📘 রূহের খোরাক > 📄 সংশয়ের নিষ্পত্তি

📄 সংশয়ের নিষ্পত্তি


এমন সংশয় নিরসনের জন্য প্রথমে কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর জেনে নিতে হবে। নৈকট্যলাভের জন্য কোনো মাধ্যম গ্রহণ করা আল্লাহ তাআলা পছন্দ করেন কিনা? আমরা কি জানি শরীয়তে শিরক কীসের ভিত্তিতে হারাম হয়েছে? শরীয়তের কোনো বিষয় সঠিকভাবে না জেনে বলে বেড়ানো কি ঠিক? এ বিষয়ে শরীয়তের কোনো সংজ্ঞা কি আছে?
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন-
إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَنْ يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَلِكَ لِمَنْ يَشَاءُ
'আল্লাহ তাআলা তাঁর সঙ্গে কৃত শিরকের গুনাহকে ক্ষমা করবেন না। শিরক ব্যতীত অন্য সব গুনাহ তিনি চাইলে ক্ষমা করে দেবেন।[১]
শিরকের মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে অতিসত্বর কোনো সিদ্ধান্তে না এসে প্রথমেই এ প্রশ্নগুলি গভীরভাবে ভাবা উচিত। আমাদের জানতে হবে, 'মুশরিক' এবং 'মুওয়াহহিদ', আল্লাহর পরিচয় থেকে দূরে থাকা ব্যক্তি এবং আল্লাহর পরিচয় লাভকারী ব্যক্তির মধ্যে তফাত কী। জান্নাতবাসী মানুষের সঙ্গে জাহান্নামবাসীর পার্থক্য কোথায়। এ বিষয়গুলি সহজাত বিষয় নয়। তাই ভাবনার আগেও আল্লাহ তাআলার দরবারে হিদায়াতের জন্য দুআ করে নেয়া উচিত। তিনি যেন সঠিক পথ প্রদর্শন করেন। অন্যথায় শত দ্বিধায় আচ্ছাদিত এ বন্ধুর পথ অতিক্রম করা সত্যিই কঠিন। আল্লাহ ছাড়া হিদায়াতের মালিক কেউ নেই। তাই হিদায়াতের জন্য তাঁরই অভিমুখী হওয়া কর্তব্য। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে তাঁর হিদায়াতের পথে অবিচল রাখুন। আমীন।

টিকাঃ
[১] সূরা নিসা, আয়াত-ক্রম: ৪৮

📘 রূহের খোরাক > 📄 শিরক দুই প্রকার

📄 শিরক দুই প্রকার


১. আল্লাহর সত্তার সঙ্গে শিরক।
২. আল্লাহ তাআলার ইবাদাত ও আদেশ পালনের ক্ষেত্রে শিরক।
প্রথম প্রকারের শিরককে দুটি ভাগে ভাগ করা যায়-

ক. এমন শিরক যাকে আরবীতে শিরকৃত তা'তীল বলা হয়। অর্থাৎ আল্লাহ তাআলাকে তাঁর গুণাবলি ও ক্ষমতা প্রদর্শনের ক্ষেত্রে অক্ষম মনে করা। এটি সবচেয়ে ভয়ংকর শিরক। পবিত্র কুরআনে ফিরআউনের কথা বর্ণিত আছে, সে অবজ্ঞাভরে বলেছিল-

وَمَا رَبُّ الْعَالَمِينَ
'বিশ্বজগতের প্রতিপালক আবার কী!' [১]

وَقَالَ فِرْعَوْنُ يَا هَامَانُ ابْنِ لِي صَرْحًا لَعَلِّي أَبْلُغُ الْأَسْبَابَ - أَسْبَابَ السَّمَاوَاتِ فَأَطَّلِعَ إِلَى إِلَهِ مُوسَى وَإِنِّي لَأَظُنُّهُ كَاذِبًا
'তারপর ফিরআউন হামানকে বলেছিল, আমার জন্য একটি উঁচু প্রাসাদ নির্মাণ করো, যেন আমি তাতে আরোহণ করে মুসার প্রভুকে উঁকি মেরে দেখে আসতে পারি। আমি মুসাকে মিথ্যাবাদী বলেই মনে করি।[২]

খ. এই প্রকার শিরকের দ্বিতীয় ভাগ হলো আল্লাহকে অক্ষম না ভেবেই তাঁর সঙ্গে কাউকে শরিক করা। তা'তীল তথা আল্লাহ তাআলাকে অক্ষম মনে করার তিন অর্থ-

১. সৃষ্টিকর্তাকে অপ্রয়োজনীয় মনে করা।
২. সৃষ্টিকর্তার সর্বময় ক্ষমতার ব্যাপারে আস্থাশীল না হওয়া।
৩. আল্লাহ তাআলার পৃথক অস্তিত্বকে অগ্রাহ্য করা। তাঁকে সৃষ্টিজীবের সমতুল্য মনে করা। অর্থাৎ যা সৃষ্টি, তাই স্রষ্টা; সৃষ্টি ও স্রষ্টার পৃথক পৃথক অস্তিত্ব অস্বীকার করা।

পৃথিবীতে আরও আরও শিরক রয়ে গেছে। এক দল মানুষ মনে করে পৃথিবী একটি চিরস্থায়ী আবাসভূমি। এর কোনো অনস্তিত্ব ছিল না। চিরকাল ধরেই পৃথিবী বিদ্যমান। কোনোদিন তার অস্তিত্ব বিনাশ হবে না। পৃথিবী থেকে যাবে। কোনোদিন ধ্বংস হবে না।

জাহমিয়া এবং কারামিতা নামের দুটি দল আছে, তাদের শিরকের প্রকার ভয়ংকর। তারা মনে করে, আল্লাহর অস্তিত্ব আছে। তবে পৃথিবীর সৃষ্টি এবং সর্বময় কৃতিত্ব আল্লাহর নয়। তারা আল্লাহর অস্তিত্বকে স্বীকার করে কিন্তু তাঁর গুণাবলিকে স্বীকার করে না। তাদের নিকট স্রষ্টা মানুষের চেয়েও হেয় প্রকৃতির এক সত্তা (নাউযুবিল্লাহ)।

টিকাঃ
[১] সূরা শুআরা, আয়াত-ক্রম: ২৩
[২] সূরা গাফির, আয়াত-ক্রম: ৩৬, ৩৭

📘 রূহের খোরাক > 📄 অগ্নি-পূজারি ও কাদেরিয়াদের শিরক

📄 অগ্নি-পূজারি ও কাদেরিয়াদের শিরক


শিরকের দ্বিতীয় প্রকার ছিল, আল্লাহ তাআলাকে প্রকৃত প্রভু মেনে নিয়েও অপর কোনো উপাস্যকে আল্লাহর সঙ্গে শরীক করা। এতে আল্লাহ তালার গুণাবলিকে অকার্যকর মনে করার প্রয়াস আছে। যেমন-

* খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বীরা আল্লাহকে তাদের তিন প্রভুর একজন মনে করে। যেমন-তারা ঈসা ও মারইয়াম আলাইহিমাস সালামকেও খোদা মনে করে থাকে।
* অগ্নি-পূজারিদের শিরক এই প্রকারের অন্তর্ভুক্ত। তারা ভালো কাজকে আলো ও খারাপ কাজকে অন্ধকারের সৃষ্টি মনে করে।
* কাদরিয়াদের শিরকও অগ্নি-উপাসকদের শিরকের অন্তর্ভুক্ত। তারা বলে, মানুষ নিজের ভালো-মন্দ নিজেই সৃষ্টি করে। এর পেছনে অন্য কারো হস্তক্ষেপ নেই।

এ প্রকারের আরেক মুশরিক হলো নমরুদ, ইবরাহীম আলাইহিস সালাম যার নিকট পবিত্র কুরআনের এ আয়াত নিয়ে গিয়েছিলেন-

إِذْ قَالَ إِبْرَاهِيمُ رَبِّيَ الَّذِي يُحْيِي وَيُمِيتُ قَالَ أَنَا أُحْيِي وَأُمِيتُ
'স্মরণ করুন ওই সময়ের কথা, যখন ইবরাহীম বলেছিল, আমার প্রতিপালক জীবন এবং মৃত্যু দান করেন। নমরুদ বলল, আমিও তাই করি।[১]

নমরুদ নিজেকে আল্লাহর সমকক্ষ ভেবেছিল। নিজের অহমিকায় এতটাই ডুবে ছিল যে, সে ভাবত, সেও আল্লাহর মতো জীবন এবং মৃত্যু দান করতে পারে।

ইবরাহীম আলাইহিস সালাম বললেন, 'আমার আল্লাহ আকাশের পূর্ব দিকে সূর্য ওঠান, এবং পশ্চিম দিকে সূর্য ডোবান।' এ কথা শুনে নমরুদ হতভম্ব হয়ে যায়। এ ধরনের মুশরিকদের জন্য ইবরাহীম আলাইহিস সালামের মুখে আল্লাহপ্রদত্ত এই উত্তর একটি তুলনারহিত চ্যালেঞ্জ।

তারকা, সূর্য এবং অগ্নি-পূজারিদের শিরকও এই ধরনের। তারা কিছু বিশেষ তারকা, অথবা বিশেষ সময়ের সূর্য অথবা অগ্নিকে পৃথিবীর ভালো-মন্দে আল্লাহর শরীক ভাবে। 'সায়েবিয়্যাহ' মতাদর্শীরাও এমন। তাদের শিরকের ধরন হলো, কেউ বলে, প্রকৃত উপাস্য কেবল আল্লাহই। তাদের বিশ্বাসেও শিরক আছে। আবার কেউ বলে, সকল উপাস্যদের মধ্যে আল্লাহই সবচেয়ে বড়। এটাও শিরক। কেউ বলে, অনেক অনেক উপাস্যের মধ্যে আল্লাহও একজন।

ইবাদাতের সময় সর্বান্তকরণে আল্লাহর অভিমুখী হতে হবে। তাহলে আল্লাহ বান্দার চাওয়া পূরণ করবেন। এমন ভিন্ন ভিন্ন অনেক মতামত প্রচলিত আছে। এ ধরনের সকল বিশ্বাস ও মত শিরকের অন্তর্ভুক্ত। কেউ কেউ আরও বলেন, প্রতি ছোট উপাস্যেরই অধঃস্তন এবং ঊর্ধ্বতন উপাস্য থাকে। বান্দা যখন প্রার্থনা করে, তখন একজন অপরজনের নিকট বান্দার প্রার্থনা পৌঁছে দেয়। এভাবেই তা আল্লাহর নিকট পৌঁছে। এটাও শিরক। আল্লাহ এবং বান্দার মাঝে কোনো মধ্যসূত্রের প্রয়োজন হয় না। আল্লাহ তাআলার বিধান হলো, বান্দা সরাসরি তাঁর কাছেই প্রার্থনা করতে পারবে।

টিকাঃ
[১] সূরা বাকারা, আয়াত-ক্রম: ২৫৮

📘 রূহের খোরাক > 📄 ইবাদাত এবং লেনদেনের ক্ষেত্রে শিরক

📄 ইবাদাত এবং লেনদেনের ক্ষেত্রে শিরক


ইতিপূর্বে বর্ণিত শিরকসমূহের তুলনায় ইবাদাত এবং লেনদেনের শিরকের পাপ কিছুটা লঘু। বিশেষত ইবাদাতের ক্ষেত্রে শিরকের শাস্তিও অনেক কম। কেননা, এটা এতটাই সুক্ষ্ম যে, কোনো নির্ভেজাল বিশ্বাসী মানুষও যেকোনো সময় মনের অজান্তেই এই শিরকে লিপ্ত হয়ে যেতে পারে। সে নিজেও টের পাবে না। ধরা যাক, এক ব্যক্তি আল্লাহ তাআলার উপর পূর্ণ বিশ্বাস স্থাপন করেছে। সে বিশ্বাস করে, সকল লাভ-ক্ষতির মালিক কেবল আল্লাহ। তিনি ব্যতীত ইবাদাতের উপযুক্ত আর কেউ নেই। তিনি সৃষ্টিকর্তা, তিনিই পালনকর্তা। কিন্তু কখনো কখনো বান্দার ভুল হয়। তার ইবাদাত, লেনদেন সব সময়ই একমাত্র আল্লাহর জন্য হয়ে ওঠে না। সে নিজেকে রক্ষা করতে আমল করে। পার্থিব কোনো প্রাপ্তি কিংবা মানুষের মাঝে যশখ্যাতির জন্যেও করে থাকতে পারে। এমতাবস্থায় তার আমল আল্লাহর জন্যই হয়; কিন্তু মস্তিষ্কে বসে থাকে শয়তান আর জাগতিক লোভ। পৃথিবীজুড়ে অধিকাংশ মানুষের ইবাদাতই এমন দোদুল্যমান। এটাও এক প্রকারের শিরক।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00