📄 আল্লাহর নাফরমানি অন্তরকে দুর্বল করে দেয়
আল্লাহ তাআলা ও পরকালের প্রতি আমাদের অন্তর প্রতিনিয়ত ছুটে চলেছে। এই ছুটে চলার গতিকে গুনাহ দুর্বল করে দেয়। কখনো কখনো আল্লাহর নাফরমানি এই আবশ্যকীয় যাত্রাকে থামিয়ে দেয়। বান্দার অন্তর ঈমানের আলোয় আলোকিত হয়ে পরকালের দিকে মৃত্যু অবধি আপন গতিতে ছুটে যায়। গুনাহের কারণে এই গতি ধীর হয়ে যায়। অন্তর দুর্বল হয়ে যায়। গুনাহের মাত্রা বৃদ্ধি পেলে অন্তরের দুর্বলতা বেড়ে যায়। দুর্বল অন্তর তখন আর আল্লাহমুখী থাকে না। অবিনশ্বরের দিকে তার যেই পথচলা ছিল গুনাহের প্রভাবে তা থমকে যায়। তাই গুনাহ অন্তরকে দুর্বল করে দেয়, রোগাক্রান্ত করে তোলে। হৃদয়ের ঈমানী স্পন্দন থামিয়ে দিয়ে অন্তরকে মৃত বানিয়ে ফেলে। গুনাহের নখর থাবায় হৃদয়ের প্রফুল্লতা স্তিমিত হয়ে যায়। অন্তরে তখন দুশ্চিন্তা, দুঃখবোধ, অক্ষমতা, অলসতা, ভয়ভীতি, কৃপণতা জেঁকে বসে। সে ঋণে জর্জরিত হয়, তার উপর অন্যান্য লোকদের প্রভাব বিস্তার করে।
নবীজি আটটি ক্ষতিকর অবস্থা থেকে আল্লাহ তাআলার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করেছেন। গুনাহের কারণে মানুষ সেই আটটি অবস্থায় বিপর্যস্ত হয়ে যায়। সেগুলো হলো-মানসিক দুশ্চিন্তা, দুঃখ, অক্ষমতা, অলসতা, ভয়ভীতি, কৃপণতা, ঋণের বোঝা, মানুষের কর্তৃত্ব। [১]
গুনাহের কারণেই বান্দা এ ধরনের শোচনীয় অবস্থার মুখোমুখি হয়। এ ছাড়া গুনাহ আল্লাহ তাআলার অবাধ্যতা, ভয়াবহ বিপদ, সর্বনাশা দুর্ভাগ্য, ধ্বংসোন্মুখ তাকদীর এবং শত্রুর উল্লাস ডেকে আনে। আল্লাহ তাআলার নিয়ামতরাজি বান্দার কাছ থেকে ছিনিয়ে নেয়ার অন্যতম কারণ এই গুনাহ। আল্লাহ তাআলার অনুগ্রহ ক্রোধে পরিণত হয়ে যায় গুনাহের কারণেই।
টিকাঃ
[১] নবীজি এ উল্লিখিত আটটি জিনিস থেকে মহান আল্লাহ তাআলার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করে দুআ করতেন এবং ঋণে জর্জরিত এক সাহাবীকেও এই দুআ সকাল-সন্ধ্যায় পড়তে বলেছেন। দুআটি হলো- اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الْهَمْ وَالْحَزَنِ وَأَعُوذُ بِكَ مِنَ الْعَجْزِ وَالْكَسَلِ وَأَعُوذُ بِكَ مِنَ الْجُبْنِ وَالْبُخْلِ وَأَعُوذُ بِكَ مِنْ غَلَبَةِ الدَّيْنِ وَقَهْرِ الرِّجَالِ 'আল্লাহ! আমি আপনার কাছে দুশ্চিন্তা ও দুঃখবোধ থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি। আমি অক্ষমতা ও অলসতা থেকে পানাহ চাই। আমি আপনার নিকট ভয়-ভীতি, কৃপণতা ও মন্দ স্বভাব থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি। আশ্রয় প্রার্থনা করছি ঋণে জর্জরিত হওয়া থেকে এবং মানুষের কঠোরতা থেকে।-আবু দাউদ, হাদীস-ক্রম: ১৫৫৭
📄 গুনাহ আল্লাহ তাআলার নিয়ামতকে দূরে সরিয়ে দেয়
গুনাহ বান্দার কাছ থেকে আল্লাহ তাআলার নিয়ামতকে দূরে সরিয়ে দেয়। আল্লাহর ক্রোধকে টেনে আনে। গুনাহের কারণেই বান্দা নিয়ামত থেকে বঞ্চিত হয়। আর আল্লাহর ক্রোধও বান্দার গুনাহের কারণে প্রকাশ পায়। আলী বলেন-
مَا نَزَلْ بَلَاءٌ إِلَّا بِذَنْبٍ، وَلَا رُفِعَ إِلَّا بِتَوْبَةٍ
'গুনাহের কারণেই বান্দা বিপদের সম্মুখীন হয়, আবার তাওবার দ্বারাই বান্দা বিপদ থেকে মুক্তি লাভ করে।'
কুরআনুল কারীমেও ইরশাদ হয়েছে-
وَمَا أَصَابَكُمْ مِنْ مُصِيبَةٍ فَبِمَا كَسَبَتْ أَيْدِيكُمْ وَيَعْفُو عَنْ كَثِيرٍ
'তোমাদের উপর যেসব বিপদ আরোপিত হয়, তা তোমাদের কর্মেরই ফল। আর আল্লাহ তাআলা তোমাদের অনেক অপরাধই মার্জনা করে দেন।'
অন্যত্র আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-
ذَلِكَ بِأَنَّ اللَّهَ لَمْ يَكُ مُغَيَّرًا نِعْمَةً أَنْعَمَهَا عَلَى قَوْمٍ حَتَّى يُغَيِّرُوا مَا بِأَنْفُسِهِمْ
'আল্লাহ তাআলা কখনোই পরিবর্তন করে দেন না তার নিয়ামতকে, যা তিনি কোনো সম্প্রদায়কে দান করেছেন, যতক্ষণ না ঐ সম্প্রদায় নিজেই নিজেদের নির্ধারিত নিয়ামতকে পরিবর্তন করে নেয়।'
আল্লাহ তাআলা এই আয়াতে সুস্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন, তিনি যখন বান্দার উপর কোনো নিয়ামত দান করেন, বান্দা যদি নিজেই ওই নিয়ামতকে পরিবর্তন না করে তবে আল্লাহ তাআলা তার থেকে ওই নিয়ামতকে সরিয়ে নেন না। আল্লাহ তাআলার আনুগত্য, তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা, তাঁর সন্তুষ্টিমূলক কর্মসমূহ ইত্যাদি সবই তাঁর পক্ষ থেকে বান্দার প্রতি নিয়ামত। বান্দা যদি এসব নিয়ামতকে পরিবর্তন করে ফেলে— আনুগত্যকে অবাধ্যতার মাধ্যমে, কৃতজ্ঞতাকে কুফরির মাধ্যমে, সন্তুষ্টিকে ক্রোধের মাধ্যমে— তাহলে বস্তুত বান্দা নিজের সৌভাগ্যকে ফেলে দিয়ে দুর্ভাগ্যকে কাছে টেনে নেয়। এক্ষেত্রে আল্লাহ তাআলা বান্দার প্রতি বিন্দুমাত্রও অবিচার করেন না। বান্দার এমন উদ্ধত আচরণে আল্লাহ তাআলাও সৌহার্দ্যপূর্ণ আচরণের পরিবর্তে কঠোর হয়ে যান, ওই বান্দাকে সম্মানের পরিবর্তে লাঞ্ছিত করেন।
বর্ণিত আছে, আল্লাহ তাআলা বলেন— ‘আমার সম্মান ও মহত্বের শপথ! আমার বান্দা যখন আমার পছন্দের পথ থেকে সরে গিয়ে আমার অপছন্দের পথে চলে, তখন আমিও তার পছন্দের নিয়ামত থেকে তাকে বঞ্চিত করে অপছন্দনীয় অবস্থায় ফেলে দিই। আবার আমার বান্দা যখন আমার অপছন্দনীয় পথ ছেড়ে দিয়ে আমার পছন্দের পথে চলতে শুরু করে, আমিও তখন তার অপছন্দনীয় অবস্থাকে দূর করে তাকে তার প্রিয় নিয়ামত দান করি।’
জনৈক আরব কবি খুব চমৎকার করে বলেছেন—
যখন তুমি তোমার রবের নিয়ামত লাভ করো, তখন অত্যন্ত যত্নবান হয়ে যাও।
সতর্ক থেকো, রবের নাফরমানি নিয়ামতকে দূর করে দেয়।
রবের আনুগত্যের মাধ্যমে তুমি কৃতগুনাহ ঝেড়ে ফেলো,
তিনি অল্প সময়ের মধ্যেই বান্দাকে তার প্রাপ্য বুঝিয়ে দেন।
সাধ্যের সবটুকু ঢেলে দিয়ে তুমি জুলুম থেকে বেঁচে থাকো,
কেননা আমাদের জন্য মানুষকে জুলুম করা খুবই অন্যায়।
এসো, সময় থাকলে পৃথিবীর নানা প্রান্তে আমরা একটি সফর দিই,
খুঁজে খুঁজে দেখে নিই জুলুমবাজ মানুষের ধ্বংসাবশেষ।
এই প্রাচীন ধ্বংসাবশেষগুলো শতায়ু লাভ করেছে জালিমের গল্প শোনাতে,
এবং আমরা এদের গল্পকে মিথ্যাও বলতে পারি না তাদের বলিষ্ঠ কন্ঠের কারণে।
তাদের বিলুপ্তির জন্য এই সর্বনাশা জুলুমই দায়ী।
তাদের জীবন-সংসারকে চূর্ণবিচূর্ণ করে মাটিতে মিশিয়ে দিলো চোখের নিমিষেই,
স্বর্গের আদলে গড়ে তোলা তাদের উপত্যকা, তাদের সুরম্য প্রাসাদ,
ছবির মতো সুন্দর ফুলেল বাগান আর রূপকথার রাজ্য থেকে নেমে আসা গর্বিত দুর্গের নগরী,
তবুও নকশী কাঁথার মতো কারুকার্যময় ও নিরাপদ জীবন থেকে ছিটকে পড়েছে জালিম সম্প্রদায়,
ডুবন্ত সূর্যের মতোই গলে গলে মিশেছে তারা নরকের অগ্নিপ্লাবনে,
আর তাদের অর্জিত মহান রবের সকল নিয়ামত মুছে গিয়েছে তাদের জীবন থেকে,
যেন সেই শ্রেষ্ঠ জীবন কাটিয়েছিল কোনো এক স্বপ্নের ঘোরে।
টিকাঃ
[১] সূরা শুরা, আয়াত-ক্রম: ৩০
[২] সূরা আনফাল, আয়াত-ক্রম: ৫৩
📄 অন্তরঙ্গীতির অন্যতম কারণ আল্লাহ তাআলার অবাধ্যতা
আল্লাহ তাআলা গুনাহগারের অন্তরে ভয়-ভীতি ঢেলে দেন। সে সর্বদা একটা আতঙ্কের মাঝে বসবাস করে। আল্লাহ তাআলার আনুগত্য যেন সাহসিকতার দুর্গ। এই দুর্গে আশ্রিত সবাই অদৃশ্য সত্তার অলৌকিক নির্ভাবনায় থাকে নির্ভার, চিন্তাহীন। আর আল্লাহ তাআলার আনুগত্য ছেড়ে যারা এই দুর্গের বাইরে চলে আসে, জাগতিক সকল ভয়ভীতি তাদেরকে আচ্ছাদিত করে ফেলে। গুনাহগার ব্যক্তি এক অজানা ভয়ে পাখির ডানার মতোই অস্থির থাকে। সামান্য আওয়াজেই ডানা মেলে পাখি যেভাবে আকাশে উড়ে যায়, একজন পাপিষ্ঠ বান্দাও দরজায় সামান্য আওয়াজ পেলেই অস্থির হয়ে ওঠে। সামান্য পায়ের আওয়াজে সে ভয় পেয়ে যায়। সামান্য চিৎকারে সে আতংকিত হয়ে পড়ে। 'চোরের মনে পুলিশ পুলিশ'-এমন প্রবাদবাক্যময় চিন্তিত এক জীবন সে যাপন করতে থাকে। জগতের সকল আয়োজনকেই সে নিজের বিরুদ্ধে মনে করে।
আর যে আল্লাহ তাআলাকে ভয় করে, পার্থিব সকল আয়োজন তার ভীতি-উদ্রেককর চিন্তার সীমানা থেকে বহু দূরে থাকে। পক্ষান্তরে যে আল্লাহ তাআলাকে ভয় করে না, জগত-সংসারের সবকিছুই তখন প্রতিনিয়ত তাকে ভয় দেখাতে থাকে। কবি বলেন-
যেদিন থেকেই চিরন্তনের দিকে এই সৃষ্টিজগতের যাত্রা শুরু হয়েছে
আল্লাহ তাআলার এক অমোঘ ফায়সালা কার্যকর রয়েছে এই বিশ্বজগতে
ভয় আর ত্রাস সর্বদাই অপরাধ আর পঙ্কিল জীবনের জন্য অবধারিত থাকে।
📄 আল্লাহর অবাধ্যতা অন্তরে দুঃসহনীয় একাকিত্বের জন্ম দেয়
আল্লাহ তাআলার অবাধ্য হওয়ার একটি শাস্তি হলো, অবাধ্য ব্যক্তির অন্তরে দুঃসহনীয় একাকিত্ব জন্ম নেয়। জগত-সংসারের সকল আয়োজন আর কোলাহলের মাঝেও সে নিজেকে নিঃসঙ্গ ভাবতে থাকে। গুনাহের কারণে একদিকে মহান রবের সাথে তার দূরত্ব ও একাকিত্ব জন্ম নেয়, অন্যদিকে সৃষ্টিজগতের সাথেও তার দূরত্ব সৃষ্টি হয়।
গুনাহের সাথে সাথে এই নিঃসঙ্গতাবোধও বৃদ্ধি পেতে থাকে। কোলাহলমুখর আন্তরিকতাপূর্ণ জীবনকে ফেলে দিয়ে সে ভীতিকর এক নিঃসঙ্গ জীবন যাপন শুরু করে। সুস্থ বিবেকের কোনো মানুষ যদি কোনো পাপাচারী ব্যক্তির জীবনের দিকে খেয়াল করে এবং ঠান্ডা মাথায় চিন্তা করে, তাহলে সে তার আভ্যন্তরীণ জীবনের করুণ দশা দেখে শিউরে উঠবে। পাপাচারী ব্যক্তি মহান রবের আনুগত্যমণ্ডিত শান্তি ও সৌহার্দ্যের জীবনের বিনিময়ে পাপ-সর্বস্ব এক নিঃসঙ্গ জীবনে একাকী যখন গুনাহ তোমাকে নিঃসঙ্গ বানিয়ে দেবে
তুমি শুধু হিম্মত করে গুনাহ থেকে ফিরে আসো
আর উচ্ছ্বল প্রাচুর্যময় জীবনকে সাদরে গ্রহণ করে প্রফুল্ল হয়ে ওঠো।
এক্ষেত্রে মূল কথা হলো, আনুগত্য বান্দার জীবনে আল্লাহ তাআলার নৈকট্য এনে দেয়। আনুগত্যের পরিমাণ যত বাড়তে থাকে বান্দাও দয়াময় আল্লাহর তত নিকটে পৌঁছে যায়। আর বান্দা যখন গুনাহে লিপ্ত হয়ে আল্লাহর নৈকট্য থেকে তখন বঞ্চিত হয়ে যায়, আল্লাহ তাআলার সাথে তখন তার দূরত্ব জন্ম নেয়। গুনাহের সাথে সাথে দিন দিন এই দূরত্ব বাড়তে থাকে।
আল্লাহ তাআলার সাথে একজন পাপিষ্ঠ বান্দার এই সম্পর্ক মানুষের সাথে শত্রুর সম্পর্কের মতোই। দৈহিক নৈকট্য সত্ত্বেও মানুষ যেমন তার শত্রুর থেকে এক ধরনের দূরত্ব বজায় রাখে, একজন গুনাহগারের সাথেও মহান আল্লাহর এমন দূরত্ব সৃষ্টি হয়। আবার একজন নেক ও সৎ বান্দার সাথে আল্লাহ তাআলার নৈকট্য ও অন্তরঙ্গতা থাকে ঘনিষ্ঠ বন্ধুর মতো। এ ক্ষেত্রে ঘনিষ্ঠজন যতই দূরে থাকুক না কেন, হৃদয়রাজ্যে একজন আরেকজনের নিকটেই বসবাস করতে থাকে। একজন নেককার বান্দার সাথেও আল্লাহ তাআলার সম্পর্ক এমনই হয়ে থাকে।