📘 রূহের খোরাক > 📄 গুনাহ মানব-জীবনের বারাকাহ নিঃশেষ করে দেয়

📄 গুনাহ মানব-জীবনের বারাকাহ নিঃশেষ করে দেয়


গুনাহ মানব-জীবনের বারাকাহ নষ্ট করে ফেলে। গুনাহগার ব্যক্তির আয়ুষ্কাল, রিযিক, ইলম, আমল ও ইবাদাতে কোনো বারাকাহ থাকে না। তার দুনিয়া ও আখিরাতের যাবতীয় বারাকাহ নিঃশেষ হয়ে যায়। আল্লাহর নাফরমানিতে লিপ্ত ব্যক্তির জীবনে প্রাচুর্য হারিয়ে যায়। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-
وَلَوْ أَنَّ أَهْلَ الْقُرَى آمَنُوا وَاتَّقَوْا لَفَتَحْنَا عَلَيْهِمْ بَرَكَاتٍ مِنَ السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ
'আর যদি জনপদের অধিবাসীগণ ঈমান আনত এবং তাকওয়া অবলম্বন করত, তাহলে আমি তাদের জন্য আসমান ও জমিনের নিয়ামতসমূহের বারাকাহ'র দ্বার উন্মুক্ত করে দিতাম।।'১
অন্যত্র ইরশাদ করেন-
وَأَنْ لَوِ اسْتَقَامُوا عَلَى الطَّرِيقَةِ لَأَسْقَيْنَاهُمْ مَاءً غَدَقًا لِنَفْتِنَهُمْ فِيهِ
'আর তাদেরকে এ মর্মে প্রত্যাদেশ প্রেরণ করা হয়েছে যে, তারা যদি সত্যের পথে অবিচল থাকত, তাহলে আমি প্রচুর পানি বর্ষণের নিয়ামতে পরীক্ষাস্বরূপ তাদেরকে সিক্ত করতাম।'২
একজন বান্দা অবশ্যই তার কৃত গুনাহের কারণে রিযিক থেকে বঞ্চিত হয়। হাদীস শরীফে বর্ণিত হয়েছে, নবীজি ইরশাদ করেন, 'রুহুল কুদুস আমার অন্তরে এ কথা ঢেলে দিয়েছেন যে, জগতের প্রতিটি প্রাণীই তার নির্ধারিত রিযিক ভোগ করে মৃত্যুবরণ করবে। সুতরাং তোমরা আল্লাহ তাআলাকে ভয় করো এবং উত্তমভাবে রিযিক তালাশ করো। আর আল্লাহর নিকট তোমাদের জন্য যা কিছু রয়েছে তা কেবল তাঁর আনুগত্য দ্বারাই অর্জন করা সম্ভব।'৩
স্বস্তি ও নির্মল আনন্দ মহান রবের সন্তুষ্টি ও তাঁর প্রতি দৃঢ় বিশ্বাসের মধ্যেই নিহিত রয়েছে। তিনি দুশ্চিন্তা, দুর্ভাবনা ও কষ্ট-ক্লেশকে তাঁর প্রতি সন্দেহবোধ আর তাঁর অসন্তুষ্টির মধ্যে রেখে দিয়েছেন।
এর আগের একটি অনুচ্ছেদে ইমাম আহমাদ রাহিমাহুল্লাহ'র কিতাবুয যুহদ থেকে একটি হাদীসে কুদসী উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন— ‘আমি আল্লাহ, যখন আমি রাজি-খুশি থাকি, তখন বারাকাহ দান করি; আমার বারাকাহ সীমাহীন। আর যখন আমি রাগান্বিত হই, তখন বান্দার ওপর লানত বর্ষণ করি। আমার লানত বান্দার সাত প্রজন্মকে গ্রাস করে নেয়। [১]
বান্দার রিযিক ও কর্মের ব্যাপকতা এবং পরিধি মূলত পরিমাণের আধিক্য দিয়ে নির্ণিত হয় না। জীবনের আয়ুষ্কাল মাস আর বছরের গণনা দিয়ে বিবেচনা করা যায় না। জীবন আর রিযিকের পরিধির ব্যাপকতা প্রকৃতপক্ষে আল্লাহপ্রদত্ত বারাকাহ দ্বারাই তৈরি হয়। [২]
আল্লাহ তাআলার অবাধ্যতার কারণে মানুষের রিযিক ও জীবনের বারাকাহ নষ্ট হয়ে যায়। কেননা আল্লাহ তাআলার অবাধ্যতা ও নাফরমানির নেতৃত্বে থাকে অভিশপ্ত ইবলিস। যারা নাফরমানিতে লিপ্ত হয়, তাদের শাসক ও রক্ষকের ভূমিকায় শয়তান সর্বদা সক্রিয় থাকে। শয়তানের দিক-নির্দেশনার অধীন হয়ে যায় গুনাহগারের দল। আর নশ্বর এই পৃথিবীর যেসকল অঙ্গন শয়তানের পদচারণায় মুখরিত হয়, জীবনের যেসকল ক্ষেত্রে শয়তানের প্রভাব বিস্তার করে সেসকল স্থান ও অঙ্গন থেকে আল্লাহ তাআলার বারাকাহ উঠিয়ে নেওয়া হয়। আমাদের দৈনন্দিন জীবনের প্রতিনিয়ত কাজের শুরুতে আল্লাহ তাআলার নাম উচ্চারণের একটি নিগূঢ় রহস্য উন্মোচিত হয় এই আলোচনাতে। হাদীসে প্রাত্যহিক সকল কাজের শুরুতে বিসমিল্লাহ পড়া বা আল্লাহর নাম নেওয়ার জন্য আমাদেরকে উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে। প্রতিটি কাজের শুরুতে আল্লাহর নাম উচ্চারণকে ইসলামী শরীয়তে যথেষ্ট গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। পোষাক পরিধান করা, ঘর থেকে বের হওয়া, ঘরে প্রবেশ, পানাহার, গাড়িতে আরোহণ, স্ত্রী-সহবাস-ইত্যাদি সকল কাজের শুরুতেই আল্লাহর নাম নেওয়া সুন্নত। পবিত্র এই নাম বারাকাহ নামিয়ে আনে, শয়তানকে দূরীভূত করে দেয়।
মানব-জীবনের বারাকাহ কেবল আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকেই অর্জিত হয়। তিনি ব্যতীত কেউ বারাকাহ দান করতে সক্ষম নয়। জগতের সকল বারাকাহ'র আধার একমাত্র তিনিই। এমনকি আল্লাহ তাআলার সাথে যতকিছু সম্পৃক্ত করা হয়, সবকিছুই বারাকাহপূর্ণ বা মুবারক হয়ে যায়। আল্লাহ তাআলার পবিত্র কালাম, তাঁর প্রেরিত রাসূল, মুমিন বান্দাগণ, কাবা শরীফ-সকল কিছুই বারাকাতে ভরপুর। কিনআন [১] অঞ্চলকেও বরকতময় হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে পবিত্র কুরআনে। আল্লাহ তাআলার দিকে যা কিছুই সম্পৃক্ত করা হয়, তার সবই বারাকাহসমৃদ্ধ হয়ে যায়। এই সম্পৃক্তির অর্থ হলো, আল্লাহ তাআলার প্রভুত্ব, আনুগত্য, তাঁর প্রতি ভক্তি, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার দিকে সম্পৃক্ত হওয়া। এই অর্থের বাইরে সৃষ্টিজগতের সবকিছু আল্লাহ তাআলার দিকে সর্বদাই সম্পৃক্ত।
আল্লাহ তাআলা বারাকাহর বিপরীতে লানত বা অভিশাপ রেখেছেন। তিনি যেমন তাঁর নির্বাচিত সৃষ্টিজগত বারাকাহসমৃদ্ধ করেছেন, তেমনি জগতের কিছু হতভাগা সৃষ্টির ওপর অভিশাপও দিয়েছেন। পাপাচারে ভরপুর পৃথিবীর কোনো কোনো অঞ্চলেও আল্লাহ তাআলা অভিসম্পাত করেছেন। তেমনি নরাধম কিছু পাপিষ্ঠ ব্যক্তিও আল্লাহর লানতের অনলে ভষ্ম হয়েছে তাদের গুনাহের কারণে। আল্লাহর অভিশাপে জর্জরিত এসকল স্থান, মানুষ আর কাজ যাবতীয় কল্যাণ ও বারাকাহ থেকে সর্বদা বঞ্চিত থাকে।
আল্লাহ তাআলা ইবলিসকে অভিশপ্ত করেছেন, নিকৃষ্ট জীবে পরিণত করে তাকে রহমত থেকে বহু দূরে ঠেলে দিয়েছেন। আর যারা এই অভিশপ্ত ইবলিসের আনুগত্য করে ইবলিসের নিকটভাজনে পরিণত হয়, তারাও আল্লাহ তাআলার অভিশাপে আটকে যায়। এই অভিশাপের কারণে তাদের জীবন ও সম্পদ থেকে বারাকাহ নিঃশেষ হয়ে যায়।
জীবনের যে সময়, অর্থ, বুদ্ধি, জ্ঞান ও সম্মান মহান রবের নাফরমানিতে ব্যয় করা হয়, তা বান্দার কোনো কাজে আসে না। বরং ব্যয়কৃত এ সবকিছু আল্লাহ তাআলার দরবারে বান্দার বিরুদ্ধেই সাক্ষ্য দেবে। তাই একজন মানুষের জীবনের সে-সময়টুকুই তার কাজে আসবে, যে সময়ে সে আল্লাহ তাআলার আনুগত্য করেছে। যে সম্পদকে সে কল্যাণের জন্য ব্যয় করেছে, সে সম্পদই তাকে প্রকৃত উপকার পৌঁছাতে পারবে। যে বিদ্যা, বুদ্ধি ও সম্মানকে কাজে লাগিয়ে সে শরীয়তের হুকুম-আহকাম মেনেছে, আল্লাহ তাআলার দরবারে সে-সব তার পক্ষে সুপারিশ করবে।
এই দৃষ্টিকোণ থেকে পৃথিবীতে কেউ কেউ শতায়ু লাভ করলেও বেঁচে থাকার মতো বেঁচে থাকার আয়ুষ্কাল হয়তো তার থাকে ১০-১৫ বছর। কেমন যেন মূল্যবান ধন-রত্নের ভাণ্ডারের মালিক হয়েও সে নিজের কাজের জন্য ১০০- ২০০ টাকাও খরচ করতে অক্ষম।
তিরমিযী'র বর্ণনা, নবীজি ইরশাদ করেন-
الدُّنْيَا مَلْعُونَةٌ، مَلْعُونُ مَا فِيهَا، إِلَّا ذِكْرُ اللَّهِ وَمَا وَالَاهُ، أَوْ عَالِمُ أَوْ مُتَعَلَّمُ
'আল্লাহর যিকির এবং যিকির-সংশ্লিষ্ট অন্যান্য আমল, আলিম ও তালিবুল ইলম ব্যতীত জগতের সকল কিছুই অভিশপ্ত। [১]
অন্য হাদীসে বর্ণিত হয়েছে-
الدُّنْيَا مَلْعُونَةً مَلْعُونُ مَا فِيهَا إِلَّا مَا كَانَ لِلَّهِ
| 'পৃথিবীতে যা কিছু আল্লাহর জন্য নয়, তার সবই অভিশপ্ত।' [২]
অর্থাৎ, যা কিছু কেবল আল্লাহ তাআলার জন্য হবে, কিংবা তাঁর সাথে সম্পৃক্ত- সবই বারাকাহময়। এর বাইরের সকল আয়োজনই আল্লাহর অভিশাপে পূর্ণ।

টিকা:
[১] সূরা আরাফ, আয়াত-ক্রম: ৯৬
[২] সূরা জীন, আয়াত-ক্রম: ১৬, ১৭
[৩] হিলয়াতুল আওলিয়া-১০/২৬, ২৭
[১] ৪৭ নম্বর পৃষ্ঠার টীকা [৩] দ্রষ্টব্য।
[২] আল্লাহপ্রদত্ত বারাকাহ'র মূল রহস্য এখানেই। ধনাঢ্যতা ও অর্থ-বিত্তের আধিক্য মানুষের কোনো কাজে আসে না, যদি আল্লাহ তাআলা সেই বিত্তে বারাকাহ না দেন। বারাকাহবিহীন বিত্তের প্রাচুর্য মানুষের উপকার করতে পারে না। আর আল্লাহ তাআলা যদি বারাকাহ দান করেন, তাহলে সামান্য অর্থ-সম্পদও মানুষের জন্য যথেষ্ট হয়ে যায়। মানুষের জীবনও আল্লাহপ্রদত্ত বারাকাহর মাধ্যমে স্বার্থক ও কর্মমুখর হয়ে ওঠে। অনেকেই দীর্ঘায়ু লাভ করে, কিন্তু বারাকাহ না থাকায় তার জীবন অনর্থকই কেটে যায়। আবার আল্লাহপ্রদত্ত বারাকাহওয়ালা সংক্ষিপ্ত জীবন অল্প সময়ে এমন কাজ ও কর্মে সফলকাম হয়, যা দীর্ঘায়ুপ্রাপ্ত ব্যক্তির সারা জীবনেও অর্জন করা সম্ভব হয় না।
[১] বর্তমান সিরিয়াকে কুরআনুল কারীমে কিনআন বলে অভিহিত করা হয়েছে। শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়াহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, 'কুরআনের নয়টি আয়াতে শামের ফযীলত ও বারাকাহর কথা বলা হয়েছে।' আর আল্লামা ইবনুল কাইয়্যিম বলেন, 'ছয়টি আয়াতে শাম অঞ্চলের বরকতের কথা বলা হয়েছে।'
[১] তিরমিযী, হাদীস-ক্রম: ২৩২২
[২] তিরমিযী, হাদীস-ক্রম: ২৩২২

📘 রূহের খোরাক > 📄 গুনাহগার ব্যক্তি নীচুস্তরের জীবন যাপন করে

📄 গুনাহগার ব্যক্তি নীচুস্তরের জীবন যাপন করে


গুনাহের অন্যতম ক্ষতি হলো, গুনাহ মানুষকে নিম্নমানের পদ, মর্যাদা ও জীবনধারার দিকে ঠেলে দেয়। অথচ মানুষকে সুউচ্চ মর্যাদা দিয়ে সৃষ্টি করা হয়েছে।
আল্লাহ তাআলা তার সৃষ্টিজগতকে দুই স্তরে ভাগ করেছেন। সম্মানিত ও উঁচুস্তরের সৃষ্টিজগত এবং নিম্নস্তরের সৃষ্টিজগত। আল্লাহ তাআলা আনুগত্যশীল বান্দাদেরকে ‘ইল্লিয়‍্যীন’ নামের উঁচু স্তরে সমাসীন করবেন। আর নাফরমান বান্দাদেরকে নীচু স্তরে জায়গা দেবেন। মহান রবের এই স্তরবিন্যাস দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জগতেই কার্যকর হবে। আল্লাহর অনুগত বান্দাগণ পৃথিবীতে সম্মানের সাথে বসবাস করবেন। আর আল্লাহর হুকুম অমান্যকারীরা (আখিরাতে তো বটেই,) দুনিয়াতেও অপদস্থ হবে, লজ্জার জিন্দেগি যাপন করবে। আল্লাহ তাআলা তাঁর অনুগত বান্দাদের জন্য দুনিয়া ও আখিরাতের সম্মান দান করেছেন। আর লাঞ্ছনার বোঝা চাপিয়ে দিয়েছেন অবাধ্যদের উপর। নবীজি ইরশাদ করেন-
بُعِثْتُ بِالسَّيْفِ بَيْنَ يَدَيِ السَّاعَةِ، وَجُعِلَ رِزْقِي تَحْتَ ظِلِّ رُمْحِي، وَجُعِلَ الذُّلُّ وَالصَّغَارُ عَلَى مَنْ خَالَفَ أَمْرِي
‘আমাকে পৃথিবীর বুকে কিয়ামতের আগে সর্বশেষ নবী হিসেবে সত্য প্রতিষ্ঠা করতে তরবারি সমেত পাঠানো হয়েছে, বর্শার নিচে আমার রিযিক রাখা হয়েছে; যারা আমার বিরুদ্ধচারণ করবে, লাঞ্ছনা আর অপদস্থতা তাদের জন্য অপরিহার্য করে দেয়া হয়েছে।’
বান্দা যখনই আল্লাহর কোনো হুকুমের অবাধ্য হয়, সে তার স্থান থেকে এক ধাপ নিচে নেমে যায়। আর বান্দা যখন অবিরাম গুনাহে লিপ্ত থাকে তখন তার মান- মর্যাদা ও জীবনাচারেরও অধঃপতন ঘটতে থাকে। গুনাহে জর্জরিত পতনোন্মুখ জীবন সৃষ্টিজগতের একদম তলানিতে গিয়ে মুখ থুবড়ে পড়ে। যাকে পবিত্র কুরআনের ভাষায় ‘আসফালু সাফিলীন’ বলা হয়েছে।
পক্ষান্তরে বান্দা যখন মহান রবের আনুগত্যের পথে অগ্রসর হতে থাকে, তখন সে তার স্থান থেকে উঁচুতে আরোহণ করতে থাকে। আনুগত্যময় জীবন ধারণ করে সে সম্মান ও মর্যাদার সুউচ্চ শিখরে পৌঁছে যায়। আখিরাতে তাকে 'ইল্লিয়্যীন' নামক স্থানে সমাসীন করা হয়।
বান্দার সামগ্রিক জীবনের আমল অনুপাতে তার জন্য 'ইল্লিয়্যীন' কিংবা 'সাফিলীন'-এ দুই স্তরের যেকোনোটিতে জায়গা দেওয়া হবে।

টিকাঃ
[১] মুসনাদু আহমাদ, হাদীস-ক্রম : ৫১১8

📘 রূহের খোরাক > 📄 গুনাহগার ব্যক্তির প্রতি অন্যরা স্পর্ধা প্রদর্শন করে

📄 গুনাহগার ব্যক্তির প্রতি অন্যরা স্পর্ধা প্রদর্শন করে


গুনাহের উল্লেখযোগ্য একটি সাজা হলো, গুনাহগার ব্যক্তির প্রতি অন্য লোকেরা খুব সহজেই কঠোর ও স্পর্ধামূলক আচরণ করে থাকে। তাদের সাথে বেপরোয়া আচরণ করার মতো দুঃসাহসী হয়ে ওঠে সাধারণ লোকজন। শুধু মানুষই নয়, পুরো সৃষ্টিজগতই তাদের সাথে স্পর্ধামূলক আচরণ করে। ইবলিস বাহিনী তাকে বিভিন্ন ধরনের কুমন্ত্রণা দিয়ে উত্যক্ত করে তোলে, এবং বিভ্রান্ত করতে থাকে। মনের মধ্যে অমূলক ভয়-ভীতি ঢেলে দেয়। তার জন্য অকল্যাণ বয়ে আনে এবং মঙ্গলজনক চিন্তা তার মাথা থেকে সরিয়ে দেয়। ক্ষতিকর বিষয় থেকে সাবধানতা অবলম্বন করতে তার মনে থাকে না। শয়তানের প্ররোচনায় সে আল্লাহ তাআলার অবাধ্যতায় পূর্ণোদ্যমে মেতে ওঠে।
আশপাশের দুষ্ট প্রকৃতির মানুষেরাও তার সাথে স্পর্ধামূলক দুঃসাহসী আচরণ করতে থাকে। তার প্রতি তাদের কোনো সম্মান কিংবা শ্রদ্ধা অবশিষ্ট থাকে না। গুনাহগার ব্যক্তি প্রতাপশালী হলেও তার অনুপস্থিতিতে তাকে অবজ্ঞা ও ঘৃণা করা হয়। গুনাহগার ব্যক্তির প্রতি তার পরিবার, স্ত্রী-স্বজন, ছেলে-মেয়ে, প্রতিবেশী-সবাই অবাধ্য হয়ে ওঠে। এমনকি অবলা পশুও গুনাহগার ব্যক্তির অনুগত থাকে না।
একজন আল্লাহওয়ালা ব্যক্তি বলেছেন, 'যখন আমার দ্বারা কোনো গুনাহ হয়ে যায় তখন এর মন্দ প্রভাব আমি আমার স্ত্রী ও জীবজন্তুর আচরণে দেখতে পাই।' ক্ষমতাধর শাসকবর্গ ও বিচারালয়ের লোকজনও তার প্রতি কঠোর হয়ে যায়। কুরআন-সুন্নাহর শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত থাকলে শাসকবর্গ অবশ্যই তার উপর আল্লাহ তাআলার হুদুদ বা নির্ধারিত শাস্তি প্রয়োগ করতেন।
গুনাহগার ব্যক্তির নফসও তার সাথে দুঃসাহসী আচরণ করতে থাকে। হিংস্র সিংহের মতো গুনাহগার ব্যক্তির নফস তার জীবনের সকল ইচ্ছা ও চাওয়া-পাওয়াকে ছিন্নভিন্ন করে দেয়। সে নফসের গোলামে পরিণত হয়। এমনকি কখনো যদি সে ভালো কাজের ইচ্ছা পোষণ করে তার নফস তাকে বাধা দিতে থাকে। ভালোকাজে নফস তার আনুগত্য করে না। বরং ক্রমশ তাকে ধ্বংসের দিকে টেনে নেয়।
নফসের সাথে বান্দার যে বিরামহীন দ্বন্দ্ব, সেই দ্বন্দ্ব নিরসনের উপায় হলো, আল্লাহর আনুগত্যে ভরপুর গুনাহমুক্ত জীবন। মহান রবের আনুগত্য হলো দুর্গ, অনুগত বান্দা সেই দুর্গে নিরাপদ থাকে। আর আনুগত্যহীন জীবন ছেড়ে বান্দা গুনাহের জীবন গ্রহণ করে বান্দা সুরক্ষিত দুর্গের বাইরে চলে আসে। পথের বিভিন্ন দুশমন তাকে হামলা করে। এই হামলায় তার নৈতিক জীবন পর্যুদস্ত হয়ে যায়। এই বিপর্যস্ততা থেকে আল্লাহ তাআলার আনুগত্য তাকে বাঁচাতে পারে। মহান রবের স্মরণ, কল্যাণমূলক বিভিন্ন কাজ, দান-সাদাকাহ, সৎ কাজের আদেশ, অসৎ কাজের নিষেধ, হারিয়ে যাওয়া পথিককে সঠিক রাস্তা দেখিয়ে দেয়া-ইত্যাদি নেক কাজ তার জীবনকে ধ্বংস হওয়া থেকে রক্ষা করতে পারে। এ ক্ষেত্রেও বান্দার সামগ্রিক জীবনের তুলনামূলক অবস্থা বিবেচ্য। নেক ও কল্যাণের পাল্লা ভারি হলে তার জীবনের কাঁটা উন্নতি ও সফলতার দিকে ঘুরতে থাকবে। আর গুনাহ ও নাফরমানির পাল্লা ভারি হলে ধ্বংসের অনলে হারিয়ে যাবে তার জীবন। আনুগত্যশীল বান্দার পক্ষে স্বয়ং আল্লাহ তাআলা থাকেন। তিনি তাঁর অনুগত বান্দাকে জীবনের নানা ঘাত-প্রতিঘাত থেকে সুরক্ষিত রাখেন। এই সুরক্ষা বান্দা নিজ ঈমান-আমলের পরিমাণ অনুপাতে পেয়ে থাকে।

📘 রূহের খোরাক > 📄 গুনাহ মানুষকে হিতাহিত জ্ঞানশূন্য করে ফেলে

📄 গুনাহ মানুষকে হিতাহিত জ্ঞানশূন্য করে ফেলে


গুনাহের কারণে মানুষ নিজের ভালো-মন্দ বুঝতেও অক্ষম হয়ে যায়। প্রতিটি মানুষেরই জীবন-চলার পথে নানা প্রতিকূল ও অনুকুল অবস্থায় নিজের ভালো-মন্দ নিজেরই বুঝে নিতে হয়। যে ব্যক্তি এ ব্যাপারে সবচেয়ে বেশি পারদর্শী তাকেই অধিক বুদ্ধিমান ও জ্ঞানী বলা হয়। নিজের জীবনের ভালো দিকগুলো চিনে খুঁজে খুঁজে নিজেকে সেই পথে চালানো কিংবা জীবনের জন্য ক্ষতিকর সকল বিষয় থেকে সচেতনভাবে বেঁচে থাকার জ্ঞান ও যোগ্যতার দ্বারাই মানুষের স্তরে পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। গুনাহের কারণে মানুষ এই জ্ঞান ও যোগ্যতা থেকে বঞ্চিত হয়ে যায়।
একজন গুনাহগার ব্যক্তি যখন বিপদগ্রস্ত হয়, তখন তার নফস তাকে সাহায্য করতে পারে না। তাকে বিপদ থেকে উদ্ধার করার পরিবর্তে আরো বিপদগামী করে তোলে। অন্তর গুনাহের কারণে রুগ্ন হয়ে যায়। লাগাতার পাপের সাগরে ভেসে বেড়াতে বেড়াতে বান্দা যখন অসহায় হয়ে যায় বা কোনো বিপদে পড়ে, তখনও তার অন্তর তার ডাকে সাড়া দেয় না। বিপদ থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার মতো সামান্য খড়কুটোও সে হাতের নাগালে পায় না।
গুনাহে জর্জরিত অন্তর দিশেহারা হয়ে যায়। নিশ্চিন্ত, ভাবনাহীন অন্তরের প্রশান্তি তার জীবনে অধরাই থেকে যায়। জীবনের প্রকৃত সুখ সে কখনো অনুভব করতে পারে না। মৃত ব্যক্তির মতো বেঁচে থাকে এই পার্থিব জগতে।
গুনাহগার বান্দা যখন বিপদগ্রস্ত হয়, সে আল্লাহ তাআলার উপর তাওয়াক্কুল করতে পারে না। আল্লাহর উপর ভরসা করতে তার মন ও দেহ সায় দেয় না। মুসীবতের সময় আল্লাহমুখী হওয়া, কাকুতি-মিনতি করে মহান রবের সাহায্য প্রার্থনা করার কাজে অন্তর তাকে বাধা দিতে থাকে। আল্লাহ তাআলার নিকট সাহায্য প্রার্থনা করে দুআ করলেও তার অন্তর প্রার্থনার সময় উদাস ও বেখেয়ালি থাকে। তার দুআর মাঝে প্রাণ থাকে না, হৃদয় থেকে আবেগময় একনিষ্ঠ দুআ সে করতে পারে না। এমনকি মৃত্যুর সময় সে তার করুণ পরিণতি উপলব্ধি করা সত্ত্বেও মহান রবের দিকে ফিরে আসতে পারে না। জীবনের সব ভুল-ত্রুটি বোঝার পরও তাওবার জন্য তার অন্তর সায় দেয় না। তাওবার বাক্য তার মুখে আসে না। এমনকি মৃত্যুকালীন যন্ত্রণার সময়ও যদি তার পাশ থেকে কেউ তাকে 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' বলার জন্য উদ্বুদ্ধ করে, তবু সে মুখ দিয়ে পবিত্র কালিমা উচ্চারণ করতে পারে না। এমন অসংখ্য ঘটনা বিভিন্ন কিতাবে পাওয়া যায় যে, মৃত্যুর আগ মুহূর্তে যখন কালিমা পড়ার জন্য পাশ থেকে কেউ উদ্বুদ্ধ করতে থাকে, তখন মুখ থেকে কালিমা উচ্চারিত হয় না। দুনিয়ার যে কাজে সে লিপ্ত থাকে সে কাজের জন্যই তার অন্তরে হাহাকার তৈরি হয়। ফলে সেই মুহূর্তে তাকে যখন কালিমার তালকীন[১] করার কথা, তখন সে বলতে থাকে—
হায় আমার ব্যবসা!
হায় আমার দোকান!
হায় আমার প্রতিষ্ঠানের কী হবে!
হায় আমার দলের কী হবে!
এক বুযুর্গ তাঁর এক ব্যবসায়ী আত্মীয়ের মৃত্যুকালীন ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, 'তাকে যখন কালিমার তালকীন করা হচ্ছিল, তখন সে বলতে লাগল— "এই পণ্যটির এই দাম, এই পণ্যটি অত্যন্ত ভালো, এটা নিতে পারেন...।"'
আবার কখনো কখনো মৃত্যুশয্যায় শায়িত ব্যক্তিকে কালিমার তালকীন করা হয় ঠিকই, সে নিজ থেকেও পড়তে আগ্রহী হয়, কিন্তু অদৃশ্য কোনো বাধায় সে আটকে যায়। তার মুখে জড়তা চলে আসে। মুখ দিয়ে আল্লাহ্ শব্দ উচ্চারণ সে আর করতে পারে না। এক ব্যক্তির ঘটনা বর্ণিত আছে, তার মৃত্যুশয্যায় কালিমার তালকীন করা হলে সে বলে, 'আমি তো লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলতে চাই, কিন্তু আমার জিহ্বার জড়তা আমাকে উচ্চারণ করতে দিচ্ছে না।'
আল্লাহ্ আমাদের সবাইকে হেফাযত করুন! এই করুণ মৃত্যুই গুনাহ থেকে মানুষকে বিরত রাখার জন্য যথেষ্ট। তবু মানুষ গুনাহের দিকে ঝুঁকে যায়। স্বাচ্ছন্দ্যে পাপকাজে জড়িয়ে পড়ে। সুস্থ মস্তিষ্কে, নিরাপদ ও নিশ্চিন্ত মুহূর্তে সে পাপাচারে লিপ্ত হয়। মহান রবের আনুগত্য করার অবারিত ও অফুরন্ত সুযোগ থাকা সত্ত্বেও সে আল্লাহর অবাধ্য হয়। গুনাহের প্রতি অন্ধ ভালোবাসায় মগ্ন হয়। ফলে যখন মৃত্যুর যন্ত্রণায় সে কাতর হয়ে যায় তখন গুনাহের অভ্যাস থেকে আর বের হতে পারে না। সুস্থ ও স্বাভাবিক অবস্থায় সে যেই গুনাহের কুমন্ত্রণা থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারেনি, মৃত্যুর যন্ত্রণায় কাতর মুহূর্তে সেই গুনাহের বিষজাল ছিঁড়ে সে বেরিয়ে আসতে পারে না। জীবনের এই অন্তিম সময়ে শয়তানও তার সমস্ত শক্তি প্রয়োগ করে গুনাহগার বান্দার মুক্তির সকল পথ ও উপকরণকে বন্ধ করে দিতে তৎপর হয়ে যায়। আল্লাহর দরবারে উপস্থিত হওয়ার শেষ সময়টুকু শয়তান বান্দাকে নিজের অনুগত করে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করে। তাওবার সকল রাস্তা গুনাহগার ব্যক্তির থেকে ক্রমশই দূর থেকে দূরে সরে যেতে থাকে। আল্লাহ তাআলার ইরশাদ-
يُثَبِّتُ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا بِالْقَوْلِ الثَّابِتِ فِي الْحَيَوَةِ الدُّنْيَا وَفِي الْآخِرَةِ وَيُضِلُّ اللَّهُ الظَّالِمِينَ وَيَفْعَلُ اللَّهُ مَا يَشَاءُ
'আল্লাহ তাআলা মুমিন বান্দাদেরকে শক্তিশালী কালিমা দ্বারা দৃঢ়পদ রাখেন। জালিমদেরকে পথভ্রষ্ট করেন। আর আল্লাহ তাআলা যা ইচ্ছা তাই করেন।'
সুতরাং আল্লাহ তাআলা যার অন্তরকে গাফিল করে দিয়েছেন, যার কাজকর্ম শরীয়তের সীমা অতিক্রম করে ফেলে, সে কীভাবে মঙ্গলজনক পরিণতি আর উত্তম উপসংহারের ব্যাপারে নিশ্চিন্ত থাকতে পারে! যে ব্যক্তি তার মনোবাসনার পূজা করে, মহান রবের আনুগত্য থেকে দূরে থাকে, যার মুখে সারাজীবন মহান রবের নাম উচ্চারিত হয়নি, সে তার জীবনের অন্তিম সময়েও আল্লাহ তাআলাকে স্মরণ করতে অক্ষম হবে। তার পঙ্কিল যবানে মহান রবের পবিত্র নাম উচ্চারণ করার সৌভাগ্য সে লাভ করতে ব্যর্থ হবে।
অথচ মুত্তাকী ও আল্লাহভীরু বান্দারাও জীবনের অন্তিম মুহূর্তের ভয়ে কাবু হয়ে আছেন। আর গুনাহগার ও পাপিষ্ঠরা যেন নিজেদের বাধাহীন জীবনের নিরাপত্তার কোনো নিশ্চয়তার ওয়াদা লাভ করেছে আল্লাহ তাআলার তরফ থেকে।
তাদের উদ্দেশ্যেই কুরআনুল কারীমের এই আয়াত-
أَمْ لَكُمْ أَيْمَانُ عَلَيْنَا بَالِغَةٌ إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ إِنَّ لَكُمْ لَمَا تَحْكُمُونَ - سَلْهُمْ أَيُّهُمْ بِذَلِكَ زَعِيمٌ
'নাকি তোমরা আমার থেকে কিয়ামত দিবস পর্যন্ত স্থায়ী কোনো শপথ নিয়েছ, তোমরা যেমন চাও তোমাদের জন্য তাই থাকবে? হে নবী! আপনি জিজ্ঞেস করুন, এ ব্যাপারে তাদের দায়িত্বশীল কে?'[১]
হাফিয আবু মুহাম্মাদ আবদুল হক ইবনু আবদির রহমান আল-আশবিলী বলেন, 'মানব-জীবনের করুণ পরিণতির অনেকগুলো কারণ ও উপকরণ আছে (আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে জীবনের করুণ পরিণতি থেকে রক্ষা করুন।)। সেগুলো হলো-
১. মানুষ জগত-সংসারের প্রতি মোহগ্রস্ত হয়ে দুনিয়ার পেছনে ছুটতে থাকবে।
২. পরকাল-ভাবনা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে।
৩. আল্লাহ তাআলার অবাধ্যতা ও নাফরমানিতে দুঃসাহসিকতার পরিচয় দেবে।
কখনো বান্দা নির্দিষ্ট গুনাহের দিকে ধাবিত হয়, সেই সাথে কোনো এক বিষয়ে আল্লাহ তাআলার নাফরমানি করে এবং কোনো এক ক্ষেত্রে এসে আল্লাহ তাআলার প্রতি সে দুঃসাহসমূলক আচরণ করে থাকে। এর পরিণতিতে সে তার অন্তরের নিয়ন্ত্রণ শয়তানের হাতে ন্যস্ত করে। তার বিবেক-বুদ্ধি লোপ পেয়ে যায়। অন্তর্দৃষ্টি নষ্ট হয় এবং জীবনে একটি অন্তরায় সৃষ্টি হয়। তখন কোনো নসীহত তার কোনো কাজে আসে না। এ অবস্থাতেই কখনো তার মৃত্যু চলে আসে। বহু দূর থেকে তাওবার কোনো আহ্বান হয়তো তাকে হাতছানি দেয়, কিন্তু তাওবা তার নসীবে জোটে না।
আবু মুহাম্মদ আল-আশবিলী এ বিষয়ক একটি ঘটনা উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, 'খলীফা নাসিরের নিকটস্থ কিছু লোক আমাকে নাসিরের মৃত্যুকালীন অবস্থার বর্ণনা দিল। তারা বলল, নাসিরের যখন মৃত্যুর সময় ঘনিয়ে আসে, তখন তার শিয়রে তার সন্তান বসে তাকে কালিমা পাঠ করতে উদ্বুদ্ধ করছিল। কিন্তু সে কালিমা পাঠ না করে জিজ্ঞেস করে, "আমার গোলাম কোথায়?” তার ছেলে আবারও তাকে কালিমার তালকীন করে। কিন্তু সে তার গোলামের কথা জানতে চায়। এভাবে এক পর্যায়ে সে সংজ্ঞাহীন হয়ে যায়। জ্ঞান ফিরে এলে সে আবার তার গোলামের কথা জানতে চায়। এরপর সে তার ছেলেকে বলে, "শুনে রাখো! আমি তোমার তরবারি চালানোর নৈপুণ্য দেখেছি। তুমি দ্রুত তরবারি নিয়ে লড়াইয়ে বের হও। একথা বলেই সে কালিমা না পড়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে.""
আশবিলী এমন আরেকজনের ঘটনা উল্লেখ করে বলেন, 'মৃত্যুর সময় ঐ ব্যক্তিকে বলা হলো, "তুমি কালিমা পড়ো।” সে কালিমা না পড়ে বলতে লাগল, "আমার অমুক বাড়ির এই জায়গাটা সংস্কার করা দরকার, ঐ বাগানে এই কাজ করা দরকার.""
এরকম আরেক লোকের কথা বর্ণিত আছে; মৃত্যুকালীন যন্ত্রণায় যখন তাকে কালিমার তালকীন করা হলো, তখন সে এক তরুণীর প্রেমে বিভোর হয়ে তাকে নিয়ে কবিতা আবৃত্তি করতে লাগল।
সুফিয়ান সাওরী একবার রাতভর কান্না করলে লোকেরা জিজ্ঞেস করল, 'আপনার সারারাতের কান্না কি শুধুই গুনাহের ভয়ে?' সুফিয়ান সাওরী তখন হাতে মাটি নিয়ে বললেন, 'গুনাহ তো এই মাটির থেকে তুচ্ছ। আমি তো সারারাত কেঁদেছি জীবনের করুণ পরিণতির আশঙ্কায়।'
ইমাম আহমাদ আবু দারদা রাদিয়াল্লাহু আনহু'র মৃত্যুকালীন অবস্থা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, 'যখন তিনি মৃত্যুশয্যায় শায়িত ছিলেন এবং মৃত্যুযন্ত্রণায় কাতর হয়ে বারবার জ্ঞান হারিয়ে ফেলছিলেন, তখন তিনি আল্লাহ তাআলার এই আয়াত তিলাওয়াত করছিলেন-
وَنُقَلِّبُ أَفْئِدَتَهُمْ وَأَبْصَارَهُمْ كَمَا لَمْ يُؤْمِنُوا بِهِ أَوَّلَ مَرَّةٍ وَنَذَرُهُمْ فِي طُغْيَانِهِمْ يَعْمَهُونَ
'আর আমি ঘুরিয়ে দেব তাদের অন্তর আর চক্ষুকে, যেভাবে তারা প্রথমবার ঈমান আনেনি। এবং আমি তাদেরকে তাদের অবাধ্যচারিতায় উদ্ভ্রান্ত অবস্থায় ছেড়ে দেব।'১৯
আবদুল হক কর্তৃক লিখিত আল-আকিবাহ (পরিণতি) গ্রন্থে উল্লেখ আছে, এক ব্যক্তি সর্বদা মসজিদে আযান ও নামাযের সময় উপস্থিত থাকত। তার চালচলনে আল্লাহ তাআলার পূর্ণ আনুগত্য ও একনিষ্ঠ ইবাদাতের ছাপ ছিল। একদিন সে মিনারের চূড়ায় উঠল আযান দেওয়ার উদ্দেশ্যে। এমন সময় মসজিদের পার্শ্ববর্তী এক খ্রিষ্টান-বাড়ির মেয়ের দিকে তার দৃষ্টি পড়ে যায়। খ্রিষ্টান মেয়ের সৌন্দর্যে সে বিমোহিত হয়ে আযান দেওয়া বাদ দিয়ে মিনার থেকে নেমে সোজা মেয়ের বাড়িতে গিয়ে উপস্থিত হয় এবং তাকে বিয়ের প্রস্তাব দেয়। মেয়েটি তাকে জানিয়ে দেয়, 'আমার বাবা আমাকে কোনো মুসলমানের কাছে বিয়ে দিবেন না। তুমি খ্রিষ্টান হলেই তবে আমাকে বিয়ে করতে পারবে।' মেয়ের সৌন্দর্যের ঘোরে লোকটি ইসলাম ত্যাগ করে খ্রিষ্টান হয়ে যায়। কিন্তু যেদিন সে ধর্মান্তরিত হয়ে খ্রিষ্টান হয়, সেদিনই সে ঘরের ছাদ থেকে পড়ে মারা যায়। এভাবে সে সারাজীবন আল্লাহ তাআলার অনুগত হয়ে জীবন যাপন করেও খ্রিষ্টান অবস্থায় ইন্তিকাল করে তার সারাজীবনের সকল পুণ্য আর সাওয়াব থেকে বঞ্চিত হয়েছে।
এ কারণেই আমাদের পূর্ববর্তী বুযুর্গ, পীর-মাশায়েখগণ জীবনের মন্দ অবসানের ব্যাপারে সবসময় চিন্তিত থাকতেন। উত্তম জীবনাবসানের জন্য আল্লাহ তাআলার নিকট দুআ ও রোনাজারি করতেন।

টিকা:
[১] তালকীনের নিয়ম হলো, মৃত্যুশয্যায় শায়িত ব্যক্তির পাশ থেকে কেউ আওয়াজ দিয়ে কালিমা পাঠ করে তাকে শোনাতে থাকবে, তাকেও কালিমা পড়ার জন্য উদ্বুদ্ধ করতে থাকবে। তবে কালিমা পড়ার জন্য তাকে সরাসরি আদেশ করবে না। মৃত্যুচিন্তায় বা জাগতিক কোনো পেরেশানিতে হয়তো সে কালিমা পড়তে অস্বীকার করে বসতে পারে, এবং এভাবে নিকৃষ্ট অবস্থায় তার মৃত্যু হতে পারে। তাই তাকে কালিমা পাঠের জন্য আদেশ করা যাবে না। বরং উচ্চারণ করে কালিমা পাঠ করে তাকে শোনাতে হবে।
[১] সূরা ইবরাহীম, আয়াত-ক্রম: ২৭
[১] সূরা কলম, আয়াত-ক্রম: ৩৯, ৪০
[১] সূরা আনআম, আয়াত-ক্রম: ১১০

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00