📄 গুনাহ আল্লাহর সাথে বান্দার সম্পর্ক নষ্ট করে
গুনাহের উল্লেখযোগ্য একটি ক্ষতি হলো, গুনাহ আল্লাহ তাআলা ও বান্দার মধ্যকার সম্পর্ক বিনষ্ট করে। আর আল্লাহ তাআলার সাথে যখন বান্দার সম্পর্ক নষ্ট হয়ে যায় তখন যাবতীয় কল্যাণের দরজা তার জন্য বন্ধ হয়ে যায়। বান্দার সামনে তখন অকল্যাণ আর অমঙ্গলের দ্বার উন্মোচিত হয় যায়। জীবনের সফলতা, আশা-ভরসা-সব নিঃশেষ হয়ে যায় তার জন্য। চিরন্তন শ্বাশত অভিভাবক আল্লাহ তাআলার সাথে এক মুহূর্তের সম্পর্কহীনতার কোনো ক্ষতিপূরণ নেই। বান্দাকে এর পরিণতি অবশ্যই ভোগ করতে হয়। অমঙ্গলের সকল উপায় ও উপকরণ তার সামনে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে দেয়া হয়। মহান রবের সাথে এই সম্পর্কহীনতার কুফল ও পরিণতি বান্দা কল্পনাও করতে পারে না।
একজন আল্লাহওয়ালা বুযুর্গ বলেন, 'বান্দা যদি আল্লাহ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, শয়তান তার অভিভাবকত্ব গ্রহণ করে। আর আল্লাহর অভিভাবকত্বে যদি সে থাকে তাহলে শয়তানের কুমন্ত্রণা তাকে ধরাশায়ী করতে পারে না।' আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-
وَإِذْ قُلْنَا لِلْمَلَائِكَةِ اسْجُدُوا لِآدَمَ فَسَجَدُوا إِلَّا إِبْلِيسَ كَانَ مِنَ الْجِنِّ فَفَسَقَ عَنْ أَمْرِ رَبِّهِ أَفَتَتَّخِذُونَهُ وَذُرِّيَّتَهُ أَوْلِيَاءَ مِنْ دُونِي وَهُمْ لَكُمْ عَدُوٌّ
'আর আপনি স্মরণ করুন, যখন আপনার রব ফিরিশতাদেরকে আদেশ করে বললেন, তোমরা আদমকে সিজদা করো, তখন ইবলিস ব্যতীত সবাই সিজদা করল। সে ছিল জীন জাতির অন্তর্ভুক্ত। সে তার রবের আদেশ অমান্য করল। সুতরাং তোমরা কি আমাকে রেখে তাকে এবং তার বংশধরকেই অভিভাবক হিসেবে গ্রহণ করছ? অথচ তারা তোমাদের স্পষ্ট দুশমন।[১]
এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাদেরকে লক্ষ করে বলেছেন-আমি তোমাদের পিতা আদমকে সৃষ্টি করেছি। তাকে সম্মানিত করেছি। তার মর্যাদা সমুন্নত করেছি। শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছি। তার সম্মানার্থে তাকে সিজদা করার জন্য আমার সকল ফিরিশতাকে আদেশ করেছি। ফিরিশতাগণ আমার কথা অনুযায়ী তাকে সিজদাহ করল। কিন্তু আমার ও আদমের শত্রু সিজদা করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে আমার আনুগত্য ত্যাগ করল। আমার থেকে মুখ ফিরিয়ে সেই শত্রু ও তার অনুগামীদেরকে অভিভাবক হিসেবে গ্রহণ করা তোমাদের জন্য কীভাবে শোভা পায়? আমারই নাফরমানির জন্য তোমরা তার অনুসরণ করবে? আমার সন্তুষ্টির বিপরীতে তোমরা তার অধীন হবে! অথচ ইবলিস ও তার বংশধরেরা তোমাদের চূড়ান্ত দুশমন। আমি আল্লাহ তার বিরুদ্ধচারণের জন্য তোমাদেরকে আদেশ করেছি। আমিই তো বিশ্বজগতের বাদশাহ! জগতের বাদশাহর দুশমনের সাথে যাদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকে তারাও বাদশাহর দুশমনের মতোই। জেনে রাখো, দুশমনের বিরুদ্ধচারণ ব্যতীত আমার প্রতি তোমাদের আনুগত্য ও ভালোবাসা পূর্ণতা লাভ করতে পারে না। আর অভিশপ্ত নরাধম ইবলিস; সে তো শুধু আমার শত্রু নয়, তোমাদেরও শত্রু। সুতরাং কীভাবে তোমরা তার প্রতি আন্তরিক হওয়ার ইচ্ছা পোষণ করো! আমার অধীনতার দাবি নিয়ে তোমরা কীভাবে তাকে ও তার সহকারীদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করতে আগ্রহী হও!
আল্লাহ তাআলা মুমিন বান্দাদেরকে এখানে যে সুরে সম্বোধন করেছেন, এরমধ্যে সূক্ষ্ম এক ধরনের ভর্ৎসনাও লুকিয়ে আছে; যে ভর্ৎসনার ভাষ্য অনেকটা এরকম— 'তোমাদের আদি পিতা আদমকে আমি সৃষ্টি করে আমার উত্তম সৃষ্টি ফিরিশতা-জাতিকে আদেশ করেছি তাকে সম্মান প্রদর্শন করতে। আদমের সম্মানার্থে আমি তাদেরকে সিজদা করারও নির্দেশ দিয়েছি। নির্দেশ মুতাবিক তারা তাকে সম্মানপ্রদর্শনপূর্বক সিজদা করেছে। কেবল ইবলিস তার নিজ অহংকারের দরুণ সিজদা করা থেকে বিরত থেকেছে। তোমাদের আদি পিতার জন্যেই সে আমার শত্রুতে পরিণত হয়েছে। সেই শত্রুর সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক স্থাপন করে তোমরা এখন আমার এই দুশমনির প্রাপ্য দিচ্ছ!
টিকা:
[১] সূরা কাহাফ, আয়াত-ক্রম: ৫০
📄 গুনাহ মানব-জীবনের বারাকাহ নিঃশেষ করে দেয়
গুনাহ মানব-জীবনের বারাকাহ নষ্ট করে ফেলে। গুনাহগার ব্যক্তির আয়ুষ্কাল, রিযিক, ইলম, আমল ও ইবাদাতে কোনো বারাকাহ থাকে না। তার দুনিয়া ও আখিরাতের যাবতীয় বারাকাহ নিঃশেষ হয়ে যায়। আল্লাহর নাফরমানিতে লিপ্ত ব্যক্তির জীবনে প্রাচুর্য হারিয়ে যায়। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-
وَلَوْ أَنَّ أَهْلَ الْقُرَى آمَنُوا وَاتَّقَوْا لَفَتَحْنَا عَلَيْهِمْ بَرَكَاتٍ مِنَ السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ
'আর যদি জনপদের অধিবাসীগণ ঈমান আনত এবং তাকওয়া অবলম্বন করত, তাহলে আমি তাদের জন্য আসমান ও জমিনের নিয়ামতসমূহের বারাকাহ'র দ্বার উন্মুক্ত করে দিতাম।।'১
অন্যত্র ইরশাদ করেন-
وَأَنْ لَوِ اسْتَقَامُوا عَلَى الطَّرِيقَةِ لَأَسْقَيْنَاهُمْ مَاءً غَدَقًا لِنَفْتِنَهُمْ فِيهِ
'আর তাদেরকে এ মর্মে প্রত্যাদেশ প্রেরণ করা হয়েছে যে, তারা যদি সত্যের পথে অবিচল থাকত, তাহলে আমি প্রচুর পানি বর্ষণের নিয়ামতে পরীক্ষাস্বরূপ তাদেরকে সিক্ত করতাম।'২
একজন বান্দা অবশ্যই তার কৃত গুনাহের কারণে রিযিক থেকে বঞ্চিত হয়। হাদীস শরীফে বর্ণিত হয়েছে, নবীজি ইরশাদ করেন, 'রুহুল কুদুস আমার অন্তরে এ কথা ঢেলে দিয়েছেন যে, জগতের প্রতিটি প্রাণীই তার নির্ধারিত রিযিক ভোগ করে মৃত্যুবরণ করবে। সুতরাং তোমরা আল্লাহ তাআলাকে ভয় করো এবং উত্তমভাবে রিযিক তালাশ করো। আর আল্লাহর নিকট তোমাদের জন্য যা কিছু রয়েছে তা কেবল তাঁর আনুগত্য দ্বারাই অর্জন করা সম্ভব।'৩
স্বস্তি ও নির্মল আনন্দ মহান রবের সন্তুষ্টি ও তাঁর প্রতি দৃঢ় বিশ্বাসের মধ্যেই নিহিত রয়েছে। তিনি দুশ্চিন্তা, দুর্ভাবনা ও কষ্ট-ক্লেশকে তাঁর প্রতি সন্দেহবোধ আর তাঁর অসন্তুষ্টির মধ্যে রেখে দিয়েছেন।
এর আগের একটি অনুচ্ছেদে ইমাম আহমাদ রাহিমাহুল্লাহ'র কিতাবুয যুহদ থেকে একটি হাদীসে কুদসী উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন— ‘আমি আল্লাহ, যখন আমি রাজি-খুশি থাকি, তখন বারাকাহ দান করি; আমার বারাকাহ সীমাহীন। আর যখন আমি রাগান্বিত হই, তখন বান্দার ওপর লানত বর্ষণ করি। আমার লানত বান্দার সাত প্রজন্মকে গ্রাস করে নেয়। [১]
বান্দার রিযিক ও কর্মের ব্যাপকতা এবং পরিধি মূলত পরিমাণের আধিক্য দিয়ে নির্ণিত হয় না। জীবনের আয়ুষ্কাল মাস আর বছরের গণনা দিয়ে বিবেচনা করা যায় না। জীবন আর রিযিকের পরিধির ব্যাপকতা প্রকৃতপক্ষে আল্লাহপ্রদত্ত বারাকাহ দ্বারাই তৈরি হয়। [২]
আল্লাহ তাআলার অবাধ্যতার কারণে মানুষের রিযিক ও জীবনের বারাকাহ নষ্ট হয়ে যায়। কেননা আল্লাহ তাআলার অবাধ্যতা ও নাফরমানির নেতৃত্বে থাকে অভিশপ্ত ইবলিস। যারা নাফরমানিতে লিপ্ত হয়, তাদের শাসক ও রক্ষকের ভূমিকায় শয়তান সর্বদা সক্রিয় থাকে। শয়তানের দিক-নির্দেশনার অধীন হয়ে যায় গুনাহগারের দল। আর নশ্বর এই পৃথিবীর যেসকল অঙ্গন শয়তানের পদচারণায় মুখরিত হয়, জীবনের যেসকল ক্ষেত্রে শয়তানের প্রভাব বিস্তার করে সেসকল স্থান ও অঙ্গন থেকে আল্লাহ তাআলার বারাকাহ উঠিয়ে নেওয়া হয়। আমাদের দৈনন্দিন জীবনের প্রতিনিয়ত কাজের শুরুতে আল্লাহ তাআলার নাম উচ্চারণের একটি নিগূঢ় রহস্য উন্মোচিত হয় এই আলোচনাতে। হাদীসে প্রাত্যহিক সকল কাজের শুরুতে বিসমিল্লাহ পড়া বা আল্লাহর নাম নেওয়ার জন্য আমাদেরকে উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে। প্রতিটি কাজের শুরুতে আল্লাহর নাম উচ্চারণকে ইসলামী শরীয়তে যথেষ্ট গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। পোষাক পরিধান করা, ঘর থেকে বের হওয়া, ঘরে প্রবেশ, পানাহার, গাড়িতে আরোহণ, স্ত্রী-সহবাস-ইত্যাদি সকল কাজের শুরুতেই আল্লাহর নাম নেওয়া সুন্নত। পবিত্র এই নাম বারাকাহ নামিয়ে আনে, শয়তানকে দূরীভূত করে দেয়।
মানব-জীবনের বারাকাহ কেবল আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকেই অর্জিত হয়। তিনি ব্যতীত কেউ বারাকাহ দান করতে সক্ষম নয়। জগতের সকল বারাকাহ'র আধার একমাত্র তিনিই। এমনকি আল্লাহ তাআলার সাথে যতকিছু সম্পৃক্ত করা হয়, সবকিছুই বারাকাহপূর্ণ বা মুবারক হয়ে যায়। আল্লাহ তাআলার পবিত্র কালাম, তাঁর প্রেরিত রাসূল, মুমিন বান্দাগণ, কাবা শরীফ-সকল কিছুই বারাকাতে ভরপুর। কিনআন [১] অঞ্চলকেও বরকতময় হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে পবিত্র কুরআনে। আল্লাহ তাআলার দিকে যা কিছুই সম্পৃক্ত করা হয়, তার সবই বারাকাহসমৃদ্ধ হয়ে যায়। এই সম্পৃক্তির অর্থ হলো, আল্লাহ তাআলার প্রভুত্ব, আনুগত্য, তাঁর প্রতি ভক্তি, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার দিকে সম্পৃক্ত হওয়া। এই অর্থের বাইরে সৃষ্টিজগতের সবকিছু আল্লাহ তাআলার দিকে সর্বদাই সম্পৃক্ত।
আল্লাহ তাআলা বারাকাহর বিপরীতে লানত বা অভিশাপ রেখেছেন। তিনি যেমন তাঁর নির্বাচিত সৃষ্টিজগত বারাকাহসমৃদ্ধ করেছেন, তেমনি জগতের কিছু হতভাগা সৃষ্টির ওপর অভিশাপও দিয়েছেন। পাপাচারে ভরপুর পৃথিবীর কোনো কোনো অঞ্চলেও আল্লাহ তাআলা অভিসম্পাত করেছেন। তেমনি নরাধম কিছু পাপিষ্ঠ ব্যক্তিও আল্লাহর লানতের অনলে ভষ্ম হয়েছে তাদের গুনাহের কারণে। আল্লাহর অভিশাপে জর্জরিত এসকল স্থান, মানুষ আর কাজ যাবতীয় কল্যাণ ও বারাকাহ থেকে সর্বদা বঞ্চিত থাকে।
আল্লাহ তাআলা ইবলিসকে অভিশপ্ত করেছেন, নিকৃষ্ট জীবে পরিণত করে তাকে রহমত থেকে বহু দূরে ঠেলে দিয়েছেন। আর যারা এই অভিশপ্ত ইবলিসের আনুগত্য করে ইবলিসের নিকটভাজনে পরিণত হয়, তারাও আল্লাহ তাআলার অভিশাপে আটকে যায়। এই অভিশাপের কারণে তাদের জীবন ও সম্পদ থেকে বারাকাহ নিঃশেষ হয়ে যায়।
জীবনের যে সময়, অর্থ, বুদ্ধি, জ্ঞান ও সম্মান মহান রবের নাফরমানিতে ব্যয় করা হয়, তা বান্দার কোনো কাজে আসে না। বরং ব্যয়কৃত এ সবকিছু আল্লাহ তাআলার দরবারে বান্দার বিরুদ্ধেই সাক্ষ্য দেবে। তাই একজন মানুষের জীবনের সে-সময়টুকুই তার কাজে আসবে, যে সময়ে সে আল্লাহ তাআলার আনুগত্য করেছে। যে সম্পদকে সে কল্যাণের জন্য ব্যয় করেছে, সে সম্পদই তাকে প্রকৃত উপকার পৌঁছাতে পারবে। যে বিদ্যা, বুদ্ধি ও সম্মানকে কাজে লাগিয়ে সে শরীয়তের হুকুম-আহকাম মেনেছে, আল্লাহ তাআলার দরবারে সে-সব তার পক্ষে সুপারিশ করবে।
এই দৃষ্টিকোণ থেকে পৃথিবীতে কেউ কেউ শতায়ু লাভ করলেও বেঁচে থাকার মতো বেঁচে থাকার আয়ুষ্কাল হয়তো তার থাকে ১০-১৫ বছর। কেমন যেন মূল্যবান ধন-রত্নের ভাণ্ডারের মালিক হয়েও সে নিজের কাজের জন্য ১০০- ২০০ টাকাও খরচ করতে অক্ষম।
তিরমিযী'র বর্ণনা, নবীজি ইরশাদ করেন-
الدُّنْيَا مَلْعُونَةٌ، مَلْعُونُ مَا فِيهَا، إِلَّا ذِكْرُ اللَّهِ وَمَا وَالَاهُ، أَوْ عَالِمُ أَوْ مُتَعَلَّمُ
'আল্লাহর যিকির এবং যিকির-সংশ্লিষ্ট অন্যান্য আমল, আলিম ও তালিবুল ইলম ব্যতীত জগতের সকল কিছুই অভিশপ্ত। [১]
অন্য হাদীসে বর্ণিত হয়েছে-
الدُّنْيَا مَلْعُونَةً مَلْعُونُ مَا فِيهَا إِلَّا مَا كَانَ لِلَّهِ
| 'পৃথিবীতে যা কিছু আল্লাহর জন্য নয়, তার সবই অভিশপ্ত।' [২]
অর্থাৎ, যা কিছু কেবল আল্লাহ তাআলার জন্য হবে, কিংবা তাঁর সাথে সম্পৃক্ত- সবই বারাকাহময়। এর বাইরের সকল আয়োজনই আল্লাহর অভিশাপে পূর্ণ।
টিকা:
[১] সূরা আরাফ, আয়াত-ক্রম: ৯৬
[২] সূরা জীন, আয়াত-ক্রম: ১৬, ১৭
[৩] হিলয়াতুল আওলিয়া-১০/২৬, ২৭
[১] ৪৭ নম্বর পৃষ্ঠার টীকা [৩] দ্রষ্টব্য।
[২] আল্লাহপ্রদত্ত বারাকাহ'র মূল রহস্য এখানেই। ধনাঢ্যতা ও অর্থ-বিত্তের আধিক্য মানুষের কোনো কাজে আসে না, যদি আল্লাহ তাআলা সেই বিত্তে বারাকাহ না দেন। বারাকাহবিহীন বিত্তের প্রাচুর্য মানুষের উপকার করতে পারে না। আর আল্লাহ তাআলা যদি বারাকাহ দান করেন, তাহলে সামান্য অর্থ-সম্পদও মানুষের জন্য যথেষ্ট হয়ে যায়। মানুষের জীবনও আল্লাহপ্রদত্ত বারাকাহর মাধ্যমে স্বার্থক ও কর্মমুখর হয়ে ওঠে। অনেকেই দীর্ঘায়ু লাভ করে, কিন্তু বারাকাহ না থাকায় তার জীবন অনর্থকই কেটে যায়। আবার আল্লাহপ্রদত্ত বারাকাহওয়ালা সংক্ষিপ্ত জীবন অল্প সময়ে এমন কাজ ও কর্মে সফলকাম হয়, যা দীর্ঘায়ুপ্রাপ্ত ব্যক্তির সারা জীবনেও অর্জন করা সম্ভব হয় না।
[১] বর্তমান সিরিয়াকে কুরআনুল কারীমে কিনআন বলে অভিহিত করা হয়েছে। শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়াহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, 'কুরআনের নয়টি আয়াতে শামের ফযীলত ও বারাকাহর কথা বলা হয়েছে।' আর আল্লামা ইবনুল কাইয়্যিম বলেন, 'ছয়টি আয়াতে শাম অঞ্চলের বরকতের কথা বলা হয়েছে।'
[১] তিরমিযী, হাদীস-ক্রম: ২৩২২
[২] তিরমিযী, হাদীস-ক্রম: ২৩২২
📄 গুনাহগার ব্যক্তি নীচুস্তরের জীবন যাপন করে
গুনাহের অন্যতম ক্ষতি হলো, গুনাহ মানুষকে নিম্নমানের পদ, মর্যাদা ও জীবনধারার দিকে ঠেলে দেয়। অথচ মানুষকে সুউচ্চ মর্যাদা দিয়ে সৃষ্টি করা হয়েছে।
আল্লাহ তাআলা তার সৃষ্টিজগতকে দুই স্তরে ভাগ করেছেন। সম্মানিত ও উঁচুস্তরের সৃষ্টিজগত এবং নিম্নস্তরের সৃষ্টিজগত। আল্লাহ তাআলা আনুগত্যশীল বান্দাদেরকে ‘ইল্লিয়্যীন’ নামের উঁচু স্তরে সমাসীন করবেন। আর নাফরমান বান্দাদেরকে নীচু স্তরে জায়গা দেবেন। মহান রবের এই স্তরবিন্যাস দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জগতেই কার্যকর হবে। আল্লাহর অনুগত বান্দাগণ পৃথিবীতে সম্মানের সাথে বসবাস করবেন। আর আল্লাহর হুকুম অমান্যকারীরা (আখিরাতে তো বটেই,) দুনিয়াতেও অপদস্থ হবে, লজ্জার জিন্দেগি যাপন করবে। আল্লাহ তাআলা তাঁর অনুগত বান্দাদের জন্য দুনিয়া ও আখিরাতের সম্মান দান করেছেন। আর লাঞ্ছনার বোঝা চাপিয়ে দিয়েছেন অবাধ্যদের উপর। নবীজি ইরশাদ করেন-
بُعِثْتُ بِالسَّيْفِ بَيْنَ يَدَيِ السَّاعَةِ، وَجُعِلَ رِزْقِي تَحْتَ ظِلِّ رُمْحِي، وَجُعِلَ الذُّلُّ وَالصَّغَارُ عَلَى مَنْ خَالَفَ أَمْرِي
‘আমাকে পৃথিবীর বুকে কিয়ামতের আগে সর্বশেষ নবী হিসেবে সত্য প্রতিষ্ঠা করতে তরবারি সমেত পাঠানো হয়েছে, বর্শার নিচে আমার রিযিক রাখা হয়েছে; যারা আমার বিরুদ্ধচারণ করবে, লাঞ্ছনা আর অপদস্থতা তাদের জন্য অপরিহার্য করে দেয়া হয়েছে।’
বান্দা যখনই আল্লাহর কোনো হুকুমের অবাধ্য হয়, সে তার স্থান থেকে এক ধাপ নিচে নেমে যায়। আর বান্দা যখন অবিরাম গুনাহে লিপ্ত থাকে তখন তার মান- মর্যাদা ও জীবনাচারেরও অধঃপতন ঘটতে থাকে। গুনাহে জর্জরিত পতনোন্মুখ জীবন সৃষ্টিজগতের একদম তলানিতে গিয়ে মুখ থুবড়ে পড়ে। যাকে পবিত্র কুরআনের ভাষায় ‘আসফালু সাফিলীন’ বলা হয়েছে।
পক্ষান্তরে বান্দা যখন মহান রবের আনুগত্যের পথে অগ্রসর হতে থাকে, তখন সে তার স্থান থেকে উঁচুতে আরোহণ করতে থাকে। আনুগত্যময় জীবন ধারণ করে সে সম্মান ও মর্যাদার সুউচ্চ শিখরে পৌঁছে যায়। আখিরাতে তাকে 'ইল্লিয়্যীন' নামক স্থানে সমাসীন করা হয়।
বান্দার সামগ্রিক জীবনের আমল অনুপাতে তার জন্য 'ইল্লিয়্যীন' কিংবা 'সাফিলীন'-এ দুই স্তরের যেকোনোটিতে জায়গা দেওয়া হবে।
টিকাঃ
[১] মুসনাদু আহমাদ, হাদীস-ক্রম : ৫১১8
📄 গুনাহগার ব্যক্তির প্রতি অন্যরা স্পর্ধা প্রদর্শন করে
গুনাহের উল্লেখযোগ্য একটি সাজা হলো, গুনাহগার ব্যক্তির প্রতি অন্য লোকেরা খুব সহজেই কঠোর ও স্পর্ধামূলক আচরণ করে থাকে। তাদের সাথে বেপরোয়া আচরণ করার মতো দুঃসাহসী হয়ে ওঠে সাধারণ লোকজন। শুধু মানুষই নয়, পুরো সৃষ্টিজগতই তাদের সাথে স্পর্ধামূলক আচরণ করে। ইবলিস বাহিনী তাকে বিভিন্ন ধরনের কুমন্ত্রণা দিয়ে উত্যক্ত করে তোলে, এবং বিভ্রান্ত করতে থাকে। মনের মধ্যে অমূলক ভয়-ভীতি ঢেলে দেয়। তার জন্য অকল্যাণ বয়ে আনে এবং মঙ্গলজনক চিন্তা তার মাথা থেকে সরিয়ে দেয়। ক্ষতিকর বিষয় থেকে সাবধানতা অবলম্বন করতে তার মনে থাকে না। শয়তানের প্ররোচনায় সে আল্লাহ তাআলার অবাধ্যতায় পূর্ণোদ্যমে মেতে ওঠে।
আশপাশের দুষ্ট প্রকৃতির মানুষেরাও তার সাথে স্পর্ধামূলক দুঃসাহসী আচরণ করতে থাকে। তার প্রতি তাদের কোনো সম্মান কিংবা শ্রদ্ধা অবশিষ্ট থাকে না। গুনাহগার ব্যক্তি প্রতাপশালী হলেও তার অনুপস্থিতিতে তাকে অবজ্ঞা ও ঘৃণা করা হয়। গুনাহগার ব্যক্তির প্রতি তার পরিবার, স্ত্রী-স্বজন, ছেলে-মেয়ে, প্রতিবেশী-সবাই অবাধ্য হয়ে ওঠে। এমনকি অবলা পশুও গুনাহগার ব্যক্তির অনুগত থাকে না।
একজন আল্লাহওয়ালা ব্যক্তি বলেছেন, 'যখন আমার দ্বারা কোনো গুনাহ হয়ে যায় তখন এর মন্দ প্রভাব আমি আমার স্ত্রী ও জীবজন্তুর আচরণে দেখতে পাই।' ক্ষমতাধর শাসকবর্গ ও বিচারালয়ের লোকজনও তার প্রতি কঠোর হয়ে যায়। কুরআন-সুন্নাহর শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত থাকলে শাসকবর্গ অবশ্যই তার উপর আল্লাহ তাআলার হুদুদ বা নির্ধারিত শাস্তি প্রয়োগ করতেন।
গুনাহগার ব্যক্তির নফসও তার সাথে দুঃসাহসী আচরণ করতে থাকে। হিংস্র সিংহের মতো গুনাহগার ব্যক্তির নফস তার জীবনের সকল ইচ্ছা ও চাওয়া-পাওয়াকে ছিন্নভিন্ন করে দেয়। সে নফসের গোলামে পরিণত হয়। এমনকি কখনো যদি সে ভালো কাজের ইচ্ছা পোষণ করে তার নফস তাকে বাধা দিতে থাকে। ভালোকাজে নফস তার আনুগত্য করে না। বরং ক্রমশ তাকে ধ্বংসের দিকে টেনে নেয়।
নফসের সাথে বান্দার যে বিরামহীন দ্বন্দ্ব, সেই দ্বন্দ্ব নিরসনের উপায় হলো, আল্লাহর আনুগত্যে ভরপুর গুনাহমুক্ত জীবন। মহান রবের আনুগত্য হলো দুর্গ, অনুগত বান্দা সেই দুর্গে নিরাপদ থাকে। আর আনুগত্যহীন জীবন ছেড়ে বান্দা গুনাহের জীবন গ্রহণ করে বান্দা সুরক্ষিত দুর্গের বাইরে চলে আসে। পথের বিভিন্ন দুশমন তাকে হামলা করে। এই হামলায় তার নৈতিক জীবন পর্যুদস্ত হয়ে যায়। এই বিপর্যস্ততা থেকে আল্লাহ তাআলার আনুগত্য তাকে বাঁচাতে পারে। মহান রবের স্মরণ, কল্যাণমূলক বিভিন্ন কাজ, দান-সাদাকাহ, সৎ কাজের আদেশ, অসৎ কাজের নিষেধ, হারিয়ে যাওয়া পথিককে সঠিক রাস্তা দেখিয়ে দেয়া-ইত্যাদি নেক কাজ তার জীবনকে ধ্বংস হওয়া থেকে রক্ষা করতে পারে। এ ক্ষেত্রেও বান্দার সামগ্রিক জীবনের তুলনামূলক অবস্থা বিবেচ্য। নেক ও কল্যাণের পাল্লা ভারি হলে তার জীবনের কাঁটা উন্নতি ও সফলতার দিকে ঘুরতে থাকবে। আর গুনাহ ও নাফরমানির পাল্লা ভারি হলে ধ্বংসের অনলে হারিয়ে যাবে তার জীবন। আনুগত্যশীল বান্দার পক্ষে স্বয়ং আল্লাহ তাআলা থাকেন। তিনি তাঁর অনুগত বান্দাকে জীবনের নানা ঘাত-প্রতিঘাত থেকে সুরক্ষিত রাখেন। এই সুরক্ষা বান্দা নিজ ঈমান-আমলের পরিমাণ অনুপাতে পেয়ে থাকে।