📄 গুনাহ মানুষের জন্য ধ্বংস ডেকে আনে
গুনাহ মানুষের জন্য দুনিয়া ও আখিরাতের ধ্বংসের উপকরণ একত্রিত করে দেয়। কেননা, গুনাহ হলো মানুষের আত্মার ব্যাধি। শারীরিক রোগব্যাধি যেমন মানুষকে ধ্বংস করে দেয়, তেমনি আত্মার ব্যাধিও মানুষকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে দেয়। শারীরিক শক্তি ও ভারসাম্য ধরে রাখার মতো খাদ্যগ্রহণ এবং শরীরকে নষ্ট করে দেয়ার মতো খাবার গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকার মাধ্যমে মানুষ যেমন শারীরিকভাবে সুস্থ থাকে, তেমনি আত্মার পক্ষে ক্ষতিকর অভ্যাস ও মানসিকতা থেকে বিরত থাকার মাধ্যমে এবং আত্মার উন্নতি সাধনকারী চরিত্রের দ্বারা মানুষ তার আত্মার ব্যাধি থেকেও মুক্ত ও সুস্থ থাকতে পারে।
মানুষের সুস্থ থাকার জন্য তিনটি উপকরণ একান্ত প্রয়োজন-
১. সুস্থতা ও দৈহিক শক্তিমত্তা ধরে রাখার মতো খাদ্যগ্রহণ
২. ক্ষতিকর খাদ্য ও উপকরণ থেকে শরীরকে মুক্ত রাখা
৩. যেসকল খাদ্য গ্রহণ করলে শরীর অসুস্থ হয়ে যায় তা থেকে বেঁচে থাকা।
এমনিভাবে মানুষের আত্মিক সুস্থতার জন্যও তিনটি উপকরণ একান্ত আবশ্যক।
১. ঈমান ও নেক আমল
২. তাওবাহ
৩. তাকওয়া; অর্থাৎ গুনাহ থেকে বিরত থাকা
রোগ-প্রতিরোধক খাদ্যের অনুপস্থিতিতে মানবদেহে যেভাবে বিভিন্ন রোগ ও অসুখ বাসা বাঁধে, তেমনি ইবাদাত ও আনুগত্যের অনুপস্থিতিতে বান্দার অন্তরে বিভিন্ন ধরনের পাপের আকাঙ্ক্ষা জায়গা করে নেয়। নাফরমান বান্দা আত্মার ব্যাধিতে অসুস্থ হয়ে পড়ে। মানুষের অন্তর সুস্থভাবে বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজন ঈমান ও নেক আমল; যা তার অন্তরকে সুরক্ষিত করে, আত্মিক ব্যাধি থেকে সুস্থ ও সতেজ রাখে।
📄 গুনাহগার বান্দাকে আইনানুগ শাস্তিপ্রদানের রহস্য
গুনাহের উল্লিখিত করুণ পরিণতিতেও যদি কোনো গুনাহগার বান্দা সতর্ক না হয়, কোনো পাপিষ্ঠ ব্যক্তি যদি তার পাপাচার থেকে ফিরে না আসে, তবে তাদের জন্য রয়েছে জাগতিক আইন। শরয়ী আইনানুযায়ী গুনাহগার ব্যক্তিকে পার্থিব শাস্তি প্রয়োগ করা হবে। আর পরকালের জীবনে তো তার জন্য অপেক্ষা করছে অনন্তকালের আযাব। সামান্য তিন দিরহাম মূল্যের সম্পদ চুরির দায়ে অভিযোগ প্রমাণিত ব্যক্তির হাত কাটার আইন রয়েছে কুরআনুল কারীমে। নিষ্পাপ, নিরপরাধ ব্যক্তিদের কাছ থেকে ডাকাতি করে সম্পদ ছিনিয়ে নেওয়ার অপরাধের শাস্তি, হাত ও পা কর্তন। সতী-সাধ্বী নারীকে অপবাদ আরোপ করলে কিংবা মদ পান করলে প্রকাশ্যে বেত্রাঘাত ও চাবুকের প্রহারকে শাস্তির বিধান হিসেবে প্রণয়ন করা হয়েছে। বিবাহ-বন্ধনে আবদ্ধ থাকাবস্থায় পরকীয়া বা ব্যভিচারে লিপ্ত হলে রজম বা পাথর নিক্ষেপে হত্যার বিধান রয়েছে। এ সবই করা হয়েছে মানুষকে গুনাহ থেকে ফিরিয়ে রাখার জন্য। শিরশ্ছেদকে প্রণয়ন করা হয়েছে রক্ত-সম্পর্কিত আত্মীয়ের সাথে ব্যভিচার বা ইচ্ছাকৃতভাবে নামায ছেড়ে দেওয়ার শাস্তি হিসেবে। সমকামিতা, পশুকামিতার শাস্তি রাখা হয়েছে প্রাণদণ্ড। এভাবেই আল্লাহ তাআলা বান্দাকে গুনাহ থেকে ফিরিয়ে রাখার জন্য প্রতিটি গুনাহ ও অপরাধের শাস্তি নির্ধারণ করেছেন, পূর্ণ ইনসাফের সাথে। ইসলামী দণ্ডবিধির পরিমিতিবোধ যুগে যুগে সকল আইন ও দণ্ডনীতির ঊর্ধ্বে প্রমাণিত হয়েছে। শরয়ী দণ্ডমালার ভারসাম্যের জাগতিক সকল আইন ভুল প্রমাণিত হয়।
অপরাধের তীব্রতায় শাস্তির মাত্রাও আল্লাহ তাআলা বাড়িয়ে দিয়েছেন। আর মানুষের স্বভাবে ও মানসিকতায় যেসকল অপরাধ-প্রবণতা দেখা যায়, তা প্রতিহত করতে আল্লাহ তাআলা বিভিন্ন প্রকারের শাস্তি আরোপ করেছেন। মানুষের স্বভাব ও মানসিকতার স্বাভাবিক রুচিবোধই যেসকল অপরাধ থেকে স্বেচ্ছায় বিরত থাকে, আল্লাহ তাআলা সেখানে শাস্তির বিধান রাখেননি। বান্দাকে নিরুৎসাহিত করেছেন, অপরাধটিকে হারাম ও নাজায়েয বলে জানিয়ে দিয়েছেন। অপরাধের পিঠে জাগতিক কোনো শাস্তির বিধান প্রয়োগ করেননি। যেমন-পশুর মলমূত্র সেবন, রক্তপান, মৃতপ্রাণী খাওয়া ইত্যাদি।
আর যেসকল অপরাধের জন্য মানুষের মন উৎসাহিত হয়ে ওঠে, সেসকল অপরাধের ক্ষতির মাত্রা অনুযায়ী আল্লাহ তাআলা জাগতিক শাস্তির বিধান রেখেছেন। যৌনচাহিদার ক্ষেত্রে বান্দার মনের আকাঙ্ক্ষা তীব্র থাকায় এই জৈবিক চাহিদা পূরণের অবাধ ও ক্ষতিকর রাস্তা বন্ধ করার জন্য আল্লাহ তাআলা যৌনক্ষমতার অপব্যবহারের শাস্তির মাত্রাও বাড়িয়ে দিয়েছেন। পাথর নিক্ষেপ করে হত্যা করার মতো কঠোর শাস্তির বিধান প্রণয়ন করেছেন। যৌন-অপরাধ দমনের সর্বনিম্ন শাস্তি হিসেবে বেত্রাঘাত ও প্রহারকে প্রণীত করেছেন, যেন সকলে এ ব্যাপারে সচেতন ও সতর্ক থাকে। চৌর্যবৃত্তির অপরাধ ও এর ক্ষতির প্রভাব বিবেচনায় চোরের জন্য হাত কাটার বিধান প্রণয়ন করে দিয়েছেন, যেন মানুষ অন্যের সম্পদ চুরি করা থেকে বিরত থাকে, সমাজের ভারসাম্যতা ও নিরাপত্তা নির্বিঘ্ন থাকে। ডাকাত ও ছিনতাইয়ের মতো গর্হিত অপরাধের শাস্তি হিসেবে হাত ও পা কেটে দেওয়ার শাস্তি প্রণীত হয়েছে।
বান্দা যেই অঙ্গ দিয়ে গুনাহের কাজে লিপ্ত হয়, ইসলামী শরীয়াহ সাধারণত সেই অঙ্গের উপরই শাস্তি প্রয়োগের বিধান রেখেছে। যেমন চুরি-ডাকাতির অপরাধ। তবে ব্যভিচারীর শাস্তি তার গোপনাঙ্গে প্রয়োগ না করে বেত্রাঘাতের দ্বারা শরীরে প্রয়োগের কারণ হলো—
১. গোপনাঙ্গ কেটে ফেলার দ্বারা বান্দাকে তার অপরাধের মাত্রার চেয়েও বেশি শাস্তি প্রয়োগ করা হয়।
২. হাত ও পা কেটে দেয়ার মাধ্যমে অন্যদেরকে সতর্ক করা যায়। অন্যরা চুরি ও ছিনতাই থেকে বিরত থাকার শিক্ষা লাভ করে। কিন্তু মানুষের গোপনাঙ্গ শরীরের আবৃত অঙ্গ হওয়ায় শাস্তি প্রয়োগের উদ্দেশ্য অর্জিত হয় না। তাই প্রকাশ্যে তাকে বেত্রাঘাতের মাধ্যমে ভর্ৎসনা ও লাঞ্ছিত করার বিধান আরোপ করা হয়েছে।
৩. মানুষের এক হাত কেটে দিলেও অনেকাংশে অন্য হাত দিয়ে তার প্রয়োজন পূরণ হয়ে যায়। এই দৃষ্টিকোণ থেকেও ব্যভিচারের শাস্তিটি ভিন্নভাবে প্রয়োগ করা হয়।
৪. ব্যভিচারের স্বাদ ও রসনেন্দ্রিয় যেহেতু সমগ্র শরীর জুড়েই বিস্তৃত তাই এর শাস্তিও ব্যভিচারীর সারা দেহে প্রয়োগ করা হয়।
মোটকথা, ইসলামী আইন পরিপূর্ণ ভারসাম্য বজায় রেখে মানুষ ও সমাজের সামগ্রিক কল্যাণের জন্য প্রণয়ন করা হয়েছে।
📄 পাপাচারের সাজা ও দণ্ডবিধির প্রকার
পাপাচারী ব্যক্তিকে দুইভাবে শাস্তি দেওয়া হয়—
শরীয়তকর্তৃক নির্ধারিত দণ্ডবিধির মাধ্যমে জাগতিক শাস্তি।
অথবা আল্লাহ তাআলা সরাসরি নিজ কুদরতে তাকে তার অপরাধের শাস্তি প্রদান করেন।
গুনাহগার ব্যক্তিকে যখন শরীয়তকর্তৃক নির্ধারিত শাস্তির মাধ্যমে দণ্ডিত করা হয়, তখন সাধারণত আল্লাহ তাআলার শাস্তি বা আযাবকে তার জন্য রহিত করা হয় অথবা লঘু করে দেয়া হয়। যদি বান্দার অপরাধের শাস্তির মাত্রা অনুযায়ী সে তার প্রাপ্য সাজা ভোগ করে ফেলে, তাহলে আল্লাহ তাআলা তাকে পুনরায় শাস্তির সম্মুখীন করবেন না। আর শরয়ী দণ্ডবিধি যদি তার জন্য যথেষ্ট না হয়, বান্দার আত্মার ব্যাধি যদি দণ্ডগ্রস্ত হওয়ার পরও তার মাঝে বিদ্যমান থাকে, তাহলে তার উপর আল্লাহ তাআলার আযাব ও শাস্তি নেমে আসে। বান্দার অনেক গুনাহ এমন আছে, যেখানে আল্লাহ তাআলা কোনো জাগতিক দণ্ডকে শরয়ী শাস্তি হিসেবে নির্ধারণ করেননি; সেসকল ক্ষেত্রে আল্লাহ তাআলা বান্দাকে নিজ কুদরতি আযাব দিয়ে পাকড়াও করেন। এই আযাব প্রদান কখনো শরয়ী শাস্তির তুলনায় কম হয়, আবার কখনো বেশি ও তীব্র হয়ে যায়। শরীয়ত কর্তৃক নির্ধারিত শাস্তির প্রয়োগক্ষেত্র নির্দিষ্ট ও সীমিত। আর আল্লাহ তাআলা সাধারণভাবে গুনাহের কারণে বান্দাকে যেই শাস্তি দিয়ে থাকেন, তার প্রয়োগক্ষেত্র ব্যাপক ও বিস্তৃত হয়ে থাকে। কেননা আল্লাহ তাআলার অবাধ্যতা যদি গোপনে করা হয় তখন শুধুমাত্র গুনাহগার ব্যক্তি একাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়, আর যখন আল্লাহর নাফরমানি প্রকাশ্যে করা হয় তখন সমাজের সবাই এর দ্বারা প্রভাবিত ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মানুষের চোখের সামনে যদি কোনো খারাপ কাজ হয়, আর সবাই যদি সম্মিলিতভাবে সেই কাজে বাধা না দেয়, বরং এতে আরও অংশগ্রহণ করে, তাহলে আল্লাহ তাআলা খুব দ্রুতই তাদেরকে আযাবগ্রস্ত করেন।
আল্লাহ তাআলা বান্দার গুনাহ ও অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী শরয়ী দণ্ডবিধি প্রণয়ন করেছেন। এই দণ্ডবিধির প্রয়োগক্ষেত্র তিনভাবে হয়ে থাকে。
* হত্যা
* অঙ্গহানি
* বেত্রাঘাত
প্রাণদণ্ডে দণ্ডিত করার মতো অপরাধ হলো কুফর বা আল্লাহ তাআলাকে অস্বীকার করা, ব্যভিচার ও সমকামিতায় লিপ্ত হওয়া। এ ধরনের অপরাধ মানুষের ধর্মীয় মূল্যবোধ, বংশধারা ও সামাজিক ভারসাম্য নষ্ট করে।
📄 শাস্তি বিবেচনায় গুনাহের প্রকার
শাস্তির বিবেচনায় বান্দার গুনাহ বা অপরাধ তিন প্রকার-
১. এমন অপরাধ বা গুনাহ, যার শাস্তি হিসাবে বান্দার ওপর হদ বা শারীরিক দণ্ড প্রয়োগ করা হয়। এই অপরাধের জন্য অপরাধীকে প্রহার, অঙ্গহানি বা প্রাণদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়। যেমন, মদপান, ব্যভিচার, পরকীয়া, চুরি, ডাকাতি, অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা করা ইত্যাদি।
২. এমন গুনাহ বা অপরাধ, যার প্রায়শ্চিত্তে বান্দাকে মাশুল গুনতে হয়। কাফফারা আদায়ের মাধ্যমে সে গুনাহ বা অপরাধের মার্জনা প্রার্থনা করতে হয়। যেমন, রামাদানের দিনে স্ত্রীর সাথে ইচ্ছাকৃত সহবাস কিংবা ইচ্ছাকৃত পানাহার করা।
৩. এমন অপরাধ ও গুনাহ, যার জন্য বান্দার উপর কোনো দণ্ডবিধি আরোপিত হয় না, কাফফারাও আদায় করার প্রয়োজন হয় না। এই তালিকায় আছে রক্তপান করা, গালমন্দ করা, অশ্লীল দৃষ্টি দেওয়া।