📄 দাসের বিবরণ
ভালোবাসার জন্য ছোট হতে পারাই দাসত্ব। কাউকে ভালোবেসে যদি তার কাছে ছোট হওয়া যায়, অন্তর তখন তার দাস হয়ে যায়। দাসত্ব মূলত ভালোবাসারই একটা স্তর। ভালোবাসার প্রথম স্তর—সম্পর্ক। দ্বিতীয় স্তর হলো, প্রিয়তমকে অনুভব করা। তৃতীয় স্তর হচ্ছে, তার চিন্তায় ডুবে থাকা, সারাক্ষণ তার কাছেই মন পড়ে থাকা। চতুর্থ স্তর—ইশক। ইশকের মধ্যে পাগলামি ও মাতলামি আছে। এজন্য আল্লাহর ক্ষেত্রে এটা ব্যবহৃত হয় না। তার পরের স্তর হলো, শাওক; তীব্র ভালোবাসা, অন্তর যেন প্রেমাষ্পদের কাছে উড়ে যায়। হাদীসে এই শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। মুসনাদু আহমাদে একটি দীর্ঘ দুআর মাঝে এই কামনা আছে— আপনার সাক্ষাতের শাওক বা তীব্র আকাঙ্ক্ষা দান করুন।
এক হাদীসে আছে, আল্লাহ তাআলা বলেন—
طَالَ شَوْقُ الْأَبْرَارِ إِلَى لِقَائِي، وَأَنَا إِلَى لِقَائِهِمْ أَشَدُّ شَوْقًا
'নেককার বান্দাদের জন্য আমার সাক্ষাতের তীব্র আকাঙ্ক্ষা দীর্ঘায়িত হয়েছে। আমিও তাদের সাক্ষাতের তীব্র আকাঙ্ক্ষা অনুভব করছি!'[২]
এটি মূলত সেই হাদীসেরই সম্পূরক, যেখানে নবী কারীম ﷺ বলেছেন, 'যে আল্লাহর সাক্ষাৎ কামনা করে, আল্লাহও তার সাক্ষাৎ কামনা করেন।' [৩] কুরাআনের আয়াত—
مَنْ كَانَ يَرْجُو لِقَاءَ اللَّهِ فَإِنَّ أَجَلَ اللَّهِ لَآتٍ
'যে আল্লাহর সাক্ষাতের প্রত্যাশা করে (তাকে বলে দাও), আল্লাহর দিন সমাগত। [১]
গভীর বোধসম্পন্ন ব্যক্তিরা এই আয়াত সম্পর্কে বলেন, আল্লাহ তাআলা বান্দার মনের সকল অবস্থা সম্পর্কে সম্যক অবগত। তিনি জানেন, তাঁর ওলীরা তাঁর সাক্ষাতের জন্যে কেমন পাগলপারা। তাঁর সাক্ষাৎ না পাওয়া পর্যন্ত তাঁদের অন্তর প্রশান্ত হবে না। তাই তিনি তাঁদের জন্য এক দিন নির্ধারণ করেছেন। সেদিন তাঁদের মন শান্ত হবে।
জীবনভর যাঁরা এভাবে আল্লাহকে পাওয়ার অপেক্ষায় রইল, তাঁদের জীবনই তো সবচেয়ে প্রশান্তির, সবচেয়ে উন্নত জীবন। এই জীবনের কথাই বলা হচ্ছে কুরআনে কারীমে-
مَنْ عَمِلَ صَالِحًا مِنْ ذَكَرٍ أَوْ أُنْثَى وَهُوَ مُؤْمِنٌ فَلَنُحْيِيَنَّهُ حَيَاةً طَيِّبَةً وَلَنَجْزِيَنَّهُمْ أَجْرَهُمْ بِأَحْسَنِ مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ
'মুমিন নর-নারীদের যারাই সৎ কাজ করবে, তাদেরকে আমি উন্নত জীবন দান করবো। এবং তারা যা করত তার তুলনায় অবশ্যই আমি তাদেরকে উত্তম প্রতিদান দেব।[২]
মুমিন, কাফির, নেককার, পাপাচারী-সবাই যে জীবন যাপন করে, সেই জীবনের কথা নয়। খাদ্য, পোশাক, বিবাহ, ভোগ-বিলাস-এসব তো পাপাচারীরা মুমিনের চেয়ে বেশিই পেয়ে থাকে। কিন্তু আল্লাহ তাআলা মুমিনদের যে জীবনের প্রত্যাশা দেখিয়েছেন, তা অবশ্যই হবে। প্রকৃত আনন্দের জীবন তো তারই, যার কোনো চিন্তা নেই। যার সব চিন্তা কেবলই আল্লাহর সন্তুষ্টি-ঘিরে। তার অন্তরে আর কিছু নেই। তার চিন্তা-ভাবনা, ওঠা-বসা-সবই আল্লাহর জন্য। চুপ থাকলেও আল্লাহর জন্য, কথা বললেও আল্লাহর জন্যই। আল্লাহর জন্যই তার হাঁটাচলা, শোনা, দেখা, জীবন, মৃত্যু—সবই। এমন ব্যক্তির পুনরুত্থানও হবে আল্লাহরই জন্য।
যেমন সহীহ বুখারীর এক হাদীসে কুদসীতে আল্লাহ তাআলা বলেন—
مَا تَقَرَّبَ إِلَيَّ عَبْدِي بِمِثْلِ أَدَاءِ مَا افْتَرَضْتُ عَلَيْهِ، وَلَا يَزَالُ عَبْدِي يَتَقَرَّبُ إِلَيَّ بِالنَّوَافِلِ حَتَّى أُحِبَّهُ، فَإِذَا أَحْبَبْتُهُ كُنْتُ سَمْعَهُ الَّذِي يَسْمَعُ بِهِ، وَبَصَرَهُ الَّذِي يُبْصِرُ بِهِ، وَيَدَهُ الَّتِي يَبْطِشُ بِهَا، وَرِجْلَهُ الَّتِي يَمْشِي بِهَا، فَبِي يَسْمَعُ، وَلِي يُبْصِرُ، وَبِي يَمْشِي، وَلَئِنْ سَأَلَنِي لَأُعْطِيَنَّهُ، وَلَئِنِ اسْتَعَاذَنِي لَأُعِيذَنَّهُ، وَمَا تَرَدَّدْتُ فِي شَيْءٍ أَنَا فَاعِلُهُ، كَتَرَدُّدِي عَنْ قَبْضِ نَفْسٍ عَبْدِيَ الْمُؤْمِنِ يَكْرَهُ الْمَوْتَ، وَأَكْرَهُ مُسَاءَتَهُ وَلَا بُدَّ لَهُ مِنْهُ
‘বান্দা তার উপর অর্পিত ফরয আদায় করে আমার নৈকট্য লাভ করে সবচেয়ে বেশি। তারপর আরো নৈকট্য লাভ করতে থাকে নফল আদায়ের মাধ্যমে। যখন সে বেশি বেশি নফল আদায় করে, আমি তাকে মুহাব্বাত করি। আর যখন আমি তাকে মুহাব্বাত করি, তখন আমিই হয়ে যাই তার শ্রবণশক্তি, যা দিয়ে সে শোনে; আমি হয়ে যাই তার দৃষ্টিশক্তি, যা দিয়ে সে দেখে; আমি হয়ে যাই তার হাত, যা দিয়ে সে ধরে; তার পা, যা দিয়ে সে হাঁটে (অর্থাৎ সব কিছুতেই আল্লাহ তাআলা একটা ফিল্টারিংয়ের মতো প্রভাব বিস্তার করেন)। আমার মধ্য দিয়েই সে দেখে, শোনে, হাঁটাচলা করে। সে আমার কাছে কিছু চাইলে আমি অবশ্যই তা দিয়ে দিই, আশ্রয় প্রার্থনা করলে আশ্রয় দিই। আমি কোনো কর্মে ইতস্তত বোধ করি না, যেমনটা করি এই মুমিন বান্দার প্রাণ হরণের সময়। তাকে কষ্ট দেয়া অপছন্দ করি, কিন্তু মৃত্যুর স্বাদ তো সবাইকেই ভোগ করতে হবে।’[১]
এ হাদীসে যা বলা হয়েছে, তা হয়তো বদ্ধ হৃদয়ের লোকদের বোধগম্য হবে না।
এখানে আল্লাহ তাআলার ভালোবাসাকে দুটি বিষয়ে সীমাবদ্ধ করা হয়েছে : ফরয পালন ও বেশি বেশি নফল আদায়।
আল্লাহ তাআলা বলছেন, ফরয পালন করাই তাঁর নৈকট্য লাভের প্রধান উপায়। এরপর হলো নফল আদায় করা। নফলের মাধ্যমে বান্দা আল্লাহর ভালোবাসার পাত্রে পরিণত হয়। আর আল্লাহ যখন তাকে ভালোবাসেন, তখন তার দায়িত্ব আরো বেড়ে যায়। এই ভালোবাসা তাকে অন্য সব কিছু থেকে বিরত করে আল্লাহর চিন্তায় বিভোর করে তোলে।
সন্দেহ নেই, এমন ভালোবাসার পেয়ালায় যে চুমুক দেবে, তার দর্শন, শ্রবণ, কর্ম, চলাফেরা-সবকিছুই আল্লাহর দ্বারা হবে। অর্থাৎ সব কিছুতেই আল্লাহ তাআলার উপস্থিতি থাকবে। আল্লাহ তাআলার সঙ্গ অনুভব করবে। এটা এমন অনুভূতি, যা বলে বোঝানো সম্ভব নয়, কেবলই অনুভব করা সম্ভব।
এই ভালোবাসা অনেকে মানুষের মধ্যে অনুভব করে, কিন্তু তা মানুষের জন্য তৈরি করা হয়নি। কবি বলেন-
حَيَالُكَ فِي عَيْنِي وَذِكْرُكَ فِي فَمِي ... وَمَثْوَاكَ فِي قَلْبِي فَأَيْنَ تَغِيبُ
'তোমার কল্পনা আমার চোখে, তোমার যিকির আমার যবানে তোমার পদচারণ আমার হৃদয়ে, হারাবে কোথায়, বলো!'
আরেক কবি বলেন-
إِنْ قُلْتُ غِبْتِ فَقَلْبِي لَا يُصَدِّقُنِي ... إِذْ أَنْتَ فِيهِ مَكَانَ السِّرِّ لَمْ تَغِبٍ
أَوْ قُلْتُ مَا غِبْتِ قَالَ الطَّرْفُ ذَا كَذِبُ ... فَقَدْ تَحَيَّرْتُ بَيْنَ الصِّدْقِ وَالْكَذِبِ
'যদি আমি বলি, তুমি নেই, আমার হৃদয়ই তা বিশ্বাস করে না! তুমি তো হৃদয়ের গোপন কুঠুরিতে থাক, কখনোই অদৃশ্য হও না।
আবার যদি বলি তুমি আছ, হৃদয়ের আরেক অংশ তা মিথ্যা মনে করে
কারণ, তোমায় খুঁজে ফেরে, আমি দুলতে থাকি সত্য-মিথ্যার দোলাচলে!'
প্রেমিকের কাছে প্রেমাস্পদের চেয়ে নিকটে আর কিছু নেই। এক পর্যায়ে আপন সত্তার চেয়েও নিকটে অনুভব করতে শুরু করে। এমন হয় যে, নিজেকে ভুলে থাকা যায়, কিন্তু ভুলে থাকা যায় না প্রেমাস্পদকে! কবি বলেন-
أُرِيدُ لِأَنْسَى ذِكْرَهَا فَكَأَنَّمَا ... تُمَثَلُ لِي لَيْلَى بِكُلِّ سَبِيلِ
'আমি তাকে ভুলে থাকতে চাই পথের প্রতিটি জায়গায় তাকে লায়লার মতো অনুভব করি।'
হাদীসে চোখ, কান ও হাত-পায়ের কথা বলা হয়েছে, কারণ, চোখ ও কান দিয়ে মানুষ প্রেম বা ঘৃণায় পতিত হয়, আর হাত ও পা দিয়ে তা বাস্তবায়ন করে। তাই এগুলো যখন আল্লাহর ভালোবাসার ফিল্টারে প্রবেশ করবে, তখন তার সব কিছু নিয়ন্ত্রিত হয়ে যাবে।
চিন্তা করে দেখুন, এই চারটি অঙ্গ নিয়ন্ত্রণ হলে যবানও নিয়ন্ত্রিত হয়ে যাবে। কারণ, চোখ, কান, হাত, পায়ের হেফাজত সবসময় সহজ থাকে না। কখনো কোনো দিকে অনিচ্ছাকৃত দৃষ্টি যায়, কানে কথা চলে আসে, অনেক সময় বাধ্য হয়ে হাত-পায়ের সঞ্চালনও করতে হয়। কিন্তু যবান? যবান তো পুরোটাই ইচ্ছাধীন। মানুষ চাইলেই যবানকে যেকোনো জায়গা থেকে বিরত রাখতে পারে।
মনের ভাব প্রকাশে অন্য কোনো অঙ্গের চেয়ে যবানই বেশি সক্ষম। যবানই মনের সঠিক ভাবনাকে ফুটিয়ে তুলতে পারে।
মানুষের সবকিছুই আল্লাহর হওয়ার পরও তিনি নিজেই বলছেন, 'আমি তার অঙ্গ প্রত্যঙ্গ হয়ে যাই।' তিনি বলছেন, 'আমার মাধ্যমেই শোনে, দেখে।' আমার জন্য বলেননি। কেউ ভাবতে পারে, আমার জন্য বললে হয়তো অর্থটা বেশি যুৎসই হতো। সব কাজের লক্ষ্য যে আল্লাহ তাআলা, তা প্রকাশ পেত। আল্লাহর দ্বারা হওয়ার চেয়ে আল্লাহর জন্য হওয়াটা যুক্তিযুক্ত হতো। এটা একটা ভুল ধারণা।
আল্লাহর দ্বারা মানে আল্লাহর সাহায্যে, এখানে কেবল এই কথাই বোঝায় না। এমনিতেও তো সকল মানুষের সকল নড়াচড়াই আল্লাহর ক্ষমতার দ্বারাই হয়। এখানে মূলত উদ্দেশ্য হলো সঙ্গ। বা অব্যয়টি সঙ্গের অর্থও দেয়। এখানে প্রতিটি কাজে আল্লাহ বান্দার সঙ্গে থাকেন, সে কথাই বোঝানো হচ্ছে।
যেমন এক হাদীসে কুদসীতে আছে, আল্লাহ তাআলা বলেন-
أَنَا مَعَ عَبْدِي مَا ذَكَرَنِي وَتَحَرَّكَتْ بِي شَفَتَاهُ
'বান্দা যখন আমাকে স্মরণ করে, আমি তার সাথেই থাকি। আমার মাধ্যমেই তার ঠোঁট নড়াচড়া অর্থাৎ যিকির করে।'[১]
কুরআনের ঘোষণা-
لَا تَحْزَنْ إِنَّ اللَّهَ مَعَنَا
'দুঃখিত হয়ে না, আল্লাহ আমাদের সাথে আছেন।'[২]
এখানেও এই বিশেষ সঙ্গই উদ্দেশ্য। নবীজি বলেন-
مَا ظَنُّكَ بِاثْنَيْنِ اللَّهُ ثَالِثُهُمَا
'সে দুজনকে কেমন মনে করো, যাদের সাথে তৃতীয়জন হলেন স্বয়ং আল্লাহ তাআলা!'[৩]
আল্লাহ তাআলা বলেন-
وَإِنَّ اللَّهَ لَمَعَ الْمُحْسِنِينَ
'আল্লাহ তাআলা সৎকর্মশীলদের সঙ্গে আছেন। [১]
إِنَّ اللَّهَ مَعَ الَّذِينَ اتَّقَوْا وَالَّذِينَ هُمْ مُحْسِنُونَ
'যারা তাকওয়া অবলম্বন করে ও সৎকর্ম করে, আল্লাহ তাদের সঙ্গে আছেন। [২]
وَاصْبِرُوا إِنَّ اللَّهَ مَعَ الصَّابِرِينَ
'তোমরা ধৈর্যধারণ করো, আল্লাহ তাআলা ধৈর্যশীলদের সঙ্গে আছেন। [৩]
قَالَ كَلَّا إِنَّ مَعِيَ رَبِّي سَيَهْدِينِ
'মূসা বললেন, "কক্ষনো নয়; আমার রব আমার সাথে আছেন, তিনি আমাকে পথ দেখাবেন।" [৪]
إِنَّنِي مَعَكُمَا أَسْمَعُ وَأَرَى
(আল্লাহ তাআলা মূসা ও হারূনকে বলেন,) 'আমি তোমাদের সাথে আছি, সব শুনছি ও দেখছি। [৫]
এই সকল আয়াতে ب হরফটি এসেছে সঙ্গ-এর অর্থে। বান্দার ইখলাস (একনিষ্ঠতা), সবর (ধৈর্য), তাওয়াক্কুল (আল্লাহ-ভরসা)—ইত্যাদি গুণ এই বিশেষ সঙ্গ ব্যতীত লাভ হবে না।
বান্দা যখন আল্লাহর সঙ্গ লাভ করবে, সকল কষ্ট তখন তার কাছে তুচ্ছ হয়ে যাবে। ভয়-ভীতি দূর হয়ে সে নিরাপত্তা লাভ করবে। সব কঠিন সহজ হয়ে যাবে, অধরা স্বপ্ন নিজেই এসে ধরা দেবে। সব দুঃখ, দুর্দশা—এমনকি দুশ্চিন্তাবাচক কোনো শব্দই তার জীবনে থাকবে না। যেখানে আল্লাহ আছেন, সেখানে কোনো দুশ্চিন্তা থাকতে পারে না। এই স্তরে এসে বান্দার প্রাণ মাছের প্রাণের মতো হয়ে যাবে। মাছ যেমন পানি ছাড়া থাকতে পারে না, সেও থাকতে পারবে না আল্লাহর সঙ্গ ব্যতীত।
আল্লাহ তাআলার সাথে এমন দৃঢ় ভালোবাসার বন্ধন তৈরি হলে তার দুনিয়ার প্রয়োজনও আল্লাহ পুরো করে দেবেন। সেই হাদীসেই তো আছে, আল্লাহ বলেন, 'সে কিছু চাইলে আমি তা দান করবে। আশ্রয় চাইলে আশ্রয় দেব।' অর্থাৎ সে যেমন আমার সবকিছু মেনে নিয়েছে, আমিও তার সবকিছু কবুল করবে। দুই পক্ষের এই বোঝাপড়া হলে ফলাফল যা হবে তা অকল্পনীয়। এরকম বান্দাকে মৃত্যু দিতেই আল্লাহ তাআলা ইতস্তত বোধ করেন। এই বান্দা যা অপছন্দ করে, আল্লাহও তা অপছন্দ করেন। তাকে কষ্ট দিতে চান না, তাই মৃত্যুও দিতে চান না। কিন্তু মৃত্যু কষ্টদায়ক হলেও এই বান্দার জন্য মৃত্যু তো কল্যাণকর। মৃত্যু তার নতুন জীবনের সূচনা। যেমন এই বান্দাকে অসুস্থ করেন, সুস্থ করার জন্য। গরীব বানান, ধনী বানানোর জন্য। ইচ্ছা অপূর্ণ রাখেন, পরবর্তীতে পূরণ করার জন্য। এই মানুষদেরকে আল্লাহ তাআলা তাদের আদি পিতার ঔরশে থাকাকালে জান্নাত থেকে বের করে দিয়েছেন, আবার তাদের জান্নাতে ফিরিয়ে নেয়ার জন্যই। এটাই তো প্রকৃত ভালোবাসা, যার কোনো বিকল্প ও তুলনা নেই। এর বিপরীতে বান্দা যদি তার প্রতিটি পশমের সমপরিমাণ ভালোবাসা আল্লাহকে দেয়, তাও তো খুবই সামান্য।
টিকাঃ
[২] হাফিয ইরাকীর মতে, এ হাদীসের কোনো সূত্র পাওয়া যায় না।-আল-মুগনী-৩/২২
[৩] বুখারী, হাদীস-ক্রম: ৭৫০৪
[১] সূরা আনকাবুত, আয়াত-ক্রম: ৫
[২] সূরা নাহল, আয়াত-ক্রম: ৯৭
[১] বুখারী, হাদীস-ক্রম: ৬৫০২
[১] মুসনাদু আহমাদ, হাদীস-ক্রম: ১০৯৭৬
[২] সূরা তাওবাহ, আয়াত-ক্রম: ৪০
[৩] বুখারী, হাদীস-ক্রম: ৩৬৫৩
[১] সূরা আনকাবূত, আয়াত-ক্রম: ৬৯
[২] সূরা নাহল, আয়াত-ক্রম: ১২৮
[৩] সূরা আনফাল, আয়াত-ক্রম: ৪৬
[৪] সূরা শুআরা, আয়াত-ক্রম: ৬২
[৫] সূরা তহা, আয়াত-ক্রম: ৪৬
📄 প্রেমের সর্বশেষ স্তর
প্রেমের সর্বশেষ স্তর হলো, নিজেকে প্রেমাষ্পদের আনুগত্যে সঁপে দেওয়া। অর্থাৎ প্রেমাস্পদের দাসানুদাসে পরিণত হওয়া। এ স্তরকে التيمم و التعبد (তাআব্বুদ ও তায়াম্মুম) শব্দে প্রকাশ করা হয়েছে। এখান থেকেই সরল পথকে বলা হয় طریق معبد। বান্দাকে 'আবদ' বলা হয়, কারণ, প্রেম তার ইবাদাতের পথকে সহজ করে দিয়েছে।
আল্লাহ পাক নানা স্থানে তাঁর প্রিয়তম রাসূলকে 'আবদ' তথা বান্দা শব্দে প্রকাশ করেছেন। যেমন: আল্লাহ তাআলা বলেন-
وَإِنْ كُنْتُمْ فِي رَيْبٍ مِمَّا نَزَّلْنَا عَلَى عَبْدِنَا فَأْتُوا بِسُورَةٍ مِنْ مِثْلِهِ
'আমি আমার 'আবদ' বা বান্দার উপর যা অবতীর্ণ করেছি, তাতে যদি তোমাদের সংশয় থাকে, তবে অনুরূপ একটি সূরা নিয়ে আসো। [১]
এ ছাড়াও শাফাআতের হাদীসে আছে, 'তোমরা বান্দা মুহাম্মদের নিকট যাও, তার পূর্বাপর সকল গুনাহ মাফ করা হয়েছে।'
টিকাঃ
[১] সূরা বাকারা, আয়াত-ক্রম: ২৩
📄 আল্লাহর প্রেমে কাউকে শরীক করা যাবে না
আল্লাহর প্রেমে অন্য কাউকে শরীক করা এক ধরনের শিরক। আল্লাহ তাআলা বলেন-
وَمِنَ النَّاسِ مَنْ يَتَّخِذُ مِنْ دُونِ اللَّهِ أَنْدَادًا يُحِبُّونَهُمْ كَحُبّ اللَّهِ وَالَّذِينَ آمَنُوا أَشَدُّ حُبًّا لِلَّهِ وَلَوْ يَرَى الَّذِينَ ظَلَمُوا إِذْ يَرَوْنَ الْعَذَابَ أَنَّ الْقُوَّةَ لِلَّهِ جَمِيعًا وَأَنَّ اللَّهَ شَدِيدُ الْعَذَابِ
'কিছু মানুষ আছে, যারা আল্লাহ ছাড়া অন্য কিছুকে তার শরীক হিসেবে গ্রহণ করে, তাদেরকে ভালোবাসে আল্লাহকে ভালোবাসার মতো। তবে যারা মুমিন, তারা আল্লাহকে আরো বেশি ভালোবাসে।[২]
কেউ বলেন, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে যে, যদিও তারা আল্লাহকে ভালোবাসে, কিন্তু সাথে অন্য কিছুকে ভালোবাসার কারণে আল্লাহ-প্রেমের মাঝে ত্রুটি প্রকাশিত হয়। আর মানুষকে আল্লাহ পাক সৃষ্টি করেছেন একমাত্র তাঁর ভালোবাসায় মশগুল রাখতে। এজন্যই অন্য কিছুকে মানুষ যখন ভালোবাসে, তখন তার আল্লাহ-প্রেমে অসম্পূর্ণতা তৈরি হয়।
আল্লাহ তাআলা বলেন-
أَمِ اتَّخَذُوا مِنْ دُونِ اللَّهِ شُفَعَاءَ قُلْ أَوَلَوْ كَانُوا لَا يَمْلِكُونَ شَيْئًا وَلَا يَعْقِلُونَ * قُلْ لِلَّهِ الشَّفَاعَةُ جَمِيعًا لَهُ مُلْكُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ ثُمَّ إِلَيْهِ تُرْجَعُونَ
'তবে কি তারা আল্লাহ ছাড়া অন্যদেরকে সুপারিশকারী বানিয়েছে? বলুন, "তারা কোনো কিছুর মালিক না হলেও এবং তারা না বুঝলেও?” বলুন, "সকল সুপারিশ আল্লাহর মালিকানাধীন। আসমানসমূহ ও জমিনের রাজত্ব একমাত্র তাঁরই। তারপর তোমরা তাঁর কাছেই প্রত্যাবর্তিত হবে।”'[১]
বান্দা যখন আল্লাহর সাথে বন্ধুত্ব করে, তখন আল্লাহ তার জন্য সুপারিশকারী তৈরি করেন। এবং মুমিনগণ আল্লাহর জন্য তার বন্ধু হয়ে যায়। সুপারিশের এটি একটি দিক, অন্যদিকে আছে অংশীবাদীদের সুপারিশ। উভয়ের মধ্যে পার্থক্যটা এখানেই।
মোদ্দাকথা, শিরকের মাধ্যমে আল্লাহর ইবাদাত করলে তা গৃহীত হয় না। কারণ, ইবাদাতের মূল শর্ত হচ্ছে, তা শিরকমুক্ত হওয়া।
দুনিয়ার যে-কাউকে, যেকোনো জিনিসকে ভালোবাসলে ভালোবাসাটা হতে হবে একমাত্র আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টির জন্য। নবীজির প্রতি ভালোবাসা যদি পরিবার-পরিজনকে ভালোবাসা থেকে শক্তিশালী না হয়, তবে ঈমানে পূর্ণতা আসবে না। এখানে নবীজিকে ভালোবাসার যে তাগিদ, তাও আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টির জন্য। হাদীসে আছে, রাসূল বলেছেন-
مَنْ أَحَبَّ لِلَّهِ، وَأَبْغَضَ لِلَّهِ، وَأَعْطَى لِلَّهِ وَمَنَعَ لِلَّهِ، فَقَدِ اسْتَكْمَلَ الْإِيمَانَ
'যে ব্যক্তি আল্লাহর জন্য (কাউকে) ভালোবাসে, আল্লাহর জন্য (কারও প্রতি) রাগান্বিত হয়, আল্লাহর জন্যই (কাউকে) দান করে এবং আল্লাহর জন্যই দান থেকে বিরত থাকে, সে তার ঈমান পূর্ণ করল।[১]
টিকাঃ
[২] সূরা বাকারা, আয়াত-ক্রম: ১৬৫
[১] সূরা যুমার, আয়াত-ক্রম: ৪৩, ৪৪
[১] আবু দাউদ, হাদীস-ক্রম: ৪৬৮১
📄 প্রেম বা মুহাব্বাতের প্রকারভেদ
মুহাব্বাতের চারটি প্রকার রয়েছে। এগুলো পৃথকভাবে বিবেচনা না করার ফলে অনেকেই বিভ্রান্তির শিকার হয়।
* প্রথম প্রকারে রয়েছে, আল্লাহ তাআলার প্রতি মুহাব্বাত। কেবল এই মুহাব্বাতই পারলৌকিক শাস্তি থেকে নিস্তার ও সওয়াব লাভের জন্য যথেষ্ট নয়। কারণ, ইহুদী, খ্রিষ্টান ও পৌত্তলিকরাও আল্লাহকে ভালোবাসে।
* দ্বিতীয় প্রকারে রয়েছে, আল্লাহর প্রিয় বিষয়ের প্রতি প্রেম বা মুহাব্বাতের প্রকাশ ঘটানো। এই প্রেম ও ভালোবাসার সম্পর্ক মানুষকে কুফরের সীমা থেকে বের করে ইসলামের বিস্তৃত বাগানে নিয়ে আসে। এবং এ প্রকারের প্রেমিকগণই আল্লাহ তাআলার নিকট বেশি মূল্যায়ন পেয়ে থাকেন।
* এরপরের প্রকারে রয়েছে, আল্লাহর জন্য এবং আল্লাহ-তে প্রেমে মশগুল হওয়ার প্রসঙ্গ; এ বিষয়টি দ্বিতীয় প্রকার প্রেমের অনিবার্য অংশ। কেননা, এটি ছাড়া তা পূর্ণতা পাবে না।
* চতুর্থত হচ্ছে, আল্লাহ তাআলার সাথে অন্য কিছুকে ভালোবাসা, যা মূলত শিরক বা অংশীবাদী প্রেম। কারো প্রতি মানুষের প্রেম যখন আল্লাহর জন্য না হয়ে ভিন্ন উদ্দেশ্যে হয়, তখন তা প্রকারান্তরে আল্লাহর সাথে শিরক হয়। যেমন মুশরিকদের প্রেম।
আরেক প্রকারের প্রেম আছে, যা আমাদের প্রতিপাদ্য নয়। তা হলো, মানুষের স্বভাবজাত প্রেম। স্বভাব-সংশ্লিষ্ট বিষয়ের প্রতি মানুষের চিত্তাকর্ষণ। পানির প্রতি তৃষ্ণার্ত ও খাবারের প্রতি ক্ষুধার্ত মানুষের যে আকর্ষণ তা এই প্রকারের অন্তর্ভুক্ত। এ ছাড়াও সন্তানদের প্রতি মানুষের ভালোবাসা যদি আল্লাহ প্রেমের প্রতিবন্ধক না হয়, তাহলে তা নিন্দিত নয়। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন-
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تُلْهِكُمْ أَمْوَالُكُمْ وَلَا أَوْلَادُكُمْ عَنْ ذِكْرِ اللَّهِ
'হে মুমিনগণ, তোমাদের সম্পদ ও সন্তান-সন্তুতি তোমাদেরকে যেন আল্লাহ থেকে বিমুখ না করে।[১]
আল্লাহ তাআলা অন্যত্র বলেন-
رِجَالٌ لَا تُلْهِيهِمْ تِجَارَةٌ وَلَا بَيْعٌ عَنْ ذِكْرِ اللَّهِ
'তারা এমন লোক, যাদেরকে ব্যবসা-বাণিজ্য বিমুখ করতে পারে না আল্লাহ তাআলার স্মরণ থেকে। [২]
টিকাঃ
[১] সূরা মুনাফিকূন, আয়াত-ক্রম: ৯
[২] সূরা নূর, আয়াত-ক্রম: ৩৭