📄 প্রেমাষ্পদের প্রকারভেদ
মুহাব্বাত সাধারণত দুই ধরনের হয়ে থাকে-
. সত্তাগত মুহাব্বাত।
. সত্তাগত মুহাব্বাতের কারণে জন্ম নেয়া ভালোবাসা।
এখানে উল্লেখ্য যে, একজন সফল মানুষের সহজাত ভালোবাসা হবে শুধুমাত্র আল্লাহর জন্য, এ ছাড়া যা কিছু আছে সবই অপ্রকৃত, এবং আল্লাহপ্রেমের অনিবার্য অংশ। যেমন ফিরিশতা, নবী-রাসূল ও ওলীদের প্রতি মানুষের ভালোবাসা।
কোনো ব্যক্তি যখন আল্লাহর অপছন্দের বিষয়ে ভালোবাসা প্রকাশ করে, আর পছন্দের বিষয়ে পোষণ করে বিদ্বেষ, তখন আল্লাহর সাথে তার বিরোধের ক্ষেত্র স্পষ্ট হয়। তদ্রূপ, মানুষ যখন নিজের ভালোবাসা ও বিদ্বেষকে আল্লাহর ইচ্ছার কাছে নিবেদন করে তখন আল্লাহর সাথে তার বন্ধুত্ব প্রকাশ পায়। আল্লাহর সাথে বন্ধুত্বের কারণেই বান্দা বেশি বেশি নামায, রোযা ও আধ্যাত্মিক সাধনা করতে পারে, এতে সে কষ্ট অনুভব করে না।
নানাবিধ কারণে প্রকাশিত ভালোবাসা দুই রকমের হয়ে থাকে
এক. যা অর্জিত হলে মানুষ আনন্দিত হয়।
দুই. যে ভালোবাসায় প্রকৃত ভালোবাসা অর্জনের জন্য সাময়িক কষ্ট সহ্য করতে হয়। যেমন রোগমুক্তির জন্য তিক্ত ওষুধের প্রতি রোগীর ভালোবাসা।
আল্লাহ তাআলা বলেন-
كُتِبَ عَلَيْكُمُ الْقِتَالُ وَ هُوَ كُرْهُ لَّكُمْ وَ عَسَى أَنْ تَكْرَهُوا شَيْئًا وَهُوَ خَيْرٌ لَّكُمْ وَعَسَى أَنْ تُحِبُّوا شَيْئًا وَهُوَ شَرٌّ لَّكُمْ وَاللَّهُ يَعْلَمُ وَأَنْتُمْ لَا تَعْلَمُوْنَ
'তোমাদের উপর লড়াইয়ের বিধান দেয়া হয়েছে, অথচ তা তোমাদের কাছে অপছন্দনীয়। হতে পারে কোনো বিষয় তোমরা অপছন্দ করছ, অথচ তা তোমাদের জন্য কল্যাণকর। আর হতে পারে কোনো বিষয় তোমরা পছন্দ করছ অথচ তা তোমাদের জন্য অকল্যাণকর। আল্লাহ জানেন, তোমরা জানো না।'[১]
এ আয়াতে বলা হয়েছে যে, জিহাদ তাদের কাছে অপছন্দের হলেও তাতে চূড়ান্ত কল্যাণ ও উপকারিতা রয়েছে। আর জ্ঞানী মানুষ কখনো সাময়িক কষ্টকে অসহ্য মনে করে ইহ-জাগতিক আনন্দে মত্ত হয় না। বরং তারা ক্ষণস্থায়ী দুর্ভোগের মধ্য দিয়ে চিরন্তন কল্যাণ লাভের প্রতিজ্ঞা করে।
টিকাঃ
[১] সূরা বাকারা, আয়াত-ক্রম: ২১৬
📄 সকল কাজের মূলে ভালোবাসা
ভালো-মন্দ সকল কাজের মূল হলো ভালোবাসা ও প্রেম, তাই আল্লাহ-রাসূলের প্রতি ভালোবাসাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে যাবতীয় দ্বীনী কাজ। আর দ্বীনী কথার ভিত্তিমূলে প্রোথিত থাকবে 'আল্লাহ ও রাসূলের প্রতি নিশ্ছিদ্র সত্যায়ন। সুতরাং, যেসব ইচ্ছা আল্লাহ ও রাসূলের ভালোবাসার মাঝে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়, তা মূলত ঈমানের পরিপন্থি।
যেমন ইবরাহীম আলাইহিস সালাম তাঁর গোত্রকে লক্ষ করে বলেছিলেন—
أَفَرَأَيْتُمْ مَا كُنْتُمْ تَعْبُدُونَ - أَنْتُمْ وَآبَاؤُكُمُ الْأَقْدَمُونَ - فَإِنَّهُمْ عَدُوٌّ لِي إِلَّا رَبَّ الْعَالَمِينَ
তোমরা ও তোমাদের পূর্বপুরুষেরা কীসের ইবাদাত করতে, তা ভেবে দেখেছ কি? বিশ্বপ্রতিপালক ব্যতীত এসব কিছুই আমার শত্রু।'[২]
মূর্তির প্রতি এই বিদ্বেষের মধ্য দিয়ে ইবরাহীম আলাইহিস সালাম আল্লাহর খলীল হয়েছিলেন। সুতরাং ভালোবাসা ও অন্তরঙ্গতা শুধু আল্লাহর জন্য হবে।
টিকাঃ
[২] সূরা শুআরা, আয়াত-ক্রম: ৭৫-৭৭
📄 তাওহীদীদের কালিমা
لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ – লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, তাওহীদের কালিমা।
গোটা পৃথিবী তাওহীদ বা একত্ববাদের স্বীকারোক্তির উপর প্রতিষ্ঠিত, তাকে লক্ষ্য বানিয়ে তৈরি করা হয়েছে সকল সৃষ্টি। এবং একত্ববাদের বাক্য বা বাণীই মুসলিম মিল্লাতের বীজ। এই কালিমা দুনিয়ার জীবনে মানুষের রক্ত, সম্পত্তি ও বংশের নিরাপত্তা এবং পরকালে বারযাখ-জগত ও জাহান্নামের শান্তি থেকে নিরাপত্তার ব্যবস্থা নিশ্চিত করে। এ কালিমা ছাড়া মানুষ জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না। শান্তির চাবিকাঠি এই কালিমার দ্বারা ভাগ্যবান ও দুর্ভাগা নির্ণিত হয়। এ ছাড়াও অনৈসলামী রাষ্ট্র থেকে ইসলামী রাষ্ট্রের বিভাজন ঘটে কালিমাকে ভিত্তি করে। যার জাগতিক জীবনের শেষ বাক্য হয় এই কালিমা, সে জান্নাতবাসী হবে।
📄 কালিমার মূলমন্ত্র
এ বাক্যের মূলমন্ত্র হচ্ছে, সম্মান ও শ্রদ্ধা মিশ্রিত ভয় ও আশাবাদী মনোভাব-সহ এ সংশ্লিষ্ট আল্লাহমুখিতা ও দুনিয়াবিমুখতার যাবতীয় দিকগুলো কেবল আল্লাহর জন্য পরিচালিত হওয়া। জাগতিক জীবনে আল্লাহ ব্যতীত অন্যের নিকট প্রত্যাশা, ক্ষমা প্রার্থনা, বিপদে আশ্রয় কামনা-সহ আনুগত্যের কোনো দিকই যেন প্রকাশিত না হয়।
অর্থাৎ ইবাদাতের কোনো দিকই যেন আল্লাহর সত্তা ব্যতীত অন্যের জন্য প্রকাশিত না হয়। কারণ, এর মধ্য দিয়েই শাহাদাত বা সাক্ষ্যের যথার্থ রূপায়ন সম্ভব হয়। এজন্যেই এ কালিমা পাঠককে জান্নাতে প্রবেশের নিশ্চয়তা দেয়। আল্লাহ তাআলা বলেন-
وَالَّذِينَ هُمْ بِشَهَادَاتِهِمْ قَائِمُونَ
'যারা তাদের শাহাদাত নিয়ে দৃঢ়তার সাথে প্রতিষ্ঠিত।[১]
অনেকেই আছেন, যারা নিজেদের শাহাদাত নিয়ে দৃঢ়তার সাথে প্রতিষ্ঠিত; প্রকাশ্যে, অপ্রকাশ্যে, দেহমন—সর্বত্রই কালিমার সাক্ষ্য বিরাজমান। কিন্তু কেউ কেউ আছে এমন যে, সে যেন নিস্তব্ধ, তার ঈমান ছিনতাই হলেও খবর থাকে না। কারো জীবন আধ-শোয়া অবস্থায় কাটে। সর্বোপরি, মানুষের ঈমানী জীবনের দৃষ্টান্ত হচ্ছে একটি দেহের মতো; অন্তরের অবস্থান সেখানে নানা রকমের হয়ে থাকে। এর মধ্যে কিছু অন্তর হয় সুস্থ, সবল ও নির্মল; আর কিছু আত্মা থাকে নিস্তেজ, প্রাণহীন। বিশুদ্ধ সূত্রে বর্ণিত নবিজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এক হাদিসে বর্ণিত আছে—
إِنِّي لأَعْلَمُ كَلِمَةً لاَ يَقُوْلُهَا عَبْدٌ عِنْدَ الْمَوْتِ إِلاَّ وَجَدَتْ رُوْحُهُ لَهَا رُوْحًا
‘আমি এমন একটা কালিমার কথা জানি, কোনো ব্যক্তি মুমূর্ষু কালে যদি তা পাঠ করে, তবে পরকালে তার আত্মা একটা অন্য জীবন পাবে।’[১]
প্রাণহীন মানুষের দেহ যেমন নিষ্ফল ও মৃত, কালিমা ছাড়া অন্তর তেমনি বৃথা ও বিফল। কালিমাসঙ্গ মৃত্যু হলে ব্যক্তি যেভাবে জানাতে নির্মল আনন্দ পাবে, তেমনি কালিমা-কেন্দ্রিক যে জীবন পরিচালিত, তা হয় ইবাদত ও আনুগত্যে মুখরিত এবং সুখকর। আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَأَمَّا مَنْ خَافَ مَقَامَ رَبِّهِ وَنَهَى النَّفْسَ عَنِ الْهَوَى - فَإِنَّ الْجَنَّةَ هِيَ الْمَأْوَى
‘যে আল্লাহর সামনে উপস্থিত হওয়ার ভয় করে, অন্তরকে প্রবৃত্তি থেকে নিরাপদ রাখে, তার আবাস জান্নাত।’[২]
আল্লাহ তাআলা অন্যত্র বলেন—
مَنْ عَمِلَ صَالِحًا مِنْ ذَكَرٍ أَوْ أُنْثَى وَهُوَ مُؤْمِنٌ فَلَنُحْيِيَنَّهُ حَيَاةً طَيِّبَةً
'যেসব মুমিন নেক কাজ করে, পুরুষ হোক বা নারী, আমি তাকে নির্মল জীবন দান করব।'[১]
কোনো বস্তু যখন মানুষের বেশি উপকারী হয়, তার বিদ্যমানতা তখন আবশ্যক হয়ে যায়। এবং এর অনুপস্থিতি তাকে রীতিমতো পীড়া দেয়। আর যে বস্তুর উপস্থিতি ব্যক্তির জন্যে কষ্টকর, তার বিদ্যমানতা তার জন্যে অসহ্য লাগে। সে হিসেবে সকল কাজে আল্লাহর ধ্যান মানুষের জন্য পরম উপকারী বিষয়। কারণ, মানুষের জীবন, সুখ-দুঃখ, চিত্তাকর্ষণ—সবকিছুতে আল্লাহমুখিতা না থাকলে তার কোনো অর্থ অবশিষ্ট থাকে না।
ব্যক্তি যখন আল্লাহমুখিতার চূড়ান্ত প্রকাশ ঘটায়, তখন তার অবস্থা হয় একজন নেশাগ্রস্তের মতো, নেশার মাদকতা তাকে এতটাই আচ্ছন্ন করে রাখে যে, সর্বগ্রাসী সয়লাবে তার ঘরবাড়ি, সম্পত্তি ও বংশের বিনাশ হলেও তার মাদকতা কমে না। সে বিভোর হয়ে থাকে তাতে। পরে যখন চেতনা জাগ্রত হয়, সবকিছুই অনুভব করে আগের মতো।
এ তো ক্ষণস্থায়ী দুনিয়ার সাময়িক বিনাশ ও বঞ্চনা, বাস্তব জীবনে যার স্থায়িত্ব নেই। কিন্তু, কেউ যদি পরকালীন জীবনে বঞ্চনা ও বিনাশের শিকার হয়, তাহলে মুক্তি কঠিন। কারণ, পরকাল তো স্থায়ী। সেখানে শাস্তি ও বঞ্চনার কোনো সমাপ্তি নেই। এটি এমন বঞ্চনা যা বহনের ক্ষমতা কোনো স্থির পর্বতের কাছেও নেই।
আল্লাহ মানুষকে সম্বোধন করে বলেন, 'হে আদম সন্তান! আমি তোমাকে আমার ইবাদাত করতে বলেছি, তামাশা করো না। তোমার রিযিকের দায়িত্ব আমি নিয়েছি, দুশ্চিন্তা করো না। হে আদম সন্তান! আমাকে তালাশ করো, যদি আমাকে পেয়ে যাও, তবে সবই পেলে। আমাকে না পেলে কিছুই তুমি পাওনি। আমিই তোমার নিকট সবকিছু থেকে অধিক ভালোবাসা পাওয়ার যোগ্য।'
টিকাঃ
[১] সূরা মাআরিজ, আয়াত-ক্রম: ৩৩
[১] মুসনাদু আহমাদ, হাদিস-ক্রম : ১৮৭
[২] সূরা নাযিআত, আয়াত-ক্রম : ৪০-৪১
[১] সূরা নাহল, আয়াত-ক্রম: ৯৭