📄 দুই পায়ের গুনাহ
গুনাহের অন্যতম আরেকটি প্রবেশদ্বার হলো মানুষের দুই পা। দুই পায়ের গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার জন্য পায়ের প্রতিটি কদমকে কেবল আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যেই ব্যবহার করা উচিত। এমন কোনো কাজের দিকে পা বাড়ানো উচিত নয়, যেখানে সওয়াবের আশা করা যায় না। সওয়াবের আশা নেই—এমন স্থানের দিকে পা বাড়ানোর চেয়ে বসে থাকা ভালো। কেননা এতে সে আল্লাহ তাআলার নাফরমানি থেকে মুক্ত থাকতে পারে। মানুষ যদি তার প্রতিটি বৈধ ও হালাল পদক্ষেপে আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি ও সওয়াবের আশা করে এবং সেই নিয়তেই সে পা বাড়ায়, তবে তার জন্য জীবনের প্রতিটি হালাল ও বৈধ পদক্ষেপেই সওয়াব অর্জন করা সম্ভব।
সাধারণত মানুষের জীবনের স্খলন দুইভাবে হয়ে থাকে। জিহ্বার দ্বারা আর পায়ের দ্বারা। আল্লাহ তাআলাও এই দুই অঙ্গের বর্ণনা একসাথে এনে ইরশাদ করেন—
وَعِبَادُ الرَّحْمَنِ الَّذِينَ يَمْشُونَ عَلَى الْأَرْضِ هَوْنًا وَإِذَا خَاطَبَهُمُ الْجَاهِلُونَ قَالُوا سَلَامًا
'রহমানের (বিশেষ) বান্দা তারাই, যারা পৃথিবীতে নম্রভাবে চলাফেরা করে এবং মূর্খ লোকেরা যখন তাদেরকে সম্বোধন করে কথা বলতে থাকে, তখন তারা তাদের উদ্দেশ্যে বলে, "সালাম"।'[১]
এই আয়াতে আল্লাহ তাআলার আস্থাভাজন বান্দাদের গুণাবলি হিসেবে অবিচলতার সাথে চলাফেরা ও কথাবার্তায় নিরাপদ ও পবিত্র থাকাকে একইসাথে চিহ্নিত করা হয়েছে।
টিকাঃ
[১] সূরা ফুরকান, আয়াত-ক্রম: ৬৩
📄 অশ্লীল কাজে হারাম মনে করা প্রতিটি বান্দার জন্য আবশ্যক
নবীজি ইরশাদ করেন—
تَعْجَبُونَ مِنْ غَيْرَةِ سَعْدٍ وَاللَّهِ لَأَنَا أَغْيَرُ مِنْهُ، وَاللَّهُ أَغْيَرُ مِنِّي، وَمِنْ أَجْلِ غَيْرَةِ اللَّهِ حَرَّمَ الْفَوَاحِشَ مَا ظَهَرَ مِنْهَا وَمَا بَطَنَ
'তোমরা সাদের আত্মপরিচয়বোধ দেখে আশ্চর্যবোধ করছ! অথচ তার চেয়েও বেশি ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন হলাম আমি। আর আমার চেয়ে বেশি আত্মপরিচয়বোধের অধিকারী হলেন আল্লাহ তাআলা। আর আল্লাহ তাআলার আত্মপরিচয়বোধ ও অহংবোধ থেকেই তিনি প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য সকল অশ্লীল কাজকে হারাম করেছেন।[১]
টিকাঃ
[১] বুখারী, হাদীস-ক্রম: ৬৮৪৬
📄 যিনা বা ব্যভিচারের শাস্তি
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একবার সূর্যগ্রহণের নামাযের পর একটি ভাষণ দেন। উক্ত ভাষণের একটি বাণী ছিল এরকম-
يَا أُمَّةَ مُحَمَّدٍ وَاللَّهِ مَا مِنْ أَحَدٍ أَغْيَرُ مِنْ اللَّهِ أَنْ يَزْنِيَ عَبْدُهُ أَوْ تَزْنِي أَمَتُهُ
'হে মুহাম্মদের উম্মত! আল্লাহর শপথ করে বলছি। আল্লাহর কোনো বান্দা বা বান্দী যখন ব্যভিচারে লিপ্ত হয়, তখন আল্লাহর আত্মসম্মানবোধ সবচেয়ে বেশি আঘাতপ্রাপ্ত হয়।[২]
সহীহ বুখারীর আরেকটি হাদীসে উল্লেখ রয়েছে, নবীজি ইরশাদ করেন-
لَا أَحَدَ أَغْيَرُ مِنَ اللَّهِ، مِنْ أَجْلِ ذَلِكَ حَرَّمَ الْفَوَاحِشَ مَا ظَهَرَ مِنْهَا وَمَا بَطَنَ، وَلَا أَحَدَ أَحَبُّ إِلَيْهِ الْعُذْرُ مِنَ اللَّهِ، مِنْ أَجْلِ ذَلِكَ أَرْسَلَ الرُّسُلَ مُبَشِّرِينَ وَمُنْذِرِينَ، وَلَا أَحَدَ أَحَبُّ إِلَيْهِ الْمَدْحُ مِنَ اللهِ، مِنْ أَجْلِ ذَلِكَ أَثْنَى عَلَى نَفْسِهِ
'আল্লাহ তাআলার মতো আত্মসম্মানবোধ-সম্পন্ন কেউ নেই। এই সম্মানের কারণেই তিনি প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য সকল অশ্লীলতা ও অন্যায়কে হারাম করেছেন। আল্লাহ তাআলার মতো করে কেউ ওযরগ্রহণ করতে ভালোবাসে না। এজন্যই তিনি তাঁর রাসূলদেরকে সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী হিসেবে প্রেরণ করেছেন। আল্লাহ তাআলার চেয়ে বেশি কেউ প্রশংসা ও বন্দনাস্তুতি পছন্দ করে না। আল্লাহ তাআলা নিজেই নিজের প্রশংসা করেছেন।'[১]
অন্য হাদীসে এসেছে-
أَكْثَرُ مَا يُدْخِلُ النَّاسَ النَّارَ الْفَمُ، وَالْفَرْجُ
'মুখ ও লজ্জাস্থানের কারণেই অধিকাংশ মানুষ জাহান্নামে যাবে।'[২]
লজ্জাস্থানের দ্বারা মানুষ যিনা-ব্যভিচারে লিপ্ত হয়। ব্যভিচারের শরয়ী দণ্ডবিধানের অধ্যায়ে যিনার খারাপ দিকগুলো তুলে ধরা হয়েছে। যিনাকারীর পরিবারে লজ্জার গ্লানি নেমে আসে। সমাজের বুকে তাদের মাথা নত হয়ে যায়। যিনা বা ব্যভিচারে যদি মহিলা গর্ভবতী হয়ে যায়, সাধারণত গর্ভপাতের মাধ্যমে সন্তান বিনষ্ট করে ফেলে। এক্ষেত্রে যিনাকারী মহিলা একইসাথে যিনা এবং মানবহত্যার মতো ভয়ংকর দুই অপরাধে লিপ্ত হয়। আর যিনার কারণে জন্ম নেয়া সন্তানকে যদি সুস্থভাবে প্রসবও করে, তাহলে যিনাকারী মহিলার পরিবারে এমন এক লোকের আগমন হয়, যে তাদের বংশের নয়, তাদের রক্ত-সম্পর্কের নয়। এ ছাড়া জন্ম নেয়া শিশুটিও পরিচয়-সংকটে ভুগতে থাকে সারাজীবন। এতগুলো মানুষের জীবনের করুণ পরিণতি কেবল একটি গুনাহের কারণেই সৃষ্টি হয়। একইসাথে যেই পুরুষ যিনা করে, সে তার বংশের ধারা নষ্ট করে দেয়। অন্যের পরিবারে অশান্তি বাঁধিয়ে দেয়। দুনিয়া ও আখিরাতের যাবতীয় অকল্যাণ আর অমঙ্গল তারা একত্রিত করে ফেলে ব্যভিচারের মাধ্যমে।
যিনার ক্ষতি শুধু বংশধারা আর পরিবারের গ্লানি ও লজ্জার অপদস্থতাই তৈরি করে না, বরং এর কারণে মানুষের হায়াত কমে যায়। দারিদ্রতা নেমে আসে জীবনে। মানুষের ক্রোধ আর আক্রোশ জন্ম নেয়। সমাজের দৃষ্টিতে ব্যভিচারে লিপ্ত ব্যক্তির চেহারায় চুনকালি পড়ে যায়। মানুষের ঘৃণা ও ধিক্কারে তার জীবনও সংকীর্ণ হয়ে যায়। তার হৃদয় মরে যায়, রোগাক্রান্ত হয়ে যায়। দুঃখ, দুর্দশা, হতাশা আর গ্লানিবোধ তার জীবনকে কুড়েকুড়ে খেতে থাকে। সে রহমতের ফিরিশতা থেকে দূরে ছিটকে পড়ে। শয়তানের নৈকট্য লাভ করে। এভাবেই সে গুনাহের কারণে জাগতিক সংসারের সবচেয়ে হতভাগা ব্যক্তিতে পরিণত হয়।
আর এই জগতে আল্লাহ তাআলার অবধারিত রীতি হলো, যিনা বা ব্যভিচারের সময় আল্লাহ তাআলার ক্রোধ প্রকাশ পায় এবং আক্রোশের মাত্রা তীব্র থেকে তীব্রতর হতে থাকে। আর আল্লাহ তাআলার ক্রোধের মাত্রা যখন বেড়ে যায়, তখন অনিবার্যভাবে এর ক্ষতিকর প্রভাব পৃথিবীতে প্রকাশ পায়।
আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ বলেন, 'যে জনপদে সুদ আর ব্যভিচার ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে, আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে সেই জনপদের ধ্বংস ঘোষণা করা হয়।'
আল্লাহ তাআলা বিবাহিত ব্যক্তির যিনার জন্য রজম বা পাথর মেরে হত্যা করার যেই দণ্ডবিধি প্রণয়ন করেছেন, সেখানে তিনটি বিশেষ দিক উল্লেখ্য।
১. পরকীয়ার শাস্তি হিসেবে আল্লাহ তাআলা কঠোরতার সাথে হত্যা করার বিধান আরোপ করেছেন। মাথায় পাথর নিক্ষেপ করে হত্যার বিধান আরোপ করেছেন। আর বিবাহপূর্ব ব্যভিচারের জন্য শরীরে বেত্রাঘাত করার আদেশ করেছেন।
২. ব্যভিচার বা পরকীয়ার দণ্ডবিধি প্রয়োগ করার ক্ষেত্রে কোনো প্রকারের করুণা, মার্জনা বা দয়াপ্রদর্শনের সুযোগ তিনি রাখেননি। এক্ষেত্রে করুণা প্রদর্শনের অর্থ হলো, আল্লাহ তাআলার আদেশ পালনে শিথিলতা বা আদেশ অমান্য করা। আল্লাহ তাআলা জগতের সর্বোচ্চ দয়ালু সত্তা হওয়ার পরেও তিনি নিজেই যখন এই দণ্ডবিধি প্রণয়ন করেছেন, সেখানে বান্দার জন্য এই শাস্তিকে লঘু করার কোনো সুযোগ নেই।
৩. আল্লাহ তাআলা ব্যভিচার বা পরকীয়ার শাস্তি প্রয়োগের জন্য গোপন কোনো স্থান বা জায়গার কথা বলেননি। বরং সমাজের সকলের জন্য শিক্ষা ও সতর্ককীরণ হিসেবে জনসমাগমে এই শাস্তি আরোপের বিধান জারি করেছেন। আর এই বিধান সমাজের চারিত্রিক ও নৈতিক অবক্ষয় রোধের সর্বোত্তম ব্যবস্থাপনা।
টিকাঃ
[২] বুখারী, হাদীস-ক্রম: ৫২২১
[১] বুখারী, হাদীস-ক্রম: ৪৬৩৪
[২] মুসনাদু আহমাদ, হাদীস-ক্রম: ৯৬৯৪
📄 সমকামিতার শাস্তি
সমকামিতা যেহেতু সামাজিক ভারসাম্যের জন্য হুমকিস্বরূপ এবং চূড়ান্ত নৈতিক অবক্ষয়, তাই এই জঘন্যতম অপরাধ দমন ও নির্মূলে শরীয়তও কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে। সমকামিতার অপরাধে লিপ্ত ব্যক্তির জন্য প্রণয়ন করেছে কঠোর শাস্তির বিধান।
আবু বকর, আলী, খালিদ ইবনুল ওয়ালীদ, আবদুল্লাহ ইবনুয যুবায়ের, আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস, জাবির ইবনু যায়েদ, আবদুল্লাহ ইবনু মা'মার—প্রমুখ সাহাবী রাদিয়াল্লাহু আনহুম আজমাঈন এবং ইমাম যুহরী, রবীআহ ইবনু আবি আবদির রহমান, ইমাম মালিক, ইসহাক ইবনু রাহুয়াই, ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বাল প্রমুখ আলিমের নিকট সমকামিতার শাস্তি ব্যভিচারের শাস্তির চেয়েও কঠোর। সমকামী পুরুষ বা নারী—বিবাহিত হোক বা অবিবাহিত—সর্বাবস্থায় তাকে হত্যা করা হবে।
আতা ইবনু আবী রাবাহ, হাসান বসরী, সাঈদ ইবনুল মুসাইয়্যিব, ইবরাহীম আন নাখায়ী, কাতাদাহ, ইমাম আওযায়ী, ইমাম আবু ইউসুফ, ইমাম মুহাম্মদ, ইমাম আহমদের এক মত এবং ইমাম শাফিয়ী'র মাযহাবের প্রচলিত মত অনুযায়ী সমকামিতা আর ব্যভিচারের শাস্তি সমপর্যায়ের।
আর ইমাম আবু হানিফা, হাকিম প্রমুখ আলিম বলেন, সমকামিতার শাস্তি যিনার চেয়ে কম গুরুতর। যিনার ব্যাপারে শরীয়ত কর্তৃক নির্ধারিত শাস্তি রয়েছে। আর সমকামিতার ব্যাপারে যেহেতু নবীজি থেকে সুনির্ধারিত কোনো শাস্তি বর্ণিত হয়নি, তাই এর শাস্তি ব্যভিচারের চেয়ে তুলনামূলক কম হবে। এক্ষেত্রে অপরাধীকে সামাজিকভাবে তীব্র নিন্দা ও ভর্ৎসনা করা হবে। মানবদেহের যে অঙ্গের মাধ্যমে সমকামিতার অপরাধ করা হয়, সেই অঙ্গের প্রতি মানুষের স্বভাবজাতই ঘৃণা ও অরুচি থাকে। বিকৃত রুচির মানুষের পক্ষেই কেবল সম্ভব এমন কুরুচিপূর্ণ কাজে লিপ্ত হওয়া। এজন্যই এই অপরাধের জন্য কোনো নির্ধারিত শাস্তি রাখা হয়নি।