📄 আল্লাহর অবাধ্যতা মানুষকে লজ্জাহীন করে দেয়
আল্লাহ তাআলার অবাধ্যতা ও নাফরমানি মানুষকে লজ্জাহীন বানিয়ে দেয়। গুনাহ ও পাপকাজে লিপ্ত ব্যক্তি বেহায়া মানুষে পরিণত হয়। লজ্জা হলো মানবাত্মার একটি আবশ্যকীয় গুণ ও বৈশিষ্ট্য। লজ্জা ও শালীনতাবোধ যাবতীয় কল্যাণ ও ভালো কাজের উৎস। সুতরাং লজ্জা ও শালীনতার অবক্ষয় মানে যাবতীয় কল্যাণ ও ভালোকাজ থেকে বঞ্চিত হয়ে যাওয়া।
নবীজি বলেন, 'লজ্জা বা শালীনতার সবটুকুই হলো কল্যাণ ও উত্তম।' [১]
গুনাহ মানুষের এই লজ্জাবোধকে দুর্বল করে দেয়। এমনকি মানুষ যখন অবারিতভাবে গুনাহের কাজে ডুবে থাকে, তখন তার অন্তরে বিন্দুমাত্র লজ্জাবোধ ও লোকচক্ষুর ভয় থাকে না। 'লোকে কী বলবে' বা 'মানুষ আমার এই নিকৃষ্ট অবস্থা জেনে ফেলবে'—এ ধরনের কোনো আশঙ্কা বা অনুভূতি তার অন্তরে আর কোনো প্রভাব রাখে না। আর কোনো মানুষ যখন এমন পর্যায়ে পৌঁছে যায় তখন তার সংশোধনের ব্যাপারে নিরাশ হতে হয়।
বর্ণিত আছে, ইবলিস যখন এমন ব্যক্তিকে দেখে তখন সে অভিনন্দন জানিয়ে বলে, 'কল্যাণ থেকে বঞ্চিত ব্যক্তি! তোমার জন্য আমি উৎসর্গিত, আমার প্রাণ তোমার জন্য নিবেদিত।'
লজ্জাকে আরবীতে 'الحياء' হায়া বলা হয়। শব্দটির সাথে আরবী 'হায়াত' অর্থাৎ 'জীবন' শব্দের মূলধাতু একই হওয়ায় বলা হয়, 'হায়া বা লজ্জাই হলো দুনিয়া ও আখিরাতের জীবন। যার হায়া নেই তার হায়াত নেই। অর্থাৎ লজ্জাহীন ব্যক্তি জাগতিক সংসারে মৃত ব্যক্তির মতো। তার মাধ্যমে মানবজীবনে কোনো কল্যাণের আশা নেই। আর আখিরাত বা পরকালের জীবনেও সে হবে দুর্ভাগা। লজ্জাহীনতা ও গুনাহের মাঝে নিগূঢ় এক সম্পর্ক রয়েছে। একটি অপরটিকে মানুষের জন্য সহজ করে দেয়। আর লজ্জাবোধ ও শালীনতা মানুষকে গুনাহের সময় আল্লাহ তাআলার কথা, আল্লাহ তাআলার শাস্তির কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। আল্লাহ তাআলার সামনে কিয়ামত-দিবসে দাঁড়ানোর কথা মনে করিয়ে দেয়। তখন মানুষ লজ্জাবোধ থেকেই আল্লাহ তাআলার নাফরমানি ও অবাধ্যতা থেকে বিরত থাকে।
সহীহ বুখারীর আরেকটি হাদীসে বর্ণিত হয়েছে-
إِنَّ مِمَّا أَدْرَكَ النَّاسَ مِنْ كَلَامِ النُّبُوَّةِ الْأُولَى: إِذَا لَمْ تَسْتَحِ فَاصْنَعْ مَا شِئْتَ
'অতীতকালের নুবওয়াতের বাণীর মধ্য থেকে এই সময়ের মানুষদের জন্য একটি বার্তা হলো, যদি তোমার লজ্জাবোধ না থাকে তাহলে তুমি যা ইচ্ছা তাই করতে পার।'[১]
লজ্জা ও শালীনতার গুরুত্ব বোঝানোর জন্য হাদীসটি বর্ণিত হয়েছে। অর্থাৎ মানবজাতিকে লজ্জা ও শালীনতার ব্যাপারে সতর্ক করে দেয়া হয়েছে। নিকৃষ্ট ও মন্দ কাজ কেবলমাত্র লজ্জার অনুপস্থিতিতেই করা সম্ভব।
টিকাঃ
[১] মুসলিম, হাদীস-ক্রম: ৩৭
[১] বুখারী, হাদীস-ক্রম: ৩৪৮৩; আবু দাউদ, হাদীস-ক্রম: ৪৭৯৭
📄 গুনাহ অন্তর থেকে আল্লাহর ভয় ও শ্রদ্ধাকে ম্লান করে দেয়
গুনাহের একটি ক্ষতি হলো, আল্লাহ তাআলার প্রতি ভয়, শ্রদ্ধা ও ভক্তিকে মানুষের অন্তরে দুর্বল করে দেয়। গুনাহের প্রতি মানুষের আসক্তি জন্ম নেয় আল্লাহভীতির দুর্বলতার সুযোগে। আল্লাহ তাআলার নাফরমানি ও অবাধ্যতার মতো দুঃসাহস তার অন্তরে স্থান করে নেয় রবের প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মানের দুর্বলতার সুযোগে। কেউ কেউ এক অদ্ভূত ধোঁকার মধ্যে থাকে। সে যুক্তি দেখায়, আল্লাহ তাআলার প্রতি উত্তম ধারণা ও ক্ষমাপ্রাপ্তির আশা আমার অন্তরে পূর্ণমাত্রায় বিদ্যমান। সেই আশাকে পুঁজি করেই আমি অবাধ্য হয়েছি। আমার অন্তরে আল্লাহ তাআলার প্রতি পূর্ণমাত্রায় শ্রদ্ধা ও সম্মান বিদ্যমান।
তার এ ধরনের মুখের বুলি স্পষ্ট ভ্রান্তি ও ভ্রষ্টতা ছাড়া কিছু নয়। কেননা আল্লাহ তাআলার প্রতি ভয়, শ্রদ্ধা ও ভক্তি আল্লাহ তাআলার নিষিদ্ধ কাজের প্রতিও ভয় ও শ্রদ্ধাবোধকে জাগ্রত করে দেয়। আর আল্লাহ তাআলা কর্তৃক গৃহীত হালাল ও হারামের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ বান্দাকে অবধারিতভাবে আল্লাহর নাফরমানি থেকে বিরত রাখবে। বরং এভাবেও বলা যায় যে, নাফরমানির একটি বড় শাস্তি হলো-আল্লাহ তাআলার প্রতি ভয় ও শ্রদ্ধা, তার হারাম বিধানের প্রতি সম্মানবোধ গুনাহগার ব্যক্তির অন্তর থেকে উঠিয়ে নেয়া। বান্দার নিকট আল্লাহ তাআলার যেসমস্ত হক ও অধিকার রয়েছে, সেসব তখন তুচ্ছ হয়ে যায়।
বান্দার অন্তর থেকে যখন আল্লাহভীতি ও শ্রদ্ধাবোধ চলে যায় তখন আল্লাহ তাআলাও তাকে তার সৃষ্টিজগতের সামনে অপদস্থ করেন। মানুষের অন্তর থেকেও তখন গুনাহগার ব্যক্তির জন্য কোনো শ্রদ্ধাবোধ আর বাকি থাকে না।
মানুষ আল্লাহ তাআলার বিধানাবলির প্রতি যতটুকু সম্মান প্রদর্শন করবে, তাকেও সমাজে ততটুকুই সম্মান করা হবে। আল্লাহ তাআলার প্রতি যে-পরিমাণ ভালোবাসা তার অন্তরে থাকবে, তার প্রতি মানুষের ভালোবাসা ঠিক তেমনই থাকবে। আর মানুষ যখন আল্লাহ তাআলা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে, আল্লাহর প্রতি নিজের ভয়, শ্রদ্ধা আর সম্মানবোধকে নষ্ট করে দেবে, আল্লাহ তাআলাও সমাজের বুকে তাকে ততটুকুই নিচে নামিয়ে দেবেন। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-
وَمَنْ يُهِنِ اللَّهُ فَمَا لَهُ مِنْ مُكْرِمٍ
'আর আল্লাহ তাআলা যাকে অপমানিত করেন, তাকে কেউই সম্মান করে না। [১]
অর্থাৎ মানুষ যখন আল্লাহ তাআলাকে সিজদার মাধ্যমে সম্মান করেনি, সিজদাহ করা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে আল্লাহ তাআলাও তাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। আল্লাহ তাআলাও তাদেরকে সম্মানিত করেননি। আর আল্লাহ তাআলা যাদেরকে সম্মান দেন না, পৃথিবীতে কেউই তাদেরকে সম্মানিত করতে পারে না। আবার আল্লাহ তাআলা যাকে সম্মান দেন তাকে কেউই অপদস্থ করতে পারে না।
টিকাঃ
[১] সূরা হজ, আয়াত-ক্রম: ১৮
📄 গুনাহ মানুষকে আল্লাহভোলা করে দেয়
গুনাহের ফলে মানুষ তার সৃষ্টিকর্তা, তার রব মহান আল্লাহ তাআলাকে ভুলে যায়। আল্লাহর নৈকট্য থেকে তাকে দূরে সরিয়ে শয়তানের সাথে আন্তরিকতা তৈরি করে দেয়। আর মানুষের এই পরিণাম এমন সর্বনাশা যে, তার থেকে মুক্তির হয়তো আর কোনো পথই তখন বাকি থাকে না। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করছেন-
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَلْتَنْظُرْ نَفْسٌ مَا قَدَّمَتْ لِغَدٍ وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ خَبِيرٌ بِمَا تَعْمَلُونَ - وَلَا تَكُونُوا كَالَّذِينَ نَسُوا اللَّهَ فَأَنْسَاهُمْ أَنْفُسَهُمْ أُولَئِكَ هُمُ الْفَاسِقُونَ
'হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহ তাআলাকে ভয় করো। প্রতিটি ব্যক্তিই যেন চিন্তা করে সে তার ভবিষ্যতের জন্য কী প্রস্তুত করছে। তোমরা আল্লাহ তাআলাকে ভয় করো। নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা তোমাদের কর্মসমূহের ব্যাপারে খুবই অবগত। তোমরা তাদের মতো হয়ো না, যারা আল্লাহ তাআলাকে ভুলে গিয়েছে; এ কারণে আল্লাহ তাআলাও তাদেরকে আত্মবিস্মৃত করে দিয়েছেন। তারাই হলো অবাধ্য ও ফাসিক।।১৯
এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা তাঁকে ভয় করার কথা বলেছেন। তাকওয়ার আদেশ করেছেন। সেইসাথে আল্লাহভোলা হতেও নিষেধ করেছেন। আল্লাহভোলা হবার একটি শাস্তিও তিনি আয়াতে উল্লেখ করে দিয়েছেন। যারা আল্লাহকে ভুলে যাবে আল্লাহ তাআলাও তাদেরকে তাদের নিজেদের ব্যাপারে আত্মবিস্মৃতি করে দেবেন। অর্থাৎ তারা তখন নিজেদের ভালোমন্দের ব্যাপারও ভুলে যাবে।
জীবনের সফলতা, কর্মপন্থা, জীবনের সুখ-শান্তি ও মুক্তির পথ তারা খুঁজে পাবে না।
গুনাহগার বান্দাকে আমরাও দেখতে পাই, সে তার নিজ জীবনের ভালোমন্দের ব্যাপারে থাকে উদাসীন। নিজের চূড়ান্ত সফলতার কথা ভুলে পার্থিব মনোবাসনার পিছে ছুটতে থাকে। স্থায়ী সাফল্যকে এড়িয়ে ক্ষণস্থায়ী ভোগবিলাসে মত্ত হয়। অথচ বুদ্ধিমান ব্যক্তি কখনোই নিজের কল্যাণ ও সফলতার ব্যাপারে আত্মবিস্মৃত হয় না। কবি বলেছেন-
أَحْلَامُ نَوْمٍ أَوْ كَظِلَّ زَائِلٍ ... إِنَّ اللَّبِيبَ بِمِثْلِهَا لَا يُخْدَعُ
'ঘুমন্ত স্বপ্নের মোহে কিংবা চলার পথের ছায়ার শান্তিতে বুদ্ধিমান পথিক কখনোই ধোঁকা খায় না।'
টিকাঃ
[১] সূরা হাশর, আয়াত-ক্রম: ১৮,১১
📄 গুনাহ সদ্ব্যবহারের অভ্যাস থেকে বঞ্চিত হওয়ার কারণ
গুনাহের একটি বড় ক্ষতি হলো, বান্দা গুনাহের কারণে তার আশপাশের মানুষের সাথে সদ্ব্যবহার করতে পারে না। ইহসানের পরিচয় দিয়ে সে তার চরিত্রের মাধুর্যপূর্ণ ব্যবহার দেখাতে পারে না।[১]
মানুষের অন্তরে যখন ইহসানের স্বভাব বা যোগ্যতা থাকবে, তখন সে গুনাহ থেকে স্বাভাবিকভাবেই বিরত থাকবে। কেননা যে ব্যক্তি আল্লাহ তাআলার ইবাদাত করবে, তার চিন্তা ও মননে সর্বদা আল্লাহ তাআলার দর্শন জেগে থাকবে। সে চিন্তা করবে— 'আমি যখন ইবাদাত করি, তখন আল্লাহ তাআলা আমার সামনেই থাকেন। আমি আল্লাহ তাআলাকে দেখতে না পেলেও আল্লাহ তাআলা আমাকে ঠিকই দেখছেন।' তার এই মানসিকতাই তাকে আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে অবধারিতভাবে ফিরিয়ে রাখবে। আল্লাহর স্মরণ, আল্লাহপ্রেম ও আল্লাহভীতি তার অন্তরে এতটাই প্রভাব ফেলবে যে, সে গুনাহের দিকে সামান্যতমও অগ্রসর হতে পারবে না। কিন্তু বান্দা যখন ইহসানের স্বভাবকে ছেড়ে দেয়, তার ইবাদাত নিছক কিছু দৃশ্যমান কাজে পরিণত হয়, তখন সে অনায়াসেই গুনাহ করতে পারে। আর এই গুনাহ তাকে আল্লাহর চিন্তা থেকে উদাসীন করে ফেলে। আল্লাহ তাআলা তাকে দেখছেন—এমন পবিত্র ও উত্তম চিন্তাসূত্রে সে তখন নিজেকে আর আবদ্ধ রাখতে পারে না।
এমনিভাবে মানুষ যখন গুনাহ করে, তখন সে ঈমানের স্বভাব ও যোগ্যতা থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে নেয়। হাদীসে বর্ণিত হয়েছে—
لَا يَزْنِي الزَّانِي حِينَ يَزْنِي وَهُوَ مُؤْمِنٌ، وَلَا يَشْرَبُ الْخَمْرَ حِينَ يَشْرَبُهَا وَهُوَ مُؤْمِنٌ، وَلَا يَسْرِقُ السَّارِقُ حِينَ يَسْرِقُ وَهُوَ مُؤْمِنٌ
'কোনো মানুষ ঈমান থাকা অবস্থায় ব্যভিচার করতে পারে না। আবার কোনো ব্যক্তি ঈমান থাকা অবস্থায় মদ পান করতে পারে না। ঈমান থাকা অবস্থায় কেউ চুরিও করতে পারে না।''[১]
গুনাহের ব্যাপারে সকলেরই চূড়ান্ত পর্যায়ের সতর্ক থাকা একান্ত জরুরি। আবার অতীত-জীবনের সকল গুনাহের জন্যেও তাওবা করা আবশ্যক।
টিকাঃ
[১] ইহসান মানবস্বভাবের অন্যতম একটি উত্তম চরিত্র। ইহসানের প্রকাশ মানুষ সদাচার ও সদ্ব্যবহারের দ্বারা প্রকাশ করে থাকে। একবার জিবরীল আমীন আলাইহিস সালাম নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞেস করলেন, 'ইহসান কাকে বলে?' নবীজি তখন উত্তর দিলেন, 'ইহসান বলা হয় আল্লাহ তাআলার ইবাদাতের সময় এমনভাবে চিন্তা করা যে, তুমি আল্লাহ তাআলাকে দেখছ। এরকমের উচ্চতর চিন্তা করতে না পারলেও অন্তরে এতটুক বিশ্বাস রাখা যে, আল্লাহ তাআলা আমার এই ইবাদাতকে দেখছেন।' বুখারী, হাদীস-ক্রম: ৫০। -অনুবাদক
[১] বুখারী, হাদীস-ক্রম: ৬৭৮২