📄 ইবাদাত এবং লেনদেনের ক্ষেত্রে শিরক
ইতিপূর্বে বর্ণিত শিরকসমূহের তুলনায় ইবাদাত এবং লেনদেনের শিরকের পাপ কিছুটা লঘু। বিশেষত ইবাদাতের ক্ষেত্রে শিরকের শাস্তিও অনেক কম। কেননা, এটা এতটাই সুক্ষ্ম যে, কোনো নির্ভেজাল বিশ্বাসী মানুষও যেকোনো সময় মনের অজান্তেই এই শিরকে লিপ্ত হয়ে যেতে পারে। সে নিজেও টের পাবে না। ধরা যাক, এক ব্যক্তি আল্লাহ তাআলার উপর পূর্ণ বিশ্বাস স্থাপন করেছে। সে বিশ্বাস করে, সকল লাভ-ক্ষতির মালিক কেবল আল্লাহ। তিনি ব্যতীত ইবাদাতের উপযুক্ত আর কেউ নেই। তিনি সৃষ্টিকর্তা, তিনিই পালনকর্তা। কিন্তু কখনো কখনো বান্দার ভুল হয়। তার ইবাদাত, লেনদেন সব সময়ই একমাত্র আল্লাহর জন্য হয়ে ওঠে না। সে নিজেকে রক্ষা করতে আমল করে। পার্থিব কোনো প্রাপ্তি কিংবা মানুষের মাঝে যশখ্যাতির জন্যেও করে থাকতে পারে। এমতাবস্থায় তার আমল আল্লাহর জন্যই হয়; কিন্তু মস্তিষ্কে বসে থাকে শয়তান আর জাগতিক লোভ। পৃথিবীজুড়ে অধিকাংশ মানুষের ইবাদাতই এমন দোদুল্যমান। এটাও এক প্রকারের শিরক।
📄 ইবাদাতের শিরক থেকে বেঁচে থাকার উপায়
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-
وَمَا أُمِرُوا إِلَّا لِيَعْبُدُوا اللَّهَ مُخْلِصِينَ لَهُ الدِّينَ حُنَفَاءَ
'তাদেরকে কেবল এটাই আদেশ করা হয়েছে যে, তারা যেন ইখলাসের সঙ্গে, একাগ্র হয়ে আল্লাহর ইবাদাত করে।' যে ব্যক্তি ইখলাস বা একনিষ্ঠতা সহকারে আল্লাহর ইবাদাত করবে না, তাকে আল্লাহর আদেশের বিপরীত কাজের জন্য পাকড়াও হতে হবে। ইখলাস সহকারে আমল করা আল্লাহ তাআলার আদেশ। হাদীসে কুদসীতে বর্ণিত আছে-
أَنَا أَغْنَى الشُّرَكَاءِ عَنِ الشِّرْكِ، فَمَنْ عَمِلَ عَمَلًا أَشْرَكَ مَعِي فِيهِ غَيْرِي فَهُوَ لِلَّذِي أَشْرَكَ بِهِ، وَأَنَا مِنْهُ بَرِيءٌ
'মুশরিকদের আমলে আমার কিছু যায় আসে না। যদি কোনো ব্যক্তি কোনো আমল করে, এবং তার মধ্যে আমার সঙ্গে অন্য কাউকে শরিক করে, তাহলে এ আমল হবে ওই শরীকের জন্য। আমার মর্যাদা এর চেয়ে অনেক উঁচু।'[১]
ইবাদাতের শিরক দুই প্রকার।
* 'শিরকে আকবার' তথা বড় শিরক।
* 'শিরকে আসগার' তথা ছোট শিরক।
'শিরকে আসগার' অন্যান্য আমলের দ্বারা মাফ করে দেয়া হয়। কিন্তু 'শিরকে আকবার' তাওবা ছাড়া কিছুতেই মাফ করা হয় না। আল্লাহ তাআলার প্রতি শ্রদ্ধা, ভক্তি কিংবা ভালোবাসার ক্ষেত্রে কাউকে শরীক করা 'শিরকে আকবার'। কাউকে শরীক করার অর্থ দাঁড়ায়, আল্লাহ এবং বান্দা একই রকমের ভালোবাসা পাওয়ার যোগ্য, যা স্পষ্টই ধৃষ্টতার লক্ষণ। এ সকল শিরক ক্ষমার অযোগ্য। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-
وَمِنَ النَّاسِ مَنْ يَتَّخِذُ مِنْ دُونِ اللَّهِ أَنْدَادًا يُحِبُّونَهُمْ كَحُبِّ اللَّهِ وَالَّذِينَ آمَنُوا أَشَدُّ حُبًّا لِلَّهِ
'আর কতিপয় লোক এমন রয়েছে, যারা আল্লাহ ছাড়া অন্যকে আল্লাহর সমকক্ষরূপে গ্রহণ করে, আল্লাহকে ভালোবাসার মতোই তাদেরকে ভালোবাসে।'[২]
এ প্রকৃতির মুশরিকরা সারাজীবন যেসকল মিথ্যা উপাস্যদের ইবাদাত করে এসেছে, তারা কিয়ামতের দিন সেসব উপাস্যদের বলবে- (পবিত্র কুরআনের আয়াতা)
تَاللَّهِ إِنْ كُنَّا لَفِي ضَلَالٍ مُبِينٍ إِذْ نُسَوِّيكُمْ بِرَبِّ الْعَالَمِينَ
'আল্লাহর কসম! আমরা স্পষ্ট ভ্রান্তিতে ডুবে ছিলাম, যখন আমরা তোমাদেরকে উভয়জাহানের প্রতিপালক আল্লাহ তাআলার বরাবর মনে করে আসছিলাম'। [১]
কুরআনের আয়াত থেকে বোঝা যায়, যারা আল্লাহর সঙ্গে অন্য কাউকে শরীক করে, তারা কখনোই শরীক উপাস্যদেরকে রিযিকদাতা, পালনকর্তা মনে করে না। বরং ভক্তি, শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও অনুরাগ বশত এ ধরনের শিরকে জড়িয়ে থাকে। এক দৃষ্টিকোণ থেকে এটা অজ্ঞতার চূড়ান্ত প্রকাশ। অপর দৃষ্টিকোণ থেকে এটি ভয়ানক এক জুলুমও বটে। মাটি থেকে সৃষ্ট এক বস্তু কী করে মহাপরাক্রমশালী আল্লাহর সমকক্ষ হতে পারে? দাসানুদাস কীভাবে পালনকর্তার সমান হয়? এক প্রস্থ মাটির কী মূল্য আছে? সে তো একা একা সৃষ্টিও হতে পারেনি। তাকে সৃষ্টি করেছেন আল্লাহ তাআলা। তার মধ্যে গুণাগুণ দান করেছেন তিনি। আল্লাহর সৃষ্টি নৈপুণ্যেই সে জমাটবদ্ধ এবং তরল হতে পারে। আল্লাহ মহান। সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী। দয়া অনুগ্রহ, জ্ঞান, ভালোবাসার এক অফুরন্ত ভাণ্ডার তিনি। তাঁর সঙ্গে সামান্য মাটির দলাকে শরীক করা বিবেকের ভয়ানক অমার্জনীয় অপব্যবহার।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-
الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ وَجَعَلَ الظُّلُمَاتِ وَالنُّورَ - ثُمَّ الَّذِينَ كَفَرُوا بِرَبِّهِمْ يَعْدِلُونَ
'সকল প্রশংসা আল্লাহ তাআলার, যিনি সমস্ত আকাশ এবং ভূমি সৃষ্টি করেছেন, আলো এবং অন্ধকার সৃষ্টি করেছেন, তথাপি কাফিররা অন্য কাউকে তাঁর সমকক্ষ সাব্যস্ত করে'। [২]
আল্লাহ আসমান-জমিন সৃষ্টি করেছেন, আলো-অন্ধকার সৃষ্টি করেছেন। এমন মহান সত্তাকে কাফিররা এমন কিছু মৃত মাটির ঢেলার সঙ্গে তুলনা করে, যাদের নিজেদেরই নিজ ক্ষমতায় তৈরি হওয়ার শক্তি নেই। নিজেদের লাভ-ক্ষতিও তাদের হাতে নেই। পৃথিবীর ভালো-মন্দে তাদের কোনো অংশগ্রহণ নেই। আফসোস! তাদেরকে আল্লাহর সমকক্ষ মনে করা মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় জুলুম।
টিকাঃ
[১] সূরা কাহফ, আয়াত-ক্রম: ১১০
[১] মুসলিম, হাদীস-ক্রম: ২৯৮৫
[২] সূরা বাকারা, আয়াত-ক্রম: ১৬৫
[১] সূরা শুআরা, আয়াত-ক্রম: ৯৭-৯৮
[২] সূরা আনআম, আয়াত-ক্রম: ০১
📄 কথা ও কর্মের শিরক
উপরে বিবৃত শিরকের পরে আরও কতিপয় শিরক হলো, বান্দা তার কথা, কাজ ও নিয়তের ক্ষেত্রে অন্য কাউকে আল্লাহর সঙ্গে শরীক করা। কর্মের শিরকের উদাহরণ, আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো সামনে মাথা অবনত করে সিজদা করা। আল্লাহর ঘর পবিত্র কাবা ব্যতীত অন্য কোনো ঘর তওয়াফ করা। হজরে আসওয়াদ ব্যতীত অন্য কোনো পাথর বা কবরে চুম্বন করা। কবরে সিজদা করা। নবীজি ﷺ পূর্ববর্তী নবী-রাসূল এবং নেককার বান্দাদের কবর-কেন্দ্রিক মসজিদ নির্মাতাদেরকে লানত করেছেন। আর যারা স্বয়ং কবরকেই প্রতিমা বানিয়ে উপাসনা করে, তাদের অবস্থা কতটা ভয়াবহ হতে পারে!
রাসূল ﷺ ইরশাদ করেন-
لَعَنَ اللَّهُ الْيَهُودَ وَالنَّصَارَى اتَّخَذُوا قُبُورَ أَنْبِيَائِهِمْ مَسَاجِدَ
'ইহুদী ও নাসারাদের ওপর আল্লাহর লানত বর্ষিত হোক, যারা তাদের নবী- রাসূলদের কবরকে মসজিদে পরিণত করেছে।'(১)
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরও বলেন-
إِنَّ شِرَارَ النَّاسِ مَنْ تُدْرِكُهُمُ السَّاعَةُ وَهُمْ أَحْيَاءُ، وَالَّذِينَ يَتَّخِذُونَ الْقُبُورَ مَسَاجِدَ
'হতভাগা সেসকল মানুষ, যাদের জীবদ্দশায় কিয়ামত সংঘটিত হবে। এবং হতভাগা সেসকল মানুষ, যারা কবরকে সিজদার জায়গা বানিয়ে নেয়।[১]
সহীহ মুসলিমে বর্ণিত আছে-
إِنَّ مَنْ كَانَ قَبْلَكُمْ كَانُوا يَتَّخِذُونَ الْقُبُورَ مَسَاجِدَ، أَلَا فَلَا تَتَّخِذُوا الْقُبُورَ مَسَاجِدَ، فَإِنِّي أَنْهَاكُمْ عَنْ ذَلِكَ
'তোমাদের পূর্ববর্তীরা কবরকে সিজদার স্থান বানিয়ে ফেলেছিল। খবরদার, তোমরা তা কোরো না। আমি তোমাদেরকে এমন গর্হিত কাজ থেকে সতর্ক করে দিচ্ছি। [২]
মুসনাদু আহমাদ এবং সহীহ ইবনু হিব্বানে বর্ণিত আছে। রাসূল ইরশাদ করেন-
لَعَنَ اللَّهُ زَوَّارَاتِ الْقُبُورِ، وَالْمُتَّخِذِينَ عَلَيْهَا الْمَسَاجِدَ وَالسُّرُجَ
'কবর যিয়ারতকারী নারী, কবরের উপর সিজদাকারী এবং বাতি প্রজ্জ্বলনকারী ব্যক্তিদের ওপর আল্লাহ তাআলা লানত বর্ষণ করেন।[৩]
অপর এক হাদীসে বর্ণিত হয়েছে-
اشْتَدَّ غَضَبُ اللَّهِ عَلَى قَوْمِ اتَّخَذُوا قُبُورَ أَنْبِيَائِهِمْ مَسَاجِدَ
'আল্লাহ তাআলা এমন সম্প্রদায়ের উপর সবচেয়ে বেশি রাগান্বিত হন, যারা তাদের নবীদের কবরকে সিজদার স্থানে পরিণত করে।[৪]
আরও একটি হাদীস-
إِنَّ مَنْ كَانَ قَبْلَكُمْ، كَانَ إِذَا مَاتَ فِيهِمُ الرَّجُلُ الصَّالِحُ، بَنَوْا عَلَى قَبْرِهِ مَسْجِدًا، وَصَوَّرُوا فِيهِ تِلْكَ الصُّوَرَ، أُولَئِكَ شِرَارُ الْخَلْقِ عِنْدَ اللَّهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ
'তোমাদের পূর্বে এমন অনেক লোক ছিল, তাদের মধ্য থেকে যখন কোনো নেককার বুযুর্গ ব্যক্তি ইন্তেকাল করত, তারা তার কবরের ওপর মসজিদ নির্মাণ করত। এবং সেখানে তার অংকিত ছবি স্থাপন করত। কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলার সম্মুখে তারা সবচেয়ে নিকৃষ্টতর সৃষ্টি হিসেবে উপস্থিত হবে।[১]
এ তো হলো সেসকল ব্যক্তি বা সম্প্রদায়ের কথা, যারা কবরের ওপর মসজিদ নির্মাণ করে আল্লাহকে সিজদা করবে; কিন্তু যারা স্বয়ং কবরকেই সিজদা করে, তাদের পরিণতি তো হবে আরো ভয়াবহ! নবীজি আল্লাহ তাআলার দরবারে দুআ করেছিলেন-
اللَّهُمَّ لَا تَجْعَلْ قَبْرِي وَثَنَا يُعْبَدُ
'আল্লাহ! আপনি আমার কবরকে পূজারিদের মূর্তিতে পরিণত করবেন না।' [২]
প্রকৃতপক্ষে এসকল হাদীসের মাধ্যমে নবীজি আল্লাহ তাআলার একত্ববাদের চতুর্পাশে এমন এক প্রাচীর স্থাপন করে গিয়েছেন যে, কেউ তা ভেঙে আল্লাহর একত্ববাদকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারবে না। এমনকি তার কাছেও ভিড়তে পারবে না। খেয়াল করা দরকার, নবীজি সূর্যোদয় এবং সূর্যাস্তের সময় নফল নামায পড়তে নিষেধ করেছেন। এভাবে তিনি সূর্যপূজারিদের সঙ্গে মুসলমানদের সাদৃশ্যের সকল পথ বন্ধ করে দিয়েছেন। আর আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো ইবাদাতের ব্যাপারে তিনি ছিলেন অত্যন্ত কঠোর। হাদীসে বর্ণিত হয়েছে-
لَا يَنْبَغِي لِأَحَدٍ أَنْ يَسْجُدَ لِأَحَدٍ إِلَّا لِلَّهِ
'কেউ যেন আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে সিজদা না করে।' [৩]
উল্লিখিত হাদীসে "لا ينبغى" শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। পবিত্র কুরআন ও হাদীস শরীফে উক্ত শব্দ দ্বারা পূর্ণাঙ্গ আদেশ বুঝানো হয়। অর্থাৎ এই শব্দ দ্বারা কৃত আদেশ অথবা নিষেধ অকাট্য পালনীয়।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-
وَمَا يَنْبَغِي لِلرَّحْمَنِ أَنْ يَتَّخِذَ وَلَدًا
'সন্তান গ্রহণ করা পরম করুণাময় আল্লাহর শান নয়।[১]
এখানেও 'لا ينبغي' শব্দের ব্যবহার রয়েছে। এবং এ বিধানের কোনো নড়চড় হবে না। 'لا ينبغي' শব্দ ব্যবহৃত এসকল বিধান ইসলামী শরীয়তে অত্যন্ত কঠোরভাবে পালন করা হয়।
টিকাঃ
[১] বুখারী, হাদীস-ক্রম: ১৩০৭
[১] মুসনাদু আহমাদ, হাদীস-ক্রম: ১৬৯৪; সনদ হাসান। সিয়ারু আলামিন নুবালা-১/৪০১
[২] মুসলিম, হাদীস-ক্রম: ৫৩২
[৩] মুসনাদু আহমাদ, হাদীস-ক্রম: ২০৩০; শুয়াইব আরনাউতের মতে হাদীসটির সনদ হাসান লিগাইরিহি। তবে সমস্ত বর্ণনায় হাদীসটি পাওয়া যায় তথা রাসূল লানত বর্ষণ করেন-এই শব্দে।
[৪] মুয়াত্তা মালিক-১/১৭২
[১] বুখারী, হাদীস-ক্রম: ৪২৭
[২] মুসনাদু আহমাদ, হাদীস-ক্রম: ৭৩৫২
[৩] হাদীসটি মুনকার, কাশফুল আসতার-৩/১৩২
[১] সূরা মারইয়াম, আয়াত-ক্রম: ৯২
📄 কথার শিরক
আল্লাহ তাআলার সঙ্গে শিরক শুধু কাজ-কর্মের মাধ্যমেই নয়, মুখ-নিসৃত শব্দের মাধ্যমেও যদি কেউ অন্য কিছুকে আল্লাহ তাআলার শরীক বলে ব্যক্ত করে, তাহলে সেটাও শিরকের অন্তর্ভুক্ত হবে। এর একটি উদাহরণ হলো, আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো নামে শপথ করা। মুসনাদু আহমাদ এবং সুনানু আবি দাউদে বর্ণিত আছে-
مَنْ حَلَفَ بِغَيْرِ اللَّهِ فَقَدْ أَشْرَكَ
'যে ব্যক্তি আল্লাহ ছাড়া অন্য কিছুর নামে শপথ করল, সে শিরক করল।' [২]
কোনো ব্যক্তি যদি অপর কাউকে বলে, 'যদি আল্লাহ চান, এবং তুমি চাও তবে এমন হতে পারে।' এটাও পূর্বোক্ত প্রকারের শিরক। স্বয়ং রাসূলকে এক সাহাবী বলেছিলেন-
مَا شَاءَ اللَّهُ وَشِئْتَ
'আল্লাহ এবং আপনি যেমন চান।'
নবীজি তখন তাঁকে বলেছিলেন, 'তুমি কি আমাকে আল্লাহর সমকক্ষ বানিয়ে দিচ্ছ? বলো, শুধুমাত্র আল্লাহ যা চান তাই হবে।' [১]
বিশ্বজগতের সকল সৃষ্টিই আল্লাহ তাআলার তুলনায় অতি ক্ষুদ্র, তুচ্ছ; আল্লাহর সাথে সবকিছুই তুলনার অযোগ্য। তাদের ভেতরের ইচ্ছাশক্তিও আল্লাহ তাআলার সৃষ্টি। সুতরাং এত ক্ষুদ্র এক সৃষ্টির ইচ্ছাকে মহাপরাক্রমশালী আল্লাহর ইচ্ছার সঙ্গে যুক্ত করা নিঃসন্দেহে চূড়ান্ত নির্বুদ্ধিতা ও ধৃষ্টতার নামান্তর। মানুষ সাধারণত বলে থাকে, 'আল্লাহ আর তুমি ছাড়া আমি আর কারো ওপর ভরসা করতে পারি না', অথবা, 'আমার জন্য আল্লাহ এবং তুমিই যথেষ্ট', কিংবা 'আসমানে আল্লাহ আর জমিনে তুমি'-এ ধরনের সব কথাই শিরক। অবশ্যই এ ধরনের কথার জন্য আল্লাহ তাআলার কাছে তাওবা করতে হবে। যে ব্যক্তি নবীজিকে বলেছিলেন, 'আল্লাহ এবং আপনি যেমন চান', তাঁর বলা বাক্যটি আমাদের দৈনন্দিন বেখেয়ালে বলে যাওয়া অসংখ্য বাক্যের তুলনায় মার্জিত ছিল। তিনি তো মহান আল্লাহ তাআলার প্রিয়পাত্র নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আল্লাহর সমকক্ষ বানিয়েছিলেন, [২] আর আমরা তো এমন ব্যক্তিকে আল্লাহর সমকক্ষ বানিয়ে ফেলি যে আল্লাহর দুশমনও হতে পারে। এবং সে রাসূলের একটি পদধূলির সমকক্ষও হবে না কোনদিন। মোটকথা, ইবাদাত, আনুগত্য, ভরসা, ভয়, তাওবা ইস্তিগফার, দান-সাদাকাহ, মান্নত, কসম, তাসবীহ, তাহলীল, দুআ, সিজদা, তাওয়াফ-ইত্যাদি সকল ইবাদাত একমাত্র আল্লাহ তাআলার জন্যই হওয়া আবশ্যক। জীবনের এই প্রধান সাধনা একমাত্র আল্লাহ তাআলার জন্যই হবে, এক্ষেত্রে কোনো নবী, রাসূল, ফিরিশতা বা কোনো বুযুর্গ, দরবেশ ব্যক্তির বন্দুমাত্রও কোনো অংশ থাকবে না। অন্যথায় সবই অর্থহীন। হাশরের ময়দানে শিরকমিশ্রিত আমল বান্দাকে আরও বেশি খারাপ পরিণতির দিকে ঠেলে নিয়ে যাবে।
প্রত্যক ব্যক্তিরই স্মরণ রাখা আবশ্যক, আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে উপাস্যের আসনে অধিষ্ঠিত করা জঘন্যতম অন্যায়। কোনো পীর, বুযুর্গ, নবী, রাসূল- কেউই তাঁর সমকক্ষ নয়। মুসনাদু আহমাদে বর্ণিত আছে, একবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট এক সাহাবী এলেন। তিনি একটি গুনাহে লিপ্ত হয়ে অনুতপ্ত হয়ে পড়েছিলেন। নবীজির সামনে দাঁড়িয়েই তিনি এই বলে তাওবা করলেন-
اللَّهُمَّ إِنِّي أَتُوبُ إِلَيْكَ وَلَا أَتُوبُ إِلَى مُحَمَّدٍ
'আল্লাহ, আমি আপনার নিকট তাওবা করছি, আমি নবীজি মুহাম্মদের কাছে তাওবা করছি না।' এ কথা শুনে রাসূল ইরশাদ করেন-
عَرَفَ الْحَقَّ لِأَهْلِهِ
'সে প্রকৃত হকদারকে চিনতে পেরেছে।' [১]
টিকাঃ
[২] তিরমিযী, হাদীস-ক্রম: ১৫৩৫
[১] মুসনাদু আহমাদ, হাদীস-ক্রম: ১৮৩৯; শাইখ শুয়াইব আরনাউতের মতে হাদীসটি সহীহ লিগাইরিহী।
[২] বস্তুত শিরক শিরকই। আল্লাহর সঙ্গে কাউকে কোনো বিষয়ে শরীক করাকে শিরক বলে। এবং শিরক যার সঙ্গেই করা হোক তা সমান অপরাধ, এ ক্ষেত্রে নবীজি ও অন্যান্য মানুষের মধ্যে কোনো ফারাক নেই। তবে এখানে নবীজিকে আল্লাহর সঙ্গে শরীক করার বিষয়টিকে ঈষৎ হালকা করে দেখানো হয়েছে শুধুই শিরকের ভয়াবহতা বোঝানোর জন্য। -সম্পাদক
[১] মুসনাদু আহমাদ, হাদীস-ক্রম: ১৫৫৮৭; শুয়াইব আরনাউতের মতে হাদীসটি যঈফ।