📄 গুনাহ মানুষের অন্তর্দৃষ্টি নষ্ট করে
গুনাহের অন্যতম একটি ক্ষতি হলো, গুনাহ মানুষের অন্তর্দৃষ্টিকে অন্ধ বানিয়ে ফেলে। হৃদয়ের চোখ দিয়ে সে তখন ভালো-মন্দের ব্যবধান করতে পারে না। তার অন্তর আলোহীন হয়ে পড়ে, জ্ঞানের দরজা বন্ধ হয়ে যায়। হিদায়াতের রাস্তার সূচনা তার সামনে অজ্ঞাত হয়ে যায়। এক্ষেত্রে আমরা পূর্বোল্লিখিত ইমাম মালিক ও শাফিয়ী রাহিমাহুল্লাহ'র সেই বিখ্যাত মজলিসের আলোচনাকে স্মরণ করতে পারি। ইমাম শাফিয়ীকে উদ্দেশ্য করে ইমাম মালিক বলেছিলেন— 'আমি মনে করি আল্লাহ তাআলা আপনাকে প্রখর মেধার অধিকারী বানিয়েছেন, আল্লাহ আপনার অন্তরে ইলমের এক বিশেষ নূর দান করেছেন। আপনি এই নূরকে আল্লাহর অবাধ্যতার অন্ধকার দিয়ে মলিন করবেন না।'
আল্লাহর অবাধ্যতার ফলে বান্দার অন্তর থেকে এই আসমানি নূর ক্রমশ বিলীন হতে থাকে এবং নাফরমানির অন্ধকার সেখানে প্রগাঢ় হয়ে যায়। গুনাহগার বান্দা তখন অন্তর্দৃষ্টি হারিয়ে ফেলে, অমাবস্যার মতো অন্ধকারে তার অন্তর কালো ও কলুষিত হয়ে যায়। জীবন-চলার পথে সে লাগাতার হোঁচট খেতে খেতে বিপর্যস্ত হয়ে যায়। সে যেন বিপদসংকুল পথে আঁধারের মাঝে হেঁটে চলা একাকী অসহায় কোনো অন্ধ ব্যক্তি। আসমানি নূর থেকে বঞ্চিত এ ধরনের পাপিষ্ঠ ব্যাক্তির জীবনে নিরাপত্তা, শান্তি দুর্লভ হয়ে যায়, সে দ্রুতই পদস্খলনের শিকার হয়।
আল্লাহর অবাধ্য ব্যক্তির অন্তরের এই অন্ধকার আস্তে আস্তে প্রগাঢ় হতে থাকে। অন্তর থেকে এই অন্ধকার তার চেহারা ও শরীরের অন্যান্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গকে প্রভাবিত করে। স্বাভাবিক ঔজ্জ্বল্য এবং আল্লাহপ্রদত্ত নূরের আভা তার চেহারা থেকে হারিয়ে যায়। মলিন হয়ে যায় পুরো চেহারা। গুনাহের এই অন্ধকারাচ্ছন্নতা মৃত্যুর পর বান্দার কবর-জীবন তথা বারযাখ জগতকেও গ্রাস করে নেয়। তার কবর গুনাহের অন্ধকারে ছেয়ে যায়। সহীহ মুসলিমে বর্ণিত আছে, নবীজি ইরশাদ করেছেন—
إِنَّ هَذِهِ الْقُبُورَ مُمْتَلِئَةٌ عَلَى أَهْلِهَا ظُلْمَةً، وَإِنَّ اللَّهَ يُنَوِّرُهَا بِصَلَاتِي عَلَيْهِمْ
'এই কবরের বাসিন্দাগণ ঘন অন্ধকারে নিমজ্জিত। অবশ্য মহান আল্লাহ তাআলা তাদের কবরকে আলোকিত করে দেবেন আমার দুআর বরকতে।'
কবর-জীবনের পর যখন পুনরুত্থান-দিবস আসবে, পৃথিবীর সমস্ত কিছুকে যেদিন একত্রিত করা হবে, সেদিন গুনাহগারদের চেহারাগুলো সবার সামনে তুলে ধরা হবে। সকলেই তাদের চেহারা দেখতে পাবে। পোড়া কয়লার মতো সীমাহীন কালো রঙের এসব চেহারা সহজেই আলাদা করা যাবে সেদিন। এ এমন এক কঠোর শাস্তি, যার কাছে দুনিয়ার সূচনালগ্ন থেকে শেষ অবধি সকল বিলাসিতা নিতান্তই তুচ্ছ আর মূল্যহীন হয়ে যায়।
টিকাঃ
[১] মুসলিম, হাদীস-ক্রম: ৯৫৬। সহীহ মুসলিমে হাদীসটি অর্থগতভাবে হুবহু পাওয়া গেলেও কিছুটা শব্দের ভিন্নতা আছে। শব্দ ও অর্থগতভাবে তা হুবহু পাওয়া যায় সুনানু আবি দাউদে: হাদীস-ক্রম: ২৫৬৮। -সম্পাদক
📄 গুনাহ বান্দাকে সমাজের চোখে খাটো করে রাখে
গুনাহের একটি ক্ষতি হলো, গুনাহগার ব্যক্তি তুচ্ছ, হীন ও গুরুত্বহীন ব্যক্তিতে পরিণত হয়। নিজের কাছে সে খাটো হয়ে যায়, সমাজের চোখেও সে গুরুত্বহীন হিসাবে পরিগণিত হয়। গুনাহে নিমজ্জিত ব্যক্তির পরিণত হলো, সে সমাজে সবচেয়ে গুরুত্বহীন ও অপ্রয়োজনীয় হয়ে যায়। সমাজে সে বোঝা হয়ে বেঁচে থাকে। পক্ষান্তরে আল্লাহ তাআলার আনুগত্য বান্দাকে সমাজের উঁচু স্তরে পৌঁছে দেয়। মানুষের নিকট তার মর্যাদা বাড়িয়ে দেয়। তার চরিত্রের পবিত্রতা ঘোষণা করে দেয় সকলের কাছে। কুরআনুল কারীমে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-
قَدْ أَفْلَحَ مَنْ زَكَّاهَا - وَقَدْ خَابَ مَنْ دَسَّاهَا
'যে ব্যক্তি নিজেকে শুদ্ধ করে নিল, সে অবশ্যই সফলকাম হলো। আর যে ব্যক্তি নিজেকে কলুষিত করে রাখল, সে চূড়ান্তভাবে ব্যর্থ হলো।১৯
নিজেকে শুদ্ধ করে নেওয়ার অর্থ হলো, নিজেকে আল্লাহ তাআলার আনুগত্যের দ্বারা সামনে এগিয়ে নেওয়া, মহান রবের আনুগত্যের মাধ্যমে সমাজে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা, নিজেকে সকলের সামনে প্রকাশ করা।
আর নিজেকে কলুষিত করার অর্থ হলো, আল্লাহ তাআলার নাফরমানির দ্বারা নিজেকে আচ্ছাদিত করে নেওয়া, ফলশ্রুতিতে সমাজে নিজের অবস্থানকে তুচ্ছ ও ক্ষুদ্র করে ফেলা।
আল্লাহ তাআলার অবাধ্য হয়ে একজন গুনাহগার ব্যক্তি নিজেই নিজেকে বিলীন করে ফেলে। তার অবস্থান, উপস্থিতি, অস্তিত্ব জগদ্বাসীর নিকট আড়াল করে রাখে তার নির্মম পরিণতির কারণে। গুনাহে নিমজ্জিত ব্যক্তি নিজের কাছেই নিজে পরাজিত থাকে। আল্লাহ তাআলার নিকটও সে নফসের যুদ্ধে ব্যর্থ ও পরাজিত বান্দা হিসেবে পরিগণিত হয়। এভাবে সমাজের চোখেও নিন্দিত হয় একজন ব্যর্থ মানুষ হিসেবে।
মহান রবের আনুগত্য, ইবাদাত, ও কল্যাণমূলক কাজ মানুষকে সমাজে সম্মানিত ও মর্যাদাবান করে তোলে। সমাজের দৃষ্টিতে সে সবচেয়ে সৎ লোকে পরিণত হয়। সম্মান ও মর্যাদার শিখরে সে আরোহণ করে রবের আনুগত্যের দ্বারা। শ্রেষ্ঠত্বের আসনে সমাসীন হয়েও বান্দা মহান রবের সামনে নিজেকে ছোট ও নগণ্য মনে করে ইবাদাত ও আনুগত্যের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। তখন সে আরো উঁচুস্থানে পৌঁছে যায়। সুতরাং আল্লাহ তাআলার অবাধ্যতার মতো তুচ্ছ ও ক্ষুদ্র কিছু থাকতে পারে না মানুষের জন্য। আর আল্লাহর আনুগত্যের চেয়ে অধিক মর্যাদাবান ও সম্মানিত কোনো বিষয়ই নেই এই বস্তুজগতে।
টিকাঃ
[১] সূরা শামস, আয়াত-ক্রম: ৯, ১০
📄 গুনাহগার ব্যক্তি শয়তানের শিকলে বন্দী
গুনাহগার ব্যক্তি শয়তানের অদৃশ্য শিকলে আবদ্ধ হয়ে তার অনুগত হয়ে যায়। যেন সে ইবলিসের মনোবাসনার বন্দীশালায় বাস করে। শয়তানের প্রবৃত্তির কাছে নিজেকে সঁপে দেয়। ইবলিসের কলুষিত জীবনের চলাফেরায় সে বন্দী থাকে। এক সংকীর্ণ জেলজীবন, চূড়ান্ত অপমান আর অপদস্থতার জিন্দেগিতে প্রবেশ করে গুনাহগার বান্দা। প্রবৃত্তির কারাগারের মতো সংকীর্ণ কোনো বন্দীশালা এই জগতে নেই। গুনাহগার ব্যক্তি মহান রবের নাফরমানি দ্বারা সেই নিকৃষ্টতম কারাগারে বন্দী হয়ে যায়। তার অন্তর বন্দী থাকে অভিশপ্ত শয়তানের বন্দীশালায়। এই আবদ্ধ অন্তর আল্লাহ তাআলার আনুগত্যের সীমানায় আর প্রবেশ করতে পারে না। সিরাতুল মুস্তাকিম তথা সত্য-সরল পথে সে আর এক কদমও এগিয়ে আসতে সক্ষম হয় না।
গুনাহগার বান্দার অন্তর যখন শয়তানের বন্দীশালায় আবদ্ধ হয়ে যায়, তখন চারপাশ থেকে বিভিন্ন প্রকারের বিপদ-আপদ তাকে ঘিরে ধরে। মানুষের অন্তর হলো উড়ন্ত পাখির মতো। পাখি মাটি থেকে যত উঁচুতে উড়ে বেড়ায় ততই সে শঙ্কামুক্ত থাকে, মাটির কাছাকাছি হলেই বিপদ-আপদ তাকে ঘিরে ধরে। মানুষের অন্তরও শয়তানের বন্দীশালার যত গহীনে আবদ্ধ হবে, তত কঠিন বিপদ-আপদ তাকে গ্রাস করবে। নবীজি বলেন-
الشَّيْطَانُ ذِئْبُ الْإِنْسَانِ
| 'শয়তান হলো মানবজাতির জন্য ধূর্ত নেকড়ের মতো।''১৯
রাখালহীন বকরি যেমন নেকড়ের পালের মাঝে দ্রুতই নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়, মানুষও তেমনি আল্লাহ তাআলার নিরাপত্তা-বেষ্টনীর বাইরে চলে গেলে দ্রুতই নিশ্চিহ্ন হওয়ার পথে ধাবিত হতে থাকে। নেকড়ের দল যেমন রাখালহীন বকরিকে নিমিষেই শিকার করে ফেলে, মানবাত্মাকেও শয়তানের হিংস্র থাবা ছিন্নভিন্ন করে দেয় এক মুহূর্তেই।
বকরি রাখালের যত কাছে থাকে, নেকড়ের আক্রমণ থেকে সে ততই নিরাপদ থাকে; আর রাখালের কাছ থেকে যত দূরে চলে যায়, ততই প্রাণনাশের ঝুঁকির দিকে এগুতে থাকে। এমনিভাবে মানবাত্মাও আল্লাহ তাআলার যত কাছে থাকে ততই সে শয়তানের কুমন্ত্রণা ও হিংস্র থাবা থেকে সুরক্ষিত থাকে; আর আল্লাহ তাআলার কাছ থেকে সে যত দূরে সরতে থাকে, ততই সে ধ্বংসের নিকটবর্তী হয়।
টিকাঃ
[১] মুসনাদু আহমাদ, হাদীস-ক্রম: ২২০২৯
📄 মানবাত্মা ধ্বংসের চার উপাদান
মানুষকে তার রব থেকে দূরে সরিয়ে পার্থিব ও পরকালের জগতের চূড়ান্ত ক্ষতির দিকে ঠেলে দেয় আত্মার চার ব্যাধি。
* গাফলত。
* আল্লাহর নাফরমানি。
* নিফাক。
* শিরক。
এই চারটি ক্ষতিকর স্বভাব পর্যায়ক্রমে মানুষকে নষ্ট করে। সর্বপ্রথম গাফলত মানুষের অন্তরকে আল্লাহভোলা করে আল্লাহ তাআলার নিরাপদ বেষ্টনী থেকে বের করে দূরে নিয়ে যায়। এরপর মাসিয়াত তথা আল্লাহর নাফরমানির দ্বারা বান্দা ও আল্লাহ তাআলার মাঝে আরও দীর্ঘ দূরত্বের সৃষ্টি হয়। সর্বশেষে মানবাত্মাকে মহাধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয় নিফাক বা মুনাফিকি এবং আপন রবের সাথে শিরকের মতো গর্হিত মন্দ কাজ।
অপরদিকে আল্লাহ-ভীতি ও তাকওয়া হলো মানুষের নিরাপত্তা-বেষ্টনী, নিরাপদ দুর্গ, শয়তানকে প্রতিহতকারী ঢাল, নফসের ধোঁকার বিপরীতে শক্তিশালী আত্মরক্ষা-ব্যবস্থা। তাকওয়া মানুষকে যেমন তার চিরশত্রু শয়তান থেকে নিরাপদ রাখে, তেমনি তা জাগতিক সকল ঝামেলা, কষ্ট-ক্লেশ ও পরকালীন সকল দুশ্চিন্তা ও করুণ পরিণতি থেকে সর্বোত্তম পন্থায় হেফাযত করে।