📄 পরিপূর্ণ মুহাব্বাত
অন্তরঙ্গতা মুহাব্বাতের পূর্ণতা ও পরিসীমাকে নির্দেশ করে। অন্তরঙ্গতা প্রেমের এমন এক স্তর, যেখানে প্রেমাষ্পদ ব্যতীত অন্য কারো স্থান নেই। এই স্তরে শুধু দুজন মানুষ পৌঁছতে সক্ষম হয়েছেন। নবী ইবরাহীম ও মুহাম্মদ। নবীজি ﷺ বলেছেন-
لَوْ كُنْتُ مُتَّخِذًا مِنْ أَهْلِ الْأَرْضِ خَلِيلًا لَا تَّخَذْتُ أَبَا بَكْرٍ خَلِيلًا، وَلَكِنَّ صَاحِبَكُمْ خَلِيلُ اللَّهِ
'পৃথিবীতে আমি যদি কাউকে অন্তরঙ্গ বন্ধু রূপে গ্রহণ করতাম, তবে আবু বকরকে করতাম; কিন্তু তোমাদের সাথী তো আল্লাহ তাআলার অন্তরঙ্গ বন্ধু।[৩]
ইবরাহীম আলাইহিস সালাম আল্লাহর নিকট সন্তান চাইলেন। আল্লাহ তাআলা তাঁকে সন্তান দান করলেন। কিন্তু যখন সন্তানের ভালোবাসা তাঁর অন্তরে প্রোথিত হলো, তখন আল্লাহ অভিমান করলেন এবং প্রত্যাশা করলেন ইবরাহীমের অন্তরে আল্লাহ ব্যতীত অন্য কিছুর প্রেম যেন না থাকে। এজন্য সন্তান জবাইয়ের নির্দেশ দিলেন, ঘুমের ঘোরে, পরীক্ষার বাস্তবায়ন যাতে মহান হয়। এখানে হত্যা করা উদ্দেশ্য ছিল না, বরং অন্তরকে আল্লাহর জন্য বিশিষ্ট করা উদ্দেশ্য। এ জন্যই ইবরাহীম যখন নির্দেশ পালনে ব্রতী হলেন, আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা পুনরায় যখন প্রাধান্য বিস্তার করল তাঁর মনে, তখন উদ্দেশ্য অর্জিত হয়ে গেছে বিধায় জবাইয়ের নির্দেশ তুলে নেওয়া হয়।
টিকাঃ
[৩] মুসলিম, হাদীস-ক্রম: ২৩৮৩
📄 ভালোবাসা ও অন্তরঙ্গতা
অনেকেই ভুল ভেবে মনে করেন যে, ভালোবাসা অন্তরঙ্গতার চেয়ে পরিপূর্ণ, আর ইবরাহীম আলাইহিস সালাম অন্তরঙ্গ তথা খলীল, অন্য দিকে মুহাম্মদ ছিলেন ভালোবাসার পাত্র বা বন্ধু। এটি ভুল ধারণা। কারণ, ইবরাহীম আলাইহিস সালাম যেমন খলীল ছিলেন, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও আল্লাহ তাআলার খলীল ছিলেন। নবীজি বিভিন্ন সময়ে বলেছেন, 'আল্লাহ ইবরাহীম আলাইহিস সালামের মতো আমাকেও খলীল হিসেবে গ্রহণ করেছেন।' এ ছাড়া নবীজি অন্য কাউকে খলীল হিসেবে স্বীকৃতি দেননি। অথচ তিনি আয়েশা, আবু বকর ও উমর-সহ অনেককেই ভালোবাসতেন। এ ছাড়া আল্লাহ ধৈর্যশীল, তাওবাকারীদের ভালোবাসার কথা উল্লেখ করেছেন। সুতরাং, হুব্ব তথা ভালোবাসা ব্যাপক বিষয় কিন্তু খলীল তথা অন্তরঙ্গ বন্ধুত্বের বিষয়টি দুজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ।
📄 সর্বোচ্চ প্রিয় বস্তুকে প্রাধান্য দেওয়া
মানুষ প্রিয় ও কাঙ্ক্ষিত বিষয়কে কখনো উপেক্ষা করে না; বরং অধিক পছন্দের বিষয়কে গ্রহণ করতে তুলনামূলক কম পছন্দের বিষয়কে প্রত্যাখান করে। আর বিবেকের বৈশিষ্ট্য হলো, অধিক প্রিয় বস্তুকে প্রাধান্য দেয়া। এটি মানুষের প্রেম ও বিদ্বেষ-শক্তির পূর্ণতা-নির্দেশক।
সর্বোচ্চ প্রিয় বস্তুকে প্রাধান্য দিতে দুটি গুণের প্রয়োজন পড়ে-
. অনুভব-শক্তি।
. অন্তরের সাহসিকতা।
মানুষ সর্বোচ্চ প্রিয় বস্তুকে প্রাধান্য দিতে ব্যর্থ হয় উল্লিখিত দুই জিনিসের দুর্বলতার কারণে। যখন ব্যক্তির অনুভব ও আত্মিক শক্তি বৃদ্ধি পাবে, তখন সে সর্বোচ্চ প্রেমাষ্পদকে অগ্রাধিকার দিতে পারবে। কারো কারো মধ্যে বিবেক ও ঈমানের চেয়ে প্রবৃত্তির শক্তি প্রবলভাবে বিদ্যমান থাকে, তখন সে দুর্বলদের নিপীড়ন করে। আবার কারো মধ্যে বিবেকের তাড়না ও ঈমানের শক্তি বেশি থাকে, তখন সে কল্যাণের পথে চলে, সৎকর্মকে প্রাধান্য দেয় সর্বত্র।
অনিষ্টতার ভিত্তিমূলে প্রোথিত থাকে আত্মা ও অনুভূতির দুর্বলতা। বস্তুত, আত্মা ও অনুভূতির পূর্ণতাই হচ্ছে কল্যাণের চাবিকাঠি।
ইচ্ছা ও ভালোবাসা সকল কাজের মূল। আর সকল উপেক্ষিত বিষয়ের সূচনা হয় বিদ্বেষ ও অপছন্দ থেকে। এই শক্তি দুটিই মানুষের সৌভাগ্য ও দুর্ভোগের মৌলিক কারণ।
তবে কোনো কাজ পরিহার করাটা কখনও চাহিদা না থাকার ফলে হয়। আবার বিদ্বেষ ও অপছন্দের জন্যেও হয় মাঝে মাঝে।
📄 পরম উপকারী বিষয়কে প্রাধান্য দেওয়া
গ্রহণ ও বর্জন—দুটি ঐচ্ছিক বিষয়। তবে কল্যাণের স্বাদ মানুষকে বাধ্য করে এর কোনো একটিকে বেছে নিতে। কারণ, কাঙ্ক্ষিত বিষয়কে শুধু জ্ঞানী ব্যক্তি নয়, বনের পশুও প্রাধান্য দিয়ে থাকে। অনেকেই বিভ্রান্তিতে নিপতিত হয়ে সাময়িক আনন্দে স্থায়ী কষ্টের কথা ভুলে যায়। মনে করে, আমি তো সুখেই আছি। যাদের দৃষ্টি পরকাল পর্যন্ত প্রলম্বিত না হয়ে ইহজগতে সীমাবদ্ধ থাকে, তাদের অবস্থা এমনই। এজন্য প্রকৃত জ্ঞানী সেই, যে পরকালীন স্থায়ী শান্তিকে গুরুত্ব দেয়।
জনৈক আলিম বলেন, 'আমি জ্ঞানীদের প্রচেষ্টাকে গভীরতার সাথে লক্ষ করেছি, তাদের সকল শ্রম ও চেষ্টা একই উদ্দেশ্যে প্রবাহিত হয়। তারা পানাহার, ব্যবসা- বাণিজ্য, বিয়ে, সংসার ও গান-বাজনা থেকে দূরে থাকার মধ্য দিয়ে অন্তর থেকে দুশ্চিন্তা দূরীভূত করেন। এক্ষেত্রে লক্ষ্য উত্তম হলেও, পদ্ধতিগত ভুলের জন্য বিপরীত প্রতিক্রিয়ার প্রকাশই বেশি ঘটে। এজন্য একমাত্র পথ হলো, আল্লাহমুখিতা ও তার সন্তুষ্টি সকল কিছুর উপর প্রাধান্য দেয়া। এ পথে চলে যদি কেউ দুনিয়াতে বঞ্চিত হয়, তবে পরকালে তার জন্য এমন সফলতা অপেক্ষমান, যার বিলুপ্তি নেই। আর এটাই বান্দার চূড়ান্ত সফলতার অভিন্ন প্রবেশিকা।