📄 দৃষ্টির গুনাহ
প্রথম পথ হলো, দৃষ্টি। যে ব্যক্তি তার চোখকে লাগামহীন করে দেয়, নিঃসন্দেহে সে চোখ একদিন তাকে ধ্বংস করে দেবে। রাসূল ﷺ ইরশাদ করেন-
لَا تُتَّبِعِ النَّظْرَةَ النَّظْرَةَ، فَإِنَّمَا لَكَ الْأُولَى وَلَيْسَتْ لَكَ الْأُخْرَى
'হে আলী! বারবার দৃষ্টি নিক্ষেপ কোরো না। কেননা প্রথমবার তোমার জন্য মাফ। কিন্তু দ্বিতীয়বার মাফ নয়।'[১]
রাসূল ﷺ আরও ইরশাদ করেন-
النَّظْرَةُ سَهُمُ مَسْمُومٌ مِنْ سِهَامٍ إِبْلِيسَ، فَمَنْ غَضَّ بَصَرَهُ عَنْ مَحَاسِنِ امْرَأَةٍ لِلَّهِ، أَوْرَثَ اللَّهُ قَلْبَهُ حَلَاوَةً إِلَى يَوْمِ يَلْقَاهُ
'অশ্লীল দৃষ্টিপাত ইবলিসের তির সমূহের মধ্য থেকে একটা বিষাক্ত তির। কোনো ব্যক্তি যদি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কোনো বেগানা নারীর ওপর দৃষ্টিপাত করা থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখে, আল্লাহ তাআলা তার হৃদয় কিয়ামত পর্যন্ত ইবাদাতের সুস্বাদে ভরিয়ে দেবেন।'[২]
নবীজি আদেশ করেছেন-
غُضُّوا أَبْصَارَكُمْ، وَاحْفَظُوا فُرُوجَكُمْ
'তোমরা দৃষ্টি অবনত রাখো এবং লজ্জাস্থানের হেফাজত করো।'[১]
রাসূল আরও ইরশাদ করেন-
إِيَّاكُمْ وَالْجُلُوسَ عَلَى الطُّرُقَاتِ
'রাস্তায় বসা থেকে বেঁচে থাকো।'
সাহাবীরা নিবেদন করলেন, 'আল্লাহর রাসূল! কখনো কখনো মজলিস বড় হয়ে রাস্তা পর্যন্ত চলে যায়। আমাদের রাস্তায় বসা ছাড়া উপায় থাকে না।' নবীজি বললেন, 'যদি বসতেই হয়, তাহলে রাস্তার হক আদায় করো।' সাহাবারা বললেন, 'রাস্তার হক কী?' নবীজি উত্তর দিলেন-
غَضُّ الْبَصَرِ وَكَفُّ الْأَذَى وَرَدُّ السَّلَامِ
'দৃষ্টি অবনত রাখা, কাউকে কষ্ট দেয়া থেকে বেঁচে থাকা, সালামের উত্তর দেয়া।'[২]
সব ধরনের গুনাহ থেকে বাঁচতে চোখের হেফাজত অত্যন্ত জরুরি বিষয়। চোখ-বাহিত অন্যায় চিন্তাগুলোই একসময় মানুষের হৃদয়ে এতটা সংক্রামক হয়ে ওঠে যে, পাপ কাজটি সংঘটিত হওয়ার আগ পর্যন্ত মানুষ স্থির হতে পারে না। কোনো এক দূরদর্শী বিদ্বান ব্যক্তি বলেছেন-
إِنَّ حَبْسَ اللَّحَظَاتِ أَيْسَرُ مِنْ دَوَامِ الْحَسَرَاتِ
'চক্ষু বন্ধ করার পরে যে যন্ত্রণা হবে, তা সহ্য করার চেয়ে আগে আগে চক্ষু বন্ধ করার কষ্ট সহ্য করা অনেক সহজ।'
অর্থাৎ গুনাহের ফলে মৃত্যুর পর যে শাস্তি হবে, এর চাইতে জীবিত অবস্থায় চক্ষু বন্ধ রেখে গুনাহমুক্ত থাকা অনেক সহজ। চোখ দিয়ে যখন কোনো পাপের ইচ্ছা মানুষের হৃদয়ে প্রবেশ করে, তখন ওই কাজটি করার জন্য প্রবৃত্তির চাপে মানুষ দিশেহারা হয়ে পড়ে। অতএব যেসব স্থানে পাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে, সেসব স্থানে মুমিনের কর্তব্য হলো নজরের হেফাজত করা।
কবি বলেন-
كُلُّ الْحَوَادِثِ مَبْدَاهَا مِنَ النَّظَرِ ... وَمُعْظَمُ النَّارِ مِنْ مُسْتَصْغَرِ الشَّرَرِ
كَمْ نَظْرَةٌ بَلَغَتْ فِي قَلْبِ صَاحِبِهَا ... كَمَبْلَغِ السَّهْمِ بَيْنَ الْقَوْسِ وَالْوَتَرِ
وَالْعَبْدُ مَا دَامَ ذَا طَرْفٍ يُقَلِّبُهُ ... فِي أَعْيُنِ الْعِينِ مَوْقُوفٌ عَلَى الْخَطَرِ
يَسُرُّ مُقْلَتَهُ مَا ضَرَّ مُهْجَتَهُ ... لَا مَرْحَبًا بِسُرُورٍ عَادَ بِالضَّرَرِ
'সকল পাপের শুরু চক্ষু থেকেই হয়। বড় বড় আগুন ছোট ছোট কয়লা থেকেই জ্বলে। চক্ষুষ্মানের হৃদয়ে কিছু দৃষ্টি এমনভাবে বিদ্ধ হয়, তৃণীর ছেড়ে যাওয়া তির লক্ষ্যস্থলে যেভাবে বিঁধে থাকে। মানুষ অপরের চোখে ক্রমাগত দৃষ্টিপাত করে হৃদয়ের কাছাকাছি পৌঁছে যায়। আত্মাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে চোখের সুখ কিনে নেয়-এমন সুখের জন্য কোনো অভিনন্দন নেই।'
চোখ মানুষকে একসময় বন্দী করে ফেলে। চোখের ওপর নিয়ন্ত্রণ না থাকলে মানুষ এমন এক দিনে গিয়ে উপনীত হয়, যখন চোখের দাসত্ব থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব হয় না। কবি বলেন-
يَا نَاظِرًا مَا أَقْلَعَتْ لَحَظَاتُهُ ... حَتَّى تَشَخَّطَ بَيْنَهُنَّ قَتِيلًا
'হে চক্ষুষ্মান! তোমার লোভাতুর দৃষ্টির অবসান সেদিনই হবে, যেদিন তুমি দৃষ্টিপাতের আক্ষেপে হা-হুতাশ করতে করতে মারা যাবে।'
অন্য একজন কবি বলেন-
مَلَّ السَّلَامَةَ فَاغْتَدَتْ لَحَظَاتُهُ ... وَقْفًا عَلَى طَلَلٍ يَظُنُّ جَمِيلًا
مَا زَالَ يُتْبِعُ إِثْرَهُ لَحَظَاتِهِ ... حَتَّى تَشَحَّطَ بَيْنَهُنَّ قَتِيلًا
‘একজন সুখী মানুষেরও সুখ নষ্ট হয়, যখন সে এমন একটি পাহাড় দেখতে পায়, যা তার কাছে বেশি সুন্দর মনে হয়। পাহাড় থেকে বিচ্যুত হয়ে অপমৃত্যু হওয়ার আগ পর্যন্ত সে তার বিগত দিনের সুখ বিসর্জন দিয়ে ছুটতে থাকে।’
দৃষ্টি এক বিস্ময়কর তির। যার দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করা হয়, তির সেদিকে না গিয়ে নিক্ষেপকারীর বুকেই বিদ্ধ হয়।
আমার নিজের লেখা দুটি চরণও এখানে উল্লেখ করছি-
يَا رَامِيًا بِسِهَامِ اللَّحْظِ مُجْتَهِدًا ... أَنْتَ الْقَتِيلُ بِمَا تَرْمِي فَلَا تُصِبٍ
يَا بَاعِثَ الطَّرْفِ يَرْتَادُ الشَّفَاءَ لَهُ ... احْبِسُ رَسُولَكَ لَا يَأْتِيكَ بِالْعَطَبِ
‘হে শক্তিমান তির-নিক্ষেপকারী! এই তিরে তুমিই মরবে। অতএব তুমি এমন কাজ করো না। হে উপশমের জন্য চক্ষুপ্রেরণকারী! তুমি তোমার দূতকে থামাও, যেন সে তোমার জন্য বিপদ ডেকে না আনে।’
এর চেয়েও ভয়াবহ বিষয় হলো, দৃষ্টি মানুষের হৃদয়কে বর্শার আঘাতের ন্যায় ক্ষত-বিক্ষত করে ফেলে। তবে সে আঘাতের ব্যথা মানুষকে এতটাই বিভ্রান্ত করে যে, সে এর উপশমের কথা ভুলে যায়।
আমার রচিত আরও তিনটি চরণ-
مَا زِلْتَ تُتْبِعُ نَظْرَةً فِي نَظْرَةٍ ... فِي إِثْرِ كُلِّ مَلِيحَةٍ وَمَلِيجٍ
وَتَظُنُّ ذَاكَ دَوَاءَ جُرْحِكَ وَهُوَ فِي الْ ... تَحْقِيقِ تَجْرِيحُ عَلَى تَجْرِيج
فَذَبَحْتَ طَرْفَكَ بِاللَّحَاظِ وَبِالْبُكَا ... فَالْقَلْبُ مِنْكَ ذَبِيحُ أَيُّ ذَبِيح
'তুমি বারংবার সুন্দরী নারী ও সুন্দর পুরুষের প্রতি দৃষ্টিপাত করে যাচ্ছ। তুমি ভাবছ এ দৃষ্টি তোমার ক্ষতের উপশম হবে। বস্তুত সে কেবল তোমার ক্ষতের ওপর ক্ষতই বাড়াবে। কীভাবে তোমার উপশম হবে, তুমি নিজেই তো নিজের ঘাড়ে ছুরি চালিয়ে দিয়েছ!'
টিকাঃ
[১] তিরমিযী, হাদীস-ক্রম: ২৭০১
[২] তাবারানী, আল মুজামুল কাবীর, হাদীস-ক্রম: ১০৩৬২। শুয়াইব আরনাউত বলেন, হাদীসের সনদে আবদুর রহমান ইবন ইসহাক আল ওয়াসিতি নাম্নী রাবী যঈফ।
[১] মুসনাদু আহমাদ, হাদীস-ক্রম: ২২৭৫৭
[২] বুখারী, হাদীস-ক্রম: ২৪৬৫
📄 চিন্তা-ভাবনার গুনাহ
মানুষের হৃদয়ে উদিত গুনাহের চিন্তা-ভাবনার সঙ্গে লড়াই করা অত্যন্ত স্পর্শকাতর একটি বিষয়। সবধরনের কল্যাণ এবং অকল্যাণের শুরু এখান থেকেই হয়। এসকল ভাবনার জন্য পৃথক কোনো রসদের প্রয়োজন হয় না। মানুষের মনে সর্বদাই কোনো না কোনো ভাবনা ঘুরপাক খেতে থাকে। হৃদয়ে উদিত ভাবনার ওপর যে ব্যক্তি পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারে, তার পক্ষেই প্রবৃত্তির দাসত্ব থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব হয়। আর যে ব্যক্তি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না, কোনো এক সময়ে সে প্রবৃত্তির কাছে অসহায় হয়ে পড়ে। ইচ্ছা না থাকলেও দাসত্ব করা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না। প্রবৃত্তির অসৎ আহ্বানগুলো দূর থেকে মনোহর লাগে। মানুষ যতই নিকটে যেতে চায়, সেসকল মনোহরী আহ্বান মরীচিকার মতো ততটাই সরে যেতে থাকে।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-
كَسَرَابٍ بِقِيعَةٍ يَحْسَبُهُ الظَّمْآنُ مَاء حَتَّى إِذَا جَاءَهُ لَمْ يَجِدْهُ شَيْئًا وَوَجَدَ اللَّهَ عِندَهُ فَوَفَّاهُ حِسَابَهُ وَاللَّهُ سَرِيعُ الْحِسَابِ
'মরুভূমির মরীচিকার মতো, যাকে পিপাসার্ত ব্যক্তি পানি মনে করে। এমনকি, সে যখন তার কাছে যায়, তখন কিছুই পায় না এবং পায় সেখানে আল্লাহকে, অতঃপর আল্লাহ তার হিসাব চুকিয়ে দেন। আল্লাহ দ্রুত হিসাব গ্রহণকারী।[১]
মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় বাস্তবতা হলো আখিরাত। দুনিয়ার সবকিছু ত্যাগ করে একদিন চূড়ান্ত পরিণতির দিকে যেতে হবে। অনন্ত আখিরাতকে উপেক্ষা করে সামান্য পার্থিব ইচ্ছা আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের জন্য সর্বস্ব বিলীন করে দেয়া জীবনের নিদারুণ অপচয়। জাগতিক বিষয়াদির প্রতি অধিক আকর্ষণ মানুষকে নির্বোধ করে দেয়। আখিরাতকে তখন অবাস্তব মনে হতে থাকে। আখিরাতের বিপরীতে দুনিয়াবি লাভ-ক্ষতির সামান্য সন্ধান পেলেই তাকে স্রোতের মাঝে থাকা খড়কুটোর মতো আঁকড়ে ধরে। আখিরাতের বাস্তবতার তুলনায় দুনিয়া একটি কল্পনার রাজ্য। আখিরাতের সুখ-দুঃখের তুলনায় দুনিয়ার সুখ-দুঃখের উদাহরণ হলো, একজন ক্ষুধার্ত ব্যক্তি খাবারের অন্বেষণ না করে চোখ বন্ধ করে কল্পনায় অনেক কিছু খেয়ে ফেলার মতো। সে ব্যক্তি ভাবছে, অনেক ভালো খাবার খেয়ে ফেলা হলো। কিন্তু কল্পনার খাবার কোনো খাবারই নয়। এটা শুধুই কল্পনা। আখিরাতের তুলনায় দুনিয়ার সব অর্জন এমনই কল্পনার মতো। দুনিয়াতে সফল ব্যক্তিরা মনে করে, অনেক কিছু পেয়ে গেছি। আরও অনেক কিছু পেয়ে যাব। বস্তুত এ অনেক কিছু আখিরাতের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কোনো অর্জনের তুলনায়ও একটি কল্পনামাত্র। আসলে কিছুই পাওয়া হয়নি।
টিকাঃ
[১] সূরা নূর, আয়াত-ক্রম: ৩৯
📄 মানুষের হৃদয়ে চার প্রকার ভাবনা সৃষ্টি হয়ে থাকে–
১. পার্থিব কোনো অর্জনের ভাবনা।
২. পার্থিব কোনো ক্ষতি থেকে মুক্তির ভাবনা।
৩. আখিরাতের কোনো অর্জনের ভাবনা।
৪. আখিরাতের কোনো ক্ষতি থেকে মুক্তির ভাবনা।
এই চার ধরনের ভাবনা নিয়ে সকলের সতর্ক থাকা উচিত। যখনই মনে কোনো ভাবনার উদয় হবে, সঙ্গে সঙ্গে খেয়াল করতে হবে, সদ্য উদিত এই ভাবনাটি উপরোক্ত চারপ্রকারের কোনটি। আখিরাতের জন্য হলে, সে ভাবনার ওপর যথাদ্রুত আমল করে ফেলা। আর যদি দুনিয়ার জন্য হয়, তাহলে আবার ভেবে দেখা, দুনিয়ার জন্য কতটুকু করা প্রয়োজন। এ প্রক্রিয়ায় নিজের কল্পনার জগতকে স্বচ্ছ রাখা সম্ভব। প্রাধান্যযোগ্য কাজগুলোও সর্বাগ্রেই করে ফেলা সম্ভব। সর্বোপরি প্রবৃত্তির ওপর নিয়ন্ত্রণ তৈরি হয় এতে। প্রবৃত্তির দাসত্ব থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। সবসময় নিজেকে জিজ্ঞাসাবাদের ওপর রাখলে মনে অন্যায় চিন্তা স্থান পাওয়ার সুযোগ কম থাকে।
মানুষের হৃদয়ে প্রতি ক্ষণে ক্ষণে হাজারও চিন্তার উদয় হতে পারে। দুনিয়া ও আখিরাত-উভয় জগতের ভাবনাতেই মানুষ বিভোর থাকে। সেক্ষেত্রে প্রাধান্যযোগ্য কাজ নির্ণয় করা জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এই বিষয়টিই একজন মানুষ কতটা উচ্চতায় পৌঁছবে তা নির্ণয় করে দেয়। ধরা যাক, দুটি চিন্তা বা কাজ কারো সামনে উপস্থিত হলো। একটি তুলনামূলক বেশি গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু কম গুরুত্বপূর্ণ কাজটি এখন না করলে পরবর্তীতে করার সুযোগ থাকবে না। তখন গুরুত্বের চাইতেও সুযোগ প্রাধান্য পাবে।
মানুষের হৃদয়ে যতরকম ভাবনার উদয় হয়, তারমধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভাবনা হলো, যা আল্লাহ তাআলার জন্য হয়।
📄 যেসকল ভাবনা আল্লাহর জন্য, তা পাঁচ প্রকার–
১. আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে অবতীর্ণ আয়াত নিয়ে চিন্তাভাবনা ও গবেষণা করা। আয়াতসমূহ গভীরভাবে উপলব্ধি করার চেষ্টা করা। কুরআন শুধুমাত্র তিলাওয়াতের জন্য অবতীর্ণ করা হয়েছে, এমন নয়। তিলাওয়াত হলো অনুধাবনের মাধ্যম। কোনো এক বুযুর্গের উক্তি-
أُنْزِلَ الْقُرْآنُ لِيُعْمَلَ بِهِ، فَاتَّخَذُوا تِلَاوَتَهُ عَمَلًا
'কুরআন অবতীর্ণ করা হয়েছে আমলের জন্য। অতএব তোমরা আমলের জন্য তিলাওয়াত করো।'
২. আমাদের চারপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা অসংখ্য কুদরতের দিকে লক্ষ করা। আল্লাহ তাআলা এভাবে খুঁজে বের করার আদেশ করেছেন। যারা উদাসীন থাকে, তাদেরকে নিন্দা করেছেন।
৩. আল্লাহ তাআলার দয়া ও অনুগ্রহ নিয়ে চিন্তাভাবনা করা। এ তিন ধরনের ভাবনা মানুষকে প্রতিনিয়ত আল্লাহর অনেক নিকটবর্তী করে দেয়। মানুষ আল্লাহর পরিচয় খুঁজে পায়। আল্লাহর ভালোবাসায় জীবন রঙিন হয়ে ওঠে।
৪. নিজের দোষত্রুটি নিয়ে চিন্তাভাবনা করা। এই ভাবনা মানুষকে ক্রমাগত একজন ভালো মানুষে পরিণত করে। বহুবিধ কল্যাণের দরজা খুলে দেয়। অসৎ প্রবৃত্তিকে দুর্বল করে ফেলে। এবং সৎ প্রবৃত্তি জাগ্রত করে।
৫. দৈনন্দিনের গুরুত্বপূর্ণ ওয়াজিব আমল ও ব্যক্তিগত ওযীফা সম্পর্কে চিন্তাভাবনা করা। এই চিন্তা প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যেতে থাকলে সময় অপচয়ের সম্ভাবনা কমে যায়। প্রতিটি সময়ই মূল্যবান সময় হয়ে ওঠে।
ইমাম শাফিয়ী বলেন-
'সূফীদের সান্নিধ্যে থেকে আমি দুটি বিষয় শিখেছি।
এক. সময় একটি তরবারির মতো। যদি তুমি তাকে দিয়ে না কাটো, তবে সে নিজেই তোমাকে কাটতে থাকবে।
দুই. যদি তুমি তোমার অন্তরকে সৎকাজে লিপ্ত না রাখো, তবে সে তোমাকে অসৎকাজে লিপ্ত করবে।'
বস্তুত সময়ের নামই জীবন। আমরা যে সময়গুলো অতিবাহিত করি, তা-ই আমাদের জীবন। এর বাইরে জীবন বলে আলাদা কিছু নেই। সময়ের ধর্ম হলো, তা সব সময়ই খুব দ্রুত ছুটতে থাকে। দুনিয়ার সময়টুকু আখিরাতের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণের সময়। যদি কেউ সঠিক প্রস্তুতি গ্রহণে উৎসাহী না হয়, তবে যত দীর্ঘ জীবন সে লাভ করুক, তাতে কোনো ফায়দা নেই। তা সাধারণ পশুপাখির জীবনেরই অনুরূপ হবে।
উল্লিখিত পাঁচ প্রকারের চিন্তাভাবনা ছাড়া অন্য যেসকল ভাবনা মানুষের মস্তিষ্কে উদয় হয়, তা শয়তানের ধোঁকার ফলেই হয়। মস্তিষ্ক যতক্ষণ অলস থাকবে, ততক্ষণ ভাবনার উদয় ঘটতেই থাকবে। এবং তা দোষণীয় কিছু নয়। তবে মানুষ যখনই সচেতনভাবে ওই ভাবনায় তলিয়ে যেতে থাকবে তখনই তা দোষণীয় বলে বিবেচিত হবে।
মানুষের হৃদয় একটি সাদা কাগজের মতো। মস্তিষ্কের ভাবনা তাতে অংকিত হয়। মিথ্যা, ধোঁকা ও গুনাহের চিন্তাভাবনা করতে থাকলে কদাকার অসংখ্য দাগে সাদা পাতাটি ভরে ওঠে। পক্ষান্তরে ভালো চিন্তাও তার মাঝে সুন্দর প্রতিফলন ঘটায়। দৃষ্টিনন্দন রঙিন দাগে হৃদয় সুশোভিত হয়।
কবির উক্তি-
أَتَانِي هَوَاهَا قَبْلَ أَنْ أَعْرِفَ الْهَوَى ... فَصَادَفَ قَلْبًا فَارِعًا فَتَمَكَّنَا
'ভালোবাসা চেনার আগেই তার ভালোবাসা আমার কাছে আসল। এবং চিরদিনের জন্য আমার হৃদয়ে জায়গা করে নিল।'
মানুষের মাঝে দুইরকম চিন্তাভাবনারই সক্ষমতা রয়েছে। শুধু নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন। শয়তান মানুষকে ভালো চিন্তার কথা ভুলিয়ে রাখে। এবং খারাপ চিন্তা ঢুকিয়ে দেয়। খারাপ চিন্তার অস্তিত্ব এবং শয়তানের ধোঁকার ভয় আছে বলেই ভালো চিন্তার মূল্য রয়েছে। দুইদিকেই সমান চিন্তাভাবনার সুযোগ মানুষকে সকল সৃষ্টি-এমনকি ফিরিশতাদের চেয়েও মূল্যবান করে তুলেছে। মানুষ ইচ্ছাশক্তির বলে মুহূর্তেই সকল খারাপ চিন্তাকে দূর করে দিতে পারে। সবচেয়ে শক্তিশালী এবং পূর্ণাঙ্গ মানুষ সে ব্যক্তি, যে হৃদয়ে জাগ্রত হাজারো চিন্তার ভিড়ে শুধু ভালো চিন্তাগুলোকেই বেছে নেয়। অতিশয় দুর্বল এবং প্রবৃত্তির কাছে পরাজিত সে ব্যক্তি, যে কেবলই খারাপ চিন্তায় ডুবে থাকে।
ভালো চিন্তায় ডুবে থাকার সবচেয়ে প্রকৃষ্ট উদাহরণ হযরত উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু। তাঁর হৃদয়ে অসংখ্য ভাবনা ভিড় করে থাকত। তিনি একই সঙ্গে কয়েকটা ইবাদাতে মগ্ন হয়ে যেতে পারতেন। নামাযে দাঁড়িয়ে জিহাদের সৈন্যসারির বিন্যাস করতেন। একই সঙ্গে নামায ও জিহাদ-দুটোই এগিয়ে চলত। নামাযে মশগুল থেকেও সৈন্যবাহিনী পরিচালনা করতে পারতেন।