📄 সমকামিতার শাস্তি
সমকামিতা যেহেতু সামাজিক ভারসাম্যের জন্য হুমকিস্বরূপ এবং চূড়ান্ত নৈতিক অবক্ষয়, তাই এই জঘন্যতম অপরাধ দমন ও নির্মূলে শরীয়তও কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে। সমকামিতার অপরাধে লিপ্ত ব্যক্তির জন্য প্রণয়ন করেছে কঠোর শাস্তির বিধান।
আবু বকর, আলী, খালিদ ইবনুল ওয়ালীদ, আবদুল্লাহ ইবনুয যুবায়ের, আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস, জাবির ইবনু যায়েদ, আবদুল্লাহ ইবনু মা'মার—প্রমুখ সাহাবী রাদিয়াল্লাহু আনহুম আজমাঈন এবং ইমাম যুহরী, রবীআহ ইবনু আবি আবদির রহমান, ইমাম মালিক, ইসহাক ইবনু রাহুয়াই, ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বাল প্রমুখ আলিমের নিকট সমকামিতার শাস্তি ব্যভিচারের শাস্তির চেয়েও কঠোর। সমকামী পুরুষ বা নারী—বিবাহিত হোক বা অবিবাহিত—সর্বাবস্থায় তাকে হত্যা করা হবে।
আতা ইবনু আবী রাবাহ, হাসান বসরী, সাঈদ ইবনুল মুসাইয়্যিব, ইবরাহীম আন নাখায়ী, কাতাদাহ, ইমাম আওযায়ী, ইমাম আবু ইউসুফ, ইমাম মুহাম্মদ, ইমাম আহমদের এক মত এবং ইমাম শাফিয়ী'র মাযহাবের প্রচলিত মত অনুযায়ী সমকামিতা আর ব্যভিচারের শাস্তি সমপর্যায়ের।
আর ইমাম আবু হানিফা, হাকিম প্রমুখ আলিম বলেন, সমকামিতার শাস্তি যিনার চেয়ে কম গুরুতর। যিনার ব্যাপারে শরীয়ত কর্তৃক নির্ধারিত শাস্তি রয়েছে। আর সমকামিতার ব্যাপারে যেহেতু নবীজি থেকে সুনির্ধারিত কোনো শাস্তি বর্ণিত হয়নি, তাই এর শাস্তি ব্যভিচারের চেয়ে তুলনামূলক কম হবে। এক্ষেত্রে অপরাধীকে সামাজিকভাবে তীব্র নিন্দা ও ভর্ৎসনা করা হবে। মানবদেহের যে অঙ্গের মাধ্যমে সমকামিতার অপরাধ করা হয়, সেই অঙ্গের প্রতি মানুষের স্বভাবজাতই ঘৃণা ও অরুচি থাকে। বিকৃত রুচির মানুষের পক্ষেই কেবল সম্ভব এমন কুরুচিপূর্ণ কাজে লিপ্ত হওয়া। এজন্যই এই অপরাধের জন্য কোনো নির্ধারিত শাস্তি রাখা হয়নি।
📄 সমকামিতার অপরাধে হত্যার বিধান
ইতিহাসের কিতাবে খালিদ ইবনুল ওয়ালীদের প্রসিদ্ধ ঘটনা বিবৃত আছে। তিনি একবার জানতে পারলেন, আরবের কিছু পুরুষ একজন আরেকজনকে বিয়ে করছে। এমন ন্যাক্কারজনক ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে তিনি খলীফাতুল মুসলিমীন আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু'র নিকট পরামর্শ চেয়ে চিঠি লিখেন। আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু তখন উপস্থিত সাহাবীদের সাথে পরামর্শ করলেন। আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু অত্যন্ত কঠোর ভাষায় বললেন, 'এমন গর্হিত কাজ পৃথিবীর ইতিহাসে একটি সম্প্রদায়ই করেছে। আর মহান আল্লাহ তাদেরকে এরজন্য যে শাস্তি দিয়েছেন, তা আমাদের সকলের জানা আছে। আমি মনে করি, এখনো যারা এ কাজ করছে, তাদেরকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করা উচিত।' তখন আবু বকর তাদেরকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করার নির্দেশনা দিয়ে চিঠি লিখলে খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ তা বাস্তবায়ন করেন। সমকামিতার শাস্তি হিসেবে তাদেরকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়।
আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, 'সমকামীকে এলাকার সবেচেয়ে বড় প্রাসাদের উপর থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিতে হবে তার ঘৃণিত কাজের জন্য। এরপরও যদি সে বেঁচে থাকে, তাহলে পাথর নিক্ষেপ করে হত্যা করা হবে।'
ইবনু আব্বাস নবীজি সূত্রে বর্ণনা করেন-
مَنْ وَجَدْتُمُوهُ يَعْمَلُ عَمَلَ قَوْمِ لُوطٍ، فَاقْتُلُوا الْفَاعِلَ وَالْمَفْعُولَ بِهِ
'তোমরা যদি কাউকে লূত সম্প্রদায়ের মন্দ স্বভাবের কাজ করতে দেখো, তবে এ কাজে লিপ্ত উভয়কেই হত্যা করে ফেলো।'[১]
নবীজি সূত্রে আরও বর্ণিত আছে-
لَعَنَ اللَّهُ مَنْ عَمِلَ عَمَلَ قَوْمٍ لُوطٍ، لَعَنَ اللَّهُ مَنْ عَمِلَ عَمَلَ قَوْمٍ لُوطٍ، لَعَنَ اللَّهُ مَنْ عَمِلَ عَمَلَ قَوْمٍ لُوطٍ
'যে ব্যক্তি লূত সম্প্রদায়ের ঘৃণিত কাজ করবে, আল্লাহ তাআলার লানত আরোপিত হোক তার উপর! যে ব্যক্তি লূত সম্প্রদায়ের ঘৃণিত কাজ করবে, আল্লাহ তাআলার লানত আরোপিত হোক তার উপর! যে ব্যক্তি লূত সম্প্রদায়ের ঘৃণিত কাজ করবে, আল্লাহ তাআলার লানত আরোপিত হোক তার উপর!'[১]
নবীজি ব্যভিচারের অপরাধীকেও তিনবার লানত করেননি, কিন্তু সমকামিতার অপরাধীকে তিন তিনবার করে আল্লাহ তাআলার লানতের বদদুআ করেছেন। এই হাদীস থেকে বোঝা যায়, বিবাহ-পরবর্তী যিনার চেয়েও জঘন্য অপরাধ হলো সমকামিতা। তাই এই অপরাধের শাস্তিও বিবাহ-পরবর্তী যিনার শাস্তির চেয়ে ভয়াবহ হওয়া উচিত।
লূত আলাইহিস সালামের সম্প্রদায় যখন সমকামিতায় লিপ্ত হয়ে গেল, তাদের নবীর কোনো বারণ তারা মনল না, তখন আল্লাহ তাআলা তাদেরকে পৃথিবীর ইতিহাসের স্মরণীয় শাস্তি আরোপ করলেন। তাদের সেই শাস্তির অভিশাপ পৃথিবী আজও বয়ে বেড়াচ্ছে। পবিত্র কুরআনে এই পাপিষ্ঠ সম্প্রদায়ের কথা, তাদের আযাবের প্রেক্ষাপট বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। এই পাপিষ্ঠ সম্প্রদায়ের কথা উল্লেখ করতে গিয়ে আল্লাহ তাআলা অত্যন্ত কঠোর ও ভীতিকর শব্দ ব্যবহার করেছেন। আরবী ভাষার দক্ষতাসম্পন্ন চোখে এই আয়াতগুলো তিলাওয়াত করলে এই নরাধম সম্প্রদায়ের শাস্তির ভয়াবহতা অনুভব করা যায়। কুরআনে কারীমে তাদের চূড়ান্ত ধ্বংসের ঘোষণা এভাবে বিবৃত হয়েছে-
فَلَمَّا جَاءَ أَمْرُنَا جَعَلْنَا عَالِيَهَا سَافِلَهَا وَأَمْطَرْنَا عَلَيْهَا حِجَارَةً مِنْ سِجِّيلٍ
'অতঃপর যখন আমার আদেশ চলে এল, তখন আমি তাদের ভূপৃষ্ঠের উপরিভাগকে নিচের দিকে উলটে দিলাম। আর তাদের উপর স্তরে স্তরে পাথরবৃষ্টি বর্ষণ করলাম।'[১]
টিকাঃ
[১] তিরমিযী, হাদীস-ক্রম: ১৪৫৬
[১] মুসনাদু আহমাদ, হাদীস-ক্রম: ২৯১৩
[১] সূরা হুদ, আয়াত-ক্রম: ৮২
📄 পশুসঙ্গমিতার শাস্তি
আমাদের এই পৃথিবীতে মানুষরূপী এমনও নিকৃষ্ট দোপায়ী জানোয়ার আছে, যারা পশুর সাথে তাদের কামভাব পূরণ করতে আগ্রহী হয়। তাদের বিবেক-বুদ্ধি এতটাই রোগাক্রান্ত যে, পশু প্রাণীকে দেখলেও তাদের যৌনক্ষুধা জেগে ওঠে। এধরনের নরাধমদের ক্ষেত্রে শরয়ী বিধি-বিধানে বিশেষজ্ঞ আলিমগণ তিন ধরনের শাস্তির কথা বলেছেন।
১. প্রথমেই কোনো শাস্তি আরোপ না করে তার মস্তিষ্কের সুস্থতা ও রুচির ভারসাম্যতা ফিরিয়ে আনার জন্য ধর্মীয় ও নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ যা ভালো মনে করেন, সেই পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন।
২. দ্বিতীয় মত হলো, তাদেরকে শাস্তির আওতাধীন করা হবে। এক্ষেত্রে তাদেরকে যিনা বা ব্যভিচারের হদ বা শাস্তি প্রয়োগ করা হবে।
৩. তৃতীয় মত হলো, সমকামিতার যেই শাস্তি রয়েছে, তাকেও শাস্তিই ভোগ করতে হবে। অর্থাৎ তাকেও সরাসরি হত্যা করতে হবে। সুনানু আবি দাউদে বর্ণিত আছে, নবীজি সূত্রে আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস বর্ণনা করেন, 'যে ব্যক্তি কোনো পশুর সাথে সঙ্গম করল, তাকে তোমরা হত্যা করো। তার সাথে সেই পশুটিকেও মেরে ফেলো।[২]
টিকাঃ
[২] আবু দাউদ, হাদীস-ক্রম: ৪৪৬৪
📄 নারী সমকামিতা
নারীদের মধ্যে সমকামিতার যে অসুস্থ প্রবণতা, তাও এক প্রকারের যিনা বা ব্যভিচার। নবীজি সূত্রে বর্ণিত আছে-
إِذَا أَتَتِ الْمَرْأَةُ الْمَرْأَةَ فَهُمَا زَانِيَتَانِ
‘কোনো নারী আরেক নারীর সাথে যৌনক্রিয়ায় লিপ্ত হলে, তারা উভয়েই ব্যভিচারিণী হিসেবে গণ্য হবে।'[১]
তবে যেহেতু তাদের এই কুরুচিপূর্ণ কাজ পুরোপুরি ব্যভিচারের অবস্থা নয়, তাই এই ঘৃণিত কাজে ব্যভিচারের শাস্তির মতো হদ বা শাস্তি আরোপিত হবে না। শাস্তি প্রয়োগের ক্ষেত্রে নারী-সমকামিতাকে ব্যভিচারের সাথে তুলনা করা ঠিক নয়।
টিকাঃ
[১] বাইহাকি, হাদীস-ক্রম: ১৭৪৯০