📄 গুনাহ মানুষকে নিন্দিত করে তোলে
গুনাহে নিমজ্জিত ব্যক্তির নাম থেকে উত্তম উপাধি ও পরিচয় তুলে নেয়া হয়। প্রশংসামূলক ও সম্মানসূচক উপাধি দ্বারা তার নাম ভূষিত হয় না। নিকৃষ্ট ও ঘৃণিত সব উপাধি তার জন্য বরাদ্দ হয়ে যায়। তার নামের সাথে কেউ তখন মুমিন, নেককার, মুহসিন, মুত্তাকী, আল্লাহর আনুগত্যশীল, তাওবাকারী, আল্লাহর ওলী, বুযুর্গ, আল্লাহভীরু, সালিহ, ন্যায়পরায়ণ, ইবাদাতগুজার, আল্লাহমুখী, উত্তম, আল্লাহর সন্তুষ্টিপ্রাপ্ত, নৈকট্যশীল বান্দা-ইত্যাদি বিশেষণ ব্যবহার করে না।
তার জন্য ব্যবহার করা হয় ফাজির, পাপিষ্ঠ, নাফরমান, মুখালিফ বা ইসলাম-বিদ্বেষী, গুনাহগার, মুফসিদ, বিশৃঙ্খলাকারী, খবিস, নিকৃষ্ট, নরাধম, যিনাকার, ব্যভিচারী, খুনি, মিথ্যুক, খিয়ানতকারী, অবিশ্বস্ত, চোর, ডাকাত, আত্মীয়তার সম্পর্কছিন্নকারী, ধোঁকাবাজ-ইত্যাদি সব মন্দ বিশেষণ।
এই ধরনের পঙ্কিলতাপূর্ণ নামেই গুনাহগারকে অভিহিত করা হয়। কুরআনুল কারীমে বলা হয়েছে-
بِئْسَ الْاِسْمُ الْفُسُوْقُ بَعْدَ الْاِيْمَانِ
'ঈমানের সৌভাগ্য অর্জনের পর কাউকে নিকৃষ্ট নামে ডাকা অত্যন্ত গর্হিত কাজ।।১৯
এই আয়াতে ঈমানদার ব্যক্তিকে ফাসিক বলে আহ্বান করতে নিষেধ করা হয়েছে। কিন্তু যে ব্যক্তি গুনাহে নিমজ্জিত হয়, বদকারের জীবনকে বেছে নেয়, সে মহান রবের ক্রোধের অনলে পুড়ে ভষ্ম হয়ে যায়। জাহান্নামের আগুন হয় তার গন্তব্য। জাগতিক জীবনে সে লাঞ্ছনা আর অপদস্থতাকে বরণ করে নেয়। পক্ষান্তরে নেককার ও সৎ বান্দাদের জন্য যেসকল নাম ও বিশেষণ ব্যবহার করা হয়, সেই নাম তাদেরকে মানবসমাজে শ্রেষ্ঠত্ব দান করে। মহান রবের সন্তুষ্টি অর্জন করে তারা। জান্নাতের সুশীতল জীবনধারা তাদেরকে আলিঙ্গন করে নেয়।
আল্লাহর অবাধ্য ব্যক্তি জাগতিক এই জীবনে যেসকল গ্লানিমূলক নিন্দনীয় নাম ও ভূষণের অধিকারী হয়, সমাজে তাকে যেসমস্ত লজ্জাজনক নামে তাকে ডাকা হয়, সুস্থ বিবেকের দৃষ্টিতে গুনাহ থেকে বিরত থাকার জন্য জাগতিক এই গ্লানি ও লজ্জাটুকুই যথেষ্ট। আর গুনাহ থেকে বিরত থেকে সৎ ও নেক কাজের তাৎক্ষণিক প্রতিদান হিসেবে একজন ঈমানদার ব্যক্তি জাগতিক যেসকল প্রশংসামূলক উপাধিতে ভূষিত হয়, শুধুমাত্র সেসব বিশেষণে বিশেষায়িত হওয়ার আকাঙ্ক্ষাটাই একজন বিবেকবান মানুষ আনুগত্যশীল ও ইবাদাতগুজার হবার জন্য যথেষ্ট।
টিকা:
[১] সূরা হুজুরাত, আয়াত-ক্রম: ১১
📄 গুনাহ মানুষের বিবেক-বুদ্ধিকে প্রভাবিত করে
গুনাহ মানুষের বোধ ও বুদ্ধি হ্রাস করায় ব্যাপক প্রভাব ফেলে। একজন চালাক-প্রকৃতির গুনাহগার বান্দার তুলনায় বুদ্ধিমান আনুগত্যশীল বান্দার মেধার প্রখরতা ও তীক্ষ্ণতা অধিক কার্যকরী থাকে। তার চিন্তা-চেতনায় সত্য ও সঠিক দিক ফুটে ওঠে। তাঁর মত ও প্রস্তাবনা বাস্তবমুখী ও গ্রহণযোগ্য হয়। পবিত্র কুরআনুল কারীমেও আল্লাহ তাআলা বিভিন্ন আয়াতে বুদ্ধিমান ও বিচক্ষণ লোকদেরকে উদ্দেশ্য করে ইরশাদ করেন-
وَاتَّقُونِ يَا أُولِي الْأَلْبَابِ
'বিবেক-বোধসম্পন্ন হে সম্প্রদায়! তোমরা আমাকে ভয় করো।'
فَاتَّقُوا اللَّهَ يَا أُولِي الْأَلْبَابِ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ
'সফল হওয়ার লক্ষ্যে তোমরা আল্লাহ তাআলাকে ভয় করো, হে বুদ্ধিমান সম্প্রদায়!'
وَمَا يَذَّكَّرُ إِلَّا أُولُو الْأَلْبَابِ
'প্রকৃত বিচক্ষণ ব্যক্তিরাই শিক্ষা অর্জন করে।'
আর বাস্তবতা হলো, প্রকৃত বুদ্ধিমান ও বিচক্ষণ ব্যক্তি কখনোই এমন সত্তার বিরুদ্ধাচরণ করতে পারে না, যাঁর নিয়ন্ত্রণে সে বেঁচে থাকে, যাঁর দৃষ্টিসীমার মাঝেই তার ওঠাবসা। যে মহান সত্তার নিকট কোনো বিষয়ই গোপন থাকে না, তার অবাধ্যতা প্রকাশ করে কোনো ব্যক্তি কখনোই নিজেকে পূর্ণ ও প্রখর মেধার অধিকারী দাবি করতে পারে না। প্রকৃতপক্ষে একজন গুনাহগার ব্যক্তিও আল্লাহ তাআলার ক্রোধে জর্জরিত হওয়া সত্ত্বেও প্রতিনিয়ত আল্লাহর নিয়ামতের দ্বারাই জীবন ধারণ করে বেঁচে থাকে। নাফরমানিতে লিপ্ত হয়ে সে জীবনের প্রতিটি ক্ষণে মহান রবের অসন্তুষ্টি, দূরত্ব আর অভিশাপের বোঝা বয়ে বেড়াচ্ছে।
পাপ-পঙ্কিলতাপূর্ণ জীবনের কালো অধ্যায়ে সে আল্লাহ তাআলার দয়ার দরজা থেকে প্রত্যাখ্যাত হয়ে অসহায় অবস্থায় দিন যাপন করছে, তার অবাধ্য আচরণে আল্লাহ তাআলা তার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন, তাকে পদে পদে অপদস্থ করছেন। জীবনের সুখ-শান্তি, মহান রবের সন্তুষ্টি, ভালোবাসা, নৈকট্য, চক্ষু ও অন্তরের প্রশান্তি, নেককার ও বুযুর্গ ব্যক্তিদের দলভুক্ত হওয়ার সৌভাগ্য- সার্থক জীবনের সকল উপাদান থেকে সে বঞ্চিত থেকে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত।
পার্থিব জীবনের ক্ষণস্থায়ী ভোগ-বিলাসে মোহগ্রস্ত কোনো পাপিষ্ঠ লোককে এজন্যই পূর্ণমাত্রার বিচক্ষণ ও বুদ্ধিমান বলে বিশেষায়িত করা সম্ভবপর হয়ে ওঠে না। ক্ষণস্থায়ী এ আনন্দ-উপকরণ একদিন তার জীবন থেকে আধোঘুমের স্বপ্নের মতো নিঃশেষ হয়ে যাবে। চিরস্থায়ী সুখ-শান্তি আর মহাসাফল্যের সোপান অধরাই থেকে যাবে তার জীবনে। জাগতিক ও পরকালীন জীবনের এ মহাসৌভাগ্যকে স্বেচ্ছায় ত্যাগ করে অস্থায়ী ও অনিশ্চিত এক উশৃঙ্খল আয়েশি জীবন গ্রহণকারী এমন পাপিষ্ঠ ব্যক্তি যদি দুনিয়াবি অন্য কোনো স্বাভাবিক বিষয়ে বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিতে ব্যর্থ হতো, তাকে অবশ্যই মানসিক বিকারগ্রস্ত পাগল বলে আখ্যায়িত করা হতো।
সুস্থ বিবেক ও বুদ্ধিমত্তার আলোকে এ কথা সহজেই বোঝা যায়-প্রকৃত সুখ-শান্তি ও আরাম-আয়েশসহ সবধরনের নিয়ামত মহান রবের সন্তুষ্টিতেই নিহিত রয়েছে। আর সকল প্রকার দুঃখ, কষ্ট, ক্লেশ ও যন্ত্রণা রবের অসন্তুষ্টি ও ক্রোধের মাঝে লুকায়িত।
চোখের শীতলতা, আত্মার প্রশান্তি, প্রাণবন্ত হৃদয়, হৃদয়ের প্রফুল্লতা, জীবনের স্বাদ, বেঁচে থাকার স্বার্থকতা এবং পরকালের অমূল্য নিয়ামতরাজি—সবকিছুর চাবি হচ্ছে আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি। পরকালীন নিয়ামতের সামান্যতম অংশও যদি বান্দার ভাগ্যে জুটে যায়, দুনিয়ার সকল নিয়ামত তার নিকট তুচ্ছ ও গৌণ মনে হবে। মহান রবের আনুগত্য ও সন্তুষ্টির চেষ্টারত বুদ্ধিমান ও বিচক্ষণ ঈমানদার ব্যক্তি কার্যত দুনিয়াতেও আল্লাহর নাফরমান বান্দার চেয়ে উত্তম ও উৎকৃষ্ট জীবন যাপন করে। নিশ্চিন্ত ও ভাবনাহীন স্বাচ্ছন্দ্যময় এক জগত-সংসারে সে বসবাস করে। নাফরমান বান্দার তুলনায় তার জীবনের দুঃখ, কষ্ট, দুশ্চিন্তা তুলনামূলক কম ও সহনীয় পর্যায়ে থাকে। একজন নেককার বান্দা প্রকৃতপক্ষে একইসাথে দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জগতের নিয়ামতের সুখ-সাগরে ভাসতে থাকে। আর গুনাহগার বান্দার পরিণতি কতই-না করুণ! সাময়িক ও ক্ষণিকের ভোগ-বিলাসে মত্ত হয়ে সে চিরস্থায়ী সুখের ঠিকানা হারিয়ে ফেলে। সে যেন কোনো নির্বোধ ব্যবসায়ী; মূল্যবান মণিমুক্তা দিয়ে যে বাজার থেকে শুকনো গোবর খরিদ করে, সুগন্ধযুক্ত মেশক আম্বর দিয়ে কেনে দুর্গন্ধময় আবর্জনা। আল্লাহ তাআলার নিয়ামতপ্রাপ্ত নবী, সিদ্দীক, শহীদ ও নেকলোকদের সান্নিধ্য লাভের সুযোগ নষ্ট করে অভিশপ্ত লোকদের সংশ্রবকে সে গ্রহণ করেছে।
ক্ষণস্থায়ী এই দুনিয়ায় মুমিনগণ যে কষ্ট ও সাময়িক দুশ্চিন্তার শিকার হন, সে ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-
إِنْ تَكُونُوا تَأْلَمُونَ فَإِنَّهُمْ يَأْلَمُونَ كَمَا تَأْلَمُونَ وَتَرْجُونَ مِنَ اللَّهِ مَا لَا يَرْجُونَ
'যদি তোমরা কষ্টপ্রাপ্ত হও, তবে তারাও তো তোমাদের মতোই কষ্টপ্রাপ্ত হয়। কিন্তু তোমরা আল্লাহ তাআলার নিকট যা আশা করো, তারা তা আশা করে না।১৯
টিকা:
[১] সূরা বাকারা, আয়াত-ক্রম: ১৯৭
[২] সূরা মায়িদা, আয়াত-ক্রম: ১০০
[৩] সূরা বাকারা, আয়াত-ক্রম: ২৬৯
[১] সূরা নিসা, আয়াত-ক্রম: ১০৪
📄 গুনাহ আল্লাহর সাথে বান্দার সম্পর্ক নষ্ট করে
গুনাহের উল্লেখযোগ্য একটি ক্ষতি হলো, গুনাহ আল্লাহ তাআলা ও বান্দার মধ্যকার সম্পর্ক বিনষ্ট করে। আর আল্লাহ তাআলার সাথে যখন বান্দার সম্পর্ক নষ্ট হয়ে যায় তখন যাবতীয় কল্যাণের দরজা তার জন্য বন্ধ হয়ে যায়। বান্দার সামনে তখন অকল্যাণ আর অমঙ্গলের দ্বার উন্মোচিত হয় যায়। জীবনের সফলতা, আশা-ভরসা-সব নিঃশেষ হয়ে যায় তার জন্য। চিরন্তন শ্বাশত অভিভাবক আল্লাহ তাআলার সাথে এক মুহূর্তের সম্পর্কহীনতার কোনো ক্ষতিপূরণ নেই। বান্দাকে এর পরিণতি অবশ্যই ভোগ করতে হয়। অমঙ্গলের সকল উপায় ও উপকরণ তার সামনে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে দেয়া হয়। মহান রবের সাথে এই সম্পর্কহীনতার কুফল ও পরিণতি বান্দা কল্পনাও করতে পারে না।
একজন আল্লাহওয়ালা বুযুর্গ বলেন, 'বান্দা যদি আল্লাহ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, শয়তান তার অভিভাবকত্ব গ্রহণ করে। আর আল্লাহর অভিভাবকত্বে যদি সে থাকে তাহলে শয়তানের কুমন্ত্রণা তাকে ধরাশায়ী করতে পারে না।' আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-
وَإِذْ قُلْنَا لِلْمَلَائِكَةِ اسْجُدُوا لِآدَمَ فَسَجَدُوا إِلَّا إِبْلِيسَ كَانَ مِنَ الْجِنِّ فَفَسَقَ عَنْ أَمْرِ رَبِّهِ أَفَتَتَّخِذُونَهُ وَذُرِّيَّتَهُ أَوْلِيَاءَ مِنْ دُونِي وَهُمْ لَكُمْ عَدُوٌّ
'আর আপনি স্মরণ করুন, যখন আপনার রব ফিরিশতাদেরকে আদেশ করে বললেন, তোমরা আদমকে সিজদা করো, তখন ইবলিস ব্যতীত সবাই সিজদা করল। সে ছিল জীন জাতির অন্তর্ভুক্ত। সে তার রবের আদেশ অমান্য করল। সুতরাং তোমরা কি আমাকে রেখে তাকে এবং তার বংশধরকেই অভিভাবক হিসেবে গ্রহণ করছ? অথচ তারা তোমাদের স্পষ্ট দুশমন।[১]
এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাদেরকে লক্ষ করে বলেছেন-আমি তোমাদের পিতা আদমকে সৃষ্টি করেছি। তাকে সম্মানিত করেছি। তার মর্যাদা সমুন্নত করেছি। শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছি। তার সম্মানার্থে তাকে সিজদা করার জন্য আমার সকল ফিরিশতাকে আদেশ করেছি। ফিরিশতাগণ আমার কথা অনুযায়ী তাকে সিজদাহ করল। কিন্তু আমার ও আদমের শত্রু সিজদা করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে আমার আনুগত্য ত্যাগ করল। আমার থেকে মুখ ফিরিয়ে সেই শত্রু ও তার অনুগামীদেরকে অভিভাবক হিসেবে গ্রহণ করা তোমাদের জন্য কীভাবে শোভা পায়? আমারই নাফরমানির জন্য তোমরা তার অনুসরণ করবে? আমার সন্তুষ্টির বিপরীতে তোমরা তার অধীন হবে! অথচ ইবলিস ও তার বংশধরেরা তোমাদের চূড়ান্ত দুশমন। আমি আল্লাহ তার বিরুদ্ধচারণের জন্য তোমাদেরকে আদেশ করেছি। আমিই তো বিশ্বজগতের বাদশাহ! জগতের বাদশাহর দুশমনের সাথে যাদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকে তারাও বাদশাহর দুশমনের মতোই। জেনে রাখো, দুশমনের বিরুদ্ধচারণ ব্যতীত আমার প্রতি তোমাদের আনুগত্য ও ভালোবাসা পূর্ণতা লাভ করতে পারে না। আর অভিশপ্ত নরাধম ইবলিস; সে তো শুধু আমার শত্রু নয়, তোমাদেরও শত্রু। সুতরাং কীভাবে তোমরা তার প্রতি আন্তরিক হওয়ার ইচ্ছা পোষণ করো! আমার অধীনতার দাবি নিয়ে তোমরা কীভাবে তাকে ও তার সহকারীদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করতে আগ্রহী হও!
আল্লাহ তাআলা মুমিন বান্দাদেরকে এখানে যে সুরে সম্বোধন করেছেন, এরমধ্যে সূক্ষ্ম এক ধরনের ভর্ৎসনাও লুকিয়ে আছে; যে ভর্ৎসনার ভাষ্য অনেকটা এরকম— 'তোমাদের আদি পিতা আদমকে আমি সৃষ্টি করে আমার উত্তম সৃষ্টি ফিরিশতা-জাতিকে আদেশ করেছি তাকে সম্মান প্রদর্শন করতে। আদমের সম্মানার্থে আমি তাদেরকে সিজদা করারও নির্দেশ দিয়েছি। নির্দেশ মুতাবিক তারা তাকে সম্মানপ্রদর্শনপূর্বক সিজদা করেছে। কেবল ইবলিস তার নিজ অহংকারের দরুণ সিজদা করা থেকে বিরত থেকেছে। তোমাদের আদি পিতার জন্যেই সে আমার শত্রুতে পরিণত হয়েছে। সেই শত্রুর সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক স্থাপন করে তোমরা এখন আমার এই দুশমনির প্রাপ্য দিচ্ছ!
টিকা:
[১] সূরা কাহাফ, আয়াত-ক্রম: ৫০
📄 গুনাহ মানব-জীবনের বারাকাহ নিঃশেষ করে দেয়
গুনাহ মানব-জীবনের বারাকাহ নষ্ট করে ফেলে। গুনাহগার ব্যক্তির আয়ুষ্কাল, রিযিক, ইলম, আমল ও ইবাদাতে কোনো বারাকাহ থাকে না। তার দুনিয়া ও আখিরাতের যাবতীয় বারাকাহ নিঃশেষ হয়ে যায়। আল্লাহর নাফরমানিতে লিপ্ত ব্যক্তির জীবনে প্রাচুর্য হারিয়ে যায়। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-
وَلَوْ أَنَّ أَهْلَ الْقُرَى آمَنُوا وَاتَّقَوْا لَفَتَحْنَا عَلَيْهِمْ بَرَكَاتٍ مِنَ السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ
'আর যদি জনপদের অধিবাসীগণ ঈমান আনত এবং তাকওয়া অবলম্বন করত, তাহলে আমি তাদের জন্য আসমান ও জমিনের নিয়ামতসমূহের বারাকাহ'র দ্বার উন্মুক্ত করে দিতাম।।'১
অন্যত্র ইরশাদ করেন-
وَأَنْ لَوِ اسْتَقَامُوا عَلَى الطَّرِيقَةِ لَأَسْقَيْنَاهُمْ مَاءً غَدَقًا لِنَفْتِنَهُمْ فِيهِ
'আর তাদেরকে এ মর্মে প্রত্যাদেশ প্রেরণ করা হয়েছে যে, তারা যদি সত্যের পথে অবিচল থাকত, তাহলে আমি প্রচুর পানি বর্ষণের নিয়ামতে পরীক্ষাস্বরূপ তাদেরকে সিক্ত করতাম।'২
একজন বান্দা অবশ্যই তার কৃত গুনাহের কারণে রিযিক থেকে বঞ্চিত হয়। হাদীস শরীফে বর্ণিত হয়েছে, নবীজি ইরশাদ করেন, 'রুহুল কুদুস আমার অন্তরে এ কথা ঢেলে দিয়েছেন যে, জগতের প্রতিটি প্রাণীই তার নির্ধারিত রিযিক ভোগ করে মৃত্যুবরণ করবে। সুতরাং তোমরা আল্লাহ তাআলাকে ভয় করো এবং উত্তমভাবে রিযিক তালাশ করো। আর আল্লাহর নিকট তোমাদের জন্য যা কিছু রয়েছে তা কেবল তাঁর আনুগত্য দ্বারাই অর্জন করা সম্ভব।'৩
স্বস্তি ও নির্মল আনন্দ মহান রবের সন্তুষ্টি ও তাঁর প্রতি দৃঢ় বিশ্বাসের মধ্যেই নিহিত রয়েছে। তিনি দুশ্চিন্তা, দুর্ভাবনা ও কষ্ট-ক্লেশকে তাঁর প্রতি সন্দেহবোধ আর তাঁর অসন্তুষ্টির মধ্যে রেখে দিয়েছেন।
এর আগের একটি অনুচ্ছেদে ইমাম আহমাদ রাহিমাহুল্লাহ'র কিতাবুয যুহদ থেকে একটি হাদীসে কুদসী উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন— ‘আমি আল্লাহ, যখন আমি রাজি-খুশি থাকি, তখন বারাকাহ দান করি; আমার বারাকাহ সীমাহীন। আর যখন আমি রাগান্বিত হই, তখন বান্দার ওপর লানত বর্ষণ করি। আমার লানত বান্দার সাত প্রজন্মকে গ্রাস করে নেয়। [১]
বান্দার রিযিক ও কর্মের ব্যাপকতা এবং পরিধি মূলত পরিমাণের আধিক্য দিয়ে নির্ণিত হয় না। জীবনের আয়ুষ্কাল মাস আর বছরের গণনা দিয়ে বিবেচনা করা যায় না। জীবন আর রিযিকের পরিধির ব্যাপকতা প্রকৃতপক্ষে আল্লাহপ্রদত্ত বারাকাহ দ্বারাই তৈরি হয়। [২]
আল্লাহ তাআলার অবাধ্যতার কারণে মানুষের রিযিক ও জীবনের বারাকাহ নষ্ট হয়ে যায়। কেননা আল্লাহ তাআলার অবাধ্যতা ও নাফরমানির নেতৃত্বে থাকে অভিশপ্ত ইবলিস। যারা নাফরমানিতে লিপ্ত হয়, তাদের শাসক ও রক্ষকের ভূমিকায় শয়তান সর্বদা সক্রিয় থাকে। শয়তানের দিক-নির্দেশনার অধীন হয়ে যায় গুনাহগারের দল। আর নশ্বর এই পৃথিবীর যেসকল অঙ্গন শয়তানের পদচারণায় মুখরিত হয়, জীবনের যেসকল ক্ষেত্রে শয়তানের প্রভাব বিস্তার করে সেসকল স্থান ও অঙ্গন থেকে আল্লাহ তাআলার বারাকাহ উঠিয়ে নেওয়া হয়। আমাদের দৈনন্দিন জীবনের প্রতিনিয়ত কাজের শুরুতে আল্লাহ তাআলার নাম উচ্চারণের একটি নিগূঢ় রহস্য উন্মোচিত হয় এই আলোচনাতে। হাদীসে প্রাত্যহিক সকল কাজের শুরুতে বিসমিল্লাহ পড়া বা আল্লাহর নাম নেওয়ার জন্য আমাদেরকে উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে। প্রতিটি কাজের শুরুতে আল্লাহর নাম উচ্চারণকে ইসলামী শরীয়তে যথেষ্ট গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। পোষাক পরিধান করা, ঘর থেকে বের হওয়া, ঘরে প্রবেশ, পানাহার, গাড়িতে আরোহণ, স্ত্রী-সহবাস-ইত্যাদি সকল কাজের শুরুতেই আল্লাহর নাম নেওয়া সুন্নত। পবিত্র এই নাম বারাকাহ নামিয়ে আনে, শয়তানকে দূরীভূত করে দেয়।
মানব-জীবনের বারাকাহ কেবল আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকেই অর্জিত হয়। তিনি ব্যতীত কেউ বারাকাহ দান করতে সক্ষম নয়। জগতের সকল বারাকাহ'র আধার একমাত্র তিনিই। এমনকি আল্লাহ তাআলার সাথে যতকিছু সম্পৃক্ত করা হয়, সবকিছুই বারাকাহপূর্ণ বা মুবারক হয়ে যায়। আল্লাহ তাআলার পবিত্র কালাম, তাঁর প্রেরিত রাসূল, মুমিন বান্দাগণ, কাবা শরীফ-সকল কিছুই বারাকাতে ভরপুর। কিনআন [১] অঞ্চলকেও বরকতময় হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে পবিত্র কুরআনে। আল্লাহ তাআলার দিকে যা কিছুই সম্পৃক্ত করা হয়, তার সবই বারাকাহসমৃদ্ধ হয়ে যায়। এই সম্পৃক্তির অর্থ হলো, আল্লাহ তাআলার প্রভুত্ব, আনুগত্য, তাঁর প্রতি ভক্তি, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার দিকে সম্পৃক্ত হওয়া। এই অর্থের বাইরে সৃষ্টিজগতের সবকিছু আল্লাহ তাআলার দিকে সর্বদাই সম্পৃক্ত।
আল্লাহ তাআলা বারাকাহর বিপরীতে লানত বা অভিশাপ রেখেছেন। তিনি যেমন তাঁর নির্বাচিত সৃষ্টিজগত বারাকাহসমৃদ্ধ করেছেন, তেমনি জগতের কিছু হতভাগা সৃষ্টির ওপর অভিশাপও দিয়েছেন। পাপাচারে ভরপুর পৃথিবীর কোনো কোনো অঞ্চলেও আল্লাহ তাআলা অভিসম্পাত করেছেন। তেমনি নরাধম কিছু পাপিষ্ঠ ব্যক্তিও আল্লাহর লানতের অনলে ভষ্ম হয়েছে তাদের গুনাহের কারণে। আল্লাহর অভিশাপে জর্জরিত এসকল স্থান, মানুষ আর কাজ যাবতীয় কল্যাণ ও বারাকাহ থেকে সর্বদা বঞ্চিত থাকে।
আল্লাহ তাআলা ইবলিসকে অভিশপ্ত করেছেন, নিকৃষ্ট জীবে পরিণত করে তাকে রহমত থেকে বহু দূরে ঠেলে দিয়েছেন। আর যারা এই অভিশপ্ত ইবলিসের আনুগত্য করে ইবলিসের নিকটভাজনে পরিণত হয়, তারাও আল্লাহ তাআলার অভিশাপে আটকে যায়। এই অভিশাপের কারণে তাদের জীবন ও সম্পদ থেকে বারাকাহ নিঃশেষ হয়ে যায়।
জীবনের যে সময়, অর্থ, বুদ্ধি, জ্ঞান ও সম্মান মহান রবের নাফরমানিতে ব্যয় করা হয়, তা বান্দার কোনো কাজে আসে না। বরং ব্যয়কৃত এ সবকিছু আল্লাহ তাআলার দরবারে বান্দার বিরুদ্ধেই সাক্ষ্য দেবে। তাই একজন মানুষের জীবনের সে-সময়টুকুই তার কাজে আসবে, যে সময়ে সে আল্লাহ তাআলার আনুগত্য করেছে। যে সম্পদকে সে কল্যাণের জন্য ব্যয় করেছে, সে সম্পদই তাকে প্রকৃত উপকার পৌঁছাতে পারবে। যে বিদ্যা, বুদ্ধি ও সম্মানকে কাজে লাগিয়ে সে শরীয়তের হুকুম-আহকাম মেনেছে, আল্লাহ তাআলার দরবারে সে-সব তার পক্ষে সুপারিশ করবে।
এই দৃষ্টিকোণ থেকে পৃথিবীতে কেউ কেউ শতায়ু লাভ করলেও বেঁচে থাকার মতো বেঁচে থাকার আয়ুষ্কাল হয়তো তার থাকে ১০-১৫ বছর। কেমন যেন মূল্যবান ধন-রত্নের ভাণ্ডারের মালিক হয়েও সে নিজের কাজের জন্য ১০০- ২০০ টাকাও খরচ করতে অক্ষম।
তিরমিযী'র বর্ণনা, নবীজি ইরশাদ করেন-
الدُّنْيَا مَلْعُونَةٌ، مَلْعُونُ مَا فِيهَا، إِلَّا ذِكْرُ اللَّهِ وَمَا وَالَاهُ، أَوْ عَالِمُ أَوْ مُتَعَلَّمُ
'আল্লাহর যিকির এবং যিকির-সংশ্লিষ্ট অন্যান্য আমল, আলিম ও তালিবুল ইলম ব্যতীত জগতের সকল কিছুই অভিশপ্ত। [১]
অন্য হাদীসে বর্ণিত হয়েছে-
الدُّنْيَا مَلْعُونَةً مَلْعُونُ مَا فِيهَا إِلَّا مَا كَانَ لِلَّهِ
| 'পৃথিবীতে যা কিছু আল্লাহর জন্য নয়, তার সবই অভিশপ্ত।' [২]
অর্থাৎ, যা কিছু কেবল আল্লাহ তাআলার জন্য হবে, কিংবা তাঁর সাথে সম্পৃক্ত- সবই বারাকাহময়। এর বাইরের সকল আয়োজনই আল্লাহর অভিশাপে পূর্ণ।
টিকা:
[১] সূরা আরাফ, আয়াত-ক্রম: ৯৬
[২] সূরা জীন, আয়াত-ক্রম: ১৬, ১৭
[৩] হিলয়াতুল আওলিয়া-১০/২৬, ২৭
[১] ৪৭ নম্বর পৃষ্ঠার টীকা [৩] দ্রষ্টব্য।
[২] আল্লাহপ্রদত্ত বারাকাহ'র মূল রহস্য এখানেই। ধনাঢ্যতা ও অর্থ-বিত্তের আধিক্য মানুষের কোনো কাজে আসে না, যদি আল্লাহ তাআলা সেই বিত্তে বারাকাহ না দেন। বারাকাহবিহীন বিত্তের প্রাচুর্য মানুষের উপকার করতে পারে না। আর আল্লাহ তাআলা যদি বারাকাহ দান করেন, তাহলে সামান্য অর্থ-সম্পদও মানুষের জন্য যথেষ্ট হয়ে যায়। মানুষের জীবনও আল্লাহপ্রদত্ত বারাকাহর মাধ্যমে স্বার্থক ও কর্মমুখর হয়ে ওঠে। অনেকেই দীর্ঘায়ু লাভ করে, কিন্তু বারাকাহ না থাকায় তার জীবন অনর্থকই কেটে যায়। আবার আল্লাহপ্রদত্ত বারাকাহওয়ালা সংক্ষিপ্ত জীবন অল্প সময়ে এমন কাজ ও কর্মে সফলকাম হয়, যা দীর্ঘায়ুপ্রাপ্ত ব্যক্তির সারা জীবনেও অর্জন করা সম্ভব হয় না।
[১] বর্তমান সিরিয়াকে কুরআনুল কারীমে কিনআন বলে অভিহিত করা হয়েছে। শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়াহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, 'কুরআনের নয়টি আয়াতে শামের ফযীলত ও বারাকাহর কথা বলা হয়েছে।' আর আল্লামা ইবনুল কাইয়্যিম বলেন, 'ছয়টি আয়াতে শাম অঞ্চলের বরকতের কথা বলা হয়েছে।'
[১] তিরমিযী, হাদীস-ক্রম: ২৩২২
[২] তিরমিযী, হাদীস-ক্রম: ২৩২২