📄 গুনাহের কারণে মানুষের বুদ্ধি লোপ পায়
গুনাহের কারণে মানুষের বিবেক-বুদ্ধি লোপ পায়। ধ্যানধারণা বিকৃত হয়ে যায়। অথচ বিবেক-বুদ্ধি হলো আলোকময় অনুভূতি। গুনাহ এই আলোকে নিভিয়ে দেয়। আর বিবেক যখন আলোহীন হয়ে যায় তখন তা দুর্বল ও অসুস্থ হয়ে পড়ে। অতীতের কোনো একজন আলিম মন্তব্য করেছেন, 'যে ব্যক্তিই আল্লাহর নাফরমানি করে সে বিবেকহীন প্রাণিতে পরিণত হয়।' মন্তব্যটি একদমই যথার্থ। কেননা নাফরমান ব্যক্তি যদি প্রকৃত বিবেকবান মানুষ হতো তাহলে তার বিবেকই তাকে আল্লাহ তাআলার অবাধ্য হওয়া থেকে বাধা দিত। কেননা সে তো আল্লাহ তাআলার অধীনে এমনভাবে রয়েছে যে, আল্লাহ তার সকল ব্যাপারে সর্বদা সম্যক অবগত। আল্লাহর রাজত্বেই তার বসবাস। আল্লাহ তাআলার নিযুক্ত ফিরিশতা সার্বক্ষণিক তার দেখভাল করছেন, তার রক্ষণাবেক্ষণে রয়েছেন! কুরআনের মর্ম ও শব্দ তাকে গুনাহ থেকে বিরত থাকতে আহ্বান করে চলেছে অনবরত। ঈমানের মহত্ব তাকে পাপ কাজ থেকে বিরত থাকার জন্য আহ্বান করছে। অনিশ্চিত মৃত্যু তাকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। জাহান্নামের লেলিহান অগ্নিশিখা তাকে পাপ কাজের ব্যাপারে চূড়ান্ত ভীতি প্রদর্শন করছে। গুনাহমুক্ত এমন এক পরিবেশে থেকেও যদি সে আল্লাহর অবাধ্যতায় লিপ্ত হয় তাহলে তার বিবেক ও বুদ্ধির দুর্বলতার দিকটিই তখন বুদ্ধিমানদের নিকট স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
আল্লাহ তাআলার অবাধ্য হয়ে মানুষ জীবনের যতটুকু স্বাদ ও আহ্লাদ ভোগ করতে পারে কার্যত তার থেকেও কয়েকগুণ বেশি পার্থিব ও পরকালীন লাভ ও উপভোগ্য জীবন তার হাতছাড়া হয়ে যায়। সুতরাং বিবেক-বুদ্ধির চরম অবক্ষয়ের শিকার হলেই কেবলমাত্র মানুষ ক্ষণিকের সামান্য অসাড় লোভ-লালসার তাড়নায় জীবনের বৃহত্তম সুখ-শান্তিকে তুচ্ছ মনে করতে পারে। একজন সুস্থ বিবেকসম্পন্ন মানুষের পক্ষে এ পথে হাঁটা কখনোই সম্ভব নয়।
টিকাঃ
[২] যারা কুরআন ও হাদীসের পর্যাপ্ত ইলম অর্জনের পরও জাগতিক লোডের মোহে কুরআন ও হাদীসের অপব্যাখ্যা করে, মানুষের কাছে দ্বীনের ভুল বার্তা পৌঁছায়, তাদেরকে উলামায়ে স্' বলা হয়।
📄 গুনাহ মানুষের অন্তরকে নির্বিকার করে তোলে
মানুষের জীবনে যখন গুনাহের পরিমাণ বাড়তে থাকে, তখন তার অন্তর অনুভূতিহীন নির্বিকার হয়ে যায়।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-
كَلَّا بَلْ رَانَ عَلَى قُلُوبِهِمْ مَا كَانُوا يَكْسِبُونَ
| 'কখনোই নয়। তাদের কৃতকর্মের ফলে তাদের অন্তরে মরীচিকা পড়েছে।'১৷
কোনো কোনো আলিম এই আয়াতের তাফসীরে বলেছেন, 'লাগাতার গুনাহের ফলে তাদের অন্তরে মরীচিকা পড়েছে।'
হাসান বসরী বলেন, 'অন্তরে মরীচিকা ধরার অর্থ হলো, অবিরাম গুনাহ করার ফলে অন্তর হয়ে যায়।'
কেউ কেউ বলেন, 'যখন আল্লাহ তাআলার অবাধ্যতা ও নাফরমানির পরিমাণ বৃদ্ধি পায় তখন গুনাহের স্পৃহা মানুষের অন্তরকে ব্যতিব্যস্ত করে রাখে।
মূল বিষয় হলো, মানুষের অন্তর গুনাহের কারণে মরিচাযুক্ত হয়ে যায়। গুনাহের পরিমাণ যত বাড়তে থাকে দিনদিন মরিচাও তত গাঢ় হতে থাকে। একপর্যায়ে গুনাহ করাই অন্তরের স্বভাবজাত অভ্যাসে পরিণত হয়। পাপ ও পঙ্কিলতায় জর্জরিত অন্তর তখন নেক ও কল্যাণের পথ গ্রহণ করতে অক্ষম হয়ে পড়ে। তখন তার অবস্থা এমন হয়ে যায়, যেন গুনাহের মধ্যেই তাকে শক্ত মোহর মেরে আবদ্ধ করে রাখা হয়েছে। কল্যাণ ও ভালো কাজ এবং তার অন্তরের মাঝে একটি অদৃশ্য পর্দা অন্তরাল হয়ে যায়। ফলে লাগাতার গুনাহের পরও কখনো যদি তার সামনে হিদায়াত ও পুণ্যের দ্বার উন্মোচিত হয়, সে উল্টোদিকে ঘুরে পিঠ প্রদর্শন করে মুখ ফিরিয়ে নেয়।
টিকাঃ
[১] সূরা মুতাফফিফীন, আয়াত-ক্রম: ১৪
📄 গুনাহ বান্দাকে নবীজির অভিশাপের পাত্র বানায়
গুনাহ বান্দাকে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অভিসম্পাতের পাত্র বানায়। বিভিন্ন গুনাহের জন্য নবীজি অভিসম্পাত করেছেন। যেসব দুর্ভাগা বান্দা-বান্দী এসব গুনাহ করে থাকে তারাও এই লানত ও অভিসম্পাতের ভাগিদার হয়। তাদের তালিকা-
১. যেসব নারী নিজেদের শরীরে ট্যাটু বা উল্কা অংকন করে, যারা সেই ট্যাটু লাগিয়ে দেয় এবং যেসকল নারী পরচুল বা নকল চুল ব্যবহার করে ও যারা সেই নকল চুল লাগিয়ে দেয়।
২. যারা সুদী লেনদেন করে, যারা সেই লেনদেন লিখে দেয় এবং যারা এর ওপর সাক্ষী থাকে।
৩. তিন তালাকপ্রাপ্তা নারীর সাথে পুনরায় সংসার করার নিমিত্তে যে স্বামী 'হীলা বিবাহ' করায় এবং যে হীলা বিবাহ করে। [১]
৪. অপরের সম্পদ যে চুরি করে।
৫. মদ্যপায়ী, মদ প্রস্তুতকারক, মদের ব্যবসায়ী, মদ বিক্রির অর্থভোগকারী এবং মদের পরিবেশক।
৬. যে ব্যক্তি নিজ পিতা-মাতার ধ্বংস কামনা করে।
৭. যে ব্যক্তি আল্লাহ তাআলা ব্যতীত অন্যকারো নামে পশু জবাই করে।
৮. জীবন্ত পশু ধরে চিত্তবিনোদনের জন্য সেটাকে যে ব্যক্তি তির নিক্ষেপ করে হত্যা করে।
৯. যে-সকল পুরুষ নারীর বেশ ধারণ করে এবং যে-সকল নারী পুরুষের সাদৃশ্য গ্রহণ করে।
১০. যে ব্যক্তি সমাজে কোনো বিদআত শুরু করে অথবা কোনো বিদআতকে প্রশ্রয় দেয়।
১১. জীব ও প্রাণির চিত্রাংকনকারী।
১২. সমকামী।
১৩. বিকৃত রুচির যেসকল মানুষ পশুকাম করে।
১৪. যে ব্যক্তি নিজের পিতা-মাতাকে গালি দেয়।
১৫. যে ব্যক্তি পশুর মুখে আঘাত করে।
১৬. যে ব্যক্তি কোনো মুসলমানের ক্ষতি করে কিংবা কোনো ষড়যন্ত্র করে।
১৭. যেসকল নারী কবর যিয়ারত করে, যারা কবরে সিজদা দেয় বা মোমবাতি জ্বালায়।
১৮. যে ব্যক্তি স্বামী-স্ত্রী কিংবা মনিব ও তার দাসীর মাঝে দূরত্ব সৃষ্টি করে দেয়।
১৯. স্ত্রীর পশ্চাদ্দেশে যৌন সম্ভোগকারী।
২০. যে ব্যক্তি নিজ পিতার বাইরে অন্যকারো দিকে নিজেকে সম্পৃক্ত করে।
২১. সাহাবীদেরকে নিয়ে যারা বাজে মন্তব্য করে।
২২. যে ব্যক্তি নারীদের পোষাক পরে অথবা যে নারী পুরুষদের পোষাক পরে।
২৩. ঘুষখোর, ঘুষদাতা ও ঘুষের মধ্যস্থতাকারী। উল্লিখিত এ সকল প্রকারের লোকের জন্য আল্লাহর রাসূল ﷺ বদদুআ ও অভিসম্পাত করেছেন।
২৪. এ ছাড়া নবীজি ﷺ ইরশাদ করেছেন, যেই স্ত্রী স্বামীর সাথে রাগ করে তার সাথে এক বিছানায় রাত্রি যাপন করে না, আল্লাহর ফিরিশতা রাতভর সেই নারীকে লানত করতে থাকেন।
২৫. আল্লাহর রাসূল ﷺ আমাদেরকে জানিয়েছেন, যে ব্যক্তি তার ভাইয়ের প্রতি ধারালো কোনো অস্ত্র দিয়ে ইশারা করে কথা বলে, ফিরিশতারা তার ওপর লানত বর্ষণ করেন।
টিকাঃ
[১] তিন তালাকের পর স্ত্রীকে পুনরায় নিজের নিকট ফিরিয়ে নিতে ইচ্ছাকৃতভাবে যারা শরীয়তের পোষাকি বিধান গ্রহণ করে।
📄 গুনাহ বান্দাকে আল্লাহ তাআলার কাছেও অভিশপ্ত বানায়
কুরআনুল কারীমে আল্লাহ তাআলা বিভিন্ন রকমের গুনাহগারকে অভিসম্পাত করেছেন। যেমন-
* আল্লাহ তাআলা অভিসম্পাত করেছেন সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদের উপর, আত্মীয়তার বন্ধন বিনষ্টকারীদের উপর, যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তার রাসূলকে কষ্ট দেয় তার উপর।
* অভিসম্পাত করেছেন ঐ ব্যক্তির উপর যে হিদায়াত ও হকের বাণী মানুষের কাছে গোপন করে।
* যে ব্যক্তি বিধর্মীদের জীবনাচারকে মুসলমানদের জীবনাচার থেকে অধিক সঠিক ও হিদায়াতমুখী বলে প্রমাণ করে, আল্লাহ তাআলা অভিসম্পাত করেছেন তার উপরও।
* সতীসাধ্বী সরলমনা মুমিন নারীদের ব্যাপারে যারা কুৎসা রটায়, আল্লাহ তাআলা তাদেরকে লানত করেছেন।
এ ছাড়াও যারা জুলুম করে, অন্যকে কষ্ট দেয়, আল্লাহকে অস্বীকার করে, মিথ্যা কথা বলে এমন ব্যক্তিদেরকে আল্লাহ তাআলা অভিসম্পাত করেছেন।