📄 সিরাতুল মুস্তাকীম
গুনাহগার বান্দার জন্য মহা বিপদ হলো, গুনাহের কারণে সে সিরাতুল মুস্তাকীম তথা আল্লাহ-নির্দেশিত সঠিক ও সরল পথ হারিয়ে ফেলে। সাজানো-গোছানো জীবন ঝড়ের তাণ্ডবের মতোই নিমিষে এলোমেলো ও লক্ষ্যহীন হয়ে যায়।
এজন্যই প্রত্যকের জন্য একান্ত আবশ্যক-সর্বদা আল্লাহ তাআলার নিকট সিরাতুল মুস্তাকীম তথা সরল-সঠিক ও হিদায়াতের পথের জন্য প্রার্থনা করা। এই প্রার্থনার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও উপকারী কোনো দুআ বান্দার জীবনে নেই।
হিদায়াতের পথে চলার জন্য মানবজীবনে নানাবিধ জ্ঞান ও যোগ্যতার প্রয়োজন হয়, জীবন চলার পথে সর্বদা সতর্কভাবে পা ফেলে সামনে এগোতে হয়। সাবধানে পথের কাঁটাগুলো উতরে যেতে হয়। পথের বাঁকে বাঁকে বান্দাকে ধোঁকা দেয়ার জন্য তাকে পার্থিব জীবন হাতছানি দিয়ে ডাকে। দুর্বল বান্দার জন্য এই পথে চলা তাই কষ্টসাধ্য। আল্লাহ তাআলার সাহায্য ছাড়া এই পথে চলা অসম্ভব।
বান্দার কর্ম, জ্ঞান ও সতর্কতার যে পরিমাণ থাকে, সে সিরাতুল মুস্তাকিম তথা সরল-সঠিক পথের দিশা ততটুকুই পায়। পুরোপুরিভাবে হিদায়াতের পথে চলার মতো যোগ্যতা বান্দার পক্ষে নিজ স্বভাব ও অভ্যাস দিয়ে অর্জন করা সম্ভব নয়। বান্দা যখনই তার স্বভাব-যোগ্যতার উপর নির্ভর করে এই পথে চলতে শুরু করে, তখনই পথ হারিয়ে ফেলে। এই পথে সঠিকভাবে পরিচালিত হতে আল্লাহ তাআলা বান্দার জন্য শরীয়ত প্রণয়ন করেছেন। পথের নিদর্শন ঠিক রেখেছেন আপন আদেশ ও নিষেধের দ্বারা। এতকিছুর পরও মানুষ এই পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে যায়। মূলত আল্লাহ তাআলা যাকে ইচ্ছা, এই পথে অবিচল থাকার তৌফিক দান করেন; আর যাকে ইচ্ছা, এই পথ থেকে বিচ্যুত করেন। ব্যক্তির যোগ্যতা, আমলের পরিমাণ ও অবস্থার ওপর বিবেচনা করে তিনি এই চ্যুতি ও অবিচলতার ফায়সালা করেন।
📄 ক্ষতি ও স্তর বিবেচনায় গুনাহের প্রকার
ক্ষতি ও স্তর বিবেচনায়ও গুনাহের বেশ কিছু প্রকার রয়েছে। প্রতি স্তরের গুনাহের জন্য ইহকালীন ও পরকালীন শান্তি ও জবাবদিহিতা ভিন্ন ভিন্ন হবে। আল্লাহ তাআলার রহমতে আমরা এই অধ্যায়ে গুনাহ সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত আকারে একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করব।
গুনাহ মূলত দুই প্রকার।
১. আল্লাহর আদেশ অমান্য করা।
২. আল্লাহর নিষিদ্ধ কাজে জড়িয়ে পড়া।
এই দুই প্রকারের গুনাহ পৃথিবী সৃষ্টির শুরুলগ্নের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। পৃথিবীর সবচে আদি গুনাহ। এ দুই গুনাহের মাধ্যমেই আল্লাহ তাআলা বিতাড়িত ইবলিস শয়তান এবং আদম আলাইহিস সালামকে পরীক্ষায় ফেলেছিলেন।
এ দুটি মৌলিক গুনাহ স্থান, কাল ও পাত্রের বিবেচনায় বিচিত্র রূপ ধারণ করে। প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ তাআলার হক নষ্ট করে বা মানুষের হক নষ্ট করে বান্দা যত রকমের গুনাহ করে, সবই উল্লিখিত দুই প্রকারের অন্তর্ভুক্ত।
📄 গুনাহের আরেকটি প্রকার
এই দুই প্রকারের গুনাহের ধরণ ও প্রকৃতি চার স্বভাবের গুনাহের মাধ্যমে প্রকাশ পেয়ে থাকে-
১. দাম্ভিক স্বভাবের গুনাহ
২. শয়তানি স্বভাবের গুনাহ
৩. হিংস্র স্বভাবের গুনাহ
৪. পাশবিক স্বভাবের গুনাহ
দাম্ভিক স্বভাব ও দম্ভ সংক্রান্ত গুনাহ হলো, আল্লাহ তাআলার সৃষ্টিকর্তা ও পালনকর্তার ক্ষমতাকে বান্দা তার নিজের উপযোগী ভাবা। নিজেকেও এসব ক্ষমতার যোগ্য মনে করা। প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ তাআলার ক্ষমতামূহের ন্যূনতম কোনো যোগ্যতাও বান্দাকে দেয়া হয়নি। যেমন আল্লাহ তাআলার মহত্ব, ক্ষমতা, আধিপত্য, প্রভুত্ব। এগুলো আল্লাহ তাআলার বিশেষ গুণ। এর কোনো কিছুই বান্দাকে দেয়া হয়নি। তবু বান্দা নিজেকে আল্লাহর ক্ষমতার অংশীদার ভেবে অন্যের ওপর জুলুম করে। আল্লাহর বান্দাদেরকে নিজের দাসে পরিণত করার চেষ্টা করে। সে মহান আল্লাহর গুণাবলিকে নিজের মধ্যে ধারণ করার অলীক কল্পনায় বিভোর হয়ে দাম্ভিক স্বভাবের গুনাহে লিপ্ত হয়ে যায়। এটা প্রকারান্তরে আল্লাহর সঙ্গে শিরক করা।
📄 শিরক দুই প্রকার
১. আল্লাহ তাআলার নাম ও ক্ষমতাসমূহের মধ্যে কাউকে শরীক করা। আল্লাহ ছাড়া অন্য কিছুকে উপাস্য হিসেবে গ্রহণ করা এবং এর ইবাদাত করা।
২. ব্যবহার ও আচরণগত কোনো বিষয়ে কাউকে আল্লাহর সঙ্গে শরীক করা।
দ্বিতীয় প্রকার শিরকের কারণে কখনো কখনো জাহান্নাম ওয়াজিব হয় না ঠিকই, কিন্তু শিরকযুক্ত ওই আমল বাতিল বলে বিবেচিত হয়।
প্রথম প্রকার শিরক সমস্ত গুনাহের মধ্যে সবচেয়ে কঠিন ও ভয়াবহতম গুনাহ। আল্লাহপাকের সৃষ্টিক্ষমতা ও মহাবিশ্ব পরিচালনার কাজে কোনো সৃষ্টির অন্তর্ভুক্তি প্রথম প্রকারের শিরক। এ গুনাহে জড়িত ব্যক্তি আল্লাহপাকের ক্ষমতা ও আয়ত্বের ভেতর দাঁড়িয়ে স্বয়ং আল্লাহর সঙ্গেই লড়াই করে। তার এই আচরণ সকল স্পর্ধার সীমা ছাড়িয়ে যায়। এই গুনাহে লিপ্ত ব্যক্তির কোনো নেক আমল কখনো আল্লাহর নিকট কবুল হবে না।