📄 আল্লাহবিমুখতার দুনিয়াবি পেরেশানি
যে ব্যক্তি আল্লাহ তাআলা থেকে মুখ ফিরিয়ে পৃথিবীর অন্যকোনো বিষয়ে আগ্রহী হয়ে উঠবে সে তিন স্তরের পেরেশানিতেই সারাজীবন কাটিয়ে দেবে।
* যে বিষয়ে সে আগ্রহী, তা অর্জিত হওয়ার আগ পর্যন্ত তার কাঙ্ক্ষিত বিষয় নিয়েই সে পেরেশানিতে অস্থির থাকবে。
* তার কাঙ্ক্ষিত বিষয় অর্জিত হওয়ার পর সেই জিনিস হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় সে অস্থির অবস্থায় সময় পার করবে。
* বহু কষ্টে অর্জিত তার কোনো কাঙ্ক্ষিত বিষয় হাতছাড়া হয়ে গেলে চূড়ান্ত পেরেশানি শুরু হবে। তার অস্থিরতার মাত্রা আগের তুলনায় বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে।
তাদের জীবন এক প্রকারের নরক-বাসে পরিণত হয়। তাদের জীবন যতই উচ্চবিলাসী হোক, অন্তরের প্রশান্তি তাদের জীবন থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। হৃদয়ের সুখ-শান্তি আর উৎফুল্লতাকে ছিনিয়ে নেয়ার চেয়ে কঠোর ও যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি আর কী থাকতে পারে মানুষের জন্য! ভয়-ভীতি, দুঃখ-দুর্দশা, দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হৃদয় আর সংকীর্ণমনার নীরব যন্ত্রণার চেয়ে কঠিন কী-ই বা হতে পারে মানুষের জন্য! অন্তরকে আল্লাহর পথ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়া, আখিরাতকে ভুলিয়ে দিয়ে ক্ষণস্থায়ী দুনিয়ার পেছনে নিজের লোভ-লালসাকে উজাড় করে দিয়ে গাইরুল্লাহর '১' মোহে আবিষ্ট হয়ে হৃদয়ের অস্থিরতার অনলে নীরবে দগ্ধ হওয়ার যন্ত্রণার চেয়ে কষ্টকর আর কী-ই বা থাকতে পারে পার্থিব এই জগতে। আল্লাহকে ছেড়ে দিয়ে, আল্লাহর পথকে ভুলে যেই পথ আর পাথেয় নিয়ে গুনাহগার বান্দা মেতে উঠে সেই পথ আর পাথেয়ই বান্দাকে ধ্বংস করে দেয়, জীবনের সুখশান্তি বিলীন করে দেয়।
টিকাঃ
[১] গাইরুল্লাহ অর্থ আল্লাহ তাআলা ব্যতীত সৃষ্টিজগতের অন্য যেকোনো জিনিস।
📄 বারযাখ জগতের অবস্থা
আল্লাহবিমুখ হয়ে কোনো বান্দা যখন মৃত্যু বরণ করবে পৃথিবীর মতো বারযাখ জগতেও সে নানা ধরনের আযাবের সম্মুখীন হবে। প্রথমত সে পার্থিব জগতের বিচ্ছেদের শোকে থাকবে জর্জরিত। দ্বিতীয়ত বারযাখ জগতের প্রশ্নোত্তরে অকৃতকার্য হওয়ার ফলে অসহনীয় আযাবে নিপতিত হবে। মাটির কীটপতঙ্গ তার শরীরকে কুড়ে কুড়ে খেতে শুরু করবে। দোযখের লেলিহান শিখা তার চোখের সামনে ভয়ংকর রূপে ভেসে উঠবে। আনুগত্যপূর্ণ ও গুনাহমুক্ত জীবনকে উপেক্ষা করার আফসোস আর হাহাকার বুকে নিয়েই তাকে অবর্ণনীয় এক জগতে বিপর্যস্ত জীবন কাটাতে হবে।
📄 আখিরাতের চিরস্থায়ী জগত
কবর বা বারযাখ জগতের পর যখন সে আখিরাতের চিরস্থায়ী জগতে উপনীত হবে, পাপ-পঙ্কিলতায় ভরপুর ক্ষণস্থায়ী পার্থিব জীবনের হিসাবের খাতা যখন মেলে ধরা হবে, তখন আরো কঠোর ও দুঃসহনীয় আযাব তাকে গ্রাস করে ফেলবে। যেদিন মানুষদের পুরুত্থিত করা হবে, সেদিন গুনাহগার ব্যক্তির জন্য অপেক্ষা করবে জাহান্নামের ভয়ংকর সব আযাব।
গুনাহগার ব্যক্তি যখন চূড়ান্ত ধ্বংসের অপেক্ষায় থাকবে, তখন জীবনের সফলতায় পৌঁছে যাবে আল্লাহমুখী মানুষেরা; যারা ক্ষণস্থায়ী পৃথিবীতে আল্লাহ তাআলার অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রেখেছে, গুনাহমুক্ত জীবন যাপন করেছে। ভুলক্রমে, ইচ্ছায়, অনিচ্ছায় কদাচিৎ ভুল করে বসলেও তাওবা ও ইস্তিগফারের মাধ্যমে নিজেকে গুনাহমুক্ত করে নিয়েছে। জীবনে পাপাচার না করে যারা আপন রবের নৈকট্য লাভ করেছে, দয়াময় মালিকের সান্নিধ্যে জীবনকে দিয়েছে শ্রেষ্ঠত্ব, করুণাময় আল্লাহ তাআলার প্রতি অগাধ বিশ্বাস, ভক্তি ও ভালোবাসা পোষণ করে নিজেদের জীবন যারা কাটিয়ে এসেছে পৃথিবীতে, চিরঞ্জীব সত্তার যিকিরে ও স্মরণে যারা ভাবনাহীন প্রশান্ত হৃদয়ের এক নির্মল জীবন অতিবাহিত করেছে তারা সেদিন মহান রবের অপার অনুগ্রহ ও কৃপায় থাকবে নির্ভার ও নিশ্চিন্ত। কিয়ামত-দিবসের বিভীষিকাময় ভয়াবহতার মাঝেও তখন কিছু নেককার বান্দা আনন্দে উৎফুল্লিত হয়ে বলতে থাকবে-'রাব্বে।
কারীমের সান্নিধ্য পেয়ে আমরা আজ ধন্য হয়েছি।' কিয়ামত-দিবসের পেরেশানির মধ্যে কেউ কেউ বলতে থাকবে, 'জান্নাতের বাসিন্দারা এখনই যে উত্তম পরিবেশে আছে, তাদের জন্য নিশ্চয় অপেক্ষা করছে আনন্দঘন এক জীবন।'
আরেকদল সেদিন বলবে, 'দুনিয়ামুখী লোকদের জন্য আফসোস! তারা না দুনিয়াতে ভোগ-বিলাসের জীবন কাটাতে পারল, না পারল দুনিয়া থেকে উত্তম ও চমকপ্রদ জীবন লাভ করতে!'
আল্লাহর নিয়ামতে খুশি হয়ে কিছুলোক সেদিন বলবে, 'পৃথিবীর রাজা-বাদশাহ ও রাজপরিবারের লোকেরা যদি আমাদের এই নিয়ামতরাজির কথা জানতে পারত তাহলে তারা রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ বাঁধিয়ে হলেও এই নিয়ামত লাভের প্রতিযোগিতা করত।'
পুরষ্কারপ্রাপ্ত আরেকদল বলবে, 'পার্থিব জগতেও একটি জান্নাত ছিল, যে ব্যক্তি সেই জান্নাতে যায়নি, সে আখিরাতের জান্নাতেও যাবে না।' [২]
সুতরাং যারা নিজেদের মূল্যবান সময় ও জীবনকে নিতান্তই তুচ্ছ ও ক্ষুদ্র জিনিসের পেছনে ব্যয় করছে তারা যেন নিজের জীবন নিয়ে চিন্তা করে, ফেলে আসা সময়গুলোর প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির হিসাব কষে। তারা যদি নিজের জীবন, নিজের সময়ের সঠিক মূল্যায়ন না-ই করতে পারে, এ ব্যাপারে তাদের যদি কোনো ধারণাই না থাকে তবে তাদের উচিত-যারা জীবন-দর্শন পাঠ করেছে, সময়ের সর্বোচ্চ সফল ব্যবহারে যারা মহান রবের নিকট পুরষ্কারপ্রাপ্ত, তাদের থেকে যেন তারা জীবনের অর্থ জেনে নেয়।
টিকাঃ
[১] আল্লাহ তাআলার আনুগত্যময় জীবন মানুষকে পৃথিবীতেও জান্নাতের অনুভূতি দান করবে। আল্লাহর আনুগত্যে ভরপুর জীবনকেই দুনিয়ার জান্নাত বলে ব্যক্ত করা হয়েছে।
📄 গুনাহ মানুষের অন্তর্দৃষ্টি নষ্ট করে
গুনাহের অন্যতম একটি ক্ষতি হলো, গুনাহ মানুষের অন্তর্দৃষ্টিকে অন্ধ বানিয়ে ফেলে। হৃদয়ের চোখ দিয়ে সে তখন ভালো-মন্দের ব্যবধান করতে পারে না। তার অন্তর আলোহীন হয়ে পড়ে, জ্ঞানের দরজা বন্ধ হয়ে যায়। হিদায়াতের রাস্তার সূচনা তার সামনে অজ্ঞাত হয়ে যায়। এক্ষেত্রে আমরা পূর্বোল্লিখিত ইমাম মালিক ও শাফিয়ী রাহিমাহুল্লাহ'র সেই বিখ্যাত মজলিসের আলোচনাকে স্মরণ করতে পারি। ইমাম শাফিয়ীকে উদ্দেশ্য করে ইমাম মালিক বলেছিলেন— 'আমি মনে করি আল্লাহ তাআলা আপনাকে প্রখর মেধার অধিকারী বানিয়েছেন, আল্লাহ আপনার অন্তরে ইলমের এক বিশেষ নূর দান করেছেন। আপনি এই নূরকে আল্লাহর অবাধ্যতার অন্ধকার দিয়ে মলিন করবেন না।'
আল্লাহর অবাধ্যতার ফলে বান্দার অন্তর থেকে এই আসমানি নূর ক্রমশ বিলীন হতে থাকে এবং নাফরমানির অন্ধকার সেখানে প্রগাঢ় হয়ে যায়। গুনাহগার বান্দা তখন অন্তর্দৃষ্টি হারিয়ে ফেলে, অমাবস্যার মতো অন্ধকারে তার অন্তর কালো ও কলুষিত হয়ে যায়। জীবন-চলার পথে সে লাগাতার হোঁচট খেতে খেতে বিপর্যস্ত হয়ে যায়। সে যেন বিপদসংকুল পথে আঁধারের মাঝে হেঁটে চলা একাকী অসহায় কোনো অন্ধ ব্যক্তি। আসমানি নূর থেকে বঞ্চিত এ ধরনের পাপিষ্ঠ ব্যাক্তির জীবনে নিরাপত্তা, শান্তি দুর্লভ হয়ে যায়, সে দ্রুতই পদস্খলনের শিকার হয়।
আল্লাহর অবাধ্য ব্যক্তির অন্তরের এই অন্ধকার আস্তে আস্তে প্রগাঢ় হতে থাকে। অন্তর থেকে এই অন্ধকার তার চেহারা ও শরীরের অন্যান্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গকে প্রভাবিত করে। স্বাভাবিক ঔজ্জ্বল্য এবং আল্লাহপ্রদত্ত নূরের আভা তার চেহারা থেকে হারিয়ে যায়। মলিন হয়ে যায় পুরো চেহারা। গুনাহের এই অন্ধকারাচ্ছন্নতা মৃত্যুর পর বান্দার কবর-জীবন তথা বারযাখ জগতকেও গ্রাস করে নেয়। তার কবর গুনাহের অন্ধকারে ছেয়ে যায়। সহীহ মুসলিমে বর্ণিত আছে, নবীজি ইরশাদ করেছেন—
إِنَّ هَذِهِ الْقُبُورَ مُمْتَلِئَةٌ عَلَى أَهْلِهَا ظُلْمَةً، وَإِنَّ اللَّهَ يُنَوِّرُهَا بِصَلَاتِي عَلَيْهِمْ
'এই কবরের বাসিন্দাগণ ঘন অন্ধকারে নিমজ্জিত। অবশ্য মহান আল্লাহ তাআলা তাদের কবরকে আলোকিত করে দেবেন আমার দুআর বরকতে।'
কবর-জীবনের পর যখন পুনরুত্থান-দিবস আসবে, পৃথিবীর সমস্ত কিছুকে যেদিন একত্রিত করা হবে, সেদিন গুনাহগারদের চেহারাগুলো সবার সামনে তুলে ধরা হবে। সকলেই তাদের চেহারা দেখতে পাবে। পোড়া কয়লার মতো সীমাহীন কালো রঙের এসব চেহারা সহজেই আলাদা করা যাবে সেদিন। এ এমন এক কঠোর শাস্তি, যার কাছে দুনিয়ার সূচনালগ্ন থেকে শেষ অবধি সকল বিলাসিতা নিতান্তই তুচ্ছ আর মূল্যহীন হয়ে যায়।
টিকাঃ
[১] মুসলিম, হাদীস-ক্রম: ৯৫৬। সহীহ মুসলিমে হাদীসটি অর্থগতভাবে হুবহু পাওয়া গেলেও কিছুটা শব্দের ভিন্নতা আছে। শব্দ ও অর্থগতভাবে তা হুবহু পাওয়া যায় সুনানু আবি দাউদে: হাদীস-ক্রম: ২৫৬৮। -সম্পাদক