📘 রূহের খোরাক > 📄 গুনাহগার ব্যক্তি শয়তানের শিকলে বন্দী

📄 গুনাহগার ব্যক্তি শয়তানের শিকলে বন্দী


গুনাহগার ব্যক্তি শয়তানের অদৃশ্য শিকলে আবদ্ধ হয়ে তার অনুগত হয়ে যায়। যেন সে ইবলিসের মনোবাসনার বন্দীশালায় বাস করে। শয়তানের প্রবৃত্তির কাছে নিজেকে সঁপে দেয়। ইবলিসের কলুষিত জীবনের চলাফেরায় সে বন্দী থাকে। এক সংকীর্ণ জেলজীবন, চূড়ান্ত অপমান আর অপদস্থতার জিন্দেগিতে প্রবেশ করে গুনাহগার বান্দা। প্রবৃত্তির কারাগারের মতো সংকীর্ণ কোনো বন্দীশালা এই জগতে নেই। গুনাহগার ব্যক্তি মহান রবের নাফরমানি দ্বারা সেই নিকৃষ্টতম কারাগারে বন্দী হয়ে যায়। তার অন্তর বন্দী থাকে অভিশপ্ত শয়তানের বন্দীশালায়। এই আবদ্ধ অন্তর আল্লাহ তাআলার আনুগত্যের সীমানায় আর প্রবেশ করতে পারে না। সিরাতুল মুস্তাকিম তথা সত্য-সরল পথে সে আর এক কদমও এগিয়ে আসতে সক্ষম হয় না।
গুনাহগার বান্দার অন্তর যখন শয়তানের বন্দীশালায় আবদ্ধ হয়ে যায়, তখন চারপাশ থেকে বিভিন্ন প্রকারের বিপদ-আপদ তাকে ঘিরে ধরে। মানুষের অন্তর হলো উড়ন্ত পাখির মতো। পাখি মাটি থেকে যত উঁচুতে উড়ে বেড়ায় ততই সে শঙ্কামুক্ত থাকে, মাটির কাছাকাছি হলেই বিপদ-আপদ তাকে ঘিরে ধরে। মানুষের অন্তরও শয়তানের বন্দীশালার যত গহীনে আবদ্ধ হবে, তত কঠিন বিপদ-আপদ তাকে গ্রাস করবে। নবীজি বলেন-
الشَّيْطَانُ ذِئْبُ الْإِنْسَانِ
| 'শয়তান হলো মানবজাতির জন্য ধূর্ত নেকড়ের মতো।''১৯
রাখালহীন বকরি যেমন নেকড়ের পালের মাঝে দ্রুতই নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়, মানুষও তেমনি আল্লাহ তাআলার নিরাপত্তা-বেষ্টনীর বাইরে চলে গেলে দ্রুতই নিশ্চিহ্ন হওয়ার পথে ধাবিত হতে থাকে। নেকড়ের দল যেমন রাখালহীন বকরিকে নিমিষেই শিকার করে ফেলে, মানবাত্মাকেও শয়তানের হিংস্র থাবা ছিন্নভিন্ন করে দেয় এক মুহূর্তেই।
বকরি রাখালের যত কাছে থাকে, নেকড়ের আক্রমণ থেকে সে ততই নিরাপদ থাকে; আর রাখালের কাছ থেকে যত দূরে চলে যায়, ততই প্রাণনাশের ঝুঁকির দিকে এগুতে থাকে। এমনিভাবে মানবাত্মাও আল্লাহ তাআলার যত কাছে থাকে ততই সে শয়তানের কুমন্ত্রণা ও হিংস্র থাবা থেকে সুরক্ষিত থাকে; আর আল্লাহ তাআলার কাছ থেকে সে যত দূরে সরতে থাকে, ততই সে ধ্বংসের নিকটবর্তী হয়।

টিকাঃ
[১] মুসনাদু আহমাদ, হাদীস-ক্রম: ২২০২৯

📘 রূহের খোরাক > 📄 মানবাত্মা ধ্বংসের চার উপাদান

📄 মানবাত্মা ধ্বংসের চার উপাদান


মানুষকে তার রব থেকে দূরে সরিয়ে পার্থিব ও পরকালের জগতের চূড়ান্ত ক্ষতির দিকে ঠেলে দেয় আত্মার চার ব্যাধি。
* গাফলত。
* আল্লাহর নাফরমানি。
* নিফাক。
* শিরক。
এই চারটি ক্ষতিকর স্বভাব পর্যায়ক্রমে মানুষকে নষ্ট করে। সর্বপ্রথম গাফলত মানুষের অন্তরকে আল্লাহভোলা করে আল্লাহ তাআলার নিরাপদ বেষ্টনী থেকে বের করে দূরে নিয়ে যায়। এরপর মাসিয়াত তথা আল্লাহর নাফরমানির দ্বারা বান্দা ও আল্লাহ তাআলার মাঝে আরও দীর্ঘ দূরত্বের সৃষ্টি হয়। সর্বশেষে মানবাত্মাকে মহাধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয় নিফাক বা মুনাফিকি এবং আপন রবের সাথে শিরকের মতো গর্হিত মন্দ কাজ।
অপরদিকে আল্লাহ-ভীতি ও তাকওয়া হলো মানুষের নিরাপত্তা-বেষ্টনী, নিরাপদ দুর্গ, শয়তানকে প্রতিহতকারী ঢাল, নফসের ধোঁকার বিপরীতে শক্তিশালী আত্মরক্ষা-ব্যবস্থা। তাকওয়া মানুষকে যেমন তার চিরশত্রু শয়তান থেকে নিরাপদ রাখে, তেমনি তা জাগতিক সকল ঝামেলা, কষ্ট-ক্লেশ ও পরকালীন সকল দুশ্চিন্তা ও করুণ পরিণতি থেকে সর্বোত্তম পন্থায় হেফাযত করে।

📘 রূহের খোরাক > 📄 গুনাহ মানুষের মান-সম্মান ধুলোয় মিশিয়ে দেয়

📄 গুনাহ মানুষের মান-সম্মান ধুলোয় মিশিয়ে দেয়


আল্লাহর অবাধ্য হওয়ার অন্যতম শাস্তি হলো, আল্লাহ তাআলার নিকট গুনাহগার ব্যক্তির সম্মান ও মর্যাদা নিঃশেষ হয়ে যায়। ফলাফল হিসেবে সে সৃষ্টিজগতেও মান-সম্মানহীন ব্যক্তিতে পরিণত হয়। মানবজাতির মাঝে যে ব্যক্তির তাকওয়া-গুণ সর্বাধিক, আল্লাহ তাআলার নিকট তার মর্যাদাও সর্বোচ্চ। যে ব্যক্তি আল্লাহর আনুগত্যে সবার চেয়ে এগিয়ে থাকে, সে মহান রবের ততই নৈকট্য অর্জন করে। বান্দা তার আনুগত্যের মাত্রা অনুযায়ী আল্লাহ তাআলার নিকট তার অবস্থান ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত করে নেয়। আবার বান্দা যখন আল্লাহ তাআলার কোনো আদেশ অমান্য করে কিংবা রবের অবাধ্য হয়ে ওঠে তখন সে নিজেই নিজের অবস্থানকে নষ্ট করে ফেলে। আর আল্লাহ তাআলার নিকট যার অবস্থান নষ্ট হয়ে যায়, মানুষের নিকটও তার অবস্থান ও মর্যাদা নষ্ট হতে শুরু করে। আল্লাহর অবাধ্য হতে হতে একপর্যায়ে আল্লাহর নিকট এবং মানুষের নিকটও তার কোনো স্থান বা মর্যাদা বাকি থাকে। গুনাহের শাস্তিস্বরূপ মান-সম্মানহীন নিতান্ত তুচ্ছ এক মানুষে পরিণত হয়ে যায়। অপমান-অপদস্থতার দুঃসহ এক জীবন নিয়ে সে বেঁচে থাকে। সমাজের বোঝা হয়ে, গুরুত্বহীন হয়ে যায়। কোনো সম্মান থাকে না তার জীবনে। তার সুখ, দুঃখ, আনন্দ, বেদনার সকল অনুভূতি মানুষের নিকট গুরুত্বহীন হয়ে যায়। এই নীরব কষ্ট আর যন্ত্রণা সয়েও গুনাহগার ব্যক্তি কেবল প্রবৃত্তির নেশার ঘোরে মোহগ্রস্ত হয়ে সে তার নাফরমানিতে মত্ত থাকে।
বান্দার প্রতি আল্লাহ তাআলার অন্যতম একটি নিয়ামত হলো, আল্লাহ তাআলা সমাজের বুকে তার নাম, মান, মর্যাদা উঁচু করে তোলেন। আল্লাহ তাআলা তাঁর নির্বাচিত বান্দা ও নবীগণের ব্যাপারে ইরশাদ করেন-
وَاذْكُرْ عِبَادَنَا إِبْرَاهِيمَ وَإِسْحَاقَ وَيَعْقُوبَ أُولِي الْأَيْدِي وَالْأَبْصَارِ - إِنَّا أَخْلَصْنَاهُمْ بِخَالِصَةٍ ذِكْرَى الدَّارِ
'আপনি স্মরণ করুন, হাত ও চোখের অধিকারী আমার বান্দা ইবরাহীম, ইসহাক ও ইয়াকুবের কথা। আমি তাদেরকে এক বিশেষ বৈশিষ্ট্য, তথা তাদেরকে এই জগতের উত্তম আলোচনা ও স্মরণের মধ্যমণি বানিয়ে দিয়েছি।'
অর্থাৎ, লোকেরা তাদেরকে নিয়ে উত্তম ও সুন্দর আলোচনা করবে। প্রিয় নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে উদ্দেশ্য করে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-
وَرَفَعْنَا لَكَ ذِكْرَكَ
'আর আমি তো আপনার নাম ও আলোচনাকে করেছি সমুচ্চিত'।
নবীদের অনুসরণ করে মহান আল্লাহর আনুগত্য করার পথে নবীর উম্মত হিসেবে উত্তরাধিকার সূত্রে একজন নেককার বান্দাও নবীদের জন্য প্রদত্ত গুণাবলি অনেকাংশেই অর্জন করতে পারে। আর আল্লাহর নাফরমানির দ্বারা বান্দা সেসকল গুণাবলি ও বৈশিষ্ট্য হারিয়ে বিপরীত চরিত্রে নিজেকে প্রকাশ করে।

टিকা:
[১] সূরা সোয়াদ, আয়াত-ক্রম: ৪৫, ৪৬
[২] সূরা আলাম নাশরাহ, আয়াত-ক্রম: ৪

📘 রূহের খোরাক > 📄 গুনাহ মানুষকে নিন্দিত করে তোলে

📄 গুনাহ মানুষকে নিন্দিত করে তোলে


গুনাহে নিমজ্জিত ব্যক্তির নাম থেকে উত্তম উপাধি ও পরিচয় তুলে নেয়া হয়। প্রশংসামূলক ও সম্মানসূচক উপাধি দ্বারা তার নাম ভূষিত হয় না। নিকৃষ্ট ও ঘৃণিত সব উপাধি তার জন্য বরাদ্দ হয়ে যায়। তার নামের সাথে কেউ তখন মুমিন, নেককার, মুহসিন, মুত্তাকী, আল্লাহর আনুগত্যশীল, তাওবাকারী, আল্লাহর ওলী, বুযুর্গ, আল্লাহভীরু, সালিহ, ন্যায়পরায়ণ, ইবাদাতগুজার, আল্লাহমুখী, উত্তম, আল্লাহর সন্তুষ্টিপ্রাপ্ত, নৈকট্যশীল বান্দা-ইত্যাদি বিশেষণ ব্যবহার করে না।
তার জন্য ব্যবহার করা হয় ফাজির, পাপিষ্ঠ, নাফরমান, মুখালিফ বা ইসলাম-বিদ্বেষী, গুনাহগার, মুফসিদ, বিশৃঙ্খলাকারী, খবিস, নিকৃষ্ট, নরাধম, যিনাকার, ব্যভিচারী, খুনি, মিথ্যুক, খিয়ানতকারী, অবিশ্বস্ত, চোর, ডাকাত, আত্মীয়তার সম্পর্কছিন্নকারী, ধোঁকাবাজ-ইত্যাদি সব মন্দ বিশেষণ।
এই ধরনের পঙ্কিলতাপূর্ণ নামেই গুনাহগারকে অভিহিত করা হয়। কুরআনুল কারীমে বলা হয়েছে-
بِئْسَ الْاِسْمُ الْفُسُوْقُ بَعْدَ الْاِيْمَانِ
'ঈমানের সৌভাগ্য অর্জনের পর কাউকে নিকৃষ্ট নামে ডাকা অত্যন্ত গর্হিত কাজ।।১৯
এই আয়াতে ঈমানদার ব্যক্তিকে ফাসিক বলে আহ্বান করতে নিষেধ করা হয়েছে। কিন্তু যে ব্যক্তি গুনাহে নিমজ্জিত হয়, বদকারের জীবনকে বেছে নেয়, সে মহান রবের ক্রোধের অনলে পুড়ে ভষ্ম হয়ে যায়। জাহান্নামের আগুন হয় তার গন্তব্য। জাগতিক জীবনে সে লাঞ্ছনা আর অপদস্থতাকে বরণ করে নেয়। পক্ষান্তরে নেককার ও সৎ বান্দাদের জন্য যেসকল নাম ও বিশেষণ ব্যবহার করা হয়, সেই নাম তাদেরকে মানবসমাজে শ্রেষ্ঠত্ব দান করে। মহান রবের সন্তুষ্টি অর্জন করে তারা। জান্নাতের সুশীতল জীবনধারা তাদেরকে আলিঙ্গন করে নেয়।
আল্লাহর অবাধ্য ব্যক্তি জাগতিক এই জীবনে যেসকল গ্লানিমূলক নিন্দনীয় নাম ও ভূষণের অধিকারী হয়, সমাজে তাকে যেসমস্ত লজ্জাজনক নামে তাকে ডাকা হয়, সুস্থ বিবেকের দৃষ্টিতে গুনাহ থেকে বিরত থাকার জন্য জাগতিক এই গ্লানি ও লজ্জাটুকুই যথেষ্ট। আর গুনাহ থেকে বিরত থেকে সৎ ও নেক কাজের তাৎক্ষণিক প্রতিদান হিসেবে একজন ঈমানদার ব্যক্তি জাগতিক যেসকল প্রশংসামূলক উপাধিতে ভূষিত হয়, শুধুমাত্র সেসব বিশেষণে বিশেষায়িত হওয়ার আকাঙ্ক্ষাটাই একজন বিবেকবান মানুষ আনুগত্যশীল ও ইবাদাতগুজার হবার জন্য যথেষ্ট।

টিকা:
[১] সূরা হুজুরাত, আয়াত-ক্রম: ১১

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00