📘 রূহের খোরাক > 📄 শিরক দুই প্রকার

📄 শিরক দুই প্রকার


১. আল্লাহর সত্তার সঙ্গে শিরক।
২. আল্লাহ তাআলার ইবাদাত ও আদেশ পালনের ক্ষেত্রে শিরক।
প্রথম প্রকারের শিরককে দুটি ভাগে ভাগ করা যায়-

ক. এমন শিরক যাকে আরবীতে শিরকৃত তা'তীল বলা হয়। অর্থাৎ আল্লাহ তাআলাকে তাঁর গুণাবলি ও ক্ষমতা প্রদর্শনের ক্ষেত্রে অক্ষম মনে করা। এটি সবচেয়ে ভয়ংকর শিরক। পবিত্র কুরআনে ফিরআউনের কথা বর্ণিত আছে, সে অবজ্ঞাভরে বলেছিল-

وَمَا رَبُّ الْعَالَمِينَ
'বিশ্বজগতের প্রতিপালক আবার কী!' [১]

وَقَالَ فِرْعَوْنُ يَا هَامَانُ ابْنِ لِي صَرْحًا لَعَلِّي أَبْلُغُ الْأَسْبَابَ - أَسْبَابَ السَّمَاوَاتِ فَأَطَّلِعَ إِلَى إِلَهِ مُوسَى وَإِنِّي لَأَظُنُّهُ كَاذِبًا
'তারপর ফিরআউন হামানকে বলেছিল, আমার জন্য একটি উঁচু প্রাসাদ নির্মাণ করো, যেন আমি তাতে আরোহণ করে মুসার প্রভুকে উঁকি মেরে দেখে আসতে পারি। আমি মুসাকে মিথ্যাবাদী বলেই মনে করি।[২]

খ. এই প্রকার শিরকের দ্বিতীয় ভাগ হলো আল্লাহকে অক্ষম না ভেবেই তাঁর সঙ্গে কাউকে শরিক করা। তা'তীল তথা আল্লাহ তাআলাকে অক্ষম মনে করার তিন অর্থ-

১. সৃষ্টিকর্তাকে অপ্রয়োজনীয় মনে করা।
২. সৃষ্টিকর্তার সর্বময় ক্ষমতার ব্যাপারে আস্থাশীল না হওয়া।
৩. আল্লাহ তাআলার পৃথক অস্তিত্বকে অগ্রাহ্য করা। তাঁকে সৃষ্টিজীবের সমতুল্য মনে করা। অর্থাৎ যা সৃষ্টি, তাই স্রষ্টা; সৃষ্টি ও স্রষ্টার পৃথক পৃথক অস্তিত্ব অস্বীকার করা।

পৃথিবীতে আরও আরও শিরক রয়ে গেছে। এক দল মানুষ মনে করে পৃথিবী একটি চিরস্থায়ী আবাসভূমি। এর কোনো অনস্তিত্ব ছিল না। চিরকাল ধরেই পৃথিবী বিদ্যমান। কোনোদিন তার অস্তিত্ব বিনাশ হবে না। পৃথিবী থেকে যাবে। কোনোদিন ধ্বংস হবে না।

জাহমিয়া এবং কারামিতা নামের দুটি দল আছে, তাদের শিরকের প্রকার ভয়ংকর। তারা মনে করে, আল্লাহর অস্তিত্ব আছে। তবে পৃথিবীর সৃষ্টি এবং সর্বময় কৃতিত্ব আল্লাহর নয়। তারা আল্লাহর অস্তিত্বকে স্বীকার করে কিন্তু তাঁর গুণাবলিকে স্বীকার করে না। তাদের নিকট স্রষ্টা মানুষের চেয়েও হেয় প্রকৃতির এক সত্তা (নাউযুবিল্লাহ)।

টিকাঃ
[১] সূরা শুআরা, আয়াত-ক্রম: ২৩
[২] সূরা গাফির, আয়াত-ক্রম: ৩৬, ৩৭

📘 রূহের খোরাক > 📄 অগ্নি-পূজারি ও কাদেরিয়াদের শিরক

📄 অগ্নি-পূজারি ও কাদেরিয়াদের শিরক


শিরকের দ্বিতীয় প্রকার ছিল, আল্লাহ তাআলাকে প্রকৃত প্রভু মেনে নিয়েও অপর কোনো উপাস্যকে আল্লাহর সঙ্গে শরীক করা। এতে আল্লাহ তালার গুণাবলিকে অকার্যকর মনে করার প্রয়াস আছে। যেমন-

* খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বীরা আল্লাহকে তাদের তিন প্রভুর একজন মনে করে। যেমন-তারা ঈসা ও মারইয়াম আলাইহিমাস সালামকেও খোদা মনে করে থাকে।
* অগ্নি-পূজারিদের শিরক এই প্রকারের অন্তর্ভুক্ত। তারা ভালো কাজকে আলো ও খারাপ কাজকে অন্ধকারের সৃষ্টি মনে করে।
* কাদরিয়াদের শিরকও অগ্নি-উপাসকদের শিরকের অন্তর্ভুক্ত। তারা বলে, মানুষ নিজের ভালো-মন্দ নিজেই সৃষ্টি করে। এর পেছনে অন্য কারো হস্তক্ষেপ নেই।

এ প্রকারের আরেক মুশরিক হলো নমরুদ, ইবরাহীম আলাইহিস সালাম যার নিকট পবিত্র কুরআনের এ আয়াত নিয়ে গিয়েছিলেন-

إِذْ قَالَ إِبْرَاهِيمُ رَبِّيَ الَّذِي يُحْيِي وَيُمِيتُ قَالَ أَنَا أُحْيِي وَأُمِيتُ
'স্মরণ করুন ওই সময়ের কথা, যখন ইবরাহীম বলেছিল, আমার প্রতিপালক জীবন এবং মৃত্যু দান করেন। নমরুদ বলল, আমিও তাই করি।[১]

নমরুদ নিজেকে আল্লাহর সমকক্ষ ভেবেছিল। নিজের অহমিকায় এতটাই ডুবে ছিল যে, সে ভাবত, সেও আল্লাহর মতো জীবন এবং মৃত্যু দান করতে পারে।

ইবরাহীম আলাইহিস সালাম বললেন, 'আমার আল্লাহ আকাশের পূর্ব দিকে সূর্য ওঠান, এবং পশ্চিম দিকে সূর্য ডোবান।' এ কথা শুনে নমরুদ হতভম্ব হয়ে যায়। এ ধরনের মুশরিকদের জন্য ইবরাহীম আলাইহিস সালামের মুখে আল্লাহপ্রদত্ত এই উত্তর একটি তুলনারহিত চ্যালেঞ্জ।

তারকা, সূর্য এবং অগ্নি-পূজারিদের শিরকও এই ধরনের। তারা কিছু বিশেষ তারকা, অথবা বিশেষ সময়ের সূর্য অথবা অগ্নিকে পৃথিবীর ভালো-মন্দে আল্লাহর শরীক ভাবে। 'সায়েবিয়্যাহ' মতাদর্শীরাও এমন। তাদের শিরকের ধরন হলো, কেউ বলে, প্রকৃত উপাস্য কেবল আল্লাহই। তাদের বিশ্বাসেও শিরক আছে। আবার কেউ বলে, সকল উপাস্যদের মধ্যে আল্লাহই সবচেয়ে বড়। এটাও শিরক। কেউ বলে, অনেক অনেক উপাস্যের মধ্যে আল্লাহও একজন।

ইবাদাতের সময় সর্বান্তকরণে আল্লাহর অভিমুখী হতে হবে। তাহলে আল্লাহ বান্দার চাওয়া পূরণ করবেন। এমন ভিন্ন ভিন্ন অনেক মতামত প্রচলিত আছে। এ ধরনের সকল বিশ্বাস ও মত শিরকের অন্তর্ভুক্ত। কেউ কেউ আরও বলেন, প্রতি ছোট উপাস্যেরই অধঃস্তন এবং ঊর্ধ্বতন উপাস্য থাকে। বান্দা যখন প্রার্থনা করে, তখন একজন অপরজনের নিকট বান্দার প্রার্থনা পৌঁছে দেয়। এভাবেই তা আল্লাহর নিকট পৌঁছে। এটাও শিরক। আল্লাহ এবং বান্দার মাঝে কোনো মধ্যসূত্রের প্রয়োজন হয় না। আল্লাহ তাআলার বিধান হলো, বান্দা সরাসরি তাঁর কাছেই প্রার্থনা করতে পারবে।

টিকাঃ
[১] সূরা বাকারা, আয়াত-ক্রম: ২৫৮

📘 রূহের খোরাক > 📄 ইবাদাত এবং লেনদেনের ক্ষেত্রে শিরক

📄 ইবাদাত এবং লেনদেনের ক্ষেত্রে শিরক


ইতিপূর্বে বর্ণিত শিরকসমূহের তুলনায় ইবাদাত এবং লেনদেনের শিরকের পাপ কিছুটা লঘু। বিশেষত ইবাদাতের ক্ষেত্রে শিরকের শাস্তিও অনেক কম। কেননা, এটা এতটাই সুক্ষ্ম যে, কোনো নির্ভেজাল বিশ্বাসী মানুষও যেকোনো সময় মনের অজান্তেই এই শিরকে লিপ্ত হয়ে যেতে পারে। সে নিজেও টের পাবে না। ধরা যাক, এক ব্যক্তি আল্লাহ তাআলার উপর পূর্ণ বিশ্বাস স্থাপন করেছে। সে বিশ্বাস করে, সকল লাভ-ক্ষতির মালিক কেবল আল্লাহ। তিনি ব্যতীত ইবাদাতের উপযুক্ত আর কেউ নেই। তিনি সৃষ্টিকর্তা, তিনিই পালনকর্তা। কিন্তু কখনো কখনো বান্দার ভুল হয়। তার ইবাদাত, লেনদেন সব সময়ই একমাত্র আল্লাহর জন্য হয়ে ওঠে না। সে নিজেকে রক্ষা করতে আমল করে। পার্থিব কোনো প্রাপ্তি কিংবা মানুষের মাঝে যশখ্যাতির জন্যেও করে থাকতে পারে। এমতাবস্থায় তার আমল আল্লাহর জন্যই হয়; কিন্তু মস্তিষ্কে বসে থাকে শয়তান আর জাগতিক লোভ। পৃথিবীজুড়ে অধিকাংশ মানুষের ইবাদাতই এমন দোদুল্যমান। এটাও এক প্রকারের শিরক।

📘 রূহের খোরাক > 📄 ইবাদাতের শিরক থেকে বেঁচে থাকার উপায়

📄 ইবাদাতের শিরক থেকে বেঁচে থাকার উপায়


আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-
وَمَا أُمِرُوا إِلَّا لِيَعْبُدُوا اللَّهَ مُخْلِصِينَ لَهُ الدِّينَ حُنَفَاءَ
'তাদেরকে কেবল এটাই আদেশ করা হয়েছে যে, তারা যেন ইখলাসের সঙ্গে, একাগ্র হয়ে আল্লাহর ইবাদাত করে।' যে ব্যক্তি ইখলাস বা একনিষ্ঠতা সহকারে আল্লাহর ইবাদাত করবে না, তাকে আল্লাহর আদেশের বিপরীত কাজের জন্য পাকড়াও হতে হবে। ইখলাস সহকারে আমল করা আল্লাহ তাআলার আদেশ। হাদীসে কুদসীতে বর্ণিত আছে-
أَنَا أَغْنَى الشُّرَكَاءِ عَنِ الشِّرْكِ، فَمَنْ عَمِلَ عَمَلًا أَشْرَكَ مَعِي فِيهِ غَيْرِي فَهُوَ لِلَّذِي أَشْرَكَ بِهِ، وَأَنَا مِنْهُ بَرِيءٌ
'মুশরিকদের আমলে আমার কিছু যায় আসে না। যদি কোনো ব্যক্তি কোনো আমল করে, এবং তার মধ্যে আমার সঙ্গে অন্য কাউকে শরিক করে, তাহলে এ আমল হবে ওই শরীকের জন্য। আমার মর্যাদা এর চেয়ে অনেক উঁচু।'[১]
ইবাদাতের শিরক দুই প্রকার।
* 'শিরকে আকবার' তথা বড় শিরক।
* 'শিরকে আসগার' তথা ছোট শিরক।
'শিরকে আসগার' অন্যান্য আমলের দ্বারা মাফ করে দেয়া হয়। কিন্তু 'শিরকে আকবার' তাওবা ছাড়া কিছুতেই মাফ করা হয় না। আল্লাহ তাআলার প্রতি শ্রদ্ধা, ভক্তি কিংবা ভালোবাসার ক্ষেত্রে কাউকে শরীক করা 'শিরকে আকবার'। কাউকে শরীক করার অর্থ দাঁড়ায়, আল্লাহ এবং বান্দা একই রকমের ভালোবাসা পাওয়ার যোগ্য, যা স্পষ্টই ধৃষ্টতার লক্ষণ। এ সকল শিরক ক্ষমার অযোগ্য। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-
وَمِنَ النَّاسِ مَنْ يَتَّخِذُ مِنْ دُونِ اللَّهِ أَنْدَادًا يُحِبُّونَهُمْ كَحُبِّ اللَّهِ وَالَّذِينَ آمَنُوا أَشَدُّ حُبًّا لِلَّهِ
'আর কতিপয় লোক এমন রয়েছে, যারা আল্লাহ ছাড়া অন্যকে আল্লাহর সমকক্ষরূপে গ্রহণ করে, আল্লাহকে ভালোবাসার মতোই তাদেরকে ভালোবাসে।'[২]
এ প্রকৃতির মুশরিকরা সারাজীবন যেসকল মিথ্যা উপাস্যদের ইবাদাত করে এসেছে, তারা কিয়ামতের দিন সেসব উপাস্যদের বলবে- (পবিত্র কুরআনের আয়াতা)
تَاللَّهِ إِنْ كُنَّا لَفِي ضَلَالٍ مُبِينٍ إِذْ نُسَوِّيكُمْ بِرَبِّ الْعَالَمِينَ
'আল্লাহর কসম! আমরা স্পষ্ট ভ্রান্তিতে ডুবে ছিলাম, যখন আমরা তোমাদেরকে উভয়জাহানের প্রতিপালক আল্লাহ তাআলার বরাবর মনে করে আসছিলাম'। [১]
কুরআনের আয়াত থেকে বোঝা যায়, যারা আল্লাহর সঙ্গে অন্য কাউকে শরীক করে, তারা কখনোই শরীক উপাস্যদেরকে রিযিকদাতা, পালনকর্তা মনে করে না। বরং ভক্তি, শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও অনুরাগ বশত এ ধরনের শিরকে জড়িয়ে থাকে। এক দৃষ্টিকোণ থেকে এটা অজ্ঞতার চূড়ান্ত প্রকাশ। অপর দৃষ্টিকোণ থেকে এটি ভয়ানক এক জুলুমও বটে। মাটি থেকে সৃষ্ট এক বস্তু কী করে মহাপরাক্রমশালী আল্লাহর সমকক্ষ হতে পারে? দাসানুদাস কীভাবে পালনকর্তার সমান হয়? এক প্রস্থ মাটির কী মূল্য আছে? সে তো একা একা সৃষ্টিও হতে পারেনি। তাকে সৃষ্টি করেছেন আল্লাহ তাআলা। তার মধ্যে গুণাগুণ দান করেছেন তিনি। আল্লাহর সৃষ্টি নৈপুণ্যেই সে জমাটবদ্ধ এবং তরল হতে পারে। আল্লাহ মহান। সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী। দয়া অনুগ্রহ, জ্ঞান, ভালোবাসার এক অফুরন্ত ভাণ্ডার তিনি। তাঁর সঙ্গে সামান্য মাটির দলাকে শরীক করা বিবেকের ভয়ানক অমার্জনীয় অপব্যবহার।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-
الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ وَجَعَلَ الظُّلُمَاتِ وَالنُّورَ - ثُمَّ الَّذِينَ كَفَرُوا بِرَبِّهِمْ يَعْدِلُونَ
'সকল প্রশংসা আল্লাহ তাআলার, যিনি সমস্ত আকাশ এবং ভূমি সৃষ্টি করেছেন, আলো এবং অন্ধকার সৃষ্টি করেছেন, তথাপি কাফিররা অন্য কাউকে তাঁর সমকক্ষ সাব্যস্ত করে'। [২]
আল্লাহ আসমান-জমিন সৃষ্টি করেছেন, আলো-অন্ধকার সৃষ্টি করেছেন। এমন মহান সত্তাকে কাফিররা এমন কিছু মৃত মাটির ঢেলার সঙ্গে তুলনা করে, যাদের নিজেদেরই নিজ ক্ষমতায় তৈরি হওয়ার শক্তি নেই। নিজেদের লাভ-ক্ষতিও তাদের হাতে নেই। পৃথিবীর ভালো-মন্দে তাদের কোনো অংশগ্রহণ নেই। আফসোস! তাদেরকে আল্লাহর সমকক্ষ মনে করা মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় জুলুম।

টিকাঃ
[১] সূরা কাহফ, আয়াত-ক্রম: ১১০
[১] মুসলিম, হাদীস-ক্রম: ২৯৮৫
[২] সূরা বাকারা, আয়াত-ক্রম: ১৬৫
[১] সূরা শুআরা, আয়াত-ক্রম: ৯৭-৯৮
[২] সূরা আনআম, আয়াত-ক্রম: ০১

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00