, দেহমন—সর্বত্রই কালিমার সাক্ষ্য বিরাজমান। কিন্তু কেউ কেউ আছে এমন যে, সে যেন নিস্তব্ধ, তার ঈমান ছিনতাই হলেও খবর থাকে না। কারো জীবন আধ-শোয়া অবস্থায় কাটে। সর্বোপরি, মানুষের ঈমানী জীবনের দৃষ্টান্ত হচ্ছে একটি দেহের মতো; অন্তরের অবস্থান সেখানে নানা রকমের হয়ে থাকে। এর মধ্যে কিছু অন্তর হয় সুস্থ, সবল ও নির্মল; আর কিছু আত্মা থাকে নিস্তেজ, প্রাণহীন। বিশুদ্ধ সূত্রে বর্ণিত নবিজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এক হাদিসে বর্ণিত আছে—
إِنِّي لأَعْلَمُ كَلِمَةً لاَ يَقُوْلُهَا عَبْدٌ عِنْدَ الْمَوْتِ إِلاَّ وَجَدَتْ رُوْحُهُ لَهَا رُوْحًا
‘আমি এমন একটা কালিমার কথা জানি, কোনো ব্যক্তি মুমূর্ষু কালে যদি তা পাঠ করে, তবে পরকালে তার আত্মা একটা অন্য জীবন পাবে।’[১]
প্রাণহীন মানুষের দেহ যেমন নিষ্ফল ও মৃত, কালিমা ছাড়া অন্তর তেমনি বৃথা ও বিফল। কালিমাসঙ্গ মৃত্যু হলে ব্যক্তি যেভাবে জানাতে নির্মল আনন্দ পাবে, তেমনি কালিমা-কেন্দ্রিক যে জীবন পরিচালিত, তা হয় ইবাদত ও আনুগত্যে মুখরিত এবং সুখকর। আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَأَمَّا مَنْ خَافَ مَقَامَ رَبِّهِ وَنَهَى النَّفْسَ عَنِ الْهَوَى - فَإِنَّ الْجَنَّةَ هِيَ الْمَأْوَى
‘যে আল্লাহর সামনে উপস্থিত হওয়ার ভয় করে, অন্তরকে প্রবৃত্তি থেকে নিরাপদ রাখে, তার আবাস জান্নাত।’[২]
আল্লাহ তাআলা অন্যত্র বলেন—
مَنْ عَمِلَ صَالِحًا مِنْ ذَكَرٍ أَوْ أُنْثَى وَهُوَ مُؤْمِنٌ فَلَنُحْيِيَنَّهُ حَيَاةً طَيِّبَةً
'যেসব মুমিন নেক কাজ করে, পুরুষ হোক বা নারী, আমি তাকে নির্মল জীবন দান করব।'[১]
কোনো বস্তু যখন মানুষের বেশি উপকারী হয়, তার বিদ্যমানতা তখন আবশ্যক হয়ে যায়। এবং এর অনুপস্থিতি তাকে রীতিমতো পীড়া দেয়। আর যে বস্তুর উপস্থিতি ব্যক্তির জন্যে কষ্টকর, তার বিদ্যমানতা তার জন্যে অসহ্য লাগে। সে হিসেবে সকল কাজে আল্লাহর ধ্যান মানুষের জন্য পরম উপকারী বিষয়। কারণ, মানুষের জীবন, সুখ-দুঃখ, চিত্তাকর্ষণ—সবকিছুতে আল্লাহমুখিতা না থাকলে তার কোনো অর্থ অবশিষ্ট থাকে না।
ব্যক্তি যখন আল্লাহমুখিতার চূড়ান্ত প্রকাশ ঘটায়, তখন তার অবস্থা হয় একজন নেশাগ্রস্তের মতো, নেশার মাদকতা তাকে এতটাই আচ্ছন্ন করে রাখে যে, সর্বগ্রাসী সয়লাবে তার ঘরবাড়ি, সম্পত্তি ও বংশের বিনাশ হলেও তার মাদকতা কমে না। সে বিভোর হয়ে থাকে তাতে। পরে যখন চেতনা জাগ্রত হয়, সবকিছুই অনুভব করে আগের মতো।
এ তো ক্ষণস্থায়ী দুনিয়ার সাময়িক বিনাশ ও বঞ্চনা, বাস্তব জীবনে যার স্থায়িত্ব নেই। কিন্তু, কেউ যদি পরকালীন জীবনে বঞ্চনা ও বিনাশের শিকার হয়, তাহলে মুক্তি কঠিন। কারণ, পরকাল তো স্থায়ী। সেখানে শাস্তি ও বঞ্চনার কোনো সমাপ্তি নেই। এটি এমন বঞ্চনা যা বহনের ক্ষমতা কোনো স্থির পর্বতের কাছেও নেই।
আল্লাহ মানুষকে সম্বোধন করে বলেন, 'হে আদম সন্তান! আমি তোমাকে আমার ইবাদাত করতে বলেছি, তামাশা করো না। তোমার রিযিকের দায়িত্ব আমি নিয়েছি, দুশ্চিন্তা করো না। হে আদম সন্তান! আমাকে তালাশ করো, যদি আমাকে পেয়ে যাও, তবে সবই পেলে। আমাকে না পেলে কিছুই তুমি পাওনি। আমিই তোমার নিকট সবকিছু থেকে অধিক ভালোবাসা পাওয়ার যোগ্য।'
টিকাঃ
[১] সূরা মাআরিজ, আয়াত-ক্রম: ৩৩
[১] মুসনাদু আহমাদ, হাদিস-ক্রম : ১৮৭
[২] সূরা নাযিআত, আয়াত-ক্রম : ৪০-৪১
[১] সূরা নাহল, আয়াত-ক্রম: ৯৭
📄 নন্দিত প্রেম ও নিন্দিত প্রেম
প্রকার ও গুণাবলির বিভিন্নতা বিচারে প্রেম- ভালোবাসার পরিধিও বিস্তৃত। তবে মানবজীবনে সবচেয়ে আলোচিত, উপকারী এবং অতি গুরুত্বপূর্ণ হলো 'উত্তম প্রেমের গল্প'; যা আল্লাহ ও তাঁর অধিকারের সাথে সংশ্লিষ্ট। যেমন- আল্লাহর আনুগত্য, আল্লাহমুখিতা ও ইবাদাত ইত্যাদি। কারণ, এসব বিষয়ের যোগ্য কেবল আল্লাহ পাক। তিনি বলেন-
وَمِنَ النَّاسِ مَنْ يَتَّخِذُ مِنْ دُونِ اللَّهِ أَنْدَادًا يُحِبُّونَهُمْ كَحُبِّ اللَّهِ وَالَّذِينَ آمَنُوا أَشَدُّ حُبًّا لِلَّهِ
'কিছু মানুষ আছে, যারা আল্লাহ ছাড়া অন্য কিছুকে তার শরীক হিসেবে গ্রহণ করে, তাদেরকে ভালোবাসে আল্লাহকে ভালোবাসার মতো। তবে যারা মুমিন তারা আল্লাহকে আরো বেশি ভালোবাসে।[১]
সবচেয়ে নিকৃষ্ট প্রেম হিসেবে চিহ্নিত করা যায় সেই প্রেমকে, যা আল্লাহ-প্রেমের মাত্রায় আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো জন্য প্রকাশিত হয়। বিপরীতে সর্বোত্তম ভালোবাসা হচ্ছে, আল্লাহকে ভালোবাসা এবং আল্লাহ যাকিছু পছন্দ করেন, সেসবকে ভালোবাসা। এই স্তরের ভালোবাসা মানুষের সৌভাগ্যের ভাবাবেগকে উদ্বেলিত করে, চিত্তকে করে প্রফুল্ল। এ ছাড়াও চিরস্থায়ী জান্নাতের বন্দোবস্ত করে। অন্যদিকে যেই প্রেম অংশীবাদী, তার পরিণতি ভয়াবহ।
পবিত্র কুরআনে উভয় প্রকারের প্রেম নিয়ে ব্যাপক আলোচনা করা হয়েছে। উৎকৃষ্ট প্রেমের প্রশংসা নানাদিক থেকে বর্ণনা করা হয়েছে। কখনো গল্পাকারে, ঘটনা শুনিয়ে এবং পরিণতির দিকে স্বচ্ছ ইঙ্গিত দিয়ে। অন্যদিকে সমান্তরালে নিন্দা জানানো হয়েছে নিকৃষ্ট প্রেমকে। এবং উভয় প্রকার প্রেমের পরিণতি নির্দেশ করে তিনটি কালের আলোচনা এসেছে-দুনিয়া, কবরের জীবন ও পরকাল।
পৃথিবীর সূচনা থেকে শেষ অবধি যত নবী এসেছেন, তাঁরা মানুষকে আল্লাহর ইবাদাতের প্রতি আহ্বান করেছেন এবং প্রচেষ্টা করেছেন-যেন মানবজাতি বিনয় ও শ্রদ্ধাভরে আল্লাহর ইবাদাতে নিমগ্ন হয়। আর স্বভাবতই, আনুগত্য ও খোদাভীরুতা এসবের অনিবার্য শর্ত। বুখারী ও মুসলিমে আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু সূত্রে বর্ণিত হাদীসে নবীজি বলেছেন-
وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ لَا يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ حَتَّى أَكُونَ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِنْ وَالِدِهِ وَوَلَدِهِ وَالنَّاسِ أَجْمَعِينَ
'ঐ আল্লাহর শপথ, যার হাতে আমার প্রাণ! তোমাদের কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত মুমিন হবে না, যতক্ষণ না আমাকে তার সত্তা, সন্তান-সন্তুতি ও পিতামাতা থেকে বেশি ভালোবাসে। [১]
একজন নবীর প্রসঙ্গ যদি এমন হয়, তবে তাঁকে যিনি প্রেরণ করেছেন, সেই সত্তার সাথে মানুষের প্রেমের সম্পর্ক কত গভীর হওয়া দরকার, তা সহজেই অনুমেয়। প্রেমের প্রশ্নে তিনি থাকবেন সর্বোচ্চে।
টিকাঃ
[১] সূরা বাকারা, আয়াত-ক্রম: ১৬৫
[১] বুখারী, হাদীস-ক্রম: ১৫
📄 পৃথিবী আবর্তিত হয় ভালোবাসাকে কেন্দ্র করে
আসমান ও জমিনে যত ধরনের চাঞ্চল্য রয়েছে, সবকিছুর মূলে আছে ভালোবাসা। এই ভালোবাসাই চরম ও চূড়ান্ত কারণ।
কারণ, মানুষের চঞ্চলতা সাধারণত তিন ধরনের হয়ে থাকে-
. ঐচ্ছিক।
. স্বাভাবিক।
. বাধ্যগত।
স্বাভাবিক চঞ্চলতার মৌলিক ক্ষেত্র হচ্ছে-স্থিরতা। পুনর্বাসিত হওয়ার লক্ষ্যে দেহ যখন তার প্রাকৃতিক অবস্থান থেকে সরে আসে, তা স্বাভাবিক হিসেবে বিবেচিত হবে। এটি একজন পরিচালকের হাতে সংঘটিত হয়। আরো একটি চঞ্চলতা রয়েছে, যা চঞ্চল ব্যক্তির অনুগামী হয়। সুতরাং, এই দুই প্রকারের মধ্যেই অদৃশ্যের পরিবর্তনকারী প্রধান ভূমিকা পালন করে। আর ঐচ্ছিক চঞ্চলতা এই দুটির মৌল। ঐচ্ছিক চঞ্চলতা আবার ইচ্ছা ও ভালোবাসার অধীন। মোটকথা, ভালোবাসা সবকিছুর কেন্দ্র। চঞ্চলতার এ তিনটি প্রকারেই সীমাবদ্ধ গোটা জগত।
পৃথিবীর সবকিছুই এসবের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। আল্লাহ তাআলা ফিরিশতাদের বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলেন-
وَمَا نَتَنَزَّلُ إِلَّا بِأَمْرِ رَبِّكَ لَهُ مَا بَيْنَ أَيْدِينَا وَمَا خَلْفَنَا وَمَا بَيْنَ ذَلِكَ وَمَا كَانَ رَبُّكَ نَسِيًّا
'পৃথিবীতে আমরা আল্লাহর নির্দেশেই অবতীর্ণ হই, আমাদের সামনে-পেছনে এবং এ দুয়ের মাঝে যা কিছু আছে-সবই আল্লাহর সৃষ্টি। তিনি বিস্মৃত হন না।[১]
এ ছাড়াও অন্যান্য আয়াতে ফিরিশতাদের কর্মতৎপরতার বিশেষ দিকগুলো আলোচিত হয়েছে। আল্লাহ তাআলার এই বিশালতম সৃষ্টির ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর পদার্থও জগতের সকল চঞ্চলতার মধ্য দিয়ে অবিনশ্বর জগতের দিকে ছুটে চলছে অবিরত।
ইরশাদ হচ্ছে-
تُسَبِّحُ لَهُ السَّمَاوَاتُ السَّبْعُ وَالْأَرْضُ وَمَنْ فِيهِنَّ وَإِنْ مِنْ شَيْءٍ إِلَّا يُسَبِّحُ بِحَمْدِهِ وَلَكِنْ لَا تَفْقَهُونَ تَسْبِيحَهُمْ إِنَّهُ كَانَ حَلِيمًا غَفُورًا
'সাত আসমান, জমিন এবং এসবের মাঝে যা কিছু রয়েছে-সবই আল্লাহ তাআলার গুণগান গাইতে থাকে, তাঁর পবিত্রতা ঘোষণা করে। জগতের প্রতিটি সৃষ্টিই তার গুণকীর্তন করতে থাকে। অবশ্য তোমরা তাদের গুণগান অনুধাবন করতে পার না। নিশ্চয় তিনি অতি সহনশীল, ক্ষমাপরায়ণ।[১]
সুতরাং, পৃথিবীর এ চঞ্চলতা যেন আল্লাহ তাআলার ইবাদাত। যদি আল্লাহ তাআলার জন্য আনুগত্য, প্রেম, প্রীতি, ইবাদাত-স্পৃহা না থাকত, তবে এই বিশ্বজগত নিশ্চল ও নিথর হয়ে পড়ত।
টিকাঃ
[১] সূরা মারইয়াম, আয়াত-ক্রম: ৬৪
[১] সূরা ইসরা, আয়াত-ক্রম: ৪৪