📄 প্রেম বা মুহাব্বাতের প্রকারভেদ
মুহাব্বাতের চারটি প্রকার রয়েছে। এগুলো পৃথকভাবে বিবেচনা না করার ফলে অনেকেই বিভ্রান্তির শিকার হয়।
* প্রথম প্রকারে রয়েছে, আল্লাহ তাআলার প্রতি মুহাব্বাত। কেবল এই মুহাব্বাতই পারলৌকিক শাস্তি থেকে নিস্তার ও সওয়াব লাভের জন্য যথেষ্ট নয়। কারণ, ইহুদী, খ্রিষ্টান ও পৌত্তলিকরাও আল্লাহকে ভালোবাসে।
* দ্বিতীয় প্রকারে রয়েছে, আল্লাহর প্রিয় বিষয়ের প্রতি প্রেম বা মুহাব্বাতের প্রকাশ ঘটানো। এই প্রেম ও ভালোবাসার সম্পর্ক মানুষকে কুফরের সীমা থেকে বের করে ইসলামের বিস্তৃত বাগানে নিয়ে আসে। এবং এ প্রকারের প্রেমিকগণই আল্লাহ তাআলার নিকট বেশি মূল্যায়ন পেয়ে থাকেন।
* এরপরের প্রকারে রয়েছে, আল্লাহর জন্য এবং আল্লাহ-তে প্রেমে মশগুল হওয়ার প্রসঙ্গ; এ বিষয়টি দ্বিতীয় প্রকার প্রেমের অনিবার্য অংশ। কেননা, এটি ছাড়া তা পূর্ণতা পাবে না।
* চতুর্থত হচ্ছে, আল্লাহ তাআলার সাথে অন্য কিছুকে ভালোবাসা, যা মূলত শিরক বা অংশীবাদী প্রেম। কারো প্রতি মানুষের প্রেম যখন আল্লাহর জন্য না হয়ে ভিন্ন উদ্দেশ্যে হয়, তখন তা প্রকারান্তরে আল্লাহর সাথে শিরক হয়। যেমন মুশরিকদের প্রেম।
আরেক প্রকারের প্রেম আছে, যা আমাদের প্রতিপাদ্য নয়। তা হলো, মানুষের স্বভাবজাত প্রেম। স্বভাব-সংশ্লিষ্ট বিষয়ের প্রতি মানুষের চিত্তাকর্ষণ। পানির প্রতি তৃষ্ণার্ত ও খাবারের প্রতি ক্ষুধার্ত মানুষের যে আকর্ষণ তা এই প্রকারের অন্তর্ভুক্ত। এ ছাড়াও সন্তানদের প্রতি মানুষের ভালোবাসা যদি আল্লাহ প্রেমের প্রতিবন্ধক না হয়, তাহলে তা নিন্দিত নয়। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন-
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تُلْهِكُمْ أَمْوَالُكُمْ وَلَا أَوْلَادُكُمْ عَنْ ذِكْرِ اللَّهِ
'হে মুমিনগণ, তোমাদের সম্পদ ও সন্তান-সন্তুতি তোমাদেরকে যেন আল্লাহ থেকে বিমুখ না করে।[১]
আল্লাহ তাআলা অন্যত্র বলেন-
رِجَالٌ لَا تُلْهِيهِمْ تِجَارَةٌ وَلَا بَيْعٌ عَنْ ذِكْرِ اللَّهِ
'তারা এমন লোক, যাদেরকে ব্যবসা-বাণিজ্য বিমুখ করতে পারে না আল্লাহ তাআলার স্মরণ থেকে। [২]
টিকাঃ
[১] সূরা মুনাফিকূন, আয়াত-ক্রম: ৯
[২] সূরা নূর, আয়াত-ক্রম: ৩৭
📄 পরিপূর্ণ মুহাব্বাত
অন্তরঙ্গতা মুহাব্বাতের পূর্ণতা ও পরিসীমাকে নির্দেশ করে। অন্তরঙ্গতা প্রেমের এমন এক স্তর, যেখানে প্রেমাষ্পদ ব্যতীত অন্য কারো স্থান নেই। এই স্তরে শুধু দুজন মানুষ পৌঁছতে সক্ষম হয়েছেন। নবী ইবরাহীম ও মুহাম্মদ। নবীজি ﷺ বলেছেন-
لَوْ كُنْتُ مُتَّخِذًا مِنْ أَهْلِ الْأَرْضِ خَلِيلًا لَا تَّخَذْتُ أَبَا بَكْرٍ خَلِيلًا، وَلَكِنَّ صَاحِبَكُمْ خَلِيلُ اللَّهِ
'পৃথিবীতে আমি যদি কাউকে অন্তরঙ্গ বন্ধু রূপে গ্রহণ করতাম, তবে আবু বকরকে করতাম; কিন্তু তোমাদের সাথী তো আল্লাহ তাআলার অন্তরঙ্গ বন্ধু।[৩]
ইবরাহীম আলাইহিস সালাম আল্লাহর নিকট সন্তান চাইলেন। আল্লাহ তাআলা তাঁকে সন্তান দান করলেন। কিন্তু যখন সন্তানের ভালোবাসা তাঁর অন্তরে প্রোথিত হলো, তখন আল্লাহ অভিমান করলেন এবং প্রত্যাশা করলেন ইবরাহীমের অন্তরে আল্লাহ ব্যতীত অন্য কিছুর প্রেম যেন না থাকে। এজন্য সন্তান জবাইয়ের নির্দেশ দিলেন, ঘুমের ঘোরে, পরীক্ষার বাস্তবায়ন যাতে মহান হয়। এখানে হত্যা করা উদ্দেশ্য ছিল না, বরং অন্তরকে আল্লাহর জন্য বিশিষ্ট করা উদ্দেশ্য। এ জন্যই ইবরাহীম যখন নির্দেশ পালনে ব্রতী হলেন, আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা পুনরায় যখন প্রাধান্য বিস্তার করল তাঁর মনে, তখন উদ্দেশ্য অর্জিত হয়ে গেছে বিধায় জবাইয়ের নির্দেশ তুলে নেওয়া হয়।
টিকাঃ
[৩] মুসলিম, হাদীস-ক্রম: ২৩৮৩
📄 ভালোবাসা ও অন্তরঙ্গতা
অনেকেই ভুল ভেবে মনে করেন যে, ভালোবাসা অন্তরঙ্গতার চেয়ে পরিপূর্ণ, আর ইবরাহীম আলাইহিস সালাম অন্তরঙ্গ তথা খলীল, অন্য দিকে মুহাম্মদ ছিলেন ভালোবাসার পাত্র বা বন্ধু। এটি ভুল ধারণা। কারণ, ইবরাহীম আলাইহিস সালাম যেমন খলীল ছিলেন, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও আল্লাহ তাআলার খলীল ছিলেন। নবীজি বিভিন্ন সময়ে বলেছেন, 'আল্লাহ ইবরাহীম আলাইহিস সালামের মতো আমাকেও খলীল হিসেবে গ্রহণ করেছেন।' এ ছাড়া নবীজি অন্য কাউকে খলীল হিসেবে স্বীকৃতি দেননি। অথচ তিনি আয়েশা, আবু বকর ও উমর-সহ অনেককেই ভালোবাসতেন। এ ছাড়া আল্লাহ ধৈর্যশীল, তাওবাকারীদের ভালোবাসার কথা উল্লেখ করেছেন। সুতরাং, হুব্ব তথা ভালোবাসা ব্যাপক বিষয় কিন্তু খলীল তথা অন্তরঙ্গ বন্ধুত্বের বিষয়টি দুজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ।
📄 সর্বোচ্চ প্রিয় বস্তুকে প্রাধান্য দেওয়া
মানুষ প্রিয় ও কাঙ্ক্ষিত বিষয়কে কখনো উপেক্ষা করে না; বরং অধিক পছন্দের বিষয়কে গ্রহণ করতে তুলনামূলক কম পছন্দের বিষয়কে প্রত্যাখান করে। আর বিবেকের বৈশিষ্ট্য হলো, অধিক প্রিয় বস্তুকে প্রাধান্য দেয়া। এটি মানুষের প্রেম ও বিদ্বেষ-শক্তির পূর্ণতা-নির্দেশক।
সর্বোচ্চ প্রিয় বস্তুকে প্রাধান্য দিতে দুটি গুণের প্রয়োজন পড়ে-
. অনুভব-শক্তি।
. অন্তরের সাহসিকতা।
মানুষ সর্বোচ্চ প্রিয় বস্তুকে প্রাধান্য দিতে ব্যর্থ হয় উল্লিখিত দুই জিনিসের দুর্বলতার কারণে। যখন ব্যক্তির অনুভব ও আত্মিক শক্তি বৃদ্ধি পাবে, তখন সে সর্বোচ্চ প্রেমাষ্পদকে অগ্রাধিকার দিতে পারবে। কারো কারো মধ্যে বিবেক ও ঈমানের চেয়ে প্রবৃত্তির শক্তি প্রবলভাবে বিদ্যমান থাকে, তখন সে দুর্বলদের নিপীড়ন করে। আবার কারো মধ্যে বিবেকের তাড়না ও ঈমানের শক্তি বেশি থাকে, তখন সে কল্যাণের পথে চলে, সৎকর্মকে প্রাধান্য দেয় সর্বত্র।
অনিষ্টতার ভিত্তিমূলে প্রোথিত থাকে আত্মা ও অনুভূতির দুর্বলতা। বস্তুত, আত্মা ও অনুভূতির পূর্ণতাই হচ্ছে কল্যাণের চাবিকাঠি।
ইচ্ছা ও ভালোবাসা সকল কাজের মূল। আর সকল উপেক্ষিত বিষয়ের সূচনা হয় বিদ্বেষ ও অপছন্দ থেকে। এই শক্তি দুটিই মানুষের সৌভাগ্য ও দুর্ভোগের মৌলিক কারণ।
তবে কোনো কাজ পরিহার করাটা কখনও চাহিদা না থাকার ফলে হয়। আবার বিদ্বেষ ও অপছন্দের জন্যেও হয় মাঝে মাঝে।