📄 যেসকল ভাবনা আল্লাহর জন্য, তা পাঁচ প্রকার–
১. আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে অবতীর্ণ আয়াত নিয়ে চিন্তাভাবনা ও গবেষণা করা। আয়াতসমূহ গভীরভাবে উপলব্ধি করার চেষ্টা করা। কুরআন শুধুমাত্র তিলাওয়াতের জন্য অবতীর্ণ করা হয়েছে, এমন নয়। তিলাওয়াত হলো অনুধাবনের মাধ্যম। কোনো এক বুযুর্গের উক্তি-
أُنْزِلَ الْقُرْآنُ لِيُعْمَلَ بِهِ، فَاتَّخَذُوا تِلَاوَتَهُ عَمَلًا
'কুরআন অবতীর্ণ করা হয়েছে আমলের জন্য। অতএব তোমরা আমলের জন্য তিলাওয়াত করো।'
২. আমাদের চারপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা অসংখ্য কুদরতের দিকে লক্ষ করা। আল্লাহ তাআলা এভাবে খুঁজে বের করার আদেশ করেছেন। যারা উদাসীন থাকে, তাদেরকে নিন্দা করেছেন।
৩. আল্লাহ তাআলার দয়া ও অনুগ্রহ নিয়ে চিন্তাভাবনা করা। এ তিন ধরনের ভাবনা মানুষকে প্রতিনিয়ত আল্লাহর অনেক নিকটবর্তী করে দেয়। মানুষ আল্লাহর পরিচয় খুঁজে পায়। আল্লাহর ভালোবাসায় জীবন রঙিন হয়ে ওঠে।
৪. নিজের দোষত্রুটি নিয়ে চিন্তাভাবনা করা। এই ভাবনা মানুষকে ক্রমাগত একজন ভালো মানুষে পরিণত করে। বহুবিধ কল্যাণের দরজা খুলে দেয়। অসৎ প্রবৃত্তিকে দুর্বল করে ফেলে। এবং সৎ প্রবৃত্তি জাগ্রত করে।
৫. দৈনন্দিনের গুরুত্বপূর্ণ ওয়াজিব আমল ও ব্যক্তিগত ওযীফা সম্পর্কে চিন্তাভাবনা করা। এই চিন্তা প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যেতে থাকলে সময় অপচয়ের সম্ভাবনা কমে যায়। প্রতিটি সময়ই মূল্যবান সময় হয়ে ওঠে।
ইমাম শাফিয়ী বলেন-
'সূফীদের সান্নিধ্যে থেকে আমি দুটি বিষয় শিখেছি।
এক. সময় একটি তরবারির মতো। যদি তুমি তাকে দিয়ে না কাটো, তবে সে নিজেই তোমাকে কাটতে থাকবে।
দুই. যদি তুমি তোমার অন্তরকে সৎকাজে লিপ্ত না রাখো, তবে সে তোমাকে অসৎকাজে লিপ্ত করবে।'
বস্তুত সময়ের নামই জীবন। আমরা যে সময়গুলো অতিবাহিত করি, তা-ই আমাদের জীবন। এর বাইরে জীবন বলে আলাদা কিছু নেই। সময়ের ধর্ম হলো, তা সব সময়ই খুব দ্রুত ছুটতে থাকে। দুনিয়ার সময়টুকু আখিরাতের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণের সময়। যদি কেউ সঠিক প্রস্তুতি গ্রহণে উৎসাহী না হয়, তবে যত দীর্ঘ জীবন সে লাভ করুক, তাতে কোনো ফায়দা নেই। তা সাধারণ পশুপাখির জীবনেরই অনুরূপ হবে।
উল্লিখিত পাঁচ প্রকারের চিন্তাভাবনা ছাড়া অন্য যেসকল ভাবনা মানুষের মস্তিষ্কে উদয় হয়, তা শয়তানের ধোঁকার ফলেই হয়। মস্তিষ্ক যতক্ষণ অলস থাকবে, ততক্ষণ ভাবনার উদয় ঘটতেই থাকবে। এবং তা দোষণীয় কিছু নয়। তবে মানুষ যখনই সচেতনভাবে ওই ভাবনায় তলিয়ে যেতে থাকবে তখনই তা দোষণীয় বলে বিবেচিত হবে।
মানুষের হৃদয় একটি সাদা কাগজের মতো। মস্তিষ্কের ভাবনা তাতে অংকিত হয়। মিথ্যা, ধোঁকা ও গুনাহের চিন্তাভাবনা করতে থাকলে কদাকার অসংখ্য দাগে সাদা পাতাটি ভরে ওঠে। পক্ষান্তরে ভালো চিন্তাও তার মাঝে সুন্দর প্রতিফলন ঘটায়। দৃষ্টিনন্দন রঙিন দাগে হৃদয় সুশোভিত হয়।
কবির উক্তি-
أَتَانِي هَوَاهَا قَبْلَ أَنْ أَعْرِفَ الْهَوَى ... فَصَادَفَ قَلْبًا فَارِعًا فَتَمَكَّنَا
'ভালোবাসা চেনার আগেই তার ভালোবাসা আমার কাছে আসল। এবং চিরদিনের জন্য আমার হৃদয়ে জায়গা করে নিল।'
মানুষের মাঝে দুইরকম চিন্তাভাবনারই সক্ষমতা রয়েছে। শুধু নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন। শয়তান মানুষকে ভালো চিন্তার কথা ভুলিয়ে রাখে। এবং খারাপ চিন্তা ঢুকিয়ে দেয়। খারাপ চিন্তার অস্তিত্ব এবং শয়তানের ধোঁকার ভয় আছে বলেই ভালো চিন্তার মূল্য রয়েছে। দুইদিকেই সমান চিন্তাভাবনার সুযোগ মানুষকে সকল সৃষ্টি-এমনকি ফিরিশতাদের চেয়েও মূল্যবান করে তুলেছে। মানুষ ইচ্ছাশক্তির বলে মুহূর্তেই সকল খারাপ চিন্তাকে দূর করে দিতে পারে। সবচেয়ে শক্তিশালী এবং পূর্ণাঙ্গ মানুষ সে ব্যক্তি, যে হৃদয়ে জাগ্রত হাজারো চিন্তার ভিড়ে শুধু ভালো চিন্তাগুলোকেই বেছে নেয়। অতিশয় দুর্বল এবং প্রবৃত্তির কাছে পরাজিত সে ব্যক্তি, যে কেবলই খারাপ চিন্তায় ডুবে থাকে।
ভালো চিন্তায় ডুবে থাকার সবচেয়ে প্রকৃষ্ট উদাহরণ হযরত উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু। তাঁর হৃদয়ে অসংখ্য ভাবনা ভিড় করে থাকত। তিনি একই সঙ্গে কয়েকটা ইবাদাতে মগ্ন হয়ে যেতে পারতেন। নামাযে দাঁড়িয়ে জিহাদের সৈন্যসারির বিন্যাস করতেন। একই সঙ্গে নামায ও জিহাদ-দুটোই এগিয়ে চলত। নামাযে মশগুল থেকেও সৈন্যবাহিনী পরিচালনা করতে পারতেন।
📄 জিহ্বার গুনাহ
জিহ্বা বান্দার গুনাহের অন্যতম প্রবেশদ্বার। জিহ্বা বা কথার গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার উপায় হলো, মুখ থেকে অনর্থক কোনো শব্দ উচ্চারণ না করা। বান্দা যদি জিহ্বার গুনাহ থেকে নিরাপদ থাকতে চায়, তাহলে সে প্রতিটি কথা বলার আগে সামান্য একটু ভেবে নেবে যে, এই কথায় আমার কোনো ফায়দা আছে কিনা?
যদি কথাটি অনর্থক হয়ে থাকে, তাহলে কথাটি বলা থেকে বিরত থাকবে। আর যদি অনর্থক না হয় তবুও সে চিন্তা করবে, আমার এই কথার কারণে এরচেয়েও উত্তম কিছু আমার হাতছাড়া হবে না তো! যদি মুখের এই কথার কারণে উত্তম কোনোকিছু হাতছাড়া হয়ে যায়, তাহলে সে এই কথা বলা থেকেও বিরত থাকবে।
কারো অন্তরের খবর জানার প্রয়োজন হলে তার মুখের কথাবার্তা, ভাবভঙ্গি খেয়াল করলেই তার মনের অবস্থা বোঝা যায়। মানুষ মুখের ভাষা দিয়েই তার মনের কথা প্রকাশ করে। ইমাম ইয়াহইয়া ইবনু মুয়ায বলেন, 'মানবাত্মা হলো ফুটন্ত ডেগচির মতো। এতে যা কিছুই রয়েছে ফুটতে থাকে। আর মানুষের জিহ্বা হলো সেই ডেগচির চামচ (যা দিয়ে ডেগচির ভেতরের জিনিস বের করে আনা হয়)।'
কেউ যখন কথা বলে, সেই কথার দিকে লক্ষ করলেই বোঝা যায় তার মনের অবস্থা। তার জিহ্বা যেন অন্তরের ফুটন্ত ডেগ থেকে টক, মিষ্টি, ঝাল-বিভিন্ন স্বাদের পসরা শ্রোতাদের সামনে তুলে ধরছে। ইমাম ইয়াহইয়া ইবনু মুয়াযের চমৎকার এই উদাহরণ থেকে বুঝে আসে, জিহ্বা বা মানুষের মুখের ভাষা হলো মানবাত্মার খাবারের মাধ্যম। চামচ দিয়ে ডেগচিতে যেভাবে বিভিন্ন খাবার রান্নার জন্য দেয়া হয়, জিহ্বা দিয়েও অন্তরের খোরাক জোগানো হয়। আনাস ﷴ সূত্রে বর্ণিত এক হাদীসে নবীজি ﷺ ইরশাদ করেছেন-
لَا يَسْتَقِيمُ إِيمَانُ عَبْدٍ حَتَّى يَسْتَقِيمَ قَلْبُهُ، وَلَا يَسْتَقِيمُ قَلْبُهُ حَتَّى يَسْتَقِيمَ لِسَانُهُ
'কারো ঈমান ততক্ষণ পর্যন্ত সুস্থির হবে না, যতক্ষণ তার অন্তর সুস্থির না হয়। আর তার অন্তর ততক্ষণ পর্যন্ত স্থির হবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত তার ভাষা সংযত না হয়।' [১]
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞেস করা হলো, 'কোন জিনিস অধিকাংশ মানুষকে জাহান্নামে নিয়ে যাবে?' নবীজি উত্তর দিলেন, 'মুখ ও লজ্জাস্থান।' [১]
মুয়ায নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট জান্নাতে প্রবেশ ও জাহান্নাম থেকে মুক্তির আমলের কথা জানতে চাইলেন। নবীজি এ ব্যাপারে মৌলিক কিছু কথা বলে তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, 'আমি কি তোমাকে এই যাবতীয় আমলকে একত্রিতকারী বিষয়ের ব্যাপারে বলে দেব না?'
মুয়ায বললেন, 'অবশ্যই বলে দিন, আল্লাহর রাসূল!' নবীজি তখন নিজের জিহ্বা মুবারক ধরে বললেন, 'এই অঙ্গকে নিয়ন্ত্রণে রাখো!'
মুয়ায অবাক হয়ে জানতে চাইলেন, 'আমাদের কথাবার্তার জন্যও কি আমাদেরকে জিজ্ঞাসা করা হবে?'
নবীজি বললেন, 'মানুষ তার মুখের কর্তিত ফসলের কারণেই তো জাহান্নামে হোঁচট খেয়ে মুখ বা থুবড়ে পড়বে। [২]
মানুষের কিছু কিছু আচরণ খুবই অদ্ভুত! স্বাভাবিকভাবে একজন মানুষের জন্য হারাম খাদ্য গ্রহণ, জুলুম, নির্যাতন, ব্যভিচার, চুরি, মদপান, পরনারীর দিকে তাকানো-ইত্যাদি হারাম কাজ থেকে বেঁচে থাকা অনেকটাই সহজ। কিন্তু তার জন্য জিহ্বাকে বিরত রাখা খুবই কঠিন হয়ে যায়! সমাজে এমন অনেক মানুষই আছে, যাদের ধর্মপালন, দুনিয়া বিমুখতা, ইবাদাত বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য; অথচ সে অবলীলায় মুখ দিয়ে এমন সব কথা বলছে, যা আল্লাহ তাআলার ক্রোধ টেনে আনে। এদিকে সে কোনো ভ্রুক্ষেপই করে না। মুখনিসৃত একটি কথার কারণে তার মান ও মর্যাদা পূর্ব থেকে পশ্চিমের দূরত্বের মতো নীচে নেমে যায়। এমন অনেক লোককেই দেখা যায়, যারা হারাম ও অশ্লীল কাজ থেকে অত্যন্ত সতর্কভাবে নিজেকে নিষ্কলুষ রাখে, কিন্তু তার লাগামহীন কথাবার্তা জীবিত ও মৃত কোনো মানুষকেই ছেড়ে কথা বলে না, সবার মান-সম্মান সে মাটিতে মিশিয়ে দেয় মুখের কথা দিয়ে।
উপরের কথাটির উজ্জ্বল দৃষ্টান্তের একটি হাদীস আছে। জুনদুব ইবনু আবদিল্লাহ সূত্রে বর্ণিত, নবীজি বলেন, 'একজন ব্যক্তি আল্লাহ তাআলার নামে কসম খেয়ে বলল, "আল্লাহর কসম! আল্লাহ তাআলা অমুক ব্যক্তিকে কিছুতেই মাফ করবেন না!" আল্লাহ তাআলা তার এই কথা শুনে উত্তর দিলেন, "কে আমার নামে কসম করে বলল, আমি অমুককে ক্ষমা করব না? যাও, আমি তাকেই ক্ষমা করে দিলাম, আর তুমি যে কসম কেটে বললে, আমি ক্ষমা করব না, তোমার সমস্ত আমল আমি বরবাদ করে দিলাম।" [১]
আবু হুরায়রা অনুরূপ একটি হাদীস বর্ণনা করে বলেন, 'সে একটি কথায় তার দুনিয়া ও আখিরাতকে নষ্ট করে দিলো।'
বিলাল ইবনুল হারিস আল মুযানী নবীজি সূত্রে বর্ণনা করেন-
إِنَّ أَحَدَكُمْ لَيَتَكَلَّمُ بِالْكَلِمَةِ مِنْ رِضْوَانِ اللَّهِ مَا يَظُنُّ أَنْ تَبْلُغَ مَا بَلَغَتْ، فَيَكْتُبُ اللَّهُ لَهُ بِهَا رِضْوَانَهُ إِلَى يَوْمِ يَلْقَاهُ، وَإِنَّ أَحَدَكُمْ لَيَتَكَلَّمُ بِالْكَلِمَةِ مِنْ سَخَطِ اللَّهِ مَا يَظُنُّ أَنْ تَبْلُغَ مَا بَلَغَتْ، فَيَكْتُبُ اللَّهُ لَهُ بِهَا سَخَطَهُ إِلَى يَوْمِ يَلْقَاهُ
'তোমাদের কেউ কেউ আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি অর্জনে এমন সব কথা বলে থাকে, তার ধারণাও থাকে না সে আল্লাহ তাআলার কি পরিমাণ সন্তুষ্টি লাভ করেছে। আবার তোমাদের কেউ কেউ এমন কথা বলে ফেলে তার মুখ দিয়ে, সে ধারণাও করতে পারে না, তার কথার কারণে কি পরিমাণ ক্রোধ সে লাভ করেছে আল্লাহ তাআলার কাছ থেকে।' [২]
আলকামাহ বলেন, 'এই হাদীস আমাকে অসংখ্য কথা বলতে বাধা দিয়েছে।'
এক সাহাবীর ইন্তিকাল হলে জনৈক ব্যক্তি ওই সাহাবীকে উদ্দেশ্য করে বললেন, 'আপনার জন্য জান্নাতের সুসংবাদ থাকল।' তখন নবীজি বললেন-
وَمَا يُدْرِيكَ؟ لَعَلَّهُ تَكَلَّمَ فِيمَا لَا يَعْنِيهِ، أَوْ بَخِلَ بِمَا لَا يُنْقِصُهُ
'তুমি কীভাবে এ ব্যাপারে অবগত হলে? সে হয়তো এমন কোনো কথা বলেছে, যে কথায় তার কোনো উপকার নেই অথবা সম্পত্তির কোনো ক্ষতি ছাড়াই সে কোনো কার্পণ্য করেছে।[১]
আবু হুরায়রা নবীজি সূত্রে সরাসরি বর্ণনা করেন-
مَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ، فَلْيَقُلْ خَيْرًا أَوْ لِيَصْمُتْ
'যে ব্যক্তি আল্লাহ তাআলার উপর ও কিয়ামত দিবসের উপর বিশ্বাস রাখে, সে যেন ভালো কথা বলে অথবা চুপ থাকে।'[২]
আবু হুরায়রাহ সূত্রে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আরেকটি হাদীস-
مِنْ حُسْنِ إِسْلَامِ الْمَرْءِ تَرْكُهُ مَا لَا يَعْنِيهِ
'একজন ব্যক্তির ইসলামের সৌন্দর্য হলো, সে যাবতীয় অনর্থক কাজ ও কথাকে পরিহার করে চলে।'[৩]
সুফিয়ান ইবনু আবদিল্লাহ আস-সাকাফী বলেন, 'একবার আমি নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বললাম, "আল্লাহর নবী! আপনি আমাকে ইসলামের এমন একটি কথা বলে দিন, যে ব্যাপারে আমি আপনার পরে আর কারো নিকট জানতে চাইব না।" নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, "তুমি বলো, 'আমি আল্লাহ তাআলার উপর ঈমান আনলাম', এরপর এই কথায় অবিচল থাকো।" আমি তখন তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম, "আমার ব্যাপারে আপনি সর্বাধিক কোন জিনিসের আশঙ্কাবোধ করেন?” তিনি তাঁর জিহ্বা মুবারক ধরে বললেন, "এই জিনিসের।”'[৪]
মানুষকে কথাবার্তার ব্যাপারে সতর্ক করতে আরো শক্ত হাদীসও সুন্নাহতে বর্ণিত হয়েছে। রাসূলের পবিত্রতমা স্ত্রী উম্মু হাবীবাহ রাসূল সূত্রে বর্ণনা করেন-
كُلُّ كَلَامِ ابْنِ آدَمَ عَلَيْهِ لَا لَهُ إِلَّا أَمْرًا بِمَعْرُوفٍ أَوْ نَهْيًا عَنْ مُنْكَرٍ، أَوْ ذِكْرَ اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ
'আদম সন্তানের প্রতিটি কথাই তার বিরুদ্ধে যায়। শুধুমাত্র যে কথা দিয়ে সে সৎ কাজের আদেশ করে, অসৎ কাজের নিষেধ করে আর যে কথা দ্বারা সে তার রবের স্মরণ করে থাকে, সেগুলো ছাড়া।[১]
আরেকটি হাদীসে বর্ণিত হয়েছে-
إِذَا أَصْبَحَ الْعَبْدُ، فَإِنَّ الْأَعْضَاءَ كُلَّهَا تُكَفِّرُ النِّسَانَ، تَقُولُ: اتَّقِ اللَّهَ فِينَا فَإِنَّمَا نَحْنُ بِكَ، فَإِذَا اسْتَقَمْتَ اسْتَقَمْنَا، وَإِنِ اعْوَجَجْتَ اعْوَجَجْنَا
'প্রতিদিন সকালে মানুষের সমস্ত অঙ্গ জিহ্বাকে সতর্ক করে। বলে, "তুমি আল্লাহকে ভয় করো। আমরা তোমারই অনুগত। তুমি ঠিক থাকলে আমরাও ঠিক থাকব, আর তুমি বক্র পথে চলে গেলে আমরাও পথচ্যুত হব।"[২]
আগেকার যামানার নেককার বুযুর্গ ব্যক্তিদের ব্যাপারে জানা যায়, 'আজকে গরম পড়েছে খুব' 'আজকে ঠান্ডা পড়েছে'- এমন কথাগুলোও তাঁরা হিসাব করে রাখতেন।
একজন বুযুর্গ ব্যক্তির মৃত্যুর পর তাঁকে কেউ একজন স্বপ্নে দেখে তাঁর মৃত্যু-পরবর্তী অবস্থা জানতে চাইলেন। তিনি বললেন, 'আমি অপেক্ষা করছি। একটি কথার কারণে আমি আটকে গেছি। কথাটি হলো, একদিন বলেছিলাম, “মানুষের আজ বৃষ্টির কী দরকার ছিল!” এই কথার জেরে এখন আমাকে বলা হয়েছে, “তুমি কি জানো, কেন এমন কথা বলেছিলে? আমার বান্দার ব্যাপারে আমিই সবচেয়ে ভালো জানি।”
জিহ্বা মানুষের ব্যবহারের সবচেয়ে সহজ অঙ্গ। আবার জিহ্বাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করে।
মানুষের মুখে উচ্চারিত সকল কথাই লিখে রাখা হয়, নাকি শুধু ভালো আর খারাপ কথাগুলো লিখে রাখা হয়—এ ব্যাপারে উলামায়ে কেরাম গবেষণা করে একেকজন একেক মতামত তুলে ধরেছেন। তবে মানুষের সকল কথাই তার আমলনামায় লিখে রাখা হয়—এই মতটিই বেশি প্রচলিত ও প্রসিদ্ধ।
পূর্বসূরি এক আলিম বলেছেন, 'মানুষের সকল কথাই তার বিরুদ্ধে থাকবে। শুধু যেই কথাগুলো সে আল্লাহ তাআলার স্মরণে বা আল্লাহর স্মরণের সহায়ক হিসেবে বলেছে—সেগুলোই তার পক্ষে সাফাই গাইবে।'
আবু বকর সিদ্দিক রা. নিজের জিহ্বাকে ধরে বলতেন, 'আমার এই অঙ্গটি আমাকে বিভিন্ন ঘাটে নিয়ে যায়।'
মানুষের কথা মূলত মানুষকে নিজের পরিণতিতে আটকে ফেলে। যখনই কারো মুখ থেকে কোনো কথা উচ্চারিত হয়, সে ব্যক্তি সেই কথায় আটকে যায়। মানুষের প্রতিটি কথার সাথেই আল্লাহ তাআলার উপস্থিতি বিদ্যমান থাকে। ইরশাদ হচ্ছে—
مَا يَلْفِظُ مِنْ قَوْلٍ إِلَّا لَدَيْهِ رَقِيبٌ عَتِيدٌ
'সে যে কথাই মুখে উচ্চারণ করে, তা গ্রহণ করার জন্য রয়েছে সদা প্রস্তুত প্রহরী।' [১]
টিকাঃ
[১] মুসনাদু আহমাদ, হাদীস-ক্রম: ১৩০৪৮
[১] তিরমিযী, হাদীস-ক্রম: ২০০৪
[২] মুসনাদু আহমাদ, হাদীস-ক্রম: ২২০৬৩
[১] মুসলিম, হাদীস-ক্রম: ২৬২১
[২] তিরমিযী, হাদীস-ক্রম: ২৩১৯
[১] তিরমিযী, হাদীস-ক্রম: ২৩১৯
[২] বুখারী, হাদীস-ক্রম: ৬০১৮
[৩] মুসনাদু আহমাদ, হাদীস-ক্রম: ১৭৩৭
[৪] মুসলিম, হাদীস-ক্রম: ৩৮
[১] তিরমিযী, হাদীস-ক্রম: ২৪১২
[২] মুসনাদু আহমাদ, হাদীস-ক্রম: ১১৯০৮
[১] সূরা কাফ, আয়াত-ক্রম : ১৮
📄 জিহ্বার দুটি বড় বিপদ
মানুষ তার জিহ্বার কারণে দুটি বিপদের কোনো একটির শঙ্কায় থাকে। একটি থেকে মুক্তি লাভ করলে অপরটি তার সামনে চলে আসে।
১. কথার বিপদ।
২. চুপ করে থাকার বিপদ।
সময় আর পরিস্থিতির বিবেচনায় একটি অপরটি থেকে বিপজ্জনক হয়ে থাকে মানুষের জন্য।
যে ব্যক্তি উচিত কথা না বলে চুপ করে থাকে, সত্য বলা থেকে বিরত থাকে, আর এই চুপ করে থাকার পেছনে তার নিজের কোনো ক্ষতিও নেই, তাহলে সে হলো মূক বা বোবা-শয়তান; আল্লাহ তাআলার অবাধ্য। সে লৌকিকতা প্রদর্শনকারী এবং বাতিলের চাটুকার হিসেবে বিবেচিত।
আবার যে ব্যক্তি চুপ তো থাকেই না, উল্টো আরো মিথ্যা ও বাতিল কথা বলে, সে হলো শয়তানের মুখপাত্র; আল্লাহ তাআলার নাফরমান।
জগতের অধিকাংশ মানুষই চুপ করে থাকার ক্ষেত্রে এবং কথা বলার ক্ষেত্রে মধ্যমপন্থা অবলম্বন করতে ব্যর্থ হয়। তবে আল্লাহ তাআলা যাদেরকে সরল-সঠিক পথে রেখেছেন, তারা নিজেদেরকে মিথ্যা ও ভ্রান্ত কথা থেকে বিরত রাখে। পরকালের জন্য উপকারী কথাগুলোই তারা শুধু বলে। এই শ্রেণির সৌভাগ্যবান লোকদেরকে আপনি অনর্থক কথা বলে সময় নষ্ট করতে দেখবেন না। তাদের থেকে এমন কথা আপনি শুনতে পাবেন না, যার কারণে তাদের আখিরাত ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
কিয়ামতের দিন এমন অনেক লোকই থাকবে, যারা তাদের জীবনের নেক কাজগুলো নিয়ে আল্লাহ তাআলার দরবারে উপস্থিত হবে, পাহাড় সমতুল্য হবে তাদের নেক কাজের পরিমাণ, অথচ এত বিপুল নেক কাজ তাদের কোনো কাজে আসবে না। তাদের মুখের উচ্চারিত কথা সকল নেককাজকে নিঃশেষ করে দেবে। জীবনের যেসমস্ত কথা দিয়ে তারা কোনো মানুষের হক নষ্ট করেছে, বা আল্লাহ তাআলার হক নষ্ট করেছে—এ সকল কথার কারণে পাহাড় পরিমাণ নেক আমলও তাদের কোনো উপকারে আসবে না।
আবার অনেক মানুষই আল্লাহ তাআলার দরবারে উপস্থিত হবে আর তাদের আমলনামায় থাকবে পাহাড-পরিমাণ মন্দ কাজের তালিকা। তবুও তারা মুক্তি পেয়ে যাবে। তাদের মুখের কথা, মহান রবের স্মরণে উচ্চারিত জিহা তাদের সকল খারাপ কাজকে দূর করে দেবে। জিহার সৎ ও সঠিক ব্যবহারের কারণে বিচার দিবসে তারা গুনাহমুক্ত হিসেবে নিজেকে আবিষ্কার করবে।
📄 দুই পায়ের গুনাহ
গুনাহের অন্যতম আরেকটি প্রবেশদ্বার হলো মানুষের দুই পা। দুই পায়ের গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার জন্য পায়ের প্রতিটি কদমকে কেবল আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যেই ব্যবহার করা উচিত। এমন কোনো কাজের দিকে পা বাড়ানো উচিত নয়, যেখানে সওয়াবের আশা করা যায় না। সওয়াবের আশা নেই—এমন স্থানের দিকে পা বাড়ানোর চেয়ে বসে থাকা ভালো। কেননা এতে সে আল্লাহ তাআলার নাফরমানি থেকে মুক্ত থাকতে পারে। মানুষ যদি তার প্রতিটি বৈধ ও হালাল পদক্ষেপে আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি ও সওয়াবের আশা করে এবং সেই নিয়তেই সে পা বাড়ায়, তবে তার জন্য জীবনের প্রতিটি হালাল ও বৈধ পদক্ষেপেই সওয়াব অর্জন করা সম্ভব।
সাধারণত মানুষের জীবনের স্খলন দুইভাবে হয়ে থাকে। জিহ্বার দ্বারা আর পায়ের দ্বারা। আল্লাহ তাআলাও এই দুই অঙ্গের বর্ণনা একসাথে এনে ইরশাদ করেন—
وَعِبَادُ الرَّحْمَنِ الَّذِينَ يَمْشُونَ عَلَى الْأَرْضِ هَوْنًا وَإِذَا خَاطَبَهُمُ الْجَاهِلُونَ قَالُوا سَلَامًا
'রহমানের (বিশেষ) বান্দা তারাই, যারা পৃথিবীতে নম্রভাবে চলাফেরা করে এবং মূর্খ লোকেরা যখন তাদেরকে সম্বোধন করে কথা বলতে থাকে, তখন তারা তাদের উদ্দেশ্যে বলে, "সালাম"।'[১]
এই আয়াতে আল্লাহ তাআলার আস্থাভাজন বান্দাদের গুণাবলি হিসেবে অবিচলতার সাথে চলাফেরা ও কথাবার্তায় নিরাপদ ও পবিত্র থাকাকে একইসাথে চিহ্নিত করা হয়েছে।
টিকাঃ
[১] সূরা ফুরকান, আয়াত-ক্রম: ৬৩