📘 রূহের খোরাক > 📄 সংশয় নিরসন

📄 সংশয় নিরসন


আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-
إِنَّ الْأَبْرَارَ لَفِي نَعِيمٍ - وَإِنَّ الْفُجَّارَ لَفِي جَحِيمٍ
'নিশ্চয় নেককার লোকেরা থাকবে অনন্ত নিয়ামতের মাঝে আর পাপিষ্ঠ ব্যক্তিরা থাকবে জাহান্নামের আগুনে।
এই আয়াতটিতে মুমিন ও নেককার লোকদের জন্য যেই সুসংবাদ দেয়া হয়েছে, আর গুনাহগার বান্দাদের জন্য যে দুসংবাদ বিবৃত হয়েছে, তা কেবল পরকালের জন্যই নয়; বরং মানুষ তার কর্মের সুফল ও দুর্ভোগ ইহকাল, কবর-জগত ও পরকাল-তিন জগতেই ভোগ করবে। মুমিন বান্দাদের অন্তর পার্থিব জীবনে সুস্থ ও নিরাপদ থাকবে, পবিত্র হৃদয়ের অধিকারী হবে তারা। অন্তরে মহান রবের পরিচয়জ্ঞান, মারিফাত ও একনিষ্ঠ ভালোবাসার স্নিগ্ধ বাতাস তার জীবনকে ছন্দময় বানিয়ে দেবে। পাপ-পঙ্কিলতা থেকে মুক্ত, আত্মার ব্যাধি থেকে সুস্থ ও নিরাপদ হৃদয়ের চেয়ে বড় কী পুরষ্কার থাকতে পারে ক্ষণস্থায়ী এ জীবনে! আল্লাহ তাআলা তার খলীল, একান্ত বন্ধু ইবরাহীম আলাইহিস সালামের পঙ্কিলতামুক্ত সুস্থ হৃদয়ের প্রশংসা করে ইরশাদ করেন-
وَإِنَّ مِنْ شِيعَتِهِ لَإِبْرَاهِيمَ - إِذْ جَاءَ رَبَّهُ بِقَلْبٍ سَلِيمٍ
'আর অবশ্যই (নূহের) দলের একজন হলো ইবরাহীম। যখন সে তার রবের দরবারে "কলবে সালীম" (অর্থাৎ পঙ্কিলতামুক্ত সুস্থ অন্তর) নিয়ে উপস্থিত হয়েছিল।[৩]
কলবে সালীমের প্রশংসায় অন্যত্র ইরশাদ হচ্ছে-
يَوْمَ لَا يَنْفَعُ مَالٌ وَلَا بَنُونَ - إِلَّا مَنْ أَتَى اللَّهَ بِقَلْبٍ سَلِيمٍ
'সেদিন সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি কোনো কাজে আসবে না। শুধুমাত্র ঐ ব্যক্তি ব্যতীত, যে আল্লাহ তাআলার নিকট "কলবে সালীম" নিয়ে উপস্থিত হতে পারবে।১৯
'কলবে সালীম' বা সুস্থ হৃদয় বলা হয় এমন অন্তরকে, যেই অন্তরে শিরক নেই। যেই অন্তর হিংসা, বিদ্বেষ, পরশ্রীকাতরতা, স্বার্থপরায়ণতা, কৃপণতা, অহংকার, দুনিয়ার লোভ-লালসা, ক্ষমতার মোহ- ইত্যাদি সকল পঙ্কিল অভ্যাস থেকে মুক্ত থাকবে, তাকেই 'কলবে সালীম' বা সুস্থ হৃদয় বলা হয়। যেসব কাজ ও স্বভাব বান্দাকে আল্লাহ তাআলা থেকে দূরে সরিয়ে আল্লাহভোলা করে দেয়, সেসব কাজ ও স্বভাব থেকে মুক্ত ও পবিত্র হৃদয়কেই বলা হয় 'কলবে সালীম'। এমন কলবের অধিকারী ব্যক্তি نশ্বর এই পৃথিবীতেও স্বর্গীয় জীবন যাপন করে এবং কবর-জগতেও জান্নাতের নিয়ামতে থাকবে। আর কিয়ামত-দিবসে সে অর্জন করবে চূড়ান্ত সফলতা।
'কলবে সালীম' বা নির্মল হৃদয়ের জন্য আবশ্যক যোগ্যতা
কলবে সালীম বা হৃদয়ের নির্মলতার জন্য পাঁচটি ব্যাধি থেকে হৃদয়কে সর্বদা মুক্ত রাখা আবশ্যক-
১. শিরক! শিরক আল্লাহ তাআলার একত্ববাদের বিশ্বাসে ফাটল তৈরি করে।
২. বিদআত। যা বান্দাকে সুন্নতের পথ থেকে বিচ্যুত করে।
৩. মনোবাসনা বা নফসের আনুগত্য। যা আল্লাহ তাআলার আদেশ পালন করা থেকে বান্দাকে দূরে সরিয়ে দেয়।
৪. অলসতা। যা আল্লাহ তাআলার স্মরণ থেকে বান্দাকে ফিরিয়ে রাখে।
৫. প্রবৃত্তির চাহিদা। এই বদঅভ্যাস বান্দার কাজের ইখলাস ও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের স্পৃহাকে নষ্ট করে দেয়।
এই পাঁচ স্বভাব আল্লাহ ও বান্দার মাঝে প্রতিবন্ধকতার পর্দা টেনে দেয়। উল্লিখিত প্রতিটি আত্মার ব্যাধি আরো অনেক রোগ ও বদভ্যাস মানবজীবনে ডেকে আনে।

টিকাঃ
[২] সূরা ইনফিতার, আয়াত-ক্রম: ১৩-১৪
[৩] সূরা সাফফাত, আয়াত-ক্রম: ৮৩-৮৪
[১] সূরা শুআরা, আয়াত-ক্রম: ৮৮-৮৯

📘 রূহের খোরাক > 📄 সিরাতুল মুস্তাকীম

📄 সিরাতুল মুস্তাকীম


গুনাহগার বান্দার জন্য মহা বিপদ হলো, গুনাহের কারণে সে সিরাতুল মুস্তাকীম তথা আল্লাহ-নির্দেশিত সঠিক ও সরল পথ হারিয়ে ফেলে। সাজানো-গোছানো জীবন ঝড়ের তাণ্ডবের মতোই নিমিষে এলোমেলো ও লক্ষ্যহীন হয়ে যায়।
এজন্যই প্রত্যকের জন্য একান্ত আবশ্যক-সর্বদা আল্লাহ তাআলার নিকট সিরাতুল মুস্তাকীম তথা সরল-সঠিক ও হিদায়াতের পথের জন্য প্রার্থনা করা। এই প্রার্থনার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও উপকারী কোনো দুআ বান্দার জীবনে নেই।
হিদায়াতের পথে চলার জন্য মানবজীবনে নানাবিধ জ্ঞান ও যোগ্যতার প্রয়োজন হয়, জীবন চলার পথে সর্বদা সতর্কভাবে পা ফেলে সামনে এগোতে হয়। সাবধানে পথের কাঁটাগুলো উতরে যেতে হয়। পথের বাঁকে বাঁকে বান্দাকে ধোঁকা দেয়ার জন্য তাকে পার্থিব জীবন হাতছানি দিয়ে ডাকে। দুর্বল বান্দার জন্য এই পথে চলা তাই কষ্টসাধ্য। আল্লাহ তাআলার সাহায্য ছাড়া এই পথে চলা অসম্ভব।
বান্দার কর্ম, জ্ঞান ও সতর্কতার যে পরিমাণ থাকে, সে সিরাতুল মুস্তাকিম তথা সরল-সঠিক পথের দিশা ততটুকুই পায়। পুরোপুরিভাবে হিদায়াতের পথে চলার মতো যোগ্যতা বান্দার পক্ষে নিজ স্বভাব ও অভ্যাস দিয়ে অর্জন করা সম্ভব নয়। বান্দা যখনই তার স্বভাব-যোগ্যতার উপর নির্ভর করে এই পথে চলতে শুরু করে, তখনই পথ হারিয়ে ফেলে। এই পথে সঠিকভাবে পরিচালিত হতে আল্লাহ তাআলা বান্দার জন্য শরীয়ত প্রণয়ন করেছেন। পথের নিদর্শন ঠিক রেখেছেন আপন আদেশ ও নিষেধের দ্বারা। এতকিছুর পরও মানুষ এই পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে যায়। মূলত আল্লাহ তাআলা যাকে ইচ্ছা, এই পথে অবিচল থাকার তৌফিক দান করেন; আর যাকে ইচ্ছা, এই পথ থেকে বিচ্যুত করেন। ব্যক্তির যোগ্যতা, আমলের পরিমাণ ও অবস্থার ওপর বিবেচনা করে তিনি এই চ্যুতি ও অবিচলতার ফায়সালা করেন।

📘 রূহের খোরাক > 📄 ক্ষতি ও স্তর বিবেচনায় গুনাহের প্রকার

📄 ক্ষতি ও স্তর বিবেচনায় গুনাহের প্রকার


ক্ষতি ও স্তর বিবেচনায়ও গুনাহের বেশ কিছু প্রকার রয়েছে। প্রতি স্তরের গুনাহের জন্য ইহকালীন ও পরকালীন শান্তি ও জবাবদিহিতা ভিন্ন ভিন্ন হবে। আল্লাহ তাআলার রহমতে আমরা এই অধ্যায়ে গুনাহ সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত আকারে একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করব।
গুনাহ মূলত দুই প্রকার।
১. আল্লাহর আদেশ অমান্য করা।
২. আল্লাহর নিষিদ্ধ কাজে জড়িয়ে পড়া।
এই দুই প্রকারের গুনাহ পৃথিবী সৃষ্টির শুরুলগ্নের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। পৃথিবীর সবচে আদি গুনাহ। এ দুই গুনাহের মাধ্যমেই আল্লাহ তাআলা বিতাড়িত ইবলিস শয়তান এবং আদম আলাইহিস সালামকে পরীক্ষায় ফেলেছিলেন।
এ দুটি মৌলিক গুনাহ স্থান, কাল ও পাত্রের বিবেচনায় বিচিত্র রূপ ধারণ করে। প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ তাআলার হক নষ্ট করে বা মানুষের হক নষ্ট করে বান্দা যত রকমের গুনাহ করে, সবই উল্লিখিত দুই প্রকারের অন্তর্ভুক্ত।

📘 রূহের খোরাক > 📄 গুনাহের আরেকটি প্রকার

📄 গুনাহের আরেকটি প্রকার


এই দুই প্রকারের গুনাহের ধরণ ও প্রকৃতি চার স্বভাবের গুনাহের মাধ্যমে প্রকাশ পেয়ে থাকে-
১. দাম্ভিক স্বভাবের গুনাহ
২. শয়তানি স্বভাবের গুনাহ
৩. হিংস্র স্বভাবের গুনাহ
৪. পাশবিক স্বভাবের গুনাহ
দাম্ভিক স্বভাব ও দম্ভ সংক্রান্ত গুনাহ হলো, আল্লাহ তাআলার সৃষ্টিকর্তা ও পালনকর্তার ক্ষমতাকে বান্দা তার নিজের উপযোগী ভাবা। নিজেকেও এসব ক্ষমতার যোগ্য মনে করা। প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ তাআলার ক্ষমতামূহের ন্যূনতম কোনো যোগ্যতাও বান্দাকে দেয়া হয়নি। যেমন আল্লাহ তাআলার মহত্ব, ক্ষমতা, আধিপত্য, প্রভুত্ব। এগুলো আল্লাহ তাআলার বিশেষ গুণ। এর কোনো কিছুই বান্দাকে দেয়া হয়নি। তবু বান্দা নিজেকে আল্লাহর ক্ষমতার অংশীদার ভেবে অন্যের ওপর জুলুম করে। আল্লাহর বান্দাদেরকে নিজের দাসে পরিণত করার চেষ্টা করে। সে মহান আল্লাহর গুণাবলিকে নিজের মধ্যে ধারণ করার অলীক কল্পনায় বিভোর হয়ে দাম্ভিক স্বভাবের গুনাহে লিপ্ত হয়ে যায়। এটা প্রকারান্তরে আল্লাহর সঙ্গে শিরক করা।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00