📄 আত্মসম্মানবোধ ও ব্যক্তিত্ব
সমগ্র বিশ্ব জগতের মধ্যে আমাদের প্রিয় নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামই ছিলেন সবচেয়ে বেশি আত্মসম্মানবোধ-সম্পন্ন ব্যক্তিত্ব। হাদীস শরীফে নবীজি ইরশাদ করেছেন- [২]
أَتَعْجَبُونَ مِنْ غَيْرَةِ سَعْدٍ؟ وَاللَّهِ لَأَنَا أَغْيَرُ مِنْهُ، وَاللَّهُ أَغْيَرُ مِنِّي
'তোমরা সাদের আত্মপরিচয়বোধ দেখে অবাক হচ্ছ! অথচ তার থেকেও বেশি ব্যক্তিত্বসম্পন্ন ব্যক্তি হলাম আমি নিজে। আর আমার থেকে বেশি আত্মপরিচয়বোধের অধিকারী হলেন অপরিসীম ক্ষমতার অধিকারী মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা। [৩]
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একবার সূর্যগ্রহণের নামাযের পর একটি ভাষণ প্রদান করেন। উক্ত ভাষণের একটি বাণী ছিল-
يَا أُمَّةَ مُحَمَّدٍ وَاللَّهِ مَا مِنْ أَحَدٍ أَغْيَرُ مِنْ اللَّهِ أَنْ يَزْنِيَ عَبْدُهُ أَوْ تَزْنِيَ أَمَتُهُ
'হে মুহাম্মদের উম্মত! আল্লাহর শপথ করে বলছি, আল্লাহর কোনো বান্দা বা বান্দি যখন ব্যভিচারে লিপ্ত হয় তখন আল্লাহর আত্মসম্মানবোধ সবচেয়ে বেশি আঘাতপ্রাপ্ত হয়।'১৯
সহীহ বুখারীর আরেকটি হাদীসে উল্লেখ রয়েছে, নবীজি ইরশাদ করেন-
لَا أَحَدَ أَغْيَرُ مِنَ اللَّهِ، مِنْ أَجْلِ ذَلِكَ حَرَّمَ الْفَوَاحِشَ مَا ظَهَرَ مِنْهَا وَمَا بَطَنَ، وَلَا أَحَدَ أَحَبُّ إِلَيْهِ الْعُذْرُ مِنَ اللَّهِ، مِنْ أَجْلِ ذَلِكَ أَرْسَلَ الرُّسُلَ مُبَشِّرِينَ وَمُنْذِرِينَ، وَلَا أَحَدَ أَحَبُّ إِلَيْهِ الْمَدْحُ مِنَ اللهِ، مِنْ أَجْلِ ذَلِكَ أَثْنَى عَلَى نَفْسِهِ
'আল্লাহ তাআলার মতো আত্মসম্মানবোধ-সম্পন্ন কেউ নেই। এই সম্মানের কারণেই তিনি প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য সকল অশ্লীলতা ও অন্যায়কে হারাম করেছেন। আল্লাহ তাআলার মতো করে কেউ ওযরগ্রহণ করতে ভালোবাসেন না। এইজন্যই তিনি তাঁর রাসূলদেরকে সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী হিসেবে প্রেরণ করেছেন। আল্লাহ তাআলার চেয়ে বেশি কেউ প্রশংসা ও বন্দনাস্তুতি পছন্দ করেন না। আল্লাহ তাআলা নিজেই নিজের প্রশংসা করেছেন। খি
এই হাদীসে নবীজি দুটি বিষয়কে একত্রিত করেছেন। এক হলো আল্লাহ তাআলার আত্মসম্মানবোধ। যার মৌলিক চাহিদা হলো সকল ধরনের নিকৃষ্ট, গর্হিত ও নিন্দনীয় কাজের প্রতি স্বভাবজাত ঘৃণা ও অরুচিবোধ। আরেকটি বিষয় হলো, বান্দার ওযর বা অজুহাত মেনে নিয়ে তার প্রতি ক্ষমাশীল আচরণ, যার মাধ্যমে আল্লাহ তাআলার রহমত ও ইহসানের চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ ঘটে।
আল্লাহ সুবহানাহু তাআলা সর্বোচ্চ গায়রাত তথা আত্মসম্মানবোধ-সম্পন্ন হওয়ার পরও তিনি ভালোবাসেন বান্দার ক্ষমাপ্রার্থনা। তিনি পছন্দ করেন বান্দাকে ক্ষমা আর মার্জনা করতে। যেসকল গর্হিত ও নিষিদ্ধ কাজে আল্লাহ তাআলার অসন্তোষ ও আভিজাত্যপূর্ণ আত্মসম্মানবোধ কেঁপে উঠে, সেসকল কাজ করেও যদি বান্দা আল্লাহ তাআলার দরবারে ক্ষমার জন্য হাত পেতে দেয় আল্লাহ তাআলা তার হাত ফিরিয়ে দেন না। এইজন্যই আল্লাহ তাআলা মানবজাতির জন্য তাঁর রাসূল ও কিতাবসমূহ প্রেরণ করেছেন; যা মানুষকে সতর্ক করতে এবং আল্লাহ তাআলার নিকট ক্ষমাপ্রার্থনা করতে উদ্বুদ্ধ করবে।
এই মহৎ দুটি গুণ আল্লাহ তাআলার এক ঐশ্বরিক ক্ষমতার ঘোষণা দেয়। আল্লাহ তাআলার মহানুভবতা ও দয়ার তুলনাহীন এক গুণ বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরে। কেননা, জগতে যেই ব্যক্তি সাধারণত যত বেশি আত্মসম্মানবোধ ও ব্যক্তিত্বসম্পন্ন হয়ে থাকে, সে তার ব্যক্তিস্বার্থকে বিনষ্টকারী সকল আচরণ ও অপরাধকে অমার্জনীয় মনে করে সেই আচরণের শাস্তি দিয়ে থাকে, দ্রুততম সময়ের মধ্যে প্রতিশোধ নিয়ে থাকে। কখনো হয়তো ক্ষমাযোগ্য বা তুচ্ছ কোনো ভুল হয়ে থাকে, কিন্তু তার প্রচণ্ডরকমের ব্যক্তিত্ব ও আত্মসম্মানবোধ একে ভুলের অযোগ্য মনে করেই প্রতিশোধমূলক আচরণ করে থাকে।
হাদীসে বর্ণিত হয়েছে-
إِنَّ مِنَ الْغَيْرَةِ مَا يُحِبُّهَا اللَّهُ وَمِنْهَا مَا يَبْغَضُهَا اللَّهُ، فَالَّتِي يَبْغَضُهَا اللَّهُ الْغَيْرَةُ مِنْ غَيْرِ رِيبَةٍ
'গায়রাত বা আত্মসম্মানবোধের কিছু আচরণ এমন রয়েছে, যা আল্লাহ তাআলার নিকট পছন্দনীয়; আর কিছু আচরণ এমন আছে, যা তাঁর নিকট অপছন্দনীয় হয়ে থাকে। নিছক সন্দেহের বশে বা ছোট কোনো বিষয়ে আত্মসম্মানকে প্রভাবিত করা আল্লাহ তাআলা অপছন্দ করেন।[১]
সুতরাং উত্তম ও পছন্দনীয় আত্মসম্মানবোধ হলো, যেই আত্মমর্যাদার সাথে ক্ষমাগুণের মিশ্রিত স্বভাব রয়েছে; যেই আত্মসম্মানবোধ ক্ষমার উপযুক্ত স্থানে ক্ষমার আচরণ করবে আর ক্ষমার অনুপযুক্ত স্থানে অসন্তোষ প্রকাশ করবে, এমন আত্মসম্মান ও আত্মমর্যাদাবোধই হলো বাস্তবে প্রশংসার উপযুক্ত।
টিকাঃ
[২] বুখারী, হাদীস-ক্রম: ৬৮৪৬
[৩] সাদ ইবনু উবাদা রাদিয়াল্লাহু আনহু'র একটি ঘটনার কথা এখানে বলা উদ্দেশ্য। যিনা বা ব্যভিচারের শাস্তির বিধান ও চারজন সাক্ষীর আবশ্যকীয়তা যখন আল্লাহ তাআলা শরীয়ত হিসেবে প্রণয়ন করলেন, তখন লোকেরা সাদ ইবনু উবাদাহকে জিজ্ঞেস করলেন, 'আচ্ছা আপনি যদি আপনার স্ত্রীকে কারো সাথে অপকর্ম করতে দেখেন তাহলে এই বিধানমতে আপনি আপনার স্ত্রীর সাথে কী করবেন?' সাদ উত্তর দিলেন, 'এমতাবস্থায় আমি আমার স্ত্রী এবং সাথে-থাকা অপর লোক উভয়কেই হত্যা করব। অর্থাৎ এমন মুহূর্তে আমার জন্য চারজন সাক্ষী এনে সাক্ষ্য রাখা এবং পরবর্তীতে এর বিচার করার মতো ধৈর্য হবে না। হয়তো আমার সাক্ষী আনার আগেই তারা আলাদা হয়ে যাবে।' তাঁর এমন উত্তর শুনে লোকেরা অবাক হয়ে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট পুরো ঘটনা বর্ণনা করলেন। তখন নবীজি উক্ত হাদীসটি বর্ণনা করেন।
[১] বুখারী, হাদীস-ক্রম: ৫২২১
[২] মুসলিম, হাদীস-ক্রম: ২১১৪
[১] আবু দাউদ, হাদীস-ক্রম: ২৬৫৯; মুসনাদু আহমাদ, হাদীস-ক্রম: ২৩৭৫২
📄 আল্লাহর অবাধ্যতা মানুষকে লজ্জাহীন করে দেয়
আল্লাহ তাআলার অবাধ্যতা ও নাফরমানি মানুষকে লজ্জাহীন বানিয়ে দেয়। গুনাহ ও পাপকাজে লিপ্ত ব্যক্তি বেহায়া মানুষে পরিণত হয়। লজ্জা হলো মানবাত্মার একটি আবশ্যকীয় গুণ ও বৈশিষ্ট্য। লজ্জা ও শালীনতাবোধ যাবতীয় কল্যাণ ও ভালো কাজের উৎস। সুতরাং লজ্জা ও শালীনতার অবক্ষয় মানে যাবতীয় কল্যাণ ও ভালোকাজ থেকে বঞ্চিত হয়ে যাওয়া।
নবীজি বলেন, 'লজ্জা বা শালীনতার সবটুকুই হলো কল্যাণ ও উত্তম।' [১]
গুনাহ মানুষের এই লজ্জাবোধকে দুর্বল করে দেয়। এমনকি মানুষ যখন অবারিতভাবে গুনাহের কাজে ডুবে থাকে, তখন তার অন্তরে বিন্দুমাত্র লজ্জাবোধ ও লোকচক্ষুর ভয় থাকে না। 'লোকে কী বলবে' বা 'মানুষ আমার এই নিকৃষ্ট অবস্থা জেনে ফেলবে'—এ ধরনের কোনো আশঙ্কা বা অনুভূতি তার অন্তরে আর কোনো প্রভাব রাখে না। আর কোনো মানুষ যখন এমন পর্যায়ে পৌঁছে যায় তখন তার সংশোধনের ব্যাপারে নিরাশ হতে হয়।
বর্ণিত আছে, ইবলিস যখন এমন ব্যক্তিকে দেখে তখন সে অভিনন্দন জানিয়ে বলে, 'কল্যাণ থেকে বঞ্চিত ব্যক্তি! তোমার জন্য আমি উৎসর্গিত, আমার প্রাণ তোমার জন্য নিবেদিত।'
লজ্জাকে আরবীতে 'الحياء' হায়া বলা হয়। শব্দটির সাথে আরবী 'হায়াত' অর্থাৎ 'জীবন' শব্দের মূলধাতু একই হওয়ায় বলা হয়, 'হায়া বা লজ্জাই হলো দুনিয়া ও আখিরাতের জীবন। যার হায়া নেই তার হায়াত নেই। অর্থাৎ লজ্জাহীন ব্যক্তি জাগতিক সংসারে মৃত ব্যক্তির মতো। তার মাধ্যমে মানবজীবনে কোনো কল্যাণের আশা নেই। আর আখিরাত বা পরকালের জীবনেও সে হবে দুর্ভাগা। লজ্জাহীনতা ও গুনাহের মাঝে নিগূঢ় এক সম্পর্ক রয়েছে। একটি অপরটিকে মানুষের জন্য সহজ করে দেয়। আর লজ্জাবোধ ও শালীনতা মানুষকে গুনাহের সময় আল্লাহ তাআলার কথা, আল্লাহ তাআলার শাস্তির কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। আল্লাহ তাআলার সামনে কিয়ামত-দিবসে দাঁড়ানোর কথা মনে করিয়ে দেয়। তখন মানুষ লজ্জাবোধ থেকেই আল্লাহ তাআলার নাফরমানি ও অবাধ্যতা থেকে বিরত থাকে।
সহীহ বুখারীর আরেকটি হাদীসে বর্ণিত হয়েছে-
إِنَّ مِمَّا أَدْرَكَ النَّاسَ مِنْ كَلَامِ النُّبُوَّةِ الْأُولَى: إِذَا لَمْ تَسْتَحِ فَاصْنَعْ مَا شِئْتَ
'অতীতকালের নুবওয়াতের বাণীর মধ্য থেকে এই সময়ের মানুষদের জন্য একটি বার্তা হলো, যদি তোমার লজ্জাবোধ না থাকে তাহলে তুমি যা ইচ্ছা তাই করতে পার।'[১]
লজ্জা ও শালীনতার গুরুত্ব বোঝানোর জন্য হাদীসটি বর্ণিত হয়েছে। অর্থাৎ মানবজাতিকে লজ্জা ও শালীনতার ব্যাপারে সতর্ক করে দেয়া হয়েছে। নিকৃষ্ট ও মন্দ কাজ কেবলমাত্র লজ্জার অনুপস্থিতিতেই করা সম্ভব।
টিকাঃ
[১] মুসলিম, হাদীস-ক্রম: ৩৭
[১] বুখারী, হাদীস-ক্রম: ৩৪৮৩; আবু দাউদ, হাদীস-ক্রম: ৪৭৯৭
📄 গুনাহ অন্তর থেকে আল্লাহর ভয় ও শ্রদ্ধাকে ম্লান করে দেয়
গুনাহের একটি ক্ষতি হলো, আল্লাহ তাআলার প্রতি ভয়, শ্রদ্ধা ও ভক্তিকে মানুষের অন্তরে দুর্বল করে দেয়। গুনাহের প্রতি মানুষের আসক্তি জন্ম নেয় আল্লাহভীতির দুর্বলতার সুযোগে। আল্লাহ তাআলার নাফরমানি ও অবাধ্যতার মতো দুঃসাহস তার অন্তরে স্থান করে নেয় রবের প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মানের দুর্বলতার সুযোগে। কেউ কেউ এক অদ্ভূত ধোঁকার মধ্যে থাকে। সে যুক্তি দেখায়, আল্লাহ তাআলার প্রতি উত্তম ধারণা ও ক্ষমাপ্রাপ্তির আশা আমার অন্তরে পূর্ণমাত্রায় বিদ্যমান। সেই আশাকে পুঁজি করেই আমি অবাধ্য হয়েছি। আমার অন্তরে আল্লাহ তাআলার প্রতি পূর্ণমাত্রায় শ্রদ্ধা ও সম্মান বিদ্যমান।
তার এ ধরনের মুখের বুলি স্পষ্ট ভ্রান্তি ও ভ্রষ্টতা ছাড়া কিছু নয়। কেননা আল্লাহ তাআলার প্রতি ভয়, শ্রদ্ধা ও ভক্তি আল্লাহ তাআলার নিষিদ্ধ কাজের প্রতিও ভয় ও শ্রদ্ধাবোধকে জাগ্রত করে দেয়। আর আল্লাহ তাআলা কর্তৃক গৃহীত হালাল ও হারামের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ বান্দাকে অবধারিতভাবে আল্লাহর নাফরমানি থেকে বিরত রাখবে। বরং এভাবেও বলা যায় যে, নাফরমানির একটি বড় শাস্তি হলো-আল্লাহ তাআলার প্রতি ভয় ও শ্রদ্ধা, তার হারাম বিধানের প্রতি সম্মানবোধ গুনাহগার ব্যক্তির অন্তর থেকে উঠিয়ে নেয়া। বান্দার নিকট আল্লাহ তাআলার যেসমস্ত হক ও অধিকার রয়েছে, সেসব তখন তুচ্ছ হয়ে যায়।
বান্দার অন্তর থেকে যখন আল্লাহভীতি ও শ্রদ্ধাবোধ চলে যায় তখন আল্লাহ তাআলাও তাকে তার সৃষ্টিজগতের সামনে অপদস্থ করেন। মানুষের অন্তর থেকেও তখন গুনাহগার ব্যক্তির জন্য কোনো শ্রদ্ধাবোধ আর বাকি থাকে না।
মানুষ আল্লাহ তাআলার বিধানাবলির প্রতি যতটুকু সম্মান প্রদর্শন করবে, তাকেও সমাজে ততটুকুই সম্মান করা হবে। আল্লাহ তাআলার প্রতি যে-পরিমাণ ভালোবাসা তার অন্তরে থাকবে, তার প্রতি মানুষের ভালোবাসা ঠিক তেমনই থাকবে। আর মানুষ যখন আল্লাহ তাআলা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে, আল্লাহর প্রতি নিজের ভয়, শ্রদ্ধা আর সম্মানবোধকে নষ্ট করে দেবে, আল্লাহ তাআলাও সমাজের বুকে তাকে ততটুকুই নিচে নামিয়ে দেবেন। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-
وَمَنْ يُهِنِ اللَّهُ فَمَا لَهُ مِنْ مُكْرِمٍ
'আর আল্লাহ তাআলা যাকে অপমানিত করেন, তাকে কেউই সম্মান করে না। [১]
অর্থাৎ মানুষ যখন আল্লাহ তাআলাকে সিজদার মাধ্যমে সম্মান করেনি, সিজদাহ করা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে আল্লাহ তাআলাও তাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। আল্লাহ তাআলাও তাদেরকে সম্মানিত করেননি। আর আল্লাহ তাআলা যাদেরকে সম্মান দেন না, পৃথিবীতে কেউই তাদেরকে সম্মানিত করতে পারে না। আবার আল্লাহ তাআলা যাকে সম্মান দেন তাকে কেউই অপদস্থ করতে পারে না।
টিকাঃ
[১] সূরা হজ, আয়াত-ক্রম: ১৮
📄 গুনাহ মানুষকে আল্লাহভোলা করে দেয়
গুনাহের ফলে মানুষ তার সৃষ্টিকর্তা, তার রব মহান আল্লাহ তাআলাকে ভুলে যায়। আল্লাহর নৈকট্য থেকে তাকে দূরে সরিয়ে শয়তানের সাথে আন্তরিকতা তৈরি করে দেয়। আর মানুষের এই পরিণাম এমন সর্বনাশা যে, তার থেকে মুক্তির হয়তো আর কোনো পথই তখন বাকি থাকে না। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করছেন-
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَلْتَنْظُرْ نَفْسٌ مَا قَدَّمَتْ لِغَدٍ وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ خَبِيرٌ بِمَا تَعْمَلُونَ - وَلَا تَكُونُوا كَالَّذِينَ نَسُوا اللَّهَ فَأَنْسَاهُمْ أَنْفُسَهُمْ أُولَئِكَ هُمُ الْفَاسِقُونَ
'হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহ তাআলাকে ভয় করো। প্রতিটি ব্যক্তিই যেন চিন্তা করে সে তার ভবিষ্যতের জন্য কী প্রস্তুত করছে। তোমরা আল্লাহ তাআলাকে ভয় করো। নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা তোমাদের কর্মসমূহের ব্যাপারে খুবই অবগত। তোমরা তাদের মতো হয়ো না, যারা আল্লাহ তাআলাকে ভুলে গিয়েছে; এ কারণে আল্লাহ তাআলাও তাদেরকে আত্মবিস্মৃত করে দিয়েছেন। তারাই হলো অবাধ্য ও ফাসিক।।১৯
এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা তাঁকে ভয় করার কথা বলেছেন। তাকওয়ার আদেশ করেছেন। সেইসাথে আল্লাহভোলা হতেও নিষেধ করেছেন। আল্লাহভোলা হবার একটি শাস্তিও তিনি আয়াতে উল্লেখ করে দিয়েছেন। যারা আল্লাহকে ভুলে যাবে আল্লাহ তাআলাও তাদেরকে তাদের নিজেদের ব্যাপারে আত্মবিস্মৃতি করে দেবেন। অর্থাৎ তারা তখন নিজেদের ভালোমন্দের ব্যাপারও ভুলে যাবে।
জীবনের সফলতা, কর্মপন্থা, জীবনের সুখ-শান্তি ও মুক্তির পথ তারা খুঁজে পাবে না।
গুনাহগার বান্দাকে আমরাও দেখতে পাই, সে তার নিজ জীবনের ভালোমন্দের ব্যাপারে থাকে উদাসীন। নিজের চূড়ান্ত সফলতার কথা ভুলে পার্থিব মনোবাসনার পিছে ছুটতে থাকে। স্থায়ী সাফল্যকে এড়িয়ে ক্ষণস্থায়ী ভোগবিলাসে মত্ত হয়। অথচ বুদ্ধিমান ব্যক্তি কখনোই নিজের কল্যাণ ও সফলতার ব্যাপারে আত্মবিস্মৃত হয় না। কবি বলেছেন-
أَحْلَامُ نَوْمٍ أَوْ كَظِلَّ زَائِلٍ ... إِنَّ اللَّبِيبَ بِمِثْلِهَا لَا يُخْدَعُ
'ঘুমন্ত স্বপ্নের মোহে কিংবা চলার পথের ছায়ার শান্তিতে বুদ্ধিমান পথিক কখনোই ধোঁকা খায় না।'
টিকাঃ
[১] সূরা হাশর, আয়াত-ক্রম: ১৮,১১