📘 রূহের খোরাক > 📄 কথা ও কর্মের শিরক

📄 কথা ও কর্মের শিরক


উপরে বিবৃত শিরকের পরে আরও কতিপয় শিরক হলো, বান্দা তার কথা, কাজ ও নিয়তের ক্ষেত্রে অন্য কাউকে আল্লাহর সঙ্গে শরীক করা। কর্মের শিরকের উদাহরণ, আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো সামনে মাথা অবনত করে সিজদা করা। আল্লাহর ঘর পবিত্র কাবা ব্যতীত অন্য কোনো ঘর তওয়াফ করা। হজরে আসওয়াদ ব্যতীত অন্য কোনো পাথর বা কবরে চুম্বন করা। কবরে সিজদা করা। নবীজি ﷺ পূর্ববর্তী নবী-রাসূল এবং নেককার বান্দাদের কবর-কেন্দ্রিক মসজিদ নির্মাতাদেরকে লানত করেছেন। আর যারা স্বয়ং কবরকেই প্রতিমা বানিয়ে উপাসনা করে, তাদের অবস্থা কতটা ভয়াবহ হতে পারে!
রাসূল ﷺ ইরশাদ করেন-
لَعَنَ اللَّهُ الْيَهُودَ وَالنَّصَارَى اتَّخَذُوا قُبُورَ أَنْبِيَائِهِمْ مَسَاجِدَ
'ইহুদী ও নাসারাদের ওপর আল্লাহর লানত বর্ষিত হোক, যারা তাদের নবী- রাসূলদের কবরকে মসজিদে পরিণত করেছে।'(১)
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরও বলেন-
إِنَّ شِرَارَ النَّاسِ مَنْ تُدْرِكُهُمُ السَّاعَةُ وَهُمْ أَحْيَاءُ، وَالَّذِينَ يَتَّخِذُونَ الْقُبُورَ مَسَاجِدَ
'হতভাগা সেসকল মানুষ, যাদের জীবদ্দশায় কিয়ামত সংঘটিত হবে। এবং হতভাগা সেসকল মানুষ, যারা কবরকে সিজদার জায়গা বানিয়ে নেয়।[১]
সহীহ মুসলিমে বর্ণিত আছে-
إِنَّ مَنْ كَانَ قَبْلَكُمْ كَانُوا يَتَّخِذُونَ الْقُبُورَ مَسَاجِدَ، أَلَا فَلَا تَتَّخِذُوا الْقُبُورَ مَسَاجِدَ، فَإِنِّي أَنْهَاكُمْ عَنْ ذَلِكَ
'তোমাদের পূর্ববর্তীরা কবরকে সিজদার স্থান বানিয়ে ফেলেছিল। খবরদার, তোমরা তা কোরো না। আমি তোমাদেরকে এমন গর্হিত কাজ থেকে সতর্ক করে দিচ্ছি। [২]
মুসনাদু আহমাদ এবং সহীহ ইবনু হিব্বানে বর্ণিত আছে। রাসূল ইরশাদ করেন-
لَعَنَ اللَّهُ زَوَّارَاتِ الْقُبُورِ، وَالْمُتَّخِذِينَ عَلَيْهَا الْمَسَاجِدَ وَالسُّرُجَ
'কবর যিয়ারতকারী নারী, কবরের উপর সিজদাকারী এবং বাতি প্রজ্জ্বলনকারী ব্যক্তিদের ওপর আল্লাহ তাআলা লানত বর্ষণ করেন।[৩]
অপর এক হাদীসে বর্ণিত হয়েছে-
اشْتَدَّ غَضَبُ اللَّهِ عَلَى قَوْمِ اتَّخَذُوا قُبُورَ أَنْبِيَائِهِمْ مَسَاجِدَ
'আল্লাহ তাআলা এমন সম্প্রদায়ের উপর সবচেয়ে বেশি রাগান্বিত হন, যারা তাদের নবীদের কবরকে সিজদার স্থানে পরিণত করে।[৪]
আরও একটি হাদীস-
إِنَّ مَنْ كَانَ قَبْلَكُمْ، كَانَ إِذَا مَاتَ فِيهِمُ الرَّجُلُ الصَّالِحُ، بَنَوْا عَلَى قَبْرِهِ مَسْجِدًا، وَصَوَّرُوا فِيهِ تِلْكَ الصُّوَرَ، أُولَئِكَ شِرَارُ الْخَلْقِ عِنْدَ اللَّهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ
'তোমাদের পূর্বে এমন অনেক লোক ছিল, তাদের মধ্য থেকে যখন কোনো নেককার বুযুর্গ ব্যক্তি ইন্তেকাল করত, তারা তার কবরের ওপর মসজিদ নির্মাণ করত। এবং সেখানে তার অংকিত ছবি স্থাপন করত। কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলার সম্মুখে তারা সবচেয়ে নিকৃষ্টতর সৃষ্টি হিসেবে উপস্থিত হবে।[১]
এ তো হলো সেসকল ব্যক্তি বা সম্প্রদায়ের কথা, যারা কবরের ওপর মসজিদ নির্মাণ করে আল্লাহকে সিজদা করবে; কিন্তু যারা স্বয়ং কবরকেই সিজদা করে, তাদের পরিণতি তো হবে আরো ভয়াবহ! নবীজি আল্লাহ তাআলার দরবারে দুআ করেছিলেন-
اللَّهُمَّ لَا تَجْعَلْ قَبْرِي وَثَنَا يُعْبَدُ
'আল্লাহ! আপনি আমার কবরকে পূজারিদের মূর্তিতে পরিণত করবেন না।' [২]
প্রকৃতপক্ষে এসকল হাদীসের মাধ্যমে নবীজি আল্লাহ তাআলার একত্ববাদের চতুর্পাশে এমন এক প্রাচীর স্থাপন করে গিয়েছেন যে, কেউ তা ভেঙে আল্লাহর একত্ববাদকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারবে না। এমনকি তার কাছেও ভিড়তে পারবে না। খেয়াল করা দরকার, নবীজি সূর্যোদয় এবং সূর্যাস্তের সময় নফল নামায পড়তে নিষেধ করেছেন। এভাবে তিনি সূর্যপূজারিদের সঙ্গে মুসলমানদের সাদৃশ্যের সকল পথ বন্ধ করে দিয়েছেন। আর আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো ইবাদাতের ব্যাপারে তিনি ছিলেন অত্যন্ত কঠোর। হাদীসে বর্ণিত হয়েছে-
لَا يَنْبَغِي لِأَحَدٍ أَنْ يَسْجُدَ لِأَحَدٍ إِلَّا لِلَّهِ
'কেউ যেন আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে সিজদা না করে।' [৩]
উল্লিখিত হাদীসে "لا ينبغى" শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। পবিত্র কুরআন ও হাদীস শরীফে উক্ত শব্দ দ্বারা পূর্ণাঙ্গ আদেশ বুঝানো হয়। অর্থাৎ এই শব্দ দ্বারা কৃত আদেশ অথবা নিষেধ অকাট্য পালনীয়।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-
وَمَا يَنْبَغِي لِلرَّحْمَنِ أَنْ يَتَّخِذَ وَلَدًا
'সন্তান গ্রহণ করা পরম করুণাময় আল্লাহর শান নয়।[১]
এখানেও 'لا ينبغي' শব্দের ব্যবহার রয়েছে। এবং এ বিধানের কোনো নড়চড় হবে না। 'لا ينبغي' শব্দ ব্যবহৃত এসকল বিধান ইসলামী শরীয়তে অত্যন্ত কঠোরভাবে পালন করা হয়।

টিকাঃ
[১] বুখারী, হাদীস-ক্রম: ১৩০৭
[১] মুসনাদু আহমাদ, হাদীস-ক্রম: ১৬৯৪; সনদ হাসান। সিয়ারু আলামিন নুবালা-১/৪০১
[২] মুসলিম, হাদীস-ক্রম: ৫৩২
[৩] মুসনাদু আহমাদ, হাদীস-ক্রম: ২০৩০; শুয়াইব আরনাউতের মতে হাদীসটির সনদ হাসান লিগাইরিহি। তবে সমস্ত বর্ণনায় হাদীসটি পাওয়া যায় তথা রাসূল লানত বর্ষণ করেন-এই শব্দে।
[৪] মুয়াত্তা মালিক-১/১৭২
[১] বুখারী, হাদীস-ক্রম: ৪২৭
[২] মুসনাদু আহমাদ, হাদীস-ক্রম: ৭৩৫২
[৩] হাদীসটি মুনকার, কাশফুল আসতার-৩/১৩২
[১] সূরা মারইয়াম, আয়াত-ক্রম: ৯২

📘 রূহের খোরাক > 📄 কথার শিরক

📄 কথার শিরক


আল্লাহ তাআলার সঙ্গে শিরক শুধু কাজ-কর্মের মাধ্যমেই নয়, মুখ-নিসৃত শব্দের মাধ্যমেও যদি কেউ অন্য কিছুকে আল্লাহ তাআলার শরীক বলে ব্যক্ত করে, তাহলে সেটাও শিরকের অন্তর্ভুক্ত হবে। এর একটি উদাহরণ হলো, আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো নামে শপথ করা। মুসনাদু আহমাদ এবং সুনানু আবি দাউদে বর্ণিত আছে-
مَنْ حَلَفَ بِغَيْرِ اللَّهِ فَقَدْ أَشْرَكَ
'যে ব্যক্তি আল্লাহ ছাড়া অন্য কিছুর নামে শপথ করল, সে শিরক করল।' [২]
কোনো ব্যক্তি যদি অপর কাউকে বলে, 'যদি আল্লাহ চান, এবং তুমি চাও তবে এমন হতে পারে।' এটাও পূর্বোক্ত প্রকারের শিরক। স্বয়ং রাসূলকে এক সাহাবী বলেছিলেন-
مَا شَاءَ اللَّهُ وَشِئْتَ
'আল্লাহ এবং আপনি যেমন চান।'
নবীজি তখন তাঁকে বলেছিলেন, 'তুমি কি আমাকে আল্লাহর সমকক্ষ বানিয়ে দিচ্ছ? বলো, শুধুমাত্র আল্লাহ যা চান তাই হবে।' [১]
বিশ্বজগতের সকল সৃষ্টিই আল্লাহ তাআলার তুলনায় অতি ক্ষুদ্র, তুচ্ছ; আল্লাহর সাথে সবকিছুই তুলনার অযোগ্য। তাদের ভেতরের ইচ্ছাশক্তিও আল্লাহ তাআলার সৃষ্টি। সুতরাং এত ক্ষুদ্র এক সৃষ্টির ইচ্ছাকে মহাপরাক্রমশালী আল্লাহর ইচ্ছার সঙ্গে যুক্ত করা নিঃসন্দেহে চূড়ান্ত নির্বুদ্ধিতা ও ধৃষ্টতার নামান্তর। মানুষ সাধারণত বলে থাকে, 'আল্লাহ আর তুমি ছাড়া আমি আর কারো ওপর ভরসা করতে পারি না', অথবা, 'আমার জন্য আল্লাহ এবং তুমিই যথেষ্ট', কিংবা 'আসমানে আল্লাহ আর জমিনে তুমি'-এ ধরনের সব কথাই শিরক। অবশ্যই এ ধরনের কথার জন্য আল্লাহ তাআলার কাছে তাওবা করতে হবে। যে ব্যক্তি নবীজিকে বলেছিলেন, 'আল্লাহ এবং আপনি যেমন চান', তাঁর বলা বাক্যটি আমাদের দৈনন্দিন বেখেয়ালে বলে যাওয়া অসংখ্য বাক্যের তুলনায় মার্জিত ছিল। তিনি তো মহান আল্লাহ তাআলার প্রিয়পাত্র নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আল্লাহর সমকক্ষ বানিয়েছিলেন, [২] আর আমরা তো এমন ব্যক্তিকে আল্লাহর সমকক্ষ বানিয়ে ফেলি যে আল্লাহর দুশমনও হতে পারে। এবং সে রাসূলের একটি পদধূলির সমকক্ষও হবে না কোনদিন। মোটকথা, ইবাদাত, আনুগত্য, ভরসা, ভয়, তাওবা ইস্তিগফার, দান-সাদাকাহ, মান্নত, কসম, তাসবীহ, তাহলীল, দুআ, সিজদা, তাওয়াফ-ইত্যাদি সকল ইবাদাত একমাত্র আল্লাহ তাআলার জন্যই হওয়া আবশ্যক। জীবনের এই প্রধান সাধনা একমাত্র আল্লাহ তাআলার জন্যই হবে, এক্ষেত্রে কোনো নবী, রাসূল, ফিরিশতা বা কোনো বুযুর্গ, দরবেশ ব্যক্তির বন্দুমাত্রও কোনো অংশ থাকবে না। অন্যথায় সবই অর্থহীন। হাশরের ময়দানে শিরকমিশ্রিত আমল বান্দাকে আরও বেশি খারাপ পরিণতির দিকে ঠেলে নিয়ে যাবে।

প্রত্যক ব্যক্তিরই স্মরণ রাখা আবশ্যক, আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে উপাস্যের আসনে অধিষ্ঠিত করা জঘন্যতম অন্যায়। কোনো পীর, বুযুর্গ, নবী, রাসূল- কেউই তাঁর সমকক্ষ নয়। মুসনাদু আহমাদে বর্ণিত আছে, একবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট এক সাহাবী এলেন। তিনি একটি গুনাহে লিপ্ত হয়ে অনুতপ্ত হয়ে পড়েছিলেন। নবীজির সামনে দাঁড়িয়েই তিনি এই বলে তাওবা করলেন-
اللَّهُمَّ إِنِّي أَتُوبُ إِلَيْكَ وَلَا أَتُوبُ إِلَى مُحَمَّدٍ
'আল্লাহ, আমি আপনার নিকট তাওবা করছি, আমি নবীজি মুহাম্মদের কাছে তাওবা করছি না।' এ কথা শুনে রাসূল ইরশাদ করেন-
عَرَفَ الْحَقَّ لِأَهْلِهِ
'সে প্রকৃত হকদারকে চিনতে পেরেছে।' [১]

টিকাঃ
[২] তিরমিযী, হাদীস-ক্রম: ১৫৩৫
[১] মুসনাদু আহমাদ, হাদীস-ক্রম: ১৮৩৯; শাইখ শুয়াইব আরনাউতের মতে হাদীসটি সহীহ লিগাইরিহী।
[২] বস্তুত শিরক শিরকই। আল্লাহর সঙ্গে কাউকে কোনো বিষয়ে শরীক করাকে শিরক বলে। এবং শিরক যার সঙ্গেই করা হোক তা সমান অপরাধ, এ ক্ষেত্রে নবীজি ও অন্যান্য মানুষের মধ্যে কোনো ফারাক নেই। তবে এখানে নবীজিকে আল্লাহর সঙ্গে শরীক করার বিষয়টিকে ঈষৎ হালকা করে দেখানো হয়েছে শুধুই শিরকের ভয়াবহতা বোঝানোর জন্য। -সম্পাদক
[১] মুসনাদু আহমাদ, হাদীস-ক্রম: ১৫৫৮৭; শুয়াইব আরনাউতের মতে হাদীসটি যঈফ।

📘 রূহের খোরাক > 📄 ইচ্ছা এবং নিয়তের মধ্যে আল্লাহর সঙ্গে শিরক

📄 ইচ্ছা এবং নিয়তের মধ্যে আল্লাহর সঙ্গে শিরক


মানুষের কাজের ইচ্ছা বা নিয়তের মধ্যে কত প্রকারের শিরক হতে পারে তার কোনো হিসাব নেই। এক-সমুদ্র জলরাশির সমান মানুষের ইচ্ছা ও নিয়তকেন্দ্রিক শিরক। সুতরাং এর প্রকরণ করে বা বলে শেষ করা যাবে না। এরচেয়ে বরং কীভাবে এই শিরক থেকে বাঁচা যাবে তা নিয়ে আলোচনা করাই ফলপ্রসূ। এই শিরক জগতের সবচেয়ে সূক্ষ্মতম শিরক। কোনো মানুষ যখনই কোনো কাজ আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো সন্তুষ্টির জন্য করে, অথবা অন্য কারো নৈকট্য হাসিলের উদ্দেশ্যে করে অথবা আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো নিকট নেককাজের প্রতিদান কামনা করে, সেটাই তার নিয়তের ভেতরে শিরক হিসেবে পরিগণিত হবে। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে নবী ইবরাহীমের যে শাশ্বত দ্বীনের অনুসরণ করতে আদেশ করেছেন, তার মূলকথা হলো, বান্দার কথা, কাজ, ইচ্ছা- সবকিছু কেবল আল্লাহর জন্যই হতে হবে। আল্লাহর সঙ্গে অন্য কাউকে শরীক করা যাবে না। বিন্দু-পরিমাণ শিরকের ছিটেফোঁটা থাকলেও কোনো আমল কবুল হবে না। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-
وَمَنْ يَبْتَغِ غَيْرَ الْإِسْلَامِ دِينًا فَلَنْ يُقْبَلَ مِنْهُ وَهُوَ فِي الْآخِرَةِ مِنَ الخَاسِرِينَ
'যে ব্যক্তি ইসলাম ছাড়া অন্য কোনো ধর্ম অনুসরণ করল, তার ধর্ম কবুল করা হবে না। আখিরাতে সে ধ্বংসপ্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে।[১]
'মিল্লাতে ইবরাহীম' বা পবিত্র ইসলামের এটাই বিধান। একমাত্র ইসলাম ছাড়া অন্য কোনো ধর্মের অনুসরণ আল্লাহর নিকট গ্রহণযোগ্য নয়। এ বিধান থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়া নিখাদ মূর্খতার শামিল।

টিকাঃ
[১] সূরা আলে ইমরান, আয়াত-ক্রম: ৮৫

📘 রূহের খোরাক > 📄 শিরকের মূলকথা

📄 শিরকের মূলকথা


শিরক কী?

সহজ কথায় শিরক হলো, এক বস্তুকে অপর একটি বস্তুর অনুরূপ মনে করা।

শরীয়তের ভাষায় শিরক হলো, বান্দাকে আল্লাহর মতো অথবা আল্লাহকে বান্দার মতো মনে করা। উদাহরণস্বরূপ- الكمال বা 'পূর্ণাঙ্গতা' আল্লাহ তাআলার একটি গুণ। কেউ যদি এই গুণটি আল্লাহর জন্য মেনে নেয় এবং সে-অনুযায়ী আমল করে, তাহলে সেটা হবে তাওহীদ। কিন্তু আল্লাহ তাআলা যাদের হৃদয় বদ্ধ করে দিয়েছেন, যাদের সত্য দেখার অন্তর্দৃষ্টি অন্ধ করে দিয়েছেন, তারা সহজভাবে তাওহীদের এই সত্য মেনে নিতে চায় না। সত্যের গায়ে অন্য জামা চড়িয়ে তারপর বিশ্বাস করে। তারা অপর কোনো ব্যক্তি বা বস্তুকে আল্লাহর অনুরূপ মনে করাকে সম্মান জ্ঞান করে। বস্তুত তারাই মুশরিক, যারা কোনো মাখলুক বা সৃষ্টিকে আল্লাহর কোনো সিফাত বা গুণাবলির অংশীদার মনে করে। সেটা যত অল্প পরিসরেই হোক না কেন। তা শিরক বলেই গণ্য হবে।

আল্লাহ তাআলার আরেকটি গুণ হলো, এ বিশাল ব্রহ্মাণ্ডের সকল লাভ, ক্ষতি ও ক্ষমতার একচ্ছত্র মালিক তিনি। অন্য কারো সঙ্গে এর ন্যূনতম কোনো সম্পর্ক নেই। যখন কোনো ব্যক্তি উপরোক্ত কথাগুলি বিশ্বাস করে এবং মেনে নেয়, তখন তার জন্য আবশ্যক হলো, দুআ, ভয় ও ভরসার সকল সম্পর্ক সে কেবল আল্লাহ তাআলার সঙ্গেই রাখবে। আর কোনো ব্যক্তি যদি এসকল বিষয়ের সম্পর্ক কোনো মাখলুকের সঙ্গে তৈরি করে নেয়, তাহলে সে নিঃসন্দেহে ওই মাখলুককে আল্লাহর সমকক্ষে পরিণত করল। কোনো সৃষ্টিই স্বয়ং নিজ প্রাণ, হায়াত ও মউতের মালিক না। সে কীভাবে তারই মতো অপর কোনো সৃষ্টির তরফে এসবের মালিক হয়? নিজের ভালোমন্দই অন্যের হাতে — এমন এক মাখলুক কীভাবে এমন এক সত্তার সমকক্ষ হয়, যিনি সমস্ত জগতের প্রতিপালক। যাঁর ইচ্ছার বিপরীতে গাছের একটি পাতাও নড়ে না। তিনি যাকে ইচ্ছা দান করেন, যাকে ইচ্ছা দান বন্ধ করে দেন। যাকে তিনি দিতে চান না, তাকে অন্য কেউই দিতে পারে না। তিনি যদি বান্দাদের জন্য রহমতের দরজা বন্ধ করে দেন, ভূপৃষ্ঠের আবাদি ভূমিগুলিকে অনুর্বর করে দেন, নদী নালা শুকিয়ে দেন, তবে কেউই রহমতের সে-দরজা খুলে দিতে পারবে না। সৃষ্টিজগত অভাবে হাহাকার করবে। আর যখন তিনি রহমতের দরজা খুলে দেবেন, তখন গাছে গাছে বাতাসে সবুজ পাতা দুলবে। পাখিদের কলরবে বন মুখরিত হয়ে উঠবে। বৃষ্টি হবে। ফল ও ফসলে আবাদি ভরে উঠবে। তাঁর রহমতের দরজা অন্য কেউ বন্ধ করতে পারবে না। এমন মহান ক্ষমতাশীল আল্লাহ তাআলার সঙ্গে নগন্য এক সৃষ্টির তুলনা করাকে পৃথিবীর সবচেয়ে নিকৃষ্ট তুলনা বলা যেতে পারে। তবুও আল্লাহর অসংখ্য বান্দা দৈনন্দিন জীবনে না বুঝে অথবা বুঝেই এই ভুলের ফাঁদে পা দিয়ে ফেলে।

আল্লাহ তাআলার পূর্ণাঙ্গতার গুণের কথা উপরে বলা হয়েছে। বলা হয়েছে, সর্বাঙ্গীন পূর্ণাঙ্গ কেবল তাঁকেই বলা যায়, যাঁর মধ্যে কোনো ত্রুটি থাকবে না। আর এই বৈশিষ্ট্য শুধুমাত্র আল্লাহ তাআলার জন্যই। পৃথিবীর কোনো সৌন্দর্যই ত্রুটি মুক্ত নয়। ফলে আল্লাহ ছাড়া আর কেউই মাবুদ হতে পারবে না। আল্লাহ তাআলা সামনে থাকা সত্ত্বেও যদি কেউ অপর কোনো মাখলুকের কাছে নিজের শ্রদ্ধা, ভালোবাসা, ভয়, বিশ্বাস, আনুগত্য ও ভরসা সঁপে দেয়, তাহলে তার এই আচরণ হবে নিরেট মূর্খতা। শুধু মূর্খতাই নয়, প্রকারান্তরে এ এক মহা-জুলুম। আল্লাহ তাআলা এত ক্ষমাবান হওয়ার পরেও এ ধরনের মাখলুককে ক্ষমা না করার কথা বলেছেন।
আল্লাহ তাআলার উল্লেখযোগ্য আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো, উপাসনার একচ্ছত্র অধিকারী একমাত্র তিনিই। বান্দা যখন তার প্রতিপালককে চিনতে পারে, তখন মহান প্রতিপালকের প্রতি নিজের আনুগত্যকে প্রকাশ্যে প্রদর্শন করা তার অবশ্য-পালনীয় কর্তব্য হয়ে যায়। আল্লাহর আনুগত্য লুকিয়ে রাখার বিষয় নয়। এক্ষেত্রে বান্দার করণীয় হলো-
* মহান প্রতিপালক আল্লাহ তাআলার প্রতি সীমাহীন ভালোবাসা পোষণ করা।
* আল্লাহ তাআলার সামনে নিজের চূড়ান্ত অক্ষমতা ও দুর্বলতা তুলে ধরা।
এ দুটি কাজই আনুগত্যের সর্বোচ্চ প্রকাশ করে থাকে। বান্দার তাকওয়া, আল্লাহভীতির সবরকমের স্তর এই দুই বিষয়ের তারতম্যের কারণেই তৈরি হয়। মানুষ যখনই এ দুটি বিষয়ে সামান্য উদাসীন হয়ে পড়ে, তখনই তার বিশ্বাসে আমূল পরিবর্তন সূচিত হয়। নিজের অলক্ষেই আল্লাহমুখী হৃদয় নম্বর সৃষ্টিজগতের দিকে ঝুঁকে যায়। মহান রবের প্রতি একনিষ্ঠ বিশ্বাস, ভালোবাসা ও আনুগত্যের জায়গাগুলোতে চিড় ধরে। অসংখ্য শিরকের দরজা খুলে যায়। মস্তিষ্কে শয়তান বাসা বাঁধে। গুনাহের ভয়াবহতাকে হালকা করে তোলে। মানুষ তার ধ্বংসের পদধ্বনি ঘুর্ণাক্ষরেও টের পায় না। নির্ভেজাল ঈমানের ওপর টিকে থাকা নিঃসন্দেহে পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন কাজ। শুধুমাত্র সেসকল লোকের পক্ষেই সম্ভব, যাদের ওপর আল্লাহ তাআলার বিশেষ রহমত রয়েছে। যাদেরকে তিনি পছন্দ করেছেন, তাদের নিকট দ্বীনের দাওয়াত প্রেরণ করেছেন। আর যারা আরও বেশি সৌভাগ্যবান, তাদেরকে পবিত্র এ দ্বীনের দাঈ ও রাহবার বানিয়েছেন। যুগে যুগে নবী-রাসূলদের প্রেরণ করেছেন। বান্দাদেরকে ঈমানের সৌভাগ্য দান করেছেন। তাদের জন্য কিতাব অবতীর্ণ করেছেন, তারা মহান রবের ঐশ্বরিক নূরের আলোয় উদ্ভাসিত জীবনে সফলতা অর্জন করেছেন। তাদের জন্যই আল্লাহ তাআলা কুরআনুল কারীমে ইরশাদ করেন-
يَهْدِي اللَّهُ لِنُورِهِ مَنْ يَشَاءُ
'আল্লাহ তাআলা যাকে ইচ্ছা করেন, তার নূরের দিকে পথ প্রদর্শন করেন।' [১]
আল্লাহ এমন এক সত্তা যে, গোটা সৃষ্টিজগত শুধু তাকেই সিজদা করবে। এটাও তাঁর একটি বিশেষ গুণ। সিজদা নামক ইবাদাতটি কেবলই তাঁর জন্য। বান্দা যখনই অন্য কোনো সৃষ্টির সামনে মাথা ঝুঁকায়, তখনই সে শিরকে লিপ্ত হয়ে যায়। শিরকমুক্ত জীবনের সকল সিজদা হবে একমাত্র আল্লাহ তাআলার সমীপে।
তাওয়াক্কুল বা আল্লাহ তাআলার উপর ভরসা ও আস্থা রেখে জীবনের চলার পথে এগিয়ে যাওয়াও শিরকমুক্ত জীবনের অন্যতম আবশ্যকীয় যোগ্যতা।
শিরকমুক্ত জীবনের অন্যতম বিশ্বাস হলো, সিজদার অনুরূপ তাওবাও কেবল আল্লাহ তাআলার কাছেই করতে হয়। আল্লাহ তাআলাই বান্দার তাওবা গ্রহণের একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিকারী। বান্দা সকল অবাধ্যতা ত্যাগ করে গুনাহ মোচনের জন্য একমাত্র তাঁরই দিকে প্রত্যাবর্তন করবে। এর বিপরীতে সব শিরক। আল্লাহ এবং বান্দার মাঝে অন্য কোনো মাখলুকের অনুপ্রবেশ মাত্রই সেখানে একটি সাদৃশ্যের প্রসঙ্গ উপস্থিত হওয়া। আল্লাহর আসনে অন্যায়ভাবে সমাসীন মাখলুক কি তবে আল্লাহরই মতো? অন্যথায় সে কীভাবে আল্লাহর আসনে সমাসীন হতে পারে? এ প্রশ্নের ভেতর দুটি ব্যক্তিত্বের উপস্থিতি আছে। প্রথমত, যে অপর একজনকে আল্লাহর সমকক্ষ জ্ঞান করল। আরেকজন হলো, যে আল্লাহর সমকক্ষের স্থানে আসীন হলো। সত্যিকারার্থেই যদি কোনো ব্যক্তি নিজেকে আল্লাহর সমকক্ষ মনে করে, এবং সে অনুযায়ী কাজ করা শুরু করে, নিজের বড়ত্বের কথা ঘোষণা করে, চাটুকারদের মুখে মুখে নিজের কীর্তির কথা ছড়িয়ে দিতে থাকে, মানুষকে তার সামনে মাথানত করতে বাধ্য করে, তাহলে এসব কর্মের ফলে সে সাদৃশ্যগত শিরকের চুড়ান্তে পৌঁছে যায়। এদেরকে আল্লাহ তাআলা চূড়ান্ত লাঞ্ছিত করার ঘোষণা দিয়েছেন। একদিন এ সকল অপরাধীকে তিনি মানুষের পদতলে ধুলোয় মিশিয়ে দেবেন।
নবীজি ইরশাদ করেন, মহা-প্রতিপালক আল্লাহ তাআলা ঘোষণা দিচ্ছেন-
الْعَظَمَةُ إِزَارِي، وَالْكِبْرِيَاءُ رِدَائِي، فَمَنْ نَازَعَنِي وَاحِدًا مِنْهُمَا عَذَبْتُهُ
'ইযযত আমার গায়ের পোশাক এবং অহংকার আমার চাদর। যদি কেউ এই দুটি ধরে টানাটানি করে, আমি তাকে শাস্তি দেব।' [১]
ভাস্কর্য ও ছবি নির্মাতাগণ নিজ হাতে মানুষের অবয়ব তৈরি করে। এই কাজটি আল্লাহ তাআলার সৃষ্টির সঙ্গে সাদৃশ্য রাখে। ফলে তারা কিয়ামতের দিন কঠিন জিজ্ঞাসাবাদ ও শাস্তির সম্মুখীন হবে। লক্ষণীয় বিষয় হলো, আল্লাহর কার্যক্রমের সঙ্গে সাদৃশ্য রাখে—এমন কাজ কত বড় অন্যায়!
নবীজি ইরশাদ করেন—
أَشَدُّ النَّاسِ عَذَابًا يَوْمَ الْقِيَامَةِ الْمُصَوِّرُونَ، يُقَالُ لَهُمْ أَحْيُوا مَا خَلَقْتُمْ
'কিয়ামতের দিন সবচেয়ে বেশি শাস্তি ভোগ করবে ছবি-নির্মাতারা। তাদেরকে বলা হবে, তোমরা যা নির্মাণ করেছ তাতে প্রাণ সঞ্চার করো।[২]'
অন্যত্র রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন—
قَالَ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ: وَمَنْ أَظْلَمُ مِمَّنْ ذَهَبَ يَخْلُقُ خَلْقًا كَخَلْقِي، فَلْيَخْلُقُوا ذَرَّةٌ، فَلْيَخْلُقُوا شَعِيرَةً
"আল্লাহ তাআলা বলেন, "ওই ব্যক্তির চেয়ে বড় জালিম আর কে হতে পারে, যে আমার সৃষ্টির মতো সৃষ্টি করতে উদ্যত হয়। তারা যেন একটি ধূলিকণা এবং একটি জবের শস্য সৃষ্টি দেখায়।[৩]"
এ হাদীসে আল্লাহ তাআলা একটি ধুলিকণা ও একটি শস্যের কথা উল্লেখ করেছেন। এত ক্ষুদ্র কোনো বস্তু সৃষ্টি করতেই বান্দা অক্ষম হয়ে যায়। সুতরাং এর চেয়ে বৃহৎ কোনো সৃষ্টির কথা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। উপরের হাদীসে সেসকল লোকের শাস্তির কথা বলা হয়েছে, যারা কোনো কাজের ক্ষেত্রে আল্লাহর সঙ্গে সাদৃশ্য রাখে। আর যারা স্বয়ং আল্লাহর ক্ষমতা ও প্রভুত্বের সঙ্গে সাদৃশ্য রাখতে চায়, তাদের পরিণতি কতটা ভয়াবহ, তা সহজেই অনুমেয়। একই পরিণতি সেসকল লোকদের জন্যেও, যারা নিজেদের জন্য আল্লাহ তাআলার বিশেষ কোনো নাম গ্রহণ করে। 'রাজাধিরাজ', 'মহাপরাক্রমশালী' অথবা 'সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী'-এ-জাতীয় অর্থ বুঝায়, এমন কোনো নাম বান্দার জন্য সমীচীন নয়।
হাদীসে বর্ণিত হয়েছে-
إِنَّ أَخْنَعَ الْأَسْمَاءِ عِنْدَ اللَّهِ رَجُلٌ يُسَمِّي بِشَاهَانُ شَاهُ - أَيْ مَلِكِ الْمُلُوكِ - لَا مَلِكَ إِلَّا اللهُ وَفِي لَفْظ : أَغِيظُ رَجُلٍ عَلَى اللَّهِ رَجُلٌ يُسَمَّى بِمَلِكِ الْأَمْلَاكِ
'আল্লাহ তাআলার নিকট সবচেয়ে নিকৃষ্ট নাম হলো 'রাজাধিরাজ', 'সকল বাদশাহের বাদশাহ' ইত্যাদি নাম। আল্লাহ ছাড়া রাজাধিরাজ আর কেউ নেই।' [১] অপর এক হাদীসে বর্ণিত আছে- 'আল্লাহ তাআলার নিকট সবচেয়ে ক্রোধ-উদ্রেককারী হলো ঐ ব্যক্তি, যার নাম 'রাজাধিরাজ'।[২]
আল্লাহপাকের ক্রোধ সেসব লোকদের উপরই নিপতিত হবে, যারা আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো জন্য বৈধ নয়-এমন নাম গ্রহণ করে। কেননা, আহকামুল হাকিমীন, মালিকুল আমলাক, শাহানশাহ (সকল ক্ষমতার অধিকারী) কেবল আল্লাহ তাআলা। তিনিই সমগ্র জাহানের একচ্ছত্র অধিপতি। আসমান-জমিন সর্বত্র কেবল তাঁরই বিধান কার্যকর হয়। তিনি মহাপরাক্রমশালী। তাঁর সমকক্ষ কেউ নেই, কখনো হবেও না।

টিকাঃ
[১] সূরা নূর, আয়াত-ক্রম: ৩৫
[১] আবু দাউদ, হাদীস-ক্রম: ৪০৯০
[২] বুখারী, হাদীস-ক্রম: ৫৯৫০
[৩] বুখারী, হাদীস-ক্রম: ৫৯৫৩
[১] বুখারী, হাদীস-ক্রম: ৬২০৬
[২] মুসলিম, হাদীস-ক্রম: ২১৪৩

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00