📘 রূহের খোরাক > 📄 শিরকের মূলকথা

📄 শিরকের মূলকথা


শিরক কী?

সহজ কথায় শিরক হলো, এক বস্তুকে অপর একটি বস্তুর অনুরূপ মনে করা।

শরীয়তের ভাষায় শিরক হলো, বান্দাকে আল্লাহর মতো অথবা আল্লাহকে বান্দার মতো মনে করা। উদাহরণস্বরূপ- الكمال বা 'পূর্ণাঙ্গতা' আল্লাহ তাআলার একটি গুণ। কেউ যদি এই গুণটি আল্লাহর জন্য মেনে নেয় এবং সে-অনুযায়ী আমল করে, তাহলে সেটা হবে তাওহীদ। কিন্তু আল্লাহ তাআলা যাদের হৃদয় বদ্ধ করে দিয়েছেন, যাদের সত্য দেখার অন্তর্দৃষ্টি অন্ধ করে দিয়েছেন, তারা সহজভাবে তাওহীদের এই সত্য মেনে নিতে চায় না। সত্যের গায়ে অন্য জামা চড়িয়ে তারপর বিশ্বাস করে। তারা অপর কোনো ব্যক্তি বা বস্তুকে আল্লাহর অনুরূপ মনে করাকে সম্মান জ্ঞান করে। বস্তুত তারাই মুশরিক, যারা কোনো মাখলুক বা সৃষ্টিকে আল্লাহর কোনো সিফাত বা গুণাবলির অংশীদার মনে করে। সেটা যত অল্প পরিসরেই হোক না কেন। তা শিরক বলেই গণ্য হবে।

আল্লাহ তাআলার আরেকটি গুণ হলো, এ বিশাল ব্রহ্মাণ্ডের সকল লাভ, ক্ষতি ও ক্ষমতার একচ্ছত্র মালিক তিনি। অন্য কারো সঙ্গে এর ন্যূনতম কোনো সম্পর্ক নেই। যখন কোনো ব্যক্তি উপরোক্ত কথাগুলি বিশ্বাস করে এবং মেনে নেয়, তখন তার জন্য আবশ্যক হলো, দুআ, ভয় ও ভরসার সকল সম্পর্ক সে কেবল আল্লাহ তাআলার সঙ্গেই রাখবে। আর কোনো ব্যক্তি যদি এসকল বিষয়ের সম্পর্ক কোনো মাখলুকের সঙ্গে তৈরি করে নেয়, তাহলে সে নিঃসন্দেহে ওই মাখলুককে আল্লাহর সমকক্ষে পরিণত করল। কোনো সৃষ্টিই স্বয়ং নিজ প্রাণ, হায়াত ও মউতের মালিক না। সে কীভাবে তারই মতো অপর কোনো সৃষ্টির তরফে এসবের মালিক হয়? নিজের ভালোমন্দই অন্যের হাতে — এমন এক মাখলুক কীভাবে এমন এক সত্তার সমকক্ষ হয়, যিনি সমস্ত জগতের প্রতিপালক। যাঁর ইচ্ছার বিপরীতে গাছের একটি পাতাও নড়ে না। তিনি যাকে ইচ্ছা দান করেন, যাকে ইচ্ছা দান বন্ধ করে দেন। যাকে তিনি দিতে চান না, তাকে অন্য কেউই দিতে পারে না। তিনি যদি বান্দাদের জন্য রহমতের দরজা বন্ধ করে দেন, ভূপৃষ্ঠের আবাদি ভূমিগুলিকে অনুর্বর করে দেন, নদী নালা শুকিয়ে দেন, তবে কেউই রহমতের সে-দরজা খুলে দিতে পারবে না। সৃষ্টিজগত অভাবে হাহাকার করবে। আর যখন তিনি রহমতের দরজা খুলে দেবেন, তখন গাছে গাছে বাতাসে সবুজ পাতা দুলবে। পাখিদের কলরবে বন মুখরিত হয়ে উঠবে। বৃষ্টি হবে। ফল ও ফসলে আবাদি ভরে উঠবে। তাঁর রহমতের দরজা অন্য কেউ বন্ধ করতে পারবে না। এমন মহান ক্ষমতাশীল আল্লাহ তাআলার সঙ্গে নগন্য এক সৃষ্টির তুলনা করাকে পৃথিবীর সবচেয়ে নিকৃষ্ট তুলনা বলা যেতে পারে। তবুও আল্লাহর অসংখ্য বান্দা দৈনন্দিন জীবনে না বুঝে অথবা বুঝেই এই ভুলের ফাঁদে পা দিয়ে ফেলে।

আল্লাহ তাআলার পূর্ণাঙ্গতার গুণের কথা উপরে বলা হয়েছে। বলা হয়েছে, সর্বাঙ্গীন পূর্ণাঙ্গ কেবল তাঁকেই বলা যায়, যাঁর মধ্যে কোনো ত্রুটি থাকবে না। আর এই বৈশিষ্ট্য শুধুমাত্র আল্লাহ তাআলার জন্যই। পৃথিবীর কোনো সৌন্দর্যই ত্রুটি মুক্ত নয়। ফলে আল্লাহ ছাড়া আর কেউই মাবুদ হতে পারবে না। আল্লাহ তাআলা সামনে থাকা সত্ত্বেও যদি কেউ অপর কোনো মাখলুকের কাছে নিজের শ্রদ্ধা, ভালোবাসা, ভয়, বিশ্বাস, আনুগত্য ও ভরসা সঁপে দেয়, তাহলে তার এই আচরণ হবে নিরেট মূর্খতা। শুধু মূর্খতাই নয়, প্রকারান্তরে এ এক মহা-জুলুম। আল্লাহ তাআলা এত ক্ষমাবান হওয়ার পরেও এ ধরনের মাখলুককে ক্ষমা না করার কথা বলেছেন।
আল্লাহ তাআলার উল্লেখযোগ্য আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো, উপাসনার একচ্ছত্র অধিকারী একমাত্র তিনিই। বান্দা যখন তার প্রতিপালককে চিনতে পারে, তখন মহান প্রতিপালকের প্রতি নিজের আনুগত্যকে প্রকাশ্যে প্রদর্শন করা তার অবশ্য-পালনীয় কর্তব্য হয়ে যায়। আল্লাহর আনুগত্য লুকিয়ে রাখার বিষয় নয়। এক্ষেত্রে বান্দার করণীয় হলো-
* মহান প্রতিপালক আল্লাহ তাআলার প্রতি সীমাহীন ভালোবাসা পোষণ করা।
* আল্লাহ তাআলার সামনে নিজের চূড়ান্ত অক্ষমতা ও দুর্বলতা তুলে ধরা।
এ দুটি কাজই আনুগত্যের সর্বোচ্চ প্রকাশ করে থাকে। বান্দার তাকওয়া, আল্লাহভীতির সবরকমের স্তর এই দুই বিষয়ের তারতম্যের কারণেই তৈরি হয়। মানুষ যখনই এ দুটি বিষয়ে সামান্য উদাসীন হয়ে পড়ে, তখনই তার বিশ্বাসে আমূল পরিবর্তন সূচিত হয়। নিজের অলক্ষেই আল্লাহমুখী হৃদয় নম্বর সৃষ্টিজগতের দিকে ঝুঁকে যায়। মহান রবের প্রতি একনিষ্ঠ বিশ্বাস, ভালোবাসা ও আনুগত্যের জায়গাগুলোতে চিড় ধরে। অসংখ্য শিরকের দরজা খুলে যায়। মস্তিষ্কে শয়তান বাসা বাঁধে। গুনাহের ভয়াবহতাকে হালকা করে তোলে। মানুষ তার ধ্বংসের পদধ্বনি ঘুর্ণাক্ষরেও টের পায় না। নির্ভেজাল ঈমানের ওপর টিকে থাকা নিঃসন্দেহে পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন কাজ। শুধুমাত্র সেসকল লোকের পক্ষেই সম্ভব, যাদের ওপর আল্লাহ তাআলার বিশেষ রহমত রয়েছে। যাদেরকে তিনি পছন্দ করেছেন, তাদের নিকট দ্বীনের দাওয়াত প্রেরণ করেছেন। আর যারা আরও বেশি সৌভাগ্যবান, তাদেরকে পবিত্র এ দ্বীনের দাঈ ও রাহবার বানিয়েছেন। যুগে যুগে নবী-রাসূলদের প্রেরণ করেছেন। বান্দাদেরকে ঈমানের সৌভাগ্য দান করেছেন। তাদের জন্য কিতাব অবতীর্ণ করেছেন, তারা মহান রবের ঐশ্বরিক নূরের আলোয় উদ্ভাসিত জীবনে সফলতা অর্জন করেছেন। তাদের জন্যই আল্লাহ তাআলা কুরআনুল কারীমে ইরশাদ করেন-
يَهْدِي اللَّهُ لِنُورِهِ مَنْ يَشَاءُ
'আল্লাহ তাআলা যাকে ইচ্ছা করেন, তার নূরের দিকে পথ প্রদর্শন করেন।' [১]
আল্লাহ এমন এক সত্তা যে, গোটা সৃষ্টিজগত শুধু তাকেই সিজদা করবে। এটাও তাঁর একটি বিশেষ গুণ। সিজদা নামক ইবাদাতটি কেবলই তাঁর জন্য। বান্দা যখনই অন্য কোনো সৃষ্টির সামনে মাথা ঝুঁকায়, তখনই সে শিরকে লিপ্ত হয়ে যায়। শিরকমুক্ত জীবনের সকল সিজদা হবে একমাত্র আল্লাহ তাআলার সমীপে।
তাওয়াক্কুল বা আল্লাহ তাআলার উপর ভরসা ও আস্থা রেখে জীবনের চলার পথে এগিয়ে যাওয়াও শিরকমুক্ত জীবনের অন্যতম আবশ্যকীয় যোগ্যতা।
শিরকমুক্ত জীবনের অন্যতম বিশ্বাস হলো, সিজদার অনুরূপ তাওবাও কেবল আল্লাহ তাআলার কাছেই করতে হয়। আল্লাহ তাআলাই বান্দার তাওবা গ্রহণের একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিকারী। বান্দা সকল অবাধ্যতা ত্যাগ করে গুনাহ মোচনের জন্য একমাত্র তাঁরই দিকে প্রত্যাবর্তন করবে। এর বিপরীতে সব শিরক। আল্লাহ এবং বান্দার মাঝে অন্য কোনো মাখলুকের অনুপ্রবেশ মাত্রই সেখানে একটি সাদৃশ্যের প্রসঙ্গ উপস্থিত হওয়া। আল্লাহর আসনে অন্যায়ভাবে সমাসীন মাখলুক কি তবে আল্লাহরই মতো? অন্যথায় সে কীভাবে আল্লাহর আসনে সমাসীন হতে পারে? এ প্রশ্নের ভেতর দুটি ব্যক্তিত্বের উপস্থিতি আছে। প্রথমত, যে অপর একজনকে আল্লাহর সমকক্ষ জ্ঞান করল। আরেকজন হলো, যে আল্লাহর সমকক্ষের স্থানে আসীন হলো। সত্যিকারার্থেই যদি কোনো ব্যক্তি নিজেকে আল্লাহর সমকক্ষ মনে করে, এবং সে অনুযায়ী কাজ করা শুরু করে, নিজের বড়ত্বের কথা ঘোষণা করে, চাটুকারদের মুখে মুখে নিজের কীর্তির কথা ছড়িয়ে দিতে থাকে, মানুষকে তার সামনে মাথানত করতে বাধ্য করে, তাহলে এসব কর্মের ফলে সে সাদৃশ্যগত শিরকের চুড়ান্তে পৌঁছে যায়। এদেরকে আল্লাহ তাআলা চূড়ান্ত লাঞ্ছিত করার ঘোষণা দিয়েছেন। একদিন এ সকল অপরাধীকে তিনি মানুষের পদতলে ধুলোয় মিশিয়ে দেবেন।
নবীজি ইরশাদ করেন, মহা-প্রতিপালক আল্লাহ তাআলা ঘোষণা দিচ্ছেন-
الْعَظَمَةُ إِزَارِي، وَالْكِبْرِيَاءُ رِدَائِي، فَمَنْ نَازَعَنِي وَاحِدًا مِنْهُمَا عَذَبْتُهُ
'ইযযত আমার গায়ের পোশাক এবং অহংকার আমার চাদর। যদি কেউ এই দুটি ধরে টানাটানি করে, আমি তাকে শাস্তি দেব।' [১]
ভাস্কর্য ও ছবি নির্মাতাগণ নিজ হাতে মানুষের অবয়ব তৈরি করে। এই কাজটি আল্লাহ তাআলার সৃষ্টির সঙ্গে সাদৃশ্য রাখে। ফলে তারা কিয়ামতের দিন কঠিন জিজ্ঞাসাবাদ ও শাস্তির সম্মুখীন হবে। লক্ষণীয় বিষয় হলো, আল্লাহর কার্যক্রমের সঙ্গে সাদৃশ্য রাখে—এমন কাজ কত বড় অন্যায়!
নবীজি ইরশাদ করেন—
أَشَدُّ النَّاسِ عَذَابًا يَوْمَ الْقِيَامَةِ الْمُصَوِّرُونَ، يُقَالُ لَهُمْ أَحْيُوا مَا خَلَقْتُمْ
'কিয়ামতের দিন সবচেয়ে বেশি শাস্তি ভোগ করবে ছবি-নির্মাতারা। তাদেরকে বলা হবে, তোমরা যা নির্মাণ করেছ তাতে প্রাণ সঞ্চার করো।[২]'
অন্যত্র রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন—
قَالَ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ: وَمَنْ أَظْلَمُ مِمَّنْ ذَهَبَ يَخْلُقُ خَلْقًا كَخَلْقِي، فَلْيَخْلُقُوا ذَرَّةٌ، فَلْيَخْلُقُوا شَعِيرَةً
"আল্লাহ তাআলা বলেন, "ওই ব্যক্তির চেয়ে বড় জালিম আর কে হতে পারে, যে আমার সৃষ্টির মতো সৃষ্টি করতে উদ্যত হয়। তারা যেন একটি ধূলিকণা এবং একটি জবের শস্য সৃষ্টি দেখায়।[৩]"
এ হাদীসে আল্লাহ তাআলা একটি ধুলিকণা ও একটি শস্যের কথা উল্লেখ করেছেন। এত ক্ষুদ্র কোনো বস্তু সৃষ্টি করতেই বান্দা অক্ষম হয়ে যায়। সুতরাং এর চেয়ে বৃহৎ কোনো সৃষ্টির কথা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। উপরের হাদীসে সেসকল লোকের শাস্তির কথা বলা হয়েছে, যারা কোনো কাজের ক্ষেত্রে আল্লাহর সঙ্গে সাদৃশ্য রাখে। আর যারা স্বয়ং আল্লাহর ক্ষমতা ও প্রভুত্বের সঙ্গে সাদৃশ্য রাখতে চায়, তাদের পরিণতি কতটা ভয়াবহ, তা সহজেই অনুমেয়। একই পরিণতি সেসকল লোকদের জন্যেও, যারা নিজেদের জন্য আল্লাহ তাআলার বিশেষ কোনো নাম গ্রহণ করে। 'রাজাধিরাজ', 'মহাপরাক্রমশালী' অথবা 'সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী'-এ-জাতীয় অর্থ বুঝায়, এমন কোনো নাম বান্দার জন্য সমীচীন নয়।
হাদীসে বর্ণিত হয়েছে-
إِنَّ أَخْنَعَ الْأَسْمَاءِ عِنْدَ اللَّهِ رَجُلٌ يُسَمِّي بِشَاهَانُ شَاهُ - أَيْ مَلِكِ الْمُلُوكِ - لَا مَلِكَ إِلَّا اللهُ وَفِي لَفْظ : أَغِيظُ رَجُلٍ عَلَى اللَّهِ رَجُلٌ يُسَمَّى بِمَلِكِ الْأَمْلَاكِ
'আল্লাহ তাআলার নিকট সবচেয়ে নিকৃষ্ট নাম হলো 'রাজাধিরাজ', 'সকল বাদশাহের বাদশাহ' ইত্যাদি নাম। আল্লাহ ছাড়া রাজাধিরাজ আর কেউ নেই।' [১] অপর এক হাদীসে বর্ণিত আছে- 'আল্লাহ তাআলার নিকট সবচেয়ে ক্রোধ-উদ্রেককারী হলো ঐ ব্যক্তি, যার নাম 'রাজাধিরাজ'।[২]
আল্লাহপাকের ক্রোধ সেসব লোকদের উপরই নিপতিত হবে, যারা আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো জন্য বৈধ নয়-এমন নাম গ্রহণ করে। কেননা, আহকামুল হাকিমীন, মালিকুল আমলাক, শাহানশাহ (সকল ক্ষমতার অধিকারী) কেবল আল্লাহ তাআলা। তিনিই সমগ্র জাহানের একচ্ছত্র অধিপতি। আসমান-জমিন সর্বত্র কেবল তাঁরই বিধান কার্যকর হয়। তিনি মহাপরাক্রমশালী। তাঁর সমকক্ষ কেউ নেই, কখনো হবেও না।

টিকাঃ
[১] সূরা নূর, আয়াত-ক্রম: ৩৫
[১] আবু দাউদ, হাদীস-ক্রম: ৪০৯০
[২] বুখারী, হাদীস-ক্রম: ৫৯৫০
[৩] বুখারী, হাদীস-ক্রম: ৫৯৫৩
[১] বুখারী, হাদীস-ক্রম: ৬২০৬
[২] মুসলিম, হাদীস-ক্রম: ২১৪৩

📘 রূহের খোরাক > 📄 আল্লাহর প্রতি খারাপ ধারণা পোষণ করা কবীরা গুনাহ

📄 আল্লাহর প্রতি খারাপ ধারণা পোষণ করা কবীরা গুনাহ


আল্লাহ তাআলার প্রতি খারাপ ধারণা পোষণ করা ধারণাতীত বড় গুনাহ। আল্লাহর প্রতি মন্দ ধারণা করে তাঁর মর্যাদা-পরিপন্থী একটি অবস্থান তৈরি করা বান্দার জন্য কোনো অবস্থাতেই বৈধ নয়। আল্লাহ তাআলা খারাপ-ধারণা-পোষণকারীদের ব্যাপারে এতটা কঠোর ক্রোধ ও লানতের কথা বলেছেন, যা অন্য কোনো গুনাহের ক্ষেত্রে বলেননি।
পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে-
عَلَيْهِمْ دَائِرَةُ السَّوْءِ وَغَضِبَ اللَّهُ عَلَيْهِمْ وَلَعَنَهُمْ وَأَعَدَّ لَهُمْ جَهَنَّمَ وَسَاءَتْ مَصِيرًا
'তারা অকল্যাণে নিমজ্জিত। আর আল্লাহ তাদের ওপর রাগান্বিত হয়েছেন, তাদের ওপর লানত বর্ষণ করেছেন এবং তাদের জন্য প্রস্তুত করে রেখেছেন জাহান্নام। তাদের ঠিকানা কত নিকৃষ্ট![১]
পবিত্র কুরআনে আরও ইরশাদ হয়েছে-
وَذَلِكُمْ ظَنُّكُمُ الَّذِي ظَنَنْتُمْ بِرَبِّكُمْ أَرْدَاكُمْ فَأَصْبَحْتُمْ مِنَ الْخَاسِرِينَ
'তোমরা যারা তোমাদের প্রতিপালকের ব্যাপারে মন্দ ধারণা পোষণ করো, এ ধারণাই তোমাদের ধ্বংস করে দিয়েছে। পরিণতিতে তোমরা কেবল ক্ষতিগ্রস্তই হবে।' [২]
পবিত্র কুরআনের অপর এক স্থানে আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রিয় বন্ধু ইবরাহীম আলাইহিস সালামের একটি কথা উল্লেখ করেন, যা ইবরাহীম তাঁর জাতিকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন-
مَاذَا تَعْبُدُونَ - أَئِفْكًا آلِهَةً دُونَ اللَّهِ تُرِيدُونَ - فَمَا ظَنُّكُمْ بِرَبِّ الْعَالَمِين
'তোমরা কার উপাসনা করো? তোমরা কি আল্লাহকে ছেড়ে মিথ্যা উপাস্যদেরকেই কামনা করো? তাহলে সমগ্র জগতের প্রতিপালক আল্লাহ তাআলার ব্যাপারে তোমাদের কী ধারণা?'[১]
আয়াতের উদ্দেশ্য হলো, আজ তোমরা আল্লাহকে ছেড়ে অন্য কিছুর উপাসনা করছ, কিন্তু হাশরের দিবসে তোমাদেরকে আল্লাহর সামনে দাঁড়াতে হবে। সেদিন তোমাদের কী পরিণতি হবে? তোমাদের ক্ষুদ্র চোখে তোমরা আল্লাহর ত্রুটি খুঁজে পেলে এবং আল্লাহর সঙ্গে শরীক করলে। কিন্তু তোমরা তোমাদের জ্ঞানের ত্রুটির কথা ভাবলে না। আল্লাহর বড়ত্ব ও মহত্ব সম্পর্কেও পুনরায় ভেবে দেখার প্রয়োজন বোধ করলে না। আল্লাহ তাআলা তো সেই ইচ্ছাধারী সত্তা, যাঁর ইচ্ছার কখনো ব্যতিক্রম হয় না। তিনি সর্বজ্ঞানী, সর্বশ্রোতা ও সর্বদ্রষ্টা। তিনি ধনী। তিনি মালিক। কারো মুখাপেক্ষী নন। সমস্ত সৃষ্টিজগত তাঁর অনুগ্রহের মুখাপেক্ষী। তিনি ন্যায়বিচারক। বান্দার সঙ্গে ইনসাফের বিচার করেন। জগতের সকল বিষয় সম্পর্কে সবিস্তার অবগত। কোথাও তাঁর আড়াল বলে কিছু নেই। জগতের আর কোনো রাজা-বাদশাহ তাঁর মতো নয়। আল্লাহ তাআলা নিজ ক্ষমতায় তাঁর সকল ইচ্ছা পূর্ণ করতে পারেন।
ধরা যাক, কোনো এক জাগতিক বাদশাহর কথা। তিনি তাঁর রাজ্য খুব ভালোভাবে পরিচালনা করছেন। কিন্তু প্রজাদের দুঃখ-দুর্দশা কিংবা আনন্দ তিনি নিজ চোখে দেখতে পারেন না। অন্যদের মাধ্যমে গৃহীত সংবাদ তাঁর কানে পৌঁছায়। তিনি চাইলেই প্রজাদের ঘরে ঘরে নিজ হাতে সহযোগিতা পৌঁছে দিতে পারেন না। তাঁর চারপাশের একটি বিশাল মন্ত্রীপরিষদ এবং প্রশাসন তাঁকে সহযোগিতা করে। তাদের সাহায্য নিতে তিনি বাধ্য। তাঁর একার পক্ষে রাজ্য পরিচালনা সম্ভব নয়। সকলেই কোথাও না কোথাও বাঁধা। অপারগতা, দুর্বলতা সকলেরই থাকে। কিন্তু আল্লাহ তাআলার কোনো দুর্বলতা নেই। তিনি কারো মুখাপেক্ষী নন। তিনি অসীম দয়ালু। তাঁর রহমত এ বিশাল ব্রহ্মাণ্ডকে ঘিরে আছে। যাকে ইচ্ছা তাকে দিতে পারেন। ফিরিয়েও নিতে পারেন। বান্দা এবং তাঁর মাঝে কোনো মধ্যসূত্রের প্রয়োজন নেই। কোনো মধ্যসূত্র স্বীকার করার অর্থ আল্লাহপাকের সক্ষমতাকে খাটো করা। এটা প্রকারান্তরে আল্লাহর প্রতি খারাপ ধারণার শামিল। বান্দার জন্য নিজের মালিকের প্রতি মন্দ ধারণা পোষণ করার চেয়ে দুঃসাহসিক কাজ আর হতে পারে না। এ শুধু গুনাহই নয়, ভয়ানক ধৃষ্টতাও বটে। বান্দা কখনই স্রষ্টা হতে পারে না। তাঁর একজন স্রষ্টা ও প্রতিপালক আছেন; যাঁর ইবাদাত করতে হয়। তাঁর সামনে গিয়ে মাথা অবনত করতে হয়। নিজের দুর্বলতা ও অক্ষমতার কথা প্রকাশ করতে হয়। সর্বোপরি তাঁকে সিজদা করতে হয়। এ সকল আরাধনা ও উপাসনা পাওয়ার একমাত্র উপযুক্ত মালিক হলেন আল্লাহ তাআলা। আর কেউ নয়। ফলে, তাঁর প্রাপ্য উপাসনা অপর কোনো বস্তুর পদতলে অর্পণ করা একধরনের জুলুম। হক যার প্রাপ্য, তাকেই তা দিতে হবে। এতে কোনো হেরফের করা যাবে না। কুরআনে কারীমে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-
ضَرَبَ لَكُمْ مَّثَلًا مِّنْ اَنْفُسِكُمْ هَلْ لَّكُمْ مِّنْ مَّا مَلَكَتْ أَيْمَانُكُمْ مِّنْ شُرَكَاءَ فِيْ مَا رَزَقْنَاكُمْ فَاَنْتُمْ فِيْهِ سَوَاءٌ تَخَافُوْنَهُمْ كَخِيفَتِكُمْ اَنْفُسَكُمْ كَذَلِكَ نُفَصِّلُ الْآيَاتِ لِقَوْمٍ يَّعْقِلُوْنَ
'তিনি তোমাদের ভেতর থেকেই তোমাদেরকে একটি উদাহরণ দিয়েছেন যে, আমি তোমাদেরকে যেসকল রিযিক দান করেছি, সেসকল ক্ষেত্রে তোমাদের গোলামদের মধ্যে কেউ কি তোমাদের এমন শরীক আছে যে, তোমরা এক্ষেত্রে একজন আরেকজনের বরাবর? তোমরাও তাদেরকে ভয় করো, যেভাবে তোমরা নিজেদেরকে ভয় করো! বিচক্ষণ লোকদের জন্য আমি এভাবেই আয়াতসমূহ বিস্তারিত উল্লেখ করে থাকি। [১]
আয়াতের উদ্দেশ্য হলো, আল্লাহপ্রদত্ত রিযিকের মধ্যেই বান্দা তার গোলামকে অংশীদার করে না, তাহলে রাজাধিরাজ আল্লাহ তাআলা, সকল কিছুর যিনি সৃষ্টিকর্তা, তাঁরই সৃষ্ট কোনো এক গোলামকে তাঁর অংশীদার করা কীভাবে সঠিক হতে পারে? এমন কাজ যে করে, সে আল্লাহ তাআলার যথাযথ হক আদায় করে না। এদের ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-
يَا أَيُّهَا النَّاسُ ضُرِبَ مَثَلُ فَاسْتَمِعُوا لَهُ إِنَّ الَّذِينَ تَدْعُونَ مِنْ دُونِ اللَّهِ لَنْ يَخْلُقُوا ذُبَابًا وَلَوِ اجْتَمَعُوا لَهُ وَإِنْ يَسْلُبْهُمُ الذُّبَابُ شَيْئًا لَا يَسْتَنْقِذُوهُ مِنْهُ ضَعُفَ الطَّالِبُ وَالْمَطْلُوبُ مَا قَدَرُوا اللَّهَ حَقَّ قَدْرِهِ إِنَّ اللَّهَ لَقَوِيٌّ عَزِيزٌ
'হে লোক সকল! একটি উদাহরণ পেশ করা হলো, তোমরা তা ভালোভাবে শুনে নাও। তোমরা আল্লাহর বিপরীতে যাদের ইবাদাত করো, তারা একটি মাছিও সৃষ্টি করতে পারবে না; যদিও তারা এই উদ্দেশ্য নিয়ে সকলেই একত্রিত হয়। এমনকি যদি মাছি তাদের কাছ থেকে কিছু ছিনিয়ে নিয়ে যায়, তারা সেটাও ফিরিয়ে আনতে পারবে না। উপাস্য এবং উপাসক উভয়ই দুর্বল। তারা আল্লাহর যথোপযুক্ত হক আদায় করেনি। নিশ্চয় আল্লাহ শক্তিমান, মর্যাদার অধিকারী।[১]
যেসকল মূর্তি, নক্ষত্র ও প্রতীকের উপাসনা মানুষ করে থাকে, তারা এতটাই দুর্বল ও হীন যে, তাদের গায়ে একটি মাছি বসলেও তারা তা তাড়িয়ে দিতে পারে না। আর এমন অবান্তর বিশ্বাসী কী করে আল্লাহর মর্যাদার হক আদায় করবে, এটা সম্ভব না। আল্লাহ তাআলা আরও ইরশাদ করেন-
وَمَا قَدَرُوا اللَّهَ حَقَّ قَدْرِهِ وَالْأَرْضُ جَمِيعًا قَبْضَتُهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَالسَّمَاوَاتُ مَطْوِيَّاتٌ بِيَمِينِهِ سُبْحَانَهُ وَتَعَالَى عَمَّا يُشْرِكُونَ
'তারা আল্লাহর মর্যাদার হক আদায় করেনি, অথচ কিয়ামতের দিন জমিন আল্লাহর করায়ত্তে থাকবে। আর দুমড়ানো আকাশ থাকবে তাঁর ডান হাতে। তারা আল্লাহর সাথে যেসকল বস্তুকে শরীক করে, তিনি তা থেকে পবিত্র ও মহান।'[২]
যেই হতভাগা এমন মহৎ গুণাগুণের অধিকারী অবিনশ্বর সত্তা আল্লাহ তাআলার ইবাদাত করে না, অথবা করলেও তাঁর সঙ্গে তাঁরই কোনো সৃষ্টিকে শরীক করে, তাহলে এমন মানুষের চিন্তা ভঙ্গুর ও ক্ষয়িষ্ণু বলে বিবেচিত হয়। প্রজ্ঞাপূর্ণ চিন্তাশক্তির অধিকারী তো ওই ব্যক্তি, যে একবাক্যে আল্লাহকে মেনে নেয় এবং তাঁর সামনে মাথা নত করে দেয়। এমনিভাবে সেসকল মানুষও আল্লাহর হক পরিপূর্ণ আদায় করে না, যারা কিতাব ও নবী-রাসূলে বিশ্বাস করে না। আল্লাহ কোনো কিতাব এবং নবী-রাসূল প্রেরণ করেননি—আল্লাহর ব্যাপারে এমন ধারণা করা অবাঞ্ছনীয়। আল্লাহ কি তবে মানুষকে অযথা সৃষ্টি করেছেন? শুধু এজন্যই কি সৃষ্টি করেছেন যে, মানুষ পৃথিবীতে ঘুরে ফিরে খেয়ে দেয়ে একদিন মরে যাবে? আল্লাহ কখনো অপ্রয়োজনীয় কাজ করেন না। পৃথিবীতে বহু মানুষ আল্লাহর অনুগ্রহের ছায়ায় বসে থেকেও আল্লাহর হক সম্পর্কে উদাসীন। যারা আল্লাহ তাআলার কোনো গুণবাচক নামকে অস্বীকার করে, অথবা অর্থহীন মনে করে, তাদের দ্বারাও আল্লাহর হক যথাযথ আদায় হয় না। যারা মনে করে, বান্দাই তার কর্মের স্রষ্টা, এ সকল মানুষ একই সঙ্গে আল্লাহর অনেকগুলো গুণকে অস্বীকার করে। কর্ম সৃষ্টির পেছনে শ্রবণ, দর্শন, ইচ্ছা, মর্যাদা, কালাম—ইত্যাদি গুণের অবদান থাকে। সুতরাং কোনো ব্যক্তি যখন কাউকে কোনো কাজের স্রষ্টা বানিয়ে দেয়, তখন আল্লাহপাকের পূর্বোক্ত গুণাবলির সঙ্গে শিরক করা হয়। পৃথিবীতে আল্লাহর ইচ্ছা ছাড়া কিছু হয় না। যখন কেউ কাউকে স্রষ্টা বানিয়ে দেয়, তখন মনে হয়, যেন আল্লাহর রাজত্বে আল্লাহর অনিচ্ছায়ও কোনো কিছু সৃষ্টি করা সম্ভব, যা প্রকাশ্যই শিরক। আল্লাহ তাআলা সকল শিরক থেকে পবিত্র।
আর সেসকল লোকও আল্লাহর হক আদায় করে না, যারা মনে করে আল্লাহ মানুষকে এমন সব বিষয়ের জন্য জবাবদিহি করবেন এবং শাস্তি দেবেন, যা মানুষের সামর্থ্যে ছিল না। মূলত মানুষ আল্লাহর হুকুম পালনে অপারগ। আল্লাহ তাআলাই যাবতীয় কাজের মালিক। তিনিই তাঁর বান্দাদের দ্বারা কাজ করিয়ে নেন। তাদেরকে বাধ্য করেন। যেভাবে পৃথিবীতে একজন আরেকজন থেকে অনেকসময় বাধ্যতামূলকভাবে কোনো কাজ আদায় করে নেয়। আল্লাহ তাআলার ব্যাপারে এ ধরনের ভাবনা পোষণ করা বেশ শক্ত বেয়াদবি। কেননা দুনিয়াতেই যদি কোনো মনিব তার গোলামের ওপর এমন কাজ চাপিয়ে দেয়, যা সে করতে অক্ষম এবং গোলামকে সে এজন্য শাস্তিও দেয়, তাহলে সে সমাজের চোখে একজন খারাপ মনিব বলে বিবেচিত হবে। সাধারণ বিবেচনা-বোধসম্পন্ন মানুষের কাছেই যা খারাপ, আহকামুল হাকিমীন মহান আল্লাহর কাছে তা কী করে ভাল হয়! এবং তিনি নিজের জন্য তা কীভাবে পছন্দ করেন! এমন ধারণা পোষণ করা নেহায়েত অন্যায়। অগ্নি-উপাসক এবং তাদের মিত্ররা এমন নিন্দনীয় মতবাদের ধারক। এমন চিন্তাভাবনা লালনকারী লোকেরাও আল্লাহর হকের যথাযথ মর্যাদা আদায় করে না।
এ ছাড়াও তাদের আরেকটি ভ্রান্তি হলো, ফিরিশতারা এখনো পৃথিবীতে যাতায়াত করেন, তা তারা বিশ্বাস করে না।
আরও এক ধরনের মতাদর্শের মানুষ আছে, যারা মনে করে, আল্লাহর পুত্র-পরিজন রয়েছে। এরাও ভ্রান্ত।
আরেকদল মনে করে, আল্লাহ সকল বান্দার ভেতরে বসবাস করেন, অথবা আল্লাহ হলেন বান্দার প্রকৃত অস্তিত্ব। বলা বাহুল্য, তারা ভ্রান্ত মতের অনুসারী। এরা কেউই আল্লাহ তাআলার মর্যাদাকে যথাযথভাবে রক্ষা করতে সক্ষম হয়নি।
একইভাবে যারা আল্লাহ তাআলার রহমত, দয়া, অনুগ্রহ, ভালোবাসা, করুণা, সন্তুষ্টি, ক্রোধ, অসন্তোষ—ইত্যাদির বাস্তবতাকে অস্বীকার করে তারাও আল্লাহ তাআলার প্রকৃত মর্যাদার হক আদায় করতে সক্ষম হয়নি।
আরও একটি দল মনে করে, আল্লাহ ইসলামের দুশমনদের ইজ্জত ও ধন-সম্পদ দান করেছেন। তাদেরকে ক্ষমতা ও খ্যাতি দিয়ে পৃথিবীর সকলের ওপর প্রভাব বিস্তার করার ক্ষমতা দিয়েছেন। অপরদিকে আল্লাহ ও রাসূলের অনুরাগীদেরকে দরিদ্র ও সহায়হীন করেছেন। তাদের ভাগ্যে লাঞ্ছনার সিলমোহর মেরে দিয়েছেন। তারা পৃথিবীর যেখানেই উপনীত হবে, শুধু লাঞ্ছিতই হবে। আল্লাহর ব্যাপারে এমন ধারণা লালন করা ঠিক নয় তো বটেই, বরং ভারি অন্যায়ও। এটা ইহুদী-নাসারাদের কাছ থেকে ধার করা রাফেজীদের মতামত।
আল্লাহ তাআলার যথাযথ হক আদায় করে না, এমন আরও একটি ভ্রান্ত দলের মত হলো, কুরআন ও হাদীসে জান্নাত-জাহান্নামের যেসকল বিবরণ ও শর্ত প্রদান করা হয়েছে, এগুলি স্রেফ সংবাদ-জাতীয় কিছু বাণী। সারাজীবন আল্লাহকে না-মানা ভয়ংকর গুনাহগার ব্যক্তিও জান্নাতে যেতে পারে, এবং কখনো আল্লাহর নাফরমানি না করা ব্যক্তিও জাহান্নামে যেতে পারে। মানুষকে জান্নাত-জাহান্নামের কথা যা কিছু বলা হয়েছে, সবই মানুষকে সন্ত্রস্ত করার জন্য। এরচেয়ে বেশি কিছু নয়। অর্থাৎ হাশরের ময়দানে আল্লাহ তাআলা নির্বিচারে যাকে ইচ্ছা তাকে বেহেশত ও দোযখ দেবেন। আল্লাহর নিকট এ সব কিছুই সমান।
আল্লাহ তাআলা তাদের এই ভ্রান্ত ধারণার বিপরীতে কুরআনের আয়াত নাযিল করেছেন। তাদের এ ধরনের মনোভাব ও সিদ্ধান্তকে পৃথিবীর সবচেয়ে নিকৃষ্ট সিদ্ধান্ত বলে চিহ্নিত করেছেন। ইরশাদ করেন-
وَمَا خَلَقْنَا السَّمَاءَ وَالْأَرْضَ وَمَا بَيْنَهُمَا بَاطِلًا ذَلِكَ ظَنُّ الَّذِينَ كَفَرُوا فَوَيْلٌ لِلَّذِينَ كَفَرُوا مِنَ النَّارِ - أَمْ نَجْعَلُ الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ كَالْمُفْسِدِينَ فِي الْأَرْضِ أَمْ نَجْعَلُ الْمُتَّقِينَ كَالْفُجَّارِ
'আর আমি আসমান ও জমিন এবং এর মধ্যবর্তী কোনো কিছুই অনর্থক সৃষ্টি করিনি। এ তো কাফিরদের নিছক এক ধারণা। অবিশ্বাসীদের জন্য রয়েছে জাহান্নামের দুর্ভোগ। যারা ঈমান এনেছে তাদেরকে কি আমি পৃথিবীতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদের মতো বানিয়ে দেব? মুত্তাকীদেরকে পাপাচারীদের কাতারে রাখব?' [১]
অন্য আয়াতে বলেন-
أَمْ حَسِبَ الَّذِينَ اجْتَرَحُوا السَّيِّئَاتِ أَنْ نَجْعَلَهُمْ كَالَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ سَوَاءٌ مَحْيَاهُمْ وَمَمَاتُهُمْ سَاءَ مَا يَحْكُمُونَ - وَخَلَقَ اللَّهُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ بِالْحَقِّ وَلِتُجْزَى كُلُّ نَفْسٍ بِمَا كَسَبَتْ وَهُمْ لَا يُظْلَمُونَ
'যারা মন্দ কাজে লিপ্ত হয়েছে, তারা কি এই ধারণা পোষণ করেছে যে, আমি তাদেরকে ঐ ব্যক্তিদের মতো করে দেব, যারা ঈমান এনেছে এবং সৎ কাজ করেছে! তাদের উভয় শ্রেণির জন্ম-মৃত্যু কি এক পর্যায়ের হবে? তাদের সিদ্ধান্ত কতই না নিকৃষ্ট! আর আল্লাহ তাআলাই আসমানসমূহ ও জমিনকে সৃষ্টি করেছেন। প্রতিটি ব্যক্তিই নিজ কর্মের প্রতিদান বুঝে পাবে। আর তাদের প্রতি কোনো অবিচার করা হবে না।[১]
আল্লাহ তাআলার যথাযথ মর্যাদা অনুধাবন করতে না পারা আরেকটি দল হলো, যারা দাবি করে মৃত্যর পর আর কোনো জীবন নেই। যাদের দৃঢ় বিশ্বাস আল্লাহ তাআলা মৃতদেরকে জীবিত করবেন না। কবরের অধিবাসীদেরকে পুনরুত্থিত করবেন না। এমন কোনো দিন আসলে নেই, যেদিন আল্লাহ তাআলা বিশ্ববাসীকে একত্রিত করে তাদেরকে প্রতিদান দেবেন, সৎকর্মশীলদেরকে তাদের প্রাপ্য বুঝিয়ে দেবেন। দুষ্কৃতিকারীদেরকে জাহান্নামের ফায়সালা করবেন-এমন কোনো মুহূর্ত আদৌ আসবে না কোনোদিন।
একইসাথে আল্লাহ তাআলার প্রকৃত হক আদায় করতে পারে না ঐ সমস্ত লোক, যারা আল্লাহ তাআলার আদেশকে গুরুত্বহীন তুচ্ছ মনে করে তার নাফরমানিতে লিপ্ত হয়। শরীয়তের নিষিদ্ধ কাজকে হেয় মনে করে তাতে জড়িত হয়। ইসলামের অবশ্য-পালনীয় কর্তব্যকে অবহেলা করে। মহান রবের স্মরণ থেকে নিজেকে উদাসীন করে রাখে। তার নিকট নিজের মনোবাসনা মহান আল্লাহর আনুগত্যের তুলনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে যায়। মাখলুকের অনুসরণ রবের অনুসরণের তুলনায় প্রাধান্য বিস্তার করে তার জীবনে। সে চক্ষুলজ্জায় নিজের অপকর্ম মানুষের কাছ থেকে গোপন করলেও আল্লাহ তাআলাকে সে ভ্রুক্ষেপ করে না। অথচ আল্লাহ তাআলা তাকে সৃষ্টি করেছেন। সমগ্র জগতের ত্রাণকর্তা ও একমাত্র প্রতিপালক তিনি। অসংখ্য নিয়ামতের ভেতর তাকে ডুবিয়ে রেখেছেন। সৎ কাজের বিনিময়ে অনন্ত সুখের জান্নাত দানের ওয়াদা করেছেন। পাশাপাশি তার ওপর কিছু দায়িত্ব অর্পণ করেছেন। আল্লাহ তাআলার কিছু হক বান্দার উপর রয়ে গেছে। শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত সেসব হক আদায়ে ত্রুটি না করা বান্দার কর্তব্য। আল্লাহ তাআলা যেসকল বিধিনিষেধ বান্দার উপর আরোপ করেছেন সেগুলো বোঝা এবং মেনে চলা তার একান্ত কর্তব্য।
এক ধরনের মানুষ নিজেদেরকে মুমিন মনে করে। কিন্তু আল্লাহর বিধানের প্রতি উদাসীন। তাদের দ্বারা আল্লাহর হক আদায় হয় না। বস্তুত উদাসীনতাই একটি পাপ। এর ফলে অন্তর থেকে বিধিনিষেধের গুরুত্ব লাঘব হয়ে যায়। মানুষ তখন অবলীলায় হারাম কাজে লিপ্ত হতে পারে। আল্লাহর সন্তুষ্টির বিপরীতে প্রবৃত্তির সন্তুষ্টিকে প্রাধান্য দিয়ে বসে। আল্লাহর আনুগত্যের বিপরীতে বান্দার আনুগত্য করে। আল্লাহ সবকিছু দেখছেন—এমন বিশ্বাসকে একসময় গুরুত্বহীন মনে হয়। বরং নিজের দেখাশোনা ও পার্থিব লাভ-লোকসানই মুখ্য হয়ে ওঠে। নিজের ইলম, আমল ও ব্যক্তিজীবনে আল্লাহর সন্তুষ্টির কোনো তাড়া থাকে না। ইহজগতই তাদের একমাত্র লক্ষ্যে পরিণত হয়। পার্থিব মর্যাদা রক্ষার্থে নিজের খারাপ কাজগুলো মানুষের কাছে লুকিয়ে রাখে, কিন্তু আল্লাহর কাছে লুকানোর কোনো ব্যস্ততা থাকে না। মানুষকে ভয় পায়, আল্লাহকে ভয় পায় না। মানুষের সঙ্গে সদাচরণ করে, কিন্তু আল্লাহর বিধানের ব্যাপারে উদাসীন থাকে। নিজের সুনাম-সুখ্যাতি ও বিলাসিতার পেছনে পর্বত পরিমাণ অর্থ ব্যয় করে, কিন্তু অথচ আল্লাহর রাস্তায় দানের ব্যাপারে এত অল্প দান করে যে, একজন সাধারণ মানুষকে তা দেয়া হলেও সে লজ্জিত হবে।
বান্দার জন্য প্রথম এবং প্রধান কর্তব্য হলো, তাঁর মনিবের সন্তুষ্টিকে প্রাধান্য দেয়া। মনিবের মর্যাদার ব্যাপারে সচেতন থাকা। তাঁর সামনে নিজেকে ছোট ও হীন করে রাখা। বহুসংখ্যক মানুষ এমন তো করেই না, বরং আল্লাহর সঙ্গে আল্লাহর দুশমনদের শরীক করে। স্বয়ং আল্লাহ যাদেরকে পছন্দ করেন তাদেরকে শরীক করাই বৈধ নয়, এমতাবস্থায় দুশমনদের শরীক করা হলে, তা হবে চূড়ান্ত মাত্রার স্পর্ধা-প্রদর্শন, আল্লাহপাকের পবিত্র সত্তাকে ছোট করে দেখার প্রয়াস এবং এক আল্লাহর দাসত্ব ছেড়ে বিতাড়িত শয়তানের উপাসনা।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-
أَلَمْ أَعْهَدْ إِلَيْكُمْ يَابَنِي آدَمَ أَنْ لَا تَعْبُدُوا الشَّيْطَانَ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُبِينٌ - وَأَنِ اعْبُدُونِي هَذَا صِرَاطٌ مُسْتَقِيمُ
'হে আদম সন্তান! আমি কি তোমাদের কাছ থেকে এই অঙ্গীকার গ্রহণ করিনি যে, তোমরা শয়তানের ইবাদত করবে না? নিশ্চয় সে তোমাদের প্রকাশ্য দুশমন। বরং তোমরা আমারই ইবাদত করবে, এটাই সঠিক পথ।[১]
মুশরিকরা তাদের ইচ্ছা ও পছন্দমতো ফিরিশতাদের ইবাদাত করত। আল্লাহ তাআলা এটাকেও শয়তানের ইবাদাত বলে অভিহিত করেছেন।
কুরআনে ইরশাদ হয়েছে-
وَيَوْمَ يَحْشُرُهُمْ جَمِيعًا ثُمَّ يَقُولُ لِلْمَلَائِكَةِ أَهَؤُلَاءِ إِيَّاكُمْ كَانُوا يَعْبُدُونَ - قَالُوا سُبْحَانَكَ أَنْتَ وَلِيُّنَا مِنْ دُونِهِمْ بَلْ كَانُوا يَعْبُدُونَ الْجِنَّ أَكْثَرُهُمْ بِهِمْ مُؤْمِنُونَ
'যেদিন তিনি তাদের সবাইকে একত্রিত করবেন এবং ফিরিশতাদেরকে বলবেন, "এরা কি তোমাদেরই পূজা করত?" ফিরিশতারা বলবেন, "আপনি পবিত্র, আমরা আপনার পক্ষে, তাদের পক্ষে নই, বরং তারা জীনদের পূজা করত। তাদের অধিকাংশই শয়তানে বিশ্বাসী।"[২]
প্রকৃতপক্ষে ফিরিশতাদের উপাসনা করলে শয়তানের উপাসনাই করা হয়। এটা শয়তানের একটি সূক্ষ্ম ফাঁদ। সে এভাবে মানুষকে নিজের দিকে ডাকে। যেন মানুষ ফিরিশতাদের কথা শুনে সহজেই ধোঁকায় পড়তে পারে।
চাঁদ-সূর্য ও নক্ষত্র-পূজারিদেরও একই অবস্থা। শয়তান তাদেরকে চাঁদ-সূর্য ও নক্ষত্রকে রূহানী বিষয় বলে ভাবতে প্ররোচনা দেয়। এবং ভেবেও বসে, এই চাঁদ-সূর্যই পৃথিবীর নিয়ন্ত্রক ও ভাগ্যবিধাতা। তারা ভুল করে সারাজীবন এদের উপাসনা করে যায়, আর শয়তান প্রতিদিন সূর্যাস্ত ও সূর্যোদয়ের সময় সূর্যের কাছাকাছি গিয়ে বসে, যেন মানুষ তার সামনেই মাথানত করে। আর যারা এসবের উদ্দেশ্যে সিজদা করে, তারা নিজের অজান্তেই আমৃত্যু শয়তানকে সিজদা করে যায়।
এমনিভাবে যারা নবী ঈসা ও তাঁর মাতা মারইয়াম আলাইহিমাস সালামের ইবাদাত করে, তারাও প্রকৃতপক্ষে শয়তানেরই ইবাদাত করে। কেননা তাদের ইবাদাত করার আদেশ আল্লাহ তাআলা দেননি। বরং পবিত্র কুরআনে তিনি এর বিরোধিতা করেছেন। ঈসা তাঁর মহীয়সী মাতা মারইয়ামের ইবাদাত করাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা সাধারণ মানুষের পক্ষে কঠিন। মানুষকে বিভ্রান্ত করতে আপাত মঙ্গলময় এমন বহু জাল শয়তান পথে পথে বিছিয়ে রেখেছে। সেসকল ধোঁকায় পতিত না হয়ে শিরকমুক্ত ইবাদাত করতে পারলেই কোনো ব্যক্তি সকল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ প্রকৃত মুমিন বলে বিবেচিত হবে।
শিরকের পরিশিষ্ট হলো, আল্লাহ ছাড়া অন্য যে কারো ইবাদাত যেখানে, যে অবস্থাতেই করা হোক না কেন, পরিশেষে তা শয়তানের ইবাদাতেই পরিণত হবে। শয়তান কেন নবী-রাসূল ও ফিরিশতাদের ইবাদাতের প্রতি মানুষকে উদ্বুদ্ধ করে? কারণ শয়তানের মূল কাজ হলো, মানুষকে আল্লাহর ইবাদাত থেকে বিমুখ করা এবং আল্লাহর ইবাদাতে শরীক সৃষ্টি করা। সরাসরি শয়তানের ইবাদাতের দিকে আহ্বান করার পরিবর্তে নবী-রাসূল ও ফিরিশতাদের ইবাদাত করানোর মাধ্যমে তার লক্ষ্যে পৌঁছানো অনেক সহজ হয়ে যায়।
আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেন-
وَیَوْمَ یَحْشُرُهُمْ جَمِیعًا یَا مَعْشَرَ الْجِنِّ قَدِ اسْتَكْثَرْتُمْ مِنَ الْإِنْسِ وَقَالَ أَوْلِيَاؤُهُمْ مِنَ الْإِنْسِ رَبَّنَا اسْتَمْتَعَ بَعْضُنَا بِبَعْضٍ وَبَلَغْنَا أَجَلَنَا الَّذِي أَجَّلْتَ لَنَا قَالَ النَّارُ مَثْوَاكُمْ خَالِدِينَ فِيهَا إِلَّا مَا شَاءَ اللَّهُ إِنَّ رَبَّكَ حَكِيمٌ عَلِيمٌ
'আর যেদিন আল্লাহ তাদের সবাইকে সমবেত করবেন, সেদিন বলবেন, “হে জীনের দল! মানুষের অনেককে তোমরা বিভ্রান্ত করেছিলে।" আর মানুষদের মধ্য থেকে তাদের অভিভাবকরা বলবে, "হে আমাদের রব! আমরা একে অপরের দ্বারা লাভবান হয়েছি এবং আমরা সে সময়ে উপনীত হয়েছি, যা আপনি আমাদের জন্য নির্ধারণ করে দিয়েছেন।” তিনি বলবেন, "আগুন তোমাদের ঠিকানা, তোমরা সেখানে স্থায়ী হবে। তবে আল্লাহ যা চান (তা ছাড়া)।" নিশ্চয় তোমার রব প্রজ্ঞাময়, সর্বজ্ঞ। [১]
এই আয়াতটি হলো আল্লাহর পক্ষ থেকে শিরকের ব্যাপারে একটি সূক্ষ্ম ইশারা। শিরক বড় বিপজ্জনক গুনাহ। তাওবা ছাড়া মাফ হবে না। জাহান্নাম চিরস্থায়ী ঠিকানা হয়ে যাবে। ধরা যাক, শরীয়ত যদি শিরককে হারাম ঘোষণা না করত, তারপরও শিরক কোনোদিন হালাল হতো না। কেননা সমস্ত জগতের মালিক আল্লাহর ইজ্জতকে খাটো করে অপর এক মাখলুককে তাঁর সঙ্গে শরীক করা কখনোই বৈধ হওয়ার মতো বিষয় নয়।

টিকাঃ
[১] সূরা ফাতহ, আয়াত-ক্রম: ৬
[২] সূরা ফুসসিলাত, আয়াত-ক্রম: ২৩
[১] সূরা সাফফাত, আয়াত-ক্রম: ৮৫-৮৭
[১] সূরা হজ, আয়াত-ক্রম: ২৮
[১] সূরা হজ, আয়াত-ক্রম: ৭৩, ৭৪
[২] সূরা যুমার, আয়াত-ক্রম: ৬৭
[১] সূরা সোয়াদ, আয়াত-ক্রম: ২৭, ২৮
[১] সূরা জাসিয়া, আয়াত-ক্রম: ২১-২২
[১] সূরা ইয়াসীন, আয়াত-ক্রম: ৬০, ৬১
[২] সূরা সাবা, আয়াতা-ক্রম: ৪০, ৪১
[১] সূরা আনআম, আয়াত-ক্রম: ১২৮

📘 রূহের খোরাক > 📄 শিরক ও অহংকার

📄 শিরক ও অহংকার


শিরক ও অহংকার-জাতীয় গুনাহগুলো আল্লাহ তাআলার সৃষ্টির উদ্দেশ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। আল্লাহ জীন ও মানুষ সৃষ্টি করেছেন শুধুমাত্র তাঁর ইবাদাতের জন্য। এই উদ্দেশ্যেই কিতাব অবতীর্ণ করেছেন এবং নবী-রাসূলগণকে প্রেরণ করেছেন। সৃষ্টজীব-জীন ও মানুষের শিরক ও অহংকার আল্লাহর এ ইচ্ছার বিপরীতে চলে যায়। আল্লাহ তাআলা এমনটা পছন্দ করেন না। মুশরিক এবং অহংকারী-উভয়েই জাহান্নামে প্রবেশ করবে। আল্লাহ তাআলা তাদের জন্য জান্নাত হারাম করেছেন। এমনকি যার অন্তরে বিন্দু-পরিমাণ অহংকার থাকবে, সেও জান্নাতে যেতে পারবে না।

📘 রূহের খোরাক > 📄 আল্লাহর সিফাত ও আহকামের ওপর কথা বলার আদব

📄 আল্লাহর সিফাত ও আহকামের ওপর কথা বলার আদব


পর্যাপ্ত জানাশোনা ছাড়া আল্লাহর আহকাম ও সিফাতের ব্যাপারে বিতর্কে লিপ্ত হওয়া শিরকের নিকটবর্তী কবীরা গুনাহ। আল্লাহ তাআলা নিজের যেসকল গুণবাচক নাম উল্লেখ করেছেন এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহকে যেসকল গুণবাচক নামে ডেকেছেন, তার বিপরীত গুণের অন্য কোনো নামে ডাকা আল্লাহ তাআলার কর্তৃত্বের জগতে অবৈধ অনুপ্রবেশের শামিল। আর যদি কেউ স্বীয় জ্ঞানের দ্বারা আল্লাহপাকের এ ধরনের কোনো গুণাবলি প্রমাণ করার চেষ্টা করে, তবে সেটা শিরকের চেয়েও বড় ধৃষ্টতা বলে গণ্য হবে।
শিরকে লিপ্ত হবার দুটি ধরন আছে :
১. আল্লাহকে স্বীকার না করে শুধুমাত্র মাখলুক তথা সৃষ্ট জিনিসের উপাসনা করা।
২. আল্লাহকে স্বীকার করলেও তাঁর পাশপাশি অন্যকে শরীকও করা।
দ্বিতীয় প্রকারের শিরক প্রথম প্রকারের তুলনায় লঘু। উদাহরণস্বরূপ-কোনো ব্যক্তি তার দেশের ক্ষমতাসীন বাদশাহকে অস্বীকার করে। পক্ষান্তরে আরেকজন বাদশাহকে স্বীকার করে এবং তাঁর সহানুভূতি লাভের জন্য অন্য কোনো উজির বা উচ্চপদস্থ ব্যক্তির মধ্যস্থতা গ্রহণ করে। নিঃসন্দেহে দ্বিতীয় প্রকারের লোকটি বাদশার নৈকট্য পাবে। তবে আল্লাহপাকের ক্ষেত্রে বিষয়টি কিছুটা ভিন্ন। তিনি নিজেই কোনো মধ্যসূত্র গ্রহণ করতে নিষেধ করেছেন। তাই সেটা করা যাবে না। আল্লাহকে অস্বীকারকারী মুশরিকদের মধ্য থেকে নেতৃস্থানীয় মুশরিক হলো ফিরআউন। পবিত্র কুরআনে ঘটনা বর্ণিত আছে-
يَا هَامَانُ ابْنِ لِي صَرْحًا لَعَلَّى أَبْلُغُ الْأَسْبَابَ - أَسْبَابَ السَّمَاوَاتِ فَأَطَّلِعَ إِلَى إِلَهِ مُوسَى وَإِنِّي لَأَظُنُّهُ كَاذِبًا
'ফিরআউন আরও বলল, "হে হামান! আমার জন্য একটি উঁচু ইমারত বানাও, যাতে আমি অবলম্বন পাই। আসমানে আরোহণের অবলম্বন, যাতে আমি মুসার ইলাহকে দেখতে পাই, আর আমি কেবল তাকে মিথ্যাবাদীই মনে করি।"[১]
আর দ্বিতীয় প্রকারের শিরক-অর্থাৎ আল্লাহকে পরিপূর্ণভাবে অস্বীকার না করে তাঁর পাশে অন্য কোনো মাখলুক বা সৃষ্টজীবকে শরীক করা-এটাকে শয়তান বেশি পছন্দ করে। কেননা এটা বিদআত। আর বিদআতের ব্যাপারে পূর্বসূরি কয়েকজন আলিমের মন্তব্য হলো-
الْبِدْعَةُ أَحَبُّ إِلَى إِبْلِيسَ مِنَ الْمَعْصِيَةِ: لِأَنَّ الْمَعْصِيَةَ يُتَابُ مِنْهَا وَالْبِدْعَةَ لَا يُتَابُ مِنْهَا
'অন্যান্য গুনাহের চেয়ে শয়তানের কাছে বিদআত বেশি পছন্দ। কারণ হলো, অন্য গুনাহ থেকে তাওবা করা যায়, বিদআত থেকে তাওবা করা হয় না।
ইবলিস বলে থাকে, 'আদম সন্তানকে আমি গুনাহের মাধ্যমে ধ্বংস করেছি। আর তারা আমাকে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ দিয়ে ধ্বংস করে দিয়েছে। এমন অবস্থা দেখে আমি তাদেরকে এমন গুনাহে লিপ্ত করে দিলাম, যাকে তারা নেকি ভেবে করতে থাকবে। ফলে কোনোদিন তাওবা করার কথা তাদের মনেও আসবে না।'
অন্যান্য গুনাহ শুধুমাত্র গুনাহে লিপ্ত ব্যক্তিকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে। কিন্তু বিদআত শুধুমাত্র একজনকেই নয়, বিদআতের প্রভাব সমাজের সর্বস্তরে ছড়িয়ে পড়ে। এবং অপরকেও উৎসাহিত করে। বিদআতে লিপ্ত ব্যক্তি অন্যান্য কবীরা গুনাহে লিপ্ত ব্যক্তি থেকে অধিক নিকৃষ্ট। কেননা, বিদআত আল্লাহর সিফাতের মধ্যে বিকৃতি ঘটায়, কিন্তু অন্য গুনাহে তা হয় না। অন্য গুনাহে লিপ্ত ব্যক্তি আখিরাতের সঠিক পথে থেকেই ভুলভ্রান্তি করে। কিন্তু বিদআতে লিপ্ত ব্যক্তির আখিরাতের পথই ভুল হয়ে যায়।

টিকাঃ
[১] সূরা মুমিন, আয়াত-ক্রম: ৩৬, ৩৭

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00