📄 গুনাহ মানুষকে আল্লাহভোলা করে দেয়
গুনাহের ফলে মানুষ তার সৃষ্টিকর্তা, তার রব মহান আল্লাহ তাআলাকে ভুলে যায়। আল্লাহর নৈকট্য থেকে তাকে দূরে সরিয়ে শয়তানের সাথে আন্তরিকতা তৈরি করে দেয়। আর মানুষের এই পরিণাম এমন সর্বনাশা যে, তার থেকে মুক্তির হয়তো আর কোনো পথই তখন বাকি থাকে না। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করছেন-
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَلْتَنْظُرْ نَفْسٌ مَا قَدَّمَتْ لِغَدٍ وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ خَبِيرٌ بِمَا تَعْمَلُونَ - وَلَا تَكُونُوا كَالَّذِينَ نَسُوا اللَّهَ فَأَنْسَاهُمْ أَنْفُسَهُمْ أُولَئِكَ هُمُ الْفَاسِقُونَ
'হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহ তাআলাকে ভয় করো। প্রতিটি ব্যক্তিই যেন চিন্তা করে সে তার ভবিষ্যতের জন্য কী প্রস্তুত করছে। তোমরা আল্লাহ তাআলাকে ভয় করো। নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা তোমাদের কর্মসমূহের ব্যাপারে খুবই অবগত। তোমরা তাদের মতো হয়ো না, যারা আল্লাহ তাআলাকে ভুলে গিয়েছে; এ কারণে আল্লাহ তাআলাও তাদেরকে আত্মবিস্মৃত করে দিয়েছেন। তারাই হলো অবাধ্য ও ফাসিক।।১৯
এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা তাঁকে ভয় করার কথা বলেছেন। তাকওয়ার আদেশ করেছেন। সেইসাথে আল্লাহভোলা হতেও নিষেধ করেছেন। আল্লাহভোলা হবার একটি শাস্তিও তিনি আয়াতে উল্লেখ করে দিয়েছেন। যারা আল্লাহকে ভুলে যাবে আল্লাহ তাআলাও তাদেরকে তাদের নিজেদের ব্যাপারে আত্মবিস্মৃতি করে দেবেন। অর্থাৎ তারা তখন নিজেদের ভালোমন্দের ব্যাপারও ভুলে যাবে।
জীবনের সফলতা, কর্মপন্থা, জীবনের সুখ-শান্তি ও মুক্তির পথ তারা খুঁজে পাবে না।
গুনাহগার বান্দাকে আমরাও দেখতে পাই, সে তার নিজ জীবনের ভালোমন্দের ব্যাপারে থাকে উদাসীন। নিজের চূড়ান্ত সফলতার কথা ভুলে পার্থিব মনোবাসনার পিছে ছুটতে থাকে। স্থায়ী সাফল্যকে এড়িয়ে ক্ষণস্থায়ী ভোগবিলাসে মত্ত হয়। অথচ বুদ্ধিমান ব্যক্তি কখনোই নিজের কল্যাণ ও সফলতার ব্যাপারে আত্মবিস্মৃত হয় না। কবি বলেছেন-
أَحْلَامُ نَوْمٍ أَوْ كَظِلَّ زَائِلٍ ... إِنَّ اللَّبِيبَ بِمِثْلِهَا لَا يُخْدَعُ
'ঘুমন্ত স্বপ্নের মোহে কিংবা চলার পথের ছায়ার শান্তিতে বুদ্ধিমান পথিক কখনোই ধোঁকা খায় না।'
টিকাঃ
[১] সূরা হাশর, আয়াত-ক্রম: ১৮,১১
📄 গুনাহ সদ্ব্যবহারের অভ্যাস থেকে বঞ্চিত হওয়ার কারণ
গুনাহের একটি বড় ক্ষতি হলো, বান্দা গুনাহের কারণে তার আশপাশের মানুষের সাথে সদ্ব্যবহার করতে পারে না। ইহসানের পরিচয় দিয়ে সে তার চরিত্রের মাধুর্যপূর্ণ ব্যবহার দেখাতে পারে না।[১]
মানুষের অন্তরে যখন ইহসানের স্বভাব বা যোগ্যতা থাকবে, তখন সে গুনাহ থেকে স্বাভাবিকভাবেই বিরত থাকবে। কেননা যে ব্যক্তি আল্লাহ তাআলার ইবাদাত করবে, তার চিন্তা ও মননে সর্বদা আল্লাহ তাআলার দর্শন জেগে থাকবে। সে চিন্তা করবে— 'আমি যখন ইবাদাত করি, তখন আল্লাহ তাআলা আমার সামনেই থাকেন। আমি আল্লাহ তাআলাকে দেখতে না পেলেও আল্লাহ তাআলা আমাকে ঠিকই দেখছেন।' তার এই মানসিকতাই তাকে আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে অবধারিতভাবে ফিরিয়ে রাখবে। আল্লাহর স্মরণ, আল্লাহপ্রেম ও আল্লাহভীতি তার অন্তরে এতটাই প্রভাব ফেলবে যে, সে গুনাহের দিকে সামান্যতমও অগ্রসর হতে পারবে না। কিন্তু বান্দা যখন ইহসানের স্বভাবকে ছেড়ে দেয়, তার ইবাদাত নিছক কিছু দৃশ্যমান কাজে পরিণত হয়, তখন সে অনায়াসেই গুনাহ করতে পারে। আর এই গুনাহ তাকে আল্লাহর চিন্তা থেকে উদাসীন করে ফেলে। আল্লাহ তাআলা তাকে দেখছেন—এমন পবিত্র ও উত্তম চিন্তাসূত্রে সে তখন নিজেকে আর আবদ্ধ রাখতে পারে না।
এমনিভাবে মানুষ যখন গুনাহ করে, তখন সে ঈমানের স্বভাব ও যোগ্যতা থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে নেয়। হাদীসে বর্ণিত হয়েছে—
لَا يَزْنِي الزَّانِي حِينَ يَزْنِي وَهُوَ مُؤْمِنٌ، وَلَا يَشْرَبُ الْخَمْرَ حِينَ يَشْرَبُهَا وَهُوَ مُؤْمِنٌ، وَلَا يَسْرِقُ السَّارِقُ حِينَ يَسْرِقُ وَهُوَ مُؤْمِنٌ
'কোনো মানুষ ঈমান থাকা অবস্থায় ব্যভিচার করতে পারে না। আবার কোনো ব্যক্তি ঈমান থাকা অবস্থায় মদ পান করতে পারে না। ঈমান থাকা অবস্থায় কেউ চুরিও করতে পারে না।''[১]
গুনাহের ব্যাপারে সকলেরই চূড়ান্ত পর্যায়ের সতর্ক থাকা একান্ত জরুরি। আবার অতীত-জীবনের সকল গুনাহের জন্যেও তাওবা করা আবশ্যক।
টিকাঃ
[১] ইহসান মানবস্বভাবের অন্যতম একটি উত্তম চরিত্র। ইহসানের প্রকাশ মানুষ সদাচার ও সদ্ব্যবহারের দ্বারা প্রকাশ করে থাকে। একবার জিবরীল আমীন আলাইহিস সালাম নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞেস করলেন, 'ইহসান কাকে বলে?' নবীজি তখন উত্তর দিলেন, 'ইহসান বলা হয় আল্লাহ তাআলার ইবাদাতের সময় এমনভাবে চিন্তা করা যে, তুমি আল্লাহ তাআলাকে দেখছ। এরকমের উচ্চতর চিন্তা করতে না পারলেও অন্তরে এতটুক বিশ্বাস রাখা যে, আল্লাহ তাআলা আমার এই ইবাদাতকে দেখছেন।' বুখারী, হাদীস-ক্রম: ৫০। -অনুবাদক
[১] বুখারী, হাদীস-ক্রম: ৬৭৮২
📄 গুনাহগার অসংখ্য সওয়াব ও কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হয়
আল্লাহ তাআলা যখন কোনো বান্দার ভালো ও কল্যাণের ইচ্ছা করেন, তখন সেই বান্দাকে নেককার মুমিন বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত করে দেন। ঈমানের পরিবেশে রাখেন। পক্ষান্তরে আল্লাহ তাআলার নাফরমানি ঈমানের পরিবেশ থেকে মানুষকে দূরে সরিয়ে দেয়। গুনাহের একটি বড় ক্ষতি হলো, গুনাহের কারণে মানুষ মুমিন বান্দাদের সংস্পর্শ লাভ করতে পারে না। আল্লাহ তাআলা মুমিন বান্দাদের জন্য বিশেষ নিরাপত্তা ও সুরক্ষার ব্যবস্থা করেন। গুনাহগার ব্যক্তি এই নিরাপত্তার বাইরে চলে যায়। আল্লাহ তাআলা মুমিন বান্দাদের জন্য যত রকমের কল্যাণ ও সফলতা রেখেছেন, গুনাহগার ব্যক্তি সেসব থেকে বঞ্চিত হয়ে যায়। পবিত্র কুরআনে বর্ণিত এই কল্যাণ ও সফলতার তালিকা প্রায় একশ'র কাছাকাছি। যেমন-
মহাপ্রতিদান। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-
وَسَوْفَ يُؤْتِ اللَّهُ الْمُؤْمِنِينَ أَجْرًا عَظِيمًا
| 'আল্লাহ তাআলা শীঘ্রই মুমিনদেরকে মহাপ্রতিদান দেবেন।' [১]
জাগতিক ও পরকালীন বিবিধ ক্ষতি থেকে সুরক্ষা প্রদান। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-
إِنَّ اللَّهَ يُدَافِعُ عَنِ الَّذِينَ آمَنُوا
| 'নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা ঈমানদারদেরকে সুরক্ষিত রাখেন।'[২]
আরশ বহনকারী ফিরিশতাদের ক্ষমাপ্রার্থনা। কুরআনের ইরশাদ-
الَّذِينَ يَحْمِلُونَ الْعَرْشَ وَمَنْ حَوْلَهُ يُسَبِّحُونَ بِحَمْدِ رَبِّهِمْ وَيُؤْمِنُونَ بِهِ وَيَسْتَغْفِرُونَ لِلَّذِينَ آمَنُوا
'যারা আরশ বহন করে এবং যারা আরশের চারপাশে থাকে তারা তাদের রবের পবিত্রতা বর্ণনা করতে থাকে এবং তাঁর প্রতি রাখে অগাধ বিশ্বাস। এবং যারা আল্লাহর প্রতি ঈমান আনে তাদের জন্য তারা ক্ষমা প্রার্থনা করে দুআ করতে থাকে।'[৩]
আল্লাহ তাআলা মুমিন বান্দাদের অভিভাবকত্ব গ্রহণ করেন।
ইরশাদ হচ্ছে-
اللَّهُ وَلِيُّ الَّذِينَ آمَنُوا
'যারা ঈমান এনেছে, আল্লাহ তাআলাই হলেন তাদের অভিভাবক।।১।
আল্লাহ তাআলা মুমিন বান্দাদেরকে ঈমানের পথে দৃঢ়পদ রাখতে ফিরিশতাদেরকে নির্দেশ দিয়ে দেন।
ইরশাদ হচ্ছে-
إِذْ يُوحِي رَبُّكَ إِلَى الْمَلَائِكَةِ أَنِّي مَعَكُمْ فَثَبِّتُوا الَّذِينَ آمَنُوا
'স্মরণ করুন, যখন আমি ফিরিশতাদের নিকট প্রত্যাদেশ প্রেরণ করলাম, আমি তোমাদের সাথেই আছি, তোমরা ঈমানদারদেরকে দৃঢ়পদ রাখো।
মুমিন বান্দাদের জন্য আল্লাহ তাআলার নিকট রয়েছে উন্নত রিযিকব্যবস্থা, মাগফিরাত এবং বিশেষ মর্যাদা। রয়েছে বিশেষ সম্মান।
ইরশাদ হচ্ছে-
وَلِلَّهِ الْعِزَّةُ وَلِرَسُولِهِ وَلِلْمُؤْمِنِينَ وَلَكِنَّ الْمُنَافِقِينَ لَا يَعْلَمُونَ
'সম্মান ও মর্যাদার অধিকারী হলেন মহান আল্লাহ তাআলা, তাঁর রাসূল ও মুমিন বান্দাগণ। কিন্তু মুনাফিকরা জানে না।
অন্যত্র ইরশাদ হচ্ছে-
يَرْفَعِ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا مِنْكُمْ وَالَّذِينَ أُوتُوا الْعِلْمَ دَرَجَاتٍ
| 'তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান এনেছে এবং জ্ঞানপ্রাপ্ত, আল্লাহ তাআলা তাদেরকে সম্মানিত করবেন।।১।
আল্লাহ তাআলা ঈমানদারদের সাথে রয়েছেন। ইরশাদ হচ্ছে-
وَأَنَّ اللَّهَ مَعَ الْمُؤْمِنِينَ
| 'আল্লাহ তাআলা ঈমানদারদের সাথেই আছেন।'।২।
আল্লাহ তাআলা মুমিন বান্দাদেরকে তাঁর অনুগ্রহের প্রাচুর্যতা দান করবেন এবং এমন বিশেষ এক ঐশী আলো দান করবেন, যে আলোতে বিশ্বাসীরা জীবন-চলার পথে সামনের দিকে এগিয়ে যাবে। সেইসাথে আল্লাহ তাআলা তাদের গুনাহসমূহকেও মাফ করে দেবেন। ইরশাদ হচ্ছে-
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَآمِنُوا بِرَسُولِهِ يُؤْتِكُمْ كِفْلَيْنِ مِن رَّحْمَتِهِ وَيَجْعَل لَّكُمْ نُوراً تَمْشُونَ بِهِ وَيَغْفِرْ لَكُمْ
হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহ তাআলাকে ভয় কর এবং এবং তার রাসূলের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করো। আল্লাহ তাআলা তোমদেরকে ভরপুর অনুগ্রহ দান করবেন এবং তোমাদের জন্য তিনি এমন এক আলোকরশ্মি স্থাপন করে দেবেন, যার আলোয় তোমরা চলতে পারবে এবং তিনি তোমাদেরকে ক্ষমা করবেন।।৩।
আল্লাহ তাআলা মুমিন বান্দাদের জন্য সৌহার্দ্যপূর্ণ ও আন্তরিক আচরণ করেন। তাদের জন্য আসমানের ফিরিশতা, নবীগণ এবং সকল নেক বান্দার অন্তরে ভালোবাসা তৈরি করে দেন। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-
إِنَّ الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ سَيَجْعَلُ لَهُمُ الرَّحْمَنُ وُدًّا
'নিশ্চয় যারা ঈমান এনেছে এবং সৎকর্ম করেছে, দয়াময় আল্লাহ অবশ্যই তাদেরকে ভালোবাসা দেবেন'।১।
প্রলয়ঙ্করী কিয়ামত দিবসে মুমিন বান্দাগণ নিরাপদ ও নিশ্চিন্ত থাকবেন।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-
فَمَنْ آمَنَ وَأَصْلَحَ فَلَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ سُورَةُ الْأَنْعَامِ
'যারা ঈমান এনেছে এবং সংশোধিত হয়েছে তাদের কোনো ভয় নেই এবং তারা চিন্তিতও হবে না'।২।
সূরা ফাতিহাতে আমরা যে সরল পথের প্রার্থনা করি, মুমিন বান্দাগণ হলেন সেই পথের অনুসারী ও মহান রবের পক্ষ থেকে পুরষ্কারপ্রাপ্ত।
এই দীর্ঘ আলোচনা থেকে একথাই প্রতীয়মান হয় যে, ঈমান হলো জগতের সকল কল্যাণের মূল উৎস। আর ঈমানহীনতা জাগতিক সকল অকল্যাণ ও অনিষ্টের মূল। সুতরাং একজন মুমিন বান্দার জন্য এমন কোনো কাজে লিপ্ত হওয়া কখনোই বাঞ্ছনীয় নয়, যে-কাজ তাকে ঈমানহীনতার দিকে ঠেলে দেয়। হয়তো সে নামেমাত্র মুসলমান থাকবে, কিন্তু গুনাহের কারণে ঈমানের নূর ধীরে ধীরে স্তিমিত হতে থাকবে। আর কখনো যদি কোনো ব্যক্তি গুনাহের উপর অবিচল থাকে, আল্লাহ তাআলার নাফরমানি অবিরত করে যেতেই থাকে তাহলে আশঙ্কা হয় যে, এই ব্যক্তির অন্তরে মরিচা ধরবে। সে ইসলামের পবিত্র সীমানার বাইরে পা ফেলতে শুরু করবে। এই কারনেই আমাদের পূর্ববর্তী বুযুর্গ আলেমগণ সর্বদা ভয়ে থেকেছেন। অতীতের একজন আলেম মন্তব্য করেছেন,
'তোমরা গুনাহের ভয় করো আর আমি কুফরির ভয়ে থাকি।'
টিকাঃ
[১] সূরা নিসা, আয়াত-ক্রম: ১৪৬
[২] সূরা হজ, আয়াত-ক্রম: ৩৮
[৩] সূরা মুমিন, আয়াত-ক্রম: ৭
[১] সূরা বাকারা, আয়াত-ক্রম: ২৫৭
[২] সূরা আনফাল, আয়াত-ক্রম: ১২
[৩] সূরা মুনাফিকুন, আয়াত-ক্রম: ৮
[১] সূরা মুজাদালাহ, আয়াত-ক্রম: ১১
[২] সূরা আনফাল, আয়াত-ক্রম: ১৯
[৩] সূরা হাদীদ, আয়াত-ক্রম: ২৮
[১] সূরা মারইয়াম, আয়াত-ক্রম: ৯৬
[২] সূরা আনআম, আয়াত-ক্রম: ৪৮
📄 আল্লাহর নাফরমানি অন্তরকে দুর্বল করে দেয়
আল্লাহ তাআলা ও পরকালের প্রতি আমাদের অন্তর প্রতিনিয়ত ছুটে চলেছে। এই ছুটে চলার গতিকে গুনাহ দুর্বল করে দেয়। কখনো কখনো আল্লাহর নাফরমানি এই আবশ্যকীয় যাত্রাকে থামিয়ে দেয়। বান্দার অন্তর ঈমানের আলোয় আলোকিত হয়ে পরকালের দিকে মৃত্যু অবধি আপন গতিতে ছুটে যায়। গুনাহের কারণে এই গতি ধীর হয়ে যায়। অন্তর দুর্বল হয়ে যায়। গুনাহের মাত্রা বৃদ্ধি পেলে অন্তরের দুর্বলতা বেড়ে যায়। দুর্বল অন্তর তখন আর আল্লাহমুখী থাকে না। অবিনশ্বরের দিকে তার যেই পথচলা ছিল গুনাহের প্রভাবে তা থমকে যায়। তাই গুনাহ অন্তরকে দুর্বল করে দেয়, রোগাক্রান্ত করে তোলে। হৃদয়ের ঈমানী স্পন্দন থামিয়ে দিয়ে অন্তরকে মৃত বানিয়ে ফেলে। গুনাহের নখর থাবায় হৃদয়ের প্রফুল্লতা স্তিমিত হয়ে যায়। অন্তরে তখন দুশ্চিন্তা, দুঃখবোধ, অক্ষমতা, অলসতা, ভয়ভীতি, কৃপণতা জেঁকে বসে। সে ঋণে জর্জরিত হয়, তার উপর অন্যান্য লোকদের প্রভাব বিস্তার করে।
নবীজি আটটি ক্ষতিকর অবস্থা থেকে আল্লাহ তাআলার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করেছেন। গুনাহের কারণে মানুষ সেই আটটি অবস্থায় বিপর্যস্ত হয়ে যায়। সেগুলো হলো-মানসিক দুশ্চিন্তা, দুঃখ, অক্ষমতা, অলসতা, ভয়ভীতি, কৃপণতা, ঋণের বোঝা, মানুষের কর্তৃত্ব। [১]
গুনাহের কারণেই বান্দা এ ধরনের শোচনীয় অবস্থার মুখোমুখি হয়। এ ছাড়া গুনাহ আল্লাহ তাআলার অবাধ্যতা, ভয়াবহ বিপদ, সর্বনাশা দুর্ভাগ্য, ধ্বংসোন্মুখ তাকদীর এবং শত্রুর উল্লাস ডেকে আনে। আল্লাহ তাআলার নিয়ামতরাজি বান্দার কাছ থেকে ছিনিয়ে নেয়ার অন্যতম কারণ এই গুনাহ। আল্লাহ তাআলার অনুগ্রহ ক্রোধে পরিণত হয়ে যায় গুনাহের কারণেই।
টিকাঃ
[১] নবীজি এ উল্লিখিত আটটি জিনিস থেকে মহান আল্লাহ তাআলার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করে দুআ করতেন এবং ঋণে জর্জরিত এক সাহাবীকেও এই দুআ সকাল-সন্ধ্যায় পড়তে বলেছেন। দুআটি হলো- اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الْهَمْ وَالْحَزَنِ وَأَعُوذُ بِكَ مِنَ الْعَجْزِ وَالْكَسَلِ وَأَعُوذُ بِكَ مِنَ الْجُبْنِ وَالْبُخْلِ وَأَعُوذُ بِكَ مِنْ غَلَبَةِ الدَّيْنِ وَقَهْرِ الرِّجَالِ 'আল্লাহ! আমি আপনার কাছে দুশ্চিন্তা ও দুঃখবোধ থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি। আমি অক্ষমতা ও অলসতা থেকে পানাহ চাই। আমি আপনার নিকট ভয়-ভীতি, কৃপণতা ও মন্দ স্বভাব থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি। আশ্রয় প্রার্থনা করছি ঋণে জর্জরিত হওয়া থেকে এবং মানুষের কঠোরতা থেকে।-আবু দাউদ, হাদীস-ক্রম: ১৫৫৭