📄 পাপাচারী ব্যক্তির শাস্তি ও নবীজির একটি স্বপ্ন
ইমাম বুখারী তাঁর প্রসিদ্ধ হাদীসের কিতাবে সামুরাহ ইবনু জুন্দুব সূত্রে একটি হাদীস বর্ণনা করেছেন। সামুরাহ বলেন, 'আল্লাহর রাসূল তাঁর সাহাবীদেরকে ফজরের নামাযের পর প্রায় সময়ই জিজ্ঞেস করতেন, “তোমাদের মধ্য কি কেউ স্বপ্ন দেখেছে?" তখন সাহাবীদের কেউ রাতের বেলা স্বপ্ন দেখলে নবীজির নিকট বর্ণনা করলে নবীজি স্বপ্নের ব্যাখ্যা করে দিতেন। একদিন ভোরে তিনি আমাদেরকে বললেন, “গতকাল রাতে দুইজন ব্যক্তি এসে আমাকে ডেকে বলল, 'আপনি আমাদের সাথে চলুন।' আমি তাদের সাথে চলতে শুরু করলাম। আমরা চলতে চলতে এক ব্যক্তির নিকট আসলাম, যে কাত হয়ে শুয়ে আছে। তার পাশেই আরেক ব্যক্তি হাতে বড় একটি পাথর নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সে তার মাথায় পাথর নিক্ষেপ করে মাথা ফাটিয়ে দিচ্ছে। আঘাতের তীব্রতায় পাথরও ফেটে চৌচির হয়ে এদিক সেদিক ছড়িয়ে পড়ছে। লোকটি পাথরের টুকরোগুলি কুড়িয়ে এনে একত্রিত করতে করতেই শুয়ে থাকা লোকটির ফাটা-মাথা আবার আগের মতো জোড়া লেগে যাচ্ছে। এরপর আবার তাকে পাথর নিক্ষেপ করে মাথা ফাটিয়ে দেয়া হচ্ছে। আমি এই বিভৎস দৃশ্য দেখে অবাক হয়ে আমার সঙ্গীদ্বয়কে বললাম, 'সুবহানাল্লাহ! এসব কী হচ্ছে এখানে!' তারা আমার কথার উত্তর না দিয়ে আমাকে বলল, 'আপনি সোজা যেতে থাকুন।' আমরা যেতে থাকলাম। এরপর আমরা চিৎ হয়ে শোয়া এক লোকের কাছে আসলাম। এখানেও দেখলাম, তার নিকট এক লোক লোহার আঁকড়া নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। আর সে তার চেহারার একদিকে এসে এটা দ্বারা মুখমণ্ডলের একদিক মাথার পেছনের দিক পর্যন্ত এবং অনুরূপভাবে নাসারন্ধ্র, চোখ ও মাথার পেছন দিক পর্যন্ত চিরে ফেলছে। এরপর ঐ লোকটি শায়িত লোকটির অপরদিকে যায় এবং প্রথম দিকের সঙ্গে যেমন আচরণ করেছে তেমনি আচরণ অপরদিকের সঙ্গেও করে। ঐ দিক হতে অবসর হতে না হতেই প্রথম দিকটি আগের মতো সুস্থ হয়ে যায়। তারপর আবার প্রথমবারের মতো আচরণ করে। আমি বললাম, 'সুবহানাল্লাহ! এরা কারা? তারা এবারও আমার কথার উত্তর না দিয়ে বলল, 'চলুন, সামনে চলুন।' আমরা চললাম এবং চুলার মতো একটি গর্তের কাছে পৌঁছলাম। গর্তে উঁকি মেরে দেখলাম, বেশ কিছু উলঙ্গ নারী ও পুরুষ রয়েছে। আর নিচ থেকে বের হওয়া আগুনের লেলিহান শিখা তাদেরকে স্পর্শ করছে।
যখনই লেলিহান শিখা তাদেরকে স্পর্শ করে, তখনই তারা উচ্চস্বরে চিৎকার করে ওঠে। আমি সঙ্গীদেরকে জিজ্ঞেস করলাম, 'এরা কারা?' তারা এবারও বলল, 'চলুন, সামনে চলুন।' আমরা চললাম এবং একটা নদীর তীরে গিয়ে পৌঁছলাম। নদীর পানি ছিল রক্তের মতো লাল। দেখলাম, সেখানে এক ব্যক্তি সাঁতার কাটছে। আর নদীর তীরে অন্য এক লোক আছে এবং সে তার কাছে অনেকগুলো পাথর একত্রিত করে রেখেছে। আর ঐ সাঁতারকাটা লোকটি বেশ কিছুক্ষণ সাঁতার কাটার পর পাথর একত্রিত করে রাখা-লোকের কাছে এসে পৌঁছে। এবং নিজের মুখ খুলে দেয়। ঐ লোক তার মুখে একটি পাথর ঢুকিয়ে দেয়। এরপর সে চলে যায়, সাঁতার কাটতে থাকে; আবার তার কাছে ফিরে আসে, যখনই সে তার কাছে ফিরে আসে, তখনই সে তার মুখ খুলে দেয়, আর ঐ ব্যক্তি তার মুখে একটা পাথর ঢুকিয়ে দেয়। আমি জিজ্ঞেস করলাম, 'এরা কারা?' তারা বলল, 'চলুন, সামনে চলুন।' আমরা চললাম এবং এমন একজন কুশ্রী লোকের কাছে এসে পৌঁছলাম, যাকে দেখলেই বিশ্রী লাগে। দেখলাম, তার নিকট রয়েছে আগুন। তা সে প্রজ্বলিত করছে এবং এর চতুর্দিকে দৌড়াচ্ছে। আমি তাদেরকে জিজ্ঞেস করলাম, 'ঐ লোকটি কে?' তারা বলল, 'চলুন, সামনে চলুন। আমরা চললাম এবং একটা সজীব-শ্যামল বাগানে হাজির হলাম, যেখানে বসন্তের হরেক রকম ফুলের কলি রয়েছে। আর বাগানের মাঝে আসমান থেকে অধিক উঁচু দীর্ঘকায় একজন পুরুষ রয়েছেন, যাঁর মাথা যেন আমি দেখতেই পাচ্ছি না। তাঁর চারপাশে এত বিপুল সংখ্যক বালক-বালিকা দেখলাম যে, এত অধিক আর কখনো আমি দেখিনি। আমি তাদেরকে বললাম, 'উনি কে? এরা কারা?' তারা এবারও বলল, 'চলুন, সামনে চলুন।' আমরা চললাম এবং একটা বিরাট বাগানে গিয়ে পৌঁছলাম। এমন বড় এবং সুন্দর বাগান আমি আর কখনো দেখিনি। সঙ্গীরা আমাকে বলল, 'এর ওপরে চড়ুন।' আমরা ওপরে চড়লাম।
শেষ পর্যন্ত সোনা-রুপার ইটের তৈরি একটি শহরে গিয়ে হাজির হলাম। আমরা শহরের দরজায় পৌঁছলাম এবং দরজা খুলতে বললাম। আমাদের জন্য দরজা খুলে দেয়া হলো, আমরা তাতে প্রবেশ করলাম। তখন সেখানে আমাদের সঙ্গে এমন কিছু লোক সাক্ষাৎ করল, যাদের শরীরের অর্ধেক খুবই সুন্দর, বাকি অর্ধেক খুব কুশ্রী। সাথীদ্বয় ওদেরকে বলল, 'যাও ঐ নদীতে গিয়ে নেমে পড়ো।'
সেটা ছিল প্রশস্ত প্রবাহিত নদী, যার পানি ছিল দুধের মতো সাদা। ওরা তাতে নেমে পড়ল। অতঃপর এরা আমাদের কাছে ফিরে এল, দেখা গেল তাদের এ শ্রীহীনতা দূর হয়ে গেছে এবং তারা খুবই সুন্দর আকৃতির হয়ে গেছে। সঙ্গে থাকা লোক দুজন আমাকে বলল, 'এটা জান্নাতে আদন এবং এটা আপনার বাসস্থান।'
আমি বেশ উপরের দিকে তাকালাম, দেখলাম, ধবধবে সাদা মেঘের মতো একটি প্রাসাদ আছে। তারা আমাকে বলল, 'এটা আপনার বাসগৃহ।' আমি তাদেরকে বললাম, 'আল্লাহ তোমাদের মাঝে বরকত দিন! আমাকে ছেড়ে দাও। আমি এতে প্রবেশ করি।' তারা বলল, 'আপনি অবশ্যই এতে প্রবেশ করবেন। তবে এখন নয়।' বললাম, 'পেছনে যে বিস্ময়কর বিষয়গুলো দেখে এলাম, সেগুলোর তাৎপর্য কী?' তারা বলল, 'আচ্ছা! আমরা আপনাকে বলে দিচ্ছি। ঐ যে প্রথম ব্যক্তিকে যার কাছে আপনি পৌঁছেছিলেন, যার মাথা পাথর দিয়ে চূর্ণ-বিচূর্ণ করা হচ্ছিল, সে হলো ঐ ব্যক্তি, যে কুরআন গ্রহণ করে তা ছেড়ে দিয়েছে। আর ফরয সালাত ছেড়ে ঘুমিয়ে থেকেছে। আর যার কাছে গিয়ে দেখেছেন যে, তার মুখের এক ভাগ মাথার পেছন দিক পর্যন্ত, এমনিভাবে নাসারদ্র ও চোখ মাথার পেছন দিক পর্যন্ত চিরে ফেলা হচ্ছিল, সে হলো ঐ ব্যক্তি, যে সকালে নিজ ঘর থেকে বের হয়ে এমন মিথ্যা বলে যা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। আর উলঙ্গ নারী-পুরুষেরা হলো ব্যভিচারী ও ব্যভিচারিণীর দল। আর যার কাছে পৌঁছে দেখেছিলেন যে, সে নদীতে সাঁতার কাটছে ও তার মুখে পাথর ঢুকিয়ে দেয়া হচ্ছে সে হলো সুদখোর।
কুশ্রী ব্যক্তি, যে আগুন জ্বালাচ্ছিল আর এর চারপাশে দৌড়াচ্ছিল, সে হলো জাহান্নামের দারোগা, মালিক ফিরিশতা। আর যে দীর্ঘকায় ব্যক্তিকে দেখলেন, তিনি ইবরাহীম আলাইহিস সালাম। তাঁর আশপাশের বালক-বালিকারা হলো ঐসব শিশু, যারা ফিতরাতের (স্বভাবধর্মের) ওপর মৃত্যুবরণ করেছে।”
'এ পর্যায়ে কয়েকজন সাহাবী জিজ্ঞেস করলেন, “আল্লাহর রাসূল! মুশরিকদের শিশু-সন্তানরাও কি সেখানে আছে?” রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, “হ্যাঁ, মুশরিকদের শিশু-সন্তানরাও আছে।” (প্রশ্নের জবাব দিয়ে নবীজি পুনরায় সঙ্গী দুই ফিরিশতার কথায় ফিরে গেলেন। ফিরিশতারা বললেন,) 'আর ঐসব লোক, যাদের অর্ধাংশ অতি সুন্দর ও অর্ধাংশ অতি কুশ্রী, তারা হলো ঐ সম্প্রদায়, যারা সৎ-অসৎ উভয় কাজ মিশ্রিতভাবে করেছে। আল্লাহ্ তাদেরকে ক্ষমা করে দিয়েছেন.'”'।[১]
টিকাঃ
[১] সূরা গাফির, আয়াত-ক্রম: ৭-৯
[১] বুখারী, হাদীস-ক্রম: ৭০৪৭
📄 গুনাহ পৃথিবীতে ফ্যাসাদ বাড়ায়
আল্লাহ তাআলার নাফরমানি ও গুনাহের উল্লেখযোগ্য একটি প্রতিক্রিয়া হলো, এর ফলে মানব সমাজ, পরিবেশ ও প্রকৃতিতে ব্যাপক পরিবর্তন সাধিত হয়। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-
ظَهَرَ الْفَسَادُ فِي الْبَرِّ وَالْبَحْرِ بِمَا كَسَبَتْ أَيْدِي النَّاسِ لِيُذِيقَهُمْ بَعْضَ الَّذِي عَمِلُوا لَعَلَّهُمْ يَرْجِعُونَ
'মানুষের কৃতকর্মের কারণেই জলে ও স্থলে ব্যাপক বিপর্যয় ঘটেছে। আল্লাহ তাআলা তাদের কৃতকর্মের আংশিক শাস্তি তাদেরকে আস্বাদন করাতে চান, যেন তারা আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন করে।খি
মুজাহিদ বলেন, উক্ত আয়াতটি তিলাওয়াত করে বলেন, 'শাসনক্ষমতা যখন কোনো জালিম বাদশাহর হাতে আসে আর সে অন্যায়-অবিচার ও জুলুম-নির্যাতন করতে থাকে তখন আল্লাহ তাআলা বৃষ্টি বন্ধ করে দেন। ক্ষেত-খামার, ফসল, ফলাদি তখন ধ্বংস হয়ে যায়, দুর্ভিক্ষ দেখা দেয় এবং বংশপ্রজন্ম হুমকির মুখে পড়ে। কেননা আল্লাহ তাআলা বিশৃঙ্খলা পছন্দ করেন না।' মুজাহিদ বলেন, 'আলোচ্য আয়াতে সমুদ্রে বিপর্যয় আসার অর্থ হলো, নদী ও সমুদ্রের তীর ঘেঁসে গড়ে ওঠা বিভিন্ন সমাজ-সভ্যতার বিপর্যয়।' প্রখ্যাত মুফাসসির ইকরিমাহ সূত্রেও সমুদ্রের ব্যাখায় সমুদ্র ও নদীতটে গোড়াপত্তন হওয়া জাতি-সভ্যতার কথাই বর্ণিত হয়েছে।
প্রাকৃতিক আরেকটি বিপর্যয় হলো, সমাজে ব্যাপকহারে গুনাহ ও নাফরমানি ছড়িয়ে পড়ার কারণে পৃথিবীতে ভূমিকম্প ও ভূমিধ্বস বেড়ে যায়। প্রকৃতি বিরূপ ও অস্বাভাবিক হয়ে ওঠে।
এ ছাড়া আরেকটি বিপর্যয় হলো, মাটি থেকে উৎপন্ন শক্তি ও খাদ্যশস্যের প্রাচুর্যতা হ্রাস পায়। মাটির বরকত কমে যায়। প্রাকৃতিক খাদ্যভাণ্ডারের আকৃতিও ছোট হয়ে আসে। বর্ণিত আছে, অতীতকালে আনার ফলের আকৃতি এত বড় হতো যে, লোকেরা আনার ফল খাওয়ার পর আনারের খোসাকে রোদ থেকে বাঁচার জন্য ছাতা হিসেবে ব্যবহার করত।
টিকাঃ
[২] সূরা রুম, আয়াত-ক্রম: ৪১
📄 আল্লাহর নাফরমানি আত্মসম্মানবোধ নষ্ট করে দেয়
গুনাহের আরেকটি ক্ষতি হলো, গুনাহ মানুষের আত্মসম্মানবোধকে নষ্ট করে দেয়। আত্মসম্মান ও আত্মপরিচয় হলো মানবাত্মার প্রাণ। জীবন্ত রক্তকণিকা যেভাবে মানবদেহের প্রাণের সঞ্চারণ করে তেমনি আত্মসম্মান ও আত্মপরিচয় হৃদয়ের স্পন্দন হয়ে মানুষকে উজ্জীবিত করে রাখে। এই বোধ ও পরিচয় মানুষের অন্তরকে যাবতীয় অকল্যাণ, নিকৃষ্ট ও নিম্নরুচির কার্যাবলী থেকে বাধা দিয়ে রাখে। অশ্লীল, ঘৃণিত ও কদর্য স্বভাব থেকে মানুষের চরিত্রকে এমনভাবে পবিত্র রাখে—যেভাবে আগুন স্বর্ণ-রৌপ্য ও লোহা থেকে মরিচাকে আলাদা করে দেয়। সর্বাধিক ইচ্ছাশক্তির প্রাচুর্য ও মানবিক চেতনায় উদ্বুদ্ধ থাকতে পারে এমন ব্যক্তি, যার আত্মসম্মানবোধ অন্যদের তুলনায় বলিষ্ঠ ও দৃঢ় থাকে।
মানুষ যখন গুনাহে অভ্যস্ত হয়ে যায়, তখন তার অন্তর থেকে নিজের প্রতি, নিজের পরিবার ও আশপাশের মানুষের প্রতি সম্মানবোধ, মর্যাদা ও ব্যক্তিত্ব ক্রমশ নিঃশেষ হয়ে যায়। আর এভাবে ব্যক্তিত্বহীন মানুষে পরিণত হওয়ার কারণে তার অন্তরও দুর্বল হয়ে পড়ে। সে তখন নিজের ব্যাপারে বা অন্যকারো ব্যাপারে কোনো কিছুই আর ঘৃণা করতে পারে না। এই পর্যায়ে আসার পর চারিত্রিক অবনতি আর অবক্ষয়ের কারণে সে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যায়। এমনকি এধরনের মানুষদের রুচি, মন মানসিকতায় ঘৃণাবোধের পরিবর্তে অন্যায়, অবিচার, অশ্লীল কাজের প্রতি একধরনের ভালোলাগা কাজ করে। তারা তখন অন্যকে এসব খারাপ আর গর্হিত কাজের প্রতি উদ্বুদ্ধ করে, সহযোগিতা করে। এজন্যই দাইয়ুসকে [১] আল্লাহ তাআলার সবচেয়ে নিকৃষ্ট সৃষ্টিজীব বলা হয়েছে। তার জন্য জান্নাত হারাম।
টিকাঃ
[১] অপকর্ম ও ব্যভিচারের ব্যবস্থাপক
📄 আত্মসম্মানবোধ ও ব্যক্তিত্ব
সমগ্র বিশ্ব জগতের মধ্যে আমাদের প্রিয় নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামই ছিলেন সবচেয়ে বেশি আত্মসম্মানবোধ-সম্পন্ন ব্যক্তিত্ব। হাদীস শরীফে নবীজি ইরশাদ করেছেন- [২]
أَتَعْجَبُونَ مِنْ غَيْرَةِ سَعْدٍ؟ وَاللَّهِ لَأَنَا أَغْيَرُ مِنْهُ، وَاللَّهُ أَغْيَرُ مِنِّي
'তোমরা সাদের আত্মপরিচয়বোধ দেখে অবাক হচ্ছ! অথচ তার থেকেও বেশি ব্যক্তিত্বসম্পন্ন ব্যক্তি হলাম আমি নিজে। আর আমার থেকে বেশি আত্মপরিচয়বোধের অধিকারী হলেন অপরিসীম ক্ষমতার অধিকারী মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা। [৩]
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একবার সূর্যগ্রহণের নামাযের পর একটি ভাষণ প্রদান করেন। উক্ত ভাষণের একটি বাণী ছিল-
يَا أُمَّةَ مُحَمَّدٍ وَاللَّهِ مَا مِنْ أَحَدٍ أَغْيَرُ مِنْ اللَّهِ أَنْ يَزْنِيَ عَبْدُهُ أَوْ تَزْنِيَ أَمَتُهُ
'হে মুহাম্মদের উম্মত! আল্লাহর শপথ করে বলছি, আল্লাহর কোনো বান্দা বা বান্দি যখন ব্যভিচারে লিপ্ত হয় তখন আল্লাহর আত্মসম্মানবোধ সবচেয়ে বেশি আঘাতপ্রাপ্ত হয়।'১৯
সহীহ বুখারীর আরেকটি হাদীসে উল্লেখ রয়েছে, নবীজি ইরশাদ করেন-
لَا أَحَدَ أَغْيَرُ مِنَ اللَّهِ، مِنْ أَجْلِ ذَلِكَ حَرَّمَ الْفَوَاحِشَ مَا ظَهَرَ مِنْهَا وَمَا بَطَنَ، وَلَا أَحَدَ أَحَبُّ إِلَيْهِ الْعُذْرُ مِنَ اللَّهِ، مِنْ أَجْلِ ذَلِكَ أَرْسَلَ الرُّسُلَ مُبَشِّرِينَ وَمُنْذِرِينَ، وَلَا أَحَدَ أَحَبُّ إِلَيْهِ الْمَدْحُ مِنَ اللهِ، مِنْ أَجْلِ ذَلِكَ أَثْنَى عَلَى نَفْسِهِ
'আল্লাহ তাআলার মতো আত্মসম্মানবোধ-সম্পন্ন কেউ নেই। এই সম্মানের কারণেই তিনি প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য সকল অশ্লীলতা ও অন্যায়কে হারাম করেছেন। আল্লাহ তাআলার মতো করে কেউ ওযরগ্রহণ করতে ভালোবাসেন না। এইজন্যই তিনি তাঁর রাসূলদেরকে সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী হিসেবে প্রেরণ করেছেন। আল্লাহ তাআলার চেয়ে বেশি কেউ প্রশংসা ও বন্দনাস্তুতি পছন্দ করেন না। আল্লাহ তাআলা নিজেই নিজের প্রশংসা করেছেন। খি
এই হাদীসে নবীজি দুটি বিষয়কে একত্রিত করেছেন। এক হলো আল্লাহ তাআলার আত্মসম্মানবোধ। যার মৌলিক চাহিদা হলো সকল ধরনের নিকৃষ্ট, গর্হিত ও নিন্দনীয় কাজের প্রতি স্বভাবজাত ঘৃণা ও অরুচিবোধ। আরেকটি বিষয় হলো, বান্দার ওযর বা অজুহাত মেনে নিয়ে তার প্রতি ক্ষমাশীল আচরণ, যার মাধ্যমে আল্লাহ তাআলার রহমত ও ইহসানের চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ ঘটে।
আল্লাহ সুবহানাহু তাআলা সর্বোচ্চ গায়রাত তথা আত্মসম্মানবোধ-সম্পন্ন হওয়ার পরও তিনি ভালোবাসেন বান্দার ক্ষমাপ্রার্থনা। তিনি পছন্দ করেন বান্দাকে ক্ষমা আর মার্জনা করতে। যেসকল গর্হিত ও নিষিদ্ধ কাজে আল্লাহ তাআলার অসন্তোষ ও আভিজাত্যপূর্ণ আত্মসম্মানবোধ কেঁপে উঠে, সেসকল কাজ করেও যদি বান্দা আল্লাহ তাআলার দরবারে ক্ষমার জন্য হাত পেতে দেয় আল্লাহ তাআলা তার হাত ফিরিয়ে দেন না। এইজন্যই আল্লাহ তাআলা মানবজাতির জন্য তাঁর রাসূল ও কিতাবসমূহ প্রেরণ করেছেন; যা মানুষকে সতর্ক করতে এবং আল্লাহ তাআলার নিকট ক্ষমাপ্রার্থনা করতে উদ্বুদ্ধ করবে।
এই মহৎ দুটি গুণ আল্লাহ তাআলার এক ঐশ্বরিক ক্ষমতার ঘোষণা দেয়। আল্লাহ তাআলার মহানুভবতা ও দয়ার তুলনাহীন এক গুণ বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরে। কেননা, জগতে যেই ব্যক্তি সাধারণত যত বেশি আত্মসম্মানবোধ ও ব্যক্তিত্বসম্পন্ন হয়ে থাকে, সে তার ব্যক্তিস্বার্থকে বিনষ্টকারী সকল আচরণ ও অপরাধকে অমার্জনীয় মনে করে সেই আচরণের শাস্তি দিয়ে থাকে, দ্রুততম সময়ের মধ্যে প্রতিশোধ নিয়ে থাকে। কখনো হয়তো ক্ষমাযোগ্য বা তুচ্ছ কোনো ভুল হয়ে থাকে, কিন্তু তার প্রচণ্ডরকমের ব্যক্তিত্ব ও আত্মসম্মানবোধ একে ভুলের অযোগ্য মনে করেই প্রতিশোধমূলক আচরণ করে থাকে।
হাদীসে বর্ণিত হয়েছে-
إِنَّ مِنَ الْغَيْرَةِ مَا يُحِبُّهَا اللَّهُ وَمِنْهَا مَا يَبْغَضُهَا اللَّهُ، فَالَّتِي يَبْغَضُهَا اللَّهُ الْغَيْرَةُ مِنْ غَيْرِ رِيبَةٍ
'গায়রাত বা আত্মসম্মানবোধের কিছু আচরণ এমন রয়েছে, যা আল্লাহ তাআলার নিকট পছন্দনীয়; আর কিছু আচরণ এমন আছে, যা তাঁর নিকট অপছন্দনীয় হয়ে থাকে। নিছক সন্দেহের বশে বা ছোট কোনো বিষয়ে আত্মসম্মানকে প্রভাবিত করা আল্লাহ তাআলা অপছন্দ করেন।[১]
সুতরাং উত্তম ও পছন্দনীয় আত্মসম্মানবোধ হলো, যেই আত্মমর্যাদার সাথে ক্ষমাগুণের মিশ্রিত স্বভাব রয়েছে; যেই আত্মসম্মানবোধ ক্ষমার উপযুক্ত স্থানে ক্ষমার আচরণ করবে আর ক্ষমার অনুপযুক্ত স্থানে অসন্তোষ প্রকাশ করবে, এমন আত্মসম্মান ও আত্মমর্যাদাবোধই হলো বাস্তবে প্রশংসার উপযুক্ত।
টিকাঃ
[২] বুখারী, হাদীস-ক্রম: ৬৮৪৬
[৩] সাদ ইবনু উবাদা রাদিয়াল্লাহু আনহু'র একটি ঘটনার কথা এখানে বলা উদ্দেশ্য। যিনা বা ব্যভিচারের শাস্তির বিধান ও চারজন সাক্ষীর আবশ্যকীয়তা যখন আল্লাহ তাআলা শরীয়ত হিসেবে প্রণয়ন করলেন, তখন লোকেরা সাদ ইবনু উবাদাহকে জিজ্ঞেস করলেন, 'আচ্ছা আপনি যদি আপনার স্ত্রীকে কারো সাথে অপকর্ম করতে দেখেন তাহলে এই বিধানমতে আপনি আপনার স্ত্রীর সাথে কী করবেন?' সাদ উত্তর দিলেন, 'এমতাবস্থায় আমি আমার স্ত্রী এবং সাথে-থাকা অপর লোক উভয়কেই হত্যা করব। অর্থাৎ এমন মুহূর্তে আমার জন্য চারজন সাক্ষী এনে সাক্ষ্য রাখা এবং পরবর্তীতে এর বিচার করার মতো ধৈর্য হবে না। হয়তো আমার সাক্ষী আনার আগেই তারা আলাদা হয়ে যাবে।' তাঁর এমন উত্তর শুনে লোকেরা অবাক হয়ে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট পুরো ঘটনা বর্ণনা করলেন। তখন নবীজি উক্ত হাদীসটি বর্ণনা করেন।
[১] বুখারী, হাদীস-ক্রম: ৫২২১
[২] মুসলিম, হাদীস-ক্রম: ২১১৪
[১] আবু দাউদ, হাদীস-ক্রম: ২৬৫৯; মুসনাদু আহমাদ, হাদীস-ক্রম: ২৩৭৫২