📄 গুনাহ বান্দা ও ফেরিশতাদের মাঝে দূরত্ব সৃষ্টি করে
গুনাহগার ব্যক্তি তার রক্ষাকারী ফিরিশতার তরফ থেকে কোনো প্রকারের সাহায্যপ্রাপ্ত হয় না। কারণ গুনাহের অন্যতম শাস্তি হলো, আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে বান্দার জন্য নিযুক্ত ফিরিশতা গুনাহের কারণে ওই বান্দা থেকে দূরে সরে যান। আর ফিরিশতার দূরে সরে যাওয়ার সুযোগে বান্দার নিকটে চলে আসে জগতের সবচেয়ে ক্ষতিকর ও নিকৃষ্ট জীব শয়তান।
মানুষ যদি সামান্য মিথ্যারও আশ্রয় নেয়, তাহলে তার সঙ্গে নিযুক্ত ফিরিশতা তার থেকে বহুদূরে সরে যান।
হাদীসে বর্ণিত হয়েছে-
إِذَا كَذَبَ الْعَبْدُ تَبَاعَدَ مِنْهُ الْمَلَكُ مِيْلاً مِّنْ نَّتَنِ رِيْحِهِ
'বান্দা যখন মিথ্যা বলে, তখন ফিরিশতারা সেই মিথ্যার কারণে সৃষ্ট মুখের দুর্গন্ধের কারণে দূরে চলে যান।।১৯
এক মিথ্যার কারণেই যদি আল্লাহ তাআলার পবিত্র সৃষ্টি ফিরিশতারা মানুষ থেকে এত দূরে সরে যান, তাহলে যে ব্যক্তি অবাধ্যতার জীবনে মিথ্যার চেয়েও আরো জঘন্য অপরাধে ব্যস্ত রয়েছে, তার জীবন থেকে ফিরিশতারা কী পরিমাণ দূরে থাকেন, চিন্তা করুন। নিশ্চয় শয়তান তখন তার জীবনের প্রতিটি পদে পদে, প্রতিটি শ্বাসে প্রশ্বাসে তার সঙ্গী হয়ে যায়। এক বুযুর্গ বলেছেন, 'বান্দা যখন কোনো কোনো পাপকাজে লিপ্ত হয় তখন জমিন আল্লাহ তাআলার দরবারে চিৎকার করে ফরিয়াদ করতে থাকে। ফিরিশতা তার কাছ থেকে দ্রুত সরে আল্লাহর দরবারে চলে যান এবং পাপিষ্ঠ ব্যক্তির নামে অভিযোগ দায়ের করেন।'
আরেকজন বুযুর্গ বলেন, 'প্রতিদিন সকালে বান্দার নিকট একজন ফিরিশতা ও শয়তান এগিয়ে আসতে থাকে। বান্দা যদি আল্লাহ তাআলার নাম উচ্চারণ করে, আল্লাহ তাআলার প্রশংসা করে এবং একত্ববাদের ঘোষণা দেয়, তাহলে ফিরিশতা শয়তানকে ভাগিয়ে দেন এবং বান্দার সারাদিনের দায়িত্ব নিজ কাঁধে তুলে নেন। আর যদি বান্দা আল্লাহ তাআলার নাম দিয়ে তার দিন শুরু না করে, দুনিয়ার কাজে ব্যস্ত হয়ে যায়, তাহলে ফিরিশতা চলে যান আর শয়তান তার সারাদিনের দায়িত্ব গ্রহণ করে।' বান্দা যখন গুনাহমুক্ত আনুগত্যময় জীবন যাপন করে, তখন ফিরিশতা তার সাথে সর্বদা লেগে থাকেন। ফিরিশতার সার্বক্ষণিক তত্ত্বাবধানে সে সমাজে অনুসরণীয় ব্যক্তিত্বে পরিণত হয়। সমাজের সর্বত্র তার প্রভাব বিস্তৃতি লাভ করে। তার গোটা জীবনের দায়ভার ফিরিশতারা গ্রহণ করে নেন। এমনকি তার মৃত্যুর সময়েও ফিরিশতারা তার সাথেই থাকেন। পুরুত্থানের দিনও সে ফিরিশতাদের সাহায্যপ্রাপ্ত হবে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-
إِنَّ الَّذِيْنَ قَالُوا رَبُّنَا اللَّهُ ثُمَّ اسْتَقَامُوا تَتَنَزَّلُ عَلَيْهِمُ الْمَلَائِكَةُ
أَلَّا تَخَافُوا وَلَا تَحْزَنُوا وَأَبْشِرُوا بِالْجَنَّةِ الَّتِي كُنْتُمْ تُوعَدُونَ - نَحْنُ أَوْلِيَاؤُكُمْ فِي الْحَيَوَةِ الدُّنْيَا وَفِي الْآخِرَةِ
'নিশ্চয় যারা ঈমান এনেছে এবং স্বীকারোক্তি দিয়েছে যে, আল্লাহ আমাদের পালনকর্তা, এরপর এই কথার উপর অবিচল থেকেছে, তাদের কাছে ফিরিশতারা এসে বলবেন, "তোমাদের কোনো ভয় নেই, কোনো দুঃখ নেই। আর তোমরা তোমাদের প্রতিশ্রুত জান্নাতের সুসংবাদ গ্রহণ করো। দুনিয়া ও আখিরাতে আমরা তোমাদের বন্ধু." [১]
আর যখন জগতের সবচেয়ে কল্যাণকামী ও সর্বোত্তম উপকারী মাখলুক নিষ্পাপ ফিরিশতাগণ বান্দার জীবনের রক্ষণাবেক্ষণ করে তখন তারা তাকে ঈমানের পথে দৃঢ়পদ রাখে, তাকে ঐশী ইলম দান করে এবং যাবতীয় কাজকর্মে তাকে শক্তিশালী করে। আল্লাহ তাআলা বলেন-
إِذْ يُوحِي رَبُّكَ إِلَى الْمَلَائِكَةِ أَنِّي مَعَكُمْ فَثَبِّتُوا الَّذِينَ آمَنُوا
'যখন আপনার প্রতিপালক ফিরিশতাদের নিকট এই মর্মে আদেশ প্রেরণ করেন যে, নিশ্চয় আমি তোমাদের সাথে আছি। সুতরাং যারা ঈমান এনেছে তোমরা তাদেরকে দৃঢ়পদ রাখো।'[২]
মৃত্যুর সময় এক ফিরিশতা বান্দাকে অভয় দিয়ে বলেন, 'তোমার কোনো ভয় নেই, কোনো দুঃখ নেই। তুমি আনন্দের সংবাদ গ্রহণ করো।' জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত, শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগের সময় ফিরিশতা তাকে কালিমার উপর স্থির রাখেন, কবরের প্রশ্নোত্তরের কঠিনতম পর্বে ফিরিশতা তার পাশেই থাকেন। এভাবেই নেক বান্দার জন্য আল্লাহ তাআলা জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই একজন করে ফিরিশতা নিযুক্ত করে দেন, আর নিযুক্ত ফিরিশতা বান্দার জীবনের প্রতিটি ধাপে তাকে অদৃশ্য থেকে সাহায্য করে কল্যাণের চূড়ান্ত পথে পৌঁছে দেন। হাদীসে বর্ণিত হয়েছে-
إِنَّ لِلْمَلَكِ بِقَلْبِ ابْنِ آدَمَ لَمَّةً، وَلِلشَّيْطَانِ لَمَّةٌ، فَلَمَّةُ الْمَلَكِ إِيعَادُ بِالْخَيْرِ وَتَصْدِيقُ بِالْوَعْدِ، وَلَمَّةُ الشَّيْطَانِ إِيعَادُ بِالشَّرِّ وَتَكْذِيبُ بِالْحَقِّ
‘বান্দার অন্তরে ফিরিশতার একটি প্রভাব থাকে আর শয়তানেরও কুমন্ত্রণা থাকে। ফিরিশতার প্রভাব হলো, ফিরিশতা বান্দার জন্য কল্যাণের পথ তৈরি করে দেন এবং নিজের কৃত ওয়াদা বাস্তবায়ন করেন। আর শয়তানের প্রভাব হলো, সে বান্দার সামনে অকল্যাণের রাস্তা খুলে দেয় এবং সত্যকে মিথ্যা প্রমাণিত করতে উঠেপড়ে লেগে যায়।’১
ফিরিশতা যখন নেককার বান্দাকে সঙ্গ দেন, তখন তিনি বান্দার মুখপাত্র হিসেবে কাজ করেন। বান্দার উপর আরোপিত যেকোনো কথার জবাব তিনিই প্রদান করেন। আর বান্দা যখন গুনাহে লিপ্ত থাকে তখন ফিরিশতা তার থেকে দূরে সরে যান। শয়তান তাকে সঙ্গ দেয়। তার মুখপাত্র হয়ে তার পক্ষ থেকে কথা বলে। ফলে গুনাহগার ব্যক্তির মুখে অশ্লীল আর মিথ্যা কথার প্রবণতা বেড়ে যায়।
হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, শান্তি আর সৌহার্দ্যের কথা উচ্চারিত হয় উমরের যবানে। সাহাবীরা কারো মুখে কল্যাণের কোনো কথা শুনলে বলতেন, ‘এই চমৎকার কথার ভাব ও মর্ম ফিরিশতা তার অন্তরে জাগ্রত করেছেন।’ আর যদি কারো মুখে অকল্যাণের কথা উচ্চারিত হতো, তাহলে তাঁরা বলতেন, ‘এই লোকের অন্তরে শয়তান কুমন্ত্রণা দিয়েছে তাই তার জিহ্বায় এসব গর্হিত কথা উচ্চারিত হয়েছে।’
অনুগত বান্দার পক্ষে ফিরিশতা কথা বলেন। কোনো গুনাহগার ব্যক্তিও যদি তার সাথে তর্কে লিপ্ত হয়, তাহলে সে যতক্ষণ চুপ থাকে ততক্ষণ ফিরিশতা তার পক্ষ থেকে তর্কের উত্তর দিতে থাকেন। একবার নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সামনে এক লোক আবু বাকর রাদিয়াল্লাহু আনহুকে গালমন্দ করছিল। আবু বাকর তখন কথা না বলে চুপ করে থাকেন। কিন্তু একপর্যায়ে তিনি লোকটির একটি কথার উত্তর দিয়ে ফেলেন। তখন নবীজি ইরশাদ করেন-
كَانَ الْمَلَكُ يُنَافِحُ عَنْكَ، فَلَمَّا رَدَدْتَ عَلَيْهِ جَاءَ الشَّيْطَانُ فَلَمْ أَكُنْ لِأَجْلِسَ
'একজন ফিরিশতাই তো তোমার পক্ষ থেকে তাকে তার কথার উত্তর দিচ্ছিল। যখন তুমি কথা বলে উঠলে তখন এই মজলিসে শয়তান এসে হাজির হয়েছে। তাই আমি এখন আর এখানে বসব না।' [১]
কোনো মুসলিম যখন অপর মুসলিমের জন্য দুআ করে, তখন একজন ফিরিশতা তার দুআয় 'আমীন আমীন' বলতে থাকেন এবং দুআকারীর জন্য এই বলে দুআ করেন, 'আল্লাহ তাআলা তোমাকেও অনুরূপ জিনিস দান করুন।'
বান্দা যখন সূরা ফাতিহা শেষ করে, ফিরিশতাগণ তখন 'আমীন' বলেন।
কুরআন-সুন্নাহর অনুসারী কোনো বান্দা যখন ভুলক্রমে কোনো অপরাধ করে ফেলে, আরশের ফিরিশতাগণ তখন তার জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা করেন।
নেককার বান্দা যখন ওযু করে ঘুমায়, তার শিয়রে একজন ফিরিশতা সারা রাত দাঁড়িয়ে থাকেন।
এভাবে নেককার বান্দার প্রতিটি কাজেই অদৃশ্য থেকে একজন ফিরিশতা সাহায্য করেন। তার প্রতিটি পদক্ষেপের অন্তরালে ফিরিশতার উপস্থিতি থাকায় সহজেই সে তার উদ্দেশ্য পূরণ করতে পারে। ফিরিশতার পরোক্ষ সহযোগিতায় বান্দার সামনে গুনাহের পথ রুদ্ধ হয়ে যায়। ক্ষতিকর ও বিপজ্জনক ক্ষেত্র সমূহ ডিঙাতে ফিরিশতা তাকে সর্বোচ্চ সাহায্য করেন। তার অজান্তেই সকল সমস্যা, অসুবিধা, কষ্ট, ক্লেশ দূর করে দেন। এভাবে নেককার বান্দাদেরকে ফিরিশতাগণ তাঁদের অতিথি হিসেবে বরণ করে নিয়ে তাদের সম্মান, মর্যাদা, সুবিধা-অসুবিধার প্রতি সজাগ দৃষ্টি রাখেন।
আর বান্দা যখন গুনাহ করে, ফিরিশতার পক্ষে তখন তার সাথে থাকা কষ্টকর হয়ে যায়। কষ্টের কারণে তিনি তাকে বদ-দুআ দেন, বলেন, 'আল্লাহ যেন তোমাকে কোনো ভালো প্রতিদান না দেন।'
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এক সাহাবী বলেছেন, 'তোমাদের সাথে সর্বদা আল্লাহ তাআলার এমন মাখলুক থাকে, যারা কখনো তোমাদের ছেড়ে যায় না। সুতরাং তোমরা তাদেরকে সম্মান কোরো এবং তাদের সাথে শালীনতাপূর্ণ আচরণ কোরো।'
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-
وَإِنَّ عَلَيْكُمْ لَحَافِظِينَ - كِرَامًا كَاتِبِينَ - يَعْلَمُونَ مَا تَفْعَلُونَ
'আর অবশ্যই তোমাদের জন্য তত্ত্বাবধায়ক নিযুক্ত রয়েছে। তারা সম্মানিত। তারা তোমাদের আমল লিপিবদ্ধ করেন। তারা তোমাদের কর্মকাণ্ডসমূহ খুব ভালো করেই জানেন।'
টিকা:
[১] তিরমিযী, হাদীস-ক্রম: ১৯৭২
[১] সূরা হা-মীম সিজদাহ, আয়াত-ক্রম: ৩০-৩১
[২] সূরা আনফাল, আয়াত-ক্রম: ১২
[১] তিরমিযী, হাদীস-ক্রম: ২৯৮৮
[১] আবু দাউদ, হাদীস-ক্রম: ৪৮৯৬
[১] সূরা ইনফিতার, আয়াত-ক্রম: ১০-১২
📄 গুনাহ মানুষের জন্য ধ্বংস ডেকে আনে
গুনাহ মানুষের জন্য দুনিয়া ও আখিরাতের ধ্বংসের উপকরণ একত্রিত করে দেয়। কেননা, গুনাহ হলো মানুষের আত্মার ব্যাধি। শারীরিক রোগব্যাধি যেমন মানুষকে ধ্বংস করে দেয়, তেমনি আত্মার ব্যাধিও মানুষকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে দেয়। শারীরিক শক্তি ও ভারসাম্য ধরে রাখার মতো খাদ্যগ্রহণ এবং শরীরকে নষ্ট করে দেয়ার মতো খাবার গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকার মাধ্যমে মানুষ যেমন শারীরিকভাবে সুস্থ থাকে, তেমনি আত্মার পক্ষে ক্ষতিকর অভ্যাস ও মানসিকতা থেকে বিরত থাকার মাধ্যমে এবং আত্মার উন্নতি সাধনকারী চরিত্রের দ্বারা মানুষ তার আত্মার ব্যাধি থেকেও মুক্ত ও সুস্থ থাকতে পারে।
মানুষের সুস্থ থাকার জন্য তিনটি উপকরণ একান্ত প্রয়োজন-
১. সুস্থতা ও দৈহিক শক্তিমত্তা ধরে রাখার মতো খাদ্যগ্রহণ
২. ক্ষতিকর খাদ্য ও উপকরণ থেকে শরীরকে মুক্ত রাখা
৩. যেসকল খাদ্য গ্রহণ করলে শরীর অসুস্থ হয়ে যায় তা থেকে বেঁচে থাকা।
এমনিভাবে মানুষের আত্মিক সুস্থতার জন্যও তিনটি উপকরণ একান্ত আবশ্যক।
১. ঈমান ও নেক আমল
২. তাওবাহ
৩. তাকওয়া; অর্থাৎ গুনাহ থেকে বিরত থাকা
রোগ-প্রতিরোধক খাদ্যের অনুপস্থিতিতে মানবদেহে যেভাবে বিভিন্ন রোগ ও অসুখ বাসা বাঁধে, তেমনি ইবাদাত ও আনুগত্যের অনুপস্থিতিতে বান্দার অন্তরে বিভিন্ন ধরনের পাপের আকাঙ্ক্ষা জায়গা করে নেয়। নাফরমান বান্দা আত্মার ব্যাধিতে অসুস্থ হয়ে পড়ে। মানুষের অন্তর সুস্থভাবে বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজন ঈমান ও নেক আমল; যা তার অন্তরকে সুরক্ষিত করে, আত্মিক ব্যাধি থেকে সুস্থ ও সতেজ রাখে।
📄 গুনাহগার বান্দাকে আইনানুগ শাস্তিপ্রদানের রহস্য
গুনাহের উল্লিখিত করুণ পরিণতিতেও যদি কোনো গুনাহগার বান্দা সতর্ক না হয়, কোনো পাপিষ্ঠ ব্যক্তি যদি তার পাপাচার থেকে ফিরে না আসে, তবে তাদের জন্য রয়েছে জাগতিক আইন। শরয়ী আইনানুযায়ী গুনাহগার ব্যক্তিকে পার্থিব শাস্তি প্রয়োগ করা হবে। আর পরকালের জীবনে তো তার জন্য অপেক্ষা করছে অনন্তকালের আযাব। সামান্য তিন দিরহাম মূল্যের সম্পদ চুরির দায়ে অভিযোগ প্রমাণিত ব্যক্তির হাত কাটার আইন রয়েছে কুরআনুল কারীমে। নিষ্পাপ, নিরপরাধ ব্যক্তিদের কাছ থেকে ডাকাতি করে সম্পদ ছিনিয়ে নেওয়ার অপরাধের শাস্তি, হাত ও পা কর্তন। সতী-সাধ্বী নারীকে অপবাদ আরোপ করলে কিংবা মদ পান করলে প্রকাশ্যে বেত্রাঘাত ও চাবুকের প্রহারকে শাস্তির বিধান হিসেবে প্রণয়ন করা হয়েছে। বিবাহ-বন্ধনে আবদ্ধ থাকাবস্থায় পরকীয়া বা ব্যভিচারে লিপ্ত হলে রজম বা পাথর নিক্ষেপে হত্যার বিধান রয়েছে। এ সবই করা হয়েছে মানুষকে গুনাহ থেকে ফিরিয়ে রাখার জন্য। শিরশ্ছেদকে প্রণয়ন করা হয়েছে রক্ত-সম্পর্কিত আত্মীয়ের সাথে ব্যভিচার বা ইচ্ছাকৃতভাবে নামায ছেড়ে দেওয়ার শাস্তি হিসেবে। সমকামিতা, পশুকামিতার শাস্তি রাখা হয়েছে প্রাণদণ্ড। এভাবেই আল্লাহ তাআলা বান্দাকে গুনাহ থেকে ফিরিয়ে রাখার জন্য প্রতিটি গুনাহ ও অপরাধের শাস্তি নির্ধারণ করেছেন, পূর্ণ ইনসাফের সাথে। ইসলামী দণ্ডবিধির পরিমিতিবোধ যুগে যুগে সকল আইন ও দণ্ডনীতির ঊর্ধ্বে প্রমাণিত হয়েছে। শরয়ী দণ্ডমালার ভারসাম্যের জাগতিক সকল আইন ভুল প্রমাণিত হয়।
অপরাধের তীব্রতায় শাস্তির মাত্রাও আল্লাহ তাআলা বাড়িয়ে দিয়েছেন। আর মানুষের স্বভাবে ও মানসিকতায় যেসকল অপরাধ-প্রবণতা দেখা যায়, তা প্রতিহত করতে আল্লাহ তাআলা বিভিন্ন প্রকারের শাস্তি আরোপ করেছেন। মানুষের স্বভাব ও মানসিকতার স্বাভাবিক রুচিবোধই যেসকল অপরাধ থেকে স্বেচ্ছায় বিরত থাকে, আল্লাহ তাআলা সেখানে শাস্তির বিধান রাখেননি। বান্দাকে নিরুৎসাহিত করেছেন, অপরাধটিকে হারাম ও নাজায়েয বলে জানিয়ে দিয়েছেন। অপরাধের পিঠে জাগতিক কোনো শাস্তির বিধান প্রয়োগ করেননি। যেমন-পশুর মলমূত্র সেবন, রক্তপান, মৃতপ্রাণী খাওয়া ইত্যাদি।
আর যেসকল অপরাধের জন্য মানুষের মন উৎসাহিত হয়ে ওঠে, সেসকল অপরাধের ক্ষতির মাত্রা অনুযায়ী আল্লাহ তাআলা জাগতিক শাস্তির বিধান রেখেছেন। যৌনচাহিদার ক্ষেত্রে বান্দার মনের আকাঙ্ক্ষা তীব্র থাকায় এই জৈবিক চাহিদা পূরণের অবাধ ও ক্ষতিকর রাস্তা বন্ধ করার জন্য আল্লাহ তাআলা যৌনক্ষমতার অপব্যবহারের শাস্তির মাত্রাও বাড়িয়ে দিয়েছেন। পাথর নিক্ষেপ করে হত্যা করার মতো কঠোর শাস্তির বিধান প্রণয়ন করেছেন। যৌন-অপরাধ দমনের সর্বনিম্ন শাস্তি হিসেবে বেত্রাঘাত ও প্রহারকে প্রণীত করেছেন, যেন সকলে এ ব্যাপারে সচেতন ও সতর্ক থাকে। চৌর্যবৃত্তির অপরাধ ও এর ক্ষতির প্রভাব বিবেচনায় চোরের জন্য হাত কাটার বিধান প্রণয়ন করে দিয়েছেন, যেন মানুষ অন্যের সম্পদ চুরি করা থেকে বিরত থাকে, সমাজের ভারসাম্যতা ও নিরাপত্তা নির্বিঘ্ন থাকে। ডাকাত ও ছিনতাইয়ের মতো গর্হিত অপরাধের শাস্তি হিসেবে হাত ও পা কেটে দেওয়ার শাস্তি প্রণীত হয়েছে।
বান্দা যেই অঙ্গ দিয়ে গুনাহের কাজে লিপ্ত হয়, ইসলামী শরীয়াহ সাধারণত সেই অঙ্গের উপরই শাস্তি প্রয়োগের বিধান রেখেছে। যেমন চুরি-ডাকাতির অপরাধ। তবে ব্যভিচারীর শাস্তি তার গোপনাঙ্গে প্রয়োগ না করে বেত্রাঘাতের দ্বারা শরীরে প্রয়োগের কারণ হলো—
১. গোপনাঙ্গ কেটে ফেলার দ্বারা বান্দাকে তার অপরাধের মাত্রার চেয়েও বেশি শাস্তি প্রয়োগ করা হয়।
২. হাত ও পা কেটে দেয়ার মাধ্যমে অন্যদেরকে সতর্ক করা যায়। অন্যরা চুরি ও ছিনতাই থেকে বিরত থাকার শিক্ষা লাভ করে। কিন্তু মানুষের গোপনাঙ্গ শরীরের আবৃত অঙ্গ হওয়ায় শাস্তি প্রয়োগের উদ্দেশ্য অর্জিত হয় না। তাই প্রকাশ্যে তাকে বেত্রাঘাতের মাধ্যমে ভর্ৎসনা ও লাঞ্ছিত করার বিধান আরোপ করা হয়েছে।
৩. মানুষের এক হাত কেটে দিলেও অনেকাংশে অন্য হাত দিয়ে তার প্রয়োজন পূরণ হয়ে যায়। এই দৃষ্টিকোণ থেকেও ব্যভিচারের শাস্তিটি ভিন্নভাবে প্রয়োগ করা হয়।
৪. ব্যভিচারের স্বাদ ও রসনেন্দ্রিয় যেহেতু সমগ্র শরীর জুড়েই বিস্তৃত তাই এর শাস্তিও ব্যভিচারীর সারা দেহে প্রয়োগ করা হয়।
মোটকথা, ইসলামী আইন পরিপূর্ণ ভারসাম্য বজায় রেখে মানুষ ও সমাজের সামগ্রিক কল্যাণের জন্য প্রণয়ন করা হয়েছে।
📄 পাপাচারের সাজা ও দণ্ডবিধির প্রকার
পাপাচারী ব্যক্তিকে দুইভাবে শাস্তি দেওয়া হয়—
শরীয়তকর্তৃক নির্ধারিত দণ্ডবিধির মাধ্যমে জাগতিক শাস্তি।
অথবা আল্লাহ তাআলা সরাসরি নিজ কুদরতে তাকে তার অপরাধের শাস্তি প্রদান করেন।
গুনাহগার ব্যক্তিকে যখন শরীয়তকর্তৃক নির্ধারিত শাস্তির মাধ্যমে দণ্ডিত করা হয়, তখন সাধারণত আল্লাহ তাআলার শাস্তি বা আযাবকে তার জন্য রহিত করা হয় অথবা লঘু করে দেয়া হয়। যদি বান্দার অপরাধের শাস্তির মাত্রা অনুযায়ী সে তার প্রাপ্য সাজা ভোগ করে ফেলে, তাহলে আল্লাহ তাআলা তাকে পুনরায় শাস্তির সম্মুখীন করবেন না। আর শরয়ী দণ্ডবিধি যদি তার জন্য যথেষ্ট না হয়, বান্দার আত্মার ব্যাধি যদি দণ্ডগ্রস্ত হওয়ার পরও তার মাঝে বিদ্যমান থাকে, তাহলে তার উপর আল্লাহ তাআলার আযাব ও শাস্তি নেমে আসে। বান্দার অনেক গুনাহ এমন আছে, যেখানে আল্লাহ তাআলা কোনো জাগতিক দণ্ডকে শরয়ী শাস্তি হিসেবে নির্ধারণ করেননি; সেসকল ক্ষেত্রে আল্লাহ তাআলা বান্দাকে নিজ কুদরতি আযাব দিয়ে পাকড়াও করেন। এই আযাব প্রদান কখনো শরয়ী শাস্তির তুলনায় কম হয়, আবার কখনো বেশি ও তীব্র হয়ে যায়। শরীয়ত কর্তৃক নির্ধারিত শাস্তির প্রয়োগক্ষেত্র নির্দিষ্ট ও সীমিত। আর আল্লাহ তাআলা সাধারণভাবে গুনাহের কারণে বান্দাকে যেই শাস্তি দিয়ে থাকেন, তার প্রয়োগক্ষেত্র ব্যাপক ও বিস্তৃত হয়ে থাকে। কেননা আল্লাহ তাআলার অবাধ্যতা যদি গোপনে করা হয় তখন শুধুমাত্র গুনাহগার ব্যক্তি একাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়, আর যখন আল্লাহর নাফরমানি প্রকাশ্যে করা হয় তখন সমাজের সবাই এর দ্বারা প্রভাবিত ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মানুষের চোখের সামনে যদি কোনো খারাপ কাজ হয়, আর সবাই যদি সম্মিলিতভাবে সেই কাজে বাধা না দেয়, বরং এতে আরও অংশগ্রহণ করে, তাহলে আল্লাহ তাআলা খুব দ্রুতই তাদেরকে আযাবগ্রস্ত করেন।
আল্লাহ তাআলা বান্দার গুনাহ ও অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী শরয়ী দণ্ডবিধি প্রণয়ন করেছেন। এই দণ্ডবিধির প্রয়োগক্ষেত্র তিনভাবে হয়ে থাকে。
* হত্যা
* অঙ্গহানি
* বেত্রাঘাত
প্রাণদণ্ডে দণ্ডিত করার মতো অপরাধ হলো কুফর বা আল্লাহ তাআলাকে অস্বীকার করা, ব্যভিচার ও সমকামিতায় লিপ্ত হওয়া। এ ধরনের অপরাধ মানুষের ধর্মীয় মূল্যবোধ, বংশধারা ও সামাজিক ভারসাম্য নষ্ট করে।