📄 দৃষ্টিশক্তির নিরাপদ ও সঠিক ব্যবহারের উপকারিতা
মানবচক্ষু শয়তানের একটি বিষাক্ত তির। মানুষের দৃষ্টিশক্তির মাঝে শয়তান ভর করে বান্দার অন্তরে জায়গা করে নেয়। দৃষ্টিশক্তির এক মুহূর্তের অপব্যবহার মানবজীবনের স্থায়ী কোনো আক্ষেপ ডেকে আনতে সক্ষম। আর দৃষ্টিশক্তির সঠিক ও নিরাপদ ব্যবহারের অন্যতম প্রক্রিয়া হলো দৃষ্টি অবনত রাখা। আর দৃষ্টিশক্তির সঠিক ও নিরাপদ ব্যবহার বা অবনত দৃষ্টি মানবজীবনে উল্লেখযোগ্য অনেক উপকারিতা বয়ে আনে।
* দৃষ্টি অবনত রাখার মাধ্যমে আল্লাহ তাআলার আদেশ মান্য করা হয়। আর আল্লাহ তাআলার আদেশ মান্য করার চেয়ে অধিক সৌভাগ্যময় কোনো কাজ দুনিয়া-আখিরাতে নেই। দৃষ্টি অবনত না রাখলে আল্লাহ তাআলার আদেশ অমান্য করা হয়। আর উভয় জাহানের সবচেয়ে ক্ষতিকর কাজ হলো, তাঁর আদেশ অমান্য করা।
* দৃষ্টিশক্তির মাধ্যমে শয়তান মানুষের অন্তরে বিষাক্ত তির নিক্ষেপ করে। দৃষ্টি অবনত রাখার মাধ্যমে মানুষ তার অন্তরকে এই বিষাক্ত তিরের আঘাত থেকে রক্ষা করতে পারে।
* দৃষ্টি অবনত রাখার মাধ্যমে বান্দার অন্তর আল্লাহমুখী হয়। আল্লাহ তাআলার সাথে তার এক ধরনের আন্তরিকতা তৈরি হয়। অন্তরে সবসময় মহান রবের স্মরণ ধরে রাখা সম্ভবপর হয়। আর দৃষ্টি অবনত না রেখে দৃষ্টির অপব্যবহার বা বহুল ব্যবহার মানুষের অন্তরকে বিক্ষিপ্ত করে দেয়। জাগতিক বিভিন্ন চিন্তা ও খেয়ালের দিকে বান্দার অন্তর ঝুঁকে যায়। আল্লাহ তাআলার সাথে দূরত্ব সৃষ্টি হয়। যত্রতত্র দৃষ্টি দেয়া মানবজীবনের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। কেননা, এর মাধ্যমে মহান রবের সাথে বান্দার এক ধরনের দূরত্ব সৃষ্টি হয়।
অবনত দৃষ্টি মানবাত্মাকে সজীব ও চিন্তামুক্ত রাখে। মানুষের অন্তর প্রফুল্ল থাকে। আর দৃষ্টির যথেচ্ছ ব্যবহার মানুষের মনকে বিষিয়ে তোলে। জাগতিক বিভিন্ন চিন্তায় চিন্তিত করে তোলে।
দৃষ্টি অবনত রাখার দ্বারা বান্দার অন্তরে এক বিশেষ নূর জন্ম নেয়। আর চোখের হেফাজত না করলে বান্দার অন্তরে জাগতিক গুনাহের প্রভাবে অন্ধকার জন্ম নেয়। কুরআনে মুমিন বান্দাদের জন্য দৃষ্টি অবনত রাখার নির্দেশের পরপরই নূর বা ঐশী আলোর বিষয়টি আলোচিত হয়েছে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-
قُلْ لِلْمُؤْمِنِينَ يَغُضُّوا مِنْ أَبْصَارِهِمْ وَيَحْفَظُوا فُرُوجَهُمْ
'হে নবী! আপনি মুমিনদেরকে বলে দিন, তারা যেন নিজেদের দৃষ্টি অবনত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানকে (অসৎ ব্যবহার থেকে) পূর্ণ হেফাজত করে।'[১]
আল্লাহ তাআলা আরও ইরশাদ করেন-
اللَّهُ نُورُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ مَثَلُ نُورِهِ كَمِشْكَاةٍ فِيهَا مِصْبَاحُ
'আল্লাহ তাআলা হলেন আসমান ও জমিনের নূর। তাঁর নূরের দৃষ্টান্ত হলো একটি দ্বীপাধারের মাঝে অবস্থিত আলোকিত এক প্রদীপের মতো।'[২]
অর্থাৎ, যে মুমিন বান্দা আল্লাহ তাআলার আদেশের পূর্ণ আনুগত্য করে এবং নিষেধ থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখে, তার অন্তরে আল্লাহর নূরের দৃষ্টান্ত এরকম। বান্দার অন্তর যখন আলোকিত হয়ে যায়, তখন চতুর্দিক থেকে যাবতীয় কল্যাণ তার দিকে ছুটে আসে। একইভাবে বান্দার অন্তর যখন অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে যায়, তখন যাবতীয় অকল্যাণ আর বিপদ-আপদ চারপাশ থেকে তাকে ঘিরে ধরে। আলোহীন অন্ধকারাচ্ছন্ন হৃদয় থেকে তখন বিদআত আর ভ্রান্তি জন্ম নেয় তার জীবনে। সে তার নফসের গোলামে পরিণত হয়। হিদায়াতের পথ থেকে দূরে সরে আসে। সৌভাগ্যের সকল উপকরণ সে তার জীবন থেকে মুছে দেয়। দুর্ভাগ্যময় করুণ পরিণতির উপায়-উপকরণকে নিজ অন্তরে জমা করে ফেলে। তার জীবনে এই দুর্গতি নেমে আসার কারণ হলো, তার অন্তরের ঐশী নূর নিভে গেছে। অন্তর আলোহীন অন্ধকার গুহায় পরিণত হয়েছে। সে হয়ে গেছে উদ্ভ্রান্ত এক অন্ধ ব্যক্তির মতো, যে অসহায় অবস্থায় রাতের ঘন আঁধারে দাঁড়িয়ে আছে একাকী।
• দৃষ্টি অবনت রাখার দ্বারা একজন বান্দা সত্যিকারের অন্তর্দৃষ্টি-সম্পন্ন ব্যক্তিত্বে পরিণত হয়। সে নিজ থেকেই সত্য-মিথ্যার পার্থক্য ধরতে পারে। কোনটা হক কোনটা বাতিল, বুঝতে পারে।
শাহ ইবনু শুজা আল কিরমানী বলেন, 'যে ব্যক্তি তার জীবনাচারকে সুন্নত দিয়ে সাজিয়ে তোলে, মনের আভ্যন্তরীণ চিন্তাধারাকে আল্লাহ তাআলার স্মরণে আলোকিত করে রাখে, চোখকে হারাম দৃষ্টিপাত থেকে হেফাজত করে, নিজেকে সংশয়পূর্ণ কাজ থেকে বিরত রাখে, হালাল খাবারে নিজেকে অভ্যস্ত করে তোলে, তার অন্তর্দৃষ্টি ভুল করে না। বর্ণিত আছে, শাহ ইবনু শুজা'র অন্তর্দৃষ্টি কখনো ভুল কোনো মন্তব্য করেনি।
মূলত আল্লাহ তাআলা বান্দাকে তার আমল অনুযায়ী প্রতিদান দেন। আর কেউ যদি আল্লাহ তাআলার জন্য কোনো কিছু ত্যাগ করে, আল্লাহ তাআলা এর বিনিময়ে তাকে আরো উত্তম কিছু দান করেন। বান্দা যখন আল্লাহ তাআলার জন্য নিজের চোখকে হারাম দৃষ্টিপাত থেকে ফিরিয়ে রাখবে, আল্লাহ তাআলা বিনিময়স্বরূপ তার অন্তরে ঐশী নূর ঢেলে দেবেন। ঈমান ও ইলমের দরজা তার সামনে খুলে দেবেন। সঠিক অন্তর্দৃষ্টি তথা মারিফাতের জ্ঞান তার অন্তরে তৈরি হবে। এসব প্রশংসনীয় গুণাবলির বিপরীত দিকটি পবিত্র কুরআনে বর্ণনা করা হয়েছে সমকামীদের সম্পর্কে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-
لَعَمْرُكَ إِنَّهُمْ لَفِي سَكَرَتِهِمْ يَعْمَهُونَ
'আপনার জীবনের কসম, তারা আপন নেশার ঘোরে প্রমত্ত ছিল।[১]
আল্লাহ তাআলা তাদেরকে নেশাগ্রস্ত বলে উল্লেখ করেছেন। আর নেশার ঘোর মানুষের মস্তিষ্ক বিগড়ে দেয়। একইসাথে আল্লাহ তাদেরকে অন্ধ বলে আখায়িত করেছেন। অন্ধত্বের কারণে মানুষের অন্তর্দৃষ্টি নষ্ট হয়ে যায়।
দৃষ্টির অবনতি মানুষকে সাহসী, দৃঢ়পদ এবং শক্তিশালী করে তোলে। আল্লাহ তাআলা তার জীবনে চলার পথে ভরপুর সাহায্য করেন। তার কথাবার্তায় শক্তিশালী দলীল প্রমাণাদি উপস্থিত করে দেন। আল্লাহ তাআলার কুদরত সর্বদা তার সহায় হয়। আর যে ব্যক্তি নফসের অনুগত হয়, মনোবাসনার চাহিদা পূরণ করে পথ চলতে থাকে, সে অপমান, লাঞ্ছনা ও তাচ্ছিল্যের শিকার হয়। হাসান বসরী বলেন, 'মানুষ যদি শক্তিশালী ও মুগ্ধকর ঘোড়া বা খচ্চরের পিঠে কাঙ্ক্ষিত গতিতে চড়ে বেড়ায় এবং এই আয়েশি বাহনের জন্য সে গর্বও করতে থাকে, তবু সে যেই গুনাহকে নিজের জীবনে জড়িয়ে রেখেছে, তার লাঞ্ছনা থেকে আল্লাহ কখনোই তাকে মুক্তি দেবেন না।
আল্লাহ তাআলা মানবজীবনের সম্মানকে রেখেছেন তাঁর আনুগত্যের সাথে। আর অপমান ও লাঞ্ছনাকে তার অবাধ্যতার সঙ্গী করে দিয়েছেন। ইরশাদ করেন-
وَلِلَّهِ الْعِزَّةُ وَلِرَسُولِهِ وَلِلْمُؤْمِنِينَ
'সকল সম্মান কেবলই আল্লাহ তাআলার জন্য, এবং তাঁর রাসূল ও মুমিনগণের জন্য।[২]
وَلَا تَهِنُوا وَلَا تَحْزَنُوا وَأَنْتُمُ الْأَعْلَوْنَ إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ
'আর তোমরা নিরাশ হয়ো না, দুঃখ কোরো না। যদি তোমরা মুমিন হও, তাহলে তোমরাই বিজয়ী হবে। [১]
চোখের হেফাজত মানবাত্মাকে শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে সুরক্ষিত করে। শয়তানের কুমন্ত্রণা দৃষ্টিশক্তির মাধ্যমে মানবদেহে ভর করে অন্তরে জায়গা করে নেয়। এরপর দ্রুততম সময়ের মধ্যে সে মানুষকে গুনাহের কাজে উদ্বুদ্ধ করে। দৃষ্টির মাধ্যমে মানুষের অন্তরে উপস্থিত হয়ে সে কোনো হারাম চিত্র হৃদয়পটে এঁকে মানুষকে সেই হারামের দিকে ধাবিত করে। হৃদয়ের অংকিত দৃশ্যকে কল্পনার জগতে পৌঁছে দেয়। মানুষ তখন শয়তানের ধোঁকায় পড়ে মিথ্যা আশা-আকাঙ্ক্ষায় বিভোর হয়ে যায়। আপন রবকে ভুলে হারাম আশার পেছনে ছুটতে থাকে। ছুটতে ছুটতে নিজের ভেতরের কামভাব সে জাগিয়ে তোলে। হারাম মনোবাসনার অনলে ঝাঁপ দিয়ে দগ্ধ করে নিজের আত্মাকে। নাফরমানি আর অবাধ্যতার জাগতিক জাহান্নামে সে তখন জ্বলেপুড়ে ছারখার হয়ে যায়।
চোখের হেফাজত মানুষের অন্তরকে কল্যাণ ও মঙ্গলের চিন্তা করার সুযোগ দেয়। নেকি অর্জনের জন্য ব্যস্ত করে রাখে। আর দৃষ্টিশক্তির অবাধ বিচরণ নেকি অর্জনের কথা বান্দার অন্তর থেকে মুছে দেয়। কল্যাণের পথে অন্তরায় সৃষ্টি করে। পার্থিব লোভ-লালসা বাড়িয়ে দেয়। মানুষকে তার নফসের গোলামিতে বাধ্য করে। আপন রবের স্মরণ থেকে করে তোলে উদাসীন।
টিকাঃ
[১] সূরা নূর, আয়াত-ক্রম: ৩০
[২] সূরা নূর, আয়াত-ক্রম: ৩৫
[১] সূরা হিজর, আয়াত-ক্রম: ২৭
[২] সূরা মুনাফিকুন, আয়াত-ক্রম: ৮
[১] সূরা আলে ইমরান, আয়াত-ক্রম: ১৩৯
📄 ভালোবাসায় অংশীদার
সর্বোত্তম প্রেমাষ্পদ আল্লাহ তাআলার ভালোবাসার সঙ্গে অন্য কিছুর ভালোবাসা কারো অন্তরে একত্রিত হতে পারে না। যার অন্তরে সঠিকভাবে আল্লাহ তাআলার ভালোবাসা দৃঢ় হয়ে বসে, তার অন্তরে অন্য কিছু থাকতে পারে না।
বান্দা কাউকে ভালোবাসলে আল্লাহর জন্যই ভালোবাসবে। যাকে ভালোবাসলে আল্লাহর নৈকট্য পাওয়া যাবে, তাকে ভালোবাসবে। আর আল্লাহর মুহাব্বাত কমে যেতে পারে-এমন সকল সম্পর্ক ছিন্ন করবে।
সত্যিকার ভালোবাসা অংশীদার সহ্য করে না। কোনো মানুষই ভালোবাসায় ভাগ পছন্দ করে না। সবাই কামনা করে সব ভালোবাসা একাই লাভ করতে। নিজের প্রতি ভালোবাসায় খুঁত সৃষ্টি করতে পারে—এমন কোনো প্রতিপক্ষকেও সহ্য করে না। ভালোবাসার আতিশয্যে প্রতিপক্ষকে নিজের প্রিয়ের কাছেও ঘেঁষতে দেয় না। এই যদি হয় মানুষের অবস্থা, যার এমন কী যোগ্যতা আছে যে, সব ভালোবাসা তারই প্রাপ্য! তাহলে সত্যিকার সব ভালোবাসা যাঁর প্রাপ্য, সেই প্রেমাস্পদ আল্লাহ তাআলার ‘গায়রত’ বা আত্মমর্যাদাবোধ কেমন হতে পারে? এজন্যই আল্লাহকে ভুলে মানুষ যে মুহাব্বাতে ডুবে যায়, সেই মুহাব্বাত তার জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়।
তাই তো আল্লাহ তাআলা সকল পাপ ক্ষমা করে দিতে পারেন, কিন্তু শিরক কখনো ক্ষমা করবেন না। মূর্তির ভালোবাসার কারণে মানুষ তার চেয়ে মূল্যবান জিনিস হারিয়ে ফেলেছে। তার হৃদয় থেকে এমন সত্তার ভালোবাসা মুছে দিচ্ছে, যার জন্য সব ভালোবাসা হওয়ার কথা ছিল। এই ভালোবাসা না থাকলে জীবন তো জীবনই না! দুই নৌকায় একসাথে পা দেয়া যায় না। আবার দুটো থেকেই মুক্ত থাকা সম্ভব নয়। যদি আল্লাহর ভালোবাসা গ্রহণ না করেন, তবে জাগতিক কোনো মোহের মধ্যে ফেলে আপনাকে পরীক্ষা করা হবে। এরপর ইহকাল-পরকাল সব শেষ। আল্লাহকে ভালো না বাসলে বিকল্প এসে উপস্থিত হবে। হয়তো প্রতিমা, নয়তো সন্তান-সন্ততি, ভক্তবৃন্দ, কিংবা নারীর ভালোবাসা জেঁকে বসবে। সাথী-সঙ্গী ভাই-বন্ধুর অভাব হবে না। অথচ আল্লাহর ভালোবাসার সামনে এ সবই তুচ্ছ বিষয়। যার ভালোবাসা অন্তরে গেঁড়ে বসবে, তার দাসে পরিণত হয় মানুষ; চাই তা একটা পাথরও হোক না কেন। কবি বলেন—
'যাকে ভালোবাসতে যাচ্ছ, তার তরেই তোমার মৃত্যু, তাই আগেই সিদ্ধান্ত নাও, কার জন্য মরতে চাও।'
আল্লাহ তাআলা বলেন, যে তার রবের দাস হয় না, সে দাস হয় তার মনের—
أَفَرَأَيْتَ مَنِ اتَّخَذَ إِلَهَهُ هَوَاهُ وَأَضَلَّهُ اللَّهُ عَلَى عِلْمٍ وَخَتَمَ عَلَى سَمْعِهِ وَقَلْبِهِ وَجَعَلَ عَلَى بَصَرِهِ غِشَاوَةٌ فَمَنْ يَهْدِيهِ مِنْ بَعْدِ اللَّهِ أَفَلَا تَذَكَّرُونَ
'তুমি কি দেখেছ তাকে, যে তার খেয়ালখুশিকে নিজ মাবুদ বানিয়ে নিয়েছে এবং জ্ঞান থাকা সত্ত্বেও আল্লাহ তাকে গোমরাহিতে নিক্ষেপ করেছেন এবং তার কান ও অন্তরে মোহর মেরে দিয়েছেন।, আর তার চোখের উপর পর্দা ফেলে দিয়েছেন? অতএব, আল্লাহর পর এমন কে আছে, যে তাকে সুপথে নিয়ে আসবে? তবু কি তোমরা শিক্ষা গ্রহণ করবে না?'[১]
টিকাঃ
[১] সূরা জাসিয়া, আয়াত-ক্রম: ২৩
📄 দাসের বিবরণ
ভালোবাসার জন্য ছোট হতে পারাই দাসত্ব। কাউকে ভালোবেসে যদি তার কাছে ছোট হওয়া যায়, অন্তর তখন তার দাস হয়ে যায়। দাসত্ব মূলত ভালোবাসারই একটা স্তর। ভালোবাসার প্রথম স্তর—সম্পর্ক। দ্বিতীয় স্তর হলো, প্রিয়তমকে অনুভব করা। তৃতীয় স্তর হচ্ছে, তার চিন্তায় ডুবে থাকা, সারাক্ষণ তার কাছেই মন পড়ে থাকা। চতুর্থ স্তর—ইশক। ইশকের মধ্যে পাগলামি ও মাতলামি আছে। এজন্য আল্লাহর ক্ষেত্রে এটা ব্যবহৃত হয় না। তার পরের স্তর হলো, শাওক; তীব্র ভালোবাসা, অন্তর যেন প্রেমাষ্পদের কাছে উড়ে যায়। হাদীসে এই শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। মুসনাদু আহমাদে একটি দীর্ঘ দুআর মাঝে এই কামনা আছে— আপনার সাক্ষাতের শাওক বা তীব্র আকাঙ্ক্ষা দান করুন।
এক হাদীসে আছে, আল্লাহ তাআলা বলেন—
طَالَ شَوْقُ الْأَبْرَارِ إِلَى لِقَائِي، وَأَنَا إِلَى لِقَائِهِمْ أَشَدُّ شَوْقًا
'নেককার বান্দাদের জন্য আমার সাক্ষাতের তীব্র আকাঙ্ক্ষা দীর্ঘায়িত হয়েছে। আমিও তাদের সাক্ষাতের তীব্র আকাঙ্ক্ষা অনুভব করছি!'[২]
এটি মূলত সেই হাদীসেরই সম্পূরক, যেখানে নবী কারীম ﷺ বলেছেন, 'যে আল্লাহর সাক্ষাৎ কামনা করে, আল্লাহও তার সাক্ষাৎ কামনা করেন।' [৩] কুরাআনের আয়াত—
مَنْ كَانَ يَرْجُو لِقَاءَ اللَّهِ فَإِنَّ أَجَلَ اللَّهِ لَآتٍ
'যে আল্লাহর সাক্ষাতের প্রত্যাশা করে (তাকে বলে দাও), আল্লাহর দিন সমাগত। [১]
গভীর বোধসম্পন্ন ব্যক্তিরা এই আয়াত সম্পর্কে বলেন, আল্লাহ তাআলা বান্দার মনের সকল অবস্থা সম্পর্কে সম্যক অবগত। তিনি জানেন, তাঁর ওলীরা তাঁর সাক্ষাতের জন্যে কেমন পাগলপারা। তাঁর সাক্ষাৎ না পাওয়া পর্যন্ত তাঁদের অন্তর প্রশান্ত হবে না। তাই তিনি তাঁদের জন্য এক দিন নির্ধারণ করেছেন। সেদিন তাঁদের মন শান্ত হবে।
জীবনভর যাঁরা এভাবে আল্লাহকে পাওয়ার অপেক্ষায় রইল, তাঁদের জীবনই তো সবচেয়ে প্রশান্তির, সবচেয়ে উন্নত জীবন। এই জীবনের কথাই বলা হচ্ছে কুরআনে কারীমে-
مَنْ عَمِلَ صَالِحًا مِنْ ذَكَرٍ أَوْ أُنْثَى وَهُوَ مُؤْمِنٌ فَلَنُحْيِيَنَّهُ حَيَاةً طَيِّبَةً وَلَنَجْزِيَنَّهُمْ أَجْرَهُمْ بِأَحْسَنِ مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ
'মুমিন নর-নারীদের যারাই সৎ কাজ করবে, তাদেরকে আমি উন্নত জীবন দান করবো। এবং তারা যা করত তার তুলনায় অবশ্যই আমি তাদেরকে উত্তম প্রতিদান দেব।[২]
মুমিন, কাফির, নেককার, পাপাচারী-সবাই যে জীবন যাপন করে, সেই জীবনের কথা নয়। খাদ্য, পোশাক, বিবাহ, ভোগ-বিলাস-এসব তো পাপাচারীরা মুমিনের চেয়ে বেশিই পেয়ে থাকে। কিন্তু আল্লাহ তাআলা মুমিনদের যে জীবনের প্রত্যাশা দেখিয়েছেন, তা অবশ্যই হবে। প্রকৃত আনন্দের জীবন তো তারই, যার কোনো চিন্তা নেই। যার সব চিন্তা কেবলই আল্লাহর সন্তুষ্টি-ঘিরে। তার অন্তরে আর কিছু নেই। তার চিন্তা-ভাবনা, ওঠা-বসা-সবই আল্লাহর জন্য। চুপ থাকলেও আল্লাহর জন্য, কথা বললেও আল্লাহর জন্যই। আল্লাহর জন্যই তার হাঁটাচলা, শোনা, দেখা, জীবন, মৃত্যু—সবই। এমন ব্যক্তির পুনরুত্থানও হবে আল্লাহরই জন্য।
যেমন সহীহ বুখারীর এক হাদীসে কুদসীতে আল্লাহ তাআলা বলেন—
مَا تَقَرَّبَ إِلَيَّ عَبْدِي بِمِثْلِ أَدَاءِ مَا افْتَرَضْتُ عَلَيْهِ، وَلَا يَزَالُ عَبْدِي يَتَقَرَّبُ إِلَيَّ بِالنَّوَافِلِ حَتَّى أُحِبَّهُ، فَإِذَا أَحْبَبْتُهُ كُنْتُ سَمْعَهُ الَّذِي يَسْمَعُ بِهِ، وَبَصَرَهُ الَّذِي يُبْصِرُ بِهِ، وَيَدَهُ الَّتِي يَبْطِشُ بِهَا، وَرِجْلَهُ الَّتِي يَمْشِي بِهَا، فَبِي يَسْمَعُ، وَلِي يُبْصِرُ، وَبِي يَمْشِي، وَلَئِنْ سَأَلَنِي لَأُعْطِيَنَّهُ، وَلَئِنِ اسْتَعَاذَنِي لَأُعِيذَنَّهُ، وَمَا تَرَدَّدْتُ فِي شَيْءٍ أَنَا فَاعِلُهُ، كَتَرَدُّدِي عَنْ قَبْضِ نَفْسٍ عَبْدِيَ الْمُؤْمِنِ يَكْرَهُ الْمَوْتَ، وَأَكْرَهُ مُسَاءَتَهُ وَلَا بُدَّ لَهُ مِنْهُ
‘বান্দা তার উপর অর্পিত ফরয আদায় করে আমার নৈকট্য লাভ করে সবচেয়ে বেশি। তারপর আরো নৈকট্য লাভ করতে থাকে নফল আদায়ের মাধ্যমে। যখন সে বেশি বেশি নফল আদায় করে, আমি তাকে মুহাব্বাত করি। আর যখন আমি তাকে মুহাব্বাত করি, তখন আমিই হয়ে যাই তার শ্রবণশক্তি, যা দিয়ে সে শোনে; আমি হয়ে যাই তার দৃষ্টিশক্তি, যা দিয়ে সে দেখে; আমি হয়ে যাই তার হাত, যা দিয়ে সে ধরে; তার পা, যা দিয়ে সে হাঁটে (অর্থাৎ সব কিছুতেই আল্লাহ তাআলা একটা ফিল্টারিংয়ের মতো প্রভাব বিস্তার করেন)। আমার মধ্য দিয়েই সে দেখে, শোনে, হাঁটাচলা করে। সে আমার কাছে কিছু চাইলে আমি অবশ্যই তা দিয়ে দিই, আশ্রয় প্রার্থনা করলে আশ্রয় দিই। আমি কোনো কর্মে ইতস্তত বোধ করি না, যেমনটা করি এই মুমিন বান্দার প্রাণ হরণের সময়। তাকে কষ্ট দেয়া অপছন্দ করি, কিন্তু মৃত্যুর স্বাদ তো সবাইকেই ভোগ করতে হবে।’[১]
এ হাদীসে যা বলা হয়েছে, তা হয়তো বদ্ধ হৃদয়ের লোকদের বোধগম্য হবে না।
এখানে আল্লাহ তাআলার ভালোবাসাকে দুটি বিষয়ে সীমাবদ্ধ করা হয়েছে : ফরয পালন ও বেশি বেশি নফল আদায়।
আল্লাহ তাআলা বলছেন, ফরয পালন করাই তাঁর নৈকট্য লাভের প্রধান উপায়। এরপর হলো নফল আদায় করা। নফলের মাধ্যমে বান্দা আল্লাহর ভালোবাসার পাত্রে পরিণত হয়। আর আল্লাহ যখন তাকে ভালোবাসেন, তখন তার দায়িত্ব আরো বেড়ে যায়। এই ভালোবাসা তাকে অন্য সব কিছু থেকে বিরত করে আল্লাহর চিন্তায় বিভোর করে তোলে।
সন্দেহ নেই, এমন ভালোবাসার পেয়ালায় যে চুমুক দেবে, তার দর্শন, শ্রবণ, কর্ম, চলাফেরা-সবকিছুই আল্লাহর দ্বারা হবে। অর্থাৎ সব কিছুতেই আল্লাহ তাআলার উপস্থিতি থাকবে। আল্লাহ তাআলার সঙ্গ অনুভব করবে। এটা এমন অনুভূতি, যা বলে বোঝানো সম্ভব নয়, কেবলই অনুভব করা সম্ভব।
এই ভালোবাসা অনেকে মানুষের মধ্যে অনুভব করে, কিন্তু তা মানুষের জন্য তৈরি করা হয়নি। কবি বলেন-
حَيَالُكَ فِي عَيْنِي وَذِكْرُكَ فِي فَمِي ... وَمَثْوَاكَ فِي قَلْبِي فَأَيْنَ تَغِيبُ
'তোমার কল্পনা আমার চোখে, তোমার যিকির আমার যবানে তোমার পদচারণ আমার হৃদয়ে, হারাবে কোথায়, বলো!'
আরেক কবি বলেন-
إِنْ قُلْتُ غِبْتِ فَقَلْبِي لَا يُصَدِّقُنِي ... إِذْ أَنْتَ فِيهِ مَكَانَ السِّرِّ لَمْ تَغِبٍ
أَوْ قُلْتُ مَا غِبْتِ قَالَ الطَّرْفُ ذَا كَذِبُ ... فَقَدْ تَحَيَّرْتُ بَيْنَ الصِّدْقِ وَالْكَذِبِ
'যদি আমি বলি, তুমি নেই, আমার হৃদয়ই তা বিশ্বাস করে না! তুমি তো হৃদয়ের গোপন কুঠুরিতে থাক, কখনোই অদৃশ্য হও না।
আবার যদি বলি তুমি আছ, হৃদয়ের আরেক অংশ তা মিথ্যা মনে করে
কারণ, তোমায় খুঁজে ফেরে, আমি দুলতে থাকি সত্য-মিথ্যার দোলাচলে!'
প্রেমিকের কাছে প্রেমাস্পদের চেয়ে নিকটে আর কিছু নেই। এক পর্যায়ে আপন সত্তার চেয়েও নিকটে অনুভব করতে শুরু করে। এমন হয় যে, নিজেকে ভুলে থাকা যায়, কিন্তু ভুলে থাকা যায় না প্রেমাস্পদকে! কবি বলেন-
أُرِيدُ لِأَنْسَى ذِكْرَهَا فَكَأَنَّمَا ... تُمَثَلُ لِي لَيْلَى بِكُلِّ سَبِيلِ
'আমি তাকে ভুলে থাকতে চাই পথের প্রতিটি জায়গায় তাকে লায়লার মতো অনুভব করি।'
হাদীসে চোখ, কান ও হাত-পায়ের কথা বলা হয়েছে, কারণ, চোখ ও কান দিয়ে মানুষ প্রেম বা ঘৃণায় পতিত হয়, আর হাত ও পা দিয়ে তা বাস্তবায়ন করে। তাই এগুলো যখন আল্লাহর ভালোবাসার ফিল্টারে প্রবেশ করবে, তখন তার সব কিছু নিয়ন্ত্রিত হয়ে যাবে।
চিন্তা করে দেখুন, এই চারটি অঙ্গ নিয়ন্ত্রণ হলে যবানও নিয়ন্ত্রিত হয়ে যাবে। কারণ, চোখ, কান, হাত, পায়ের হেফাজত সবসময় সহজ থাকে না। কখনো কোনো দিকে অনিচ্ছাকৃত দৃষ্টি যায়, কানে কথা চলে আসে, অনেক সময় বাধ্য হয়ে হাত-পায়ের সঞ্চালনও করতে হয়। কিন্তু যবান? যবান তো পুরোটাই ইচ্ছাধীন। মানুষ চাইলেই যবানকে যেকোনো জায়গা থেকে বিরত রাখতে পারে।
মনের ভাব প্রকাশে অন্য কোনো অঙ্গের চেয়ে যবানই বেশি সক্ষম। যবানই মনের সঠিক ভাবনাকে ফুটিয়ে তুলতে পারে।
মানুষের সবকিছুই আল্লাহর হওয়ার পরও তিনি নিজেই বলছেন, 'আমি তার অঙ্গ প্রত্যঙ্গ হয়ে যাই।' তিনি বলছেন, 'আমার মাধ্যমেই শোনে, দেখে।' আমার জন্য বলেননি। কেউ ভাবতে পারে, আমার জন্য বললে হয়তো অর্থটা বেশি যুৎসই হতো। সব কাজের লক্ষ্য যে আল্লাহ তাআলা, তা প্রকাশ পেত। আল্লাহর দ্বারা হওয়ার চেয়ে আল্লাহর জন্য হওয়াটা যুক্তিযুক্ত হতো। এটা একটা ভুল ধারণা।
আল্লাহর দ্বারা মানে আল্লাহর সাহায্যে, এখানে কেবল এই কথাই বোঝায় না। এমনিতেও তো সকল মানুষের সকল নড়াচড়াই আল্লাহর ক্ষমতার দ্বারাই হয়। এখানে মূলত উদ্দেশ্য হলো সঙ্গ। বা অব্যয়টি সঙ্গের অর্থও দেয়। এখানে প্রতিটি কাজে আল্লাহ বান্দার সঙ্গে থাকেন, সে কথাই বোঝানো হচ্ছে।
যেমন এক হাদীসে কুদসীতে আছে, আল্লাহ তাআলা বলেন-
أَنَا مَعَ عَبْدِي مَا ذَكَرَنِي وَتَحَرَّكَتْ بِي شَفَتَاهُ
'বান্দা যখন আমাকে স্মরণ করে, আমি তার সাথেই থাকি। আমার মাধ্যমেই তার ঠোঁট নড়াচড়া অর্থাৎ যিকির করে।'[১]
কুরআনের ঘোষণা-
لَا تَحْزَنْ إِنَّ اللَّهَ مَعَنَا
'দুঃখিত হয়ে না, আল্লাহ আমাদের সাথে আছেন।'[২]
এখানেও এই বিশেষ সঙ্গই উদ্দেশ্য। নবীজি বলেন-
مَا ظَنُّكَ بِاثْنَيْنِ اللَّهُ ثَالِثُهُمَا
'সে দুজনকে কেমন মনে করো, যাদের সাথে তৃতীয়জন হলেন স্বয়ং আল্লাহ তাআলা!'[৩]
আল্লাহ তাআলা বলেন-
وَإِنَّ اللَّهَ لَمَعَ الْمُحْسِنِينَ
'আল্লাহ তাআলা সৎকর্মশীলদের সঙ্গে আছেন। [১]
إِنَّ اللَّهَ مَعَ الَّذِينَ اتَّقَوْا وَالَّذِينَ هُمْ مُحْسِنُونَ
'যারা তাকওয়া অবলম্বন করে ও সৎকর্ম করে, আল্লাহ তাদের সঙ্গে আছেন। [২]
وَاصْبِرُوا إِنَّ اللَّهَ مَعَ الصَّابِرِينَ
'তোমরা ধৈর্যধারণ করো, আল্লাহ তাআলা ধৈর্যশীলদের সঙ্গে আছেন। [৩]
قَالَ كَلَّا إِنَّ مَعِيَ رَبِّي سَيَهْدِينِ
'মূসা বললেন, "কক্ষনো নয়; আমার রব আমার সাথে আছেন, তিনি আমাকে পথ দেখাবেন।" [৪]
إِنَّنِي مَعَكُمَا أَسْمَعُ وَأَرَى
(আল্লাহ তাআলা মূসা ও হারূনকে বলেন,) 'আমি তোমাদের সাথে আছি, সব শুনছি ও দেখছি। [৫]
এই সকল আয়াতে ب হরফটি এসেছে সঙ্গ-এর অর্থে। বান্দার ইখলাস (একনিষ্ঠতা), সবর (ধৈর্য), তাওয়াক্কুল (আল্লাহ-ভরসা)—ইত্যাদি গুণ এই বিশেষ সঙ্গ ব্যতীত লাভ হবে না।
বান্দা যখন আল্লাহর সঙ্গ লাভ করবে, সকল কষ্ট তখন তার কাছে তুচ্ছ হয়ে যাবে। ভয়-ভীতি দূর হয়ে সে নিরাপত্তা লাভ করবে। সব কঠিন সহজ হয়ে যাবে, অধরা স্বপ্ন নিজেই এসে ধরা দেবে। সব দুঃখ, দুর্দশা—এমনকি দুশ্চিন্তাবাচক কোনো শব্দই তার জীবনে থাকবে না। যেখানে আল্লাহ আছেন, সেখানে কোনো দুশ্চিন্তা থাকতে পারে না। এই স্তরে এসে বান্দার প্রাণ মাছের প্রাণের মতো হয়ে যাবে। মাছ যেমন পানি ছাড়া থাকতে পারে না, সেও থাকতে পারবে না আল্লাহর সঙ্গ ব্যতীত।
আল্লাহ তাআলার সাথে এমন দৃঢ় ভালোবাসার বন্ধন তৈরি হলে তার দুনিয়ার প্রয়োজনও আল্লাহ পুরো করে দেবেন। সেই হাদীসেই তো আছে, আল্লাহ বলেন, 'সে কিছু চাইলে আমি তা দান করবে। আশ্রয় চাইলে আশ্রয় দেব।' অর্থাৎ সে যেমন আমার সবকিছু মেনে নিয়েছে, আমিও তার সবকিছু কবুল করবে। দুই পক্ষের এই বোঝাপড়া হলে ফলাফল যা হবে তা অকল্পনীয়। এরকম বান্দাকে মৃত্যু দিতেই আল্লাহ তাআলা ইতস্তত বোধ করেন। এই বান্দা যা অপছন্দ করে, আল্লাহও তা অপছন্দ করেন। তাকে কষ্ট দিতে চান না, তাই মৃত্যুও দিতে চান না। কিন্তু মৃত্যু কষ্টদায়ক হলেও এই বান্দার জন্য মৃত্যু তো কল্যাণকর। মৃত্যু তার নতুন জীবনের সূচনা। যেমন এই বান্দাকে অসুস্থ করেন, সুস্থ করার জন্য। গরীব বানান, ধনী বানানোর জন্য। ইচ্ছা অপূর্ণ রাখেন, পরবর্তীতে পূরণ করার জন্য। এই মানুষদেরকে আল্লাহ তাআলা তাদের আদি পিতার ঔরশে থাকাকালে জান্নাত থেকে বের করে দিয়েছেন, আবার তাদের জান্নাতে ফিরিয়ে নেয়ার জন্যই। এটাই তো প্রকৃত ভালোবাসা, যার কোনো বিকল্প ও তুলনা নেই। এর বিপরীতে বান্দা যদি তার প্রতিটি পশমের সমপরিমাণ ভালোবাসা আল্লাহকে দেয়, তাও তো খুবই সামান্য।
টিকাঃ
[২] হাফিয ইরাকীর মতে, এ হাদীসের কোনো সূত্র পাওয়া যায় না।-আল-মুগনী-৩/২২
[৩] বুখারী, হাদীস-ক্রম: ৭৫০৪
[১] সূরা আনকাবুত, আয়াত-ক্রম: ৫
[২] সূরা নাহল, আয়াত-ক্রম: ৯৭
[১] বুখারী, হাদীস-ক্রম: ৬৫০২
[১] মুসনাদু আহমাদ, হাদীস-ক্রম: ১০৯৭৬
[২] সূরা তাওবাহ, আয়াত-ক্রম: ৪০
[৩] বুখারী, হাদীস-ক্রম: ৩৬৫৩
[১] সূরা আনকাবূত, আয়াত-ক্রম: ৬৯
[২] সূরা নাহল, আয়াত-ক্রম: ১২৮
[৩] সূরা আনফাল, আয়াত-ক্রম: ৪৬
[৪] সূরা শুআরা, আয়াত-ক্রম: ৬২
[৫] সূরা তহা, আয়াত-ক্রম: ৪৬
📄 প্রেমের সর্বশেষ স্তর
প্রেমের সর্বশেষ স্তর হলো, নিজেকে প্রেমাষ্পদের আনুগত্যে সঁপে দেওয়া। অর্থাৎ প্রেমাস্পদের দাসানুদাসে পরিণত হওয়া। এ স্তরকে التيمم و التعبد (তাআব্বুদ ও তায়াম্মুম) শব্দে প্রকাশ করা হয়েছে। এখান থেকেই সরল পথকে বলা হয় طریق معبد। বান্দাকে 'আবদ' বলা হয়, কারণ, প্রেম তার ইবাদাতের পথকে সহজ করে দিয়েছে।
আল্লাহ পাক নানা স্থানে তাঁর প্রিয়তম রাসূলকে 'আবদ' তথা বান্দা শব্দে প্রকাশ করেছেন। যেমন: আল্লাহ তাআলা বলেন-
وَإِنْ كُنْتُمْ فِي رَيْبٍ مِمَّا نَزَّلْنَا عَلَى عَبْدِنَا فَأْتُوا بِسُورَةٍ مِنْ مِثْلِهِ
'আমি আমার 'আবদ' বা বান্দার উপর যা অবতীর্ণ করেছি, তাতে যদি তোমাদের সংশয় থাকে, তবে অনুরূপ একটি সূরা নিয়ে আসো। [১]
এ ছাড়াও শাফাআতের হাদীসে আছে, 'তোমরা বান্দা মুহাম্মদের নিকট যাও, তার পূর্বাপর সকল গুনাহ মাফ করা হয়েছে।'
টিকাঃ
[১] সূরা বাকারা, আয়াত-ক্রম: ২৩