📄 শিরক ও অহংকার
শিরক ও অহংকার-জাতীয় গুনাহগুলো আল্লাহ তাআলার সৃষ্টির উদ্দেশ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। আল্লাহ জীন ও মানুষ সৃষ্টি করেছেন শুধুমাত্র তাঁর ইবাদাতের জন্য। এই উদ্দেশ্যেই কিতাব অবতীর্ণ করেছেন এবং নবী-রাসূলগণকে প্রেরণ করেছেন। সৃষ্টজীব-জীন ও মানুষের শিরক ও অহংকার আল্লাহর এ ইচ্ছার বিপরীতে চলে যায়। আল্লাহ তাআলা এমনটা পছন্দ করেন না। মুশরিক এবং অহংকারী-উভয়েই জাহান্নামে প্রবেশ করবে। আল্লাহ তাআলা তাদের জন্য জান্নাত হারাম করেছেন। এমনকি যার অন্তরে বিন্দু-পরিমাণ অহংকার থাকবে, সেও জান্নাতে যেতে পারবে না।
📄 আল্লাহর সিফাত ও আহকামের ওপর কথা বলার আদব
পর্যাপ্ত জানাশোনা ছাড়া আল্লাহর আহকাম ও সিফাতের ব্যাপারে বিতর্কে লিপ্ত হওয়া শিরকের নিকটবর্তী কবীরা গুনাহ। আল্লাহ তাআলা নিজের যেসকল গুণবাচক নাম উল্লেখ করেছেন এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহকে যেসকল গুণবাচক নামে ডেকেছেন, তার বিপরীত গুণের অন্য কোনো নামে ডাকা আল্লাহ তাআলার কর্তৃত্বের জগতে অবৈধ অনুপ্রবেশের শামিল। আর যদি কেউ স্বীয় জ্ঞানের দ্বারা আল্লাহপাকের এ ধরনের কোনো গুণাবলি প্রমাণ করার চেষ্টা করে, তবে সেটা শিরকের চেয়েও বড় ধৃষ্টতা বলে গণ্য হবে।
শিরকে লিপ্ত হবার দুটি ধরন আছে :
১. আল্লাহকে স্বীকার না করে শুধুমাত্র মাখলুক তথা সৃষ্ট জিনিসের উপাসনা করা।
২. আল্লাহকে স্বীকার করলেও তাঁর পাশপাশি অন্যকে শরীকও করা।
দ্বিতীয় প্রকারের শিরক প্রথম প্রকারের তুলনায় লঘু। উদাহরণস্বরূপ-কোনো ব্যক্তি তার দেশের ক্ষমতাসীন বাদশাহকে অস্বীকার করে। পক্ষান্তরে আরেকজন বাদশাহকে স্বীকার করে এবং তাঁর সহানুভূতি লাভের জন্য অন্য কোনো উজির বা উচ্চপদস্থ ব্যক্তির মধ্যস্থতা গ্রহণ করে। নিঃসন্দেহে দ্বিতীয় প্রকারের লোকটি বাদশার নৈকট্য পাবে। তবে আল্লাহপাকের ক্ষেত্রে বিষয়টি কিছুটা ভিন্ন। তিনি নিজেই কোনো মধ্যসূত্র গ্রহণ করতে নিষেধ করেছেন। তাই সেটা করা যাবে না। আল্লাহকে অস্বীকারকারী মুশরিকদের মধ্য থেকে নেতৃস্থানীয় মুশরিক হলো ফিরআউন। পবিত্র কুরআনে ঘটনা বর্ণিত আছে-
يَا هَامَانُ ابْنِ لِي صَرْحًا لَعَلَّى أَبْلُغُ الْأَسْبَابَ - أَسْبَابَ السَّمَاوَاتِ فَأَطَّلِعَ إِلَى إِلَهِ مُوسَى وَإِنِّي لَأَظُنُّهُ كَاذِبًا
'ফিরআউন আরও বলল, "হে হামান! আমার জন্য একটি উঁচু ইমারত বানাও, যাতে আমি অবলম্বন পাই। আসমানে আরোহণের অবলম্বন, যাতে আমি মুসার ইলাহকে দেখতে পাই, আর আমি কেবল তাকে মিথ্যাবাদীই মনে করি।"[১]
আর দ্বিতীয় প্রকারের শিরক-অর্থাৎ আল্লাহকে পরিপূর্ণভাবে অস্বীকার না করে তাঁর পাশে অন্য কোনো মাখলুক বা সৃষ্টজীবকে শরীক করা-এটাকে শয়তান বেশি পছন্দ করে। কেননা এটা বিদআত। আর বিদআতের ব্যাপারে পূর্বসূরি কয়েকজন আলিমের মন্তব্য হলো-
الْبِدْعَةُ أَحَبُّ إِلَى إِبْلِيسَ مِنَ الْمَعْصِيَةِ: لِأَنَّ الْمَعْصِيَةَ يُتَابُ مِنْهَا وَالْبِدْعَةَ لَا يُتَابُ مِنْهَا
'অন্যান্য গুনাহের চেয়ে শয়তানের কাছে বিদআত বেশি পছন্দ। কারণ হলো, অন্য গুনাহ থেকে তাওবা করা যায়, বিদআত থেকে তাওবা করা হয় না।
ইবলিস বলে থাকে, 'আদম সন্তানকে আমি গুনাহের মাধ্যমে ধ্বংস করেছি। আর তারা আমাকে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ দিয়ে ধ্বংস করে দিয়েছে। এমন অবস্থা দেখে আমি তাদেরকে এমন গুনাহে লিপ্ত করে দিলাম, যাকে তারা নেকি ভেবে করতে থাকবে। ফলে কোনোদিন তাওবা করার কথা তাদের মনেও আসবে না।'
অন্যান্য গুনাহ শুধুমাত্র গুনাহে লিপ্ত ব্যক্তিকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে। কিন্তু বিদআত শুধুমাত্র একজনকেই নয়, বিদআতের প্রভাব সমাজের সর্বস্তরে ছড়িয়ে পড়ে। এবং অপরকেও উৎসাহিত করে। বিদআতে লিপ্ত ব্যক্তি অন্যান্য কবীরা গুনাহে লিপ্ত ব্যক্তি থেকে অধিক নিকৃষ্ট। কেননা, বিদআত আল্লাহর সিফাতের মধ্যে বিকৃতি ঘটায়, কিন্তু অন্য গুনাহে তা হয় না। অন্য গুনাহে লিপ্ত ব্যক্তি আখিরাতের সঠিক পথে থেকেই ভুলভ্রান্তি করে। কিন্তু বিদআতে লিপ্ত ব্যক্তির আখিরাতের পথই ভুল হয়ে যায়।
টিকাঃ
[১] সূরা মুমিন, আয়াত-ক্রম: ৩৬, ৩৭
📄 মানবহত্যা ও জুলুম-নির্যাতন
শিরকের পর সবচেয়ে বড় গুনাহ হলো, অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা করা এবং জুলুম করা। ইনসাফ ও ন্যায়বিচারের ওপর সারা পৃথিবী টিকে আছে। জুলুম ইনসাফের বিপরীত বিষয়। মানুষকে ইনসাফের কথা স্মরণ করিয়ে দিতে আল্লাহ তাআলা নবী-রাসূলদেরকে প্রেরণ করেছেন। আসমানী কিতাব সমূহেও বহুবার জুলুমের কথা উল্লেখ করেছেন। জুলুম করতে নিষেধ করেছেন। ইনসাফের নীতি প্রতিষ্ঠার আদেশ করেছেন। জুলুম নৈরাজ্যের পথ খুলে দেয়। অতএব যে জুলুমের প্রতিক্রিয়ায় যতটা নৈরাজ্য সৃষ্টি হবে, সে জুলুম ততটা ভয়ংকর বলে বিবেচিত হবে।
হত্যাকাণ্ডের মধ্যে নিজের শিশু সন্তানকে হত্যা করা এবং সন্তানের দিক থেকে পিতামাতাকে হত্যা করা সর্বাপেক্ষা নিকৃষ্টতর জুলুম। আল্লাহ শিশুদের এমনভাবে সৃষ্টি করেন, সকলেই তাদেরকে ভালোবাসে। বিশেষত, সন্তানের প্রতি পিতামাতার ভালোবাসার তুলনা হয় না। তবু কেউ যদি এই ভয়ে হত্যা করে যে, সন্তান আগামীতে দারিদ্র্যের কারণ হবে, তার সম্পদের অংশীদার হবে, তাহলে এর চেয়ে নিকৃষ্ট জুলুম আর হতে পারে না। অপরদিকে পিতামাতা হলেন মানুষের পৃথিবীতে আসার একমাত্র মাধ্যম। কেউ যদি তার পিতামাতাকে হত্যা করে, সেটাও অতি নিকৃষ্ট জুলুম হিসেবে বিবেচিত হবে।
নিহত ব্যক্তির অবস্থা ভেদে হত্যার স্তর নির্ণিত হয়। নিহত ব্যক্তি যদি নবী, সাহাবী অথবা দ্বীনের দাঈ আলিম হন, তাহলে পিতামাতা ও সন্তান হত্যার পরে এটাই সর্বাপেক্ষা বড় জুলুম। এবং কিয়ামতের দিন হত্যাকারীকে কঠিন জিজ্ঞাসাবাদ ও শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে।
আল্লাহ তাআলা কোনো মুমিনকে ইচ্ছাকৃত হত্যার শাস্তি হিসেবে চিরস্থায়ী জাহান্নামের বিধান করেছেন। ইচ্ছাকৃত হত্যাকারীর ওপর আল্লাহর ক্রোধ ও লানত বর্ষিত হয়। কোনো ব্যক্তি যদি অমুসলিম থাকা অবস্থায় কোনো মুমিনকে হত্যা করে, অতঃপর ইসলাম গ্রহণ করে, তাহলে মুসলিম শাসক ইসলামের স্বার্থে রক্তপাত ছাড়াই ক্ষতিপূরণ গ্রহণ করে তাকে ক্ষমা করে দিতে পারেন। তবে মুসলিম ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে অপর মুসলমানকে হত্যা করলে তাকে কোনোভাবে ক্ষমা করা যাবে কিনা, এ বিষয়ে ইমামদের মধ্যে মতানৈক্য রয়েছে। ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বল থেকেই দুটি মত বর্ণিত আছে।
যাঁরা মনে করেন হত্যাকারীর তাওবা কবুল হবে না, ক্ষতিপূরণ আদায় করলেও তাকে ক্ষমা করা যাবে না, তাঁদের যুক্তি হলো, হত্যাকারীর হয়তো আরো দীর্ঘদিন হায়াত পাওয়ার সম্ভাবনা ছিল। হত্যাকারী তার সেই হায়াত ছিনিয়ে নিয়েছে। মৃতব্যক্তির ক্ষতিপূরণ গ্রহণের সম্ভাবনাও শেষ হয়ে গেছে। ফলে ইনসাফ হলো, আইনের মাধ্যমে হত্যাকারীকেও একই শাস্তি প্রদান করা। এখানে ক্ষতিপূরণের কোনো সুযোগ নেই। নিহতের হক কেবলই তার নিজের। তার উত্তারাধিকারগণ সে হক গ্রহণ করলে নিহত ব্যক্তির কিছু যায়-আসে না। আর ওয়ারিশরা হত্যাকারীর কাছ থেকে যে ক্ষতিপূরণ পাবে তা হলো ওই জিনিসের বিনিময়, যা নিহত ব্যক্তি ওয়ারিশদেরকে দিত। ক্ষতিপূরণের মাধ্যমে ওয়ারিশদের হক আদায় হলেও নিহত ব্যক্তির জীবনের ঋণ থেকেই যায়। তা আদায় করার বিকল্প কোনো সুযোগ নেই। যদি ওয়ারিশদের ক্ষতিপূরণ আদায়ের মাধ্যমে হত্যাকারীর সঙ্গে কোনো সমঝোতা হয়, তারপরেও হাশরের ময়দানে হত্যাকারীকে নিহতের হক নষ্ট করার অপরাধে কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে।
অন্যান্য ইমামগণ বলেন, ক্ষতিপূরণ এবং তাওবা-ইস্তিগফারের মাধ্যমে তার তাওবা কবুল করা হবে। কেননা হত্যাকারী শরয়ী বিধান অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ দিচ্ছে। এবং কৃত অপরাধের জন্য ক্ষমাপ্রার্থনাও করেছে।
তাঁরা আরও বলেন, যেহেতু কুফর-শিরক এবং যাদুটোনার মতো বড় বড় গুনাহ তাওবা করার দ্বারা মাফ হয়ে যায়, সুতরাং হত্যাকাণ্ডের অপরাধও তাওবা-ইস্তিগফারের মাধ্যমে মাফ হয়ে যাবে। আল্লাহ তাআলা তো সেসব কাফিরকেও ক্ষমা করে দিয়েছেন, যারা তাঁর প্রিয় ব্যক্তিদের হত্যা করেছে। ইসলাম গ্রহণের পর তাদেরকে শুধু ক্ষমা করেননি, বরং প্রিয়ভাজনেও পরিণত করেছেন। পবিত্র কুরআনে বর্ণিত আছে-
قُلْ يَا عِبَادِيَ الَّذِينَ أَسْرَفُوا عَلَى أَنْفُسِهِمْ لَا تَقْنَطُوا مِنْ رَحْمَةِ اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ جَمِيعًا
'আপনি বলে দিন, হে আমার বান্দাগণ, যারা নিজদের উপর বাড়াবাড়ি করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। অবশ্যই আল্লাহ সকল পাপ ক্ষমা করে দেবেন।' [১]
এই আয়াতটি ব্যাপকার্থে ব্যবহৃত হয়েছে। কুফর-শিরকসহ সবরকমের গুনাহ তাওবার মাধ্যমে মাফ হয়ে যায়।
ইমামগণ বলেন, তাওবা দ্বারা সকল গুনাহ মাফ হয়ে যাওয়ার পর নিষ্পাপ একটি মানুষকে শাস্তি দেয়া শরীয়ত-বিরুদ্ধ। এ ক্ষেত্রে তাওবা করার অর্থ হলো, হত্যাকারী ব্যক্তি তার প্রাণ নিহতের হাতে তুলে দেয়া। যেহেতু নিহতের হাতে তুলে দেয়ার সম্ভাবনা শেষ হয়ে গেছে, তাই নিহতের স্থলে তার প্রাণের মালিকানা চলে যাবে নিহতের ওয়ারিশদের হাতে। তারা তাকে কিসাসের জন্য শাসকের হাতে তুলে দিতে পারে অথবা ক্ষতিপূরণ গ্রহণ করতে পারে। অথবা চাইলে সম্পূর্ণ মাফ করে দিতে পারে। তাদের মতামতকেই নিহতের মতামত বলে বিবেচনা করা হবে।
টিকাঃ
[১] সূরা যুমার, আয়াত-ক্রম: ৫৩
📄 একটি হত্যাকাণ্ড তিন ধরনের হক নষ্ট করে–
১. আল্লাহর হক
২. নিহত ব্যক্তির হক
৩. নিহত ব্যক্তির নিকটাত্মীয়ের হক
হত্যা করার পর ঘাতক যদি আল্লাহর কাছে লজ্জিত হয়ে খাঁটি মনে তাওবা করে এবং নিহতের আত্মীয়দের সঙ্গে সমঝোতা করে ফেলে, তাহলে আল্লাহ তাকে মাফ করে দেবেন।
ঘাতক যখন তার প্রাণ নিহতের আত্মীয়দের হাতে তুলে দেবে, এবং আত্মীয়রা যদি তাকে ক্ষতিপূরণসহ অথবা ক্ষতিপূরণ ছাড়া ক্ষমা করে দেয়, তাহলে আত্মীয়দের হকও আদায় হয়ে যাবে।
অবশিষ্ট থাকল নিহত ব্যক্তির হক। ঘাতক যদি পৃথিবীতেই আল্লাহ ও নিহতের আত্মীয়দের কাছ থেকে ক্ষমা আদায় করে নিতে পারে, তাহলে আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিন নিহত ব্যক্তিকে হত্যার বিনিময়ে উত্তম প্রতিদান দেবেন।