📄 মুমিন বান্দার জন্য আত্মার প্রশান্তি ও পার্থিব সুখ
আল্লাহ তাআলা এইজন্যই উত্তম ও আদর্শ জীবনের জন্য ঈমান ও নেক আমলের কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি ইরশাদ করেছেন-
مَنْ عَمِلَ صَالِحًا مِنْ ذَكَرٍ أَوْ أُنْثَى وَهُوَ مُؤْمِنٌ فَلَنُحْيِيَنَّهُ حَيَاةٌ طَيِّبَةً وَلَنَجْزِيَنَّهُمْ أَجْرَهُمْ بِأَحْسَنِ مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ
'যে নারী বা পুরুষ ঈমানের অবস্থায় নেক কাজ করবে, আমি অবশ্যই তাকে উত্তম জীবন দান করব। আর তারা যে আমল করেছে, তার থেকেও উত্তম প্রতিদান আমি তাদেরকে দান করব।''১।
এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা ঈমানদার ও নেককার বান্দাদের জন্য পার্থিব জীবনে উত্তম জীবনব্যবস্থা এবং পরকালে উত্তম প্রতিদানের ঘোষণা দিয়েছেন। আল্লাহ তাআলার আনুগত্যে তাদের জন্য উভয় জগতেই রয়েছে সুখময় নিশ্চিন্ত জীবন। অন্য আয়াতেও আল্লাহ তাআলা এমন সুসংবাদ দিচ্ছেন-
لِلَّذِينَ أَحْسَنُوا فِي هَذِهِ الدُّنْيَا حَسَنَةٌ وَلَدَارُ الْآخِرَةِ خَيْرٌ وَلَنِعْمَ دَارُ الْمُتَّقِينَ
যারা এই জগতে সৎকাজ করে, তাদের জন্য রয়েছে কল্যাণ; আর পরকালের জীবন তো তাদের জন্য আরো উত্তম। মুত্তাকী বান্দাদের জীবন কতই-না চমৎকার!'২
অন্য আরেক আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন-
وَأَنِ اسْتَغْفِرُوا رَبَّكُمْ ثُمَّ تُوبُوا إِلَيْهِ يُمَتِّعْكُمْ مَتَاعًا حَسَنًا إِلَى أَجَلٍ مُسَمًّى وَيُؤْتِ كُلَّ ذِي فَضْلٍ فَضْلَهُ
'আর তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করো। অতঃপর তারই নিকট তোমরা প্রত্যাবর্তন করো। তিনি তোমাদেরকে নির্ধারিত সময় পর্যন্ত এক উত্তম উপভোগ্য জীবন দান করবেন। আর প্রত্যেক অধিক আমলকারী ব্যক্তিকে তার প্রাপ্য মর্যাদা বুঝিয়ে দেবেন।''১।
এসব আয়াতের সারমর্ম হলো-নেক ও মুত্তাকী বান্দাগণ দুনিয়া ও আখিরাতের সফলতার চূড়ায় পৌঁছে যাবেন। উভয় জগতেই তাঁদের জন্য থাকবে উত্তম জীবনব্যবস্থা। মুমিন মুত্তাকী বান্দাদের জন্য রয়েছে আত্মার প্রশান্তি, হৃদয়ের সুখ ও উল্লাস, উপভোগ্য ও প্রশান্তিকর এক মন-মানসিকতা। সেই সাথে তাদের হৃদয় হবে প্রশস্ত, আলোকিত এবং সকল পঙ্কিলতা থেকে মুক্ত ও নির্মল। হারাম মনোবাসনা ত্যাগ করার মাঝেই প্রকৃত সুখ ও নিশ্চিন্ত শান্তি নিহিত। এই সুখানুভূতি যারা লাভ করে জীবন তাদের উচ্চমার্গীয় স্তরে পৌঁছে যায়। এক বুযুর্গ এমন জীবন পেয়ে বলেছিলেন, 'রাজ পরিবারের লোকজন যদি জানত আমরা কেমন স্বর্গীয় জীবন যাপন করছি, তাহলে তারা তরবারির লড়াই চালিয়ে হলেও সেই জীবন পেতে মরিয়া হয়ে উঠত।'
এমনই সৌভাগ্যবান আরেকজন বলেছেন, 'অবশ্যই দুনিয়াতে পরকালীন জান্নাতের মতো একটি জান্নাত আছে। যে ব্যক্তি দুনিয়ার এই জান্নাতে প্রবেশ করবে না, সে পরকালীন জান্নাতেও প্রবেশ করতে পারবে না।' নবীজি ইরশাদ করেছেন-
إِذَا مَرَرْتُمْ بِرِيَاضِ الْجَنَّةِ فَارْتَعُوا، قَالُوا: وَمَا رِيَاضُ الْجَنَّةِ؟ قَالَ: حِلَقُ الذِّكْرِ
'যখন তোমরা জান্নাতের বাগান অতিক্রম কর, তখন উৎফুল্ল চিত্তে সেদিকে এগিয়ে যাও।' সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞেস করলেন, 'জান্নাতের বাগান কী?' নবীজি বললেন, 'আল্লাহ তাআলার যিকিরের মজলিস।।২খ
অন্য হাদীসে পার্থিব জান্নাতের বাগান সম্পর্কে ইরশাদ হয়েছে-
مَا بَيْنَ بَيْتِي وَمِنْبَرِي رَوْضَةٌ مِنْ رِيَاضِ الْجَنَّةِ
'আমার ঘর আর আমার মসজিদের মিম্বারের মাঝের জায়গাটুকু হলো জান্নাতের একটি বাগান।[১]
টিকাঃ
[১] সূরা নাহল, আয়াত-ক্রম: ৯৭
[২] সূরা নাহল, আয়াত-ক্রম: ৩০
[১] সূরা হুদ, আয়াত-ক্রম: ৩
[২] মুসনাদু আহমাদ, হাদীস-ক্রম: ১২৫২৩। শুয়াইব আরনাউতের মতে হাদীসটির সনদ দুর্বল。
[১] অর্থাৎ, এইস্থানে সবসময় নবীজি ইলম এবং তাঁর সাহাবীগণ ইলম ও যিকিরের চর্চা করতেন। তাই এ স্থানকে জান্নাতের বাগান বলা হয়েছে।
📄 সংশয় নিরসন
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-
إِنَّ الْأَبْرَارَ لَفِي نَعِيمٍ - وَإِنَّ الْفُجَّارَ لَفِي جَحِيمٍ
'নিশ্চয় নেককার লোকেরা থাকবে অনন্ত নিয়ামতের মাঝে আর পাপিষ্ঠ ব্যক্তিরা থাকবে জাহান্নামের আগুনে।
এই আয়াতটিতে মুমিন ও নেককার লোকদের জন্য যেই সুসংবাদ দেয়া হয়েছে, আর গুনাহগার বান্দাদের জন্য যে দুসংবাদ বিবৃত হয়েছে, তা কেবল পরকালের জন্যই নয়; বরং মানুষ তার কর্মের সুফল ও দুর্ভোগ ইহকাল, কবর-জগত ও পরকাল-তিন জগতেই ভোগ করবে। মুমিন বান্দাদের অন্তর পার্থিব জীবনে সুস্থ ও নিরাপদ থাকবে, পবিত্র হৃদয়ের অধিকারী হবে তারা। অন্তরে মহান রবের পরিচয়জ্ঞান, মারিফাত ও একনিষ্ঠ ভালোবাসার স্নিগ্ধ বাতাস তার জীবনকে ছন্দময় বানিয়ে দেবে। পাপ-পঙ্কিলতা থেকে মুক্ত, আত্মার ব্যাধি থেকে সুস্থ ও নিরাপদ হৃদয়ের চেয়ে বড় কী পুরষ্কার থাকতে পারে ক্ষণস্থায়ী এ জীবনে! আল্লাহ তাআলা তার খলীল, একান্ত বন্ধু ইবরাহীম আলাইহিস সালামের পঙ্কিলতামুক্ত সুস্থ হৃদয়ের প্রশংসা করে ইরশাদ করেন-
وَإِنَّ مِنْ شِيعَتِهِ لَإِبْرَاهِيمَ - إِذْ جَاءَ رَبَّهُ بِقَلْبٍ سَلِيمٍ
'আর অবশ্যই (নূহের) দলের একজন হলো ইবরাহীম। যখন সে তার রবের দরবারে "কলবে সালীম" (অর্থাৎ পঙ্কিলতামুক্ত সুস্থ অন্তর) নিয়ে উপস্থিত হয়েছিল।[৩]
কলবে সালীমের প্রশংসায় অন্যত্র ইরশাদ হচ্ছে-
يَوْمَ لَا يَنْفَعُ مَالٌ وَلَا بَنُونَ - إِلَّا مَنْ أَتَى اللَّهَ بِقَلْبٍ سَلِيمٍ
'সেদিন সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি কোনো কাজে আসবে না। শুধুমাত্র ঐ ব্যক্তি ব্যতীত, যে আল্লাহ তাআলার নিকট "কলবে সালীম" নিয়ে উপস্থিত হতে পারবে।১৯
'কলবে সালীম' বা সুস্থ হৃদয় বলা হয় এমন অন্তরকে, যেই অন্তরে শিরক নেই। যেই অন্তর হিংসা, বিদ্বেষ, পরশ্রীকাতরতা, স্বার্থপরায়ণতা, কৃপণতা, অহংকার, দুনিয়ার লোভ-লালসা, ক্ষমতার মোহ- ইত্যাদি সকল পঙ্কিল অভ্যাস থেকে মুক্ত থাকবে, তাকেই 'কলবে সালীম' বা সুস্থ হৃদয় বলা হয়। যেসব কাজ ও স্বভাব বান্দাকে আল্লাহ তাআলা থেকে দূরে সরিয়ে আল্লাহভোলা করে দেয়, সেসব কাজ ও স্বভাব থেকে মুক্ত ও পবিত্র হৃদয়কেই বলা হয় 'কলবে সালীম'। এমন কলবের অধিকারী ব্যক্তি نশ্বর এই পৃথিবীতেও স্বর্গীয় জীবন যাপন করে এবং কবর-জগতেও জান্নাতের নিয়ামতে থাকবে। আর কিয়ামত-দিবসে সে অর্জন করবে চূড়ান্ত সফলতা।
'কলবে সালীম' বা নির্মল হৃদয়ের জন্য আবশ্যক যোগ্যতা
কলবে সালীম বা হৃদয়ের নির্মলতার জন্য পাঁচটি ব্যাধি থেকে হৃদয়কে সর্বদা মুক্ত রাখা আবশ্যক-
১. শিরক! শিরক আল্লাহ তাআলার একত্ববাদের বিশ্বাসে ফাটল তৈরি করে।
২. বিদআত। যা বান্দাকে সুন্নতের পথ থেকে বিচ্যুত করে।
৩. মনোবাসনা বা নফসের আনুগত্য। যা আল্লাহ তাআলার আদেশ পালন করা থেকে বান্দাকে দূরে সরিয়ে দেয়।
৪. অলসতা। যা আল্লাহ তাআলার স্মরণ থেকে বান্দাকে ফিরিয়ে রাখে।
৫. প্রবৃত্তির চাহিদা। এই বদঅভ্যাস বান্দার কাজের ইখলাস ও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের স্পৃহাকে নষ্ট করে দেয়।
এই পাঁচ স্বভাব আল্লাহ ও বান্দার মাঝে প্রতিবন্ধকতার পর্দা টেনে দেয়। উল্লিখিত প্রতিটি আত্মার ব্যাধি আরো অনেক রোগ ও বদভ্যাস মানবজীবনে ডেকে আনে।
টিকাঃ
[২] সূরা ইনফিতার, আয়াত-ক্রম: ১৩-১৪
[৩] সূরা সাফফাত, আয়াত-ক্রম: ৮৩-৮৪
[১] সূরা শুআরা, আয়াত-ক্রম: ৮৮-৮৯
📄 সিরাতুল মুস্তাকীম
গুনাহগার বান্দার জন্য মহা বিপদ হলো, গুনাহের কারণে সে সিরাতুল মুস্তাকীম তথা আল্লাহ-নির্দেশিত সঠিক ও সরল পথ হারিয়ে ফেলে। সাজানো-গোছানো জীবন ঝড়ের তাণ্ডবের মতোই নিমিষে এলোমেলো ও লক্ষ্যহীন হয়ে যায়।
এজন্যই প্রত্যকের জন্য একান্ত আবশ্যক-সর্বদা আল্লাহ তাআলার নিকট সিরাতুল মুস্তাকীম তথা সরল-সঠিক ও হিদায়াতের পথের জন্য প্রার্থনা করা। এই প্রার্থনার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও উপকারী কোনো দুআ বান্দার জীবনে নেই।
হিদায়াতের পথে চলার জন্য মানবজীবনে নানাবিধ জ্ঞান ও যোগ্যতার প্রয়োজন হয়, জীবন চলার পথে সর্বদা সতর্কভাবে পা ফেলে সামনে এগোতে হয়। সাবধানে পথের কাঁটাগুলো উতরে যেতে হয়। পথের বাঁকে বাঁকে বান্দাকে ধোঁকা দেয়ার জন্য তাকে পার্থিব জীবন হাতছানি দিয়ে ডাকে। দুর্বল বান্দার জন্য এই পথে চলা তাই কষ্টসাধ্য। আল্লাহ তাআলার সাহায্য ছাড়া এই পথে চলা অসম্ভব।
বান্দার কর্ম, জ্ঞান ও সতর্কতার যে পরিমাণ থাকে, সে সিরাতুল মুস্তাকিম তথা সরল-সঠিক পথের দিশা ততটুকুই পায়। পুরোপুরিভাবে হিদায়াতের পথে চলার মতো যোগ্যতা বান্দার পক্ষে নিজ স্বভাব ও অভ্যাস দিয়ে অর্জন করা সম্ভব নয়। বান্দা যখনই তার স্বভাব-যোগ্যতার উপর নির্ভর করে এই পথে চলতে শুরু করে, তখনই পথ হারিয়ে ফেলে। এই পথে সঠিকভাবে পরিচালিত হতে আল্লাহ তাআলা বান্দার জন্য শরীয়ত প্রণয়ন করেছেন। পথের নিদর্শন ঠিক রেখেছেন আপন আদেশ ও নিষেধের দ্বারা। এতকিছুর পরও মানুষ এই পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে যায়। মূলত আল্লাহ তাআলা যাকে ইচ্ছা, এই পথে অবিচল থাকার তৌফিক দান করেন; আর যাকে ইচ্ছা, এই পথ থেকে বিচ্যুত করেন। ব্যক্তির যোগ্যতা, আমলের পরিমাণ ও অবস্থার ওপর বিবেচনা করে তিনি এই চ্যুতি ও অবিচলতার ফায়সালা করেন।
📄 ক্ষতি ও স্তর বিবেচনায় গুনাহের প্রকার
ক্ষতি ও স্তর বিবেচনায়ও গুনাহের বেশ কিছু প্রকার রয়েছে। প্রতি স্তরের গুনাহের জন্য ইহকালীন ও পরকালীন শান্তি ও জবাবদিহিতা ভিন্ন ভিন্ন হবে। আল্লাহ তাআলার রহমতে আমরা এই অধ্যায়ে গুনাহ সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত আকারে একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করব।
গুনাহ মূলত দুই প্রকার।
১. আল্লাহর আদেশ অমান্য করা।
২. আল্লাহর নিষিদ্ধ কাজে জড়িয়ে পড়া।
এই দুই প্রকারের গুনাহ পৃথিবী সৃষ্টির শুরুলগ্নের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। পৃথিবীর সবচে আদি গুনাহ। এ দুই গুনাহের মাধ্যমেই আল্লাহ তাআলা বিতাড়িত ইবলিস শয়তান এবং আদম আলাইহিস সালামকে পরীক্ষায় ফেলেছিলেন।
এ দুটি মৌলিক গুনাহ স্থান, কাল ও পাত্রের বিবেচনায় বিচিত্র রূপ ধারণ করে। প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ তাআলার হক নষ্ট করে বা মানুষের হক নষ্ট করে বান্দা যত রকমের গুনাহ করে, সবই উল্লিখিত দুই প্রকারের অন্তর্ভুক্ত।