📄 গুনাহ মানুষকে হিতাহিত জ্ঞানশূন্য করে ফেলে
গুনাহের কারণে মানুষ নিজের ভালো-মন্দ বুঝতেও অক্ষম হয়ে যায়। প্রতিটি মানুষেরই জীবন-চলার পথে নানা প্রতিকূল ও অনুকুল অবস্থায় নিজের ভালো-মন্দ নিজেরই বুঝে নিতে হয়। যে ব্যক্তি এ ব্যাপারে সবচেয়ে বেশি পারদর্শী তাকেই অধিক বুদ্ধিমান ও জ্ঞানী বলা হয়। নিজের জীবনের ভালো দিকগুলো চিনে খুঁজে খুঁজে নিজেকে সেই পথে চালানো কিংবা জীবনের জন্য ক্ষতিকর সকল বিষয় থেকে সচেতনভাবে বেঁচে থাকার জ্ঞান ও যোগ্যতার দ্বারাই মানুষের স্তরে পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। গুনাহের কারণে মানুষ এই জ্ঞান ও যোগ্যতা থেকে বঞ্চিত হয়ে যায়।
একজন গুনাহগার ব্যক্তি যখন বিপদগ্রস্ত হয়, তখন তার নফস তাকে সাহায্য করতে পারে না। তাকে বিপদ থেকে উদ্ধার করার পরিবর্তে আরো বিপদগামী করে তোলে। অন্তর গুনাহের কারণে রুগ্ন হয়ে যায়। লাগাতার পাপের সাগরে ভেসে বেড়াতে বেড়াতে বান্দা যখন অসহায় হয়ে যায় বা কোনো বিপদে পড়ে, তখনও তার অন্তর তার ডাকে সাড়া দেয় না। বিপদ থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার মতো সামান্য খড়কুটোও সে হাতের নাগালে পায় না।
গুনাহে জর্জরিত অন্তর দিশেহারা হয়ে যায়। নিশ্চিন্ত, ভাবনাহীন অন্তরের প্রশান্তি তার জীবনে অধরাই থেকে যায়। জীবনের প্রকৃত সুখ সে কখনো অনুভব করতে পারে না। মৃত ব্যক্তির মতো বেঁচে থাকে এই পার্থিব জগতে।
গুনাহগার বান্দা যখন বিপদগ্রস্ত হয়, সে আল্লাহ তাআলার উপর তাওয়াক্কুল করতে পারে না। আল্লাহর উপর ভরসা করতে তার মন ও দেহ সায় দেয় না। মুসীবতের সময় আল্লাহমুখী হওয়া, কাকুতি-মিনতি করে মহান রবের সাহায্য প্রার্থনা করার কাজে অন্তর তাকে বাধা দিতে থাকে। আল্লাহ তাআলার নিকট সাহায্য প্রার্থনা করে দুআ করলেও তার অন্তর প্রার্থনার সময় উদাস ও বেখেয়ালি থাকে। তার দুআর মাঝে প্রাণ থাকে না, হৃদয় থেকে আবেগময় একনিষ্ঠ দুআ সে করতে পারে না। এমনকি মৃত্যুর সময় সে তার করুণ পরিণতি উপলব্ধি করা সত্ত্বেও মহান রবের দিকে ফিরে আসতে পারে না। জীবনের সব ভুল-ত্রুটি বোঝার পরও তাওবার জন্য তার অন্তর সায় দেয় না। তাওবার বাক্য তার মুখে আসে না। এমনকি মৃত্যুকালীন যন্ত্রণার সময়ও যদি তার পাশ থেকে কেউ তাকে 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' বলার জন্য উদ্বুদ্ধ করে, তবু সে মুখ দিয়ে পবিত্র কালিমা উচ্চারণ করতে পারে না। এমন অসংখ্য ঘটনা বিভিন্ন কিতাবে পাওয়া যায় যে, মৃত্যুর আগ মুহূর্তে যখন কালিমা পড়ার জন্য পাশ থেকে কেউ উদ্বুদ্ধ করতে থাকে, তখন মুখ থেকে কালিমা উচ্চারিত হয় না। দুনিয়ার যে কাজে সে লিপ্ত থাকে সে কাজের জন্যই তার অন্তরে হাহাকার তৈরি হয়। ফলে সেই মুহূর্তে তাকে যখন কালিমার তালকীন[১] করার কথা, তখন সে বলতে থাকে—
হায় আমার ব্যবসা!
হায় আমার দোকান!
হায় আমার প্রতিষ্ঠানের কী হবে!
হায় আমার দলের কী হবে!
এক বুযুর্গ তাঁর এক ব্যবসায়ী আত্মীয়ের মৃত্যুকালীন ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, 'তাকে যখন কালিমার তালকীন করা হচ্ছিল, তখন সে বলতে লাগল— "এই পণ্যটির এই দাম, এই পণ্যটি অত্যন্ত ভালো, এটা নিতে পারেন...।"'
আবার কখনো কখনো মৃত্যুশয্যায় শায়িত ব্যক্তিকে কালিমার তালকীন করা হয় ঠিকই, সে নিজ থেকেও পড়তে আগ্রহী হয়, কিন্তু অদৃশ্য কোনো বাধায় সে আটকে যায়। তার মুখে জড়তা চলে আসে। মুখ দিয়ে আল্লাহ্ শব্দ উচ্চারণ সে আর করতে পারে না। এক ব্যক্তির ঘটনা বর্ণিত আছে, তার মৃত্যুশয্যায় কালিমার তালকীন করা হলে সে বলে, 'আমি তো লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলতে চাই, কিন্তু আমার জিহ্বার জড়তা আমাকে উচ্চারণ করতে দিচ্ছে না।'
আল্লাহ্ আমাদের সবাইকে হেফাযত করুন! এই করুণ মৃত্যুই গুনাহ থেকে মানুষকে বিরত রাখার জন্য যথেষ্ট। তবু মানুষ গুনাহের দিকে ঝুঁকে যায়। স্বাচ্ছন্দ্যে পাপকাজে জড়িয়ে পড়ে। সুস্থ মস্তিষ্কে, নিরাপদ ও নিশ্চিন্ত মুহূর্তে সে পাপাচারে লিপ্ত হয়। মহান রবের আনুগত্য করার অবারিত ও অফুরন্ত সুযোগ থাকা সত্ত্বেও সে আল্লাহর অবাধ্য হয়। গুনাহের প্রতি অন্ধ ভালোবাসায় মগ্ন হয়। ফলে যখন মৃত্যুর যন্ত্রণায় সে কাতর হয়ে যায় তখন গুনাহের অভ্যাস থেকে আর বের হতে পারে না। সুস্থ ও স্বাভাবিক অবস্থায় সে যেই গুনাহের কুমন্ত্রণা থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারেনি, মৃত্যুর যন্ত্রণায় কাতর মুহূর্তে সেই গুনাহের বিষজাল ছিঁড়ে সে বেরিয়ে আসতে পারে না। জীবনের এই অন্তিম সময়ে শয়তানও তার সমস্ত শক্তি প্রয়োগ করে গুনাহগার বান্দার মুক্তির সকল পথ ও উপকরণকে বন্ধ করে দিতে তৎপর হয়ে যায়। আল্লাহর দরবারে উপস্থিত হওয়ার শেষ সময়টুকু শয়তান বান্দাকে নিজের অনুগত করে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করে। তাওবার সকল রাস্তা গুনাহগার ব্যক্তির থেকে ক্রমশই দূর থেকে দূরে সরে যেতে থাকে। আল্লাহ তাআলার ইরশাদ-
يُثَبِّتُ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا بِالْقَوْلِ الثَّابِتِ فِي الْحَيَوَةِ الدُّنْيَا وَفِي الْآخِرَةِ وَيُضِلُّ اللَّهُ الظَّالِمِينَ وَيَفْعَلُ اللَّهُ مَا يَشَاءُ
'আল্লাহ তাআলা মুমিন বান্দাদেরকে শক্তিশালী কালিমা দ্বারা দৃঢ়পদ রাখেন। জালিমদেরকে পথভ্রষ্ট করেন। আর আল্লাহ তাআলা যা ইচ্ছা তাই করেন।'
সুতরাং আল্লাহ তাআলা যার অন্তরকে গাফিল করে দিয়েছেন, যার কাজকর্ম শরীয়তের সীমা অতিক্রম করে ফেলে, সে কীভাবে মঙ্গলজনক পরিণতি আর উত্তম উপসংহারের ব্যাপারে নিশ্চিন্ত থাকতে পারে! যে ব্যক্তি তার মনোবাসনার পূজা করে, মহান রবের আনুগত্য থেকে দূরে থাকে, যার মুখে সারাজীবন মহান রবের নাম উচ্চারিত হয়নি, সে তার জীবনের অন্তিম সময়েও আল্লাহ তাআলাকে স্মরণ করতে অক্ষম হবে। তার পঙ্কিল যবানে মহান রবের পবিত্র নাম উচ্চারণ করার সৌভাগ্য সে লাভ করতে ব্যর্থ হবে।
অথচ মুত্তাকী ও আল্লাহভীরু বান্দারাও জীবনের অন্তিম মুহূর্তের ভয়ে কাবু হয়ে আছেন। আর গুনাহগার ও পাপিষ্ঠরা যেন নিজেদের বাধাহীন জীবনের নিরাপত্তার কোনো নিশ্চয়তার ওয়াদা লাভ করেছে আল্লাহ তাআলার তরফ থেকে।
তাদের উদ্দেশ্যেই কুরআনুল কারীমের এই আয়াত-
أَمْ لَكُمْ أَيْمَانُ عَلَيْنَا بَالِغَةٌ إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ إِنَّ لَكُمْ لَمَا تَحْكُمُونَ - سَلْهُمْ أَيُّهُمْ بِذَلِكَ زَعِيمٌ
'নাকি তোমরা আমার থেকে কিয়ামত দিবস পর্যন্ত স্থায়ী কোনো শপথ নিয়েছ, তোমরা যেমন চাও তোমাদের জন্য তাই থাকবে? হে নবী! আপনি জিজ্ঞেস করুন, এ ব্যাপারে তাদের দায়িত্বশীল কে?'[১]
হাফিয আবু মুহাম্মাদ আবদুল হক ইবনু আবদির রহমান আল-আশবিলী বলেন, 'মানব-জীবনের করুণ পরিণতির অনেকগুলো কারণ ও উপকরণ আছে (আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে জীবনের করুণ পরিণতি থেকে রক্ষা করুন।)। সেগুলো হলো-
১. মানুষ জগত-সংসারের প্রতি মোহগ্রস্ত হয়ে দুনিয়ার পেছনে ছুটতে থাকবে।
২. পরকাল-ভাবনা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে।
৩. আল্লাহ তাআলার অবাধ্যতা ও নাফরমানিতে দুঃসাহসিকতার পরিচয় দেবে।
কখনো বান্দা নির্দিষ্ট গুনাহের দিকে ধাবিত হয়, সেই সাথে কোনো এক বিষয়ে আল্লাহ তাআলার নাফরমানি করে এবং কোনো এক ক্ষেত্রে এসে আল্লাহ তাআলার প্রতি সে দুঃসাহসমূলক আচরণ করে থাকে। এর পরিণতিতে সে তার অন্তরের নিয়ন্ত্রণ শয়তানের হাতে ন্যস্ত করে। তার বিবেক-বুদ্ধি লোপ পেয়ে যায়। অন্তর্দৃষ্টি নষ্ট হয় এবং জীবনে একটি অন্তরায় সৃষ্টি হয়। তখন কোনো নসীহত তার কোনো কাজে আসে না। এ অবস্থাতেই কখনো তার মৃত্যু চলে আসে। বহু দূর থেকে তাওবার কোনো আহ্বান হয়তো তাকে হাতছানি দেয়, কিন্তু তাওবা তার নসীবে জোটে না।
আবু মুহাম্মদ আল-আশবিলী এ বিষয়ক একটি ঘটনা উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, 'খলীফা নাসিরের নিকটস্থ কিছু লোক আমাকে নাসিরের মৃত্যুকালীন অবস্থার বর্ণনা দিল। তারা বলল, নাসিরের যখন মৃত্যুর সময় ঘনিয়ে আসে, তখন তার শিয়রে তার সন্তান বসে তাকে কালিমা পাঠ করতে উদ্বুদ্ধ করছিল। কিন্তু সে কালিমা পাঠ না করে জিজ্ঞেস করে, "আমার গোলাম কোথায়?” তার ছেলে আবারও তাকে কালিমার তালকীন করে। কিন্তু সে তার গোলামের কথা জানতে চায়। এভাবে এক পর্যায়ে সে সংজ্ঞাহীন হয়ে যায়। জ্ঞান ফিরে এলে সে আবার তার গোলামের কথা জানতে চায়। এরপর সে তার ছেলেকে বলে, "শুনে রাখো! আমি তোমার তরবারি চালানোর নৈপুণ্য দেখেছি। তুমি দ্রুত তরবারি নিয়ে লড়াইয়ে বের হও। একথা বলেই সে কালিমা না পড়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে.""
আশবিলী এমন আরেকজনের ঘটনা উল্লেখ করে বলেন, 'মৃত্যুর সময় ঐ ব্যক্তিকে বলা হলো, "তুমি কালিমা পড়ো।” সে কালিমা না পড়ে বলতে লাগল, "আমার অমুক বাড়ির এই জায়গাটা সংস্কার করা দরকার, ঐ বাগানে এই কাজ করা দরকার.""
এরকম আরেক লোকের কথা বর্ণিত আছে; মৃত্যুকালীন যন্ত্রণায় যখন তাকে কালিমার তালকীন করা হলো, তখন সে এক তরুণীর প্রেমে বিভোর হয়ে তাকে নিয়ে কবিতা আবৃত্তি করতে লাগল।
সুফিয়ান সাওরী একবার রাতভর কান্না করলে লোকেরা জিজ্ঞেস করল, 'আপনার সারারাতের কান্না কি শুধুই গুনাহের ভয়ে?' সুফিয়ান সাওরী তখন হাতে মাটি নিয়ে বললেন, 'গুনাহ তো এই মাটির থেকে তুচ্ছ। আমি তো সারারাত কেঁদেছি জীবনের করুণ পরিণতির আশঙ্কায়।'
ইমাম আহমাদ আবু দারদা রাদিয়াল্লাহু আনহু'র মৃত্যুকালীন অবস্থা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, 'যখন তিনি মৃত্যুশয্যায় শায়িত ছিলেন এবং মৃত্যুযন্ত্রণায় কাতর হয়ে বারবার জ্ঞান হারিয়ে ফেলছিলেন, তখন তিনি আল্লাহ তাআলার এই আয়াত তিলাওয়াত করছিলেন-
وَنُقَلِّبُ أَفْئِدَتَهُمْ وَأَبْصَارَهُمْ كَمَا لَمْ يُؤْمِنُوا بِهِ أَوَّلَ مَرَّةٍ وَنَذَرُهُمْ فِي طُغْيَانِهِمْ يَعْمَهُونَ
'আর আমি ঘুরিয়ে দেব তাদের অন্তর আর চক্ষুকে, যেভাবে তারা প্রথমবার ঈমান আনেনি। এবং আমি তাদেরকে তাদের অবাধ্যচারিতায় উদ্ভ্রান্ত অবস্থায় ছেড়ে দেব।'১৯
আবদুল হক কর্তৃক লিখিত আল-আকিবাহ (পরিণতি) গ্রন্থে উল্লেখ আছে, এক ব্যক্তি সর্বদা মসজিদে আযান ও নামাযের সময় উপস্থিত থাকত। তার চালচলনে আল্লাহ তাআলার পূর্ণ আনুগত্য ও একনিষ্ঠ ইবাদাতের ছাপ ছিল। একদিন সে মিনারের চূড়ায় উঠল আযান দেওয়ার উদ্দেশ্যে। এমন সময় মসজিদের পার্শ্ববর্তী এক খ্রিষ্টান-বাড়ির মেয়ের দিকে তার দৃষ্টি পড়ে যায়। খ্রিষ্টান মেয়ের সৌন্দর্যে সে বিমোহিত হয়ে আযান দেওয়া বাদ দিয়ে মিনার থেকে নেমে সোজা মেয়ের বাড়িতে গিয়ে উপস্থিত হয় এবং তাকে বিয়ের প্রস্তাব দেয়। মেয়েটি তাকে জানিয়ে দেয়, 'আমার বাবা আমাকে কোনো মুসলমানের কাছে বিয়ে দিবেন না। তুমি খ্রিষ্টান হলেই তবে আমাকে বিয়ে করতে পারবে।' মেয়ের সৌন্দর্যের ঘোরে লোকটি ইসলাম ত্যাগ করে খ্রিষ্টান হয়ে যায়। কিন্তু যেদিন সে ধর্মান্তরিত হয়ে খ্রিষ্টান হয়, সেদিনই সে ঘরের ছাদ থেকে পড়ে মারা যায়। এভাবে সে সারাজীবন আল্লাহ তাআলার অনুগত হয়ে জীবন যাপন করেও খ্রিষ্টান অবস্থায় ইন্তিকাল করে তার সারাজীবনের সকল পুণ্য আর সাওয়াব থেকে বঞ্চিত হয়েছে।
এ কারণেই আমাদের পূর্ববর্তী বুযুর্গ, পীর-মাশায়েখগণ জীবনের মন্দ অবসানের ব্যাপারে সবসময় চিন্তিত থাকতেন। উত্তম জীবনাবসানের জন্য আল্লাহ তাআলার নিকট দুআ ও রোনাজারি করতেন।
টিকা:
[১] তালকীনের নিয়ম হলো, মৃত্যুশয্যায় শায়িত ব্যক্তির পাশ থেকে কেউ আওয়াজ দিয়ে কালিমা পাঠ করে তাকে শোনাতে থাকবে, তাকেও কালিমা পড়ার জন্য উদ্বুদ্ধ করতে থাকবে। তবে কালিমা পড়ার জন্য তাকে সরাসরি আদেশ করবে না। মৃত্যুচিন্তায় বা জাগতিক কোনো পেরেশানিতে হয়তো সে কালিমা পড়তে অস্বীকার করে বসতে পারে, এবং এভাবে নিকৃষ্ট অবস্থায় তার মৃত্যু হতে পারে। তাই তাকে কালিমা পাঠের জন্য আদেশ করা যাবে না। বরং উচ্চারণ করে কালিমা পাঠ করে তাকে শোনাতে হবে।
[১] সূরা ইবরাহীম, আয়াত-ক্রম: ২৭
[১] সূরা কলম, আয়াত-ক্রম: ৩৯, ৪০
[১] সূরা আনআম, আয়াত-ক্রম: ১১০
📄 গুনাহ মানুষের অন্তরকে অন্ধ করে দেয়
গুনাহের অন্যতম আরেকটি দুনিয়াবি শাস্তি হলো, পাপিষ্ঠ ব্যক্তির অন্তর অন্ধ হয়ে যায়। গুনাহের মাত্রা বেশি হলে চর্মচক্ষু অন্ধ না হলেও হৃদয়ের দৃষ্টিশক্তি দুর্বল হয়ে যায়। আর অন্তর দৃষ্টিহীন বা দুর্বল হয়ে গেলে হিদায়াতের পথও সে খুঁজে পায় না। হিদায়াতের পথে চলার মতো কোনো নির্দেশনা সে পায় না।
মানুষের জীবন দুটি যোগ্যতার মাধ্যমে উন্নতি লাভ করে。
* মিথ্যা থেকে সত্যকে আলাদা করতে পারার যোগ্যতা。
* সত্যকে মিথ্যার উপর প্রাধান্য দিয়ে সত্য গ্রহণ করতে পারার যোগ্যতা。
এই দুই যোগ্যতার দ্বারাই আল্লাহ তাআলার নিকট বান্দার মর্যাদা ও স্থান নির্ধারিত হয়। আল্লাহ তাআলা এই দুই যোগ্যতার কারণে নবীদের প্রশংসা করে ইরশাদ করেন-
وَاذْكُرْ عِبَادَنَا إِبْرَاهِيمَ وَإِسْحَاقَ وَيَعْقُوبَ أُولِي الْأَيْدِي وَالْأَبْصَارِ
'আর স্মরণ করুন, হাত ও দৃষ্টির অধিকারী আমার বান্দা ইবরাহীম, ইসহাক ও ইয়াকুবের কথা।'১
আয়াতে হাত দ্বারা সত্যকে মিথ্যার উপর প্রাধান্য দেওয়া ও সত্য বাস্তবায়ন করাকে বোঝানো হয়েছে। আর দৃষ্টি অর্থ দ্বীন ও ধর্মের দৃষ্টি-অর্থাৎ সত্যকে মিথ্যা থেকে আলাদা করতে পারার মতো অন্তর্দৃষ্টি। উল্লিখিত আয়াতে আল্লাহ তাআলা সত্য অনুধাবনের যোগ্যতা এবং কাজ-কর্মে সত্যকে প্রতিষ্ঠা করতে পারার যোগ্যতার কারণে তাঁর নবীদের প্রশংসা করেছেন।
এই দুই যোগ্যতা অর্জনকে কেন্দ্র করে মানুষ চার শ্রেণিতে বিভক্ত।
যারা সত্যকে পুরোপুরি অনুধাবন করে প্রতিষ্ঠা করতে সচেষ্ট হয় এবং পূর্ণ সফলতা লাভ করে। তারা আল্লাহ তাআলার নিকট সম্মানিত ও মর্যাদাবান থাকে। আল্লাহর দরবারে বিশেষ পুরষ্কারে ভূষিত হয়।
যারা সত্যকে অনুধাবন করতে পারে না। সত্য প্রতিষ্ঠা করারও কোনো শক্তি কিংবা মনোবাসনা রাখে না। পৃথিবীতে এই শ্রেণির মানুষের সংখ্যা বেশি। এরা দুর্বল চিত্তের অধিকারী হয়। লজ্জা আর অপদস্থতা এদের জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকে।
তৃতীয় শ্রেণির লোকেরা সত্যকে অনুধাবন করতে পারে। সত্যকে পুরোপুরি মেনে নেয়। কিন্তু দুর্বলতার কারণে তারা সত্যকে প্রতিষ্ঠা করতে অক্ষম থাকে। সত্যের দিকে মানুষকে আহ্বান করতে ব্যর্থ হয়। দুর্বল মুমিন বান্দাগণ এই শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত। এজন্যই আল্লাহ তাআলার নিকট দুর্বল মুমিনের তুলনায় শক্তিশালী মুমিন উত্তম।
চতুর্থ শ্রেণির লোকেরা সত্য প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ও সচেষ্ট থাকে। হকের ব্যাপারে তারা আন্তরিক হয়। তবে তাদের সত্য অনুধাবনের যোগ্যতা কম কিংবা অপর্যাপ্ত হয়। তারা সত্যিকারের নেককার ও দ্বীন বিষয়ে পারদর্শী জ্ঞানীদেরকে চিনতে পারে না। আল্লাহ তাআলার দ্বীনের প্রকৃত ধারক-বাহক আর শয়তানের অনুচরদের মাঝে পার্থক্য করতে ব্যর্থ হয়। মরীচিকার দিকে ছুটে যায় পানির আশায়। কালো কয়লাকেও আজওয়া খেজুর মনে করে সংগ্রহ করতে থাকে। আবার উপকারী ওষুধকে বিষ মনে করে দূরে থাকে। এই শ্রেণির লোকেরা দ্বীন ও ধর্মের নেতৃত্ব দেওয়ার যোগ্যতা রাখে না। উল্লিখিত প্রথম শ্রেণির লোক ব্যতীত দ্বীন ও ধর্মের নেতৃত্ব দেওয়ার যোগ্যতা মূলত কারোরই নেই।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-
وَجَعَلْنَا مِنْهُمْ أَئِمَّةً يَهْدُونَ بِأَمْرِنَا لَمَّا صَبَرُوا وَكَانُوا بِآيَاتِنَا يُوقِنُونَ
'আর তারা যেহেতু ধৈর্যধারণ করেছে, তাই আমি তাদের মধ্য থেকে নিযুক্ত করেছিলাম এমন শাসকবর্গ, যারা আমার আদেশে দিকনির্দেশনা দিত। আর তারা ছিল আমার আয়াতের প্রতি দৃঢ় বিশ্বাসী।।'[১]
নেতৃত্বের জন্য আল্লাহ তাআলা ধৈর্য ও দৃঢ় বিশ্বাসের শর্ত দিয়েছেন।[২]
যারা ধৈর্য ধারণ করবে ও মহান রবের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করবে, আল্লাহ তাআলা তাদেরকে ক্ষতিগ্রস্ত বান্দাদের কাতার থেকে আলাদ রাখবেন। আল্লাহ তাআলা সময়ের কসম করে ইরশাদ করেন-
وَالْعَصْرِ - إِنَّ الْإِنْسَانَ لَفِي خُسْرٍ - إِلَّا الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ وَتَوَاصَوْا بِالْحَقِّ وَتَوَاصَوْا بِالصَّبْرِ
'শপথ সময়ের! নিশ্চয় মানবজাতি মহাক্ষতির মধ্যে রয়েছে। শুধুমাত্র তারা ব্যতীত, যারা ঈমান এনে নেক কাজ করেছে এবং পরস্পর সত্যের প্রতি ওসীয়ত করে ও ধৈর্যধারণের তাগিদ দেয়।'[৩]
সৌভাগ্যবান বান্দারা আল্লাহর প্রতি ঈমান আনার দ্বারা সত্যকে শুধু উপলদ্ধিই করেনি বরং তারা সত্য প্রতিষ্ঠার প্রতি সচেষ্ট থেকেছে, একে অন্যকে ধৈর্যধারণ ও সৎকাজের আদেশ করেছে। কুরআনুল কারীমে এসকল অনুগত বান্দা ব্যতীত অন্য সবাইকে ক্ষতিগ্রস্ত বলে অভিহিত করা হয়েছে। এই আয়াত নিয়ে চিন্তা করলে স্পষ্টই বোঝা যায়, গুনাহ মানুষের অন্তর্দৃষ্টি নষ্ট করে দেয়, গুনাহগার ব্যক্তি তখন প্রকৃত সত্য বুঝতে ব্যর্থ হয়। তার ধৈর্য আর সহিষ্ণুগুণ লোপ পায়।
চরিত্রের অবনতিতে তার সত্য অনুধাবনের ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায়। মিথ্যা ও অসাড় কাজে তার মেধা স্বাচ্ছন্দ্যে ব্যবহৃত হয়। সে মিথ্যাকে সত্য মনে করে এবং এর অনুসরণ করতে থাকে। ভালোকে মন্দ আর মন্দকে ভালো মনে করতে থাকে। তার জীবনের গতি পাল্টে যায়। অবিনশ্বর জগত আর মহান রবের দিকে ছুটে চলার পরিবর্তে সে পার্থিব জীবনের ক্ষণজন্মা ভোগ-বিলাসে মত্ত থাকে। আল্লাহ তাআলা ও তাঁর নিদর্শনাবলির পরিবর্তে সে দুনিয়ার মোহে বিভোর হয়ে যায়। শেষ-বিচারের দিন জীবনের হিসাব দেওয়ার প্রস্তুতি ছেড়ে দিয়ে উদ্দেশ্যহীন ভবঘুরে জীবনের জোয়ারে গা ভাসায়।
গুনাহের কারণে মানুষের জীবনের এই আমূল পরিবর্তনই পাপাচারের শাস্তির জন্য যথেষ্ট। লক্ষ্য-উদ্দেশ্যহীন, ভুলে ভরপুর এমন করুণ জীবনের দিকে একটু খেয়াল করলে একজন গুনাহগার ব্যক্তি তার গুনাহ থেকে ফিরে আসতে পারত।
অপর দিকে আল্লাহ তাআলার আনুগত্য বান্দার অন্তরকে আলোকিত করে। হৃদয়কে করে প্রস্ফুটিত। অন্তর পবিত্র, পরিচ্ছন্ন ও কুলীন হয়। নেক কাজ করলে বান্দার অন্তর এক বিশেষ নূরে ঝলমল করতে থাকে। তখন তার অন্তর যেন স্বচ্ছতা প্রতিফলনের আয়না হয়ে যায়। উপরন্তু অনুগত বান্দার হৃদয়ের আলোতে অন্যরাও আলোকিত হতে থাকে। অন্তরের উপচে-পড়া নূর তার চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে। শয়তান তার থেকে দূরে থাকে। মহান রবের আনুগত্যের এই নূরকে শয়তান প্রচণ্ড ভয় পায়। আসমানের ফিরিশতাদের নূর দ্বারা শয়তান যেমন ধরাশায়ী হয়, মুমিন বান্দার অন্তরের নূরের বিচ্ছুরণও তাকে ভষ্ম করে দেয়। শয়তান এই নূরের জ্যোতিতে মুখ থুবড়ে পড়ে সাহায্যের জন্য তার সহচরদের ডাকাডাকি করে। শয়তানের অনুচরেরা ভিড় জমিয়ে ফেলে তার পাশে।
فَيَا نَظْرَةً مِنْ قَلْبِ حُرِّ مُنَوَّرٍ ... يَكَادُ لَهَا الشَّيْطَانُ بِالنُّورِ يُحْرَقُ
'মুমিন বান্দার হৃদয়ের আলো-উষ্ণতা কতই না প্রবল! অভিশপ্ত শয়তানও আনুগত্যের আলোর বিচ্ছুরণে ভস্ম হয়ে যায়।'
আল্লাহর আনুগত্যের বরকতে মুমিন বান্দার অন্তর শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে সুরক্ষিত থাকে। শয়তানও মুমিন বান্দাদেরকে ছেড়ে দিয়ে গুনাহগার বান্দার অন্তরে জেঁকে বসে। পাপিষ্ঠ ব্যক্তির অন্তরকে সে নিজের আবাসস্থল বানিয়ে নেয়। প্রতিদিন শয়তান তার প্রতি নিজেকে উৎসর্গ করে অভিনন্দন জানিয়ে বলে-
قَرِينُكَ فِي الدُّنْيَا وَفِي الْحَشْرِ بَعْدَهَا ... فَأَنْتَ قَرِينٌ لِي بِكُلِّ مَكَانِ
فَإِنْ كُنْتَ فِي دَارِ الشَّقَاءِ فَإِنَّنِي ... وَأَنْتَ جَمِيعًا فِي شَقًّا وَهَوَانِ
'সর্বত্রই তুমি আমার সঙ্গী। পৃথিবীতে যেমন, হাশরের ময়দানেও আমরা একে অপরের সঙ্গী থাকব। তুমি যদি দুর্ভাগ্যময় জীবনে চলে যাও, তাহলে আমিও তোমার সাথে পরকালে হতভাগা আর বঞ্চিত থাকব।'
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-
وَمَنْ يَعْشُ عَنْ ذِكْرِ الرَّحْمَنِ نُقَيِّضْ لَهُ شَيْطَانًا فَهُوَ لَهُ قَرِينٌ - وَإِنَّهُمْ لَيَصُدُّونَهُمْ عَنِ السَّبِيلِ وَيَحْسَبُونَ أَنَّهُمْ مُهْتَدُونَ - حَتَّى إِذَا جَاءَنَا قَالَ يَا لَيْتَ بَيْنِي وَبَيْنَكَ بُعْدَ الْمَشْرِقَيْنِ فَبِئْسَ الْقَرِينُ - وَلَنْ يَنْفَعَكُمُ الْيَوْمَ إِذْ ظَلَمْتُمْ أَنَّكُمْ فِي الْعَذَابِ مُشْتَرِكُونَ
'যে ব্যক্তি দয়াময় আল্লাহর স্মরণ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, আমি তার জন্য এক শয়তান নিযুক্ত করে দিই। সে তার সঙ্গী হয়ে যায়। শয়তানরাই মানুষদেরকে সঠিক পথে চলতে বাধা দেয়। আর মানুষেরা বাধাগ্রস্ত হওয়ার পরও মনে করতে থাকে, তারাই সঠিক পথপ্রাপ্ত। এভাবে যেদিন সে আমার সামনে উপস্থিত হবে, সেদিন আফসোস করে (শয়তানের উদ্দেশ্যে) বলবে, "হায়! আমার মাঝে আর তোমার মাঝে যদি পূর্ব-পশ্চিমের দূরত্ব থাকত! তুমি অত্যন্ত নিকৃষ্ট এক সঙ্গী আমার!” যেহেতু তোমরা অন্যায় করেছিলে তাই আজ আর তোমাদের (এই আফসোস) কোনো কাজে আসবে না। তোমরা সকলেই একত্রে আজ আমার আযাবে শরীক হবে।'১৯
অর্থাৎ যে ব্যক্তি আল্লাহ তাআলার যিকির, পবিত্র কুরআন থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, কুরআনের ব্যাপারে অজ্ঞ থাকে, তার বোধ ও অন্তর্দৃষ্টিকে কুরআনের মর্ম ও অর্থ অনুধাবনে কোনো কাজে না লাগায়, আল্লাহ তাআলা এই বিমুখতার শাস্তি স্বরূপ তার জন্য একটি শয়তান নিযুক্ত করে দেন। ঘরে-বাইরে এই শয়তান তার সার্বক্ষণিক সঙ্গী হয়ে যায়। তার বন্ধু, তার অভিভাবক হিসেবে এই নরাধম সর্বদা তার সাথে লেগে থাকে।
উল্লিখিত আয়াতে এরপরে জানিয়ে দেয়া হয়েছে, এই শয়তান তার বন্ধু হিসেবে তার জীবনের সাথে জড়িয়ে যায়। সত্য ও সঠিক পথ থেকে তাকে ফিরিয়ে দেয়। তার জন্য জান্নাতের রাস্তাকে এমনভাবে বন্ধ করে দেয় যে, সে ভুলের পথে, জাহান্নামের দিকে ছুটতে থাকে আর এই ভ্রষ্ট পথকেই সে সঠিক মনে করতে থাকে। এভাবে পার্থিব জীবন কাটিয়ে দেওয়ার পরে সে তার সঙ্গীর বাস্তবতা ও জীবনের চরম অমার্জনীয় ভুল উপলব্ধি করতে পারবে। তখন তারা পরস্পর ভর্ৎসনা করতে করতে একজন আরেকজন থেকে দূরত্ব কামনা করবে। একজন অপরজনকে নিকৃষ্ট সঙ্গী মনে করে বলবে, 'পার্থিব জীবনে তুমি ছিলে আমার নিকৃষ্ট সঙ্গী। তুমিই আমাকে হিদায়াতের পথ থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছ, অথচ আমি হিদায়াতের পথেই ছিলাম। তুমি আমার সামনে সত্যকে বিকৃত করে তুলেছ। তুমি আজকেও আমার সবচেয়ে নিকৃষ্ট সঙ্গী।'
বিপদগ্রস্ত লোকের যদি কোনো সঙ্গী থাকে, দণ্ডিত ব্যক্তি যদি তার পাশে তার মতোই দণ্ডপ্রাপ্ত কোনো লোক পায়, তাহলে সে একটা নীরব সান্ত্বনা লাভ করে। অন্যের উপস্থিতিতে তার কষ্ট কিছুটা হলেও লাঘব হয়। কিন্তু জাহান্নামের শাস্তিতে কোনো সান্ত্বনা নেই, পার্শ্ববর্তী সাজাপ্রাপ্ত লোকের উপস্থিতিতে শাস্তি বিন্দুমাত্র হালকা মনে হওয়ারও কোনো কারণ নেই। কেননা জাহান্নামের শাস্তির তীব্রতায় একজন আরেক জনের শাস্তি দেখে সান্ত্বনা লাভ করার মতো পরিস্থিতি থাকবে না।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে নিজ কুদরত দ্বারা রক্ষা করুন।
টিকা:
[১] সূরা সোয়াদ, আয়াত-ক্রম: ৪৫
[১] সূরা সিজদাহ, আয়াত-ক্রম: ২৪
[২] দৃঢ় বিশ্বাস অর্জনের জন্য অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন আলিম হওয়া আবশ্যক। -অনুবাদক
[৩] সূরা আসর, আয়াত-ক্রম: ১-৩
[১] সূরা যুখরুফ, আয়াত-ক্রম: ৩৬-৩৯
📄 গুনাহ মানুষের গোপন শত্রু
গুনাহ শয়তানের একটি হাতিয়ার। এই হাতিয়ার খোদ গুনাহগার ব্যক্তির বিরুদ্ধেই ব্যবহৃত হয়। বান্দার পাপকর্ম তার নিজের জন্য ক্ষতিকর হয়ে যায়। মূলত আল্লাহ তাআলা গুনাহগার বান্দার জন্য একজন শত্রু নিযুক্ত করে দেন। অদৃশ্য থেকে এই শত্রু সর্বদা গুনাহগার ব্যক্তির পেছনে লেগে থাকে। গুনাহগার ব্যক্তির ক্ষতি করতে সর্বদা সচেষ্ট থাকে। গুনাহগার ব্যক্তির প্রতিটি পদক্ষেপ, প্রতিটি কাজেই সে ষড়যন্ত্র করতে উদ্যত হয়। এই শত্রু হলো শয়তান। শয়তান মানুষকে স্পষ্ট দেখতে পায়। মানুষের চোখে শয়তান ধরা পড়ে না, অদৃশ্য থেকে। শয়তান কখনো ঘুমায় না, গাফিল হয় না। সে মানুষের পিছেই পড়ে থাকে। সে যেই গুনাহগার ব্যক্তির পেছনে উঠেপড়ে লেগে যায় তার ক্ষতি করতে সে অন্যান্য শয়তান এবং মানুষরূপী শয়তানদের থেকে সাহায্য নেয়। সে তার সামনে মিথ্যার বেসাতি মেলে ধরে। বিভিন্ন রকমের ভ্রান্তি আর ভ্রষ্টতা সে তার পথে বিছিয়ে দেয়। গুনাহগার বান্দার পেছনে তার অন্যান্য শয়তানদেরকে লেলিয়ে দেয়। তারা পরস্পর বলাবলি করে—‘এই মানুষজাতিই তো আমাদের চিরশত্রু। মানুষের জন্যই তো আমাদের পূর্বপুরুষকে (ইবলিস) অভিশপ্ত করা হয়েছে। সে যেন আমাদের হাতছাড়া না হয়ে যায়। তাকেও অভিশপ্ত বানাতে হবে। জান্নাতে যেন তার বিন্দুমাত্র অংশ না থাকে। সে জান্নাতে থাকবে আর আমরা হব জাহান্নামী, এটা হতেই পারে না। তার জন্যই তো আমরা রহমত থেকে বিতাড়িত হয়েছি। আমাদেরকে অভিশপ্ত করা হয়েছে। সুতরাং, এসো, আমরা সকলে একযোগে আমাদের সময়, শ্রম ও মেধা দিয়ে তাকে আমাদের দলভুক্ত করে নিই, তাকেও আমাদের মতো অভিশপ্ত করে তোলি।'
এভাবেই শয়তান তার অনুচরদেরকে মানুষের পেছনে লেলিয়ে দেয়। তাই আল্লাহ তাআলাও মানুষদের সুরক্ষার জন্য বাহিনী গঠন করে দিয়েছেন। আল্লাহর বাহিনীর সাথে শয়তানের বাহিনীর নিরন্তর লড়াইয়ের সূচনা এই পৃথিবীর শুরু-লগ্ন থেকেই। হক আর বাতিলের লড়াই। আল্লাহ তাআলা জিহাদকে ইবাদাত হিসেবে এই পৃথিবীতে প্রচলিত করেছেন। এই ইবাদাতে আল্লাহ তাআলা বান্দাদের প্রাণ ও সম্পদকে আখিরাতের বিনিময়ে ক্রয় করে নিয়েছেন। ঐশী গ্রন্থ তাওরাত, ইনজিল ও কুরআনুল কারীমে আল্লাহ তাআলা মুমিন বান্দাদের জান-মালের বিনিময় জান্নাত বলে অভিহিত করেছেন। কুরআনের ইরশাদ-
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا هَلْ أَدُلُّكُمْ عَلَى تِجَارَةٍ تُنْجِيكُمْ مِنْ عَذَابٍ أَلِيمٍ - تُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ وَتُجَاهِدُونَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ بِأَمْوَالِكُمْ وَأَنْفُسِكُمْ ذَلِكُمْ خَيْرٌ لَكُمْ إِنْ كُنْتُمْ تَعْلَمُونَ - يَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ وَيُدْخِلْكُمْ جَنَّاتٍ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ وَمَسَاكِنَ طَيِّبَةً فِي جَنَّاتِ عَدْنٍ ذَلِكَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ - وَأُخْرَى تُحِبُّونَهَا نَصْرُ مِنَ اللَّهِ وَفَتْحُ قَرِيبٌ وَبَشِّرِ الْمُؤْمِنِينَ
'হে ঈমানদারগণ! আমি কি তোমাদেরকে এমন এক ব্যবসায়ের সন্ধান দেব, যা তোমাদেরকে যন্ত্রণাদায়ক আযাব থেকে রক্ষা করবে? (তা হলো) তোমরা আল্লাহ ও রাসূলের প্রতি ঈমান আনবে এবং আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করবে তোমাদের অর্থ-সম্পদ ও জীবনকে উৎসর্গ করে। তোমাদের জন্য এই ব্যবসা অত্যন্ত লাভজনক, যদি তোমরা বুঝতে পার। (এই ব্যবসায়ে) আল্লাহ তাআলা তোমাদের জীবনের গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেবেন আর তোমাদেরকে এমন এক জান্নাতে প্রবেশ করাবেন, যার নিচ দিয়ে বয়ে গেছে নদ-নদী, তিনি তোমাদেরকে দেবেন বসবাসের জন্য জান্নাতে উত্তম বাসস্থান। এটাই মহা সফলতা। এ ছাড়াও তিনি তোমাদের জন্য আরো পছন্দনীয় দুটি বিষয় রেখে দিয়েছেন; আল্লাহ তাআলার সাহায্য ও নিকট-ভবিষ্যতের বিজয়। সুতরাং হে নবী! আপনি মুমিনদেরকে সুসংবাদ জানিয়ে দিন।[১]
আল্লাহ তাআলা শয়তানকে তাঁর প্রিয় বান্দাদের মুকাবিলায় সুযোগ দিয়ে রেখেছেন। তাঁর প্রিয় বান্দাগণ শয়তানের মুকাবিলায় জিহাদ করে নিজেদেরকে মহান রবের শ্রেষ্ঠ বান্দা হিসেবে প্রমাণ করে। আর আল্লাহ তাঁর মুমিন বান্দার অন্তরে হক-বাতিলের এই চিরায়ত দ্বন্দ্বের নিশানা দিয়েছেন। এই অন্তর দিয়ে মুমিন বান্দা আল্লাহ তাআলার পরিচয় লাভ করে, মহান রবের প্রতি ভালোবাসা, শ্রদ্ধা, আনুগত্য, একনিষ্ঠতা প্রদর্শন করে। নিজের হৃদয়কে আল্লাহমুখী করে, আল্লাহর উপর ভরসা করে। তাই শয়তানের সাথে মানবজাতির এই দ্বন্দ্বের দায়ভার তিনি মানুষের হৃদয়ের মাঝেই রেখে দিয়েছেন। এরপর তিনি এই চিরায়ত যুদ্ধে মানুষের অন্তরকে সাহায্য করেছেন ফিরিশতাদের মাধ্যমে, যারা পালাক্রমে অন্তরের রক্ষণাবেক্ষণ করে থাকে। সেই সাথে অন্তরকে শক্তি যুগিয়েছেন প্রেরিত কিতাব, রাসূল, ঈমানের নূর, দৃঢ় বিশ্বাস ও হিদায়াতের আলো দ্বারা।
অন্তরের এই শক্তির পাশাপাশি আল্লাহ তাআলা তাকে দৈহিক শক্তিমত্তাও দান করেছেন। চোখের দ্বারা অন্তরের পর্যবেক্ষণ হয়, কানের দ্বারা শ্রবণ হয় আর জিহ্বা দ্বারা অন্তরের ভাষ্য প্রকাশ পায়। বান্দার হাত-পা তার অন্তরকে সার্বক্ষণিক সহায়তা করতে থাকে। ফিরিশতাগণ তাদের জন্য দুআ করেন। সর্বশেষে আল্লাহ নিজেই তাদের রক্ষকের ভূমিকায় থাকেন। মুমিন বান্দাদেরকে তিনি তাঁর দলের লোক হিসেবে ঘোষণা দিয়ে ইরশাদ করেন-
أُولَئِكَ حِزْبُ اللَّهِ أَلَا إِنَّ حِزْبَ اللَّهِ هُمُ الْمُفْلِحُونَ
'এরাই হলো আল্লাহ তাআলার দল। জেনে রাখো, মহান আল্লাহ তাআলার দলই চূড়ান্ত সফলতা লাভ করবে।”
وَإِنَّ جُنْدَنَا لَهُمُ الْغَالِبُونَ
'আর অবশ্যই আমার বাহিনীই হবে বিজয়ী।”
আল্লাহ তাআলা এভাবে হক-বাতিলের অবিরাম দ্বন্দ্বে নিজের দলকে বিশ্ববাসীর নিকট ঘোষণা দিয়ে পরিচিত করে দিয়েছেন। যেসকল বান্দা আল্লাহ তাআলার দলভুক্ত তাদের জন্য পবিত্র কুরআনে এই যুদ্ধ ও দ্বন্দ্বের সমরশিক্ষা বর্ণিত হয়েছে। আল্লাহ তাআলা তাদের উদ্দেশ করে বলেন-
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اصْبِرُوا وَصَابِرُوا وَرَابِطُوا وَاتَّقُوا اللَّهَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ
'হে ঈমানদারগণ! তোমরা ধৈর্য ধরো। শত্রুর মুকাবিলায় প্রতিযোগিতা করে তোমরা (আনুগত্য, বিপদ-আপদ ও গুনাহ থেকে বিরত থাকার ব্যাপারে) কষ্টসহিষ্ণু হও। দৃঢ়তা অবলম্বন করো। আর আল্লাহকে ভয় করতে থাক, যাতে তোমরা সফল হও।[১]
আল্লাহ তাআলা এই চার জিনিসের মাধ্যমে (ধৈর্যধারণ, শত্রুর চেয়ে বেশি কষ্টসহিষ্ণু হওয়া, দৃঢ়পদ থাকা এবং তাকওয়া অবলম্বন করা) তাঁর মুমিন বান্দাদেরকে বাতিলের মুকাবিলায় বিজয় লাভের পদ্ধতি শিক্ষা দিয়েছেন।
টিকা:
[১] সূরা সাফ, আয়াত-ক্রম: ১০-১৩
[১] সূরা মুজাদালাহ, আয়াত-ক্রম: ২২
[২] সূরা সাফফাত, আয়াত-ক্রম: ১৭৩
[১] সূরা আলে ইমরান, আয়াত-ক্রম: ২০০
📄 গুনাহ বান্দাকে আযাবিগ্রস্ত করে
গুনাহের অন্যতম ক্ষতি হলো, গুনাহগার ব্যক্তি নিজের কথাও ভুলে যায়। নিজের প্রতি যত্নহীন থাকে। তিলেতিলে নিজেকে বিনষ্ট করে ফেলে, নিজের জন্য বড় বড় ক্ষতি ডেকে আনে। আল্লাহ তাআলার ইরশাদ-
وَلَا تَكُونُوا كَالَّذِينَ نَسُوا اللَّهَ فَأَنْسَاهُمْ أَنْفُسَهُمْ أُولَئِكَ هُمُ الْفَاسِقُونَ
'আর তোমরা তাদের মতো হয়ো না, যারা আল্লাহ তাআলাকে ভুলে গিয়েছে, ফলে আল্লাহও তাদেরকে আত্মবিস্মৃত করে দিয়েছেন। তারাই হলো অবাধ্য ও ফাসিক।[১]
অন্য আয়াতে ইরশাদ করেন—
نَسُوا اللَّهَ فَنَسِيَهُمْ
‘তারা আল্লাহ তাআলাকে ভুলে গিয়েছে, ফলে আল্লাহও তাদেরকে ভুলে গিয়েছেন।[২]
যারা আল্লাহ তাআলাকে ভুলে যায়, তাদের জীবনে দুটি শাস্তি নেমে আসে।
১. আল্লাহ তাআলা তাদেরকে ভুলে যান
২. তাদের নিজেদেরকেও নিজেদের ব্যাপারে ভুলিয়ে দেন
আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাকে ভুলে যাওয়ার অর্থ হলো, তিনি বান্দাকে ছাড় দেন, কিছু কালের জন্য অবাধ্যতা ও স্বেচ্ছাচারের সুযোগ দেন। ফলে বান্দা কিছু কালের এই বল্গাহীন জীবন পেয়ে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে উপনীত হয়।
আর আল্লাহ তাআলা বান্দাকে বান্দার নিজের ব্যাপারে বিস্মৃত করে দেওয়ার অর্থ হলো, বান্দা নিজের আসল পরিচয় ভুলে যায়। তার প্রকৃত অবস্থান ও মর্যাদার ব্যাপারে সে উদাসীন হয়ে যায়। স্বার্থক জীবনের সফলতা ও সৌভাগ্যের উপকরণগুলোর কথা তার মনে থাকে না। সে নিজের ভালোমন্দ বুঝতে অক্ষম হয়ে যায়। নিজ স্বার্থের ব্যাপারেও থাকে বেখেয়াল। জীবনের উন্নতির চাবিকাঠি তার অজানাই থেকে যায়। উত্তম ও দৃঢ়সংকল্প তার অন্তরে বদ্ধমূল হয় না আর। তার চোখে তখন আর নিজের ত্রুটি-বিচ্যুতি ধরা পড়ে না। নিজের ভুল পদক্ষেপও সে ভুলে যায়। একইসাথে সে তার আত্মার ব্যাধি, হৃদয়ের ক্ষতিকারক অভ্যাসের ব্যাপারে উদাসীন হয়ে যায়। ভুলোমনা হয়ে নিজের চারিত্রিক বদঅভ্যাস সে দূর করতেও তখন অনীহা প্রকাশ করে।
পাপিষ্ঠ ব্যক্তির চলাফেরার দিকে খেয়াল করলেও দেখা যায়, সে তার সম্ভাবনাময় জীবনকে অনর্থক কাজে নষ্ট করে দিচ্ছে। তার মূল্যবান প্রতিভা, স্বভাবজাত যোগ্যতাকে নিকৃষ্ট কোনো কাজের পেছনে হেলায় ফেলায় অপচয় করে বেড়াচ্ছে। তার মেধার সঠিক মূল্যায়ন করতে সে ব্যর্থ হয়ে জীবনের করুণ পরিণতিকে বরণ করে নিচ্ছে।
মূলত এই পৃথিবীতে আমরা এসেছি আখিরাতকে গড়ার জন্য। পার্থিব জীবনের বিনিময়ে আখিরাতের সাফল্যমণ্ডিত জীবনকে তৈরি করার সাধনায় লিপ্ত হওয়ার কথা আমাদের সকলের। এই সাধনায় যারা উদাসীন, তারা পার্থিব জীবনে নিজেদেরকে সফল ব্যক্তি মনে করতে থাকে। জাগতিক জীবনের ভোগ-বিলাসের পেছনেই তারা সর্বস্ব ব্যয় করে দেয়। পার্থিব জীবনের মোহ তাদেরকে আচ্ছাদিত করে নেয়। তারা দুনিয়ার সুখ-শান্তিতেই আত্মতৃপ্তি লাভ করে। চোখের সম্মুখে উপস্থিত ভোগবাদী জীবনকেই তারা গ্রহণ করে নেয়, বিনিময়ে নষ্ট করে দেয় অবিনশ্বর জীবনের সফলতা। মনে করতে থাকে, পার্থিব জীবনকে বেছে নেওয়াই প্রকৃত বুদ্ধিমত্তার পরিচয়।
আবার কখনো তারা এই কথা বলে আত্মপ্রবঞ্চিত হয় যে, যা কিছু চোখে দেখছ, তাই গ্রহণ করো। যা কিছু শুধু শুনছ (পরকালের কথা), তার চিন্তা আপাতত বাদ দাও।
তাদের ব্যাপারেই আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন-
فَمَا رَبِحَتْ تِجَارَتُهُمْ وَمَا كَانُوا مُهْتَدِينَ
'তাদের এই কারবার লাভজনক হয়নি। আর তারা হিদায়াতপ্রাপ্তও হতে পারেনি।' ১৯
অন্যত্র ইরশাদ করেন-
أُولَئِكَ الَّذِينَ اشْتَرَوُا الْحَيَوَةَ الدُّنْيَا بِالْآخِرَةِ فَلَا يُخَفَّفُ عَنْهُمُ الْعَذَابُ وَلَا هُمْ يُنْصَرُونَ
'এরাই হলো ঐ সমস্ত লোক, যারা তাদের পরকালের বিনিময়ে পার্থিব জীবনকে ক্রয় করে নিয়েছে। সুতরাং তাদের শাস্তি লঘু করা হবে না। আর তাদেরকে কোনো প্রকার সাহায্যও করা হবে না।'১
আর প্রকৃত লাভবান ও সফল ব্যক্তিদের পরিচয় হলো, তারা এই ক্ষণস্থায়ী জীবনকে উৎসর্গ করে দিয়েছে চিরস্থায়ী জীবনের সফলতার স্বার্থে। তুচ্ছ এই নশ্বর জীবনকে তারা অবিনশ্বর জিন্দেগির জন্য বিক্রি করে দিয়েছে। তুচ্ছ এই জগত-সংসারের বিনিময়ে তারা সাড়া দিয়েছে মহামূল্যবান জীবনের আহ্বানে। তারা বলে-'এই ক্ষণজন্মা তুচ্ছ জীবন দিয়ে আমরা কী করব! এই জীবনের সব প্রাপ্য আমরা মহান আল্লাহর কাছে দিয়ে দিলাম পরকালের চিরস্থায়ী সফল জীবনের আশায়! এক মুহূর্তের স্বপ্নের মোহগ্রস্ত এই জীবনে আমরা কী-ই বা করতে পারব! অথচ আখিরাতের জীবন তো অতুলনীয়! আমাদের হাতছানি দিয়ে ডাকছে সে-জীবন!
ক্ষণস্থায়ী এই দুনিয়ার ব্যাপারে ইরশাদ হচ্ছে-
وَيَوْمَ يَحْشُرُهُمْ كَأَنْ لَمْ يَلْبَثُوا إِلَّا سَاعَةً مِنَ النَّهَارِ يَتَعَارَفُونَ بَيْنَهُمْ
'আর সেদিন তাদেরকে এমন অবস্থায় সমবেত করা হবে, যেন তারা (পার্থিব জীবনে) দিনের সামান্য সময় ছাড়া সেখানে অবস্থানই করেনি। তারা পরস্পরকে সেদিন দেখে চিনতে পারবে।
অন্যত্র আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-
يَسْأَلُونَكَ عَنِ السَّاعَةِ أَيَّانَ مُرْسَاهَا - فِيمَ أَنْتَ مِنْ ذِكْرَاهَا - إِلَى رَبِّكَ مُنْتَهَاهَا - إِنَّمَا أَنْتَ مُنْذِرُ مَنْ يَخْشَاهَا كَأَنَّهُمْ يَوْمَ يَرَوْنَهَا لَمْ يَلْبَثُوا إِلَّا عَشِيَّةٌ أَوْ ضُحَاهَا
'তারা আপনার নিকট জানতে চায়, কিয়ামত কবে ঘটবে? আপনার সাথে এই আলোচনার কী সম্পর্ক রয়েছে! এর প্রকৃত জ্ঞান তো আপনার রবের নিকটই গচ্ছিত। যারা কিয়ামত দিবসকে ভয় করে, আপনি তো কেবল তাদেরকেই সতর্ক করবেন। যেদিন তারা কিয়ামতের বিভীষিকা দেখবে, সেদিন মনে হবে তারা যেন মাত্র এক সন্ধ্যা বা এক সকাল কাটিয়ে এসেছে পৃথিবীতে।।১৯
অন্য আয়াতে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-
كَمْ لَبِثْتُمْ فِي الْأَرْضِ عَدَدَ سِنِينَ - قَالُوا لَبِثْنَا يَوْمًا أَوْ بَعْضَ يَوْمٍ فَاسْأَلِ الْعَادِّينَ - قَالَ إِنْ لَبِثْتُمْ إِلَّا قَلِيلًا لَوْ أَنَّكُمْ كُنْتُمْ تَعْلَمُونَ
'(আল্লাহ তাআলা তাদেরকে বলবেন,) "তোমরা বছরের হিসেবে কত বছর পৃথিবীতে অবস্থান করলে?” তারা বলবে, "আমরা তো একদিন বা সামান্য কিছু সময় সেখানে অবস্থান করেছি, যারা গুণে রেখেছে আপনি তাদেরকে জিজ্ঞেস করুন।" আল্লাহ বলবেন, "তোমরা আসলেই সামান্য সময় পৃথিবীতে অবস্থান করেছ, যদি তোমরা তা জানতে!".
কুরআনের অন্য আয়াতে দুনিয়ার স্থায়িত্ব নিয়ে ইরশাদ হয়েছে-
يَوْمَ يُنْفَخُ فِي الصُّورِ وَنَحْشُرُ الْمُجْرِمِينَ يَوْمَئِذٍ زُرْقًا - يَتَخَافَتُونَ بَيْنَهُمْ إِنْ لَبِثْتُمْ إِلَّا عَشْرًا - نَحْنُ أَعْلَمُ بِمَا يَقُولُونَ إِذْ يَقُولُ أَمْثَلُهُمْ طَرِيقَةً إِنْ لَبِثْتُمْ إِلَّا يَوْمًا
'যেদিন শিঙ্গায় ফুঁ দেয়া হবে, সেদিন আমি অপরাধীদেরকে নীল চক্ষুসহ একত্রিত করব। তারা পরস্পরে চুপিচুপি বলাবলি করবে, "তোমরা (পৃথিবীতে) মাত্র ১০ দিন অবস্থান করেছিলে।” আমি খুব ভালো করেই জানি, তারা সেদিন কী বলবে। তখন তাদের উত্তম ব্যক্তিটি বলবে, "তোমরা পৃথিবীতে মাত্র একদিন ছিলে."[৩]
এই হলো কিয়ামতের ময়দানে ক্ষণস্থায়ী দুনিয়ার বাস্তবতা। এই বাস্তবতা উপলদ্ধি করে যখন তারা পৃথিবীতে তাদের অবস্থান-কালের স্বল্পতা জানতে পারবে, ক্ষণস্থায়ী জীবনের বাইরেও তাদের জন্য যেই অনন্ত জীবন রয়েছে সেই জীবনে যখন তারা উপনীত হবে, তখন বুঝতে পারবে তারা ধোঁকাগ্রস্ত এক জীবন পার করে এসেছে। ক্ষণস্থায়ী জীবনের মোহে পড়ে তারা চিরস্থায়ী জীবনকে নস্যাৎ করে দিয়েছে। তারা অপূরণীয় ক্ষতির সম্মুখীন হয়ে নিজেদের জীবনকে চূড়ান্ত ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছে। এই পৃথিবীর সকলেই তাদের জীবনকে পুঁজি বানিয়ে ব্যবসায় নেমেছে। কেউ এই পুঁজি খাটিয়ে আখিরাতের বাসস্থানকে তৈরি করে নেয়। আর কেউ এই পুঁজিকে ক্ষণস্থায়ী দুনিয়ার পেছনেই নিঃশেষ করে দেয়। গুনাহগার ভোগবাদী লোকেরা কিয়ামতের দিন অনুভব করবে তারা তাদের পুঁজি বিনিময় করে লাভবান হতে পারেনি। আল্লাহ তাআলা এই পুঁজির সর্বোত্তম ব্যবহারকারীদের পরিচয় জানিয়ে দিয়ে ইরশাদ করছেন—
إِنَّ اللَّهَ اشْتَرَى مِنَ الْمُؤْمِنِينَ أَنْفُسَهُمْ وَأَمْوَالَهُمْ بِأَنَّ لَهُمُ الْجَنَّةَ يُقَاتِلُونَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ فَيَقْتُلُونَ وَيُقْتَلُونَ وَعْدًا عَلَيْهِ حَقًّا فِي التَّوْرَاةِ وَالْإِنْجِيلِ وَالْقُرْآنِ وَمَنْ أَوْفَى بِعَهْدِهِ مِنَ اللَّهِ فَاسْتَبْشِرُوا بِبَيْعِكُمُ الَّذِي بَايَعْتُمْ بِهِ وَذَلِكَ هُوَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ
'নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা মুমিন বান্দাদের থেকে তাদের প্রাণ ও সম্পদকে জান্নাতের বিনিময়ে ক্রয় করে নিয়েছেন। তারা আল্লাহর রাস্তায় লড়াই করে। তারা শত্রুদের হত্যা করে, তারা নিজেরাও মারা যায়। তাওরাত, ইনজিল ও কুরআনে তিনি এই সত্য ওয়াদাতে অবিচল। আর কে রয়েছে আল্লাহ তাআলার চেয়ে অধিক ওয়াদা পূরণকারী! সুতরাং তোমরা আল্লাহ তাআলার সাথে যে লেনদেন করেছ তার জন্য সুসংবাদ গ্রহণ করো। আর অবশ্যই ইহা মহা সাফল্য।'¹
টিকা:
[১] সূরা হাশর, আয়াত-ক্রম: ১৯
[২] সূরা তাওবাহ, আয়াত-ক্রম: ৬৭
[১] সূরা বাকারা, আয়াত-ক্রম: ১৬
[১] সূরা বাকারা, আয়াত-ক্রম: ৮৬
[২] সূরা ইউনুস, আয়াত-ক্রম: ৪৫
[১] সূরা নাযিয়াত, আয়াত-ক্রম: ৪২-৪৬
[২] সূরা মুমিনূন, আয়াত-ক্রম: ১১২-১১৪
[৩] সূরা ত্বহা, আয়াত-ক্রম: ১০২-১০৪
[১] সূরা তাওবাহ, আয়াত-ক্রম: ১১১