📄 অন্যায্যভাবে অন্যের সম্পদ আত্মসাৎ করার শাস্তি
অন্যায়ভাবে অন্যের সম্পদ জোরপূর্বক ছিনিয়ে নিলে বা চুরি করলে শরীয়ত অপরাধীর হাত কাটার দণ্ডবিধি আরোপ করেছে। চুরির অপরাধ করতে গিয়ে চোর কুকুর, বেড়াল বা সাপের মতো অন্যের ঘরে অনুমতি ব্যতীত, গোপনে, সিঁধ কেটে, দরজা-জানালা ভেঙে প্রবেশ করে। চোর যেহেতু অন্যের ঘরে চৌর্যবৃত্তি করার জন্য হাত ব্যবহার করে, হাতের দ্বারা অন্যের সম্পদ আত্মসাৎ করে, তাই তার হাতের উপর শাস্তি প্রয়োগ করা হয়।
অনুরূপ ডাকাতি করতে গিয়েও অপরাধীরা যেহেতু হাত ও পা ব্যবহার করে থাকে, তাই তাদের হাত ও পায়ের উপর ইসলামী দণ্ডবিধি প্রয়োগ করা হয়।
📄 সরাসরি কুদরতি শাস্তি
গুনাহগার বান্দা বা অপরাধীকে আল্লাহ তাআলা সরাসরি কুদরতী বা ঐশ্বরিক শাস্তি প্রদান করেন দুইভাবে।
১. গুনাহগার বান্দার অন্তরকে শাস্তি দেন।
২. গুনাহগার বান্দাকে দৈহিক ও আর্থিক শাস্তি দেন।
গুনাহগার বান্দাকে আল্লাহ তাআলা মানসিকভাবে দুঃখ-কষ্ট দিয়ে অথবা অন্তরের প্রফুল্লতা ও স্বাদ-আহ্লাদ নিশ্চিহ্ন করে দিয়ে অন্তরকে মৃত বানিয়ে দেন। এভাবে গুনাহগার বান্দার অন্তরে অসহনীয় শাস্তি আরোপ করেন। শারীরিক শাস্তির চেয়েও কঠিন হয়ে থাকে মানসিক শাস্তি। যেভাবে দৈহিক ব্যথা, যন্ত্রণা মানুষের মনকেও বিপর্যস্ত করে তোলে, সেভাবে মানসিক শান্তির প্রভাবও বান্দার শরীরকে অস্থির করে তোলে। অন্তরের উপর আরোপিত সাজা মানুষের দেহকেও জর্জরিত করে তোলে। এরপর মৃত্যুর পরের সময় যখন মানবদেহ থেকে রূহ বা আত্মা বের হয়ে যায়, তখন এই শাস্তি পুরোপুরিভাবে শরীরকে আচ্ছাদিত করে নেয়। এ সময় বান্দাকে কবরের আযাবের সম্মুখীন হতে হয়। বারযাখ জগতের আযাব গুনাহগার বান্দাকে আপন গুনাহের প্রতিদান বুঝিয়ে দিতে থাকে।
📄 গুনাহগার বান্দার শরীরে কুদরতী শাস্তির প্রভাব
গুনাহগার বান্দার শরীরে আল্লাহ তাআলার কুদরতী শাস্তি দুনিয়া ও আখিরাতের উভয় জগতেই প্রতিফলিত হয়। গুনাহ ও অপরাধের তীব্রতায় শাস্তির পরিমাণও কম-বেশি হয়ে থাকে এবং স্থায়ী ও সাময়িক হয়। দুনিয়া ও আখিরাতের সকল অকল্যাণ মূলত গুনাহ ও তার শাস্তিকে কেন্দ্র করেই। এই অকল্যাণের সূচনা হয় পঙ্কিল অন্তর আর খারাপ কাজের দ্বারা। পাপী মন ও মন্দ কাজ থেকে নবীজি আল্লাহ তাআলার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করে বলেন-
وَنَعُوذُ بِاللَّهِ مِنْ شُرُورِ أَنْفُسِنَا وَمِنْ سَيِّئَاتِ أَعْمَالِنَا
'আমরা আল্লাহ তাআলার নিকট অন্তরের পঙ্কিলতা ও মন্দ আমল থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করি।।১
আল্লাহ তাআলার নিকট নবীজি অন্তরের অনিষ্ট থেকে এবং কর্মের ক্ষতি থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করেছেন।
আর মানুষের কর্মের অনিষ্ট বা মন্দ কাজ মূলত অন্তরের পঙ্কিলতা বা অনিষ্ট থেকেই জন্ম নেয়। সুতরাং মানবাত্মা হলো সকল পাপ কাজের সূতিকাগার। আর মন্দ কাজের প্রতিদানও বান্দার জন্য মন্দ ও অমঙ্গল হয়ে থাকে।
ফিরিশতাগণ মুমিন বান্দাদের জন্য আল্লাহ তাআলার কাছে দুআ করেছেন-
وَقِهِمُ السَّيِّئَاتِ وَمَنْ تَقِ السَّيِّئَاتِ يَوْمَئِذٍ فَقَدْ رَحِمْتَهُ
'আর আপনি তাদেরকে রক্ষা করুন যাবতীয় অমঙ্গল থেকে। আর আপনি সেদিন যাকে যাবতীয় অকল্যাণ থেকে রক্ষা করবেন, তখন আপনি বাস্তবিক অর্থেই তার প্রতি করুণা করবেন।২
ফিরিশতাগণ মুমিন বান্দাদের জন্য যাবতীয় অমঙ্গল থেকে নিরাপত্তার দুআ করেছেন। এই দুআর মাঝে মন্দ আমল থেকে নিরাপত্তার জন্যেও আবেদন করা হয়েছে। আর বান্দাকে যখন মন্দ আমল থেকে নিরাপত্তা দেওয়া হবে তখন বান্দা মন্দ পরিণতি থেকেও রক্ষা পাবে।
আল্লাহ তাআলা বান্দাকে গুনাহ থেকে দুইভাবে রক্ষা করেন。
* গুনাহ ও অন্যায় কাজ থেকে দূরে সরিয়ে রাখেন。
* ক্ষমা করে দিয়ে মন্দ আমলের অশুভ পরিণতি ভোগ করা থেকে কিয়ামত-দিবসে রক্ষা করবেন。
গুনাহ ও অপরাধের শাস্তির প্রকারভেদের সারকথা হলো, মন্দ ও অসৎ কাজের পরিণতি বান্দাকে বিভিন্নভাবে ভোগ করতে হয়। কখনো শরীয়ত কর্তৃক নির্ধারিত দণ্ডে দণ্ডিত হওয়ার মাধ্যমে। আবার কখনো আল্লাহ তাআলার কুদরতি আযাব ও সাজা ভোগ করার মাধ্যমে। গুনাহের এই পরিণতি বান্দার শরীরে আর অন্তরে আরোপিত হয়। কিছু শাস্তি পাপিষ্ঠ ব্যক্তিকে পার্থিব জগতেই বুঝিয়ে দেয়া হয়। আর কিছু শাস্তি অপেক্ষা করে মৃত্যুর পর কবরে, বারযাখ জগতে। চূড়ান্ত শাস্তি ভোগ করতে তার জন্য পরকালের জগতে তৈরি করা হয়েছে জাহান্নাম। গুনাহের প্রতিদান হিসাবে বান্দাকে পৃথিবী ও পরকাল-সর্বত্রই, অথবা যেকোনো এক জগতে অবশ্যই সাজা ভোগ করতে হবে। কুরআন-হাদীসে এসব শাস্তির কথা বারবার উল্লেখ করে বান্দাকে সতর্ক করা হয়েছে। এরপরও যারা পাপকাজে মগ্ন হয়ে যায়, তারা পাপাচার থেকে ফিরে আসতে পারে না। যেন সে নেশাগ্রস্ত, ঘুমন্ত অথবা অজ্ঞ, মূর্খ কোনো ব্যক্তি। দুনিয়া ও আখিরাতের কোনো জ্ঞান তার নেই। অজ্ঞতা আর অবহেলার ঘুমে বিভোর হয়ে সে ভাবনাহীন কাটাচ্ছে।
কিন্তু মহা ক্ষমতাবান আল্লাহ তাআলার আযাবের যন্ত্রণায় তার ঘুম ভেঙে যাবে একদিন। সেদিন তার চৈতন্য ফিরে এলেও হাহাকার ও আফসোসের বেশি কিছু করার আর ক্ষমতা থাকবে না। আগুনে হাত লাগলে যেমন হাত পুড়ে যায়, আঘাতপ্রাপ্ত হলে পাত্র যেভাবে ভেঙে যায়, পানিতে ভারি জিনিস যেভাবে ডুবে যায় কিংবা মানবদেহে অসুখ বা বিষ যেভাবে প্রভাব বিস্তার করে ঠিক সেভাবেই গুনাহের কারণে বান্দার উপর নেমে আসে পার্থিব ও পরকালীন আযাব। আযাব কখনো তাৎক্ষণিকভাবেই পতিত হয়। কখনো সহ্যের সীমা অতিক্রম করে যায়। কখনো বান্দার জন্য সহনীয় পর্যায়ে থাকে। গুনাহের প্রতিফলন দেরিতে হলে অনেক সময় মানুষ ধোঁকাগ্রস্ত হয়। গুনাহের কোনো প্রতিক্রিয়া তার সরল চোখে দেখতে না পেলে সে এই গুনাহকে সহজ ও সাধারণ ভাবতে থাকে। অথচ গুনাহের প্রতিক্রিয়া ও পরিণতি অবশ্যম্ভাবী। অসুস্থের কারণ ও উপকরণসমূহ দেখা যাওয়ার পরও কখনো কখনো মানবদেহের রোগ দেরিতে প্রকাশ পায়। গুনাহের প্রতিফলও কখনো কখনো দেরিতে প্রকাশ করা হয়। গুনাহের প্রতিক্রিয়া প্রকাশ পাওয়ার আগেই যদি বান্দা তাওবা, অনুশোচনা ও ইস্তিগফারের মাধ্যমে মহান রবের করুণার ছায়াতলে আশ্রয় নেয় তাহলে সে গুনাহের ক্ষতি থেকে মুক্তি লাভ করে। অন্যথায় সে নীরবে, অজান্তে ধ্বংসের গিরিখাদের কিনারায় দাঁড়িয়ে থাকে। তার ধ্বংস আর নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়া তখন শুধুমাত্র সময়ের ব্যাপার হয়ে যায়।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে তাঁর কুদরত ও রহমত দ্বারা হিফাযত করুন। আমীন।
টিকাঃ
[১] তিরমিযী, হাদীস-ক্রম: ১১০৫
[২] সূরা মুমিন, আয়াত-ক্রম: ৯
📄 হৃদয়ে গুনাহের প্রভাব
আল্লাহ তাআলা তাঁর নাফরমানি বা অবাধ্যতার যে-সব শাস্তি নির্ধারণ করেছেন, এবং গুনাহের সাজা ও শাস্তির যে-সকল কারণ ও উপকরণ তিনি ও তাঁর রাসূল বর্ণনা করেছেন, কেউ যদি ঠান্ডা মাথায় সে-সব বিষয়ে চিন্তা করে, তাহলে গুনাহমুক্ত জীবন যাপন করা তার জন্য সহজ ও স্বভাবযোগ্যতায় পরিণত হবে। এখানে গুনাহের কিছু মানসিক ও আত্মিক শাস্তির কথা উল্লেখ করা হচ্ছে, বুদ্ধিমান ও সচেতন পাঠকের জন্য এগুলোই আশাকরি যথেষ্ট হবে, ইনশাআল্লাহ।
প্রথম প্রভাব: গুনাহের কারণে আল্লাহ তাআলা গুনাহগার ব্যক্তির অন্তরকে সিলগালা করে দেন। তার হৃদয়ে মোহর মেরে দেয়া হয়। হৃদয় তখন অনুভূতিহীন নির্বিকার হয়ে যায়। নির্জীব প্রাণহীন এ হৃদয়ে হিদায়াত ধারণ করার মতো কোনো যোগ্যতা আর থাকে না। একইসাথে তার অন্তরের শ্রবণশক্তিও নষ্ট করে দেয়। তার হৃদয়ের কান বধির হয়ে যায়। এবং তার অন্তর্চক্ষুর সামনে পর্দা ফেলে দেয়া হয়। সে তখন সামনের পথও আর দেখতে পায় না। এভাবে বদ্ধ হৃদয়, বধির শ্রবণশক্তি আর দৃষ্টিহীন অন্তর্ভুক্ষ নিয়ে সে উদ্ভ্রান্তের মতো জীবন যাপন করে। সে নিজের ব্যাপারেও আত্মবিস্মৃত হয়ে যায়। তার হৃদয়কে সংকীর্ণ করে দেয়া হয়, যেন সে দুই হাতে বুক চেপে ধরে দ্রুতবেগে আসমানের দিকে উঠছে। তার অন্তরকে হক ও সত্যের পথ থেকে বিচ্যুত করে দেয়া হয়। একের পর এক আত্মিক ব্যাধিতে তাকে রোগাক্রান্ত করে তোলে। সে ভগ্ন হৃদয় নিয়ে ধুঁকতে থাকে অসহায়ের মতো।
হুযাইফাহ ইবনুল ইয়ামান সূত্রে ইমাম মালিক বর্ণনা করেন, 'মানুষের অন্তর চার ধরনের।
১. দাগহীন পবিত্র অন্তর। এই অন্তরে নূর চমকাতে থাকে। মুমিন বান্দারা এমন অন্তরকে ধারণ করে থাকে।
২. গাফিল ও নির্বিকার অন্তর। এমন অন্তর কাফিরের হয়ে থাকে।
৩. অধঃপতিত, নীচু অন্তর। মুনাফিক এই অন্তরের মালিক হয়।
৪. ঈমান ও নিফাকের স্বভাব-মিশ্রিত অন্তর। যেই স্বভাব অন্তরে বেশি বদ্ধমূল থাকে, অন্তরকে সেই স্বভাবের বলেই অভিহিত করা হয়।
দ্বিতীয় প্রভাব: হৃদয়ে মোহর বসিয়ে দেয়ার কারণে গুনাহগার ব্যক্তির অন্তর আল্লাহ তাআলার অনুগত থাকতে অক্ষম হয়ে যায়। ইবাদাত ও আনুগত্যের পথে অন্তরায় সৃষ্টি করে।
তৃতীয় প্রভাব : অন্তরকে বধির বানিয়ে দেয়া হয়। হৃদয়ের কান পেতে সে হিদায়াতের কোনো বাণী শুনতে পারে না। হৃদয়কে বাকহীন, বোবা বানিয়ে দেয়া হয়। অন্তরের কথা সে মানব-ভাষায় প্রকাশ করতে অক্ষম হয়ে যায়। অন্তর্চক্ষুকে দৃষ্টিহীন করে দেয়া হয়। ফলে সে হৃদয়ের চোখ দিয়ে কিছু দেখতে পায় না। সে তখন হক ও সত্য কথায় কোনো উপকৃত হতে পারে না। একজন বধিরের নিকট যেমন মানব-আওয়াজ মূল্যহীন হয়ে যায়, তেমনি তার নিকট হিদায়াতের সকল কথা মূল্যহীন হয়ে পড়ে। একজন অন্ধ ব্যক্তির নিকট রঙ ও বর্ণ যেমন মূল্যহীন, বাকহীন, মূক বা বোবার নিকট মানুষের কথার যেমন কোনো মূল্য নেই, তার নিকটও শরীয়ত ও ধর্ম তেমনি মূল্যহীন হয়ে যায়। এদেরকে লক্ষ করেই ইরশাদ করা হয়েছে-
فَإِنَّهَا لَا تَعْمَى الْأَبْصَارُ وَلَكِنْ تَعْمَى الْقُلُوبُ الَّتِي فِي الصُّدُورِ
| 'বস্তুত চক্ষু অন্ধ হয় না। হৃদয়ে স্থিত অন্তর্দৃষ্টি অন্ধ হয়ে যায়।'
চতুর্থ প্রভাব: গুনাহের কারণে মানবাত্মায় ধ্বস নামে। যেভাবে কোনো স্থান বা জায়গা মাটিতে ধ্বসে পড়ে। ধ্বসিত হৃদয় তখন বান্দার অজান্তেই নীচু স্বভাব ও রুচিহীন হয়ে যায়। অন্তর রুচিহীন হয়ে যাওয়ায় বান্দা তখন নিকৃষ্ট স্বভাবের লোকদের সাথে ওঠাবসা করতে থাকে।
পঞ্চম প্রভাব: অধঃপতিত অন্তরের মন্দ চিন্তাভাবনার কারণে গুনাহগার বান্দা কল্যাণ ও নেকির কাজ থেকে দূরে সরে যায়। উত্তম ও কল্যাণমূলক কাজ, শালীন ও ভালো কথাবার্তা এবং মার্জিত চরিত্র থেকে সে বঞ্চিত থাকে। তার কথায় ও কাজে অশালীন চরিত্রের ছাপ থাকে।
একজন বুযুর্গ ব্যক্তি মানুষের অন্তর নিয়ে মন্তব্য করেছেন, 'মানুষের অন্তর ভবঘুরে স্বভাবের। কারো অন্তর আরশকে কেন্দ্র করে ঘুরপাক খায়, আর কারো অন্তর মন্দ স্বভাবকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়।'
ষষ্ঠ প্রভাব : অন্তরের চেহারা-চরিত্রকে নিকৃষ্ট বানিয়ে দেয়া। মানুষের আত্মা তার জীবনের প্রতিচ্ছবি। এই প্রতিচ্ছবি গুনাহের কারণে ম্লান হয়ে যায়। পাপের বিষাক্ত থাবায় এই প্রতিচ্ছবিকে ঘষামাজা করে কাদাকার চিত্র বানিয়ে বান্দার জীবনে সেঁটে দেয়া হয়। অন্তরে তখন পশু-চরিত্র জায়গা করে নেয়। বন্য পশুর স্বভাব, চরিত্র আর চালচলন তার জীবনে প্রতিফলিত হয়। গুনাহের মাত্রা হিসেবে কোনো পাপাচারীর অন্তর শুকরের মতো আর কারো অন্তর কুকুর, গাধা বা ইতরশ্রেণির প্রাণীর মতো করে দেয়া হয়। তার চাল-চলনে তখন সেই পশুর স্বভাব প্রকাশ পায়। আল্লাহ তাআলার ইরশাদ-
وَمَا مِنْ دَابَّةٍ فِي الْأَرْضِ وَلَا طَائِرٍ يَطِيرُ بِجَنَاحَيْهِ إِلَّا أُمَمٌ أَمْثَالُكُمْ
| 'আর পৃথিবীতে যত প্রাণী এবং ডানা ঝাপটিয়ে উড়ে-বেড়ানো পাখি রয়েছে, তার সবই তোমাদের মতো একেকটি শ্রেণি। ১১।
সুফিয়ান সাওরী এই আয়াতের ব্যাখায় বলেছেন, 'মানুষের কর্মের দ্বারাই তার সমশ্রেণির প্রাণীজগত নির্ধারিত হয়। এইজন্যই মানব-সমাজে কারো চরিত্র হয় হিংস্র পশুর ন্যায়। কারো অভ্যাস হয়ে থাকে কুকুর, শুকরের মতো। আবার কেউ বেশভূষায় ময়ূরের মতো সুসজ্জিত পোষাকে নিজেকে মেলে ধরে। কেউ নিজেকে সবজায়গায় প্রাধান্য দিয়ে থাকে, প্রাণীজগতে মোরগের মাঝে এই স্বভাব বিদ্যমান। কেউ নির্বোধ হয়ে থাকে, গাধার মধ্যে এই স্বভাব বিদ্যমান। কারো আন্তরিকতা থাকে পোষা-পায়রার মতো। এভাবে প্রাণীজগতের সকল পশুপাখির মধ্যেই কোনো না কোনো চরিত্রে মানুষের স্বভাব ও অভ্যাস বিদ্যমান থাকে।
আল্লাহ তাআলা নির্বোধ জাহান্নামী লোকদের কথা বলতে গিয়ে তাদেরকে নিকৃষ্ট উট, শুকর, কুকুর বা অবলা গবাদি পশুর সাথে তুলনা দিয়েছেন। গুনাহের মাত্রা বৃদ্ধি পেতে পেতে একসময় চারিত্রিক সাদৃশ্যতা চেহারাতেও ফুটে ওঠে। আল্লাহ তাআলার নৈকট্যপ্রাপ্ত অন্তর্দৃষ্টি-সম্পন্ন বান্দাদের চোখে পাপাচারীদের এসব আভ্যন্তরীণ চেহারা ধরা পড়ে।
সপ্তম প্রভাব: অন্তরের বিবেক-বুদ্ধিকে উল্টোপথে ছেড়ে দেওয়া হয়। চিন্তার মোড় ঘুরিয়ে দেয়া হয়। গুনাহগার বান্দা তখন হককে বাতিল মনে করে। আর বাতিলকে মনে করে হক। ভালো ও কল্যাণমূলক কাজকে সে খারাপ চোখে দেখে। আর মন্দ কাজকে ভালো মনে করে। এভাবে সমাজে সে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে আর নিজেকে সমাজের সংস্কারক ভাবতে থাকে। আল্লাহর পথে, ধর্মীয় অনুশাসন পালনে সে বাধা হয়ে দাঁড়ায় আর নিজেকে মনে করে আল্লাহর পথের সাহায্যকারী, ধর্মের প্রতি বিশেষ অনুরাগী। হিদায়াতের বিকল্পে ভ্রষ্টতা গ্রহণ করে নিজেকে ভাবে হিদায়াতের অনুসারী। কুপ্রবৃত্তির গোলামি করে নিজেকে আল্লাহ তাআলার অনুগত বান্দা ভেবে তৃপ্ত হয়। গুনাহের শাস্তি হিসেবেই তার উপর চিন্তার এই মহাভ্রান্তি ও অধঃপতনের লাঞ্ছনা চাপিয়ে দেয়া হয়।
অষ্টম প্রভাব :
মহান রবের ব্যাপারে তার অন্তর অন্ধ হয়ে যায়। তার অন্তরে গুনাহের অন্ধকার পর্দা টেনে দেয়া হয়। পর্দার কারণে তার মাঝে আর মহান রবের মাঝে এক দেয়াল সৃষ্টি হয়। পৃথিবীতে সে আপন রবের প্রকৃত পরিচয় আর পায় না। আর কিয়ামত-দিবসে সমগ্র সৃষ্টিজগত যখন মহান রবের করুণার ভিখারি হয়ে বসে থাকবে, তখনও তার মাঝে আর করুণাময় আল্লাহ তাআলার মাঝে পর্দা টানা থাকবে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন—
كَلَّا بَلْ رَانَ عَلَى قُلُوبِهِمْ مَا كَانُوا يَكْسِبُونَ كَلَّا إِنَّهُمْ عَنْ رَبِّهِمْ يَوْمَئِذٍ لَمَحْجُوبُونَ
'কখনোই নয়। কৃতকর্মের ফলে তাদের অন্তরে মরীচিকা পড়েছে। কখনোই নয়, সেদিন তারা তাদের রব থেকে পর্দার অন্তরালে থাকবে।[১]
সাধনার যেই পথ ও পরিক্রমা, গুনাহ আর নাফরমানি সেই পথকে বিনষ্ট করে দেয়। বান্দা তখন নিজের ভালো খুঁজে পায় না। আত্মশুদ্ধির পথ তার অজানা থেকে যায়। একইসাথে গুনাহ ও পাপাচার মহান রবের ঐশ্বরিক সম্পর্ক পানে ছুটে চলা মানবাত্মার গতিকে থামিয়ে থামিয়ে রাখে। তখন মানবাত্মা মহান রবের পরিচয় লাভ করতে ব্যর্থ হয়ে রবের সান্নিধ্য থেকে বঞ্চিত হয়। গুনাহের পর্দা তার জীবনের সকল সাফল্যকে আড়াল করে রাখে। সফলতা আর সম্মানের পরিবর্তে সে ব্যর্থতার গ্লানি নিয়ে ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যায়।
নবম প্রভাব :
গুনাহগার ব্যক্তির জীবন সংকীর্ণ হয়ে যায়। দুনিয়ায়, কবরে ও পরকালে সে এক সংকীর্ণ জীবনের অধিকারী হয়। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন—
وَمَنْ أَعْرَضَ عَنْ ذِكْرِي فَإِنَّ لَهُ مَعِيشَةً ضَنْكًا وَنَحْشُرُهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ أَعْمَى
'আর যে ব্যক্তি আমার স্মরণ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তার জন্য আমি রেখে দিয়েছি সংকীর্ণ এক জীবনব্যবস্থা। কিয়ামতের দিন আমি তাকে অন্ধ অবস্থায় পুনরুত্থিত করব।'
সংকীর্ণ জীবনের অর্থ হচ্ছে, গুনাহগার ব্যক্তির বারযাখ জগত অর্থাৎ কবরের জীবন সংকীর্ণ হবে। জীবনের এই সংকীর্ণতা শুধু কবরের জীবনেই নয়, পার্থিব ও পরকালীন জীবনেও সে সংকীর্ণতায় ভুগবে। গুনাহগার বান্দা যত বেশি আল্লাহর স্মরণ থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখবে সে ততই জীর্ণ-শীর্ণ জীবনে প্রবেশ করবে।
যদিও জাগতিক ভোগ-বিলাসের কারণে তাকে আয়েশি জিন্দেগির অধিকারী বলে মনে হতে পারে, কিন্তু পার্থিব শত বিলাসিতার মাঝে ডুবে থাকলেও হৃদয়-জগতে সে নীরবে একাকিত্বের যন্ত্রণায় দগ্ধ হতে থাকে। মানসিক হাহাকার, হতাশা ও জীবনের প্রতি শত অভিযোগ তাকে কুড়েকুড়ে দংশন করতে থাকে।
অলীক কিছু আশা আর কল্পনায় বিভোর থাকলেও অব্যক্ত যন্ত্রণা তার হৃদয়ে রক্তক্ষরণ ঘটায়। পার্থিব ভালোবাসা, নেতৃত্বের মোহ, জৈবিক মনোবাসনার তীব্র লালসা তার যন্ত্রণার কথা মুখ ফুটে ব্যক্ত করতে বাধা দেয়। শরাবের নেশার চেয়েও ভয়ংকর থাকে জাগতিক এই মোহ। মৃত্যু-যন্ত্রণা আসার আগ অবধি পার্থিব বিত্ত-বৈভব ও ক্ষমতার মোহে আচ্ছন্ন ব্যক্তির চৈতন্য ফিরে আসে না।
এভাবে পার্থিব জীবনও তার জীর্ণ-শীর্ণ হয়ে যায়, হিদায়াত ও তাওবার রাস্তা সে হারিয়ে ফেলে। তার জীবন কখনো স্থিতিশীল হয় না, অস্থির চিত্ত নিয়ে সে চূড়ান্ত ভোগ-বিলাসে মত্ত থাকে, কিন্তু অদৃশ্যের এক তাড়া লেগে থাকে তার জীবনে।
সর্বত্রই তার ব্যস্ততা, দু দণ্ড বিশ্রামের মতো অবকাশ যেন তার নেই। সে জানে না, আল্লাহ তাআলার আনুগত্য ও ইবাদাত ব্যতীত হৃদয় কখনো প্রশান্ত হয় না। মহান রবের স্মরণেই আত্মার সুখ, চিত্তের স্থিরতা। আল্লাহ তাআলার ইবাদাতে যার চক্ষু শীতল হয়, জগতের সকল ঝড়-ঝামেলাতেও তার চোখ ও হৃদয় শীতল থাকে। সে উত্তপ্ত হয় না।
টিকা:
[১] সূরা আনআম, আয়াত-ক্রম: ৩৮
[১] সূরা মুতাফফিফীন, আয়াত-ক্রম: ১৪-১৫
[১] সূরা তহা, আয়াত-ক্রম: ১২৪