📘 রূহের খোরাক > 📄 গুনাহ মানুষের অন্তরকে ‘অসুস্থ’ করে তোলে

📄 গুনাহ মানুষের অন্তরকে ‘অসুস্থ’ করে তোলে


গুনাহ মানুষের অন্তরকে দুর্বল করে দেয়। সুস্থ, স্বাভাবিক ও স্থিরচিত্তকে অসুস্থ ও বিকৃতমনা করে তোলে। আত্মার ব্যাধিতে অন্তর রুগ্ন হয়ে যায়। মন ও মানসিকতাকে প্রাণবন্তকর রাখার অনুভূতি আর উচ্ছ্বাস গুনাহগার ব্যক্তির হৃদয় থেকে হারিয়ে যায়। বিভিন্ন ধরনের রোগব্যাধি মানুষের শরীরকে যেভাবে দুর্বল করে তোলে, সেভাবে গুনাহও মানুষের হৃদয়কে বিতৃষ্ণ করে দেয়। হৃদয়কে রুগ্ন করে তোলে। গুনাহ থেকে নিজেকে মুক্ত করতে পারলে এই রুগ্নতা থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যায়।
আধ্যাত্মিক জগতের আলিম ও সূফীগণ এ ব্যাপারে একমত যে, মানুষের অন্তরের কাঙ্ক্ষিত ও চূড়ান্ত সফলতার শেষ স্তর হলো আপন রবের সাক্ষাৎ ও সান্নিধ্যলাভ। আর মহান রবের সান্নিধ্যলাভ কেবল গুনাহমুক্ত সুস্থ ও পবিত্র অন্তরের অধিকারীদের ক্ষেত্রেই সম্ভব। মানুষ তার মনের বিপরীতে রবের পথে চলার দ্বারাই গুনাহমুক্ত সুস্থ ও পবিত্র আত্মার অধিকারী হতে পারে। নফসের কামনাই হলো হৃদয়ের ব্যাধি আর এই কামনার বিপরীতে চলাই এই ব্যাধির প্রতিকার।
যে ব্যক্তি নিজেকে প্রবৃত্তির অনুগামিতা থেকে ফিরিয়ে রাখে, জান্নাতকে তার বাসস্থান বানিয়ে দেয়া হয়। আর পরকালে যে ব্যক্তি জান্নাতকে বাসস্থান বানিয়ে নেয়, পার্থিব জগতেও সে স্বর্গীয় অনুভূতিরাভ করতে থাকে। শত কষ্ট, দুঃখ-দুর্দশা, দারিদ্রতার ঘাত-প্রতিঘাতে তার জাগতিক জীবন বিপর্যস্ত হলেও সে তার অনুভূতির রাজ্যে এক অবর্ণনীয় সুখময় জীবনের মধ্য দিয়ে দিনাতিপাত করতে থাকে। খেজুর পাতার চাটাইয়ে অনাহারে অর্ধাহারে জীবন পার করলেও হৃদয়ের জগতে সে স্বর্গীয় সুখ আস্বাদন করতে থাকে গুনাহমুক্ত অন্তরের পবিত্র অনুভূতি দ্বারা। যদিও পরকালীন বেহেশতের তুলনায় পার্থিব এই সুখানুভূতি খুবই সামান্য, তারপরও জগত-সংসারের ঝড়-ঝাপটায় দিশেহারা জীবনের তুলনায় পাপ-পঙ্কিলতামুক্ত হৃদয়ের এই অনুভূতিই মানুষকে প্রশান্ত করে দেয়। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-
إِنَّ الْأَبْرَارَ لَفِي نَعِيمٍ - وَإِنَّ الْفُجَّارَ لَفِي جَحِيمٍ
‘নিশ্চয় সৎকর্মশীলগণ থাকবেন সুখ-শান্তির নিয়ামতে আর দুষ্কর্মকারীদের স্থান হবে জাহান্নাম।’
মানুষের এই দুই শ্রেণির অবস্থা শুধুমাত্র পরকালের জীবনের জন্যই নয়, মানুষ জন্মের পর তিনটি জগতের সম্মুখীন হবে।
* পার্থিব জগত。
* বারযাখ জগত। [২]
* চিরস্থায়ী জগত。
যারা সৎকাজ করবে তারা এই তিন জগতেই আল্লাহ তাআলার দেয়া নিয়ামতের মাঝে সুখে-শান্তিতে বসবাস করবে। আর যারা আল্লাহ তাআলার অবাধ্যচারিতায় দুষ্কর্ম করে বেড়ায় তারা তিন জগতেই থাকবে দুঃসহনীয় কষ্টে।

টিকাঃ
[১] সূরা ইনফিতার, আয়াত-ক্রম: ১৩, ১৪
[২] মৃত্যু-পরবর্তী কবরের জগত তথা কিয়ামত-দিবসের পুনরুত্থান ও বিচারের আগ পর্যন্ত মানুষ মৃত্যুর পর যেই জগতে থাকে তাকে বারযাখ বলে।

📘 রূহের খোরাক > 📄 আল্লাহবিমুখতার দুনিয়াবি পেরেশানি

📄 আল্লাহবিমুখতার দুনিয়াবি পেরেশানি


যে ব্যক্তি আল্লাহ তাআলা থেকে মুখ ফিরিয়ে পৃথিবীর অন্যকোনো বিষয়ে আগ্রহী হয়ে উঠবে সে তিন স্তরের পেরেশানিতেই সারাজীবন কাটিয়ে দেবে।
* যে বিষয়ে সে আগ্রহী, তা অর্জিত হওয়ার আগ পর্যন্ত তার কাঙ্ক্ষিত বিষয় নিয়েই সে পেরেশানিতে অস্থির থাকবে。
* তার কাঙ্ক্ষিত বিষয় অর্জিত হওয়ার পর সেই জিনিস হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় সে অস্থির অবস্থায় সময় পার করবে。
* বহু কষ্টে অর্জিত তার কোনো কাঙ্ক্ষিত বিষয় হাতছাড়া হয়ে গেলে চূড়ান্ত পেরেশানি শুরু হবে। তার অস্থিরতার মাত্রা আগের তুলনায় বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে।
তাদের জীবন এক প্রকারের নরক-বাসে পরিণত হয়। তাদের জীবন যতই উচ্চবিলাসী হোক, অন্তরের প্রশান্তি তাদের জীবন থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। হৃদয়ের সুখ-শান্তি আর উৎফুল্লতাকে ছিনিয়ে নেয়ার চেয়ে কঠোর ও যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি আর কী থাকতে পারে মানুষের জন্য! ভয়-ভীতি, দুঃখ-দুর্দশা, দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হৃদয় আর সংকীর্ণমনার নীরব যন্ত্রণার চেয়ে কঠিন কী-ই বা হতে পারে মানুষের জন্য! অন্তরকে আল্লাহর পথ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়া, আখিরাতকে ভুলিয়ে দিয়ে ক্ষণস্থায়ী দুনিয়ার পেছনে নিজের লোভ-লালসাকে উজাড় করে দিয়ে গাইরুল্লাহর '১' মোহে আবিষ্ট হয়ে হৃদয়ের অস্থিরতার অনলে নীরবে দগ্ধ হওয়ার যন্ত্রণার চেয়ে কষ্টকর আর কী-ই বা থাকতে পারে পার্থিব এই জগতে। আল্লাহকে ছেড়ে দিয়ে, আল্লাহর পথকে ভুলে যেই পথ আর পাথেয় নিয়ে গুনাহগার বান্দা মেতে উঠে সেই পথ আর পাথেয়ই বান্দাকে ধ্বংস করে দেয়, জীবনের সুখশান্তি বিলীন করে দেয়।

টিকাঃ
[১] গাইরুল্লাহ অর্থ আল্লাহ তাআলা ব্যতীত সৃষ্টিজগতের অন্য যেকোনো জিনিস।

📘 রূহের খোরাক > 📄 বারযাখ জগতের অবস্থা

📄 বারযাখ জগতের অবস্থা


আল্লাহবিমুখ হয়ে কোনো বান্দা যখন মৃত্যু বরণ করবে পৃথিবীর মতো বারযাখ জগতেও সে নানা ধরনের আযাবের সম্মুখীন হবে। প্রথমত সে পার্থিব জগতের বিচ্ছেদের শোকে থাকবে জর্জরিত। দ্বিতীয়ত বারযাখ জগতের প্রশ্নোত্তরে অকৃতকার্য হওয়ার ফলে অসহনীয় আযাবে নিপতিত হবে। মাটির কীটপতঙ্গ তার শরীরকে কুড়ে কুড়ে খেতে শুরু করবে। দোযখের লেলিহান শিখা তার চোখের সামনে ভয়ংকর রূপে ভেসে উঠবে। আনুগত্যপূর্ণ ও গুনাহমুক্ত জীবনকে উপেক্ষা করার আফসোস আর হাহাকার বুকে নিয়েই তাকে অবর্ণনীয় এক জগতে বিপর্যস্ত জীবন কাটাতে হবে।

📘 রূহের খোরাক > 📄 আখিরাতের চিরস্থায়ী জগত

📄 আখিরাতের চিরস্থায়ী জগত


কবর বা বারযাখ জগতের পর যখন সে আখিরাতের চিরস্থায়ী জগতে উপনীত হবে, পাপ-পঙ্কিলতায় ভরপুর ক্ষণস্থায়ী পার্থিব জীবনের হিসাবের খাতা যখন মেলে ধরা হবে, তখন আরো কঠোর ও দুঃসহনীয় আযাব তাকে গ্রাস করে ফেলবে। যেদিন মানুষদের পুরুত্থিত করা হবে, সেদিন গুনাহগার ব্যক্তির জন্য অপেক্ষা করবে জাহান্নামের ভয়ংকর সব আযাব।
গুনাহগার ব্যক্তি যখন চূড়ান্ত ধ্বংসের অপেক্ষায় থাকবে, তখন জীবনের সফলতায় পৌঁছে যাবে আল্লাহমুখী মানুষেরা; যারা ক্ষণস্থায়ী পৃথিবীতে আল্লাহ তাআলার অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রেখেছে, গুনাহমুক্ত জীবন যাপন করেছে। ভুলক্রমে, ইচ্ছায়, অনিচ্ছায় কদাচিৎ ভুল করে বসলেও তাওবা ও ইস্তিগফারের মাধ্যমে নিজেকে গুনাহমুক্ত করে নিয়েছে। জীবনে পাপাচার না করে যারা আপন রবের নৈকট্য লাভ করেছে, দয়াময় মালিকের সান্নিধ্যে জীবনকে দিয়েছে শ্রেষ্ঠত্ব, করুণাময় আল্লাহ তাআলার প্রতি অগাধ বিশ্বাস, ভক্তি ও ভালোবাসা পোষণ করে নিজেদের জীবন যারা কাটিয়ে এসেছে পৃথিবীতে, চিরঞ্জীব সত্তার যিকিরে ও স্মরণে যারা ভাবনাহীন প্রশান্ত হৃদয়ের এক নির্মল জীবন অতিবাহিত করেছে তারা সেদিন মহান রবের অপার অনুগ্রহ ও কৃপায় থাকবে নির্ভার ও নিশ্চিন্ত। কিয়ামত-দিবসের বিভীষিকাময় ভয়াবহতার মাঝেও তখন কিছু নেককার বান্দা আনন্দে উৎফুল্লিত হয়ে বলতে থাকবে-'রাব্বে।
কারীমের সান্নিধ্য পেয়ে আমরা আজ ধন্য হয়েছি।' কিয়ামত-দিবসের পেরেশানির মধ্যে কেউ কেউ বলতে থাকবে, 'জান্নাতের বাসিন্দারা এখনই যে উত্তম পরিবেশে আছে, তাদের জন্য নিশ্চয় অপেক্ষা করছে আনন্দঘন এক জীবন।'
আরেকদল সেদিন বলবে, 'দুনিয়ামুখী লোকদের জন্য আফসোস! তারা না দুনিয়াতে ভোগ-বিলাসের জীবন কাটাতে পারল, না পারল দুনিয়া থেকে উত্তম ও চমকপ্রদ জীবন লাভ করতে!'
আল্লাহর নিয়ামতে খুশি হয়ে কিছুলোক সেদিন বলবে, 'পৃথিবীর রাজা-বাদশাহ ও রাজপরিবারের লোকেরা যদি আমাদের এই নিয়ামতরাজির কথা জানতে পারত তাহলে তারা রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ বাঁধিয়ে হলেও এই নিয়ামত লাভের প্রতিযোগিতা করত।'
পুরষ্কারপ্রাপ্ত আরেকদল বলবে, 'পার্থিব জগতেও একটি জান্নাত ছিল, যে ব্যক্তি সেই জান্নাতে যায়নি, সে আখিরাতের জান্নাতেও যাবে না।' [২]
সুতরাং যারা নিজেদের মূল্যবান সময় ও জীবনকে নিতান্তই তুচ্ছ ও ক্ষুদ্র জিনিসের পেছনে ব্যয় করছে তারা যেন নিজের জীবন নিয়ে চিন্তা করে, ফেলে আসা সময়গুলোর প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির হিসাব কষে। তারা যদি নিজের জীবন, নিজের সময়ের সঠিক মূল্যায়ন না-ই করতে পারে, এ ব্যাপারে তাদের যদি কোনো ধারণাই না থাকে তবে তাদের উচিত-যারা জীবন-দর্শন পাঠ করেছে, সময়ের সর্বোচ্চ সফল ব্যবহারে যারা মহান রবের নিকট পুরষ্কারপ্রাপ্ত, তাদের থেকে যেন তারা জীবনের অর্থ জেনে নেয়।

টিকাঃ
[১] আল্লাহ তাআলার আনুগত্যময় জীবন মানুষকে পৃথিবীতেও জান্নাতের অনুভূতি দান করবে। আল্লাহর আনুগত্যে ভরপুর জীবনকেই দুনিয়ার জান্নাত বলে ব্যক্ত করা হয়েছে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00