📘 রূহের খোরাক > 📄 আল্লাহর সিফাত ও আহকামের ওপর কথা বলার আদব

📄 আল্লাহর সিফাত ও আহকামের ওপর কথা বলার আদব


পর্যাপ্ত জানাশোনা ছাড়া আল্লাহর আহকাম ও সিফাতের ব্যাপারে বিতর্কে লিপ্ত হওয়া শিরকের নিকটবর্তী কবীরা গুনাহ। আল্লাহ তাআলা নিজের যেসকল গুণবাচক নাম উল্লেখ করেছেন এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহকে যেসকল গুণবাচক নামে ডেকেছেন, তার বিপরীত গুণের অন্য কোনো নামে ডাকা আল্লাহ তাআলার কর্তৃত্বের জগতে অবৈধ অনুপ্রবেশের শামিল। আর যদি কেউ স্বীয় জ্ঞানের দ্বারা আল্লাহপাকের এ ধরনের কোনো গুণাবলি প্রমাণ করার চেষ্টা করে, তবে সেটা শিরকের চেয়েও বড় ধৃষ্টতা বলে গণ্য হবে।
শিরকে লিপ্ত হবার দুটি ধরন আছে :
১. আল্লাহকে স্বীকার না করে শুধুমাত্র মাখলুক তথা সৃষ্ট জিনিসের উপাসনা করা।
২. আল্লাহকে স্বীকার করলেও তাঁর পাশপাশি অন্যকে শরীকও করা।
দ্বিতীয় প্রকারের শিরক প্রথম প্রকারের তুলনায় লঘু। উদাহরণস্বরূপ-কোনো ব্যক্তি তার দেশের ক্ষমতাসীন বাদশাহকে অস্বীকার করে। পক্ষান্তরে আরেকজন বাদশাহকে স্বীকার করে এবং তাঁর সহানুভূতি লাভের জন্য অন্য কোনো উজির বা উচ্চপদস্থ ব্যক্তির মধ্যস্থতা গ্রহণ করে। নিঃসন্দেহে দ্বিতীয় প্রকারের লোকটি বাদশার নৈকট্য পাবে। তবে আল্লাহপাকের ক্ষেত্রে বিষয়টি কিছুটা ভিন্ন। তিনি নিজেই কোনো মধ্যসূত্র গ্রহণ করতে নিষেধ করেছেন। তাই সেটা করা যাবে না। আল্লাহকে অস্বীকারকারী মুশরিকদের মধ্য থেকে নেতৃস্থানীয় মুশরিক হলো ফিরআউন। পবিত্র কুরআনে ঘটনা বর্ণিত আছে-
يَا هَامَانُ ابْنِ لِي صَرْحًا لَعَلَّى أَبْلُغُ الْأَسْبَابَ - أَسْبَابَ السَّمَاوَاتِ فَأَطَّلِعَ إِلَى إِلَهِ مُوسَى وَإِنِّي لَأَظُنُّهُ كَاذِبًا
'ফিরআউন আরও বলল, "হে হামান! আমার জন্য একটি উঁচু ইমারত বানাও, যাতে আমি অবলম্বন পাই। আসমানে আরোহণের অবলম্বন, যাতে আমি মুসার ইলাহকে দেখতে পাই, আর আমি কেবল তাকে মিথ্যাবাদীই মনে করি।"[১]
আর দ্বিতীয় প্রকারের শিরক-অর্থাৎ আল্লাহকে পরিপূর্ণভাবে অস্বীকার না করে তাঁর পাশে অন্য কোনো মাখলুক বা সৃষ্টজীবকে শরীক করা-এটাকে শয়তান বেশি পছন্দ করে। কেননা এটা বিদআত। আর বিদআতের ব্যাপারে পূর্বসূরি কয়েকজন আলিমের মন্তব্য হলো-
الْبِدْعَةُ أَحَبُّ إِلَى إِبْلِيسَ مِنَ الْمَعْصِيَةِ: لِأَنَّ الْمَعْصِيَةَ يُتَابُ مِنْهَا وَالْبِدْعَةَ لَا يُتَابُ مِنْهَا
'অন্যান্য গুনাহের চেয়ে শয়তানের কাছে বিদআত বেশি পছন্দ। কারণ হলো, অন্য গুনাহ থেকে তাওবা করা যায়, বিদআত থেকে তাওবা করা হয় না।
ইবলিস বলে থাকে, 'আদম সন্তানকে আমি গুনাহের মাধ্যমে ধ্বংস করেছি। আর তারা আমাকে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ দিয়ে ধ্বংস করে দিয়েছে। এমন অবস্থা দেখে আমি তাদেরকে এমন গুনাহে লিপ্ত করে দিলাম, যাকে তারা নেকি ভেবে করতে থাকবে। ফলে কোনোদিন তাওবা করার কথা তাদের মনেও আসবে না।'
অন্যান্য গুনাহ শুধুমাত্র গুনাহে লিপ্ত ব্যক্তিকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে। কিন্তু বিদআত শুধুমাত্র একজনকেই নয়, বিদআতের প্রভাব সমাজের সর্বস্তরে ছড়িয়ে পড়ে। এবং অপরকেও উৎসাহিত করে। বিদআতে লিপ্ত ব্যক্তি অন্যান্য কবীরা গুনাহে লিপ্ত ব্যক্তি থেকে অধিক নিকৃষ্ট। কেননা, বিদআত আল্লাহর সিফাতের মধ্যে বিকৃতি ঘটায়, কিন্তু অন্য গুনাহে তা হয় না। অন্য গুনাহে লিপ্ত ব্যক্তি আখিরাতের সঠিক পথে থেকেই ভুলভ্রান্তি করে। কিন্তু বিদআতে লিপ্ত ব্যক্তির আখিরাতের পথই ভুল হয়ে যায়।

টিকাঃ
[১] সূরা মুমিন, আয়াত-ক্রম: ৩৬, ৩৭

📘 রূহের খোরাক > 📄 মানবহত্যা ও জুলুম-নির্যাতন

📄 মানবহত্যা ও জুলুম-নির্যাতন


শিরকের পর সবচেয়ে বড় গুনাহ হলো, অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা করা এবং জুলুম করা। ইনসাফ ও ন্যায়বিচারের ওপর সারা পৃথিবী টিকে আছে। জুলুম ইনসাফের বিপরীত বিষয়। মানুষকে ইনসাফের কথা স্মরণ করিয়ে দিতে আল্লাহ তাআলা নবী-রাসূলদেরকে প্রেরণ করেছেন। আসমানী কিতাব সমূহেও বহুবার জুলুমের কথা উল্লেখ করেছেন। জুলুম করতে নিষেধ করেছেন। ইনসাফের নীতি প্রতিষ্ঠার আদেশ করেছেন। জুলুম নৈরাজ্যের পথ খুলে দেয়। অতএব যে জুলুমের প্রতিক্রিয়ায় যতটা নৈরাজ্য সৃষ্টি হবে, সে জুলুম ততটা ভয়ংকর বলে বিবেচিত হবে।

হত্যাকাণ্ডের মধ্যে নিজের শিশু সন্তানকে হত্যা করা এবং সন্তানের দিক থেকে পিতামাতাকে হত্যা করা সর্বাপেক্ষা নিকৃষ্টতর জুলুম। আল্লাহ শিশুদের এমনভাবে সৃষ্টি করেন, সকলেই তাদেরকে ভালোবাসে। বিশেষত, সন্তানের প্রতি পিতামাতার ভালোবাসার তুলনা হয় না। তবু কেউ যদি এই ভয়ে হত্যা করে যে, সন্তান আগামীতে দারিদ্র্যের কারণ হবে, তার সম্পদের অংশীদার হবে, তাহলে এর চেয়ে নিকৃষ্ট জুলুম আর হতে পারে না। অপরদিকে পিতামাতা হলেন মানুষের পৃথিবীতে আসার একমাত্র মাধ্যম। কেউ যদি তার পিতামাতাকে হত্যা করে, সেটাও অতি নিকৃষ্ট জুলুম হিসেবে বিবেচিত হবে।

নিহত ব্যক্তির অবস্থা ভেদে হত্যার স্তর নির্ণিত হয়। নিহত ব্যক্তি যদি নবী, সাহাবী অথবা দ্বীনের দাঈ আলিম হন, তাহলে পিতামাতা ও সন্তান হত্যার পরে এটাই সর্বাপেক্ষা বড় জুলুম। এবং কিয়ামতের দিন হত্যাকারীকে কঠিন জিজ্ঞাসাবাদ ও শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে।

আল্লাহ তাআলা কোনো মুমিনকে ইচ্ছাকৃত হত্যার শাস্তি হিসেবে চিরস্থায়ী জাহান্নামের বিধান করেছেন। ইচ্ছাকৃত হত্যাকারীর ওপর আল্লাহর ক্রোধ ও লানত বর্ষিত হয়। কোনো ব্যক্তি যদি অমুসলিম থাকা অবস্থায় কোনো মুমিনকে হত্যা করে, অতঃপর ইসলাম গ্রহণ করে, তাহলে মুসলিম শাসক ইসলামের স্বার্থে রক্তপাত ছাড়াই ক্ষতিপূরণ গ্রহণ করে তাকে ক্ষমা করে দিতে পারেন। তবে মুসলিম ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে অপর মুসলমানকে হত্যা করলে তাকে কোনোভাবে ক্ষমা করা যাবে কিনা, এ বিষয়ে ইমামদের মধ্যে মতানৈক্য রয়েছে। ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বল থেকেই দুটি মত বর্ণিত আছে।

যাঁরা মনে করেন হত্যাকারীর তাওবা কবুল হবে না, ক্ষতিপূরণ আদায় করলেও তাকে ক্ষমা করা যাবে না, তাঁদের যুক্তি হলো, হত্যাকারীর হয়তো আরো দীর্ঘদিন হায়াত পাওয়ার সম্ভাবনা ছিল। হত্যাকারী তার সেই হায়াত ছিনিয়ে নিয়েছে। মৃতব্যক্তির ক্ষতিপূরণ গ্রহণের সম্ভাবনাও শেষ হয়ে গেছে। ফলে ইনসাফ হলো, আইনের মাধ্যমে হত্যাকারীকেও একই শাস্তি প্রদান করা। এখানে ক্ষতিপূরণের কোনো সুযোগ নেই। নিহতের হক কেবলই তার নিজের। তার উত্তারাধিকারগণ সে হক গ্রহণ করলে নিহত ব্যক্তির কিছু যায়-আসে না। আর ওয়ারিশরা হত্যাকারীর কাছ থেকে যে ক্ষতিপূরণ পাবে তা হলো ওই জিনিসের বিনিময়, যা নিহত ব্যক্তি ওয়ারিশদেরকে দিত। ক্ষতিপূরণের মাধ্যমে ওয়ারিশদের হক আদায় হলেও নিহত ব্যক্তির জীবনের ঋণ থেকেই যায়। তা আদায় করার বিকল্প কোনো সুযোগ নেই। যদি ওয়ারিশদের ক্ষতিপূরণ আদায়ের মাধ্যমে হত্যাকারীর সঙ্গে কোনো সমঝোতা হয়, তারপরেও হাশরের ময়দানে হত্যাকারীকে নিহতের হক নষ্ট করার অপরাধে কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে।

অন্যান্য ইমামগণ বলেন, ক্ষতিপূরণ এবং তাওবা-ইস্তিগফারের মাধ্যমে তার তাওবা কবুল করা হবে। কেননা হত্যাকারী শরয়ী বিধান অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ দিচ্ছে। এবং কৃত অপরাধের জন্য ক্ষমাপ্রার্থনাও করেছে।

তাঁরা আরও বলেন, যেহেতু কুফর-শিরক এবং যাদুটোনার মতো বড় বড় গুনাহ তাওবা করার দ্বারা মাফ হয়ে যায়, সুতরাং হত্যাকাণ্ডের অপরাধও তাওবা-ইস্তিগফারের মাধ্যমে মাফ হয়ে যাবে। আল্লাহ তাআলা তো সেসব কাফিরকেও ক্ষমা করে দিয়েছেন, যারা তাঁর প্রিয় ব্যক্তিদের হত্যা করেছে। ইসলাম গ্রহণের পর তাদেরকে শুধু ক্ষমা করেননি, বরং প্রিয়ভাজনেও পরিণত করেছেন। পবিত্র কুরআনে বর্ণিত আছে-

قُلْ يَا عِبَادِيَ الَّذِينَ أَسْرَفُوا عَلَى أَنْفُسِهِمْ لَا تَقْنَطُوا مِنْ رَحْمَةِ اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ جَمِيعًا
'আপনি বলে দিন, হে আমার বান্দাগণ, যারা নিজদের উপর বাড়াবাড়ি করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। অবশ্যই আল্লাহ সকল পাপ ক্ষমা করে দেবেন।' [১]
এই আয়াতটি ব্যাপকার্থে ব্যবহৃত হয়েছে। কুফর-শিরকসহ সবরকমের গুনাহ তাওবার মাধ্যমে মাফ হয়ে যায়।

ইমামগণ বলেন, তাওবা দ্বারা সকল গুনাহ মাফ হয়ে যাওয়ার পর নিষ্পাপ একটি মানুষকে শাস্তি দেয়া শরীয়ত-বিরুদ্ধ। এ ক্ষেত্রে তাওবা করার অর্থ হলো, হত্যাকারী ব্যক্তি তার প্রাণ নিহতের হাতে তুলে দেয়া। যেহেতু নিহতের হাতে তুলে দেয়ার সম্ভাবনা শেষ হয়ে গেছে, তাই নিহতের স্থলে তার প্রাণের মালিকানা চলে যাবে নিহতের ওয়ারিশদের হাতে। তারা তাকে কিসাসের জন্য শাসকের হাতে তুলে দিতে পারে অথবা ক্ষতিপূরণ গ্রহণ করতে পারে। অথবা চাইলে সম্পূর্ণ মাফ করে দিতে পারে। তাদের মতামতকেই নিহতের মতামত বলে বিবেচনা করা হবে।

টিকাঃ
[১] সূরা যুমার, আয়াত-ক্রম: ৫৩

📘 রূহের খোরাক > 📄 একটি হত্যাকাণ্ড তিন ধরনের হক নষ্ট করে–

📄 একটি হত্যাকাণ্ড তিন ধরনের হক নষ্ট করে–


১. আল্লাহর হক
২. নিহত ব্যক্তির হক
৩. নিহত ব্যক্তির নিকটাত্মীয়ের হক

হত্যা করার পর ঘাতক যদি আল্লাহর কাছে লজ্জিত হয়ে খাঁটি মনে তাওবা করে এবং নিহতের আত্মীয়দের সঙ্গে সমঝোতা করে ফেলে, তাহলে আল্লাহ তাকে মাফ করে দেবেন।

ঘাতক যখন তার প্রাণ নিহতের আত্মীয়দের হাতে তুলে দেবে, এবং আত্মীয়রা যদি তাকে ক্ষতিপূরণসহ অথবা ক্ষতিপূরণ ছাড়া ক্ষমা করে দেয়, তাহলে আত্মীয়দের হকও আদায় হয়ে যাবে।

অবশিষ্ট থাকল নিহত ব্যক্তির হক। ঘাতক যদি পৃথিবীতেই আল্লাহ ও নিহতের আত্মীয়দের কাছ থেকে ক্ষমা আদায় করে নিতে পারে, তাহলে আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিন নিহত ব্যক্তিকে হত্যার বিনিময়ে উত্তম প্রতিদান দেবেন।

📘 রূহের খোরাক > 📄 একজন মানুষ হত্যা সমগ্র মানবজাতিকে হত্যার সমতুল্য

📄 একজন মানুষ হত্যা সমগ্র মানবজাতিকে হত্যার সমতুল্য


একজন মানুষকে হত্যার প্রভাব সমাজের ওপর খুবই বিপজ্জনক। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-
مِنْ أَجْلِ ذَلِكَ كَتَبْنَا عَلَى بَنِي إِسْرَائِيلَ أَنَّهُ مَنْ قَتَلَ نَفْسًا بِغَيْرِ نَفْسٍ أَوْ فَسَادٍ فِي الْأَرْضِ فَكَأَنَّمَا قَتَلَ النَّاسَ جَمِيعًا وَمَنْ أَحْيَاهَا
‘এ কারনেই আমি বনী ইসরাঈলের প্রতি লিখে দিয়েছি যে, যে কেউ প্রাণের বিনিময়ে প্রাণ অথবা পৃথিবীতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা ছাড়া কাউকে হত্যা করল, সে যেন সব মানুষকেই হত্যা করল। এবং যে কারও জীবন রক্ষা করে, সে যেন সবার জীবন রক্ষা করল’।
উক্ত আয়াত থেকে হত্যার ভয়াবহতা অনুমান করা যায়। প্রশ্ন হয়, তাহলে কি আল্লাহর নিকট একজন এবং শতজনের প্রাণহানীর একই মূল্য? কুরআনের উক্ত আয়াতের পূর্বাপর সংশ্লিষ্ট অন্যান্য আয়াত এই অর্থ প্রকাশ করে না। অবশ্যই একজন এবং ১০০ জন হত্যার মূল্য এক নয়। এখানে মানুষকে হত্যার ভয়াবহতা সম্পর্কে ধারণা দেয়ার জন্য আল্লাহ এমন উদাহরণ ব্যবহার করেছেন। কোনো বিষয়ে অপর কোনো বিষয়ের উদাহরণ দিলেই দুটি জিনিস হুবহু এক হওয়ার আবশ্যকীয়তা নেই। পবিত্র কুরআনেই এমন আরও উদাহরণ রয়েছে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-
كَأَنَّهُمْ يَوْمَ يَرَوْنَهَا لَمْ يَلْبَثُوا إِلَّا عَشِيَّةً أَوْ ضُحَاهَا
‘যেদিন তারা কিয়ামত দেখবে, সেদিন তাদের অবস্থা এমন হবে যেন তারা ইতিপূর্বে এক সন্ধ্যাবেলা বা তার প্রভাতকালের অধিক সময় অবস্থান করেনি’।
আরও একটি আয়াত-
كَأَنَّهُمْ يَوْمَ يَرَوْنَ مَا يُوعَدُونَ لَمْ يَلْبَثُوا إِلَّا سَاعَةً مِنْ نَهَارٍ
‘তাদেরকে যে বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছিল, যেদিন তারা তা প্রত্যক্ষ করবে, মনে হবে তারা পৃথিবীতে এক দিনের কিছু সময় অবস্থান করেছে’।
উক্ত দুই আয়াতে পৃথিবীতে অবস্থানকালের সময়টিকে যতটা ক্ষুদ্র বলা হয়েছে, বস্তুত তা ততটা ক্ষুদ্র ও সংক্ষিপ্ত নয়। ওই সময়ের মানুষ কিয়ামত দর্শনে কতটা বিভ্রান্ত ও বিহ্বল হবে, তা বোঝাতেই এমন উদাহরণের অবতারণা। একজন মানুষ হত্যা সমগ্র মানবজাতিকে হত্যার নামান্তর বিষয়টিও তেমন। হাদীস শরীফেও এমন বহু উদাহরণ রয়েছে।
রাসূল ইরশাদ করেন-
مَنْ صَلَّى الْعِشَاءَ فِي جَمَاعَةٍ فَكَأَنَّمَا قَامَ نِصْفَ اللَّيْلِ، وَمَنْ صَلَّى الْفَجْرَ فِي جَمَاعَةٍ فَكَأَنَّمَا قَامَ اللَّيْلَ كُلَّهُ
'যে ব্যক্তি ইশার নামায জামাতে আদায় করল, সে যেন অর্ধেক রাত নামায আদায়ে রত থাকল। আর যে ফজর নামাযও জামাতে আদায় করল, সে যেন সারারাতই নামায আদায়ে রত থাকল।[১]
অর্থাৎ কোনো ব্যক্তি ইশা ও ফজর জামাতে আদায় করলে সারারাত নামায আদায়ের সওয়াব লাভ করবে।
আরেক হাদীসে বর্ণিত হয়েছে-
مَنْ صَامَ رَمَضَانَ وَأَتْبَعَهُ بِسِدٍ مِنْ شَوَّالٍ فَكَأَنَّمَا صَامَ الدَّهْرَ
'যে ব্যক্তি রামাদানসহ শাওয়ালেরও ছয়টি রোযা রাখবে, সে যেন সারা বছর রোযা রাখল।[২]
আরেক হাদীসে বর্ণিত আছে-
مَنْ قَرَأَ { قُلْ هُوَ اللَّهُ أَحَدٌ فَكَأَنَّمَا قَرَأَ ثُلُثَ الْقُرْآنِ
'যে ব্যক্তি সূরা ইখলাস পাঠ করল, সে যেন কুরআনের এক-তৃতীয়াংশ পাঠ করে নিল।[৩]
এসকল আমলের সওয়াব যে পরিমাণ বলা হয়েছে, সে পরিমাণই দেওয়া হবে। কিন্তু সওয়াবই মূল বিষয় নয়। বান্দার জন্য মূল বিষয় আল্লাহপাকের ইবাদাতের সঙ্গে যুক্ত থাকা। যত দীর্ঘ সময় যুক্ত থাকা যাবে, আল্লাহর সন্তুষ্টি তত বৃদ্ধি পাবে। অন্যথায় ইশা পড়ে ঘুমিয়ে গিয়ে ফজর পড়া ব্যক্তির সঙ্গে সারারাত তাহাজ্জুদ পড়া ব্যক্তির কোনো পার্থক্য থাকে না। হত্যার প্রসঙ্গটিও অনুরূপ। একজনকে হত্যা করা ১০০ জনের সমান নয়, কিন্তু হত্যাই একটি নিকৃষ্ট বিষয়। একটি হত্যা অনেক রক্তপাত এবং বিশৃঙ্খলার আশঙ্কা তৈরি করে। শত নৈরাজ্যের দুয়ার খুলে দেয়।
এসকল সূক্ষ্ম বিষয় সহজে অনুধাবন করার জন্য কুরআন-হাদীসের স্বচ্ছ ও গভীর জ্ঞান থাকা প্রয়োজন। ঈমানের পরেই কুরআন-হাদীসের জ্ঞান মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় নিয়ামত। যাঁরা বলেন, একজন মানুষ হত্যা এবং সমগ্র মানবজাতি হত্যার মধ্যে মিল কোথায়? তাঁদের জন্য নিম্নোক্ত পাঁচটি মিল তুলে ধরা হলো—
* একজনকে হত্যাকারী এবং শতজনকে হত্যাকারী—উভয়েই আল্লাহর হুকুম অমান্যকারী। ফলে উভয়েই আল্লাহর লানতে পতিত হবে। উভয়েরই শেষ-ঠিকানা হবে জাহান্নাম। শাস্তির তফাত হলেও একই ঠিকানায় যেতে হবে।
* হত্যা নামক নিষিদ্ধ কাজে উভয়েই লিপ্ত হয়েছে।
* উভয়েই সমগ্র মানবজাতির জন্য হুমকিস্বরূপ। কেননা যে ব্যক্তি নিজের কোনো স্বার্থসিদ্ধির জন্য একজনকে হত্যা করল, সে সুযোগ পেলে স্বার্থ হাসিলের জন্য সমগ্র মানবজাতিকে হত্যা করতে পারে।
* একজন অথবা শতজন হত্যাকারী—উভয়েই মানবজাতির ইতিহাসে হত্যাকারী হিসেবেই চিহ্নিত থাকবে।
* ঈমান, আমল ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধনের ক্ষেত্রে সকল মুমিন একটি দেহের মতো। সুতরাং কোনো জালিম যখন একজন মুমিনকে হত্যা করল সে ওই দেহের একটি অঙ্গ কেটে ফেলল। সে অঙ্গের যন্ত্রণা জগতের সকল মুমিনের হৃদয়কে কাতর করে তুলবে।
শুধু মুমিন হত্যাই নয়, মুসলিমদের অধীনে থাকা কোনো কাফিরকে হত্যা করলেও সে হত্যার বেদনা মুসলমানদের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ ঘটায়। নরহত্যা প্রসঙ্গে রাসূল বলেন—
لَا تُقْتَلُ نَفْسٌ ظُلْمًا بِغَيْرِ حَقٌّ، إِلَّا كَانَ عَلَى ابْنِ آدَمَ الْأَوَّلِ كِفْلُ مِنْهَا لِأَنَّهُ أَوَّلُ مَنْ سَنَّ الْقَتْلَ
'যখন অন্যায়ভাবে কোনো মানুষ খুন হয়, সে খুনের একটি অংশের পাপ আদম আলাইহিস সালামের প্রথম সন্তান কাবিলের ওপর বর্তাবে। কেননা সে পৃথিবীতে এ পাপের প্রচলন ঘটিয়েছে।'[১]
শুধুমাত্র হত্যাকাণ্ডের ক্ষেত্রেই একটি হত্যা সমগ্র মানবজাতিকে হত্যার সমতুল্য। একটি চুরি সমগ্র মানবজাতির চুরির সমতুল্য নয়। একটি শিরক সমস্ত মানবজাতির শিরকের সমতুল্য নয়। তবে শিরকের ব্যাপারে শক্ত হুশিয়ারি আছে। রাসূল ইরশাদ করেন, 'আমি আমর ইবনু লুহাই খিজায়ীকে জাহান্নামের কঠিন আগুনে দগ্ধ হতে দেখেছি। কেননা সে সর্বপ্রথম ইবরাহীম আলাইহিস সালামের ধর্মে বিকৃতি সাধন করেছে।'
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-
وَلَا تَكُونُوا أَوَّلَ كَافِرٍ بِهِ
'তোমরা প্রথম অস্বীকারকারী হয়ো না।' [২]
অর্থাৎ প্রথম কাফির হয়ে পরবর্তী সময়ের মানুষদের জন্য তোমাদেরকে অনুসরণের পথ খুলে দিয়ো না। যে-কোনো পাপ কাজেই প্রথম ব্যক্তি হওয়া ভয়ঙ্কর। কিয়ামত পর্যন্ত অনুসৃত ব্যক্তির আমলনামায় গুনাহ জমা হতে থাকবে। মানবহত্যা প্রসঙ্গে আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস সূত্রে বর্ণিত হাদীসে রাসূল ইরশাদ করেন-
يَجِيءُ الْمَقْتُولُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ، نَاصِيَتُهُ وَرَأْسُهُ بِيَدِهِ، وَأَوْدَاجُهُ تَشْخَبُ دَمًا يَقُولُ: يَا رَبِّ سَلْ هَذَا فِيمَ قَتَلَنِي؟
'কিয়ামতের দিন নিহত ব্যক্তি তার হত্যাকারীকে এমনভাবে নিয়ে আসবে যে, তার কপাল এবং মাথা তার হাতেই থাকবে এবং ঘাড়ের প্রধান দুই রক্তনালি থেকে অনর্গল রক্ত ছুটতে থাকবে। নিহত ব্যক্তি বলবে, “হে রব! তাকে জিজ্ঞেস করুন, কেন সে আমাকে হত্যা করেছিল।"[১]
হাদীসটি বর্ণনা করার পর উপস্থিত জনতা ইবনু আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুকে জিজ্ঞাসা করেন, 'যদি হত্যাকারী তাওবা করে?' প্রত্যুত্তরে ইবনু আব্বাস কুরআনের এই আয়াত পাঠ করেন—
وَمَنْ يَقْتُلْ مُؤْمِنًا مُتَعَمِّدًا فَجَزَاؤُهُ جَهَنَّمُ خَالِدًا فِيهَا
'যে ব্যক্তি স্বেচ্ছায় মুসলমানকে হত্যা করে, তার শাস্তি জাহান্নাম, তাতেই সে চিরকাল থাকবে।'[২]
অতঃপর ইবনু আব্বাস বলেন, 'এই আয়াত রহিতও হয়নি, পরিবর্তনও হয়নি। মুমিনের হন্তারকের জন্য তাওবার সুযোগ নেই।' সামুরা ইবনু জুনদুব (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত—
أَوَّلُ مَا يُنْتِنُ مِنَ الْإِنْسَانِ بَطْنُهُ، فَمَنِ اسْتَطَاعَ مِنْكُمْ أَنْ لَا يَأْكُلَ إِلَّا طَيِّبًا فَلْيَفْعَلْ، وَمَنِ اسْتَطَاعَ أَنْ لَا يَحُولَ بَيْنَهُ وَبَيْنَ الْجَنَّةِ مِلْءُ كَفَّ مِنْ دَمٍ أَهْرَاقَهُ فَلْيَفْعَلْ
'সর্বপ্রথম মানুষের পাকস্থলি দুর্গন্ধযুক্ত হয়। অতএব তোমাদের মধ্যে যারা সক্ষম, তারা যেন পবিত্র রিযিক আহার করে। আর যারা সক্ষম, তারা যেন তাদের এবং জান্নাতের মাঝে রক্তের একটি ফোঁটার আড়ালও না রাখে।'[৩]
নাফে বলেন, 'একদিন আবদুল্লাহ ইবনু উমর (রাঃ) কাবা শরীফের দিকে দৃষ্টিপাত করে বলেন—
مَا أَعْظَمَكِ وَأَعْظَمَ حُرْمَتَكِ، وَالْمُؤْمِنُ عِنْدَ اللَّهِ أَعْظَمُ حُرْمَةٌ منك
"তুমি অনেক উচ্চ। তোমার সম্মান অনেক বেশি। কিন্তু আল্লাহর কাছে মুমিনের সম্মান তোমার চেয়েও বেশি।"[১]
স্বয়ং ইবনু উমর থেকে বর্ণিত আরও একটি হাদীস হলো-
لَا يَزَالُ الْمُؤْمِنُ فِي فُسْحَةٍ مِنْ دِينِهِ مَا لَمْ يُصِبْ دَمًا حَرَامًا
'যে ফাঁদে মানুষ একবার পা দিলে আর কোনোদিন বের হতে পারে না, তা হলো, অন্যায় রক্তপাত ঘটানো।'[২]
সহীহ বুখারী ও মুসলিমে আবু হুরায়রা সূত্রে বর্ণিত-
سِبَابُ الْمُؤْمِنِ فُسُوقُ وَقِتَالُهُ كُفْرُ
'মুমিনকে গালি দেয়া ফাসেকী, আর হত্যা করা কুফরী।'[৩]
সহীহ বুখারী ও মুসলিমে আরও বর্ণিত আছে, রাসূল ইরশাদ করেন-
لَا تَرْجِعُوا بَعْدِي كُفَّارًا يَضْرِبُ بَعْضُكُمْ رِقَابَ بَعْضٍ
'আমার পরে তোমরা কুফরীর দিকে এমনভাবে ফিরে যেয়ো না যে, একে অন্যের ঘাড়ে আঘাত করবে।'[৪]
অন্য হাদীসে বর্ণিত আছে, রাসূল ইরশাদ করেন-
مَنْ قَتَلَ مُعَاهَدًا لَمْ يُرَحْ رَائِحَةَ الْجَنَّةِ، وَإِنَّ رِيحَهَا لَيُوجَدُ مِنْ مَسِيرَةِ أَرْبَعِينَ عَامًا
‘যে ব্যক্তি কাউকে ইচ্ছাকৃতভাবে হত্যা করবে সে জান্নাতের ঘ্রাণও পাবে না, যদি ও জান্নাতের ঘ্রাণ ৪০ বছরের সমান দূরত্ব থেকেও পাওয়া যায়।’[১]
এটা হলো ওই ব্যক্তির শাস্তি, যে কোনো অমুসলিমকে যুদ্ধাবস্থা ছাড়া ইচ্ছাকৃতভাবে হত্যা করে। পক্ষান্তরে ইচ্ছাকৃতভাবে একজন মুমিন হত্যার শাস্তি কিয়ামতের দিন কী হতে পারে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে—একজন নারী কেবল এ কারণেই জাহান্নামে যাবে যে, সে একটি পিপাসার্ত বিড়ালকে সারাদিন বেঁধে রাখার ফলে বিড়ালটি মারা যায়। নবীজি দেখলেন, বিড়ালটি ক্ষুধা ও পিপাসার তীব্রতায় আপন গ্রীবা চেটে খাচ্ছিল। তিনি বললেন, ‘হাশরের ময়দানে ওই ব্যক্তির কী পরিণতি হবে, যে অন্যায়ভাবে কোনো মুমিনকে বন্দী করে রাখে, এবং বন্দী অবস্থায় ওই মুমিন শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে।’ হাদীসে আছে—
لَزَوَالُ الدُّنْيَا أَهْوَنُ عَلَى اللَّهِ مِنْ قَتْلِ مُؤْمِنٍ بِغَيْرِ حَقٍ
‘অন্যায়ভাবে কোনো মুমিন খুন হওয়ার বিপরীতে সারা পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাওয়া আল্লাহর কাছে অতি গৌণ বিষয়।’[২]

টিকাঃ
[১] সূরা মায়িদা, আয়াত-ক্রম: ৩২
[২] সূরা নাযিয়াত, আয়াত-ক্রম: ৪৬
[৩] সূরা আহকাফ, আয়াত-ক্রম: ৩৫
[১] মুসলিম, হাদীস-ক্রম: ৬৪৫
[২] মুসনাদু আহমাদ-৫/৪১৯
[৩] মুসলিম, হাদীস-ক্রম: ৮১১
[১] বুখারী, হাদীস-ক্রম: ৬৮৬৭; মুসলিম, হাদীস-ক্রম: ১৬৭৭
[২] সূরা বাকারা, আয়াত-ক্রম: ৪১
[১] তিরমিযী, হাদীস-ক্রম: ৩০২৯
[২] সূরা নিসা, আয়াত-ক্রম: ৯৩
[৩] বুখারী, হাদীস-ক্রম: ৭১৫২
[১] তিরমিযী, হাদীস-ক্রম: ২১৫১; শুয়াইব আরনাউতের মতে হাদীসটির সনদ শক্তিশালী।
[২] বুখারী, হাদীস-ক্রম: ৬৮৬২
[৩] তিরমিযী, হাদীস-ক্রম: ২০১৮
[৪] বুখারী, হাদীস-ক্রম: ১২১; মুসলিম, হাদীস-ক্রম: ৬৫
[১] বুখারী, হাদীস-ক্রম: ৩১৬৬
[২] ইবনু মাজাহ, হাদীস-ক্রম: ২৬১৯

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00