📄 গুনাহ মানুষের গোপন শত্রু
গুনাহ শয়তানের একটি হাতিয়ার। এই হাতিয়ার খোদ গুনাহগার ব্যক্তির বিরুদ্ধেই ব্যবহৃত হয়। বান্দার পাপকর্ম তার নিজের জন্য ক্ষতিকর হয়ে যায়। মূলত আল্লাহ তাআলা গুনাহগার বান্দার জন্য একজন শত্রু নিযুক্ত করে দেন। অদৃশ্য থেকে এই শত্রু সর্বদা গুনাহগার ব্যক্তির পেছনে লেগে থাকে। গুনাহগার ব্যক্তির ক্ষতি করতে সর্বদা সচেষ্ট থাকে। গুনাহগার ব্যক্তির প্রতিটি পদক্ষেপ, প্রতিটি কাজেই সে ষড়যন্ত্র করতে উদ্যত হয়। এই শত্রু হলো শয়তান। শয়তান মানুষকে স্পষ্ট দেখতে পায়। মানুষের চোখে শয়তান ধরা পড়ে না, অদৃশ্য থেকে। শয়তান কখনো ঘুমায় না, গাফিল হয় না। সে মানুষের পিছেই পড়ে থাকে। সে যেই গুনাহগার ব্যক্তির পেছনে উঠেপড়ে লেগে যায় তার ক্ষতি করতে সে অন্যান্য শয়তান এবং মানুষরূপী শয়তানদের থেকে সাহায্য নেয়। সে তার সামনে মিথ্যার বেসাতি মেলে ধরে। বিভিন্ন রকমের ভ্রান্তি আর ভ্রষ্টতা সে তার পথে বিছিয়ে দেয়। গুনাহগার বান্দার পেছনে তার অন্যান্য শয়তানদেরকে লেলিয়ে দেয়। তারা পরস্পর বলাবলি করে—‘এই মানুষজাতিই তো আমাদের চিরশত্রু। মানুষের জন্যই তো আমাদের পূর্বপুরুষকে (ইবলিস) অভিশপ্ত করা হয়েছে। সে যেন আমাদের হাতছাড়া না হয়ে যায়। তাকেও অভিশপ্ত বানাতে হবে। জান্নাতে যেন তার বিন্দুমাত্র অংশ না থাকে। সে জান্নাতে থাকবে আর আমরা হব জাহান্নামী, এটা হতেই পারে না। তার জন্যই তো আমরা রহমত থেকে বিতাড়িত হয়েছি। আমাদেরকে অভিশপ্ত করা হয়েছে। সুতরাং, এসো, আমরা সকলে একযোগে আমাদের সময়, শ্রম ও মেধা দিয়ে তাকে আমাদের দলভুক্ত করে নিই, তাকেও আমাদের মতো অভিশপ্ত করে তোলি।'
এভাবেই শয়তান তার অনুচরদেরকে মানুষের পেছনে লেলিয়ে দেয়। তাই আল্লাহ তাআলাও মানুষদের সুরক্ষার জন্য বাহিনী গঠন করে দিয়েছেন। আল্লাহর বাহিনীর সাথে শয়তানের বাহিনীর নিরন্তর লড়াইয়ের সূচনা এই পৃথিবীর শুরু-লগ্ন থেকেই। হক আর বাতিলের লড়াই। আল্লাহ তাআলা জিহাদকে ইবাদাত হিসেবে এই পৃথিবীতে প্রচলিত করেছেন। এই ইবাদাতে আল্লাহ তাআলা বান্দাদের প্রাণ ও সম্পদকে আখিরাতের বিনিময়ে ক্রয় করে নিয়েছেন। ঐশী গ্রন্থ তাওরাত, ইনজিল ও কুরআনুল কারীমে আল্লাহ তাআলা মুমিন বান্দাদের জান-মালের বিনিময় জান্নাত বলে অভিহিত করেছেন। কুরআনের ইরশাদ-
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا هَلْ أَدُلُّكُمْ عَلَى تِجَارَةٍ تُنْجِيكُمْ مِنْ عَذَابٍ أَلِيمٍ - تُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ وَتُجَاهِدُونَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ بِأَمْوَالِكُمْ وَأَنْفُسِكُمْ ذَلِكُمْ خَيْرٌ لَكُمْ إِنْ كُنْتُمْ تَعْلَمُونَ - يَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ وَيُدْخِلْكُمْ جَنَّاتٍ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ وَمَسَاكِنَ طَيِّبَةً فِي جَنَّاتِ عَدْنٍ ذَلِكَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ - وَأُخْرَى تُحِبُّونَهَا نَصْرُ مِنَ اللَّهِ وَفَتْحُ قَرِيبٌ وَبَشِّرِ الْمُؤْمِنِينَ
'হে ঈমানদারগণ! আমি কি তোমাদেরকে এমন এক ব্যবসায়ের সন্ধান দেব, যা তোমাদেরকে যন্ত্রণাদায়ক আযাব থেকে রক্ষা করবে? (তা হলো) তোমরা আল্লাহ ও রাসূলের প্রতি ঈমান আনবে এবং আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করবে তোমাদের অর্থ-সম্পদ ও জীবনকে উৎসর্গ করে। তোমাদের জন্য এই ব্যবসা অত্যন্ত লাভজনক, যদি তোমরা বুঝতে পার। (এই ব্যবসায়ে) আল্লাহ তাআলা তোমাদের জীবনের গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেবেন আর তোমাদেরকে এমন এক জান্নাতে প্রবেশ করাবেন, যার নিচ দিয়ে বয়ে গেছে নদ-নদী, তিনি তোমাদেরকে দেবেন বসবাসের জন্য জান্নাতে উত্তম বাসস্থান। এটাই মহা সফলতা। এ ছাড়াও তিনি তোমাদের জন্য আরো পছন্দনীয় দুটি বিষয় রেখে দিয়েছেন; আল্লাহ তাআলার সাহায্য ও নিকট-ভবিষ্যতের বিজয়। সুতরাং হে নবী! আপনি মুমিনদেরকে সুসংবাদ জানিয়ে দিন।[১]
আল্লাহ তাআলা শয়তানকে তাঁর প্রিয় বান্দাদের মুকাবিলায় সুযোগ দিয়ে রেখেছেন। তাঁর প্রিয় বান্দাগণ শয়তানের মুকাবিলায় জিহাদ করে নিজেদেরকে মহান রবের শ্রেষ্ঠ বান্দা হিসেবে প্রমাণ করে। আর আল্লাহ তাঁর মুমিন বান্দার অন্তরে হক-বাতিলের এই চিরায়ত দ্বন্দ্বের নিশানা দিয়েছেন। এই অন্তর দিয়ে মুমিন বান্দা আল্লাহ তাআলার পরিচয় লাভ করে, মহান রবের প্রতি ভালোবাসা, শ্রদ্ধা, আনুগত্য, একনিষ্ঠতা প্রদর্শন করে। নিজের হৃদয়কে আল্লাহমুখী করে, আল্লাহর উপর ভরসা করে। তাই শয়তানের সাথে মানবজাতির এই দ্বন্দ্বের দায়ভার তিনি মানুষের হৃদয়ের মাঝেই রেখে দিয়েছেন। এরপর তিনি এই চিরায়ত যুদ্ধে মানুষের অন্তরকে সাহায্য করেছেন ফিরিশতাদের মাধ্যমে, যারা পালাক্রমে অন্তরের রক্ষণাবেক্ষণ করে থাকে। সেই সাথে অন্তরকে শক্তি যুগিয়েছেন প্রেরিত কিতাব, রাসূল, ঈমানের নূর, দৃঢ় বিশ্বাস ও হিদায়াতের আলো দ্বারা।
অন্তরের এই শক্তির পাশাপাশি আল্লাহ তাআলা তাকে দৈহিক শক্তিমত্তাও দান করেছেন। চোখের দ্বারা অন্তরের পর্যবেক্ষণ হয়, কানের দ্বারা শ্রবণ হয় আর জিহ্বা দ্বারা অন্তরের ভাষ্য প্রকাশ পায়। বান্দার হাত-পা তার অন্তরকে সার্বক্ষণিক সহায়তা করতে থাকে। ফিরিশতাগণ তাদের জন্য দুআ করেন। সর্বশেষে আল্লাহ নিজেই তাদের রক্ষকের ভূমিকায় থাকেন। মুমিন বান্দাদেরকে তিনি তাঁর দলের লোক হিসেবে ঘোষণা দিয়ে ইরশাদ করেন-
أُولَئِكَ حِزْبُ اللَّهِ أَلَا إِنَّ حِزْبَ اللَّهِ هُمُ الْمُفْلِحُونَ
'এরাই হলো আল্লাহ তাআলার দল। জেনে রাখো, মহান আল্লাহ তাআলার দলই চূড়ান্ত সফলতা লাভ করবে।”
وَإِنَّ جُنْدَنَا لَهُمُ الْغَالِبُونَ
'আর অবশ্যই আমার বাহিনীই হবে বিজয়ী।”
আল্লাহ তাআলা এভাবে হক-বাতিলের অবিরাম দ্বন্দ্বে নিজের দলকে বিশ্ববাসীর নিকট ঘোষণা দিয়ে পরিচিত করে দিয়েছেন। যেসকল বান্দা আল্লাহ তাআলার দলভুক্ত তাদের জন্য পবিত্র কুরআনে এই যুদ্ধ ও দ্বন্দ্বের সমরশিক্ষা বর্ণিত হয়েছে। আল্লাহ তাআলা তাদের উদ্দেশ করে বলেন-
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اصْبِرُوا وَصَابِرُوا وَرَابِطُوا وَاتَّقُوا اللَّهَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ
'হে ঈমানদারগণ! তোমরা ধৈর্য ধরো। শত্রুর মুকাবিলায় প্রতিযোগিতা করে তোমরা (আনুগত্য, বিপদ-আপদ ও গুনাহ থেকে বিরত থাকার ব্যাপারে) কষ্টসহিষ্ণু হও। দৃঢ়তা অবলম্বন করো। আর আল্লাহকে ভয় করতে থাক, যাতে তোমরা সফল হও।[১]
আল্লাহ তাআলা এই চার জিনিসের মাধ্যমে (ধৈর্যধারণ, শত্রুর চেয়ে বেশি কষ্টসহিষ্ণু হওয়া, দৃঢ়পদ থাকা এবং তাকওয়া অবলম্বন করা) তাঁর মুমিন বান্দাদেরকে বাতিলের মুকাবিলায় বিজয় লাভের পদ্ধতি শিক্ষা দিয়েছেন।
টিকা:
[১] সূরা সাফ, আয়াত-ক্রম: ১০-১৩
[১] সূরা মুজাদালাহ, আয়াত-ক্রম: ২২
[২] সূরা সাফফাত, আয়াত-ক্রম: ১৭৩
[১] সূরা আলে ইমরান, আয়াত-ক্রম: ২০০
📄 গুনাহ বান্দাকে আযাবিগ্রস্ত করে
গুনাহের অন্যতম ক্ষতি হলো, গুনাহগার ব্যক্তি নিজের কথাও ভুলে যায়। নিজের প্রতি যত্নহীন থাকে। তিলেতিলে নিজেকে বিনষ্ট করে ফেলে, নিজের জন্য বড় বড় ক্ষতি ডেকে আনে। আল্লাহ তাআলার ইরশাদ-
وَلَا تَكُونُوا كَالَّذِينَ نَسُوا اللَّهَ فَأَنْسَاهُمْ أَنْفُسَهُمْ أُولَئِكَ هُمُ الْفَاسِقُونَ
'আর তোমরা তাদের মতো হয়ো না, যারা আল্লাহ তাআলাকে ভুলে গিয়েছে, ফলে আল্লাহও তাদেরকে আত্মবিস্মৃত করে দিয়েছেন। তারাই হলো অবাধ্য ও ফাসিক।[১]
অন্য আয়াতে ইরশাদ করেন—
نَسُوا اللَّهَ فَنَسِيَهُمْ
‘তারা আল্লাহ তাআলাকে ভুলে গিয়েছে, ফলে আল্লাহও তাদেরকে ভুলে গিয়েছেন।[২]
যারা আল্লাহ তাআলাকে ভুলে যায়, তাদের জীবনে দুটি শাস্তি নেমে আসে।
১. আল্লাহ তাআলা তাদেরকে ভুলে যান
২. তাদের নিজেদেরকেও নিজেদের ব্যাপারে ভুলিয়ে দেন
আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাকে ভুলে যাওয়ার অর্থ হলো, তিনি বান্দাকে ছাড় দেন, কিছু কালের জন্য অবাধ্যতা ও স্বেচ্ছাচারের সুযোগ দেন। ফলে বান্দা কিছু কালের এই বল্গাহীন জীবন পেয়ে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে উপনীত হয়।
আর আল্লাহ তাআলা বান্দাকে বান্দার নিজের ব্যাপারে বিস্মৃত করে দেওয়ার অর্থ হলো, বান্দা নিজের আসল পরিচয় ভুলে যায়। তার প্রকৃত অবস্থান ও মর্যাদার ব্যাপারে সে উদাসীন হয়ে যায়। স্বার্থক জীবনের সফলতা ও সৌভাগ্যের উপকরণগুলোর কথা তার মনে থাকে না। সে নিজের ভালোমন্দ বুঝতে অক্ষম হয়ে যায়। নিজ স্বার্থের ব্যাপারেও থাকে বেখেয়াল। জীবনের উন্নতির চাবিকাঠি তার অজানাই থেকে যায়। উত্তম ও দৃঢ়সংকল্প তার অন্তরে বদ্ধমূল হয় না আর। তার চোখে তখন আর নিজের ত্রুটি-বিচ্যুতি ধরা পড়ে না। নিজের ভুল পদক্ষেপও সে ভুলে যায়। একইসাথে সে তার আত্মার ব্যাধি, হৃদয়ের ক্ষতিকারক অভ্যাসের ব্যাপারে উদাসীন হয়ে যায়। ভুলোমনা হয়ে নিজের চারিত্রিক বদঅভ্যাস সে দূর করতেও তখন অনীহা প্রকাশ করে।
পাপিষ্ঠ ব্যক্তির চলাফেরার দিকে খেয়াল করলেও দেখা যায়, সে তার সম্ভাবনাময় জীবনকে অনর্থক কাজে নষ্ট করে দিচ্ছে। তার মূল্যবান প্রতিভা, স্বভাবজাত যোগ্যতাকে নিকৃষ্ট কোনো কাজের পেছনে হেলায় ফেলায় অপচয় করে বেড়াচ্ছে। তার মেধার সঠিক মূল্যায়ন করতে সে ব্যর্থ হয়ে জীবনের করুণ পরিণতিকে বরণ করে নিচ্ছে।
মূলত এই পৃথিবীতে আমরা এসেছি আখিরাতকে গড়ার জন্য। পার্থিব জীবনের বিনিময়ে আখিরাতের সাফল্যমণ্ডিত জীবনকে তৈরি করার সাধনায় লিপ্ত হওয়ার কথা আমাদের সকলের। এই সাধনায় যারা উদাসীন, তারা পার্থিব জীবনে নিজেদেরকে সফল ব্যক্তি মনে করতে থাকে। জাগতিক জীবনের ভোগ-বিলাসের পেছনেই তারা সর্বস্ব ব্যয় করে দেয়। পার্থিব জীবনের মোহ তাদেরকে আচ্ছাদিত করে নেয়। তারা দুনিয়ার সুখ-শান্তিতেই আত্মতৃপ্তি লাভ করে। চোখের সম্মুখে উপস্থিত ভোগবাদী জীবনকেই তারা গ্রহণ করে নেয়, বিনিময়ে নষ্ট করে দেয় অবিনশ্বর জীবনের সফলতা। মনে করতে থাকে, পার্থিব জীবনকে বেছে নেওয়াই প্রকৃত বুদ্ধিমত্তার পরিচয়।
আবার কখনো তারা এই কথা বলে আত্মপ্রবঞ্চিত হয় যে, যা কিছু চোখে দেখছ, তাই গ্রহণ করো। যা কিছু শুধু শুনছ (পরকালের কথা), তার চিন্তা আপাতত বাদ দাও।
তাদের ব্যাপারেই আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন-
فَمَا رَبِحَتْ تِجَارَتُهُمْ وَمَا كَانُوا مُهْتَدِينَ
'তাদের এই কারবার লাভজনক হয়নি। আর তারা হিদায়াতপ্রাপ্তও হতে পারেনি।' ১৯
অন্যত্র ইরশাদ করেন-
أُولَئِكَ الَّذِينَ اشْتَرَوُا الْحَيَوَةَ الدُّنْيَا بِالْآخِرَةِ فَلَا يُخَفَّفُ عَنْهُمُ الْعَذَابُ وَلَا هُمْ يُنْصَرُونَ
'এরাই হলো ঐ সমস্ত লোক, যারা তাদের পরকালের বিনিময়ে পার্থিব জীবনকে ক্রয় করে নিয়েছে। সুতরাং তাদের শাস্তি লঘু করা হবে না। আর তাদেরকে কোনো প্রকার সাহায্যও করা হবে না।'১
আর প্রকৃত লাভবান ও সফল ব্যক্তিদের পরিচয় হলো, তারা এই ক্ষণস্থায়ী জীবনকে উৎসর্গ করে দিয়েছে চিরস্থায়ী জীবনের সফলতার স্বার্থে। তুচ্ছ এই নশ্বর জীবনকে তারা অবিনশ্বর জিন্দেগির জন্য বিক্রি করে দিয়েছে। তুচ্ছ এই জগত-সংসারের বিনিময়ে তারা সাড়া দিয়েছে মহামূল্যবান জীবনের আহ্বানে। তারা বলে-'এই ক্ষণজন্মা তুচ্ছ জীবন দিয়ে আমরা কী করব! এই জীবনের সব প্রাপ্য আমরা মহান আল্লাহর কাছে দিয়ে দিলাম পরকালের চিরস্থায়ী সফল জীবনের আশায়! এক মুহূর্তের স্বপ্নের মোহগ্রস্ত এই জীবনে আমরা কী-ই বা করতে পারব! অথচ আখিরাতের জীবন তো অতুলনীয়! আমাদের হাতছানি দিয়ে ডাকছে সে-জীবন!
ক্ষণস্থায়ী এই দুনিয়ার ব্যাপারে ইরশাদ হচ্ছে-
وَيَوْمَ يَحْشُرُهُمْ كَأَنْ لَمْ يَلْبَثُوا إِلَّا سَاعَةً مِنَ النَّهَارِ يَتَعَارَفُونَ بَيْنَهُمْ
'আর সেদিন তাদেরকে এমন অবস্থায় সমবেত করা হবে, যেন তারা (পার্থিব জীবনে) দিনের সামান্য সময় ছাড়া সেখানে অবস্থানই করেনি। তারা পরস্পরকে সেদিন দেখে চিনতে পারবে।
অন্যত্র আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-
يَسْأَلُونَكَ عَنِ السَّاعَةِ أَيَّانَ مُرْسَاهَا - فِيمَ أَنْتَ مِنْ ذِكْرَاهَا - إِلَى رَبِّكَ مُنْتَهَاهَا - إِنَّمَا أَنْتَ مُنْذِرُ مَنْ يَخْشَاهَا كَأَنَّهُمْ يَوْمَ يَرَوْنَهَا لَمْ يَلْبَثُوا إِلَّا عَشِيَّةٌ أَوْ ضُحَاهَا
'তারা আপনার নিকট জানতে চায়, কিয়ামত কবে ঘটবে? আপনার সাথে এই আলোচনার কী সম্পর্ক রয়েছে! এর প্রকৃত জ্ঞান তো আপনার রবের নিকটই গচ্ছিত। যারা কিয়ামত দিবসকে ভয় করে, আপনি তো কেবল তাদেরকেই সতর্ক করবেন। যেদিন তারা কিয়ামতের বিভীষিকা দেখবে, সেদিন মনে হবে তারা যেন মাত্র এক সন্ধ্যা বা এক সকাল কাটিয়ে এসেছে পৃথিবীতে।।১৯
অন্য আয়াতে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-
كَمْ لَبِثْتُمْ فِي الْأَرْضِ عَدَدَ سِنِينَ - قَالُوا لَبِثْنَا يَوْمًا أَوْ بَعْضَ يَوْمٍ فَاسْأَلِ الْعَادِّينَ - قَالَ إِنْ لَبِثْتُمْ إِلَّا قَلِيلًا لَوْ أَنَّكُمْ كُنْتُمْ تَعْلَمُونَ
'(আল্লাহ তাআলা তাদেরকে বলবেন,) "তোমরা বছরের হিসেবে কত বছর পৃথিবীতে অবস্থান করলে?” তারা বলবে, "আমরা তো একদিন বা সামান্য কিছু সময় সেখানে অবস্থান করেছি, যারা গুণে রেখেছে আপনি তাদেরকে জিজ্ঞেস করুন।" আল্লাহ বলবেন, "তোমরা আসলেই সামান্য সময় পৃথিবীতে অবস্থান করেছ, যদি তোমরা তা জানতে!".
কুরআনের অন্য আয়াতে দুনিয়ার স্থায়িত্ব নিয়ে ইরশাদ হয়েছে-
يَوْمَ يُنْفَخُ فِي الصُّورِ وَنَحْشُرُ الْمُجْرِمِينَ يَوْمَئِذٍ زُرْقًا - يَتَخَافَتُونَ بَيْنَهُمْ إِنْ لَبِثْتُمْ إِلَّا عَشْرًا - نَحْنُ أَعْلَمُ بِمَا يَقُولُونَ إِذْ يَقُولُ أَمْثَلُهُمْ طَرِيقَةً إِنْ لَبِثْتُمْ إِلَّا يَوْمًا
'যেদিন শিঙ্গায় ফুঁ দেয়া হবে, সেদিন আমি অপরাধীদেরকে নীল চক্ষুসহ একত্রিত করব। তারা পরস্পরে চুপিচুপি বলাবলি করবে, "তোমরা (পৃথিবীতে) মাত্র ১০ দিন অবস্থান করেছিলে।” আমি খুব ভালো করেই জানি, তারা সেদিন কী বলবে। তখন তাদের উত্তম ব্যক্তিটি বলবে, "তোমরা পৃথিবীতে মাত্র একদিন ছিলে."[৩]
এই হলো কিয়ামতের ময়দানে ক্ষণস্থায়ী দুনিয়ার বাস্তবতা। এই বাস্তবতা উপলদ্ধি করে যখন তারা পৃথিবীতে তাদের অবস্থান-কালের স্বল্পতা জানতে পারবে, ক্ষণস্থায়ী জীবনের বাইরেও তাদের জন্য যেই অনন্ত জীবন রয়েছে সেই জীবনে যখন তারা উপনীত হবে, তখন বুঝতে পারবে তারা ধোঁকাগ্রস্ত এক জীবন পার করে এসেছে। ক্ষণস্থায়ী জীবনের মোহে পড়ে তারা চিরস্থায়ী জীবনকে নস্যাৎ করে দিয়েছে। তারা অপূরণীয় ক্ষতির সম্মুখীন হয়ে নিজেদের জীবনকে চূড়ান্ত ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছে। এই পৃথিবীর সকলেই তাদের জীবনকে পুঁজি বানিয়ে ব্যবসায় নেমেছে। কেউ এই পুঁজি খাটিয়ে আখিরাতের বাসস্থানকে তৈরি করে নেয়। আর কেউ এই পুঁজিকে ক্ষণস্থায়ী দুনিয়ার পেছনেই নিঃশেষ করে দেয়। গুনাহগার ভোগবাদী লোকেরা কিয়ামতের দিন অনুভব করবে তারা তাদের পুঁজি বিনিময় করে লাভবান হতে পারেনি। আল্লাহ তাআলা এই পুঁজির সর্বোত্তম ব্যবহারকারীদের পরিচয় জানিয়ে দিয়ে ইরশাদ করছেন—
إِنَّ اللَّهَ اشْتَرَى مِنَ الْمُؤْمِنِينَ أَنْفُسَهُمْ وَأَمْوَالَهُمْ بِأَنَّ لَهُمُ الْجَنَّةَ يُقَاتِلُونَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ فَيَقْتُلُونَ وَيُقْتَلُونَ وَعْدًا عَلَيْهِ حَقًّا فِي التَّوْرَاةِ وَالْإِنْجِيلِ وَالْقُرْآنِ وَمَنْ أَوْفَى بِعَهْدِهِ مِنَ اللَّهِ فَاسْتَبْشِرُوا بِبَيْعِكُمُ الَّذِي بَايَعْتُمْ بِهِ وَذَلِكَ هُوَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ
'নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা মুমিন বান্দাদের থেকে তাদের প্রাণ ও সম্পদকে জান্নাতের বিনিময়ে ক্রয় করে নিয়েছেন। তারা আল্লাহর রাস্তায় লড়াই করে। তারা শত্রুদের হত্যা করে, তারা নিজেরাও মারা যায়। তাওরাত, ইনজিল ও কুরআনে তিনি এই সত্য ওয়াদাতে অবিচল। আর কে রয়েছে আল্লাহ তাআলার চেয়ে অধিক ওয়াদা পূরণকারী! সুতরাং তোমরা আল্লাহ তাআলার সাথে যে লেনদেন করেছ তার জন্য সুসংবাদ গ্রহণ করো। আর অবশ্যই ইহা মহা সাফল্য।'¹
টিকা:
[১] সূরা হাশর, আয়াত-ক্রম: ১৯
[২] সূরা তাওবাহ, আয়াত-ক্রম: ৬৭
[১] সূরা বাকারা, আয়াত-ক্রম: ১৬
[১] সূরা বাকারা, আয়াত-ক্রম: ৮৬
[২] সূরা ইউনুস, আয়াত-ক্রম: ৪৫
[১] সূরা নাযিয়াত, আয়াত-ক্রম: ৪২-৪৬
[২] সূরা মুমিনূন, আয়াত-ক্রম: ১১২-১১৪
[৩] সূরা ত্বহা, আয়াত-ক্রম: ১০২-১০৪
[১] সূরা তাওবাহ, আয়াত-ক্রম: ১১১
📄 গুনাহ মানুষকে আল্লাহর নিয়ামত থেকে বঞ্চিত করে
গুনাহের উল্লেখযোগ্য আরেকটি ক্ষতি হলো, গুনাহের কারণে মানুষ আল্লাহ তাআলার বর্তমান ও ভবিষ্যত নিয়ামাত থেকে বঞ্চিত হয়। পাপ কাজ বান্দার কাছ থেকে আল্লাহ তাআলার উপস্থিত নিয়ামতকে দূর করে দেয়। আবার ভবিষ্যতে আল্লাহ তাআলার নিয়ামত অর্জন করার জন্য এবং বর্তমানের নিয়ামতকে ধরে রাখার জন্য আল্লাহ তাআলার আনুগত্যের চেয়ে কার্যকর কোনো মাধ্যম নেই। গুনাহগার বান্দা যখন আল্লাহর আনুগত্য ছেড়ে গুনাহে লিপ্ত হয় তখন তার তাৎক্ষণিক নিয়ামতসমূহ অরক্ষিত হয়ে পড়ে। কেননা, বান্দা আনুগত্যের দ্বারা আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে নিয়ামত লাভ করে থাকে। আর আল্লাহ তাআলা জগতের সকল জিনিস অর্জনের রাস্তা খোলা রেখেছেন, আবার অর্জিত জিনিস হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার মতো উপায়-উপকরণও তৈরি করেছেন। আল্লাহ তাআলার আনুগত্য হলো তার নিয়ামত অর্জনের পথ। আর রবের নাফরমানي হলো অর্জিত নিয়ামত হাতছাড়া হওয়ার কারণ, ভবিষ্যতের নিয়ামতের রাস্তা বন্ধের উপকরণ। আল্লাহ তাআলা যখন বান্দার নিয়ামতকে বহাল রাখার ইচ্ছা করেন, তখন তাকে আনুগত্যের সুযোগ তৈরি করে দেন। আর যখন তাকে নিয়ামত থেকে বঞ্চিত করে অপদস্থ করতে চান, তখন তার সামনে নাফরমানির রাস্তা খুলে দেন, আর বান্দাও নিয়ামত থেকে বঞ্চিত হতে আপন রবের অবাধ্যতায় মেতে ওঠে।
📄 গুনাহ বান্দা ও ফেরিশতাদের মাঝে দূরত্ব সৃষ্টি করে
গুনাহগার ব্যক্তি তার রক্ষাকারী ফিরিশতার তরফ থেকে কোনো প্রকারের সাহায্যপ্রাপ্ত হয় না। কারণ গুনাহের অন্যতম শাস্তি হলো, আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে বান্দার জন্য নিযুক্ত ফিরিশতা গুনাহের কারণে ওই বান্দা থেকে দূরে সরে যান। আর ফিরিশতার দূরে সরে যাওয়ার সুযোগে বান্দার নিকটে চলে আসে জগতের সবচেয়ে ক্ষতিকর ও নিকৃষ্ট জীব শয়তান।
মানুষ যদি সামান্য মিথ্যারও আশ্রয় নেয়, তাহলে তার সঙ্গে নিযুক্ত ফিরিশতা তার থেকে বহুদূরে সরে যান।
হাদীসে বর্ণিত হয়েছে-
إِذَا كَذَبَ الْعَبْدُ تَبَاعَدَ مِنْهُ الْمَلَكُ مِيْلاً مِّنْ نَّتَنِ رِيْحِهِ
'বান্দা যখন মিথ্যা বলে, তখন ফিরিশতারা সেই মিথ্যার কারণে সৃষ্ট মুখের দুর্গন্ধের কারণে দূরে চলে যান।।১৯
এক মিথ্যার কারণেই যদি আল্লাহ তাআলার পবিত্র সৃষ্টি ফিরিশতারা মানুষ থেকে এত দূরে সরে যান, তাহলে যে ব্যক্তি অবাধ্যতার জীবনে মিথ্যার চেয়েও আরো জঘন্য অপরাধে ব্যস্ত রয়েছে, তার জীবন থেকে ফিরিশতারা কী পরিমাণ দূরে থাকেন, চিন্তা করুন। নিশ্চয় শয়তান তখন তার জীবনের প্রতিটি পদে পদে, প্রতিটি শ্বাসে প্রশ্বাসে তার সঙ্গী হয়ে যায়। এক বুযুর্গ বলেছেন, 'বান্দা যখন কোনো কোনো পাপকাজে লিপ্ত হয় তখন জমিন আল্লাহ তাআলার দরবারে চিৎকার করে ফরিয়াদ করতে থাকে। ফিরিশতা তার কাছ থেকে দ্রুত সরে আল্লাহর দরবারে চলে যান এবং পাপিষ্ঠ ব্যক্তির নামে অভিযোগ দায়ের করেন।'
আরেকজন বুযুর্গ বলেন, 'প্রতিদিন সকালে বান্দার নিকট একজন ফিরিশতা ও শয়তান এগিয়ে আসতে থাকে। বান্দা যদি আল্লাহ তাআলার নাম উচ্চারণ করে, আল্লাহ তাআলার প্রশংসা করে এবং একত্ববাদের ঘোষণা দেয়, তাহলে ফিরিশতা শয়তানকে ভাগিয়ে দেন এবং বান্দার সারাদিনের দায়িত্ব নিজ কাঁধে তুলে নেন। আর যদি বান্দা আল্লাহ তাআলার নাম দিয়ে তার দিন শুরু না করে, দুনিয়ার কাজে ব্যস্ত হয়ে যায়, তাহলে ফিরিশতা চলে যান আর শয়তান তার সারাদিনের দায়িত্ব গ্রহণ করে।' বান্দা যখন গুনাহমুক্ত আনুগত্যময় জীবন যাপন করে, তখন ফিরিশতা তার সাথে সর্বদা লেগে থাকেন। ফিরিশতার সার্বক্ষণিক তত্ত্বাবধানে সে সমাজে অনুসরণীয় ব্যক্তিত্বে পরিণত হয়। সমাজের সর্বত্র তার প্রভাব বিস্তৃতি লাভ করে। তার গোটা জীবনের দায়ভার ফিরিশতারা গ্রহণ করে নেন। এমনকি তার মৃত্যুর সময়েও ফিরিশতারা তার সাথেই থাকেন। পুরুত্থানের দিনও সে ফিরিশতাদের সাহায্যপ্রাপ্ত হবে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-
إِنَّ الَّذِيْنَ قَالُوا رَبُّنَا اللَّهُ ثُمَّ اسْتَقَامُوا تَتَنَزَّلُ عَلَيْهِمُ الْمَلَائِكَةُ
أَلَّا تَخَافُوا وَلَا تَحْزَنُوا وَأَبْشِرُوا بِالْجَنَّةِ الَّتِي كُنْتُمْ تُوعَدُونَ - نَحْنُ أَوْلِيَاؤُكُمْ فِي الْحَيَوَةِ الدُّنْيَا وَفِي الْآخِرَةِ
'নিশ্চয় যারা ঈমান এনেছে এবং স্বীকারোক্তি দিয়েছে যে, আল্লাহ আমাদের পালনকর্তা, এরপর এই কথার উপর অবিচল থেকেছে, তাদের কাছে ফিরিশতারা এসে বলবেন, "তোমাদের কোনো ভয় নেই, কোনো দুঃখ নেই। আর তোমরা তোমাদের প্রতিশ্রুত জান্নাতের সুসংবাদ গ্রহণ করো। দুনিয়া ও আখিরাতে আমরা তোমাদের বন্ধু." [১]
আর যখন জগতের সবচেয়ে কল্যাণকামী ও সর্বোত্তম উপকারী মাখলুক নিষ্পাপ ফিরিশতাগণ বান্দার জীবনের রক্ষণাবেক্ষণ করে তখন তারা তাকে ঈমানের পথে দৃঢ়পদ রাখে, তাকে ঐশী ইলম দান করে এবং যাবতীয় কাজকর্মে তাকে শক্তিশালী করে। আল্লাহ তাআলা বলেন-
إِذْ يُوحِي رَبُّكَ إِلَى الْمَلَائِكَةِ أَنِّي مَعَكُمْ فَثَبِّتُوا الَّذِينَ آمَنُوا
'যখন আপনার প্রতিপালক ফিরিশতাদের নিকট এই মর্মে আদেশ প্রেরণ করেন যে, নিশ্চয় আমি তোমাদের সাথে আছি। সুতরাং যারা ঈমান এনেছে তোমরা তাদেরকে দৃঢ়পদ রাখো।'[২]
মৃত্যুর সময় এক ফিরিশতা বান্দাকে অভয় দিয়ে বলেন, 'তোমার কোনো ভয় নেই, কোনো দুঃখ নেই। তুমি আনন্দের সংবাদ গ্রহণ করো।' জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত, শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগের সময় ফিরিশতা তাকে কালিমার উপর স্থির রাখেন, কবরের প্রশ্নোত্তরের কঠিনতম পর্বে ফিরিশতা তার পাশেই থাকেন। এভাবেই নেক বান্দার জন্য আল্লাহ তাআলা জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই একজন করে ফিরিশতা নিযুক্ত করে দেন, আর নিযুক্ত ফিরিশতা বান্দার জীবনের প্রতিটি ধাপে তাকে অদৃশ্য থেকে সাহায্য করে কল্যাণের চূড়ান্ত পথে পৌঁছে দেন। হাদীসে বর্ণিত হয়েছে-
إِنَّ لِلْمَلَكِ بِقَلْبِ ابْنِ آدَمَ لَمَّةً، وَلِلشَّيْطَانِ لَمَّةٌ، فَلَمَّةُ الْمَلَكِ إِيعَادُ بِالْخَيْرِ وَتَصْدِيقُ بِالْوَعْدِ، وَلَمَّةُ الشَّيْطَانِ إِيعَادُ بِالشَّرِّ وَتَكْذِيبُ بِالْحَقِّ
‘বান্দার অন্তরে ফিরিশতার একটি প্রভাব থাকে আর শয়তানেরও কুমন্ত্রণা থাকে। ফিরিশতার প্রভাব হলো, ফিরিশতা বান্দার জন্য কল্যাণের পথ তৈরি করে দেন এবং নিজের কৃত ওয়াদা বাস্তবায়ন করেন। আর শয়তানের প্রভাব হলো, সে বান্দার সামনে অকল্যাণের রাস্তা খুলে দেয় এবং সত্যকে মিথ্যা প্রমাণিত করতে উঠেপড়ে লেগে যায়।’১
ফিরিশতা যখন নেককার বান্দাকে সঙ্গ দেন, তখন তিনি বান্দার মুখপাত্র হিসেবে কাজ করেন। বান্দার উপর আরোপিত যেকোনো কথার জবাব তিনিই প্রদান করেন। আর বান্দা যখন গুনাহে লিপ্ত থাকে তখন ফিরিশতা তার থেকে দূরে সরে যান। শয়তান তাকে সঙ্গ দেয়। তার মুখপাত্র হয়ে তার পক্ষ থেকে কথা বলে। ফলে গুনাহগার ব্যক্তির মুখে অশ্লীল আর মিথ্যা কথার প্রবণতা বেড়ে যায়।
হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, শান্তি আর সৌহার্দ্যের কথা উচ্চারিত হয় উমরের যবানে। সাহাবীরা কারো মুখে কল্যাণের কোনো কথা শুনলে বলতেন, ‘এই চমৎকার কথার ভাব ও মর্ম ফিরিশতা তার অন্তরে জাগ্রত করেছেন।’ আর যদি কারো মুখে অকল্যাণের কথা উচ্চারিত হতো, তাহলে তাঁরা বলতেন, ‘এই লোকের অন্তরে শয়তান কুমন্ত্রণা দিয়েছে তাই তার জিহ্বায় এসব গর্হিত কথা উচ্চারিত হয়েছে।’
অনুগত বান্দার পক্ষে ফিরিশতা কথা বলেন। কোনো গুনাহগার ব্যক্তিও যদি তার সাথে তর্কে লিপ্ত হয়, তাহলে সে যতক্ষণ চুপ থাকে ততক্ষণ ফিরিশতা তার পক্ষ থেকে তর্কের উত্তর দিতে থাকেন। একবার নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সামনে এক লোক আবু বাকর রাদিয়াল্লাহু আনহুকে গালমন্দ করছিল। আবু বাকর তখন কথা না বলে চুপ করে থাকেন। কিন্তু একপর্যায়ে তিনি লোকটির একটি কথার উত্তর দিয়ে ফেলেন। তখন নবীজি ইরশাদ করেন-
كَانَ الْمَلَكُ يُنَافِحُ عَنْكَ، فَلَمَّا رَدَدْتَ عَلَيْهِ جَاءَ الشَّيْطَانُ فَلَمْ أَكُنْ لِأَجْلِسَ
'একজন ফিরিশতাই তো তোমার পক্ষ থেকে তাকে তার কথার উত্তর দিচ্ছিল। যখন তুমি কথা বলে উঠলে তখন এই মজলিসে শয়তান এসে হাজির হয়েছে। তাই আমি এখন আর এখানে বসব না।' [১]
কোনো মুসলিম যখন অপর মুসলিমের জন্য দুআ করে, তখন একজন ফিরিশতা তার দুআয় 'আমীন আমীন' বলতে থাকেন এবং দুআকারীর জন্য এই বলে দুআ করেন, 'আল্লাহ তাআলা তোমাকেও অনুরূপ জিনিস দান করুন।'
বান্দা যখন সূরা ফাতিহা শেষ করে, ফিরিশতাগণ তখন 'আমীন' বলেন।
কুরআন-সুন্নাহর অনুসারী কোনো বান্দা যখন ভুলক্রমে কোনো অপরাধ করে ফেলে, আরশের ফিরিশতাগণ তখন তার জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা করেন।
নেককার বান্দা যখন ওযু করে ঘুমায়, তার শিয়রে একজন ফিরিশতা সারা রাত দাঁড়িয়ে থাকেন।
এভাবে নেককার বান্দার প্রতিটি কাজেই অদৃশ্য থেকে একজন ফিরিশতা সাহায্য করেন। তার প্রতিটি পদক্ষেপের অন্তরালে ফিরিশতার উপস্থিতি থাকায় সহজেই সে তার উদ্দেশ্য পূরণ করতে পারে। ফিরিশতার পরোক্ষ সহযোগিতায় বান্দার সামনে গুনাহের পথ রুদ্ধ হয়ে যায়। ক্ষতিকর ও বিপজ্জনক ক্ষেত্র সমূহ ডিঙাতে ফিরিশতা তাকে সর্বোচ্চ সাহায্য করেন। তার অজান্তেই সকল সমস্যা, অসুবিধা, কষ্ট, ক্লেশ দূর করে দেন। এভাবে নেককার বান্দাদেরকে ফিরিশতাগণ তাঁদের অতিথি হিসেবে বরণ করে নিয়ে তাদের সম্মান, মর্যাদা, সুবিধা-অসুবিধার প্রতি সজাগ দৃষ্টি রাখেন।
আর বান্দা যখন গুনাহ করে, ফিরিশতার পক্ষে তখন তার সাথে থাকা কষ্টকর হয়ে যায়। কষ্টের কারণে তিনি তাকে বদ-দুআ দেন, বলেন, 'আল্লাহ যেন তোমাকে কোনো ভালো প্রতিদান না দেন।'
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এক সাহাবী বলেছেন, 'তোমাদের সাথে সর্বদা আল্লাহ তাআলার এমন মাখলুক থাকে, যারা কখনো তোমাদের ছেড়ে যায় না। সুতরাং তোমরা তাদেরকে সম্মান কোরো এবং তাদের সাথে শালীনতাপূর্ণ আচরণ কোরো।'
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-
وَإِنَّ عَلَيْكُمْ لَحَافِظِينَ - كِرَامًا كَاتِبِينَ - يَعْلَمُونَ مَا تَفْعَلُونَ
'আর অবশ্যই তোমাদের জন্য তত্ত্বাবধায়ক নিযুক্ত রয়েছে। তারা সম্মানিত। তারা তোমাদের আমল লিপিবদ্ধ করেন। তারা তোমাদের কর্মকাণ্ডসমূহ খুব ভালো করেই জানেন।'
টিকা:
[১] তিরমিযী, হাদীস-ক্রম: ১৯৭২
[১] সূরা হা-মীম সিজদাহ, আয়াত-ক্রম: ৩০-৩১
[২] সূরা আনফাল, আয়াত-ক্রম: ১২
[১] তিরমিযী, হাদীস-ক্রম: ২৯৮৮
[১] আবু দাউদ, হাদীস-ক্রম: ৪৮৯৬
[১] সূরা ইনফিতার, আয়াত-ক্রম: ১০-১২